প্রবন্ধ
ইসলামে এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী ﷺ
১৮ জুলাই, ২০২৬
৮১
০
এতিমদের প্রতি বিশ্বনবী ﷺ-এর অপরিসীম মমতা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজীবনকে উচ্চ আদর্শ ও মহান চারিত্রিক গুণাবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছেন, যার ভিত্তি হবে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ। তাঁর শিক্ষা মানুষের বিচ্ছিন্ন শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক কল্যাণের এক সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করে।
তিনি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, একজন মুমিনের সঙ্গে অন্য মুমিনের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত। এ সম্পর্ককে তিনি এমন একটি সুসংহত ও মজবুত ইমারতের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যার প্রতিটি অংশ অপর অংশকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং শক্তিশালী করে। তিনি বলেছেন—
المؤمن للمؤمن كالبنيان يشد بعضه بعضا
"একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য একটি সুদৃঢ় ভবনের ন্যায়; যার এক অংশ অপর অংশকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে।"
অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহানুভূতির চিত্র আরও গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন—
إن المؤمن من أهل الإيمان بمنزلة الرأس من الجسد ، يألم المؤمن لأهل الإيمان ، كما يألم الجسد لما في الرأس
ঈমানদার ব্যক্তি অন্য ঈমানদারদের জন্য দেহের মাথার মতো। মাথায় ব্যথা হলে যেমন সমগ্র দেহ কষ্ট অনুভব করে, তেমনি একজন মুমিনও অন্য মুমিনের কষ্টে ব্যথিত হয়।
অতএব, ইসলামী ভ্রাতৃত্বের দাবি হলো….সমাজের সচ্ছল ব্যক্তি অভাবগ্রস্তের পাশে দাঁড়াবে। আর এতিমত্বের চেয়ে বড় অসহায়ত্ব আর কী হতে পারে? এতিম হলো দুর্বলতা, অভাব এবং সহযোগিতা, দয়া ও স্নেহের প্রয়োজনের এক জীবন্ত প্রতীক।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বপ্রথম সেই মহান ব্যক্তি, যিনি এতিমের হৃদয়ের ব্যথা ও বেদনা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি এতিমদের লালন-পালন, শিক্ষা, সুষ্ঠু আচরণ এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের নিশ্চয়তার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে তারা সমাজের কল্যাণকর সদস্য হিসেবে গড়ে ওঠে এবং কখনো নিজেদের অন্যদের তুলনায় হীন বা অবহেলিত মনে না করে; অন্যথায় তারা ভেঙে পড়ে সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
এই উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে এতিমের দায়িত্ব গ্রহণে উৎসাহিত করে বলেন—
وأنا وكافل اليتيم في الجنة هكذا» وأشار بالسبابة والوسطى، وفرج بينهما شيئا
"আমি এবং এতিমের লালন-পালনকারী জান্নাতে এভাবে পাশাপাশি থাকব।"
এরপর তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুলের দিকে ইঙ্গিত করে সামান্য ফাঁক করে দেখালেন।
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় ইবনে বাত্তাল (রহ.) বলেন—
"যে ব্যক্তি এ হাদীস শুনবে, তার জন্য উচিত হবে এর ওপর আমল করা, যাতে সে জান্নাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গী হতে পারে। আখিরাতে এর চেয়ে উচ্চ মর্যাদা আর কিছু হতে পারে না।"
এই মহান সুসংবাদই প্রমাণ করে যে, এতিমের লালন-পালন শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি এমন এক মহান ইবাদত, যার প্রতিদান হলো জান্নাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সান্নিধ্য। তাই প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের উচিত এতিমদের প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করা এবং তাদের সম্মানজনক জীবন গঠনে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসা।
এতিমের প্রতি সদাচরণ : হৃদয় কোমল হওয়ার অন্যতম মাধ্যম
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতিমের প্রতি সদাচরণকে হৃদয়ের কঠোরতা দূর করার একটি কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কেননা আল্লাহর নিকট সবচেয়ে দূরবর্তী হৃদয় হলো কঠোর ও নির্দয় হৃদয়।
হযরত আবু দারদা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তার হৃদয়ের কঠোরতার অভিযোগ করল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন—
أتحب أن يلين قلبك وتدرك حاجتك ؟ ، ارحم اليتيم ، وامسح رأسه ، وأطعمه من طعامك ، يلن قلبك وتدرك حاجتك
"তুমি কি চাও তোমার হৃদয় কোমল হোক এবং তোমার প্রয়োজন পূরণ হোক? তবে এতিমের প্রতি দয়া করো, তার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দাও এবং তোমার খাবার থেকে তাকে খেতে দাও। তাহলে তোমার হৃদয় কোমল হবে এবং তোমার প্রয়োজনও পূরণ হবে।"
আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব, হাদীস নং: ৩৮৬৪
এ হাদীসের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন যে, এতিমের প্রতি দয়া, স্নেহ ও সহমর্মিতা কেবল এতিমের উপকারই করে না; বরং মানুষের নিজের অন্তরকেও কোমল, বিনয়ী ও আল্লাহমুখী করে তোলে।
এতিমের মাথায় স্নেহের হাত বুলানোর ফযীলত
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও সুসংবাদ দিয়েছেন, যে ব্যক্তি একান্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কোনো এতিমের প্রতি সামান্যতম সদাচরণও করে এমনকি তার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেও সে মহান প্রতিদান ও বিপুল সওয়াবের অধিকারী হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন….
من مسح رأس يتيم ـ لم يمسحه إلا لله ـ كان له بكل شعرة مرت عليها يده حسنات ، ومن أحسن إلى يتيمة أو يتيم عنده ، كنت أنا وهو في الجنة كهاتين
"যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো এতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, তার হাত যতটি চুল স্পর্শ করবে, প্রতিটি চুলের বিনিময়ে সে একটি করে নেকি লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি তার তত্ত্বাবধানে থাকা কোনো এতিম ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে, সে এবং আমি জান্নাতে এ দুই আঙুলের ন্যায় পাশাপাশি থাকব।"
এই নির্দেশনার গভীর তাৎপর্য হলো….এতিমের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দেওয়া এমন একটি সহজ আমল, যা ধনী-গরিব, ছোট-বড় প্রায় সবাই করতে পারে। অথচ এর মাধ্যমে একদিকে এতিমের হৃদয়ে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও আপনজনের অনুভূতি সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে দয়াকারী ব্যক্তি মহান সওয়াবের অধিকারী হন।
এতিমের অনুভূতির প্রতি বিশ্বনবী ﷺ-এর অসাধারণ সংবেদনশীলতা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এতিমের ভরণ-পোষণ বা আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করেই ক্ষান্ত হননি; বরং তাদের হৃদয়ের অনুভূতি ও মানসিক প্রশান্তির প্রতিও অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। তিনি সর্বদা চেষ্টা করতেন, যেন কোনো এতিমের হৃদয় ভেঙে না যায় এবং তারা আনন্দ ও ভালোবাসা অনুভব করতে পারে।
এর একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা হলো— একবার সাহাবি আবু লুবাবা (রাযি.) ও এক এতিম বালকের মধ্যে একটি খেজুর গাছ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিচার করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাছটি আবু লুবাবা (রাযি.)-এর বলে রায় দেন; কারণ প্রকৃত অধিকার তাঁর পক্ষেই ছিল। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন, এতিম বালকটি কান্নায় ভেঙে পড়েছে, তখন তিনি আবু লুবাবা (রাযি.)-কে বললেন—
"তুমি গাছটি তাকে দিয়ে দাও।" তিনি অস্বীকৃতি জানালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন— "গাছটি তাকে দিয়ে দাও; এর বিনিময়ে জান্নাতে তোমার জন্য একটি খেজুরগাছ থাকবে।" তবুও তিনি সম্মত হলেন না। এ ঘটনা শুনে সাহাবি ইবনুদ দাহদাহ (রাযি.) আবু লুবাবা (রাযি.)-এর কাছে এসে বললেন— "আপনি কি এই গাছটি আমার এই বাগানের বিনিময়ে বিক্রি করবেন?" তিনি বললেন, "হ্যাঁ।"
অতঃপর ইবনুদ দাহদাহ (রাযি.) নিজের বাগান দিয়ে গাছটি কিনে নিলেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন— "হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যে গাছটি এতিমকে দেওয়ার জন্য চেয়েছিলেন, আমি যদি সেটি তাকে দিয়ে দিই, তবে কি আমার জন্যও জান্নাতে একটি খেজুরগাছ থাকবে?" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—"হ্যাঁ।"
পরবর্তীতে ইবনুদ দাহদাহ (রাযি.) উহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে বললে—"জান্নাতে ইবনুদ দাহদাহর জন্য কতই না ফলভারে নত অসংখ্য খেজুরগাছ রয়েছে!"
বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান
এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ইসলামে এতিমের শুধু সম্পদ ও ভরণ-পোষণের অধিকারই নয়; তার হাসি, আনন্দ, মানসিক শান্তি ও অনুভূতিরও বিশেষ মূল্য রয়েছে। একজন এতিমের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য যদি একজন মুমিন নিজের মূল্যবান সম্পদও ত্যাগ করে, তবে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে তার চেয়ে উত্তম প্রতিদান সংরক্ষণ করে রাখেন।
এতিমদের প্রতি বিশ্বনবী ﷺ-এর বাস্তব দৃষ্টান্ত ও কঠোর সতর্কবাণী
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতিমদের প্রতি দয়া ও মমতার কারণে কুরাইশ গোত্রের নারীদের বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন—
خير نساء ركبن الإبل نساء قريش ، أحناه على يتيم في صغره ، وأرعاه على زوج في ذات يده
"উটে আরোহণকারী নারীদের মধ্যে কুরাইশের নারীরাই সর্বোত্তম। তারা শৈশবে এতিমের প্রতি সবচেয়ে বেশি স্নেহশীল এবং স্বামীর সম্পদ ও পরিবারের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যত্নশীল।"
এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, এতিমদের প্রতি স্নেহ, ভালোবাসা ও দায়িত্বশীল আচরণ এমন একটি মহৎ গুণ, যার কারণে একটি জাতি বা সম্প্রদায়ও প্রশংসিত হতে পারে।
হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাযি.)-এর সন্তানদের দায়িত্ব গ্রহণ
মুতা যুদ্ধের পর সাহাবি হযরত জাফর ইবন আবি তালিব (রাযি.) শাহাদাত বরণ করলে তাঁর সন্তানরা এতিম হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং নিজের ঘরে নিয়ে আসেন।
যখন তাদের মা সন্তানদের দারিদ্র্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন—
"তুমি কি তাদের দারিদ্র্যের আশঙ্কা করছ? আমি দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের অভিভাবক।"
এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল মুখে এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেননি; বরং বাস্তব জীবনেও তিনি তাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে উম্মতের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এতিমের প্রতি সদাচরণের উৎসাহই দেননি; বরং তাদের প্রতি অবিচার এবং তাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। কারণ এমন জঘন্য অপরাধ কেবল সেই ব্যক্তিই করতে পারে, যার হৃদয় কঠোর হয়ে গেছে এবং যে দুর্ভাগ্যের পথে ধাবিত হয়েছে।
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— "তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক (মহাপাপ) থেকে বেঁচে থাকো।" সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কী কী?"
তিনি বললেন—
১. আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা, ২. জাদু করা, ৩. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা, ৪. সুদ খাওয়া, ৫. এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা, ৬. যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা ৭. এবং সতী-সাধ্বী, নিরপরাধ মুমিন নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া।
সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২৭৬৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৮৯
এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করাকে সাতটি মহাধ্বংসাত্মক পাপের একটি হিসেবে গণ্য করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের দৃষ্টিতে এতিমের সম্পদের অধিকার কতটা পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ।
এতিমের সম্পদের দায়িত্ব গ্রহণে যোগ্যতার গুরুত্ব
এতিমের সম্পদের অধিকারের গুরুত্ব ও ভয়াবহতার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের মধ্যে যারা দুর্বল ছিলেন তাদেরকে এতিমের সম্পদের দায়িত্ব না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
হযরত আবু যর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন—
يا أبا ذر ، إني أراك ضعيفا ، وإني أحب لك ما أحب لنفسي ، لا تأمرن على اثنين ، ولا تولين مال يتيم
"হে আবু যর! আমি তোমাকে দুর্বল মনে করি। আর আমি তোমার জন্য তাই পছন্দ করি, যা নিজের জন্য পছন্দ করি। তুমি দুইজন লোকেরও নেতৃত্ব গ্রহণ করো না এবং কোনো এতিমের সম্পদের অভিভাবক হয়ো না।"
এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, এতিমের সম্পদের দায়িত্ব এমন একজনের হাতেই অর্পণ করা উচিত, যিনি বিশ্বস্ত, দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ।
সাহাবায়ে কেরামের জীবনে নববী শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এসব মহান শিক্ষা সাহাবায়ে কেরাম শুধু শ্রবণেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছিলেন। তাঁরা এতিমদের লালন-পালন, ভরণ-পোষণ ও অভিভাবকত্ব গ্রহণকে আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং জান্নাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সান্নিধ্য অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল মনে করতেন।
তাঁদের জীবনের দিকে তাকালে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তাঁরা আন্তরিকতার সঙ্গে এতিমদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাদের শিক্ষা, ভরণ-পোষণ ও সম্মান নিশ্চিত করেছেন এবং তাদের কখনো সমাজের বোঝা হিসেবে নয়; বরং সমাজের সম্মানিত সদস্য হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
এর পেছনে ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেই মহান ঘোষণা—
أنا وكافل اليتيم في الجنة هكذا ، وأشار بالسبابة والوسطى وفرج بينهما شيئاً
"আমি এবং এতিমের লালন-পালনকারী জান্নাতে এভাবে পাশাপাশি থাকব।"
এরপর তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুলের দিকে ইঙ্গিত করে সামান্য ফাঁক করে দেখিয়েছিলেন।
এই সুসংবাদই সাহাবায়ে কেরামকে এতিমদের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁদের সেই আদর্শ আজও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং অনুকরণীয় শিক্ষা।
আল্লাহ তাআলা অধমকেসহ সমগ্র উম্মতে মুহাম্মাদীকে এতিমদের প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের খেদমত, লালন-পালন এবং অধিকার আদায়ের তাওফীক দান করুন। আমাদেরকে এতিমের চোখের অশ্রু মোছার, তাদের মুখে হাসি ফোটানোর এবং তাদের জন্য রহমত ও আশ্রয়ের মাধ্যম হিসেবে কবুল করুন। আমীন
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
শান্তি সম্প্রীতি ও উদারতার ধর্ম ইসলাম
নামে যার শান্তির আশ্বাস তার ব্যাপারে আর যাই হোক, সন্ত্রাসের অপবাদ দেয়ার আগে তার স্বরূপ উদঘাটনে দু'দণ...
মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ
...
স্রষ্টা ও তাঁর অস্তিত্ব
...
ঈমান-আমল সুরক্ষিত রাখতে হক্কানী উলামায়ে কেরামের সঙ্গে থাকুন, অন্যদের সঙ্গ ছাড়ুন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... قال الله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتّ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন