নবীজী সা. এর ফরয নামায
রাসূল সা. এর ফরয নামায
আল্লাহ তাআলা মিরাজের রাতে নবীজী ﷺ-কে পাঁচ ওয়াক্ত নামায দিয়েছেন।
فُرِضَتْ عَلَى النَّبِيِّ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِهِ الصَّلَوَاتُ خَمْسِيْنَ، ثُمَّ نُقِصَتْ حَتَّى جُعِلَتْ خَمْسًا، ثُمَّ نُودِيَ: يَا مُحَمَّدُ، إِنَّهُ لاَ يُبَدَّلُ القَوْلُ لَدَيَّ، وَإِنَّ لَكَ بِهَذِهِ الخَمْسِ خَمْسِينَ.
“মিরাজের রাতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয়েছিলো। এরপর তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করা হয়। এরপর বলা হলো, হে মুহাম্মাদ! আমার কথার কোনো রদ বদল হয় না। আপনার জন্যে এই পাঁচ ওয়াক্তের ছাওয়াব পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান।” -(সহীহ) সুনানে তিরমিযী (২১৩); দ্র. সহীহ বুখারী (৩৮৮৭), সহীহ মুসলিম (১৬২)।
তিনি প্রত্যেক জ্ঞানসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারীর উপর ফরজ করেছেন।
{إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا}
“নিশ্চয় নামায মুমিনদের উপর সময়াবদ্ধ ফরয।” -সূরা নিসা, আয়াত: ১০৩
{وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ}
“তোমরা নামায কায়েম কর ও যাকাত দাও এবং যারা রুকূ করে তাদের সাথে রুকূ কর।” -সূরা বাকারা, আয়াত: ৪৩।
ঈমানের পরেই নামাযের কথা বলেছেন।
{الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ}
“যারা গায়বের প্রতি ঈমান রাখে এবং নামায কায়েম করে।” -সূরা বাকারা, আয়াত: ৩।
নির্দেশ দিয়েছেন নামাযের প্রতি যত্নবান হতে,
{حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا للهِ قَانِتِينَ}
“তোমরা নামাযের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষত মধ্যবর্তী নামাযের প্রতি এবং তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনীত হয়ে দাঁড়াও।” -সূরা বাকারা, আয়াত: ২৩৮।
নামাযের মাধ্যমে সাহায্য নিতে।
{يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ}
“হে মুমিনগণ! তোমরা নামায ও সবরের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।” -সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩
নামাযে অলসতা ও শিথিলতার নিন্দা করেছেন।
{إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ أَللهُ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللهَ إِلَّا قَلِيلًا}
“নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে ধোঁকাবাজি করে। অথচ আল্লাহই তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে রেখেছেন। আর যখন তারা নামাযে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে দাঁড়ায়, কেবল লোক দেখানোর জন্য, আসলে তারা অল্পই আল্লাহকে স্মরণ করে।” -সূরা নিসা আয়াত: ১৪২।
{فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ}
“ধ্বংস হোক সে নামাযীদের, যারা তাদের নামাযে গাফলতি করে। যারা মানুষকে দেখায়।” -সূরা মাউন, আয়াত: ৪-৬।
নামায না পড়লে শাস্তির কথাও বলেছেন।
{مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ}
“(তাদেরকে বলা হবে) কোন্ কাজ তোমাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করল? তারা বলবে, আমরা নামাযীদের মধ্যে ছিলাম না।” -সূরা মুদ্দাচ্ছির, আয়াত: ৪২-৪৩।
এরশাদ করেছেন, ‘নামায অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে।’
{وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ}
“এবং আপনি নামায কায়েম করুন। নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বাধা দেয়।” -সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫।
নবীজী ﷺ নামাযের অপরিসীম গুরুত্ব দিতেন।
قَالَ رَسُولُ اللهِ ‘: بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَالْحَجِّ وَصَوْمِ رَمَضَانَ.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর। আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত কোনো মাবুদ নেই ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল- এর সাক্ষ্য দেয়া, নামায কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, হজ্জ করা এবং রমযানের রোযা রাখা।” -সহীহ বুখারী (৮), সহীহ মুসলিম (১৬), সুনানে তিরমিযী (২৬০৯)
বলেছেন, নামায ইসলামের ভিত্তি।
أَوَلَا أَدُلُّكَ عَلَى رَأْسِ الْأَمْرِ وَعَمُودِهِ وَذُرْوَةِ سَنَامِهِ؟ أَمَّا رَأْسُ الْأَمْرِ: فَالْإِسْلَامُ، فَمَنْ أَسْلَمَ سَلِمَ، وَأَمَّا عَمُودُهُ: فَالصَّلَاةُ، وَأَمَّا ذُرْوَةُ سَنَامِهِ: فَالْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ.
“আমি কি তোমাকে এই বিষয়ের (দীনের) মূল, এর খুঁটি ও এর সর্বোচ্চ চূড়া জানাবো না? এই বিষয়ের মূল হলো ইসলাম, সুতরাং যে ইসলাম গ্রহণ করলো সে নিরাপদ হলো। এর খুঁটি হলো নামায। আর এর সর্বোচ্চ চূড়া হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ।” -(হাদীস সহীহ) মুসনাদে আহমাদ (২২০৬৮), মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা (৩০৯৫১), আলমুজামুল কাবীর-তাবারানী (৩০৪)।
এবং ঈমান ও কুফরের মাঝে পার্থক্যকারী।
بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلاَةِ إنّ
“ব্যক্তির কুফুর-শিরকের মাঝে পার্থক্যকারী হলো নামায ছেড়ে দেওয়া।” -সহীহ মুসলিম (৮২), সুনানে আবু দাউদ (৪৬৭৮), সুনানে বায়হাকী ৩/৩৬৫
কেউ মুসলমান হলে সর্বপ্রথম তাকে নামায শিক্ষা দিতেন।
كَانَ رَسُولُ اللهِ ‘ إِذَا أَسْلَمَ الرَّجُلُ كَانَ أَوَّلُ مَا يُعَلِّمُنَا الصَّلاةَ أَوْ قَالَ: عَلَّمَهُ الصَّلَاةَ
“কেউ যখন ইসলাম গ্রহণ করত তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে প্রথমে নামায শিখাতেন। অথবা বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাকে প্রথমে নামায শিখাতেন।” -(সহীহ) মুসনাদে বাযযার (২৭৬৫), আলমুজামুল কাবীর-তাবারানী (৮১৮৬), মাজমাউয যাওয়ায়েদ ২/১২১।
নবীজী ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব নেয়া হবে। নামাযের হিসাব ঠিক হলে অন্যান্য আমলও ঠিক বলে গণ্য হবে।
أوَّلُ ما يُحاسَبُ بهِ العَبْدُ يَوْمَ القِيامَةِ الصَّلاةُ فإنْ صَلَحَتْ صَلَحَ سائِرُ عَمَلِهِ وإنْ فَسَدَتْ فَسَدَ سائِرُ عَمَلِه.
“কেয়ামতের দিন বান্দার কাছ থেকে প্রথম হিসাব নেয়া হবে নামাযের। যার নামায ঠিক থাকবে তার সব আমল ঠিক থাকবে। যার নামায ঠিক থাকবে না তার অন্য সব আমলও ঠিক থাকবে না।” -(হাদীস হাসান) আলমুজামুল আওসাত-তাবারানী (১৮৫৯), সুনানে তিরমিযী (৪১৩), আল-মুখতারা (২৫৭৮)।
তিনি নামাযের উৎসাহ দিয়েছেন; বর্ণনা করেছেন নামাযের বহু ফজীলত। গুরুত্বের প্রতি লক্ষ করে নবীজী ﷺ ছোট বাচ্চাদেরকে নামাযের প্রতি উৎসাহ দিতে বলেছেন
مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا، وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْر.
“সাত বছর বয়সে থাকা অবস্থায় তোমরা তোমাদের সন্তানদের নামায শিখাও। আর দশ বছর বয়সে নামাযের জন্যে তাদেরকে প্রহার কর।” -(হাদীস সহীহ) সুনানে আবু দাউদ (৪৯৫, ৪৯৪); দ্র. মুসনাদে আহমাদ (৬৬৮৯, ৬৭৫৬), কানযুল উম্মাল (৪৫৩২৪)।
নবীজী ﷺ এর শেষ কথাও ছিলো নামায।
كَانَ آخِرُ كَلامِ رَسُولِ اللهِ ‘: الصَّلاةَ الصَّلاةَ، اتَّقُوا اللهَ فِيمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ কথা ছিলো: নামায! নামায! তোমাদের অধীনে যারা রয়েছে তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর।” -(হাদীস সহীহ) সুনানে আবু দাউদ (৫১৫৬), মুসনাদে আহমাদ (৫৮৫), সুনানে ইবনে মাজাহ (২৬৯৮)।
নবীজী ﷺ পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘তোমরা আমার মতো নামায পড়ো।’
عن مَالِكٍ ، أَتَيْنَا إِلَى النَّبِيِّ ‘ وَنَحْنُ شَبَبَةٌ مُتَقَارِبُونَ فَأَقَمْنَا عِنْدَهُ عِشْرِينَ يَوْمًا وَلَيْلَةً... قَالَ ‘ : ارْجِعُوا إِلَى أَهْلِيكُمْ فَأقِيمُوْا فِيْهِمْ...وصَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي.
“হযরত মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা সমবয়সী কিছু যুবক রাসূল ﷺ এর খেদমতে হাযির হয়ে বিশ দিন অতিবাহিত করলাম।... (আমাদের পূনরায় বাড়ীতে প্রস্থানের সময়) নবীজী ﷺ বললেন, তোমরা বাড়ীতে ফিরে যাও এবং তাদের মাঝে নামায প্রতিষ্ঠা করো যেভাবে আমাকে পড়তে দেখেছ।” -সহীহ বুখারী (৬৩১), আলআদাবুল মুফরাদ (২১৩), সহীহ ইবনে হিব্বান (২১৩১)।
হাদীসটি আক্ষরিক অর্থে অনেক ব্যাপক হলেও অন্যান্য হাদীস ও দলীলের কারণে মর্ম ও নির্দেশনার দিক থেকে এতো ব্যাপক নয়। এ দিকে ইঙ্গিত করেই হাদীসটির বর্ণনাকারী ইমাম ইবনে হিব্বান রাহ. বলেন,
قَوْلُهُ ‘: صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي لَفْظَةُ أَمْرٍ تَشْتَمِلُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ كَانَ يَسْتَعْمِلُهُ ‘ فِي صَلَاتِهِ، فَمَا كَانَ مِنْ تِلْكَ الْأَشْيَاءِ خَصَّهُ الْإِجْمَاعُ أَوِ الْخَبَرُ بِالنَّقْلِ، فَهُوَ لَا حَرَجَ عَلَى تَارِكِهِ فِي صَلَاتِهِ، وَمَا لَمْ يَخُصَّهُ الْإِجْمَاعُ أَوِ الْخَبَرُ بِالنَّقْلِ، فَهُوَ أَمْرٌ حَتْمٌ عَلَى الْمُخَاطَبِينَ كَافَّةً، لَا يَجُوزُ تَرْكُهُ بِحَالٍ.
-সহীহ ইবনে হিব্বান (২১৩১)