নবীজী সা. এর ফরয নামায
জামাআত
নবীজী ﷺ মসজিদে এসে জামাআতে ফরয নামায আদায় করার বহু ফজীলত বর্ণনা করেছেন।
مَنْ غَدَا إِلَى الْمَسْجِدِ وَرَاحَ، أَعَدَّ اللهُ لَهُ نُزُلَهُ مِنْ الْجَنَّةِ كُلَّمَا غَدَا أَوْ رَاحَ
“যে সকাল সন্ধ্যা মসজিদে যাওয়া আসা করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতের আতিথ্য প্রস্তুত করেন যতবার সে যায় আসে।” -সহীহ বুখারী (৬৬২), সহীহ মুসলিম (৬৬৯), সহীহ ইবনে হিব্বান (২০৩৭)।
صَلَاةُ الْجَمَاعَةِ تَفْضُلُ صَلَاةَ الْفَذِّ بِسَبْعٍ وَعِشْرِينَ دَرَجَةً
“জামাতের নামায একাকী নামাযের তুলনায় সাতাশগুণ বেশি মর্যাদা রাখে।” -সহীহ বুখারী (৬৪৫), সহীহ মুসলিম (৬৫০), সহীহ ইবনে হিব্বান (২০৫২)।
তিনি নিজেও মসজিদে জামাআতের সাথে ফরয নামায আদায় করতেন। পুরুষদের জামাআতে উপস্থিত হওয়ার প্রতি অপরিসীম গুরুত্ব দিতেন।
قَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ بِالصَّلاَةِ فَتُقَامَ، ثُمَّ أُخَالِفَ إِلَى مَنَازِلِ قَوْمٍ لاَ يَشْهَدُونَ الصَّلاَةَ، فَأُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ.
“আমি ইচ্ছা করেছিলাম, আমি নামাযের নির্দেশ দেব। তখন নামায দাঁড়াবে। এরপর আমি সে লোকদের ঘরে যাব যারা মসজিদে নামাযে উপস্থিত হয় না। তখন আমি তাদের ঘর পুড়িয়ে দেব।” -সহীহ বুখারী (২৪২০), সুনানে তিরমিযী (২১৭) সহীহ মুসলিম (৬৫১, ৬৫২)।
শরঈ ওযর ছাড়া ঘরে ফরয নামায আদায় করতে নিষেধ করেছেন।
مَنْ سَمِعَ النِّدَاءَ فَلَمْ يَأْتِهِ، فَلَا صَلَاةَ لَهُ، إِلَّا مِنْ عُذْرٍ
“যে আযান শোনার পর মসজিদে আসলো না, তার নামায হবে না। তবে ওযর থাকলে ভিন্ন কথা।” -(সহীহ) সুনানে ইবনে মাজাহ (৭৯৩), সহীহ ইবনে হিব্বান (২০৬৪), মুসতাদরাকে হাকেম ১/৩৭২।
خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللهُ ‘ فِى سَفَرٍ فَمُطِرْنَا فَقَالَ: لِيُصَلِّ مَنْ شَاءَ مِنْكُمْ فِى رَحْلِهِ
“আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এক সফরে বের হলাম। এরপর বৃষ্টির কবলে পড়লাম। তখন তিনি বললেন, তোমাদের যে চায় সে নিজ বাহনে নামায পড়ে নিতে পারে।” -সহীহ মুসলিম (৬৯৮), সুনানে আবু দাউদ (১০৬৫), সহীহ ইবনে হিব্বান (৪৩৭)।
মহিলাদেরকে মসজিদে যাওয়ার নির্দেশ দেননি। বরং বলেছেন, মহিলাদের জন্য ঘরে নামায পড়াই উত্তম।
صَلَاتُكِ فِي دَارِكِ خَيْرٌ لَكِ مِنْ صَلَاتِكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ.
