ওয়াজিব ও সুন্নাত নামায
জানাযার নামায
নবীজী ﷺ কোনো মুসলমান মারা গেলে যত দ্রুত সম্ভব তার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করতে বলেছেন।
إِذَا مَاتَ أَحَدُكُمْ فَلَا تَحْبِسُوهُ، وَأَسْرِعُوا بِهِ إِلَى قَبْرِهِ
“তোমাদের কেউ ইন্তেকাল করলে দ্রুত তার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে; বিলম্ব করবে না।” -(হাসান) আলমুজামুল কাবীর-তাবারানী ১২/৪৪৪ (১৩৬১৩), দ্র. সহীহ বুখারী (১৩১৫), সহীহ মুসলিম (৯৪৪), সুনানে আবু দাউদ (৩১৫৯)।
তিনি গুরুত্ব সহকারে জানাযার নামায পড়তেন। কেউ মারা গেলে তাঁকে অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
إِنَّ أَخَاكُمْ النَّجَاشِيَّ قَدْ مَاتَ، فَقُومُوا فَصَلُّوا عَلَيْهِ
“তোমাদের ভাই (বাদশাহ) নাজাশী পরলোক গমন করেছে। সবাই আসো! তাঁর জানাযার নামায পড়ো।” -(সহীহ) সুনানে তিরমিযী (১০৩৯), সহীহ মুসলিম (৯৫৩), সুনানে ইবনে মাজাহ (১৫৩৫,১৫৩৬), সহীহ ইবনে হিব্বান (৩১০২)।
مَا مَاتَ مِنْكُمْ مَيِّتٌ -مَا كُنْتُ بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ- إِلَّا آذَنْتُمُونِي بِهِ، فَإِنَّ صَلَاتِي عَلَيْهِ رَحْمَةٌ
“আমার উপস্থিতিতে তোমাদের কেউ ইন্তিকাল করলে অবশ্যই আমাকে জানাবে। কারণ, আমার প্রদত্ত জানাযা তার জন্য রহমত স্বরূপ।” -(সহীহ) সহীহ ইবনে হিব্বান (৩০৮৭), মুসনাদে ইবনে আবি শায়বা (৭০৭), সুনানে ইবনে মাজাহ (১৫২৮)।
একবার এক সাহাবী/সাহাবীয়া মারা গেলে নবীজী ﷺ কে না জানিয়েই দাফন করা হয়; তিনি জানার পরে (ওয়ালী হিসেবে) তার কবরে নামায পড়েন।
إِنَّ رَجُلًا أَسْوَدَ أَوْ امْرَأَةً سَوْدَاءَ كَانَ يَقُمُّ الْمَسْجِدَ، فَمَاتَ، فَسَأَلَ النَّبِيُّ ‘ عَنْهُ، فَقَالُوا: مَاتَ، قَالَ: أَفَلَا كُنْتُمْ آذَنْتُمُونِي بِهِ، دُلُّونِي عَلَى قَبْرِهِ -أَوْ قَالَ: قَبْرِهَا-، فَأَتَى قَبْرَهَا، فَصَلَّى عَلَيْهَا.
“একজন কালো পুরুষ বা মহিলা মসজিদ পরিস্কার করতেন। একদিন সে মারা গেলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খবর জানতে চাইলেন। তারা বললেন, তিনি ইন্তিকাল করেছেন। তিনি বললেন, তোমরা আমাকে জানাতে পারলে না! আমাকে তার কবর দেখিয়ে দাও। এরপর তিনি তার কবরে এসে তার জানাযার নামায পড়লেন।” -সহীহ বুখারী (৪৫৮), সহীহ মুসলিম (৯৫৬)। দ্র. আততাজরীদ ৩/১১২৩
শর্তসাপেক্ষে সীমিত সময়ের জন্য কবরে নামায পড়ার সুযোগ রয়েছে। ইমাম ইবনে আবদুল বার রাহ. বলেন,
أجمع العلماء الذين رأوا الصلاة على القبر جائزة: أنه لا يصلى على قبر إلا بقرب ما يدفن
-আলইসতিযকার ৩/৩৫।
নবীজী ﷺ শহীদদের জানাযার নামায পড়েছেন।
إنَّ رَجُلًا مِنَ الْأَعْرَابِ جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ ‘ فَآمَنَ بِهِ وَاتَّبَعَهُ، ثُمَّ قَالَ: ... وَلَكِنِّي اتَّبَعْتُكَ عَلَى أَنْ أُرْمَى إِلَى هَهُنَا، وَأَشَارَ إِلَى حَلْقِهِ بِسَهْمٍ، فَأَمُوتَ فَأَدْخُلَ الْجَنَّةَ فَقَالَ: إِنْ تَصْدُقِ اللَّهَ يَصْدُقْكَ، فَلَبِثُوا قَلِيلًا ثُمَّ نَهَضُوا فِي قِتَالِ الْعَدُوِّ، فَأُتِيَ بِهِ النَّبِيَّ ‘ يُحْمَلُ قَدْ أَصَابَهُ سَهْمٌ حَيْثُ أَشَارَ، فَقَالَ النَّبِيُّ ‘: أَهُوَ هُوَ؟قَالُوا: نَعَمْ، قَالَ: صَدَقَ اللَهَ فَصَدَقَهُ، ثُمَّ كَفَّنَهُ النَّبِيُّ ‘ فِي جُبَّةِ النَّبِيِّ ‘، ثُمَّ قَدَّمَهُ فَصَلَّى عَلَيْهِ.
“এক বেদুইন নবীজীর কাছে এসে ঈমান গ্রহণ করলো এবং তাঁর অনুসরণ করলো। এরপর সে বললো, ... কিন্তু আমি আপনাকে অনুসরণ করব এই শর্তে যে, আমার এই জায়গায় “এটা বলে সে তার গলা দেখালো” তীর নিক্ষেপ করা হবে ফলে আমি মারা যাবো এবং জান্নাতে দাখেল হবো। নবীজী বললেন, তুমি যদি আল্লাহর সাথে সত্য আচরণ কর আল্লাহ তোমার সাথে সত্য আচরণ করবেন।
সাহাবাগণ এর পর অল্প সময় থাকলেন। এরপর যুদ্ধের জন্যে উঠে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বেদুইনকে নিয়ে আসা হলো, যে জায়গা সে দেখিয়েছিলো সে জায়গায় তীর লেগে আছে। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই কি সেই? তারা বললেন, জী। নবীজী বললেন, সে আল্লাহর সাথে সত্য ওয়াদা করেছে, আল্লাহ তাকে সত্য প্রতিদান দিবেন। এরপর নবীজী তাকে নিজের জুব্বায় জড়িয়ে নিয়ে সামনে রাখলেন আর তার জানাযা পড়লেন।” - (সহীহ) সুনানে নাসাঈ (১৯৫৩), মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক (৬৬৫১), শরহু মাআনিল আছার ১/৩২৩।
إنَّ النَّبِيَّ ‘ خَرَجَ يَوْمًا فَصَلَّى عَلَى أَهْلِ أُحُدٍ صَلَاتَهُ عَلَى الْمَيِّتِ.
“নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন বের হলেন এবং মাইয়েতের জানাযার নামাযের মত উহুদের শহীদদের জানাযা পড়লেন।” -সহীহ বুখারী (১৩৪৪), সহীহ মুসলিম (২২৯৬)। দ্র. শরহু মাআনিল আছার ১/৩২১-৩২৪।
তবে আত্মহত্যাকারী ও গনীমতের মালে খেয়ানতকারীর জানাযা নিজে পড়েননি। উপস্থিত সাহাবীদেরকে পড়তে বলেছেন।
أُتِىَ النَّبِيَّ ‘ بِرَجُلٍ قَتَلَ نَفْسَهُ بِمَشَاقِصَ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْهِ.
“নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হলো, যে লোহার চিরুনী দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। নবীজী তার জানাযা পড়েননি।” -সহীহ মুসলিম (৯৭৮), মুসনাদে আহমাদ (২০৯৪২), সুনানে তিরমিযী (১০৬৯)।
إنَّ رَجُلاً مِنْ أَصْحَابِ النَّبِىِّ ‘ تُوُفِّيَ يَوْمَ خَيْبَرَ فَذَكَرُوا ذلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ ‘، فَقَالَ صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ. فَتَغَيَّرَتْ وُجُوهُ النَّاسِ لِذَلِكَ فَقَالَ إِنَّ صَاحِبَكُمْ غَلَّ في سَبِيلِ اللَّهِ. فَفَتَّشْنَا مَتَاعَهُ فَوَجَدْنَا خَرَزًا مِنْ خَرَزِ يَهُودَ لَا يُسَاوِي دِرْهَمَيْنِ.
“এক সাহাবী খায়বার যুদ্ধে মারা গেলেন। অন্যরা বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তুলে ধরলো। তিনি বললেন, তোমরা তার জানাযা পড়ে নাও। এ কথার কারণে লোকদের চেহারায় পরিবর্তন দেখা দিলো। তখন নবীজী বললেন, তোমাদের সঙ্গী গনীমতের সম্পদে খেয়ানত করেছে। তখন আমরা তার সামানা খোঁজ করে ইহুদীদের একটি অলংকার পেলাম, যার মূল্য দুই দিরহামও হবে না।” -(হাসান) সুনানে আবু দাউদ (২৭১০), মুসতাদরাকে হাকেম (২৫৮২) ২/১২৭, সহীহ ইবনে হিব্বান (৪৮৫৩)।
(জীবিত ভূমিষ্ট) শিশুর জানাযা নবীজী ﷺ পড়েছেন।
أُتِيَ رسولَ الله ‘ بصَبِيٍّ منْ صِبْيَانِ الْأَنْصَارِ، فَصَلّى عَلَيْهِ
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক আনসারী শিশুকে নিয়ে আসা হলো। তিনি তার জানাযার নামায পড়লেন।” -(সহীহ) সুনানে তিরমিযী (১০৩২), মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা (১১৩৬৮), সহীহ ইবনে হিব্বান (৩০৪৯), দ্র. সহীহ ইবনে হিব্বান (৬০৩২)।
الطِّفْلُ يُصَلَّى عَلَيْهِ
“শিশু মারা গেলে তার জানাযার নামায পড়তে হবে।” -(সহীহ) সুনানে নাসাঈ (১৯৪৭), সহীহ মুসলিম (২৬৬২), সুনানে ইবনে মাজাহ (১৫০৭)।
নবীজী ﷺ গায়েবানা জানাযা পড়তেন না।
যাদুল মাআদ ১/৫০০-৫০১।
সহীহ ও অকাট্য হাদীস দ্বারা গায়েবানা জানাযা প্রমাণিত নয়। বাদশাহ নাজাশির জানাযা একটি বিশেষ ঘটনা ছিলো। এ ছাড়া বর্ণিত হয়েছে যে, তার খাটিয়া নামাযের সময় রাসূল ﷺ এর সম্মুখে উপস্থিত করা হয়েছিল। -সহীহ ইবনে হিব্বান (৩১০২), আবু আওয়ানা, ফাতহুল বারী ৩/২৩৩।
খোলাফা রাশেদিনসহ কোনো সাহাবীর স্বাভাবিক অবস্থায় দ্বিতীয় জানাযা পড়া হয় নি। তবে শর্তসাপেক্ষে ওয়ালীর জন্য দ্বিতীয় জানাযা পড়ার অনুমতি রয়েছে।
كَانَ ابْنُ عُمَرَ إِذَا انْتَهَى إِلَى جَنَازَةٍ وَقَدْ صُلِّيَ عَلَيْهَا دَعَا وَانْصَرَفَ وَلَمْ يُعِدِ الصَّلَاةَ
-(সহীহ) মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক (৬৫৪৫), আততামহীদ ৬/২৬০, আলইসতিযকার ৩/৩৪।
হাফিযুল হাদীস ইমাম আবদুর রাযযাক রাহ. অনুরূপ আরও একটি বর্ণনা উল্লেখ করে বলেছেন, “ وبه نأخذ ”। এমনিভাবে আহলে মদীনা ও কুফার আমলও অনুরূপ ছিলো। ইমাম মালেক রাহ. কে দ্বিতীয় জানাযা সম্বলিত হাদীস সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,
قَدْ جَاءَ هَذَا الْحَدِيْثُ، وَلَيْسَ عَلَيْهِ الْعَمَلُ.
-আলমুদাওয়ানা-সুহনূন ১/২৫৭।
এ ছাড়া যে হাদীসে দ্বিতীয়বার জানাযা পড়ার কথা উল্লেখ হয়েছে তা ওয়ালীর সাথে সম্পৃক্ত; ব্যাপকতা উদ্দেশ্য নয়।
নবীজী ﷺ জানাযার নামায মাঠে পড়তেন।
وَخَرَجَ بِهِمْ إِلَى الْمُصَلَّى، فَصَفَّ بِهِمْ، وَكَبَّرَ عَلَيْهِ أَرْبَعَ تَكْبِيرَاتٍ.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিয়ে ঈদগাহে গেলেন। তাদেরকে কাতারবদ্ধ করলেন এবং জানাযায় চার তাকবীর বললেন।” -সহীহ বুখারী (১২৪৫), মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদকৃত বর্ণনা (৩১৬), সহীহ মুসলিম (৯৫১)।
إِنَّ اليَهُودَ جَاءُوا إِلَى النَّبِيِّ ‘ بِرَجُلٍ مِنْهُمْ وَامْرَأَةٍ زَنَيَا فَأَمَرَ بِهِمَا، فَرُجِمَا قَرِيبًا مِنْ مَوْضِعِ الجَنَائِزِ عِنْدَ المَسْجِدِ.
“ইয়াহুদীরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক ইহুদী পুরুষ ও মহিলাকে নিয়ে এলো, যারা যিনা করেছিলো। তিনি তাদের সম্পর্কে ফয়সালা দিলেন। তখন তাদেরকে মসজিদের জানাযার নামায পড়ার কাছাকাছি জায়গায় পাথর মারা হলো।” -সহীহ বুখারী (১৩২৯), মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদকৃত বর্ণনা (৬৯৩), সহীহ মুসলিম (১৬৯৯)।
মসজিদে পড়তেন না এবং মসজিদে না পড়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
مَنْ صَلَّى عَلَى جَنَازَةٍ فِي الْمَسْجِدِ، فَلَيْسَ لَهُ شَيْءٌ
“যে মসজিদে জানাযার নামায পড়বে তার কোনো সাওয়াব হবে না।” -(হাসান) সুনানে ইবনে মাজাহ (১৫১৭), মুসনাদে আহমাদ (৯৭৩০), মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (১২০৯৭), মুসনাদে আবি দাউদ-তায়ালিসী (২৪২৯), শরহু মাআনিল আছার ১/৩১৭, হাদীসটির অধিকাংশ বর্ণনা এরূপই। একটি বর্ণনায় لا شيء عليه উল্লেখ হয়েছে; যা শায। আর সালেহ বিন নাবহান এ সনদে ইখতেলাতমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য রাবী। দ্র. আল-কামিল ৫/৮৫, আলকাশিফ ৩/১৬, যাদুল মাআদ ১/৪৮২।
সাহাবা কেরাম এ হাদীস মোতাবেক আমল করতেন। সালেহ ইবনে নাবহান রাহ. নিজের দেখা ঘটনা উল্লেখ করে বলেন,
أَدْرَكْتُ رِجَالًا مِمَّنْ أَدْرَكُوا النَّبِيَّ ‘ وَأَبَا بَكْرٍ، إِذَا جَاءُوْا فَلَمْ يَجِدُوا إِلَّا أَنْ يُصَلُّوْا فِي الْمَسْجِدِ رَجَعُوا فَلَمْ يُصَلُّوْا
-মুসনাদে আবু দাউদ-তায়ালিসী (২৪২৯), মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (১২০৯৭)।
নবীজী ﷺ জানাযায় কমপক্ষে তিন কাতার হওয়া পছন্দ করতেন।
قَالَ رَسُولَ اللَّهِ ‘: مَنْ صَلَّى عَلَيْهِ ثَلاَثَةُ صُفُوفٍ فَقَدْ أوْجَب.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিন কাতার মানুষ যার জানাযা পড়লো, তার জন্যে (জান্নাত) অনিবার্য হয়ে গেলো।” -(হাসান) সুনানে তিরমিযী (১০২৯), সুনানে আবু দাউদ (৩১৬৬), মুসনাদুর রুয়ানী (১৫৩৭)।
তিনি কাতারে মুসল্লী সংখ্যা বেশি হওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন।
مَا مِنْ مَيِّتٍ يُصَلِّي عَلَيْهِ أُمَّةٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ يَبْلُغُونَ مِائَةً كُلُّهُمْ يَشْفَعُونَ لَهُ إِلاَّ شُفِّعُوا فِيهِ.
“যে কোনো মাইয়েত, যার জানাযা মুসলমানদের একটি দল পড়বে যারা সংখ্যায় একশজন হবে, (এবং) তারা সকলে তার জন্যে সুপারিশ করবে তাহলে তাদের সুপারিশ কবুল করা হবে।” -সহীহ মুসলিম (৯৪৭), সুনানে ইবনে মাজাহ (১৪৯৮), সুনানে কুবরা নাসাঈ (১৯৮৬)।
খাটিয়া সামনে রেখে মৃত ব্যক্তির বুক বরাবর একটু পিছিয়ে দাঁড়াতেন।
عَنْ سَمُرَةَ قَالَ: صَلَّيْتُ وَرَاءَ النَّبِيِّ عَلَى امْرَأَةٍ مَاتَتْ فِي نِفَاسِهَا، فَقَامَ عَلَيْهَا وَسْطَهَا.
“সামুরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে এক মহিলার জানাযা পড়েছি, যে নেফাসে মারা গিয়েছে। তখন নবীজী তার খাটিয়ার মাঝামাঝি দাঁড়িয়েছেন।” -সহীহ বুখারী (১৩৩২), সহীহ মুসলিম (৯৬৪), ফাতহুল বারী-ইবনে হাজার ৩/২৪৮।
‘ওয়াসতুন’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর মাঝে বুকও অন্তর্ভুক্ত। দ্র. আলমাবসূত ৩২/১০৫। পুরুষের ক্ষেত্রে মাথা বরাবর দাঁড়ানোর কথাও বর্ণিত হয়েছে।
عَنْ أَنَسٍ ، أَنَّهُ أُتِيَ بِجِنَازَةِ رَجُلٍ فَقَامَ عِنْدَ رَأْسِ السَّرِيرِ وَجِيءَ بِجِنَازَةِ امْرَأَةٍ فَقَامَ أَسْفَلَ مِنْ ذَلِكَ عِنْدَ السَّرِيرِ، فَقَالَ الْعَلاَءُ بْنُ زِيَادٍ: هَكَذَا رَأَيْتَ رَسُولَ اللهِ ‘ يَصْنَعُ؟ قَالَ: نَعَمْ.
“আনাস রা. এর নিকট এক পুরুষের জানাযা নিয়ে আসা হলো, তিনি খাটিয়ার মাথার দিকে দাঁড়ালেন। পরবর্তীতে এক মহিলার জানাযা নিয়ে আসা হলো, তিনি আগের তুলনায় একটু নীচের দিকে খাটিয়ার কাছে দাঁড়ালেন। তখন ‘আলা বিন যিয়াদ আনাস রা.কে বললেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমনটি করতে দেখেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ।” -(সহীহ) মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা (১১৬৬৪), মুসনাদে আহমাদ (১২১৮০), সুনানে বায়হাকী ৪/৩৩।
قَال الإمامُ العَيْنِيُّ ؒ:وَالْإِجْمَاعُ قَائِمٌ عَلى أَنَّه لَا يَقُوْمُ مُلَاصِقًا لِلْجَنَازَةِ، وَأَنَّه لَا بُدَّ مِنْ فُرْجَةٍ بَينَهُمَا.
-উমদাতুল কারী ৮/১৯৭।
রুকূ ও সেজদা ব্যতীত চার তাকবীরে জানাযা পড়তেন।
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ‘ نَعَى النَّجَاشِيَّ فِي الْيَوْمِ الَّذِي مَاتَ فِيهِ وَخَرَجَ إِلَى الْمُصَلَّى فَصَفَّ بِهِمْ وَكَبَّرَ أَرْبَعًا.
“যেদিন নাজাশী মারা গেলেন সেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মৃত্যুর সংবাদ জানালেন এবং ঈদগাহের উদ্দেশে বের হলেন। এরপর তাদেরকে কাতারে দাঁড় করালেন এবং চারটি তাকবীর বললেন।” -সহীহ বুখারী (১২৪৫, ১৩১৮), সহীহ মুসলিম (৯৫১)। দ্র. মুসতাদরাকে হাকেম (১৪২৪, ১৪২৩), ফাতহুল বারী ৭/৩৮৮।
শুধু প্রথম তাকবীর বলার সময় হাত তুলতেন।
إنَّ رَسُولَ اللَّهِ ‘ كَبَّرَ عَلَى جَنَازَةٍ فَرفَعَ يَدَيْهِ فِيْ أوَّلِ تَكْبِيرَةٍ، وَوَضَعَ يَدَه الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى.
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামাযে তাকবীর বললেন। প্রথম তাকবীরে তিনি হাত তুললেন এবং ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন।” -(হাদীস হাসান) সুনানে তিরমিযী (১০৭৮), সুনানে দারা কুতনী (১৮৩১) ২/৪৩৮। দ্র. মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক (৬৩৬৩)।
জানাযার নামাযের রাকআতগুলোতে আল্লাহ তাআলার হাম্দ-ছানা, দরূদ ও দুআ পড়তেন।
إذَا صَلَّيْتُمْ عَلَى الْمَيِّتِ فَأَخْلِصُوا لَهُ الدُّعَاءَ.
“যখন তোমরা জানাযার নামায পড়বে তখন তার জন্যে একনিষ্ঠভাবে দোয়া করবে।” -(হাদীস সহীহ) আবু দাউদ (৩১৯৯), সহীহ ইবনে হিব্বান (৩০৭৬), সুনানে ইবনে মাজাহ (১৪৯৭), সুনানে বায়হাকী ৪/৪০
জানাযার মূল উদ্দেশ্য হলো, দুআ করা। আর দুআর সুন্নাত পদ্ধতি হলো, হামদ ও সালাতের পর দুআ করা।
إذا صَلَّى أحَدُكُم فليَبْدأ بتَمْجيدِ رَبِّه والثَّناءِ عليه، ثم يُصَلِّي على النبيِّ ‘، ثم يدعو بعدُ بما شاءَ.
“কেউ যখন নামায পড়ে (এবং তাশাহহুদে দুআ করে) সে যেন তাঁর প্রতিপালকের বড়ত্ব ও প্রশংসা দিয়ে শুরু করে। এরপর নবীর নামে দরূদ পড়ে। এরপর যা ইচ্ছা দোয়া করে।” -(সহীহ) সুনানে আবু দাউদ (১৪৮১), সুনানে তিরমিযী (৩৪৭৭), সহীহ ইবনে খুযায়মা (৭১০)।
জানাযার নামাযে কিরাআত পড়তেন না।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ ، قَالَ: لَيْسَ عَلَى الْجِنَازَةِ قِرَاءَةٌ
“হযরত ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জানাযার নামাযে কোনো কিরাআত নেই।” -(সহীহ) আলআউসাত ৫/৪৮৩, মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা (১১৫২২)।
إنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ كَانَ لاَ يَقْرَأُ فِي الصَّلاَةِ عَلَى الْجَنَازَةِ.
“আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা. জানাযার নামাযে কিরাআত পড়তেন না।” -(সহীহ) মুয়াত্তা মালেক (৭৭৭), মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা (১২৫২২)।
عن عَبْدِ اللهِ بن مسعود ¢: لَمْ يُوَقَّتْ لَنَا عَلَى الْجَنَازَةِ قَوْلٌ وَلَا قِرَاءَةٌ
-আলমুজামুল কাবীর-তাবারানী, (৯৬০৪, ৯৬০৬)।
ইমাম নূরুদ্দীন হায়ছামী রাহ. বলেন,
رواه أحمد، ورجاله رجال الصحيح
-মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৩/৩২।
নবীজী ﷺঅনেকেরই জানাযা পড়েছেন। এবং তাঁর নামাযের বিবরণও অনেক হাদীসে উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু কোথাও কিরাআত পড়ার আবশ্যকীয়তা সুস্পষ্টভাবে সহীহ সনদে উল্লেখ হয়নি। বরং একাধিক সাহাবা রা. থেকে কিরাআত না পড়ার কথা উল্লেখ হয়েছে।
কোনো কোনো সাহাবী থেকে সূরা পড়ার কথা বর্ণিত হলেও তা কিরাআত প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। কেননা তারা সূরা পড়েছেন দুআ হিসেবে; কিরাআত হিসেবে নয়।
ইমাম আবু জাফর তহাবী রাহ. বলেন,
يحْتَمل أَن يكون قراءتهم لَهَا على وَجه الدُّعَاء لَا التِّلَاوَة.
সাহাবাদের মধ্যে যাঁরা জানাযার নামাযে সূরা ফাতিহা পড়েছেন, তাঁরা দুআ হিসেবে পড়েছেন; কিরাআত হিসেবে নয়।” -মুখতাসারু ইখতিলাফিল উলামা ১/৩৯৩।
সাহাবা কেরাম নবীজী ﷺ থেকে নামায শিখেছেন। তাঁরা নামাযের যে বিবরণ উল্লেখ করেছেন তা এরূপ প্রথম তাকবীরের পর ছানা, দ্বিতীয় তাকবীরের পর দরূদ, তৃতীয় তাকবীরের পর দুআ করতেন ।
عَنْ الْمَقْبُرِيِّ، أَنَّهُ سَأَلَ أَبَا هُرَيْرَةَ كَيْفَ تُصَلِّي عَلَى الْجَنَازَةِ ؟ فَقَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: أَنَا لَعَمْرُ اللَّهِ أُخْبِرُكَ، أَتَّبِعُهَا مِنْ أَهْلِهَا، فَإِذَا وُضِعَتْ كَبَّرْتُ وَحَمِدْتُ اللَّهَ، وَصَلَّيْتُ عَلَى نَبِيِّهِ، ثُمَّ أَقُولُ: اللَّهُمَّ...
“মাকবুরীর সূত্রে, তিনি আবু হুরায়রা রা.কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা কীভাবে জানাযার নামায পড়ব? আবু হুরায়রা রা. বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি অবশ্যই তোমাকে জানাব। আমি ঘর থেকে জানাযার অনুসরণ করি। এরপর যখন (নামাযের জায়গায়) রাখা হয় তখন আমি তাকবীর বলি ও আল্লাহর হামদ পড়ি এবং নবীজীর নামে দুরূদ পড়ি। এরপর বলি, আল্লাহুম্মা...” -(সহীহ) মুয়াত্তা মালেক (৭৭৫), মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা (১১৪৯৫, ১১৪৯৪), মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক (৬৪২৫)।
হাদীসে একাধিক দুআ বর্ণিত হয়েছে। নবীজী ﷺ এ দুআটিও পড়তেন,
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الإِسْلاَمِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ
সুনানে তিরমিযী (১০২৫), মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক (৬৪১৯), সুনানে আবু দাউদ (৩২০১)।
ছোট বাচ্চার জানাযায় নবীজী ﷺ তার পিতা-মাতার জন্য দুআ করতেন।
وَالسَّقْطُ يُصَلّى عَلَيْهِ، وَيُدْعَى لِوَالِدَيْهِ بِالْمَغْفِرَةِ وَالرَّحْمَةِ
“(মৃত) ছোট শিশুর জানাযা পড়া হবে। তার মাতা-পিতার উপর মাগফিরাত ও রহমাতের দুআ করা হবে।” -(সহীহ) সুনানে আবু দাউদ (৩১৮০), মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালিসী (৭৩৭), মুসনাদে আহমাদ (১৮১৭৪)।
হাদীসে বিভিন্ন দুআ বর্ণিত হয়েছে। নিম্নের দুআটিও পড়া যাবে
اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا سَلَفًا وَاجْعَلْهُ لَنَا فَرْطًا وَاجْعَلْهُ لَنَا أَجْرًا
জামি’ সুফিয়ান ছাওরী দ্র. সুনানে বায়হাকী ৪/৯-১০, আততালখীছুল হাবীর ৩/১২১৩।
দুআ পড়ে দুই সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করতেন।
ثَلَاثُ خِلَالٍ كَانَ رَسُولُ اللهِ ‘ يَفْعَلُهُنَّ، تَرَكَهُنَّ النَّاسُ، إِحْدَاهُنَّ: التَّسْلِيمُ عَلَى الْجِنَازَةِ مِثْلَ التَّسْلِيمِ فِي الصَّلَاةِ
“আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.বলেন, তিনটি বিষয় এমন, যেগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করতেন, কিন্তু লোকেরা ছেড়ে দিয়েছে একটি হলো নামাযের সালামের মত জানাযার নামাযে সালাম ফেরানো।” -(হাসান) সুনানে বায়হাকী ৪/৪৩, আলমুজামুল কাবীর ১০/৮২ (১০০২২), মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আছার (৭৬৩৫)।