প্রবন্ধ
সাহাবায়ে কেরামের উত্তম আখলাক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
০
০
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বোত্তম আখলাক ও চরিত্রের অধিকারী। তাঁর পবিত্র জীবন ছিল উত্তম চরিত্রের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাকের প্রশংসা করে ইরশাদ করেছেন——
وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ
“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।”
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাযি:) ছিলেন তাঁর ঘরের সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, ইবাদত, আচরণ ও চরিত্রকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছেন। তাই যখন তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তখন তিনি এমন একটি উত্তর দিলেন, যা কয়েকটি শব্দের হলেও অর্থের দিক থেকে যেন একটি বিশাল সমুদ্র—
كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ
তাঁর চরিত্রই ছিল কুরআন।
—আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং: ৩০৮
অর্থাৎ, কুরআন শুধু তাঁর মুখে তিলাওয়াত হতো না; কুরআন তাঁর জীবনে চলমান ছিল। কুরআনের প্রতিটি শিক্ষা তাঁর চরিত্রে প্রতিফলিত হতো। কুরআন যেখানে ক্ষমার শিক্ষা দিয়েছে—তিনি ক্ষমা করেছেন; কুরআন যেখানে দয়ার শিক্ষা দিয়েছে—তিনি দয়া করেছেন; কুরআন যেখানে ধৈর্যের শিক্ষা দিয়েছে—তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন; কুরআন যেখানে নম্রতার শিক্ষা দিয়েছে—তিনি নম্র হয়েছেন।
তাঁর জীবনে কুরআনের শিক্ষা এমনভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল যে, তাঁকে দেখলে যেন কুরআনের শিক্ষা জীবন্ত অবস্থায় চোখের সামনে দেখা যেত।
এই মহান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যে যাঁরা জীবন কাটিয়েছেন, তাঁর প্রতিটি কথা শুনেছেন, তাঁর প্রতিটি আচরণ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাঁর কাছ থেকেই ঈমান, কুরআন, সুন্নাহ ও আখলাক শিখেছেন—তাঁরাই হলেন সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম। এই কারণেই সাহাবায়ে কেরামের জীবন ছিল নববী আখলাকের প্রতিচ্ছবি।
তাঁদের কেউ ছিলেন ক্ষমাশীলতার দৃষ্টান্ত, কেউ ছিলেন আত্মত্যাগের প্রতীক, কেউ ছিলেন দয়া ও কোমলতার মূর্ত প্রতীক, কেউ ছিলেন সত্যবাদিতা ও আমানতদারির অনন্য উদাহরণ। তাঁদের পারস্পরিক ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, বিনয়, ত্যাগ ও মানুষের প্রতি কল্যাণকামিতা—সবকিছুর মধ্যেই ফুটে উঠেছিল সেই মহান শিক্ষকের ছাপ, যাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।
সাহাবায়ে কেরামের আখলাকের অন্যতম উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও ঈমানি ভ্রাতৃত্ব।
আল্লাহ তাআলা মুহাজির ও আনসারদের প্রশংসা করে ইরশাদ করেছেন—
وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও নিজেরাও অভাবগ্রস্ত থাকে।
আনসার সাহাবায়ে কেরাম মক্কা থেকে আগত মুহাজির ভাইদের শুধু মুখে স্বাগত জানাননি; বরং তাঁদের নিজেদের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও জীবনযাপনের অংশীদার করে নিয়েছিলেন।
সাহাবায়ে কেরামের উত্তম চরিত্র ও মহৎ গুণাবলি ছিল অসংখ্য ও বিস্তৃত। তাঁদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়েই ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস, ধৈর্য, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, বিনয়, দয়া, ক্ষমাশীলতা ও পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার অপূর্ব দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তাঁদের এই মহান আখলাকের প্রতিটি দিক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধও যথেষ্ট হবে না। তাই প্রবন্ধের পরিধি ও পাঠকের সুবিধার কথা বিবেচনা করে সাহাবায়ে কেরামের অসংখ্য উত্তম গুণাবলি থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও অনুকরণীয় আখলাক সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো। আশা করা যায়, তাঁদের পবিত্র জীবন ও উত্তম চরিত্র থেকে আমরা নিজেদের জীবনকে সুন্দর করার অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারব।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সাহাবায়ে কেরামের সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন:
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
মুমিন তো কেবল তারাই, যারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে আন্তরিকভাবে মানে এবং যখন রাসূলের সাথে সমষ্টিগত কোন কাজে শরীক হয়, তখন তার অনুমতি ছাড়া কোথাও যায় না। (হে নবী!) যারা তোমার অনুমতি নেয়, তারাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সত্যিকারভাবে মানে। সুতরাং তারা যখন তাদের কোন কাজের জন্য তোমার কাছে অনুমতি চায়, তখন তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হয় অনুমতি দিও এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাতের দুআ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
(হে মানুষ!) তোমরা নিজেদের মধ্যে রাসূলের ডাককে তোমাদের পারস্পরিক ডাকের মত (মামুলি) মনে করো না; তোমাদের মধ্যে যারা একে অন্যের আড়াল নিয়ে চুপিসারে সরে পড়ে আল্লাহ তাদেরকে ভালো করে জানেন। সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের ভয় করা উচিত না জানি তাদের উপর কোন বিপদ আপতিত হয় অথবা যন্ত্রণাদায়ক কোন শাস্তি তাদেরকে আক্রান্ত করে।
১. হযরত মিসওয়ার ইবনে মাখরামাহ এবং মারওয়ান ইবনে হাকাম (রাযি:) হতে হুদায়বিয়ার সন্ধির হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
তারপর উরওয়া তার সঙ্গীদের কাছে ফিরে গেল এবং বলল, হে আমার কওম, আল্লাহর কসম! আমি অনেক রাজা বাদশাহর নিকটে প্রতিনিধিত্ব করেছি। কায়সার (রোম) কিসরা (পারস্য) ও নাজ্জাশী (আবিসিনিয়ার) সম্রাটের দরবারে দূত হিসেবে গিয়েছি; কিন্তু আমি আল্লাহর কসম করে বলতে পারি যে, কোন রাজা বাদশাহকেই তার অনুসরীদের ন্যায় এত সম্মান করতে দেখিনি, যেমন মুহাম্মাদের অনুসারীরা তাঁকে করে থাকে। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি থুথু ফেলেন, তখন তা কোন সাহাবীর হাতে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা তা তাদের গায়ে মুখে মেখে ফেলেন। তিনি কোন আদেশ দিলে তারা তা সঙ্গে সঙ্গে পালন করেন; তিনি ওযু করলে তাঁর ওযুর পানি নিয়ে সাহাবীগণের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়; তিনি কথা বললে, সাহাবীগণ নিশ্চুপ হয়ে শুনেন। এমনকি তাঁর সম্মানার্থে তারা তাঁর চেহারার দিকেও তাকান না।
একই ঘটনার বর্ণনায় আরও রয়েছে:
উরওয়াহ ইবনে মাসউদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বলছিলেন এবং কথা বলার সময় বারবার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাড়ি মোবারক স্পর্শ করছিলেন। তখন মুগীরাহ ইবনে শু'বাহ (রাযি:) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথার কাছে তরবারি হাতে এবং মাথায় শিরস্ত্রাণ পরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। উরওয়াহ যখনই হাত বাড়িয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাড়ি মোবারক স্পর্শ করতে যেতেন, মুগীরাহ ইবনে শু'বাহ (রাযি:) তরবারির খাপের নিচের অংশ দিয়ে তার হাতে আঘাত করতেন এবং বলতেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাড়ি থেকে তোমার হাত সরিয়ে নাও।
সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২৭৩১ - ২৭৩৩
২. হযরত আমর ইবনুল আস (রাযি:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমার অন্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপেক্ষা বেশী প্রিয় আর কেউ ছিল না। আমার চোখে তিনি অপেক্ষা মহান আর কেউ ছিল না। অপরির্সীম শ্রদ্ধার কারণে আমি তার প্রতি চোখ ভরে তাকাতেও পারতাম না। আজ যদি আমাকে তাঁর দেহ আকৃতির বর্ণনা করতে বলা হয়, তবে আমার পক্ষে তা সম্ভব হয়ে উঠবে না। কারণ চোখভরে আমি কখনোই তাঁর প্রতি তাকাতে পারি নি।
৩. হযরত আবু আইয়ুব (রাযি:) থেকে বর্ণিত যে, (হিজরতের সময়) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বাড়িতে অতিথি হলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থাকতেন নীচ তলায়, আর আবু আইয়ুব (রাযি:) থাকতেন উপর তলায়। এক রাত্রে আবু আইয়ুব (রাযি:) জাগ্রত হয়ে বললেন, আমরা তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাথার উপর চলাফেরা করি। তখন তাঁরা সেখান থেকে সরে গিয়ে এক কোণে রাত কাটালেন। এরপর (সকালে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তিনি বিষয়টি অবহিত করলে তিনি বললেনঃ নীচ তলায়ই বেশী সুবিধা। তখন তিনি বললেন, আপনি নীচে থাকবেন এমন ছাদে আমি উঠবো না।
এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপর তলায় এবং আবু আইয়্যুব (রাযি:) নীচ তলায় স্থান পরিবর্তন করলেন। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য খাবার তৈরী করতেন। যখন অবশিষ্ট খাবার ফিরিয়ে আনা হতো, তখন তিনি জিজ্ঞাসা করতেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন স্থানে তাঁর আঙ্গুল লাগিয়েছেন? এরপর তাঁর আঙ্গুলের স্থান থেকে বেছে বেছে খেতেন।
একদিন তিনি তাঁর জন্য খাবার তৈরী করলেন, যাতে ছিল রসুন। তাঁর কাছে ফিরিয়ে আনা হলে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আঙ্গুলের স্থান সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন। তাঁকে বলা হলো, তিনি এগুলো আহার করেননি। এতে তিনি ঘাবড়িয়ে গেলেন এবং তাঁর নিকট গেলেন। এরপর জিজ্ঞাসা করলেন ওটা কি হারাম? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ না। তবে আমি ওটা অপছন্দ করি। তিনি বললেন, তাহলে আপনি যা অপছন্দ করেন, আমিও তা অপছন্দ করি।
৪. হযরত আলী (রাযি:) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈঠকের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:
وَإِذَا تَكَلَّمَ أَطْرَقَ جُلَسَاؤُهُ، كَأَنَّمَا عَلَىٰ رُؤُوسِهِمُ الطَّيْرُ، فَإِذَا سَكَتَ تَكَلَّمُوا
তিনি যখন কথা বলতেন, তখন তাঁর সাহচর্যে বসা লোকেরা এমনভাবে মাথা নিচু করে নীরব থাকতেন, যেন তাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। আর তিনি যখন নীরব হতেন, তখন তাঁরা কথা বলতেন।
শামাঈলে তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৫১
৫. হযরত বারা ইবনে আযেব (রাযি:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমার অবস্থা এমন ছিল যে, পুরো একটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে যেত আর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোনো একটি বিষয়ে প্রশ্ন করতে চাইতাম; কিন্তু তাঁর প্রতি চরম গাম্ভীর্য ও শ্রদ্ধাবোধের কারণে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে ইতস্তত ও ভয়বোধ করতাম। আল-মাতালিবুল ‘আলিয়াহ ৩৫৯০
সাহাবায়ে কেরামের একে অপরের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। তাঁর সঙ্গে যারা আছে, তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং আপসের মধ্যে একে অন্যের প্রতি দয়ার্দ্র। তুমি তাদেরকে দেখবে (কখনও) রুকুতে, (কখনও) সিজদায়, আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি সন্ধানে রত। তাদের আলামত তাদের চেহারায় পরিস্ফুট, সিজদার ফলে। এই হল তাদের সেই গুণাবলী, যা তাওরাতে বর্ণিত আছে। আর ইনজিলে তাদের দৃষ্টান্ত এই, যেন এক শস্যক্ষেত্র, যা তার কুঁড়ি বের করল, তারপর তাকে শক্ত করল। তারপর তা পুষ্ট হল। তারপর তা নিজ কাণ্ডের উপর এভাবে সোজা দাঁড়িয়ে গেল যে, তা কৃষকদেরকে মুগ্ধ করে ফেলে। এটা এইজন্য যে, আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফেরদের অন্তর্দাহ সৃষ্টি করেন। যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদেরকে মাগফিরাত ও মহা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
১. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, গাছপালার মধ্যে এমন একটি গাছ আছে, যার পাতা ঝরে পড়ে না এবং তা হল মুমিনের দৃষ্টান্ত। তোমরা আমাকে বলতে পার, সেটা কোন গাছ? অতঃপর লোকজনের খেয়াল জঙ্গলের গাছ পালার প্রতি গেল। আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, আমার মনে হতে লাগল যে, তা হল খেজুর গাছ। কিন্তু আমি লজ্জাবোধ করলাম। সাহাবায়ে কিরাম (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনিই আমাদের তা বলে দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তা হল খেজুর গাছ। আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, তারপর আমি আমার পিতাকে আমার মনে যা এসেছিল তা বললাম। তিনি বললেন, তুমি যদি তখন তা বলে দিতে যে, উহা হল খেজুর গাছ, তবে অমুক অমুক জিনিস লাভ করার চাইতেও আমার কাছে অধিক প্রিয় হত। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৮১১
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি:)-কে কথা বলা থেকে যা বিরত রেখেছিল, তা হলো আল্লাহর রাসুলের সাহাবিদের প্রতি তাঁর সম্মান ও শ্রদ্ধা। কারণ, তিনি যখন দেখলেন যে তাঁরা নীরব আছেন, তখন তিনিও নীরব রইলেন এবং তাঁদের সামনে কথা বললেন না।
২. হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রাযিঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে যুবক ছিলাম। আমি তাঁর নিকট থেকে অনেক কিছু মুখস্ত করে নিতাম। এখানে আমার চেয়ে অধিক বয়সী সাহাবী থাকার কারণে আমি কথা বলা থেকে বিরত থাকি।
৩. হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ বাজালী (রাযিঃ) এর সঙ্গে এক সফরে বের হলাম। (এই সফরে) তিনি আমার খিদমত আঞ্জাম দিতেন। তখন আমি তাকে বললাম, এরূপ করবে না। তিনি বললেন, আমি আনসারগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে এরূপ কিছু খিদমত করতে দেখেছি। যাতে আমি কসম করেছি যে, যখন আমি আনসারদের কারো সাথী হব তখন তাঁর খিদমত করব। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৫১৩
৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি:) থেকে বর্ণিত। তিনি যায়েদ ইবনে সাবিত (রাযি:)-এর সওয়ারির লাগাম/রেকাব ধরে হাঁটছিলেন। তখন যায়েদ (রাযি:) তাঁকে বললেন: হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই! আপনি সরে দাঁড়ান (আমাকে একা যেতে দিন)। উত্তরে ইবনে আব্বাস (রাযি.) বললেন: আমরা আমাদের বড় ও আলেমদের সাথে এমনই আচরণ করে থাকি।
বায়হাকী, হাদীস নং: ১২৫৫৮
৫. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইন্তিকাল করলেন, আনসার সম্পদায় বললেন, আমাদের মধ্য থেকে একজন আমীর হবে আর তোমাদের মধ্য থেকে একজন আমীর হবে। তাঁদের নিকট উমর (রাযিঃ) এসে বললেনঃ তোমরা কি জানো না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর (রাযিঃ)-কে আদেশ করেছিলেন, লোকের ইমাম হয়ে নামায আদায় করতে? অতএব তোমাদের মধ্যে কার মন খুশি হবে আবু বকরের অগ্রগামী হতে? তাঁরা বললেন, নাউযু বিল্লাহ! আমরা আবু বকরের অগ্রবর্তী হতে চাই না। সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং: ৭৭৭
৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাত পেলেন, তখন আমি আনসারদের একজন লোককে বললাম: আসুন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করি ও জ্ঞান জিজ্ঞেস করি; কারণ তাঁরা আজ সংখ্যায় অনেক। তখন লোকটি বলল: হে ইবনে আব্বাস! আপনার জন্য বিস্ময়! আপনি কি মনে করেন যে মানুষ আপনার মুখাপেক্ষী হবে, অথচ মানুষের মাঝে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জ্যেষ্ঠ সাহাবিগণ বিদ্যমান রয়েছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি:) বলেন: আমি ওই লোকটিকে ছেড়ে দিয়ে নিজে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিদের কাছে (জ্ঞানার্জনের জন্য) যেতে লাগলাম। কোনো এক ব্যক্তি হাদিস জানেন—এমন খবর আমার কাছে পৌঁছালে আমি তাঁর দরজায় গিয়ে উপস্থিত হতাম, তখন তিনি দুপুরে কায়লুলা (বিশ্রাম) করতেন। আমি আমার চাদরটি মাথার নিচে বালিশ বানিয়ে তাঁর দরজার বাইরে শুয়ে পড়তাম, আর বাতাস আমার ওপর ধুলাবালি উড়িয়ে দিত। এরপর তিনি বের হয়ে আমাকে দেখে বলতেন: হে আল্লাহর রাসুলের চাচাতো ভাই! আপনি কেন এসেছেন? আমাকে খবর পাঠালেন না কেন, আমিই তো আপনার কাছে আসতাম। আমি বলতাম: না, আপনার কাছে আসার বেশি অধিকার আমারই। তারপর আমি তাঁকে হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম।
পরবর্তীতে সেই আনসারি লোকটি বেঁচে ছিলেন এবং আমাকে এমন অবস্থায় দেখলেন যে মানুষ জ্ঞান অর্জনের জন্য আমার চারপাশে সমবেত হচ্ছে। তখন তিনি বলতেন: এই যুবকটি আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ছিল। সুনানে দারেমী, হাদীস নং: ৫৭০
সাহাবায়ে কেরামের 'ইহসান' (উত্তম আচরণ )
১. আবু বকর সিদ্দিক (রাযি:)-এর ইহসান
হযরত আবু বকর (রাযি:)-এর ইহসানের অন্যতম একটি দৃশ্যমান দিক ছিল তাঁর আত্মীয়স্বজনদের পেছনে অর্থ ব্যয় করা, যাদের মধ্যে মিসতাহ্ (রাযি:)-ও একজন ছিলেন। কিন্তু মিসতাহ্ যখন হযরত আয়েশা (রাযি:)-এর বিরুদ্ধে অপবাদে (ইফকের ঘটনায়) লিপ্ত হলেন, তখন হযরত আবু বকর (রাযি:) তাঁর এই অনুদান বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশ মেনে তিনি তাঁকে ক্ষমা করে দেন এবং পূর্বে যে অনুদান বা খোরপোষ তাঁকে দিতেন, তা পুনরায় চালু করেন।
হযরত আয়েশা (রাযি:) থেকে বর্ণিত 'ইফকের ঘটনা' সম্পর্কিত হাদিসে তিনি বলেন: আবু বকর সিদ্দীক (রাযিঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! নিকটাত্মীয়তার কারণে মিসতাহ্ জন্য তিনি যা খরচ করতেন, আয়েশা (রাযিঃ) সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলার পর মিসতার জন্য আমি আর কখনও খরচ করবো না।
তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করলেন وَلاَ يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أن يؤتوا إِلَى قَوْلِهِ غَفُورٌ رَحِيمٌ তোমাদের মধ্যে যারা নিআমতপ্রাপ্ত ও স্বচ্ছল, তারা যেন দান না করার কসম না করে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান। তখন আবু বকর (রাযিঃ) বললেন, আল্লাহর কসম। আমি অবশ্যই চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। এরপর তিনি মিসতাহ্ কে যা দিতেন, তা পুনরায় দিতে লাগলেন। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২৬৬১
২. মা-এর প্রতি আবু হুরায়রা (রা.)-এর 'ইহসান'
হযরত আবু হুরায়রা (রাযিঃ) বর্ণনা করেছেন, আমি আমার মাকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাতাম, তখন তিনি মুশরিক ছিলেন। একদিন আমি তাকে ইসলাম কবুলের জন্য আহবান জানালাম। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে আমাকে এমন এক কথা শোনালেন যা আমার কাছে খুবই অপ্রিয় ছিল। আমি কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলাম। আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি আমার মাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে আসছিলাম। আর তিনি অস্বীকার করে আসছিলেন। এরপর আমি তাকে আজ দাওয়াত দেওয়াতে তিনি আমাকে আপনার সম্পর্কে এমন কথা শোনালেন, যা আমি পছন্দ করি না। সুতরাং আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি আবু হুরায়রার মাকে হিদায়াত দান করেন।
তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ হে আল্লাহ! আবু হুরায়রার মাকে হিদায়াত দান কর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআর কারণে আমি খুশি মনেবেরিয়ে এলাম। যখন আমি (ঘরের) দরজায় পৌঁছলাম তখন তা বন্ধ দেখতে পেলাম। আমার মা আমার পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি বললেন, আবু হুরায়রা! একটু দাড়াও। তখন আমি পানির কলকল শব্দ শুনছিলাম। তিনি বলেন, এরপর তিনি গোসল করলেন এবং গায়ে চাঁদর পরলেন। আর তড়িঘড়ি করে দোপাট্টা ও ওড়না জড়িয়ে নিলেন, এরপর ঘরের দরজা খুলে দিলেন।
এরপর বললেন, “হে আবু হুরায়রা! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতিত কোন ইলাহ নেই, আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসুল। তিনি বলেন, তখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে রওয়ানা হলাম। এরপর তাঁর কাছে গেলাম এবং আমি তখন আনন্দে কাঁদছিলাম। তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ আপনার দুআ কবুল করেছেন এবং আবু হুরায়রার মাকে হিদায়াত দান করেছেন। তখন তিনি আল্লাহর শুকর আদায় করলেন ও তাঁর প্রশংসা করলেন এবং ভাল ভাল কথা বললেন।
তিনি বলেন, এরপর আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন, তিনি যেন আমাকে এবং আমার মাকে মু’মিন বান্দাদের কাছে প্রিয় করেন এবং তাদের ভালবাসা আমাদের অন্তরে বদ্ধমূল করে দেন। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ হে আল্লাহ! তোমার এই বান্দা (আবু হুরায়রা) কে এবং তাঁর মাকে মুমিন বান্দাদের কাছে প্রিয়ভাজন করে দাও এবং তাদের কাছেও মুমিন বান্দাদের প্রিয় করে দাও। এরপর এমন কোন মুমিন বান্দা সৃষ্টি হয়নি, যে আমার কথা শুনেছে অথবা আমাকে দেখেছে অথচ আমাকে ভালোবাসেনি। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৪৯১
৩. বাবার বন্ধুর প্রতি ইবনে উমর (রা.)-এর ইহসান
হযরত ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, যখন তিনি মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হতেন তখন তাঁর সঙ্গে একটি গাধা থাকত। উটের সওয়ারীতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে ক্ষণিক স্বস্তি লাভের জন্য তাতে আরোহণ করতেন। আর তাঁর সাথে একটি পাগড়ী থাকত, যা তিনি মাথায় বেঁধে নিতেন। একদা তিনি উক্ত গাধায় আরোহণ করে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর পাশ দিয়ে একজন বেদুঈন অতিক্রম করছিল। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি অমুকের পুত্র অমুক নও? সে বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি তাকে গাধাটি দিয়ে দিলেন এবং বললেন, এতে আরোহণ কর। তিনি তাকে পাগড়ীটিও দান করলেন এবং বললেন, এটি দ্বারা তোমার মাথা বেঁধে নাও।
তখন তাঁর সঙ্গীদের কেউ কেউ তাকে বললেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি এই বেদুইনকে গাধাটি দিয়ে দিলেন, যার উপর সওয়ার হয়ে আপনি স্বস্তি লাভ করতেন এবং পাগড়ীটিও দান করলেন, যার দ্বারা আপনার মাথা বাঁধতেন। তখন তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার হল কোন ব্যক্তির পিতার ইন্তিকালের পর তার বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সদ্ভাব রাখা। আর এই বেদুঈনের পিতা ছিলেন উমর (রাযিঃ) এর অন্তরঙ্গ বন্ধু। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৫৫২
পিতার মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধুর প্রতি উপহার দিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি:) তাঁর পিতা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সাথে উত্তম বরকতময় আচরণ (বিরর/সন্তান হিসেবে কর্তব্য) পালন করেছেন।
পিতার ইন্তেকালের পর পিতার ভালোবাসার পাত্র ও বন্ধুদের প্রতি ইহসান করা সন্তানের পক্ষ থেকে অন্যতম সেরা পর্যায়ের পুণ্যময় আচরণ। আর পিতার মৃত্যুর পর তাঁর স্বজন ও বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার এই অসিয়ত বা নির্দেশকে এজন্যই বড়মাপের সদাচরণ বলা হয়েছে, কারণ এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ অর্জিত হয় এবং ভালোবাসার বন্ধন অটুট থাকে। শরহে নববী আলা মুসলিম ১৬/১১০
সাহাবায়ে কেরামের 'ইসার' (আত্মত্যাগ ও পরোপকার)
সাহাবিগণ (ইসার) আত্মত্যাগ ও পরোপকারের এমন চমৎকার ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যে, তাঁদের আত্মত্যাগের ঘটনাবলি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তা কল্পনা বলে মনে হতে পারে; যদি না তা আমাদের কাছে বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী এবং বিশুদ্ধ ও স্পষ্ট সনদের মাধ্যমে পৌঁছাত।
নিচে তাঁদের সেই আত্মত্যাগের কিছু মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তুলে ধরা হলো:
১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মেহমান
হযরত আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, জনৈক (ক্ষুধার্ত) ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে এল। তিনি খাদ্য দ্রব্য কিছু আছে কিনা তা জানার জন্য তাঁর সহধর্মিণীদের কাছে লোক পাঠালেন। তাঁরা জানালেন, আমাদের নিকট পানি ব্যতীত অন্য কিছুই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কে আছ যে এই (ক্ষুধার্ত) ব্যক্তিকে মেহমান হিসাবে নিয়ে নিজের সাথে খাওয়াতে পার? তখন জনৈক আনসারী সাহাবী (আবু তালহা (রাযিঃ) বললেন আমি পারব। এ বলে তিনি মেহমানকে নিয়ে বাড়িতে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেহমানকে সন্মান কর। স্ত্রী বললেন, বাচ্চাঁদের আহার্য ব্যতীত আমাদের ঘরে অন্য কিছুই নেই। আনসারী বললেন, তুমি আহার প্রস্তুত কর এবং বাতি জ্বালাও এবং বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দাও।
(স্বামীর কথা অনুযায়ী) সে বাতি জ্বালাল, বাচ্চাদেরকে ঘুম পাড়াল এবং সামান্য খাবার যা তৈরী ছিল তা উপস্থিত করল। (তারপর মেহমান সহ তারা খেতে বসলেন) বাতি ঠিক করার বাহানা করে স্ত্রী উঠে গিয়ে বাতিটি নিভিয়ে দিলেন। তারপর তারা স্বামী-স্ত্রী উভয়ই অন্ধকারের মধ্যে আহার করার মত শব্দ করতে লাগলেন এবং মেহমানকে বুঝাতে লাগলেন যে, তারাও সঙ্গে খাচ্ছেন। তাঁরা উভয়েই (বাচ্চারা সহ) সারা রাত অভুক্ত অবস্থায় কাটালেন। ভোরে যখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গেলেন, তখন তিনি বললেন, আল্লাহ্ তোমাদের গতরাতের কার্যকলাপ দেখে হেসে দিয়েছেন অথবা বলেছেন খুশী হয়েছেন এবং এ আয়াত নাযিল করেছেন। (আনসারদের অন্যতম গুণ হল এই): তারা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের উপর অন্যদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। আর যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩৭৯৮
২. আনসারদের অতুলনীয় ইসার
মুহাজিরগণ মদিনায় এমন এক অবস্থায় আগমন করেছিলেন যে, তাঁদের কাছে পার্থিব কোনো ধন-সম্পদই ছিল না। তাঁরা নিজেদের যাবতীয় সম্পত্তি ও যা কিছু তাঁদের ছিল—সব পেছনে ফেলে রেখে এসেছিলেন। তাঁরা কেবল মহান আল্লাহর দরবারে যা রয়েছে তার আশায়, তাঁর রহমতের প্রত্যাশায় এবং তাঁর আজাবের ভয়ে ছুটে এসেছিলেন।
অন্যদিকে, মদিনার স্থায়ী বাসিন্দা আনসারগণ তাঁদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদায় ভূষিত করেন। এই পার্থিব জীবনের সামান্য কিছু নিয়েও তাঁরা মুহাজিরদের প্রতি কার্পণ্য করেননি। আনসারদের এই মহানুভবতা ও আত্মত্যাগের দৃশ্য এমন এক স্তরের, যা বর্ণনা করতে ভাষা অক্ষম এবং তা ব্যক্ত করতে অভিব্যক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
হযরত আনাস (রাযি:) বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনা আগমন করলেন, মুহাজিরগণ তাঁর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যাঁদের মধ্যেে এসে পৌঁছেছি তাদের অপেক্ষা প্রচুর জিনিসের দাতা এবং অল্প জিনিস দ্বারা হলেও সহানুভূতিশীল কোন সম্প্রদায় আমরা আর দেখি নাই। তাঁরা আমাদের কষ্টের ভার নিয়েছেন এবং কষ্টে অর্জিত জিনিসে আমাদেরকে শরীক করেছেন, যাতে আমরা ভয় করছি যে, তারাই সমস্ত সওয়াব নিয়ে যাবেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তা হবে না যাবৎ তোমরা তাদের জন্য দুআ কর ও তাদের প্রশংসা কর। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: 2487
হযরত আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাযিঃ) যখন মদীনায় আগমন করেন, তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ও সা‘দ ইবনে রাবী আনসারী (রাযিঃ)- এর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দিলেন। সা‘দ (রাযিঃ) তাঁর সম্পত্তি ভাগ করে অর্ধেক সম্পত্তি এবং দু‘জন স্ত্রীর যে কোন একজন নিয়ে যাওয়ার জন্য আব্দুর রহমানকে অনুরোধ করলেন। তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহ আপনার পরিবারবর্গ ও ধন-সম্পদে বরকত দান করুন। আমাকে স্থানীয় বাজারের রাস্তাটি দেখিয়ে দিন……..। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩৯৩৭
৩. সম্পদের ব্যপারে আবু বকর (রাযি:)-এর অনন্য ইসার
হযরত যায়দ ইবনে আসলাম (রাহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে দান করার নির্দেশ দেন। ঘটনাক্রমে সেদিন আমার কাছে মাল ছিল। আমি (মনে মনে) বলিঃ আজ আমি আবু বাকর (রাযিঃ) এর চাইতে (দানে) অগ্রগামী হব, যদিও কোন দিন আমি দানে তার অগ্রগামী হতে পারিনি। তাই আমি আমার অর্ধেক সম্পদ নিয়ে আসি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করেনঃ তুমি তোমার পরিবার-পরিজনদের জন্য কি রেখে এসেছ? আমি বলি, এর সম-পরিমাণ সম্পদ।
হযরত উমর (রাযিঃ) বলেনঃ আর আবু বকর (রাযিঃ) আনলেন তার সমস্ত সম্পদ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করেনঃ তুমি তোমার পরিবার-পরিজনদের জন্য কি রেখে এসেছ? তিনি বলেন, আমি তাদের জন্য আল্লাহ এবং তার রাসূলকে রেখে এসেছি। উমর (রাযিঃ) বলেনঃ তখন আমি বলিঃ আমি ভবিষ্যতে কোন দিন কোন ব্যাপারে অধিক ফযীলতের অধিকারী হওয়ার জন্য আপনার সাথে প্রতিযোগিতা করব না। সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ১৬৭৮
৪. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি:)-এর ইসার কিছু চমৎকার উদাহরণ
আমিরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি:) যখন আঘাতপ্রাপ্ত (ছুরিবিদ্ধ) হলেন, তখন তিনি তাঁর ছেলে আবদুল্লাহকে বললেন: হে আবদুল্লাহ ইবনে উমর! তুমি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি:)-এর কাছে যাও এবং বলো, উমর ইবনুল খাত্তাব আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। তারপর তাঁর কাছে অনুমতি চাও—আমি যেন আমার দুই সঙ্গীর (রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ও আবু বকর রাযি:) পাশেই দাফন হতে পারি।
আবদুল্লাহ (রাযি:) তাঁর কাছে গেলে আয়েশা (রাযি:) বললেন: আমি এই স্থানটি নিজের (দাফনের) জন্য চেয়েছিলাম, তবে আজ আমি আমার নিজের চেয়ে উমরকে প্রাধান্য দিচ্ছি (স্থানটি তাঁকে ছেড়ে দিচ্ছি)!