“ঘরে তোমার নামায গোত্রের মসজিদে তোমার নামায থেকে উত্তম।” -(হাদীস সহীহ) মুসনাদে আহমাদ (২৭০৯০), সহীহ ইবনে খুযায়মা (১৬৮৯), সহীহ ইবনে হিব্বান (২২১৭)
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: لَوْ أَدْرَكَ رَسُولُ الله ‘ مَا أَحْدَثَ النِّسَاءُ لَمَنَعَهُنَّ كَمَا مُنِعَتْ نِسَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ
“হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আজকাল মহিলারা (মসজিদে গমনের কারণে) যে অবস্থা সৃষ্টি করেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু তা দেখতে পেলে অবশ্যই তাদেরকে বারণ করতেন। যেমন বনী ইসরাঈল মহিলাদেরকে বারণ করা হয়েছিল।” -সহীহ বুখারী (৮৬৯), সহীহ মুসলিম (৪৪৫), সুনানে আবু দাউদ (৫৬৯)।
صَلَاةُ الْمَرْأَةِ فِي بَيْتِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي حُجْرَتِهَا، وَصَلَاتُهَا فِي مَخْدَعِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي بَيْتِهَا
“মহিলাদের ঘরে নামায আদায় করা- বৈঠকখানায় নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম। এবং মহিলাদের সাধারণ থাকার ঘরে নামায আদায় করার চেয়ে গোপন প্রকোষ্ঠে নামায আদায় করা অধিক উত্তম।” -(হাসান) সুনানে আবু দাউদ (৫৭০), মুসতাদরাকে হাকেম ১/২০৯, (৭৫৭) দ্র. সুনানে তিরমিযী (১১৭৩), সুনানে বায়হাকী ৩/১৩১।
وَبُيُوتُهُنَّ خَيْرٌ لَهُنَّ
“ঘর হলো মহিলাদের নামাযের জন্য উত্তম স্থান।” -(হাদীস সহীহ) সহীহ ইবনে খুযায়মা (১৬৮৪),মুসনাদে আহমাদ (৫৪৬৮), সুনানে আবু দাউদ (৫৬৭), সুনানে বায়হাকী ৩/১৩১।
জামাআতে নামায আদায় করার ক্ষেত্রে কাতার সোজা করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
أَقبلَ رَسولُ اللهِ عَلى الناسِ بِوَجهِه، فَقَال: أقِيمُوا صُفُوفَكُمْ ثَلَاثًا، وَاللَّهِ لَتُقِيمُنَّ صُفُوفَكُمْ أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللهُ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের পুরোপুরি অভিমুখী হয়ে বললেন, তোমাদের কাতার সোজা কর। তিনবার একথা বললেন। আল্লাহর শপথ, তোমরা অবশ্যই তোমাদের কাতার সোজা করবে অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের অন্তরের মাঝে বৈপরীত্য সৃষ্টি করে দিবেন।” -(সহীহ) সুনানে আবু দাউদ (৬৬২), সহীহ বুখারী (৭১৭), সুনানে বায়হাকী ১/৭৬।
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাতার সোজা করতে বলতেন।
وَحَاذُوا بَيْنَ الْمَنَاكِبِ، وَسُدُّوا الْخَلَلَ.
“কাঁধে কাঁধ বরাবর করে দাড়াও এবং মাঝের ফাঁকা বন্ধ কর।” -(সহীহ) মুসনাদে আহমাদ (৫৭২৪), সুনানে আবু দাউদ (৬৬৬) মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক (২৪৪১)।
كَانَ رَسُولُ اللهِ ‘ يَمْسَحُ مَنَاكِبَنَا فِي الصَّلَاةِ، وَيَقُولُ: اسْتَوُوا، وَلَا تَخْتَلِفُوا
“নবীজী ﷺ নামাযে আমাদের কাঁধ স্পর্শ করতেন এবং (কাতার সোজা করার উদ্দেশ্যে) বলতেন, সোজা হয়ে দাঁড়াও, কাতার বাঁকা করো না,” -সহীহ মুসলিম (৪৩২), মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা (৩৫৪৭), মুসনাদে আহমাদ (১৭১০২), সুনানে নাসাঈ (৮১২), মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা (১৩৮২), সহীহ ইবনে খুযায়মা (১৫৪২), সহীহ ইবনে হিব্বান (২১৭২)।
দু’পায়ের মাঝে স্বাভাবিক ফাঁকা রাখতেন। পার্শ্ববর্তী মুসল্লীর পায়ের সাথে পা মিলিয়ে রাখার সুস্পষ্ট নির্দেশ করেন নি। বরং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ‘কওলী’ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, সাহাবা কেরাম রা. পার্শ্ববর্তী মুসল্লির পা’র সাথে পা’ মিলিয়ে রাখতেন না। বরং উভয়ের মাঝে জুতা রাখা যায়- পরিমাণ ফাঁকা রাখতেন।
إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ فَلَا يَضَعْ نَعْلَيْهِ عَنْ يَمِينِهِ، وَلَا عَنْ يَسَارِهِ، فَتَكُونَ عَنْ يَمِينِ غَيْرِهِ، إِلَّا أَنْ لَا يَكُونَ عَنْ يَسَارِهِ أَحَدٌ، وَلْيَضَعْهُمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ
“তোমাদের কেউ নামাযে দাঁড়ালে সে যেন নিজ জুতা ডান পাশে না রাখে, তদ্রপ বাম পাশেও যেন না রাখে, কেননা তার বাম পার্শ্ব অন্যজনের ডান পার্শ্ব হয়ে যায়। (এ থেকে প্রমাণিত হয়, দুজন মুসল্লীর মাঝে কিছু ফাঁকা থাকত এবং জুতা রাখার সুযোগ ছিলো। তবে অন্যের ডান হওয়াতে রাখতে বারণ করেছেন।) তবে বাম পাশে কেউ না থাকলে রাখতে পারে। (আর যদি উভয় পাশে মুসল্লী থাকে তাহলে) সে যেন নিজ পায়ের মাঝখানে রাখবে।” -(হাসান) সুনানে আবু দাউদ (৬৫৪), সহীহ ইবনে হিব্বান (২১৮৮), মুসতাদরাকে হাকেম (৯৫৪), সুনানে বায়হাকী ২/৪৩২, শরহুস্ সুন্নাহ (৩০২)।
যে হাদীসে পা’র সাথে পা মিলানোর কথা উল্লেখ হয়েছে তার উপর আক্ষরিক অর্থে আমল করা সম্ভব নয়; ব্যাখ্যা অনিবার্য। বিধায় হাফিযুল হাদীস ও সালাফী আলেমরাও বলেছেন, ঐ হাদীস দ্বারা মিলানো উদ্দেশ্য নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো, অধিক গুরুত্ব বুঝাানো।
একাধিক মুক্তাদী হলে নবীজী ﷺ সামনে দাঁড়াতেন। একজন হলে তাকে ডানে দাঁড় করাতেন।
عَنْ جَابِرٍ: فَقَامَ رَسُولُ اللهُ ‘ لِيُصَلِّىَ ... ثُمَّ جِئْتُ حَتَّى قُمْتُ عَنْ يَسَارِ رَسُولِ اللهُ ‘ فَأَخَذَ بِيَدِي فَأَدَارَنِى حَتَّى أَقَامَنِي عَنْ يَمِينِهِ ثُمَّ جَاءَ جَبَّارُ بْنُ صَخْرٍ فَتَوَضَّأَ ثُمَّ جَاءَ فَقَامَ عَنْ يَسَارِ رَسُولِ اللهُ ‘ فَأَخَذَ رَسُولُ اللهُ ‘ بِيَدَيْنَا جَمِيعًا فَدَفَعَنَا حَتَّى أَقَامَنَا خَلْفَه.
“জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে দাঁড়ালেন। ... আমি এসে রাসূলুল্লাহর বাম পাশে দাঁড়ালাম। তিনি আমার হাত ধরে আমাকে ঘুরিয়ে ডান দিকে নিয়ে এলেন। এরপর জাব্বার বিন সখর এলেন। তিনি অযু করলেন। এরপর এসে রাসূলুল্লাহর বামপাশে দাঁড়ালেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দুজনের হাত ধরে আমাদেরকে পিছনের দিকে সরিয়ে দিলেন, এভাবে তিনি আমাদেরকে তাঁর পেছনে দাঁড় করালেন।” -সহীহ মুসলিম (৩০১০), সুনানে আবু দাউদ (৬৩৪), মুসতাদরাকে হাকেম (৯৩২)।
প্রয়োজনে সামনে সুতরা স্থাপন করতেন।
قَالَ رَسُولُ اللهُ ‘: إِذَا وَضَعَ أَحَدُكُمْ بَيْنَ يَدَيْهِ مِثْلَ مُؤْخِرَةِ الرَّحْلِ فَلْيُصَلِّ وَلاَ يُبَالِ مَنْ مَرَّ وَرَاءَ ذَلِكَ.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন তোমাদের কেউ সামনে হাওদার পেছনের লাঠির মত কিছু স্থাপন করে তখন যেন সে নামাযে দাঁড়ায়, লাঠির ঐ পাশে কে যায় তার যেন পরোয়া না করে।” -সহীহ মুসলিম (৪৯৯) সুনানে তিরমিযী (৩৩৫), কানযুল উম্মাল (১৯২১৭)।
সুতরা’র কাছাকাছি দাঁড়াতেন।
قَالَ رَسُولُ اللهِ ‘:إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ إِلَى سُتْرَةٍ فَلْيَدْنُ مِنْهَا، لاَ يَقْطَعُ الشَّيْطَانُ عَلَيْهِ صَلاَتَهُ.
“কেউ যখন ‘সুতরা’ রেখে নামায পড়ে তখন সে যেন ‘সুতরা’র কাছাকাছি থাকে। শয়তান তার নামাযে বিঘ্নতা সৃষ্টি করতে পারবে না।” -(সহীহ) সুনানে নাসাঈ (৭৪৮), সুনানে আবু দাউদ (৬৯৫), সহীহ ইবনে হিব্বান (২৩৭৩)।
তিনি নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে নিষেধ করেছেন।
لَوْ يَعْلَمُ المـَارُّ بَيْنَ يَدَيِ المـُصَلِّي مَاذَا عَلَيْهِ، لَكَانَ أَنْ يَقِفَ أَرْبَعِينَ خَيْرًا لَهُ مِنْ أَنْ يَمُرَّ بَيْنَ يَدَيْهِ.
“যদি নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী জানত তার কী গোনাহ হচ্ছে, তাহলে তার চল্লিশ বছর দাঁড়িয়ে থাকা তার জন্যে উত্তম সামনে দিয়ে যাওয়ার তুলনায়।” -সহীহ বুখারী (৫১০), সহীহ মুসলিম (৫০৭), সুনানে নাসাঈ (৮৩২)।
ইমামের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন মুক্তাদীর অবস্থার প্রতি পূর্ণ লক্ষ রাখতে।
مَنْ صَلَّى بِالنَّاسِ فَلْيُخَفِّفْ، فَإِنَّ فِيهِمُ المَرِيضَ، وَالضَّعِيفَ، وَذَا الحَاجَةِ
“যে ইমাম হবে সে যেন সহজ-স্বাভাবিকভাবে নামায পড়ায়। কারণ, মুসল্লীদের মাঝে অসুস্থ, দূর্বল ও জরুরতওয়ালা লোক থাকে।” -সহীহ বুখারী (৯০), সহীহ মুসলিম (৪৬৭), মুসনাদে আহমাদ (১৭০৬৫), সুনানে ইবনে মাজাহ (৯৮৪)।