নামাযের বিবিধ মাসআলা
সফরকালীন নামায
নবীজী ﷺ সফরে চার রাকআতবিশিষ্ট নামায দু’রাকআত পড়তেন।
{وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَقْصُرُواْ مِنَ الصَّلاَةِ إِنْ خِفْتُمْ أَن يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُواْ إِنَّ الْكَافِرِينَ كَانُواْ لَكُمْ عَدُوًّا مُّبِيْنًا}
“যখন তোমরা যমীনে সফর করবে তখন তোমাদের নামায কসর করতে কোনো দোষ নেই। যদি আশংকা করো যে, কাফেররা তোমাদেরকে ফেতনায় ফেলবে। নিশ্চয় কাফেররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” -সূরা নিসা, আয়াত: ১০১।
قَالَتْ عَائِشَةُ أُمُّ الْمُؤْمِنِينَ: فَرَضَ اللَّهُ الصَّلَاةَ حِينَ فَرَضَهَا رَكْعَتَيْنِ رَكْعَتَيْنِ فِي الْحَضَرِ وَالسَّفَرِ فَأُقِرَّتْ صَلَاةُ السَّفَرِ وَزِيدَ فِي صَلَاةِ الْحَضَرِ.
“আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহ যখন নামায ফরয করেছেন তখন ফরয করেছেন দুই রাকআত দুই রাকআত। এরপর সফরের নামায বহাল রাখা হয়েছে আর মুকীম অবস্থায় নামায বাড়ানো হয়েছে।” -সহীহ বুখারী (৩৫০), সহীহ মুসলিম (৬৮৫)।
সফর অবস্থায় নবীজী ﷺ ইমাম হলে দু’রাকআত পড়াতেন।
صَلُّوا أَرْبَعًا، فَإِنَّا قَوْمٌ سَفْرٌ.
“উপস্থিত লোকদের বললেন, তোমরা চার রাকআত পড়ে নাও, আমরা মুসাফিরদল।” -(হাদীস হাসান) সুনানে আবু দাউদ (১২২৯), মুসনাদে আহমাদ (১৯৮৭৮)।
قَالَ عُمَرُ:র্ يَا أَهْلَ مَكَّةَ! أَتِمُّوا صَلاَتَكُمْ فَإِنَّا قَوْمٌ سَفْرٌ.
“উমার রা. বললেন, হে মক্কাবাসী, তোমরা চার রাকআত পূর্ণ কর। আমরা মুসাফিরদল।” -(সহীহ) মুয়াত্তা মালেক (১৫০৬), মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক (৪৩৬৯, ৪৩৭১)।
নবীজী ﷺ মদীনায় নামায পড়িয়েছেন। সাহাবা কেরাম দূর-দূরান্ত থেকে আসতেন। নবীজী ﷺ এর পেছনে নামায পড়তেন। তারা মুসাফির হলেও নবীজীর পিছনে চার রাকআতই পড়তেন। আর নবীজী ﷺ তা সমর্থন করতেন (এর ব্যতিক্রম হাদীসে প্রমাণিত নয়)। তাই মুসাফির মুকীমের পেছনে নামায পড়লে ইমামের অনুসরণে মুকীমের নামায আদায় করবে।
كَانَ ابْنُ عُمَرَ إذَا صَلَّى مَعَ الإِمَامِ صَلَّى أَرْبَعًا، وَإِذَا صَلاَّهَا وَحْدَهُ صَلَّاهَا رَكْعَتَيْنِ.
“ইবনে উমার রা. যখন ইমামের সাথে নামায পড়তেন চার রাকআত পড়তেন। আর একাকী নামায পড়লে দু’রাকআত পড়তেন।” -সহীহ মুসলিম (৬৯৪), মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা (১৪১৭০)।
عَنِ ابْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ: صَلَّيْتُ مَعَ النَّبِيٍّ ‘ رَكْعَتَيْنِ، وَمَعَ أَبِي بَكْرٍ رَكْعَتَيْنِ، وَمَعَ عُمَرَ رَكْعَتَيْنِ ومَع عُثْمَانَ صَدْرًا مِنْ إِمَارَتِه ثم أَتَمَّ... أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ صَلّى أَرْبَعًا.
“ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি নবীজীর সাথে দু’রাকআত নামায পড়েছি। আবুবকর রা. এর সাথে দু’রাকআত পড়েছি। উমার রা. এর সাথে দু’রাকআত পড়েছি। উসমান রা. এর সাথে তাঁর খেলাফতের শুরুর দিনগুলোতে পড়েছি, তিনি চার রাকআত পূর্ণ পড়েছেন। ...... আবদুল্লাহ রা. চার রাকআত পড়েছেন।” -(সহীহ) সুনানে আবু দাউদ (১৯৬০), সহীহ বুখারী (১০৮৪, ১৬৫৭), সহীহ মুসলিম (৬৯৫)।
عَنْ مُوسَى بْنِ سَلَمَةَ، قَالَ: كُنَّا مَعَ ابْنِ عَبَّاسٍ بِمَكَّةَ، فَقُلْتُ: إِنَّا إِذَا كُنَّا مَعَكُمْ صَلَّيْنَا أَرْبَعًا، وَإِذَا رَجَعْنَا إِلَى رِحَالِنَا صَلَّيْنَا رَكْعَتَيْنِ. قَالَ: تِلْكَ سُنَّةُ أَبِي الْقَاسِمِ ‘.
“মূসা বিন সালামা রাহ. বলেন, আমরা মক্কায় ইবনে আব্বাস রা. এর সাথে ছিলাম। আমি বললাম, আমরা যখন আপনাদের সাথে থাকি চার রাকআত নামায পড়ি। আর যখন কাফেলায় ফিরি তখন দু’রাকআত নামায পড়ি। তিনি বললেন, এটিই নবীজীর সুন্নাহ।” -(সহীহ) মুসনাদে আহমাদ (১৮৬২), সহীহ মুসলিম (৬৮৮)।
নবীজী ﷺ সফরের নিয়তে নিজ এলাকা অতিক্রম করলে ‘কসরের নামায’ পড়তেন।
عَنْ أَنَسٍ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ:صَلَّيْنَا مَعَ النَّبِيِّ ‘ الظُّهْرَ بِالمَدِينَةِ أَرْبَعًا، وَبِذِي الحُلَيْفَةِ العَصْرَ رَكْعَتَيْنِ.
“আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবীজীর সাথে মদীনায় যোহর নামায পড়েছি চার রাকআত আর যুল হুলায়ফায় আছর নামায পড়েছি দুই রাকআত।” -(সহীহ) সুনানে তিরমিযী (৫৪৫), সহীহ মুসলিম (৬৯০)। দ্র. মুসনাদে আবু ইয়ালা (৫৮৬২)।
তিন দিন দিবা-রাত্রি স্বাভাবিকভাবে পায়ে হেটে অতিক্রম করা যায়- এ পরিমাণ দূরত্বকে সফরে দূরত্ব স্থির করেছেন।
جَعَلَ رَسُولُ اللهِ ‘ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَلَيَالِيَهُنَّ لِلْمُسَافِرِ، وَيَوْمًا وَلَيْلَةً لِلْمُقِيمِ.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনদিন তিনরাত নির্ধারণ করেছেন মুসাফিরের জন্যে আর একদিন একরাত মুকীমের জন্যে।” (মাসেহের সময়সীমা থেকে ইমামগণ সফরের দূরত্বের পরিমাণ স্থির করেছেন।) -সহীহ মুসলিম (২৭৬), সহীহ ইবনে হিব্বান (১৩২২)।র্
إِنَّ ابْنَ عُمَرَ وَابْنَ عَبَّاسٍ كَانَا يُصَلِّيَانِ رَكْعَتَيْنِ رَكْعَتَيْنِ، وَيُفْطِرَانِ فِى أَرْبَعَةِ بُرُدٍ فَمَا فَوْقَ ذَلِكَ.
“ইবনে উমার ও ইবনে আব্বাস রা. দুই রাকআত দুই রাকআত নামায পড়তেন। চার বারীদ (সফরের নির্দিষ্ট দূরত্ব) বা এর চেয়ে বেশি দূরত্ব হলে রোযা রাখতেন না।” -(সহীহ) সুনানে বায়হাকী ৩/১৩৭, আলআওসাত (২২৫১), সহীহ বুখারী (১০৮৬, তা’লীকান)।
নবীজী ﷺ থেকে সাহাবা কেরাম নামাযের পদ্ধতি ও নিয়ম শিখেছেন। তাদের থেকে বর্ণিত, মুসাফির পনের দিনের বেশি এক স্থানে অবস্থান করলে মুকীমের নামায পড়বে।
قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ: إِذَا كُنْتَ مُسَافِرًا، فَوَطَّنْتَ نَفْسَكَ عَلَى إِقَامَةِ خَمْسَةَ عَشَرَ يَوْمًا، فَأَتْمِمِ الصَّلَاةَ، وَإِنْ كُنْتَ لَا تَدْرِي مَتَى تَظْعَنُ فَأَقْصِرْ.
“আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা. বলেন, যদি তুমি মুসাফির হও আর পনেরোদিন সে স্থানে অবস্থানের পোক্তা নিয়ত কর তাহলে পূর্ণ নামায পড়ো। আর যদি না জানো কবে তুমি সফর করবে, তাহলে কসর কর।” -কিতাবুল আছার-ইমাম আবু হানীফা; বর্ণনা: মুহাম্মাদ রাহ. (১৮৮), কিতাবুল হুজ্জাহ ১/১২০।
নবীজী ﷺ ইকামাতের নিয়ত না করলে (যেমন যুদ্ধরত অবস্থায়) কসরের নামায পড়তে থাকতেন; যতদিন অতিবাহিত হোক না কেন।
أقامَ رسولُ الله ‘ بتبوك عشرينَ يوماً يقصُر الصلاة.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকে বিশদিন অবস্থান করেছেন, তিনি নামায কসর করতেন।” -(সহীহ) সুনানে আবু দাউদ (১২৩৫), মুসনাদে আহমাদ (১৪১৩৯)। দ্র. সহীহ বুখারী (১০৮০)।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّهُ قَالَ: أَرْتَجَ عَلَيْنَا الثَّلْجُ وَنَحْنُ بِأَذْرَبِيجَانَ سِتَّةَ أَشْهُرٍ فِى غَزَاةٍ. قَالَ ابْنُ عُمَرَ: فَكُنَّا نُصَلِّى رَكْعَتَيْنِ، وفي رواية: إِذَا أَزْمَعْتَ إِقَامَةً فَأَتِمّ
“আজারবাইজানে এক যুদ্ধে থাকা অবস্থায় ছয় মাস আমাদের উপর তুষারপাত হলো। ইবনে উমার রা. বলেন, আমরা দুই রাকআত নামায পড়তাম। এক বর্ণনায় রয়েছে, যখন তুমি মুকীম হওয়ার নিয়ত করবে তখন পূর্ণ নামায পড়বে।” -(সহীহ) সুনানে বায়হাকী ৩/১৫২, মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক (৪৩৩৯)। দ্র. মুসনাদে আহমাদ (৫৫৫২)।
নবীজী ﷺ প্রত্যেক নামায নির্ধারিত সময়ে পড়তেন।
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ‘ يُصَلِّيْ الصَّلاَةَ لِوَقْتِهَا إِلاَّ بِجَمْعٍ وَعَرَفَاتٍ.
“মুযদালিফা ও আরাফা ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল নামায ওয়াক্তমত আদায় করতেন।” -(সহীহ) সুনানে নাসাঈ (৩০১০), সহীহ বুখারী (১৬৮২), সহীহ মুসলিম (১২৮৯)।
দু’ওয়াক্তের নামায এক ওয়াক্তে আদায় করতেন না। প্রয়োজনে যোহরের নামায ওয়াক্তের শেষসময়ে আর আছরের নামায ওয়াক্তের শুরুর সময়ে পড়তেন। এমনিভাবে মাগরিবের নামায ওয়াক্তের শেষসময়ে আর এশার নামায ওয়াক্তের শুরুর সময়ে আদায় করতেন।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ‘ إِذَا أَعْجَلَهُ السَّيْرُ فِي السَّفَرِ، يُؤَخِّرُ الْمَغْرِبَ حَتَّى يَجْمَعَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ الْعِشَاءِ.
“আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, যখন সফরের তাড়া থাকত মাগরিবকে বিলম্বিত করে মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করতেন।” -সহীহ বুখারী (১০৯১), সহীহ মুসলিম (৭০৩)।
عَن عَمرو قال: سَمِعتُ أَبَا الشَّعْثَاءِ جَابِرًا قَالَ: سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ قَالَ: صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ‘ ثَمَانِيًا جَمِيعًا وَسَبْعًا جَمِيعًا، قُلْتُ: يَا أَبَا الشَّعْثَاءِ أَظُنُّهُ أَخَّرَ الظُّهْرَ وَعَجَّلَ الْعَصْرَ وَعَجَّلَ الْعِشَاءَ وَأَخَّرَ الْمَغْرِبَ قَالَ وَأَنَا أَظُنُّهُ.
“আমর বলেন, আমি আবুশ শা’ছা জাবেরকে বলতে শুনেছি, আমি ইবনে আব্বাস রা.কে বলতে শুনেছি, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে পুরো আট রাকআত ও পুরো সাত রাকআত পড়েছি। আমি বললাম, হে আবুশ শা’ছা, ধারণা করি যোহরকে বিলম্বিত করেছেন আর আসরকে দ্রুত পড়েছেন এবং এশাকে দ্রুত পড়েছেন আর মাগরিব বিলম্বিত করেছেন? আমি বললাম, আমিও তা ধারণা করি।” -সহীহ বুখারী (১১৭৪), সহীহ মুসলিম (৭০৫)।
বিতির ও ফজরের দু’রাকআত সুন্নাত কখনো ছাড়তেন না।
رَكَعَ النَّبِيُّ ‘ رَكْعَتَيْ الْفَجْرِ فِي السَّفَر وَفي رواية: وَلَمْ يَكُنْ يَدَعْهُمَا أَبَدًا.
“সফরে নবীজী ফজরের দুই রাকআত সুন্নাত আদায় করলেন। এক বর্ণনায় রয়েছে, তিনি কখনো এই দুই রাকআত ছাড়তেন না।” -সহীহ বুখারী (১১৫৯, কিতাব: ১৮ বাব: ১২), যাদুল মাআদ ১/৩০৫।
সফরের হালতে অন্যান্য ‘সুনানে রাতেবা’ কখনো আদায় করতেন, কখনো আদায় করতেন না।
قَالَ ابْنُ عُمَرَ:صَحِبْتُ النَّبِيَّ ‘ فَلَمْ أَرَهُ يُسَبِّحُ فِي السَّفَرِ.
“ইবনে উমার রা. বলেন, আমি নবীজীর সাথে ছিলাম। সফরে তাঁকে সুন্নাত পড়তে দেখিনি।” -সহীহ বুখারী (১১০১), সহীহ মুসলিম (৬৮৯)।
قَالَ الْبَرَاءُ: سَافَرْتُ مَعَ النَّبِيِّ ‘ ثَمَانِيَةَ عَشَرَ سَفَرًا، فَلَمْ أَرَهُ تَرَكَ الرَّكْعَتَيْنِ قَبْلَ الظُّهْرِ.
“বারা রা. বলেন, আমি নবীজীর সাথে আঠারোটি সফর করেছি। আমি তাঁকে যোহরের পূর্বের দুই রাকআত ছাড়তে দেখিনি।” -(সলিহ) মুসনাদে আহমাদ (১৮৫৮৩) সহীহ ইবনে খুযায়মা (১২৫৩) মুসতাদরাকে হাকেম (১১৮৭)।
সুযোগ হলে নফল পড়তেন।
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ‘ يُصَلِّي عَلَى رَاحِلَتِهِ حَيْثُ تَوَجَّهَتْ فَإِذَا أَرَادَ الْفَرِيضَةَ نَزَلَ فَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহনে আরও হী হয়ে নামায আদায় করতেন, বাহন যেদিকে মুখ করে থাকুক না কেনো। যখন ফরয আদায় করতে চাইতেন নেমে কেবলামুখী হতেন।” -সহীহ বুখারী (৪০০), সহীহ মুসলিম(৭০০)।