আবদুল্লাহ যখন ফিরে এলেন, তখন উমর (রাযি:) জিজ্ঞাসা করলেন: কী খবর তোমার? তিনি বললেন: হে আমিরুল মুমিনীন! তিনি আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন।
হযরত উমর (রাযি:) বললেন: এই শায়িত হওয়ার স্থানটির চেয়ে আমার কাছে আর কোনো কিছুই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না! তবে শোনো, আমি যখন ইন্তেকাল করব, তখন আমাকে বহন করে নিয়ে যাবে এবং আবার সালাম দিয়ে বলবে, উমর ইবনুল খাত্তাব অনুমতি চাচ্ছেন। তিনি যদি অনুমতি দেন, তবেই আমাকে সেখানে দাফন করবে; অন্যথায় আমাকে সাধারণ মুসলিমদের গোরস্তানে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে দাফন করবে।
উম্মু জুররাহ্ (রহি.) যিনি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি:)-এর কাছে আসা-যাওয়া করতেন, তার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ইবনে জুবায়র (রাযি:) আয়েশা (রাযি:)-এর কাছে দুটি বস্তায় ভরে প্রচুর ধন-সম্পদ পাঠালেন। আমার ধারণা, তা ছিল এক লাখ আশি হাজার (দিরহাম)। তিনি একটি বড় পাত্র আনালেন—অথচ সেদিন তিনি রোজা ছিলেন—এবং বসে মানুষের মাঝে তা বণ্টন করতে লাগলেন। সন্ধ্যা নামতেই সেই অর্থ থেকে একটি দিরহামও আর তাঁর কাছে অবশিষ্ট রইল না!
সন্ধ্যা হলে তিনি বললেন: হে দাসী! আমার ইফতার নিয়ে এসো। দাসী তাঁর সামনে রুটি ও তেল নিয়ে এল। তখন উম্মু জুররাহ্ তাঁকে বললেন: আজকে আপনি যা কিছু বণ্টন করলেন, সেখান থেকে কি একটি দিরহাম দিয়েও আমাদের জন্য একটু গোশত কিনে রাখতে পারতেন না, যা দিয়ে আমরা ইফতার করতাম?! আয়েশা (রা.) তাকে বললেন: আমাকে ভর্ৎসনা কোরো না, তুমি যদি আমাকে তখন মনে করিয়ে দিতে, তবে হয়তো আমি তা-ই করতাম। হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া ২/৪৭
উরওয়াহ্ (রহি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আয়েশা (রাযি:)-কে দেখেছি, তিনি (এক এক করে) সত্তুর হাজার (দিরহাম) দান করে দিচ্ছেন, অথচ তিনি নিজের ছেঁড়া জামায় তালি লাগাচ্ছিলেন! হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া ২/৪৭
৫. ইবনে উমর (রাযি:)-এর ইসারের অনন্য দৃষ্টান্ত:
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেই মৌসুমে নতুন আঙুর ওঠার পর তাঁর আঙুর খাওয়ার খুব ইচ্ছা হলো। তখন তাঁর স্ত্রী সাফিয়্যাহ (রাযি:) এক দিরহাম পাঠালেন এবং এক দিরহাম দিয়ে এক থোকা আঙুর কিনে আনা হলো। কিন্তু (আঙুর নিয়ে আসার সময়) বার্তা বাহকের পিছু পিছু একজন ভিক্ষুক চলে এল। বার্তা বাহক যখন দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল, তখন ভিক্ষুকটি বাইরে থেকে ডেকে বলল: আমি এক অভাবী ভিক্ষুক! ইবনে উমর (রাযি:) তা শুনে বললেন: আঙুর থোকাটি ওকে দিয়ে দাও। তাই সেটি তাকে দিয়ে দেওয়া হলো। এরপর সাফিয়্যাহ (রাযি:) আবারও এক দিরহাম পাঠিয়ে আরেকটি আঙুরের থোকা কিনে আনালেন। আবারও সেই বার্তা বাহকের পিছু পিছু ভিক্ষুকটি চলে এল। বার্তা বাহক দরজায় পৌঁছে ভেতরে ঢুকতেই ভিক্ষুকটি ডেকে বলল: আমি এক অভাবী ভিক্ষুক!
ইবনে উমর (রাযি:) আবারও বললেন: আঙুর থোকাটি ওকে দিয়ে দাও। ফলে সেটিও তাকে দিয়ে দেওয়া হলো। এবার সাফিয়্যাহ (রাযি:) লোক মারফত সেই ভিক্ষুককে বলে পাঠালেন: আল্লাহর কসম! তুমি যদি আবার ফিরে আসো, তবে আমার কাছ থেকে কখনোই কোনো ভালো কিছু পাবে না!
এরপর তিনি আবার এক দিরহাম পাঠিয়ে (তৃতীয়বারের মতো) আঙুর কিনে আনালেন…
তাবারনী ১২/২৬৬
৬. নিজের বোনদের প্রতি জাবির (রাযি:)-এর ইসার:
হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) মৃত্যু (শাহাদাত) বরণ করলেন এবং নয়টি (কিংবা তিনি বলেছেন, সাতটি) কন্যা রেখে গেলেন। পরে আমি এক বিধবা মহিলাকে বিয়ে করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, হে জাবির! তুমি বিয়ে করেছ? জাবির (রাযিঃ) বলেন, আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি বললেন, তা কুমারী নাকি বিধবা? জাবির (রাযিঃ) বলেন, আমি বললামঃ বিধবা ইয়া রাসুলাল্লাহ! তিনি বললেন, তবে তা কোন তরূনী (কুমারী) কেন নয় যে, তুমি তাঁর সঙ্গে আনন্দ-স্ফূর্তি করতে সেও তোমার সঙ্গে আনন্দ-স্ফূর্তি করত কিংবা তিনি বলেছিলেন, তুমি তার সঙ্গে হাস্য-রস করতে সেও তোমার সঙ্গে হাস্য-রস করত।
জাবির (রাযিঃ) বলেন, আমি বললাম, (আমার পিতা) আব্দুল্লাহ নয়টি (কিংবা সাতটি) মেয়ে রেখে মৃত্যু বরণ করেছেন এবং আমি তাদের মাঝে তাদের মত একজনকে নিয়ে আসা অপছন্দ করলাম। তাই আমি এমন একটি মহিলাকে নিয়ে আসা পছন্দ করলাম যে তাদের দেখাশুনা করবে এবং তাদের শুধরে দিবে ও গড়ে তুলবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন। অথবা তিনি আমাকে (এ ধরনের) কোন উত্তম কথা বললেন। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৭১৫
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহি.) বলেন: এর মধ্যে জাবির (রাযি:)-এর এক মহতী ফযিলত ও মর্যাদা নিহিত রয়েছে; কেননা তিনি তাঁর বোনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন এবং নিজের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে বোনদের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
সাহাবায়ে কেরামের উত্তম আচরণ
১. আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর পিতার প্রতি সুমহান সদাচরণ এবং নবী ﷺ -এর সামনে পিতার ইসলাম গ্রহণের প্রতি তীব্র ব্যাকুলতা
হযরত আসামা বিনতে আবু বকর (রাযি:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন 'জি তুওয়া' নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন, তখন (আবু বকরের পিতা) আবু কুহাফা তাঁর সবচেয়ে ছোট মেয়েকে বললেন: 'হে প্রিয় মেয়ে! আমাকে আবু কুবাইস পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে চলো। আসমা (রাযি:) বলেন: তখন আবু কুহাফার দৃষ্টিশক্তি চলে গিয়েছিল। তিনি বলেন: আমি তাঁকে পাহাড়ের ওপর নিয়ে গেলাম।
তিনি আমাকে বললেন: হে প্রিয় মেয়ে! তুমি কী দেখতে পাচ্ছ? আমি বললাম: আমি একটি বিশালাকার কালো জনস্রোত একত্র হতে দেখছি। তিনি বললেন: ওরা হলো অশ্বারোহী বাহিনী। আমি বললাম: আমি এক লোককে সেই জনতার মাঝে আগে-পিছে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখছি।
তিনি বললেন: হে মেয়ে! উনি হলেন সেনাপরিচালক (যিনি ঘোড়াগুলোকে নির্দেশ দেন এবং সামনে এগিয়ে নেন)। এরপর আসমা (রাযি:) বলেন: আমি বললাম, আল্লাহর কসম! সেই বিশাল কালো জনস্রোত চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে! তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! তাহলে তো অশ্বারোহী বাহিনী সামনে এগিয়ে এসেছে! দ্রুত আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো। তাই মেয়েটি তাঁকে নিয়ে নিচে নেমে এল। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই অশ্বারোহী বাহিনীর মুখোমুখি হতে হলো। তখন মেয়েটির (আবু কুহাফার ছোট মেয়ের) গলায় একটি রুপার হার ছিল; এক লোক তার সাথে দেখা করে তার গলা থেকে হারটি ছিনিয়ে নিল। আসমা (রাযি:) বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং মাসজিদুল হারামে ঢুকলেন, তখন আবু বকর (রাযি:) তাঁর পিতাকে সাথে করে নিয়ে এলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাঁকে দেখলেন, তখন বললেন: তুমি বৃদ্ধ লোকটিকে তাঁর বাড়িতেই রেখে এলে না কেন, যাতে আমি নিজেই তাঁর কাছে যেতাম। আবু বকর (রাযি:) বললেন: হে আল্লাহর রাসুল! আপনার তাঁর কাছে যাওয়ার চেয়ে তিনি হেঁটে আপনার কাছে আসাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।
আসমা (রাযি:) বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে নিজের সামনে বসালেন, তাঁর বুকে হাত বুলালেন এবং বললেন: 'ইসলাম কবুল করুন। তখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন।
মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৬৯৫৬
২. আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি:)-এর পিতার মৃত্যুর পর পিতার বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার গভীর দৃষ্টান্ত
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, মক্কা মুআযযামার এক রাস্তায় আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) এর সঙ্গে এক বেদুঈনের সাক্ষাত হল। আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) তাঁকে সালাম দিলেন এবং তিনি যে গাধার পিঠে সওয়ার হতেন সে গাধা তাকে সওয়ারীর জন্য দিয়ে দিলেন। তিনি তাঁর মাথার পাগড়ী তাকে দান করলেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার (রাহঃ) তাকে বললেন যে, আমরা তাকে বললাম, আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। বেদুঈনরা তো অল্পতেই তুষ্ট হয়ে যায়। (এত দেওয়ার প্রয়োজন কী ছিল?) তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) বললেন, এই ব্যক্তির পিতা উমর ইবনুল খাজব (রাযিঃ) এর বন্ধু ছিলেন। আর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, কোন ব্যক্তির সর্বোত্তম নেকীর কাজ হচ্ছে তার পিতার বন্ধুজনের সঙ্গে সদাচরণের সম্পর্ক রক্ষা করা। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৬২৮২
৩. উসামাহ ইবনে যায়েদ (রাযি:) এবং তাঁর মায়ের প্রতি সুমহান সদাচরণ
মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন, উসমান ইবনে আফফান (রাযি:)-এর যুগে একটি খেজুরগাছের মূল্য এক হাজার দিরহাম পর্যন্ত পৌঁছেছিল। তিনি বলেন, তখন উসামা ইবনে যায়েদ (রাযি:) একটি খেজুরগাছের কাছে গিয়ে তার মাথা কেটে (বা কাণ্ডে ছিদ্র করে) ভেতরের কোমল শাঁস বের করে আনলেন এবং তা তাঁর মাকে খাওয়ালেন। লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, আপনি এমনটি কেন করলেন? অথচ আপনি তো দেখছেন যে, এই খেজুরগাছটির মূল্য এক হাজার দিরহাম পর্যন্ত পৌঁছেছে!
তিনি উত্তরে বললেন, আমার মা এটি আমার কাছে চেয়েছেন। আর তিনি আমার কাছে এমন কোনো জিনিস চাইলে, যা দেওয়ার সামর্থ্য আমার রয়েছে—আমি তা তাঁকে অবশ্যই দিয়ে থাকি।
তাবাকাতুল কুবরা ৪/৬৫
৪. হারিসাহ ইবনুন নু'মান (রাযি:) মায়ের প্রতি সবচেয়ে সদয় ও অনুগত মানুষদের অন্যতম
হযরত আয়েশা (রাযি:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আমি ঘুমাচ্ছিলাম, তখন (স্বপ্নে) নিজেকে জান্নাতে দেখতে পেলাম। সেখানে আমি একজন তিলাওয়াতকারীর তিলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম: উনি কে? ফেরেশতারা উত্তর দিলেন: ইনি হারিসাহ ইবনুন নু'মান।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: মাতা-পিতার সাথে সুসম্পর্ক ও সদাচরণের সুফল এমনই হয়! মাতা-পিতার সাথে সদাচরণের ফল এমনই হয়! আর হারিসাহ (রাযি:) ছিলেন তাঁর মায়ের প্রতি অত্যন্ত অনুগত ও সর্বশ্রেষ্ঠ সদাচরণকারী লোক। মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৫৩৩৭
সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক সহযোগিতা
সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনুকরণীয় ও সর্বোচ্চ সুমহান আদর্শ। তাঁরা ছিলেন একটি একক দেহের মতো, যেকোনো একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে পুরো দেহ যেমন ব্যথিত হয়, তাঁরাও ঠিক তেমনই ছিলেন।
যে সময়ে আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এবং আমর ইবনুল আস (রাযি:) মিসর, শাম ও ইরাক বিজয়ে ব্যস্ত ছিলেন; ঠিক সে সময়ে আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী (রাযি:) প্রজা সাধারণের শাসনভার পরিচালনা ও সার্বিক কল্যাণ দেখভাল করছিলেন। অপরদিকে মুয়াজ ইবনে জাবাল, ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমর (রাযি:) মানুষকে শিক্ষা দান, ফতোয়া প্রদান ও আদর্শ গঠনে মগ্ন ছিলেন। আবু হুরায়রা, আনাস ও আয়েশা (রাযি:) হাদিস সংরক্ষণ ও বর্ণনা করছিলেন এবং আবু জার ও আবু দারদা (রাযি:) সাধারণ মানুষ ও শাসকদের সদুপদেশ ও উপদেশমালা প্রদান করছিলেন। এভাবে তাঁরা একে অপরকে সহযোগিতা করেছেন, কখনো একে অপরের দোষ ধরেননি; পারস্পরিক সহায়তা করেছেন, কখনো একে অপরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেননি।
সাহাবায়ে কেরাম পারস্পরিক সহযোগিতার চমৎকার কিছু দৃষ্টান্ত নিচে আলোকপাত করছি।
১. খন্দক (পরীখা) খননে সাহাবায়ে কেরাম পারস্পরিক সহযোগিতা
মর্যাদাবান সাহাবি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাযি:) খন্দকের যুদ্ধে সাহাবিদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার এক চমৎকার চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন: মুহাজির ও আনসার সাহাবিগণ মদিনার চারপাশে খন্দক খনন করছিলেন এবং নিজেদের পিঠে করে মাটি বহন করছিলেন। আর তাঁরা সমস্বরে আবৃত্তি করছিলেন:
আমরা ইসলামের উপর মুহাম্মাদের হাতে বায়আত নিয়েছি, ততদিন পর্যন্ত যতদিন আমরা বেঁচে থাকি। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উত্তরে বলেছিলেনঃ হে আল্লাহ! আখিরাতের কল্যাণ ছাড়া কোন কল্যাণ নেই। তাই আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি বরকত নাযিল করুন। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২৮৩৫
২. হিজরতের পর মুহাজিরদের সাথে আনসারদের পারস্পরিক সহযোগিতা
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রাযিঃ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যখন মদীনায় আসি, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার এবং সা’দ ইবনে রাবী’ (রাযিঃ) এর মাঝে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সৃষ্টি করে দেন। পরে সা’দ ইবনে রাবী’ বললেন, আমি আনসারদের মাঝে অধিক ধন-সম্পত্তির অধিকারী। আমার অর্ধেক সম্পত্তি তোমাকে ভাগ করে দিচ্ছি এবং আমার উভয় স্ত্রীকে দেখে যাকে তোমার পছন্দ হয়, বল আমি তাকে তোমার জন্য পরিত্যাগ করব। যখন (সে ইদ্দত পূর্ণ করবে), তখন তুমি তাকে বিবাহ করে নিবে। আব্দুর রহমান (রাযিঃ) বললেন, এ সবে আমার কোন প্রয়োজন নেই। বরং (আপনি বলুন) ব্যবসা বাণিজ্য করার মতো কোন বাজার আছে কি? তিনি বললেন, কায়নুকার বাজার আছে। পরের দিন আব্দুর রহমান (রাযিঃ) সে বাজারে গিয়ে পনীর ও ঘি (খরিদ করে) নিয়ে আসলেন……। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২০৪৮
৩. সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক সহযোগিতার আরও একটি দৃষ্টান্ত
হযরত সালমান (রাযি:)-এর ঘটনার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন তিনি (মুক্তির জন্য) তাঁর মনিবের সাথে 'মুকাতাবাত' (নির্দিষ্ট অর্থ বা কাজের বিনিময়ে দাসত্ব থেকে মুক্তির চুক্তি) করেছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন নিঃস্ব ও দরিদ্র; চুক্তিকৃত পাওনা মেটানোর মতো কোনো সম্পদ তাঁর কাছে ছিল না। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে বললেন: তোমাদের ভাইকে সাহায্য করো।
অতপর সাহাবিগণ তাঁকে (অর্থ ও খেজুরগাছের চারা দিয়ে) এমনভাবে সাহায্য করলেন যে, তিনি দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হলেন এবং একজন স্বাধীন মানুষে পরিণত হলেন।
মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৩৭৩৭
সাহাবায়ে কেরামের বিনয় ও নম্রতা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণে সাহাবায়ে কেরামের সেই সমস্ত মহান কর্ম ও সদ্ব্যবহারের চর্চা করতেন, যা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করতেন, বিশেষ করে নম্রতা, বিনয় ও অহংকারমুক্ত আচরণের ক্ষেত্রে।
সংক্ষেপে বলা যায়, তাঁরা মহান রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসৃত পথেই পরিচালিত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যকার কারো পদমর্যাদা যতই সুউচ্চ হোক না কেন, কেউই কখনো অহংকার করেননি কিংবা জনসাধারণের জন্য উপকারী এসব ছোটখাটো কাজ করতে ইতস্তত বা বোধ সংকোচ করেননি।
আবু লাইছ আস-সামারকন্দি (রহি.) বলেন:
এরাই ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিগণ, যাঁদের মূল চরিত্র ও স্বভাবই ছিল পরম বিনয় ও নম্রতা। আর এ কারণেই তাঁরা সমগ্র সৃষ্টিজগৎ, ফেরেশতাকুল এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিলেন। তাম্বীহুল গাফেলীন ১৮৮ পৃষ্ঠা
১. আবু বকর সিদ্দিক (রাযি.)-এর বিনয় ও নম্রতা
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি:) যখন খলিফা নির্বাচিত হলেন, তখন তিনি সকালে বাজারের উদ্দেশ্যে বের হতেন। খিলাফতের দায়িত্ব পাওয়ার পূর্বে তিনি মহল্লার মানুষদের ছাগল দোহন করে দিতেন। তাই যখন তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করা হলো, তখন মহল্লার এক বালিকা বলে উঠল: এখন তো আর উনি আমাদের ছাগল দোহন করে দেবেন না! এ কথা শুনে আবু বকর (রাযি:) বললেন: অবশ্যই! আমি অবশ্যই তোমাদের ছাগল দোহন করে দেব। আর আমি আশা রাখি যে, আমি যে (খিলাফতের) দায়িত্বে প্রবেশ করেছি, তা আমার আগের অভ্যাসকে বদলে দেবে না। তাবাকাতে ইবনে সাদ ৩৪৩০
তিনি আরও বলতেন: আমার বড় ইচ্ছা হয় আমি যদি কোনো মুমিন বান্দার দেহের একটি পশম হতে পারতাম! মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ৫৬০
তিনি এই কথাটি এমন অবস্থায় বলেছিলেন যে, তিনি ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত (দশজন সাহাবির) অন্যতম, মহান 'সিদ্দিক' (সত্যবাদী), রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনন্য সঙ্গী এবং তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর প্রথম খলিফা।
২. উমর (রাযি:)-এর বিনয় ও নম্রতা
তারিক ইবনে শিহাব (রহি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি:) শাম সফরের উদ্দেশ্যে বের হলেন এবং আমাদের সাথে আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাযি:)-ও ছিলেন। পথিমধ্যে তারা এক জলাশয় বা কাদা-পানির পারাপারের স্থানে এসে পৌঁছালেন। উমর (রাযি:) তখন তাঁর উটের পিঠে সাওয়ার ছিলেন। তিনি উট থেকে নেমে পড়লেন, নিজের চামড়ার মোজা দুটি খুলে কাঁধে ঝুলিয়ে নিলেন এবং উটের লাগাম ধরে কাদা-পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে পার হতে লাগলেন।
তা দেখে আবু উবাইদাহ (রাযি:) বললেন: হে আমিরুল মুমিনীন! আপনি এমনটি করছেন?! আপনি নিজের মোজা খুলে কাঁধে তুলে নিচ্ছেন, উটের লাগাম ধরে কাদা-পানি পার হচ্ছেন! স্থানীয় শহরবাসী আপনাকে এভাবে দেখুক তা আমি একদম পছন্দ করছি না।
তখন উমর (রাযি:) আফসোস করে বললেন: আহা আবু উবাইদাহ! তুমি ছাড়া অন্য কেউ যদি এ কথা বলতো, তবে আমি তাকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতাম! শোনো, আমরা ছিলাম সবচেয়ে লাঞ্ছিত ও অপমানিত জাতি, অতঃপর আল্লাহ তাআলা ইসলামের মাধ্যমে আমাদের সম্মানিত করেছেন। তাই আমরা যদি আল্লাহ আমাদের যে বিষয়ের মাধ্যমে সম্মান দিয়েছেন তা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে সম্মান সন্ধান করি, তবে আল্লাহ আমাদের আবারও লাঞ্ছিত ও অপমানিত করবেন।
মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস নং: ২০৭
কায়স ইবনে আবি হাজিম (রহি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি:) যখন শামে পৌঁছালেন, তখন সেখানকার আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে এলেন। তাঁকে বলা হলো: আপনি এই তুর্কি ঘোড়াটিতে (উন্নত জাতের ঘোড়া) সওয়ার হোন, যাতে সাধারণ মানুষ আপনাকে (সম্ভ্রমের সাথে) দেখতে পায়। তিনি উত্তর দিলেন: তোমরা তো বিষয়টিকে এই পার্থিব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছ, অথচ মূল সিদ্ধান্ত আসে ওপর থেকে। (এ কথা বলে তিনি আকাশের দিকে হাত দিয়ে নির্দেশ করলেন) এবং বললেন, আমার পথ ছাড়ো। তানবিহুল গাফিলিন ১৮৭ পৃষ্ঠা
হযরত আবু মাহযূরা (রাযি:) বলেন, আমি হযরত উমর (রাযি:)-এর দরবারে বসে ছিলাম। এমন সময় সাফওয়ান ইবন উমাইয়া (রাযি.) একটি বিরাট পাত্র নিয়ে সেখানে এসে হাজির হলেন। পাত্রটি একটি পশমী চাদরে করে কয়েকজন ব্যক্তি বহন করে এনেছিল। তারা এটি এনে হযরত উমর (রাযি.)-এর সামনে রাখল। তখন হযরত উমর (রাযি.) দুঃস্থ-দরিদ্র লোকজন এবং তাঁর কাছে থাকা লোকদের দাসদের ডাকলেন। তাঁরা তাঁর সঙ্গে একত্রে বসে খাবার খেলেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ এমন একটি সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিয়েছেন। অথবা তিনি বললেন, আল্লাহ এমন একটি সম্প্রদায়কে অপদস্থ করেছেন, যারা তাদের দাসদের সঙ্গে খেতে অনিচ্ছুক এবং তাদের প্রতি বিমুখ ছিল।
তখন সাফওয়ান বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা তাদের প্রতি বিমুখ নই; বরং তাদেরকে নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। আল্লাহর কসম! আমরা এমন কোনো উত্তম খাবার পাই না, যা নিজেরা খাব এবং তাদেরকেও খাওয়াব।
আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং: ২০১
হযরত উরওয়া ইবনে জুবায়র (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.)-কে কাঁধে পানির মশক বহন করতে দেখে বললাম: হে আমিরুল মুমিনীন! এটি তো আপনার জন্য শোভা পায় না! তিনি উত্তরে বললেন: যখন বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধি দলগুলো আনুগত্য ও শোনার মানসিকতা নিয়ে আমার কাছে আসতে শুরু করল, তখন আমার অন্তরে কিছুটা আত্মতুষ্টি বা অহংকারের ভাব উঁকি দিয়েছিল; তাই আমি নিজের নফসকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছি। আর রিসালাতুল কুশায়রিয়্যাহ ১/২৭৯
৩. উসমান (রাযি:)-এর বিনয় ও নম্রতা
হাসান বসরী (রহি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি উসমান ইবনে আফফান (রাযি:)-কে মসজিদে কায়লুলা (দুপুরের বিশ্রাম) নিতে দেখেছি, অথচ তিনি তখন মুসলিম জাহানের খলিফা! তিনি যখন উঠে দাঁড়াতেন, তখন তাঁর পাশে মসজিদের কঙ্কর ও নুড়িপাথরের দাগ লেগে থাকত। তা দেখে আমরা বিস্ময়ে বলতাম: ইনিই আমিরুল মুমিনীন! ইনিই আমিরুল মুমিনীন।
হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া ১/৬০
মায়মুন ইবনে মিহরান (রহি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: হামদানি (রহি.) আমাকে খবর দিয়েছেন যে, তিনি উসমান ইবনে আফফান (রাযি:)-কে একটি খচ্চরের পিঠে সওয়ার হতে দেখেছেন, অথচ তিনি তখন মুসলিম উম্মাহর খলিফা! আর তাঁর ঠিক পেছনেই সওয়ার ছিল তাঁর দাস নায়েল।
হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া ১/৬০
৪. আলী (রাযি:)-এর বিনয় ও নম্রতা
আমর ইবনে কায়স আল-মুলায়ী (রহি.) তাঁদের মধ্যকার এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন: আলী ইবনে আবি তালিব (রাযি:)-কে তালি দেওয়া পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখা গেল। তাঁকে বলা হলো: আপনি তালি দেওয়া পোশাক পরছেন? তিনি উত্তরে বললেন: 'মুমিন এটি অনুসরণ করবে এবং এর মাধ্যমে অন্তর বিনম্র ও নম্র হয়। ইসলাহুল মাল ৩৯৪
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে
পোশাকের ব্যাপারে আলী (রাযি:)-কে পরামর্শ বা আপত্তি জানানো হলে তিনি বললেন: আমার এই পোশাক অহংকার থেকে বহু দূরে এবং কোনো মুসলিমের জন্য আমাকে অনুসরণ করার সবচেয়ে উপযোগী পথ।
ফাযায়েলে সাহাবা ৯০৮
৫. আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাযি:)-এর বিনয় ও নম্রতা
আব্দুল্লাহ ইবনে হানজালা (রহি.) থেকে বর্ণিত: একদিন আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাযি:) মাথার ওপর এক বোঝা জ্বালানি কাঠ নিয়ে বাজারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। (তাঁর মতো সুপরিচিত ব্যক্তির এমন কাণ্ড দেখে) জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: আমি এর মাধ্যমে আমার ভেতরের অহংকার তাড়িয়ে দিচ্ছি। কারণ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি: যার অন্তরে সর্ষেদানাপরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তাবারানী ১৪/৩০৮
৬. সালমান ফারসি (রাযি:)-এর বিনয় ও নম্রতা
হযরত সালমান ফারসি (রাযি:) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি (মাদায়েন) অঞ্চলের গভর্নর ছিলেন। একদিন সেখানকার এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বাজার থেকে কিছু কেনাকাটা করলেন। পথিমধ্যে সালমান (রাযি:) পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, আর ঐ লোকটি (তাঁর সাদাসিধে পোশাক ও অবয়ব দেখে) তাঁকে একজন সাধারণ মজুর ভেবে বসল। তাই সে বলল: এদিকে এসো, এটি বহন করে নিয়ে চলো! সালমান (রাযি:) বিনাবাক্যে মালামালটি কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটতে লাগলেন। পথে যে মানুষের সাথেই দেখা হতে লাগল, তারা সালমান (রা.)-কে দেখে বলতে লাগল: আল্লাহ আমিরের কল্যাণ করুন! আমরা আপনার থেকে এটি বহন করে নিচ্ছি! কিন্তু সালমান (রাযি:) কারো হাতে তা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তা দেখে লোকটি মনে মনে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে বলল: দুর্ভোগ আমার! আমি শেষ পর্যন্ত এলাকার খোদ আমিরকেই মজুর বানালাম? এরপর সে ক্ষমা চাইতে লাগল এবং বলল: আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন, আমি আপনাকে চিনতে পারিনি! সালমান (রাযি:) বললেন: সামনে চলো। এভাবে তিনি মালামাল বহন করে লোকটির ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন, অতপর সে বললেন: আমি আর কখনোই অন্য কাউকে এভাবে খাটাব না। তানবিহুল গাফিলিন ১৮৮ পৃষ্ঠা
৭. আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাযি:)-এর বিনয় ও নম্রতা
হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাযি:) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি কুফার গভর্নর ছিলেন। একদিন তিনি পশুখাদ্যের দোকানে গিয়ে ঘাস ক্রয় করলেন। বিক্রেতা এবং তিনি উভয়েই আঁটির একেক পাশ ধরলেন এবং টানাটানি করে অর্ধেকটা আম্মার (রাযি:)-এর হাতে আর অর্ধেকটা বিক্রেতার হাতে আসল। এরপর পুরো আঁটিটি আম্মার (রাযি:)-এর কাঁধে তুলে দেওয়া হলো এবং তিনি তা বহন করে নিজ ঘরে নিয়ে গেলেন। তানবিহুল গাফিলিন ১৮৮ পৃষ্ঠা
৮. আবু হুরায়রা (রা.)-এর বিনয় ও নম্রতা
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি:) থেকে বর্ণিত আছে যে, উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি:) তাঁকে বাহরাইনের গভর্নর বানিয়ে পাঠালেন। তিনি একটি গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে বাহরাইনে প্রবেশ করলেন এবং বলতে লাগলেন: আমিরের জন্য পথ ছেড়ে দাও! আমিরের জন্য পথ ছেড়ে দাও। তানবিহুল গাফিলিন ১৮৮ পৃষ্ঠা
পরবর্তীকালে তিনি যখন মদিনার গভর্নর ছিলেন, তখনও তাঁকে কাঁধে জ্বালানি কাঠের বোঝা বহন করতে দেখা যেত এবং তিনি (রসিকতা ও পরম বিনয়ের সাথে) বলতে থাকতেন: আমিরের জন্য পথ ছেড়ে দাও।
আর রিসালাতুল কুশায়রিয়্যাহ ১/২৮০
৯. আবু দারদা (রাযি:)-এর বিনয় ও নম্রতা
উম্মুদ দারদা (রাযি:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আবু দারদা (রাযি:)-কে দেখেছি, তিনি আমাদের এই রান্নার হাঁড়ির নিচে ফু দিয়ে আগুন জ্বালাতেন, এমনকি (ধোঁয়ায়) তাঁর দুই চোখ দিয়ে গড়িয়ে পানি পড়ত।
আয-যুহদ ৭৪২
১০. উম্মুদ দারদা (রাযি:)-এর বিনয় ও নম্রতা
ইব্রাহিম ইবনে আবি আবলাহ (রহি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি উম্মুদ দারদা (রাযি:)-কে বায়তুল মাকদিসে (মসজিদুল আকসায়) দরিদ্র নারীদের সাথে বসে থাকতে দেখেছি।
আত-তাওয়াদু' ওয়াল-খুমূল (ইবনে আবিদ দুনিয়া) ১০৫
১১. যুল ক্বালা হিমইয়ারী (রাযি.)-এর বিনয় ও নম্রতা
ইলওয়ান ইবনে দাউদ আল-বাজালী (রহি.) থেকে বর্ণিত, হামদান গোত্রের এক শায়খ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন: জাহিলিয়াতের যুগে আমার গোত্র আমাকে যুল ক্বালা-এর কাছে উপহারস্বরূপ দেওয়ার জন্য কিছু ঘোড়া সহকারে পাঠায়। আমি পুরো এক বছর তাঁর দরবারে অবস্থান করি, কিন্তু তাঁর সাক্ষাৎ পাচ্ছিলাম না। অতঃপর একদিন তিনি তাঁর রাজপ্রাসাদের উচ্চকক্ষ থেকে প্রজাদের ওপর একঝলক দৃষ্টি দিলেন; অমনি উপস্থিত সব মানুষ তাঁর উদ্দেশ্যে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল! এরপর তিনি নিচে এসে বসলেন, আমি ঘোড়াগুলো নিয়ে তাঁর সামনে পেশ করলাম এবং তিনি তা গ্রহণ করলেন।
পরবর্তীকালে (ইসলাম গ্রহণের পর) আমি তাঁকে শামের হিমস শহরে দেখি যে, তিনি মাত্র এক দিরহামের গোশত কিনে তা নিজ হাতে বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর গোত্রের মানুষ ও আজাদ করা দাসরা ছুটে এসে তা তাঁর হাত থেকে নিজেরা নেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পরম বিনয়ের কারণে তিনি তা কাউকে দিতে অস্বীকৃতি জানালেন।
তখন তিনি আবৃত্তি করছিলেন:
ধিক্ এই দুনিয়াদারদের, যখন দুনিয়ার রূপ এমনই হয়!
আমি তো এখান থেকে প্রতিদিন যন্ত্রণার মধ্যেই বাস করছি।
অথচ এমন এক সময় ছিল, যখন বলা হতো—'সবচেয়ে সুখী জীবন কার?'
তখন সবাই আমার দিকেই আঙুল তুলে বলতো—'এই যে ইনি!'
অতঃপর সেই আরামের জীবনের বদলে আমি এক কষ্টকর জীবন বেছে নিয়েছি;
তবে কতই না চমৎকার এই কষ্ট! কতই না বরকতময় এই কঠোরতা!
আত-তাওয়াদু' ওয়াল-খুমূল (ইবনে আবিদ দুনিয়া) ৯৮
সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক ভালোবাসা
১. হযরত আবু দারদা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট বসা ছিলাম। এমন সময় আবু বকর (রাযিঃ) পরিহিত কাপড়ের একপাশ এমনভাবে ধরে আসলেন যে, তাঁর উভয় হাঁটু বেরিয়ে পড়ছিল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের এ সাথী এইমাত্র কারো সাথে ঝগড়া করে আসছে। (এমন সময় আবু বকর (রাযিঃ) মজলিসে উপস্থিত হয়ে) তিনি সালাম করলেন এবং বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার এবং উমর ইবনে খাত্তাবের মাঝে একটি বিষয়ে কিছু বচসা হয়ে গেছে। আমিই প্রথম কটু কথা বলেছি। তারপর আমি লজ্জিত হয়ে তাঁর নিকট ক্ষমা চেয়েছি। কিন্তু তিনি ক্ষমা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এখন আমি আপনার খেদমতে হাযির হয়েছি। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন, হে আবু বকর (রাযিঃ)। একথাটি তিনি তিনবার বললেন।
এরপর উমর (রাযিঃ) লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আবু বকর (রাযিঃ)- এর বাড়িতে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আবু বকর (রাযিঃ) কি বাড়িতে আছেন? তাঁরা বলল না। তখন উমর (রাযিঃ) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে চলে আসলেন। (তাঁকে দেখে) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। আবু বকর (রাযিঃ) ভীত হয়ে নতজানু হয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমিই প্রথম অন্যায় করেছি। একথাটি তিনি দু’বার বললেন। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ যখন আমাকে তোমাদের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন তখন তোমরা সবাই বলেছ, তুমি মিথ্যা বলছ আর আবু বকর বলেছে, আপনি সত্য বলেছেন। তাঁর জান মাল সর্বস্ব দিয়ে আমার প্রতি যে সহানুভূতি দেখিয়েছে তা নজিরবিহীন। তোমরা কি আমার খাতিরে আমার সাথীকে অব্যাহতি প্রদান করবে? এ কথাটি তিনি দু’বার বলেছেন। এরপর আবু বকর (রাযিঃ)- কে আর কখনও কষ্ট দেয়া হয় নি। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩৬৬১
সুতরাং এই হাদিসে আবু বকর সিদ্দিক (রাযি:)-এর পক্ষ থেকে ভালোবাসা অর্জনের প্রচেষ্টা এবং তাঁর প্রতি ওমর (রাযি:)-এর অন্তরে থাকা ক্ষোভ/মনোমালিন্য দূর করার আকুল আবেদনের উল্লেখ রয়েছে; আল্লাহ তাঁদের সবার ওপর সন্তুষ্ট।
২. হযরত আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। আব্দুল্লাহ ইবনে আবু রাবাহ (রাহঃ) বলেন, আমি একটি প্রতিনিধি দলের সাথে (যার মধ্যে আবু হুরায়রা (রাযিঃ)ও ছিলেন) মুআবিয়া (রাযিঃ) এর কাছে গেলাম। সেই সময় ছিল রমযান মাস। তখন তাঁরা একে অন্যের জন্য খানা তৈরী করতেন। আবু হুরায়রা (রাযিঃ) অধিকাংশ সময় আমাদেরকে তাঁর বাসস্থানে দাওয়াত করতেন। সুতরাং আমি মনে মনে বললাম, আমিও খানা তৈরী করবো এবং সলকেই আমার বাসস্থানে দাওয়াত করবো। আমি খানা তৈরীর নির্দেশ দিলাম। এরপর আবু হুরায়রা (রাযিঃ) এর সঙ্গে আমি বিকালে সাক্ষাত করলাম এবং বললাম, আজ রাতের দাওয়াত আমার বাসায়। আবু হুরায়রা (রাযিঃ) বললেন, আপনি আজ আমার পূর্বেই (দাওয়াত) দিয়ে দিলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৭৮০
এই বর্ণনায় সালাফদের উত্তম সৌহার্দ্য প্রদর্শন, পারস্পরিক সাক্ষাৎ, সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একে অপরকে সম্মান ও আপ্যায়ন করার অনুপম আদর্শ ফুটে উঠেছে।
৩. হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবি লাইলা (রহ.) বলেন: কা'ব ইবনে উজরাহ্ (রাযি:)-এর সাথে আমার দেখা হলো, তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে এমন একটি উপহার দেব না, যা আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে শুনেছি? আমি বললাম, 'হ্যাঁ, অবশ্যই! আমাকে তা উপহার দিন।
তিনি ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে তাঁকে দ্বীনের কিছুটা জ্ঞান উপহার হিসেবে প্রদান করেছিলেন।
৪. হাফস ইবনে আসিম (রাহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ি। ইবনে উমর (রাযিঃ) আমাকে দেখতে আসেন।
৫.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, মক্কা মুআযযামার এক রাস্তায় আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) এর সঙ্গে এক বেদুঈনের সাক্ষাত হল। আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) তাঁকে সালাম দিলেন এবং তিনি যে গাধার পিঠে সওয়ার হতেন সে গাধা তাকে সওয়ারীর জন্য দিয়ে দিলেন। তিনি তাঁর মাথার পাগড়ী তাকে দান করলেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার (রাহঃ) তাকে বললেন যে, আমরা তাকে বললাম, আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। বেদুঈনরা তো অল্পতেই তুষ্ট হয়ে যায়। (এত দেওয়ার প্রয়োজন কী ছিল?) তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) বললেন, এই ব্যক্তির পিতা উমর ইবনুল খাজব (রাযিঃ) এর বন্ধু ছিলেন। আর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, কোন ব্যক্তির সর্বোত্তম নেকীর কাজ হচ্ছে তার পিতার বন্ধুজনের সঙ্গে সদাচরণের সম্পর্ক রক্ষা করা। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৫৫২
সাহাবায়ে কেরামের দানশীলতা
১. যায়দ ইবনে আসলাম (রাহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে দান করার নির্দেশ দেন। ঘটনাক্রমে সেদিন আমার কাছে মাল ছিল। আমি (মনে মনে) বলিঃ আজ আমি আবু বাকর (রাযিঃ) এর চাইতে (দানে) অগ্রগামী হব, যদিও কোন দিন আমি দানে তার অগ্রগামী হতে পারিনি। তাই আমি আমার অর্ধেক সম্পদ নিয়ে আসি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করেনঃ তুমি তোমার পরিবার-পরিজনদের জন্য কি রেখে এসেছ? আমি বলি, এর সম-পরিমাণ সম্পদ।
হযরত উমর (রাযিঃ) বলেনঃ আর আবু বকর (রাযিঃ) আনলেন তার সমস্ত সম্পদ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করেনঃ তুমি তোমার পরিবার-পরিজনদের জন্য কি রেখে এসেছ? তিনি বলেন, আমি তাদের জন্য আল্লাহ এবং তার রাসূলকে রেখে এসেছি। উমর (রাযিঃ) বলেনঃ তখন আমি বলিঃ আমি ভবিষ্যতে কোন দিন কোন ব্যাপারে অধিক ফযীলতের অধিকারী হওয়ার জন্য আপনার সাথে প্রতিযোগিতা করব না।
সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ১৬৭৮
২. হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মদীনার আনসারী সাহাবীদের মধ্যে আবু তালহা (রাযিঃ) সর্বাপেক্ষা বিত্তবান ছিলেন। তার সস্পত্তির মধ্যে ‘বায়রুহা’ই ছিল সর্বাধিক প্রিয় সম্পদ। সেটি মসজিদুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্মুখে অবস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে গিয়ে এর সুপেয় পানি পান করতেন। আনাস (রাযিঃ) বলেন, ″তোমরা যা ভালবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা তোমরা কখনো পূন্যতা লাভ করবে না″ এ আয়াত নাযিল হলে তখন আবু তালহা (রাযিঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট গিয়ে বললেন, আল্লাহ তাআলা আল কুরআনে বলছেন, ″তোমরা যা ভালবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুন্য লাভ করবে না।″
‘বায়রুহা’ আমার সর্বপেক্ষা প্রিয় সম্পদ। অতএব আমি তা আল্লাহর রাহে সাদ্কা করলাম। বিনিময়ে আমি আল্লাহর কাছে নেকী ও সঞ্চয় আশা করি এবং আখিরাতে পুজির আশা রাখি। ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার মর্জি মাফিক আপনি তা সদ্ব্যবহার করুন। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, বাহ! সম্পদটি লাভজনক। সম্পদটি লাভজনক। এ সম্পর্কে তুমি যা বললে, অবশ্যই আমি তা শুনেছি তবে আমার পছন্দ হচ্ছে তা তুমি তোমার আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে বন্টন করে দাও। অতঃপর আবু তালহা (রাযিঃ) আত্মীয়-স্বজন ও তার চাচাতো ভাইদের মাঝে তা বন্টন করে দিলেন।
৩. কায়স ইবনে সাদ ইবনে উবাদাহ্ (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর ভাইদের (দ্বীনি বন্ধুদের) আগমন বিলম্বিত মনে করলেন (অর্থাৎ কেউ তাঁকে দেখতে আসছে না দেখে কারণ জানতে চাইলেন)। তখন তাঁকে বলা হলো, 'আপনার কাছে তাঁদের যে ঋণ রয়েছে, সেই লজ্জাতেই তাঁরা আসছেন না।' এ কথা শুনে তিনি বললেন, 'আল্লাহ এমন সম্পদকে ধিক্কার দিন, যা দ্বীনি ভাইদের দেখা-সাক্ষাৎ করা থেকে বিরত রাখে!' এরপর তিনি একজন ঘোষণাকারীকে আদেশ দিলেন, সে যেন ঘোষণা করে দেয়: 'কায়স ইবনে সাদের কাছে যাঁরই কোনো ঋণ আছে, সে তা থেকে মুক্ত (তাঁর ঋণ মাফ করে দেওয়া হলো)।'
বর্ণনাকারী বলেন: ওই দিন বিকেলেই প্রচুর মানুষের সাক্ষাৎ ও অসুস্থতা দেখতে আসার চাপে তাঁর বাড়ির সিঁড়িটি ভেঙে পড়েছিল! আর রিসালাতুল কুশায়রিয়্যাহ ২/৪০৬
৪. আতা (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আমি ইবনে আব্বাস (রাযি:)-এর মজলিসের চেয়ে অধিক সম্মানিত, গভীর ফিকহ (জ্ঞান) সমৃদ্ধ এবং বিশাল পাত্রের (খাবারের আপ্যায়নের) ব্যবস্থা সম্পন্ন কোনো মজলিস কখনো দেখিনি। কুরআন বিশারদগণ তাঁর কাছে এসে প্রশ্ন করতেন, আরবি ভাষা ও ব্যাকরণবিদগণ তাঁর কাছে এসে প্রশ্ন করতেন এবং কবিগণও তাঁর কাছে এসে প্রশ্ন করতেন; আর তাঁরা সবাই তাঁর সুদূরপ্রসারী ও প্রশস্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে তৃপ্ত হয়ে ফিরে যেতেন।
কিতাবুয যুহদ (আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক) ১১৭৫
৫. সাঈদ ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "হাসান ইবনে আলী (রা.) তাঁর পাশে থাকা এক ব্যক্তিকে আল্লাহর কাছে দশ হাজার দিরহাম রিজিক পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করতে শুনলেন। এরপর তিনি (মজলিস শেষে) ফিরে গেলেন এবং তাঁর কাছে ওই দশ হাজার দিরহাম পাঠিয়ে দিলেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা ৩/২৬০
৬. ইবনে যোবাইর (রাযি:) বলতেন: "আমি আয়েশা ও আসমা (রাযি:)-এর চেয়ে অধিক দানশীল কোনো দুই নারীকে কখনো দেখিনি; তবে তাঁদের দানের ধরন ছিল ভিন্ন। আয়েশা (রাযি:) কোনো কিছু জমিয়ে জমিয়ে একত্র করতেন, অতঃপর তা জমা হলে উপযুক্ত স্থানে বিতরণ করে দিতেন। আর আসমা (রাযি:) আগামীকালের জন্য কখনোই কোনো কিছু জমিয়ে রাখতেন না।
তারিখে দিমাশক (ইবনে আসাকির) ১৯/৫৯
৭. আবান ইবনে উসমান (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "এক ব্যক্তি উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি:)-কে ক্ষতি বা বিপদে ফেলার উদ্দেশ্যে কুরাইশদের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের কাছে গিয়ে বলল, 'উবায়দুল্লাহ আপনাদের বলেছেন যে, আজ যেন আপনারা সবাই তাঁর বাড়িতে গিয়ে দুপুরের খাবার খান।' ফলে তাঁরা সবাই এসে তাঁর ঘর পূর্ণ করে ফেললেন। উবায়দুল্লাহ (রাযি:) জিজ্ঞেস করলেন, 'বিষয়টি কী?' তাঁকে পুরো ঘটনা জানানো হলো। অতঃপর তিনি তৎক্ষণাৎ ফলমূল কেনার নির্দেশ দিলেন এবং একদল লোককে রান্না করা ও রুটি প্রস্তুত করার আদেশ দিলেন।
প্রথমে অতিথিদের সামনে ফলমূল পরিবেশন করা হলো। তাঁরা ফল খাওয়া শেষ করতে না করতেই দস্তরখান বিছিয়ে (মূল) খাবার পরিবেশন করা হলো। সবাই তৃপ্তি সহকারে খেয়ে চলে গেলেন। এরপর উবায়দুল্লাহ (রাযি:) তাঁর তত্ত্বাবধায়কদের জিজ্ঞেস করলেন, 'আমাদের পক্ষে কি প্রতিদিন এমন ব্যবস্থা করা সম্ভব?' তাঁরা বললেন, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'তবে এরা যেন প্রতিদিন আমাদের এখানেই দুপুরের খাবার খায়'। ইহইয়াউ উলুমুদ্দীন ৩/২৪৭
সাহাবায়ে কেরামের জবান হেফাজত (সংযত )
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিগণ মুক্তি লাভ ও কল্যাণ অর্জনে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যাকুল ছিলেন। আর তাঁরা জানতেন যে, তাঁদের মুক্তির অন্যতম মাধ্যম হলো নিজ জিহ্বা হেফাজত (সংযত) রাখা। এ বিষয়ে কিছু বিবরণ বর্ণিত হয়েছে; তার মধ্যে রয়েছে:
১. হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি:) নিজের মুখের ভেতর একটি কাঁকর/ছোট পাথর রেখে দিতেন, যার মাধ্যমে তিনি নিজেকে (অপ্রয়োজনীয়) কথা বলা থেকে বিরত রাখতেন। তিনি তাঁর জিহ্বার দিকে ইঙ্গিত করে বলতেন: 'এই বস্তুটিই আমাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে'।
বাইহাকী শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং: ৪৯৪৭
২. হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি:)-কে নিজের জিহ্বা ধরে বলতে দেখা গেল: "তোমার জন্য আফসোস! ভালো কথা বলো, লাভবান হবে; অথবা মন্দ কথা থেকে চুপ থাকো, নিরাপদ থাকবে। তা না হলে জেনে রাখো, তুমি অবশ্যই অনুতপ্ত হবে।"
বর্ণনাকারী বলেন, তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো: "হে ইবনে আব্বাস, আপনি কেন এমন বলছেন?" তিনি বললেন: "আমার কাছে খবর পৌঁছেছে যে, আমার ধারণা তিনি বলেছেন—কিয়ামতের দিন মানুষ তার শরীরের অন্য কোনো অঙ্গের ওপর ততটা রাগান্বিত বা ক্রোধান্বিত হবে না, যতটা হবে তার জিহ্বার ওপর; কেবল সেই কথা ব্যতীত যা দিয়ে সে ভালো কিছু বলেছে অথবা ভালো কিছু লিখিয়েছে।
হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া ১/৩২৮
৩. আসলাম (রহ.) থেকে বর্ণিত: ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি:) একবার আবু বকর সিদ্দিক (রাযি:)-এর নিকট প্রবেশ করে দেখলেন, তিনি নিজ জিহ্বা টেনে ধরছেন । তখন ওমর (রাযি:) তাঁকে বললেন, থামুন! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। উত্তরে আবু বকর (রাযি:) বললেন, এই বস্তুটিই আমাকে ধ্বংস ও বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া ১/৩৩
৪. জায়েদ ইবনে আসলাম (রহ.) থেকে বর্ণিত: তিনি আবু দুজানাহ্ (রাযি:) অসুস্থ থাকা অবস্থায় তাঁর কাছে গিয়ে প্রবেশ করলেন। তখন তাঁর চেহারা উজ্জ্বল ও প্রফুল্ল দেখাচ্ছিল। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার চেহারা এমন উজ্জ্বল ও প্রফুল্ল দেখাচ্ছে কেন? তিনি বললেন, আমার কাছে দুটি আমলের চেয়ে বেশি ভরসাজনক কোনো কাজ নেই: প্রথমত, আমি অনর্থক বা অহেতুক কোনো কথা বলতাম না; আর দ্বিতীয়ত, মুসলমানদের প্রতি আমার অন্তর সর্বদা হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত ও নিষ্কপুষ্প ছিল।
তাবাকাতুল কুবরা ৪৫৭৭
৫. শাদ্দাদ ইবনে আউস (রাযি:) এক সফরে ছিলেন। তিনি এক জায়গায় অবতরণ করে তাঁর সেবককে বললেন: আমাদের দস্তরখান খাবারের সরঞ্জাম নিয়ে এসো, আমরা তা নিয়ে কিছুটা অনর্থক খেলাধূলা/বাজে সময় পার করি। বর্ণনাকারী বলেন: আমি তাঁর এই কথার বিরোধিতা করলাম (অসন্তোষ প্রকাশ করলাম)। তখন তিনি বললেন: আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে এই একটি কথা ছাড়া এমন কোনো বাক্য মুখ দিয়ে উচ্চারণ করিনি—যা বলবার আগে লাগাম ও রশি দিয়ে সংযত করিনি। সুতরাং আমার এই কথাটি তোমরা স্মরণ রেখো না। ইবনে হিব্বান ৯৩৫
সাহাবায়ে কেরামের লজ্জাশীলতা
১. আবু বকর সিদ্দিক (রাযি:)-এর লজ্জাশীলতা
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি:) একদিন মানুষকে উদ্দেশ্য করে খুতবা দিলেন এবং বললেন: হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহকে লজ্জা করো। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! আমি যখন খোলা মাঠে শৌচকার্য সম্পাদন করতে যাই, তখন আমার মহান প্রতিপালকের প্রতি লজ্জাবশত কাপড়ে মাথা ও মুখ ঢেকে রাখি।মাকারিমুল আখলাক ৯২
২. উসমান ইবনে আফফান (রাযি:)-এর লজ্জাশীলতা
হযরত উসমান (রাযি:) তীব্র লজ্জাশীলতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন, এমনকি ফেরেশতাগণও তাঁকে দেখে লজ্জা পেতেন। আয়েশা (রাযি:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে পায়ের নলা উন্মুক্ত রেখে শায়িত ছিলেন। এ অবস্থায় আবু বকর (রাযি:) ভেতরে আসার অনুমতি চাইলে তিনি তাকে সে অবস্থাতেই অনুমতি দিলেন এবং তাঁরা কথাবার্তা বললেন। এরপর ওমর (রাযি:) অনুমতি চাইলেন, তিনি তাকেও একই অবস্থায় অনুমতি দিলেন এবং তাঁরাও কথা বললেন। অতঃপর উসমান (রাযি:) অনুমতি চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোজা হয়ে বসলেন এবং নিজের পোশাক সঠিকভাবে ঠিক করে নিলেন। (বর্ণনাকারী মুহাম্মদ বলেন: আমি বলছি না যে এই ঘটনাটি একই দিনে ঘটেছিল)।
এরপর তিনি ভেতরে এসে কথা বললেন। তিনি বেরিয়ে গেলে আয়েশা (রাযি:) বললেন: আবু বকর এলেন আপনি বিশেষ কুণ্ঠা বা নড়াচড়া দেখালেন না, ওমর এলেন আপনি তার জন্যও বিশেষ পরোয়া করলেন না (অর্থাৎ স্বাভাবিক পোশাকেই রইলেন); কিন্তু উসমান আসার পর আপনি সোজা হয়ে বসলেন এবং আপনার পোশাক ঠিক করে নিলেন! জবাবে তিনি বললেন: আমি কি এমন একজন মানুষের প্রতি লজ্জাশীল হব না, যাকে দেখে ফেরেশতারাও লজ্জা পায়।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৪০১
৩. আয়েশা (রাযি:)-এর লজ্জাশীলতা:
হযরত আয়েশা (রাযি:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আমার যে ঘরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আমার পিতা (আবু বকর) দাফন হয়েছিলেন, সেখানে (স্বাভাবিকভাবে) প্রবেশ করতাম এবং আমার অতিরিক্ত চাদর/পোশাক খুলে রাখতাম। আমি মনে মনে বলতাম, এরা তো কেবল আমার স্বামী এবং আমার পিতা। কিন্তু যখন তাঁদের সাথে ওমর (রাযি:) দাফন হলেন, তখন আল্লাহর কসম! ওমর (রাযি:)-এর প্রতি লজ্জাবশত আমি পুরো শরীর ভালোভাবে কাপড়ে পেঁচিয়ে/ঢেকে রাখা ছাড়া কখনো সেই ঘরে প্রবেশ করিনি। মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৫৬৬২
৪. ফাতিমা বিনতে উতবা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর লজ্জাশীলতা:
হযরত আয়েশা (রাযি:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উতবা ইবনে রাবীআ'র কন্যা ফাতিমা (রাযি:) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বায়আত নিতে এলেন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করছিলেন যে, তারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না এবং ব্যভিচার করবে না... (সুরার শেষ পর্যন্ত পুরো আয়াতটি তিলওয়াত করলেন)। বর্ণনাকারী বলেন: তখন ফাতিমা লজ্জায় নিজের মাথায় হাত রাখলেন! তাঁর এই লজ্জা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুগ্ধ হলেন। তখন আয়েশা (রাযি:) বললেন: হে নারী! তুমি স্বীকার ও সম্মতি প্রকাশ করো, আল্লাহর কসম! আমরাও তো এই শর্তেই বায়আত হয়েছি। তখন তিনি বললেন: তবে তো ঠিক আছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াতের ভিত্তিতে তাঁর বায়আত গ্রহণ করলেন। মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ২৫২১৬
৫. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা ফাতিমা (রাযি:)-এর লজ্জাশীলতা
আব্দুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ্ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর ফাতিমা (রাযি:) ৭০ দিন-রাত জীবিত ছিলেন। তিনি (তাঁর মৃত্যুর পূর্বে) বললেন: আমি এই (সাধারণ) জানাজার খাটিয়ার ছিদ্র বা ফাঁকগুলোর কারণে সত্যিই লজ্জাবোধ করছি, যখন (মৃত্যুর পর) আমাকে তাতে বহন করা হবে! বর্ণনাকারী বলেন: তখন এক নারী আমি জানি না তিনি আসমা বিনতে উমাইস না কি উম্মে সালামা (রা.)—তাঁকে বললেন: আপনি চাইলে আমি আপনার জন্য এমন একটি বস্তু তৈরি করে দিতে পারি যা হাবশায় তৈরি করা হয় এবং যাতে নারীদের বহনের সময় পর্দা বজায় থাকে। তিনি বললেন: 'হ্যাঁ, তুমি তা তৈরি করো। অতঃপর তিনি (খাজুরের ডালপালা দিয়ে ঘেরা ছাউনিযুক্ত) খাটিয়া তৈরি করলেন। ফাতিমা (রাযি:) যখন তা দেখলেন, তখন বললেন: আল্লাহ তোমাকে ঢেকে রাখুন (পর্দায় রাখুন)। বর্ণনাকারী বলেন: এর পর থেকেই (মুসলিম সমাজে ছাউনিযুক্ত) খাটিয়া তৈরি করার প্রচলন চালু থাকে। আল-ওয়াসায়েল ইলা মারেফাতিল আওয়ায়িল ৩৮ পৃষ্ঠা
সাহাবায়ে কেরামের দয়া
১. ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি:)-এর দয়া
ইনি সেই ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি:), যিনি নিজের কঠোরতা ও শক্তি-সামর্থ্যের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। কিন্তু দয়া ও সহানুভূতি তাঁর স্বভাবকেও বদলে দিত; ফলে তিনি কোমল হৃদয়ের মানুষে পরিণত হতেন, তাঁর অন্তর দয়ায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠত এবং তাঁর হৃদয়ে স্নেহের ফলগুধারা প্রবাহিত হতো। এর একটি স্পষ্ট প্রমাণ হলো আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাযি:)-কে বলা তাঁর সেই কথাটি যখন তিনি ওমরের কাছে এসে অনুরোধ করেছিলেন যেন তিনি মানুষের সাথে কিছুটা কোমল আচরণ করেন; কারণ ওমরের ভয়ে সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি পর্দানশীন কুমারী মেয়েরাও তাদের অন্দরমহলে ভীত থাকত। তখন ওমর (রাযি:) বললেন: আল্লাহর কসম! তাঁদের (প্রজাদের সুশাসন ও শৃঙ্খলার) জন্য এই কঠোরতা ছাড়া আমি ভিন্ন কিছু উপযুক্ত দেখি না। কিন্তু আল্লাহর কসম! তারা যদি জানত যে আমার অন্তরে তাদের জন্য কতটা স্নেহ, দয়া ও সহানুভূতি জমা রয়েছে, তবে তারা ভালোবেসে আমার কাঁধ থেকে গায়ের চাদর টেনে খুলে নিয়ে যেত। তারিখে দিমাশক ৪৪/২৭০
একদা উয়ায়নাহ ইবনে হিসন ওমর (রাযি:)-কে তাঁর এক সন্তানকে কোলে নিয়ে স্নেহের সাথে চুম্বন করতে দেখলেন। তখন উয়ায়নাহ বললেন: আপনি আমিরুল মুমিনীন হওয়া সত্ত্বেও সন্তানকে চুম্বন করছেন? আমি যদি আমিরুল মুমিনীন হতাম, তবে কখনো আমার কোনো সন্তানকে চুম্বন করতাম না। ওমর (রাযি:) তখন বললেন: আল্লাহর কসম, আল্লাহর কসম, এভাবে তিনি তাঁকে তিনবার কসম দিতে বললেন। অতঃপর ওমর (রাযি:) বললেন: আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া কেড়ে নিয়ে থাকেন, তবে এতে আমার কী করার আছে? নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে কেবল দয়ালুদের ওপরই দয়া করেন।
আব্দুর রজ্জাক ২০৫৯০
একদিন তাঁর মাছ খাওয়ার চাহিদা হলো। তিনি বললেন: আমার মনে তাজা মাছ খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা জেগেছে। তখন (তাঁর সেবক) ইয়ারফা ওমর (রাযি:)-এর জন্য মাছের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন এবং তিনি তাঁর সওয়ারি প্রস্তুত করলেন। যাওয়ার পথে দু'রাত এবং আসার পথে দু'রাত মোট চার রাত সফর করলেন। অতঃপর তিনি এক ঝুড়ি মাছ কিনে আনলেন। তারপর ইয়ারফা সেই সওয়ারি পশুটিকে ধুইয়ে দিলেন। কিন্তু ওমর (রাযি:) পশুটির দিকে তাকিয়ে তার কানের নিচে ঘাম দেখতে পেলেন। তা দেখে তিনি বললেন: ওমরের এক বারের চাহিদাপূরণের জন্য তুমি আল্লাহর সৃষ্টি অবলা একটি পশুকে কষ্ট দিলে! না, আল্লাহর কসম! ওমর এ মাছের স্বাদ গ্রহণ করবে না। তুমি তোমার মাছের ঝুড়ি নিয়ে যাও (গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দাও বা যা খুশি করো)। তারিখে দিমাশক ৪৪/৩০১
২. আবু বারযাহ্ আসলামী (রাযি:)-এর দয়া
হযরত আবু বারযাহ্ আসলামী (রাযি:) তাঁর দয়া ও সহানুভূতির নিদর্শন ছিল যে, বিধবা, এতিম ও মিসকিনদের জন্য তাঁর ঘরে প্রতিদিন সকালে এক পেয়ালা এবং সন্ধ্যায় এক পেয়ালা সারীদ (গোশতের ঝোলে ভেজানো রুটির সুস্বাদু খাবার) প্রস্তুত থাকত।
সাহাবায়ে কেরামের কৃজ্ঞতা
১. হযরত আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় এলেন তখন মুহাজিরগণ তাঁর কাছে এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা যে জাতির কাছে এসেছি তাদের মত প্রাচুর্যের অবস্থায় এবং অপ্রাচুর্যের অবস্থায় (আল্লাহর পথে) এত ব্যয় করতে এবং এত উত্তম সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে আর কাউকে আমরা দেখিনি। তারা আমাদের সকল প্রয়োজনে যথেষ্ট ছিলেন এবং তাদের শ্রমলব্ধ সম্পদে আমাদের অংশীদার বানিয়েছেন। এমনকি আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে যে সব সাওয়াব তারাই নিয়ে যাবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ শোন যতদিন তোমরা তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করবে এবং তাদের প্রশংসা করবে (ততদিন তোমাদেরও সাওয়াব হতে থাকবে)।
২. হযরত আনাস (রাযি:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাযি:) মদিনায় হিজরত করে এলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এবং আনসারী সাহাবি সাদ ইবনুর রাবী (রা.)-এর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক গড়ে দিলেন। সাদ (রাযি:) ছিলেন ধনী ব্যক্তি। তাই তিনি আব্দুর রহমান (রাযি:)-কে বললেন: আমি আমার ধন-সম্পদ দুই ভাগ করে অর্ধেক আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি এবং আমার স্ত্রীর মধ্য থেকে একজনকে তালাক দিয়ে আপনাকে বিয়ে করিয়ে দিচ্ছি। আব্দুর রহমান (রাযি:) বললেন: আল্লাহ আপনার পরিবারে ও সম্পদে বরকত দান করুন! আমাকে বরং আপনারা বাজারের পথ দেখিয়ে দিন (আমি ব্যবসা করে জীবিকা অর্জন করব)।
সাহাবায়ে কেরামের ধৈর্য
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের শিক্ষা দিয়েছেন কীভাবে নানা রকম পরিস্থিতি ও ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করতে হয়। তিনি তাঁদের এই দ্বীনের জন্য ধৈর্য ধারণ করা এবং তাঁর পথে আত্মত্যাগ করার শিক্ষা দিয়েছেন।
আর সাহাবি (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-দের এমন অগণিত প্রেক্ষাপট ও দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা কেউ গণনা করে শেষ করতে পারবে না। কারণ তাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে নিজেদের জীবন, ধন-সম্পদ ও প্রাণকে আল্লাহর রাহেই বিলিয়ে (বিক্রি করে) দিয়েছিলেন। ফলে তাঁরা দুনিয়া ও আখেরাতের চরম সৌভাগ্য ও সফলতা অর্জন করেছেন।
১. বিলাল (রাযি:)-কে নির্যাতন করা হতো, আর তিনি ধৈর্য ধারণ করতেন
বিলাল (রাযি:) নিজ ঈমানের কারণে তাঁকে চরম নির্যাতন করা হতো, আর তিনি অটল ধৈর্য ধারণ করতেন। (উমাইয়া ইবনে খালাফ দ্বিপ্রহরের খরতাপ যখন তীব্র রূপ নিত, তখন তাঁকে বের করে মক্কার উত্তপ্ত প্রান্তর ও কংকরময় ভূমিতে চিত করে শুইয়ে দিত। অতঃপর সে নির্দেশ দিত একটি বিশাল ভারী পাথর এনে তাঁর বুকের ওপর রাখার জন্য। এরপর সে তাঁকে বলত: তোর এই অবস্থাই চলতে থাকবে যতক্ষণ না তুই মারা যাস, অথবা মুহাম্মাদের সাথে কুফরি করিস এবং লাত ও উজ্জা দেবীর উপাসনা করিস! কিন্তু তিনি এই নির্মম নির্যাতনের মধ্যেও কেবল বলতে থাকতেন: 'আহাদ, আহাদ' [আল্লাহ এক, আল্লাহ এক])। হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া ১/১৪৮
সাহাবায়ে কেরামের সততা
১. আবু জার (রাযি:) সততা
হযরত আবু জার (রাযি:) ছিলেন অত্যন্ত সত্যভাষী। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: (আকাশের নিচে ও পৃথিবীর উপরে আবু জারের চেয়ে অধিক সত্যভাষী আর কোনো লোক নেই।) সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস নং: ১৫৬
২. কা‘ব ইবনে মালিক (রাযি.)-এর সত্যবাদিতা ও সততার মাধ্যমে মুক্তি লাভের ঘটনা আমাদের সকলেরই জানা। দেখুন:-
৩. বিলালের (রাযি:) সততা
বিলাল (রাযি:) তাঁর ভাইয়ের জন্য কুরাইশ গোত্রের বনু হিসল শাখা থেকে এক মহিলার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন: আমরা কারা, তা আপনারা চেনেন ও জানেন। আমরা দাস ছিলাম, আল্লাহ আমাদের মুক্ত করেছেন; আমরা পথভ্রষ্ট ছিলাম, আল্লাহ আমাদের হেদায়াত দিয়েছেন; এবং আমরা নিঃস্ব ছিলাম, আল্লাহ আমাদের স্বাবলম্বী করেছেন। আমি আমার ভাই খালিদের জন্য অমুক মহিলার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। যদি আপনারা তাঁর কাছে বিয়ে দেন, তবে 'আলহামদুলিল্লাহ' আর যদি ফিরিয়ে দেন, তবে 'আল্লাহু আকবার'।
তখন তাঁরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বললেন: উনি তো বিলাল! তাঁর মতো লোককে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। ফলে তাঁরা তাঁর ভাইয়ের কাছে মেয়েটিকে বিয়ে দিলেন।
সেখান থেকে ফেরার পর খালিদ বিলালকে বললেন: আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন! আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আমাদের পূর্বের ত্যাগ ও যুদ্ধ-অভিযানের অবদানগুলোর কথা কেন উল্লেখ করলেন না? বিলাল (রাযি:) বললেন: থামো! আমি সত্য বলেছি, আর এই সততাই তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আত-তাবাকাতুল কাবীর ৩/২১৮
সাহাবায়ে কেরামের ইনসাফ ও ন্যায়বিচার
১. আসেম ইবনে কুলাইব তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আলী (রাযি:) বায়তুল মালে (সরকারি কোষাগারে) যা কিছু ছিল, তা সাত ভাগে ভাগ করলেন। এরপর তিনি একটি রুটি পেলেন, সেটিও ভেঙে সাতটি টুকরো করলেন। অতঃপর তিনি সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের ডাকলেন এবং তাঁদের মধ্যে লটারি করলেন। হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া ৭/৩০০
২. আলী ইবনে রাবিয়াহ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আলী (রাযি:)-এর দুজন স্ত্রী ছিলেন। যখন তিনি তাঁদের একজনের ঘরে থাকার দিনে গোশত কিনতেন, তখন আধা দিরহামের কিনতেন; আর যখন অপরজনের ঘরে থাকার দিন হতো, তখনও আধা দিরহামের গোশত কিনতেন।
আন-নাফাকাতু আলাল-‘ইয়ালি (ইবনি আবী দুনইয়া) ২/৭০২
৩. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: মুআজ ইবনে জাবাল (রাযি:)-এর দুজন স্ত্রী ছিলেন। যখন তিনি তাঁদের একজনের ঘরে অবস্থানের দিনে থাকতেন, তখন অপরজনের ঘর থেকে অজুও করতেন না (এমনকি এক গ্লাস পানিও পান করতেন না)। তিনি (ইয়াহইয়া) বলেন: অতঃপর মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে একই দিনে তাঁর উভয় স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। তখন তিনি তাঁদের কবরের কাছে নিয়ে গেলেন এবং তাঁদের মধ্যে লটারি করলেন—কোন স্ত্রীকে অপরজনের আগে কবরে নামাবেন? এরপর তিনি একই কবরে তাঁদের দুজনকেই দাফন করলেন।
আন-নাফাকাতু আলাল-‘ইয়ালি (ইবনি আবী দুনইয়া) ২/৭০২
সাহাবায়ে কেরামের আত্মসংযম
১. হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন, আবূ বকর সিদ্দীক (রাযি.)-এর একজন গোলাম ছিল। সে তাঁকে নিজ উপার্জন থেকে নির্ধারিত পরিমাণ প্রদান করত। তিনি তার প্রদত্ত সে উপার্জন থেকে খেতেন। একদিন সে একটা জিনিস নিয়ে আসল। তিনি তা থেকে খেলেন। গোলাম বলল, আপনি জানেন এটা কী? আবু বকর রাযি. বললেন, কী এটা? সে বলল, আমি জাহিলী যুগে এক ব্যক্তির ভাগ্যগণনা করেছিলাম। আমি ভাগ্যগণনা ভালো জানতাম না। আমি কেবল তাকে ধোঁকাই দিয়েছিলাম। সে ইদানীং আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার বিনিময়ে এই জিনিসটি আমাকে দিয়েছে, যা থেকে আপনি খেলেন। ফলে আবু বকর রাযি. মুখে হাত ঢুকিয়ে দিলেন এবং পেটে যা-কিছু ছিল তা সব বমি করে দিলেন।
২. হাকীম ইবনে হিযাম (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট কিছু চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন, আবার চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন, আবার চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন। তারপর বললেনঃ হে হাকীম, এই সম্পদ শ্যামল সুস্বাদু। যে ব্যক্তি প্রশস্ত অন্তরে (লোভ ছাড়া) তা গ্রহণ করে, তার জন্য তা বরকতময় হয়। আর যে ব্যক্তি অন্তরের লোভসহ তা গ্রহণ করে, তার জন্য তা বরকতময় করা হয় না। যেন সে এমন ব্যক্তির মত, যে খায় কিন্তু তার ক্ষুধা মেটেনা। উপরের হাত নীচের হাত থেকে উত্তম। হাকীম (রাযিঃ) বলেন, আমি বললাম, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তাঁর কসম! ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার পর মৃত্যু পর্যন্ত (সওয়াল করে) আমি কাউকে সামান্যতমও ক্ষতিগ্রস্ত করব না।
এরপর আবু বকর (রাযিঃ) হাকীম (রাযিঃ) কে অনুদান গ্রহণের জন্য ডাকতেন, কিন্তু তিনি তাঁর কাছ থেকে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন। তারপর উমর (রাযিঃ) তাঁর যুগে তাঁকে কিছু দেওয়ার জন্য ডাকলেন। তিনি তাঁর কাছ থেকেও কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। উমর (রাযিঃ) বললেন, মুমিনগণ! হাকীম (রাযিঃ) এর ব্যাপারে আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি। আমি তাঁর কাছে এই গনিমত থেকে তাঁর প্রাপ্য পেশ করেছি, কিন্তু সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পর হাকীম (রাযিঃ) মৃত্যু পর্যন্ত কারো নিকট কিছু চেয়ে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করেন নি।
সাহাবায়ে কেরামের ক্ষমা ও উদারতা
১. আবু বকর (রাযি:)-এর ক্ষমা
মিস্তাহ ইবনে উসাসার প্রতি তাঁর ক্ষমা:
মিস্তাহ ইবনে উসাসাহ (রাযি:) তাঁদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যাঁরা ইফকের ঘটনায় (আম্মাজান আয়েশা রা.-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদে) জড়িয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ যখন আয়েশা (রাযি:)-এর নির্দোষিতার ঘোষণা নাজিল করলেন, (তখন আবু বকর সিদ্দীক (রাযি:) যিনি আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে মিস্তাহ ইবনে উসাসার পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করতেন, তিনি) বললেন: আল্লাহর কসম! আয়েশার সম্পর্কে সে যা বলেছে, এরপর আমি মিস্তাহর পেছনে আর কখনোই কোনো অর্থ খরচ করব না।
তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করলেন:
وَلَا یَاۡتَلِ اُولُوا الۡفَضۡلِ مِنۡکُمۡ وَالسَّعَۃِ اَنۡ یُّؤۡتُوۡۤا اُولِی الۡقُرۡبٰی وَالۡمَسٰکِیۡنَ وَالۡمُہٰجِرِیۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۪ۖ وَلۡیَعۡفُوۡا وَلۡیَصۡفَحُوۡا ؕ اَلَا تُحِبُّوۡنَ اَنۡ یَّغۡفِرَ اللّٰہُ لَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদাবান ও বিত্তশালী, তারা যেন আত্মীয়স্বজনকে দান না করার শপথ না নেয়... আল্লাহ কি তোমাদের ক্ষমা করুন—তা তোমরা পছন্দ করো না? আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আন-নূর: ২২)
এ আয়াত শুনে আবু বকর (রাযি:) বললেন: হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই চাই যে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। এরপর তিনি মিস্তাহর জন্য যে নিয়মিত আর্থিক ভাতা দিতেন, তা পুনরায় চালু করে দিলেন এবং বললেন: আল্লাহর কসম! আমি এটি তাঁর কাছ থেকে আর কখনোই বন্ধ করব না।
২. উমর (রাযি:)-এর ক্ষমা
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, উয়াইনা ইবনে হিসন ইবনে হুযাইফা এসে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র হুর ইবনে কায়সের কাছে অবস্থান করলেন। উমর (রাযিঃ) যাদেরকে পার্শ্বে রাখতেন হুর হলেন তাদের মধ্যে একজন। কারীবৃন্দ, যুবক-বৃদ্ধ সকলেই উমর ফারূক (রাযিঃ) এর মজলিসের সদস্য এবং উপদেষ্টা ছিলেন। এরপর উয়াইনা তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রকে ডেকে বললেন, এই আমীরের কাছে তো তোমার একটা মর্যাদা আছে, সুতরাং তুমি আমার জন্য তাঁর কাছে প্রবেশের একটা অনুমতি নিয়ে দাও। তিনি বললেন হ্যাঁ, তাঁর কাছে আমি আপনার প্রবেশের প্রার্থনা করব।
ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, এরপর হুর অনুমতি প্রার্থনা করলেন ‘উয়াইনার জন্য এবং উমর (রাযিঃ) অনুমতি দিলেন। উয়াইনা উমরের কাছে গিয়ে বললেন, হ্যাঁ আপনি তো আমাদেরকে বেশী বেশী দানও করেন না এবং আমাদের মাঝে ন্যায় বিচারও করেন না। উমর (রাযিঃ) ক্রোধান্বিত হলেন এবং তাকে কিছু একটা করাতে উদ্যত হলেন। তখন হুর বললেন, আমিরুল মু’মিনীন! আল্লাহ তাআলা তো তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলেছেন, ‘‘ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর’ সৎ কাজের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদেরকে উপেক্ষা কর’’ (সূরা আরাফ, আয়াত নং: ১৯৯) আর এই ব্যক্তি তো নিঃসন্দেহে অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত। (হুর যখন তাঁর নিকট এটা তিলাওয়াত করলেন তখন) আল্লাহর কসম তখন উমর (রাযিঃ) আয়াতের অমান্য করেননি। উমর আল্লাহর কিতাবের বিধানের সামনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতেন, অর্থাৎ তা অতিক্রম করতেন না।
৩. ইবনে মাসউদ (রাযি:)-এর ক্ষমা
হযরত ইবনে মাসউদ (রাযি:) বাজারে খাবার কেনার জন্য বসলেন এবং কেনাকাটা শেষ করলেন। এরপর তিনি দিরহাম বের করতে চাইলেন, যা তাঁর পাগড়ির মধ্যে বাঁধা ছিল। কিন্তু তিনি দেখলেন যে সেটি খোলা এবং টাকা চুরি হয়ে গেছে! তিনি বললেন: আমি যখন বসেছিলাম, তখনো তো টাকাটা আমার সাথেই ছিল।
তখন উপস্থিত লোকেরা চোরের বিরুদ্ধে বদদোয়া দিতে শুরু করল এবং বলতে লাগল: হে আল্লাহ! যে চোর এটি নিয়েছে তার হাত কেটে দাও! হে আল্লাহ! তার সাথে এমন এমন করো!
তখন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি:) বললেন: হে আল্লাহ! যদি অভাব বা প্রয়োজন তাকে এটি নিতে বাধ্য করে থাকে, তবে আপনি এতে তাকে বরকত দিন! আর যদি গোনাহের প্রতি দুঃসাহস তাকে এটি নিতে বাধ্য করে থাকে, তবে এটিকে তার জীবনের শেষ গোনাহ বানিয়ে দিন। ইহইয়াউ উলুমুদ্দীন ৩/১৮৪
৪. হুসাইন ইবনে আলী (রাযি:)-এর ক্ষমা
হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাযি:) বলেন: যদি কোনো ব্যক্তি আমার এই কানে গালি দেয় এবং আমার অপর কানে এসে ওজর পেশ করে ক্ষমা চায়, তবে আমি তার ওজর গ্রহণ করে নেব।
আল-আসামী ওয়াল-কুনা ৫/৮৯
৫. ইবনে আব্বাস (রাযি:)-এর ক্ষমা
এক ব্যক্তি উম্মতের বিজ্ঞ আলেম ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-কে গালি দিল। লোকটি তার কথা শেষ করলে তিনি বললেন: "হে ইকরিমা! দেখো তো এই লোকটির কোনো প্রয়োজন আছে কি না, আমরা তা পূরণ করে দেব।" তা শুনে লোকটি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। ইহইয়াউ উলুমুদ্দীন ৮/৩২
সাহাবায়ে কেরামের (গাইরাত) আত্মমর্যাদাবোধ
সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মান ও সুরক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আত্মমর্যাদাবান ছিলেন। তাঁরা তাঁর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য ও তাঁকে সাহায্য-সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ও বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাঁদের এই সংবেদনশীলতা ও আত্মমর্যাদাবোধের কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. উমর ইবনে খত্তাব (রাযি:)-এর গাইরাত
আবু সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত ছিলাম। তিনি কিছু গণীমতের মাল বন্টন করছিলেন। তখন বানু তামীম গোত্রের জুলখোয়াইসিরাহ নামে এক ব্যক্তি এসে হাযির হল এবং বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বন্টনে ইনসাফ করুন। তিনি বললেন, তোমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি ইনসাফ না করি, তবে ইনসাফ করবে কে? আমি তো নিষ্ফল ও ক্ষতিগ্রস্ত হব যদি আমি ইনসাফ না করি। উমর (রাযিঃ) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাকে অনুমতি দিন আমি এর গর্দান উড়িয়ে দেই। তিনি বললেন, একে যেতে দাও। তার এমন কিছু সঙ্গী সাথী রয়েছে তোমাদের কেউ তাদের নামাযের তুলনায় নিজের নামায এবং রোযা তুচ্ছ বলে মনে করবে। এরা কুরআন পাঠ করে, কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালীর নিম্নদেশে প্রবেশ করে না। তারা দ্বীন থেকে এমন ভাবে (দ্রুত) বেরিয়ে যাবে যেমন তীর ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়।
তীরের অগ্রভাগের লোহা দেখা যাবে কিন্তু (শিকারের) কোন চিহ্ন পাওয়া যাবে না। কাঠের অংশটুকু দেখলে তাতেও কিছু পাওয়া যাবে না। মধ্যবর্তী অংশটুকু দেখলে তাতেও কিছু পাওয়া যাবে না। তার পালক দেখলে তাতেও কোন চিহ্ন পাওয়া যায় না। অথচ তীরটি শিকারী জন্তুর নাড়িভুঁড়ি ভেদ করে রক্তমাংস অতিক্রম করে বেরিয়ে গেছে। এদের নিদর্শন হল এমন একটি কাল মানুষ যার একটি বাহু মেয়ে লোকের স্তনের ন্যায় অথবা গোশত টুকরার ন্যায় নড়াচড়া করবে। তারা লোকদের মধ্যে বিরোধ কালে আত্মপ্রকাশ করবে। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩৬১০
হযরত আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সময় আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বসা ছিলাম। তখন তিনি বললেন, আমি নিদ্রিত ছিলাম। দেখলাম আমি জান্নাতে অবস্থিত। হঠাৎ দেখলাম এক মহিলা একটি প্রাসাদের পাশে উযু করছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ প্রাসাদটি কার? তারা উত্তরে বললেন, উমরের। তখন তাঁর (উমরের) আত্মমর্যাদাবোধের কথা আমার স্মরণ হল। আমি পেছনের দিকে ফিরে চলে আসলাম। এ কথা শুনে উমর (রাযিঃ) কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার সম্মুখে কি আমার মর্যাদাবোধ থাকতে পারে? সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩২৪২
২. আয়েশা (রাযি:)-এর গাইরাত
হযরত আয়িশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন একদল ইয়াহুদী রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে (সাক্ষাতের) অনুমতি চাইল। তারা তখন বলল, السَّامُ عَلَيْكُمْ (তোমাদের মরণ হোক)! তখন আয়িশা (রাযিঃ) বললেন, بلْ عَلَيْكُمُ السَّامُ وَاللَّعْنَةُ (বরং তোমাদের উপরে মরণ ও অভিশাপ বর্ষিত হোক)! তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা! আল্লাহ তাআলা সব বিষয়ে উদারতা পছন্দ করেন। আয়েশা (রাযিঃ) বললেন, আপনি কি তাদের উক্তি শোনেন নি? তিনি বললেন, আমিও তো বলে দিয়েছি “ওয়া আলাইকুম” (তোমাদের উপরেও)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট থেকে বের হলেন। তিনি বলেন, এতে আমার মনে কিছুটা ঈর্ষা জাগল। অতঃপর তিনি এসে আমার অবস্থা দেখে বললেন, হে আয়েশা! তোমার কি হয়েছে? তুমি কি ঈর্ষা পোষণ করছ? উত্তরে আমি বললাম, আমার মত মহিলা আপনার মত স্বামীর প্রতি কেন ঈর্ষা করবেনা। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার শয়তান কি তোমার নিকট এসে উপস্থিত হয়েছে? তখন তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার সাথেও কি শয়তান রয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ নিশ্চয়ই। অতঃপর আমি বললাম, প্রত্যেক মানুষের সাথেই কি শয়তান রয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার সাথেও কি রয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমার সাথেও। তবে আল্লাহ তাআলা তার মুকাবিলায় আমাকে সহযোগিতা করেছেন। এখন তার ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৮১৫
৩. ইবনে উমর (রাযি:)-এর গাইরাত
হযরত ইবনে উমর (রাযি:) এক খ্রিস্টান পাদরির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন বলা হলো: এই লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দিয়েছে। তা শুনে তিনি বললেন: আমি যদি নিজে তা শুনতাম, তবে তার গর্দান উড়িয়ে দিতাম! আমরা তাদের এই শর্তে নিরাপত্তা (জিযিয়ার চুক্তি) দিইনি যে তারা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেবে।
رواه الحارث في المسند
৪. সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাযি:)-এর গাইরাত
সা’দ ইবনে উবাদাহ (রাযি:) বলেন: আমি যদি আমার স্ত্রীর সাথে কোনো পরপুরুষকে দেখতে পাই, তবে আমি তলোয়ারের ভোঁতা পাশ নয়, বরংধারালো পাশ দিয়ে তাকে আঘাত করব (শিরচ্ছেদ করব)। এ কথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছালে তিনি বললেন: তোমরা কি সা’দের আত্মমর্যাদাবোধ দেখে আশ্চর্য হচ্ছ? আল্লাহর কসম! আমি তার চেয়েও বেশি আত্মমর্যাদাবান, আর আল্লাহ আমার চেয়েও বেশি আত্মমর্যাদাবান। আর আল্লাহর এই চরম আত্মমর্যাদাবোধের কারণেই তিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল অশ্লীল কাজকে হারাম করেছেন।
সাহাবায়ে কেরামের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ
১. আবু বকর (রাযি.)-এর ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ
হযরত আবু বারযা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি আবু বকর (রাযিঃ)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি কোন এক ব্যক্তির প্রতি খুবই রাগান্বিত হলে, আমি তাকে বলিঃ হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা। আপনি আমাকে তার হত্যার অনুমতি দিন। আমার এ কথা শুনে তার ক্রোধ প্রশমিত হয় এবং তিনি উঠে তার গৃহে চলে যান।
এরপর তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেনঃ তুমি কি বলেছিলে? তখন আমি বলিঃ আমি আপনার কাছে ঐ ব্যক্তির মস্তক দ্বিখণ্ডিত করার অনুমতি চেয়েছিলাম। তিনি বলেনঃ যদি আমি তোমাকে এরূপ অনুমতি দিতাম, তবে কি তুমি তাকে হত্যা করতে? তখন আমি বলিঃ নিশ্চয়ই। তিনি বলেনঃ আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর, আর কোন ব্যক্তির জন্য এরূপ করার অধিকার নেই।
সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৪৩৬৩
২. ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, উয়াইনা ইবনে হিসন ইবনে হুযাইফা এসে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র হুর ইবনে কায়সের কাছে অবস্থান করলেন। উমর (রাযিঃ) যাদেরকে পার্শ্বে রাখতেন হুর হলেন তাদের মধ্যে একজন। কারীবৃন্দ, যুবক-বৃদ্ধ সকলেই উমর ফারূক (রাযিঃ) এর মজলিসের সদস্য এবং উপদেষ্টা ছিলেন। এরপর উয়াইনা তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রকে ডেকে বললেন, এই আমীরের কাছে তো তোমার একটা মর্যাদা আছে, সুতরাং তুমি আমার জন্য তাঁর কাছে প্রবেশের একটা অনুমতি নিয়ে দাও। তিনি বললেন হ্যাঁ, তাঁর কাছে আমি আপনার প্রবেশের প্রার্থনা করব।
ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, এরপর হুর অনুমতি প্রার্থনা করলেন ‘উয়াইনার জন্য এবং উমর (রাযিঃ) অনুমতি দিলেন। উয়াইনা উমরের কাছে গিয়ে বললেন, হ্যাঁ আপনি তো আমাদেরকে বেশী বেশী দানও করেন না এবং আমাদের মাঝে ন্যায় বিচারও করেন না। উমর (রাযিঃ) ক্রোধান্বিত হলেন এবং তাকে কিছু একটা করাতে উদ্যত হলেন। তখন হুর বললেন, আমিরুল মু’মিনীন! আল্লাহ তাআলা তো তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলেছেন, ‘‘ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর’ সৎ কাজের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদেরকে উপেক্ষা কর’’ আর এই ব্যক্তি তো নিঃসন্দেহে অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত। (হুর যখন তাঁর নিকট এটা তিলাওয়াত করলেন তখন) আল্লাহর কসম তখন উমর (রাযিঃ) আয়াতের অমান্য করেননি। উমর আল্লাহর কিতাবের বিধানের সামনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতেন, অর্থাৎ তা অতিক্রম করতেন না।
সাহাবায়ে কেরামের রসিকতা
১. কাতাদাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ইবনে উমর (রাযি:)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিগণ কি হাসাহাসি করতেন? তিনি বললেন: 'হ্যাঁ, তাঁরা হাসতেন অথচ তাঁদের অন্তরে ঈমান ছিল পাহাড়ের চেয়েও সুবিশাল ও সুদৃঢ়।
أخرجه معمر في الجامع
২. বাকর ইবনে আব্দুল্লাহ (রহঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ একে অপরের প্রতি তরমুজ নিক্ষেপ করেও রসিকতা করতেন। কিন্তু তারা কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হলে যোগ্য পুরুষই প্রতিপন্ন হতেন।
আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং: ২৬৫
৩. বিলাল ইবনে সা’দ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি সাহাবিদের দেখেছি, তারা (তিরন্দাজি ও খেলাধুলার সময়) লক্ষ্যবস্তুগুলোর মাঝে দৌড়াদৌড়ি করতেন এবং একে অপরের সাথে হাসাহাসি করতেন। কিন্তু যখন রাত হতো, তখন তারা ইবাদতে নিমগ্ন হতেন। আয্-যুহদ (ইবনে মুবারক) ১৪৪
৩. উসায়দ ইবনে হুযায়র (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি একজন আনসার সাহাবী ছিলেন, একদিন তিনি লোকদের সাথে হাস্য-কৌতুকরত থেকে তাদের হাসাচ্ছিলেন। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পেটে কাঠ দিয়ে গুতা দেন। তখন উসায়দ (রাযিঃ) বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে এর প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ দেন। তখন তিনি বলেনঃ আচ্ছা, তুমি প্রতিশোধ নিয়ে নেও। উসায়দ (রাযিঃ) বলেনঃ আপনি তো জামা গায়ে দিয়ে আছেন, আমার গায়ে তো জামা ছিল না। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জামা উপরে উঠালে, উসায়দ (রাযিঃ) তাঁর পার্শ্ব দেশে চুমা দিতে থাকে এবং বলেঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটাই আমার উদ্দেশ্য ছিল।
সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৫২২৪
৪. উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি:) থেকে বর্ণিত: এক ব্যক্তি ছিল যার লকব বা ডাকনাম ছিল 'হিমার'। সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘিয়ের পাত্র ও মধুর পাত্র হাদিয়া দিত। পরবর্তীতে যখন পাওনাদার এসে তার কাছে টাকা তাগাদা দিত, তখন সে তাকে সাথে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে চলে আসত এবং বলত: হে আল্লাহর রাসুল! এই লোককে তার পণ্যের দাম দিয়ে দিন! এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসা ছাড়া আর কিছুই করতেন না এবং তার জন্য পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দিতেন; ফলে তাকে তা দিয়ে দেওয়া হতো।
আবু মুসনাদে আবু ইয়ালা ১৭৬
৫. উমর ইবনে খাত্তাব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যমানায় এক ব্যক্তি যার নাম ছিল আব্দুল্লাহ আর লকব ছিল হিমার। এ লোকটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হাঁসাত…….। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬৭৮০
সাহাবায়ে কেরামের পরিচ্ছন্নতা
১. হযরত আবু আইয়্যুব আনছারী (রাযিঃ), হযরত জাবের (রাযিঃ) ও হযরত আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন এ আয়াতটি নাযিল হলাে : "فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يحب المطهرين " তথায় (মসজিদে কুবায়) এরূপ লোকগণ রয়েছে, যারা পবিত্রতা অর্জন করা ভালবাসে এবং আল্লাহ্ পাক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালবাসেন।” তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আনসারগণ! আল্লাহ্ পাক তোমাদের পবিত্রতা অর্জনের গুণ বর্ণনা করেছেন। তোমাদের পবিত্রতা কি? তারা বললেন, আমরা নামাযের জন্য অজু করি। অপবিত্রতা হতে গোসল করি এবং পানি দ্বারা ইস্তেঞ্জা করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ কারণেই আল্লাহ্ পাক তোমাদের প্রশংসা করেছেন। অতএব তোমরা সর্বদা এই রীতি বজায় রাখবে।
মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং: ৩৬৯
২. নিজের ঘরের পরিচ্ছন্নতার প্রতি ইবনে মাসউদ (রাযি:)-এর তীব্র অনুরাগ
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি:)-এর এক উম্মে ওয়ালাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আবদুল্লাহ (রাযি:) তাঁর ঘর ঝাড়ু দেওয়ার নির্দেশ দিতেন (এবং এমনভাবে পরিষ্কার করা হতো যে), এমনকি যদি আপনি ঘরের মধ্যে একটি খড়ের টুকরো বা নলের টুকরোও খুঁজতেন, তবুও তা খুঁজে পেতেন না। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং: ২৫৯২১
৩. জুমুআ ও ঈদের দিনে গোসল করা এবং সর্বোত্তম পোশাক পরিধানের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতার প্রতি ইবনে উমর (রাযি:)-এর তীব্র অনুরাগের দৃষ্টান্ত
নাফে (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ইবনে উমর (রাযি:) জুমার দিনের জন্য গোসল করতেন যেমনটি তিনি অপবিত্রতার (জানাবাত) পর গোসল করতেন। আর তিনি তাঁর সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন, অতঃপর ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে/মসজিদে আসতেন।
মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং: ৫৫৯৩
৪. স্ত্রীর জন্য সাজসজ্জা ও পরিপাটি থাকার প্রতি ইবনে আব্বাস (রাযি:)-এর অনুরাগের দৃষ্টান্ত
ইবনে আব্বাস (রাযি:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আমার স্ত্রীর জন্য সাজসজ্জা করা ও পরিপাটি থাকা পছন্দ করি, ঠিক যেমনটি পছন্দ করি যে আমার স্ত্রী আমার জন্য সাজসজ্জা করুক। কারণ আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেছেন: আর স্ত্রীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের প্রতি (স্বামীদের) অধিকার রয়েছে। (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)।
মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং: ১৯৬০৮
৫. উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি:) এবং রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ
ইবনে সিরীন (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যখন আবু মুসা আল-আশআরি (রাযি:) বসরায় আসলেন, তখন তিনি লোকজনকে বললেন: আমিরুল মুমিনীন (উমর রা.) আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন তোমাদেরকে তোমাদের নবীর সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়ার জন্য এবং তোমাদের রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দেওয়ার জন্য।
মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং: ২৫৯২৩
সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুমের মহান চরিত্র ও উত্তম আখলাকের সামান্য কিছু দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরা হলো। তাঁদের জীবনে উত্তম চরিত্র, আদব, বিনয়, তাকওয়া, সত্যবাদিতা, ত্যাগ ও পরোপকারের অসংখ্য অনুপম দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। সেসবের সবগুলো তুলে ধরতে গেলে প্রবন্ধটি অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাই সংক্ষেপে কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেই এ আলোচনা সমাপ্ত করা হলো।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ইসলামই পৃথিবীর ভবিষ্যত
...
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ
...
মূর্তি ও ভাস্কর্যপ্রীতি : ইসলাম কী বলে?
ইসলামের যে বিষয়গুলোর নিষিদ্ধতা অকাট্য ও মুতাওয়াতিরভাবে প্রমাণিত তার মধ্যে প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণ ...
শান্তি সম্প্রীতি ও উদারতার ধর্ম ইসলাম
নামে যার শান্তির আশ্বাস তার ব্যাপারে আর যাই হোক, সন্ত্রাসের অপবাদ দেয়ার আগে তার স্বরূপ উদঘাটনে দু'দণ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন