নবুয়তি দাওয়াতি মেহনতের মেজাজ
নবুয়তি দাওয়াতি মেহনতের মেজাজ
[আল্লাহ তা'আলা রাসূল সা.-কে মুয়াল্লিম হিসেবে পাঠিয়েছেন এবং তাঁর আনা দ্বীনকে কামেল ও মুকাম্মাল ঘোষণা করেছেন। কুরআন শরিফে পরিষ্কার বলা হয়েছে — অমুসলিমদের জ্ঞান, সভ্যতা বা সংস্কৃতির সাথে কোনো সামঞ্জস্যতা গ্রহণযোগ্য নয়; বরং সম্পূর্ণ আলাদা থেকে দাওয়াত দিতে হবে।
সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন উম্মি — লিখতে-পড়তে ও গুনতে জানতেন না। অথচ তারাই রোম ও পারস্যের মতো সবচেয়ে উন্নত সভ্যতাগুলোকে শিক্ষক হিসেবে গিয়েছেন। তাদের কাছে গণিত, বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি কিছুই ছিল না; ছিল শুধু ঈমান ও আমল। এই শক্তির সামনে রোমীয় ও পারস্যরা ধাঁধিয়ে গেল — নিজ ভাষা, সভ্যতা ও ধর্ম পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করল। ইতিহাসে এমন নজির আর নেই যে, সভ্য জাতি অসভ্য জাতির অনুকরণ করেছে।
পরাজিত রোমীয় সেনাপতিরা স্বীকার করেছে — মুসলমানরা রাত জেগে ইবাদত করে, ন্যায়বিচার করে, মদ খায় না, ওয়াদা রক্ষা করে — এই কারণেই তারা জিতেছে। এতে গণিত বা প্রযুক্তির কোনো ভূমিকা নেই। একইভাবে পারস্যের বন্দী হরমুজানও স্বীকার করেছেন — 'মাঝখানে তোমাদের রব এসে গেছেন।'
দাওয়াতে নিজেকে 'গ্রহণযোগ্য' বানাতে গিয়ে অন্যের চালচলন-পোশাক গ্রহণ করা মানেই দাই থেকে মাদউ হয়ে যাওয়া। আর সামঞ্জস্যতা আসলে তাওহিদের শক্তিই নষ্ট হয়। আবু বকর রা.-এর বুকে চাপড় মেরে বলা 'এটাই হক' — এই শক্তিশালী তালকিনেই উমর রা.-এর দিল বদলে গেছে, কোনো যুক্তিতে নয়।
আজও মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে — সাদা-কালো দাড়িওয়ালাদের একসাথে হাসতে দেখে, মরুভূমিতে এক মুসাফিরের নামাজ পড়তে দেখে, ফজরের নামাজের দৃশ্য দেখে। এই শক্তি যুক্তিতে নেই, আমলে আছে। সাহাবাগণ এই আমল ও আখলাক নিয়েই গিয়েছিলেন। আমাদেরও এই পথেই চলতে হবে — ঈমান ও আমলের বুনিয়াদে, সামঞ্জস্যতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে।]
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমাদ রহঃ
الحمد لله نستعينه ونعوذ به من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلله فلا هادي له. ونشهد أن لا إله إلا الله ونشهد أن محمد عبده ورسوله.
بسم الله الرحمن الرحيم —
اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَاَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا ۲۸
وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إن أمة أمية لا نكتب ولا نحسب. أو كما قال عليه الصلاة والسلام
.
আবু বকর রা.-এর জামানায় যে কুরআন একত্র করা হয়েছিল, সে কুরআনে শব্দে নুকতাও ছিল না, যের-যবর তথা হরকতও ছিল না।
এগুলো করার প্রয়োজন ছিল, এজন্য আল্লাহ তা'আলা যে ব্যক্তিকে পরবর্তীতে ব্যবহার করেছেন সে হলো হাজ্জাজ বিন ইউসুফ। আর সবাই জানে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এই উম্মতের বড় কোনো মুত্তাকি-পরহেজগার ব্যক্তি নয়, বরং তার বিপরীত। তো তাকেই আল্লাহ তা'আলা ইস্তেমাল (ব্যবহার) করলেন কুরআনের নুকতা, হরকত ইত্যাদি কাজে।
বদর যুদ্ধের সময় লেখা শেখানোর জন্য ব্যবহার করলেন মক্কার কাফের কয়েদিদেরকে, আর আরবি লেখার কাজে পরিপূর্ণতার জন্য পরবর্তীতে আল্লাহ তা'আলা ব্যবহার করলেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে।
সুতরাং বোঝা যায়, লেখার কাজ বা লেখা পরিপূর্ণ করার কাজটা সরাসরি নবুয়তের অংশ নয়। এর সম্পর্ক হতে পারে কাফের বা ফাজেরদের সাথেও।
আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতকে ওই ইলম দিয়ে উঠান।
সাহাবিরা ইহুদিদের কাছ থেকে অল্পকিছু শিখতে চাইলেন, রাসূল সা. খুব মজবুত ও শক্তভাবে নিষেধ করলেন যে, এই ইলমের পবিত্রতা যেন নষ্ট না হয়।
বাইর থেকে কিছুই নিলেন না। সব ব্যাপারে তাদের কাছ থেকে আলাদা থাকার নীতি এখতিয়ার করলেন। সাধারণ বিষয়ে তো তাদের সাথে কোনো মিল থাকবে না, এমনকি যদি ঘটনাক্রমে কোনো সামঞ্জস্য এসে যায়, তা থেকেও পাক থাকতে বলা হয়েছে।
অমুসলমানদের কাছ থেকে কোনো জিনিস ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্প্রয়োজনীয় জিনিস গ্রহণ করা, নকল করা বা অনুসরণ করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কোনো ধরনের কোনো সামঞ্জস্য যেন না হয়। নামাজ পড়ার সময় সামনে একটি সুতরা রাখা হয় আড়াল দেওয়ার জন্য; যাতে এর সামনে দিয়ে চলাফেরা করতে পারে; কিন্তু এই সুতরা রাখার কারণে কখনো কখনো যারা সামনে রেখে উপাসনা করে, তাদের বাহ্যিক সামঞ্জস্য হয়ে যায় বা কেউ ভাবতে পারে এই সুতরাকে সেজদা করা হচ্ছে। একটি লাঠি সামনে রাখল; এখন কেউ ভাবতে পারে যে, এই লাঠিকে সেজদা করা হচ্ছে — এর থেকে পাক থাকার জন্য মুস্তাহাব হলো, লাঠি একেবারে সামনে না রাখা; একটু পাশে রাখা। যাতে সরাসরি পূজার সামঞ্জস্য না হয়।
অনেক জাতি আছে সূর্যের পূজা করে। এজন্য সূর্য উদয়, সূর্য অস্ত ও সূর্য ঠিক মাথার উপরে থাকার সময় সেজদা করা নিষেধ করা হয়েছে। নামাজ পড়বে না, তবে অন্য আমল যথা জিকির, তিলাওয়াত ইত্যাদি করবে। নামাজ পড়বে না; যাতে কেউ ভুল করে মনে না করে যে, অন্য জাতির নকল করা হচ্ছে। আর ইহুদি-নাসারা থেকে এতবেশি দূরে থাকতে বলা হয়েছে যে, তাদের কাছ থেকে কী শিক্ষা নেবে! তাদের কাছ থেকে না রান্না করা শিখবে, না জামা বানানো শিখবে, না ঘর বানানো শিখবে; তাদের কাছ থেকে কিছুই নেবে না।
এই সাহাবায়ে কেরাম কিছুদিন পরেই গেলেন দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ওই রোমানদের কাছে; পারস্যদের কাছে; মিসরীয়দের কাছে। রাসূলে কারিম সা.-কে আল্লাহ তা'আলা শিক্ষক বানিয়ে পাঠিয়েছেন। রাসূল সা. ইরশাদ করেন:
إنما بعثت معلماً
'আমি মুয়াল্লিম হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।'
সাহাবায়ে কেরাম সেই মুয়াল্লিম জাতি, তারা শিক্ষক হিসেবে গিয়েছেন। রোম দেশ হলো ওই দেশ, যেখানকার স্থাপত্যশিল্প ইত্যাদি এখন পর্যন্ত শিক্ষার বিষয়; পারস্য, যেখানকার দর্শন ইত্যাদি এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বইপত্র, জার্নাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচ্য বিষয়। আরো পশ্চিমে লক্ষ্য করলে মিসর... মিসর, আলেকজান্দ্রিয়া, ভূমধ্যসাগর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বহু পণ্ডিত ছিল, যাদের কথা এখনো পড়ানো হয়।
আর্কিমিডিস আলেকজান্দ্রিয়া তথা ইসকান্দারিয়া, যা বর্তমান মিসরের একটি শহর। যে স্কুলে পড়েছে, ক্লাস থ্রি বা ফাইভের দিকে আর্কিমিডিসের নাম সে পেয়ে গেছে। আর 'পেয়ে গিয়েছে'-এর মানে এই সাবজেক্ট শেষ হয়ে যায়নি। যদি সে গনিত পড়ে তাহলে এমএসসিতে হয়তো তার নাম আবার পাবে।
পিথাগোরাস - ক্লাস ফাইভে উঠে তার নামও পেয়েছে। আর এগুলো ভালো করে মনে রাখতে হবে; নইলে পরবর্তীতে এসএসসি, এইচএসসি — সব গুলো নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে।
তাদের দেশে, তাদের সন্তানদের নিকট সাহাবায়ে কেরাম গিয়েছেন মুয়াল্লিম হিসেবে। ওই আর্কিমিডিসের নাতির কাছে আর পিথাগোরাসের নাতির কাছে। রাসূল সা. যেই সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে খুব আনন্দের সাথে বলেছেন:
إن أمة أمية لا نكتب ولا نحسب
'আমরা নিরক্ষর উম্মত। আমরা লিখিও না, গুনিও না।
'
গুনতেই জানে না; আর সভ্যতার বুনিয়াদ হলো লেখাপড়া ও গণনা। যেরকমভাবে দ্বীনের বুনিয়াদ হচ্ছে ঈমান-আকায়েদ; এগুলো ছাড়া কোনোদিনই মুত্তাকি হতে পারে না। ঈমান নাই, নামাজ পড়ে; রোজা রাখে; হজ করে — তার সব বৃথা। ঠিক যেমন ঈমান ছাড়া কোনো দ্বীন হতে পারে না, তদ্রূপ লেখা ও গণনা ছাড়া কোনো সভ্যতা হতে পারে না। রাসূল সা. এরই নফি (অস্বীকার) করেছেন: 'আমরা লিখিও না, গুনিও না।' আর এই সমস্ত মানুষ যারা শিখলেন না, সেই সাহাবাদেরকে পাঠালেন মুয়াল্লিম হিসেবে সেসব দেশে।
সাহাবায়ে কেরাম মুয়াল্লিম হিসেবে এসেছেন মিসরে, মুয়াল্লিম হিসেবে এসেছেন শামদেশে। এখানকার অধিবাসীদেরকে শেখাতে লাগলেন। তারা ভালো করে জানেন, এখানকার মানুষজন গণিতের পণ্ডিত আর তারা গুনতেও জানেন না; কিন্তু এতে তাদের কোনো দ্বিধা নেই। রান্না করা জানেন না, জামা সেলাই করা জানেন না, ঘর বানানো জানেন না, আর তারা এসেছেন সবচেয়ে সভ্য জাতিগুলোকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। কিন্তু পরবর্তী বিষয় আরো আশ্চর্যজনক, ধীরে ধীরে এই রোমীয়রা মুসলমান হলো এবং ক্রমেই মুসলমানদের অনুসরণ ও অনুকরণ করতে আরম্ভ করল।
ইতিহাসে এরকম নজির পাওয়া যায় না যে, শহরের লোক গ্রামের লোকের নকল করছে; শিক্ষিত লোক অশিক্ষিত লোকের নকল করছে; ধনী লোক গরিব মানুষের নকল করছে; নিজের চালচলন বাদ দিয়ে তাদের নকল করছে; বরং তার বিপরীত — গ্রামবাসীরা শহরবাসীদের নকল করে; অশিক্ষিতরা শিক্ষিতদের নকল করে; গরিব লোকেরা ধনীদের নকল করে। কিন্তু এখানে সম্পূর্ণ উলটো হলো। প্রচলিত একটি কথা আছে, 'গঙ্গা উলটো বইতে লাগল' — সভ্য জাতি অসভ্য জাতির নকল করল। শুধু নকলই নয়, নকলের এই চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত ইতিহাসে আর নেই। এতটাই নকল করল যে, নিজ ভাষা ভুলে গিয়ে ওই আরবদের ভাষাকে নিজ ভাষা বানিয়ে ফেলল। বড় একটি অংশ।
অন্য জাতির কাছ থেকে তার ভাষা নিয়ে নিজ ভাষা ভুলে যাওয়ার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে পাওয়া যায় না; কিন্তু তারা ভুলে গেলেন। যেটা পাওয়া যায়, কোনো একটি আঞ্চলিক ভাষা; যাকে ভাষার মর্যাদা দেওয়া যায় না, ওই রকম আঞ্চলিক ভাষা, ডায়ামেট্রিক যেগুলোকে বলা হয়ে থাকে, এগুলো মাঝে মাঝে বিলুপ্ত হয়ে যায় শক্তিশালী ভাষার মোকাবেলায়। রোম ভাষা কোনো আঞ্চলিক ভাষা ছিল না, গ্রিক ভাষা কোনো আঞ্চলিক ভাষা ছিল না। ফিলিস্তিনের অঞ্চলগুলো রোমের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইরাকের বড় একটি অংশ রোমীয় অঞ্চল ছিল। তারা তাদের রোমীয় ভাষা, রোমীয় সভ্যতার সবকিছু ভুলে গেল, আর আরব হয়ে গেল। এমনকি আরবদের ভাষা পর্যন্ত গ্রহণ করে নিল।
মিসর ইত্যাদি এলাকা সম্পূর্ণ আরব অঞ্চল হয়ে গেল; অথচ নৃতত্ত্বের দিক থেকে এই মিসর ইত্যাদি হলো আজম। মিসর ইতিহাসে কখনো রোম সাম্রাজ্যের অংশ ছিল, কখনো গ্রিক সভ্যতার অংশ ছিল। আর গ্রিক সভ্যতা যাকে বলা হয়, তার বড় একটি অংশ মিসরের সাথে জড়িত। যেমনটি বললাম, আর্কিমিডিস গ্রিক সভ্যতা হিসেবে পরিচিত, তবে আর্কিমিডিসের বাসস্থান ছিল আলেকজান্দ্রিয়া, যা বর্তমানে মিসরের একটি শহর। সুতরাং এই মিসর গ্রিক সভ্যতা বা সাম্রাজ্যের একটি শহর।
আজ যদি আলেকজান্দ্রিয়ায় গিয়ে কেউ গ্রিক ভাষায় কথা বলে তবে কোনো দোকানদার তা বুঝবে না। যদি বলে, আমি আর্কিমিডিসের নাতি; দাদার ভাষায় কথা বলছি — কেউ বুঝবে না; তবে আরবি বললেই বুঝবে। তারা এই গ্রিক ভাষা ত্যাগ করেছে। এত উন্নত ভাষা, যে ভাষা নিয়ে তাদের গর্ব করার কথা ছিল, সেই ভাষাকে নিয়ে তারা লজ্জিত হলো কেমন করে? আল্লাহ তা'আলা সাহাবায়ে কেরামকে ঈমান ও আমল তথা এমন শক্তি দিয়ে পাঠিয়েছেন, যার মোকাবেলায় সব হারিয়েছে।
কোনো ছোট বাচ্চা জিজ্ঞেস করছিল, রাতের বেলায় আকাশে এত তারা থাকে, দিনের বেলায় সব কোথায় যায়? আসল কথা হলো, তারা কোথাও যায় না, ওখানেই থাকে। তবে সূর্যের আলোর কারণে কিছুই দেখা যায় না। সূর্যগ্রহণ হলে — যা কখনো কখনো হয়ে থাকে, তখন — আবার দিনের বেলায়ই তারা দেখা যায়; কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় সূর্যের আলোর মোকাবেলায় হারিয়ে যায়। সাহাবায়ে কেরাম এমনই ঈমান-আমলের এক দৌলত নিয়ে গিয়েছেন, আসমানি গনিমত নিয়ে গেছেন যে, এর মোকাবেলায় গণিত, দর্শন, সভ্যতা — সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। (সুবহানাল্লাহ) শুধু নিশ্চিহ্নই হয়নি, না থাকার লজ্জাও হয়ে গেছে।
বড় কিছু যা নিয়ে মানুষ মুগ্ধ হয়, তাতে যদি কোনো ত্রুটি সংযুক্ত থাকে, তখন সেই ত্রুটি আর ত্রুটি থাকে না, বরং সেটা তার একটি সৌন্দর্যের বিষয় হয়ে যায়, তার গৌরবের একটি অংশ হয়ে যায়। বড় দরবেশ... তার মজলিসে কেউ গেল। এখন তার কাঁথা যদি ছেঁড়া হয়, তো সেই কাঁথা যত বেশি ছেঁড়া হবে, তার দরবেশিও তত বেশি বাড়বে। যার কাছে কাপড়ের চাকচিক্যই ধন-দৌলত-সম্পদ, তার জামায় যদি একটু দাগ পড়ে যায়, তবে তার সমস্যা আছে। তার দাম এক ধাপ কমে যাবে। কিন্তু দরবেশের ক্ষেত্রে এমন নয়, বরং দরবেশের যত বেশি ছিঁড়বে, তার গৌরব তত বাড়বে।
মজনুর মজলিসে গিয়ে দরবেশ পাগলামি করল। এখন যদি সে সত্যিই দরবেশ হয়, তো তার পাগলামি, তবে তার এলোমেলো কথাই তার জৌলুস বাড়াবে। আশ্চর্য সব কথা, এই কথাগুলোর মধ্যে কোনো গৌরব নেই। পাগল; কিন্তু কোনো কারণে যদি সে বিখ্যাত হয়ে যায়, তাহলে তার দোষ-ত্রুটি যা-কিছু আছে, সবকিছুকে মাহাত্ম্য দিয়ে দেয়। আর সম্ভবত এমন করেই হাফিজের খুব নামকরা একটি কবিতা আছে, 'গালের তিলের' উপর। যার অর্থ মোটামুটি এই ধরনের:
'ওর গালের একটি তিলের জন্য আমি সমরকন্দ ও বুখারার সব সম্পদ দিয়ে দিতে রাজি আছি।'
ওই জামানায় সমরকন্দ ও বুখারা ছিল সম্পদের অধিকারী। যদি যুক্তি দিয়ে বিচার করা হয়, তাহলে গালের তিল একটি ত্রুটি; যার চিকিৎসা করা হয়। এর হোমিও চিকিৎসাও আছে। এটা কোনো ভুল নয়, এটা একটি দোষ। কোনো রোগের কারণে চামড়ায় দাগ পড়ে গেছে। ডাক্তাররা এটা পছন্দ করতেন না, তবে এর জন্য হোমিও চিকিৎসাই ভালো। কিন্তু বিষয়টি চিকিৎসার।
তাহলে যা চিকিৎসার বিষয় ছিল, সেটা কাব্যের বিষয়বস্তু কেমন করে হয়ে গেল! এটা এজন্য হয়েছে যে, ওই তিল যখন সুন্দর চেহারায় পড়েছে, তখন সেটা আর চিকিৎসার বিষয়বস্তু থাকেনি, সেটা কাব্যের বিষয়বস্তু হয়ে গিয়েছে। অন্য জায়গায় থাকলে এই মর্যাদা সে পেত না। সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো কারণে মহান হয়ে যায়, তার ত্রুটি আর ত্রুটি থাকে না, সেটা তার মাহাত্ম্যের অংশ হয়ে যায়।
অঞ্চলের দিক থেকে যারা ভ্রমণ করেন, বড় বড় শহরে যান। তার ভ্রমণপথে সুন্দর রাস্তাঘাট কত কিছু থাকে। আর সেই পর্যটক হয়তো ওই আরবের মরু অঞ্চলে গেল। নির্জন জায়গায়, রাতের অন্ধকারে, দুপুরের প্রচণ্ড উত্তাপে। বা আরবের বর্তমান শহরগুলোতে যায় যেমন জেদ্দা ইত্যাদি, তাহলে সেসব এলাকা ঘুরে ঘুরে দেশে ফিরে এসে বলার এমন কিছু নেই। তাকে প্রলোভন দেয় — এমন কিছুই নেই; কিন্তু শহরের বাইরে নির্জন কোনো অঞ্চলে যদি চলে যায়, যেখানে ধু-ধু বালু; কালো পাহাড়; লোকজন নেই, তখন বলার কিছু আছে।
আজও সেই মরুভূমিগুলোতে, ওই পাহাড়গুলোতে এমন ভাষা আছে, যদি কোনো প্রাণবান মানুষ যায় তাহলে সে রাসূল সা.-এর সরাসরি কিছু তো পাবে না, কিন্তু মনে হবে সেই ছোঁয়া যেন সে পাচ্ছে। দিলে এমনই নাড়া দেবে, যেটা অন্য কোথাও সে পাবে না। আর সেটা তখনই, যখন সেখানে কোনো মোটরগাড়ি নেই, পাকা রাস্তা নেই, আধুনিক সভ্যতার কোনো ছোঁয়া নেই, তখনই সে জৌলুস সে পাবে। ঠিক যেরকম মক্কা-মদিনার মরুভূমি অঞ্চলে কিছু না থাকলেও প্রচণ্ড জৌলুস আছে, সেই কালো পাহাড়গুলোর প্রবল ভাষা আছে, ঠিক তেমনিভাবে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কিছু না থাকার পরেও ওই পাহাড়গুলোর ভাষার মতো প্রবল ভাষা আছে। ওইসব অঞ্চলে সাহাবায়ে কেরাম যখন গিয়েছেন একেবারে রোমীয়দের মধ্যে, তো এই আলেকজান্দ্রিয়া ও রোমের সভ্য জাতিগুলো ধাঁধিয়ে গেল। চোখের সামনে সূর্য থাকলে যেমন সব হারিয়ে যায়, সাহাবায়ে কেরামকে দেখে সব হারিয়ে গেল।
সাহাবাগণ বিজয়ী ছিলেন, কিন্তু তাদের রাজমহলগুলোতে তারা থাকেননি; থেকেছেন নিজেদের ঝুপড়িতে। ওই রোমীয়রা তাদের রাজমহলেই থাকে, তারা এখনো জরির পোশাক পরে। তারা এখনো তাদের উন্নত মানের খাবার খায়। এর মোকাবেলায় সাহাবায়ে কেরাম রান্না করা জানেন না, খাওয়া জানেন না আর থাকেন ঝুপড়ি ঘরে। আর ওই রাজমহলে বসবাসকারী, জরির পোশাক পরিধানকারীরা ধীরে ধীরে এই সাহাবায়ে কেরামের নিকট এসে মুসলমান হতে লাগল।
আমরা অনেক সময় মনে করি, ইয়ারমুকের যুদ্ধ হলো, কাদিসিয়ার যুদ্ধ হলো আর রোমীয় ও পারস্যরা সব মুসলমান হয়ে গেল। না, এটা রাতারাতির কোনো ব্যাপার ছিল না। যুদ্ধের ফায়সালা হয়তো রাতারাতি বা কম সময়ের মধ্যে হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের মুসলমান হওয়া কোনো তাৎক্ষণিক বিষয় ছিল না। মোটামুটি একটি জাতি মুসলমান হতে সময় লেগেছিল প্রায় পঞ্চাশ বছর; ওই জামানায়। এই পঞ্চাশ বছরে তারা দেখেছে: এরা রান্না করতে জানে না — তাও দেখেছে; এরা গণনা করা জানে না — তাও দেখেছে; লিখতে জানে না, পড়তে জানে না — তাও দেখেছে। এদের যা কিছুই নেই, না সম্পদ; না আধুনিক কোনো জ্ঞান — কিছুই নেই। সব না থাকা দেখেও তারা মুসলমান হয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলা বড় মেহেরবানি করে ওই ঈমান-আমলকে তার পবিত্র সুরতে রেখেছেন, এটাকে অন্য কিছুর মধ্যে, কোনো ময়লার আবরণের মধ্যে ফেলেননি।
যেরকম মক্কার পাশের মরুভূমি অঞ্চল, তার পাশের কালো পাথরের পাহাড়গুলো... সেই পাথরের মধ্যে যদি কেউ শামিয়ানা টাঙিয়ে দেয়, কালো রং লাগিয়ে দেয়, কিছু দোকান বসিয়ে দেয় আর কিছু পাকা রাস্তা বানিয়ে দেয়, তাহলে সেই পাহাড়ে সৌন্দর্য বাড়বে না, বরং সে তার প্রাণ হারিয়ে ফেলবে। আজ যেমন সাফা-মারওয়াতে সাঈ তো হয়ে যায়, কিন্তু রাসূল সা.-এর জামানার সাঈ, কিংবা আরো প্রাচীন অর্থাৎ হাজেরা আ.-এর সাঈর ছোঁয়া পাওয়া মুশকিল। কারণ, এয়ারকন্ডিশন আর নিচে মার্বেল, উপরেও মার্বেল। তো কোথায় সেই সাঈ-এর নাগাল পাবে?
সাহাবায়ে কেরামগণ যখন বিদেশে গিয়েছেন, একেবারে উম্মি সিফাতের উপর গিয়েছেন; রাসূলে কারিম সা. যে সিফাত নিয়ে এসেছিলেন। আর ওই সিফাতের উপর যখন তারা গিয়েছেন, তখন ওই রোমীয় ও ইরানিরা ক্রমেই তাদের দিকে চলে এসেছে। যদিও তাদের কাছে ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো কিছু ছিল না। আর এটা বড় মেহেরবানি যে, পরবর্তীকালে মুসলমানদের জন্য, যারা দীনি দাওয়াতের দায়িত্ব নিয়েছেন, আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রত্যেককে দায়িত্ব দিয়েছেন, তাদের যে সম্পদের প্রয়োজন, তা আল্লাহর কাছে আছে। যদি রোমীয়দের কাছে জ্ঞান, ইরানিদের কাছে জ্ঞান ও সম্পদের কিছু থাকত, তাহলে সাহাবাদের এই জৌলুস ও গৌরব — কিছুই থাকত না।
মক্কার পাহাড়গুলোতে যদি আধুনিক কিছু দোকানপাট বসিয়ে দেওয়া হয় তাহলে পাহাড় যেরকম তার ধাঁধিয়ে দেওয়া শক্তি হারিয়ে ফেলবে, ওই পাহাড় তার প্রবল ভাষায় আর দাওয়াত দিতে পারবে না। অন্তরে ওই আঘাত আর লাগবে না — নির্জন ও একাকী ওই পাহাড়ে গেলে। ঠিক তেমনিভাবে সাহাবায়ে কেরামের কাছে যদি কিছু আধুনিকতা চলে আসত, তাহলে সাহাবায়ে কেরামও তাদের প্রবল ভাষা হারিয়ে ফেলতেন। তাই সাহাবাগণ ঠিক মক্কার পাহাড়ের মতো একেবারে উম্মি সিফাত সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই ঈমান-আমলই তাদের কাছে আছে; অন্য কিছু নেই। আর এই না-থাকাটাই তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল, নতুবা ওই সম্পদে রং থাকে না যদি ঈমান-আমলের সাথে অন্য কিছু এসে যায়।
আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি জামানার মুসলমানদের জন্য এই পথটি বড় সহজ করেছেন। আমাদেরকে আর কিছু মেলাতে হবে না। কুরআন শরিফে পরিষ্কারভাবে বলে দেওয়া হয়েছে:
قُلْ يٰۤاَيُّهَا الْكٰفِرُوْنَۙ۱ لَاۤ اَعْبُدُ مَا تَعْبُدُوْنَۙ۲ وَلَاۤ اَنْتُمْ عٰبِدُوْنَ مَاۤ اَعْبُدُۚ۳ وَلَاۤ اَنَا عَابِدٌ مَّا عَبَدْتُّمْۙ۴ وَلَاۤ اَنْتُمْ عٰبِدُوْنَ مَاۤ اَعْبُدُؕ۵ لَكُمْ دِيْنُكُمْ وَلِيَ دِيْنِ۠۶
তোমাদের সাথে আমাদের কোনো সামঞ্জস্য নেই। তোমাদের কিছু নিয়ে কোনো জোড়াতালি দিতে হবে না। না তোমার ধর্ম, না তোমার ইবাদত, না তোমার সভ্যতা, না তোমার চালচলন, না তোমার জ্ঞান ও প্রযুক্তি — কিছুই না। নিখাঁদ পবিত্রতার সাথে আল্লাহ তা'আলা যে দ্বীন দিয়েছেন, সেই দ্বীনই হচ্ছে সভ্যতা। এজন্য কোনো ধরনের কোনো সামঞ্জস্যতা গ্রহণ করা যাবে না। আর যদি গ্রহণ করি তাহলে নিষ্কলুষতা হারিয়ে ফেলবে; তাওহিদের সেই শক্তি আর থাকবে না।
অনেক আগের কথা, ভোপালে এক হিন্দু মুসলমান হলো; কিন্তু সে তার পূর্বের অভ্যাসমতো প্রতিদিন সকালবেলা সূর্যের একটু পূজা করে। নামাজ-রোজাও করে, আবার সূর্যের পূজাও করে। আবার সকালবেলা অজু করার সময় পানি দিয়ে ছিটানোর কাজটিও সে সেরে নেয়। ওখানে একজন আল্লাহওয়ালা ছিলেন, নাম তাইমুর মিয়া। বড় আলেম এবং বিখ্যাত একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সেই ইমরান মিয়াকে ডেকে পাঠালেন। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি মুসলমান হয়েছ? বলল, হ্যাঁ। নামাজ পড়? — হ্যাঁ। রোজা রাখ? — হ্যাঁ। তাহলে লোকে যে বলছে তুমি নাকি সূর্যকে পূজা কর? (মানে সূর্য পূজা করো) সে বলল, 'হ্যাঁজি, উনকো ভি নারাজ নেহি করনা চাহিয়ে।' (হ্যাঁ, একটু করি। ওদেরকেও নারাজ করা ঠিক নয়।)
সুতরাং যদি একটু মিশিয়ে দেয় আর ওদেরকেও সন্তুষ্ট করতে চায়, তবে তাওহিদ আর অবশিষ্ট থাকবে না। অতএব, যেভাবে অন্য কিছু মিলিয়ে দিলে তাওহিদ আর অবশিষ্ট থাকে না, তেমনিভাবে তাওহিদের দাই অন্য কারো কাছ থেকে কোনো আচরণ নিয়ে নিলে, দাওয়াতের কুওয়াতও আর থাকবে না। কিন্তু মানুষ এই ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছে যে, 'উনকো ভি নারাজ নেহি করনা চাহিয়ে', এজন্য একটু করে নিই। সে বলছে, আমি বেশি পরিমাণে করি না, অল্প পরিমাণে করি।
নামাজ-রোজাই বেশি করি; ওইটার পরিমাণ খুবই অল্প।
আমাদেরও মনে হয়, যদি সেই সব অমুসলিম জাতিকে দাওয়াত দিতে হয়, তাহলে আমাকেও তাদের মতো কিছু শিখতে হবে; যাতে তাদের কাছে আমিও গ্রহণযোগ্য হই। অথচ দীনি দাওয়াতি মেজাজের সম্পূর্ণ খেলাফ হলো, মাদউ (যাকে আহ্বান করা হয়)-এর কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য বানানো। নিজেকে গ্রহণযোগ্য বানানোর মানেই হলো, নিজে মাদউ হয়ে যাওয়া। অতএব সাবধানতা এই ব্যাপারে করা হয়েছে যে, কোনো ধরনের কোনো সামঞ্জস্যতা যেন না আসে।
আর গ্রহণযোগ্যতার বৈশিষ্ট্য কী? সামঞ্জস্যতা। যে যত বেশি সামঞ্জস্যতা অর্জন করবে, সে তত বেশি
গ্রহণযোগ্য হয়। এটাই সাধারণ মাপকাঠি। আর এই সামঞ্জস্য থেকেই সাবধান করা হয়েছে। যেন ইঙ্গিতে এই কথা বলা হলো, 'খবরদার! গ্রহণযোগ্য হবে না। কোনো গ্রহণযোগ্যতার প্রয়োজন নেই। বিলকুল একতরফা দাওয়াত।' এমন নয় যে, সে আমার কিছু শুনুক, আমিও তার কথা কিছু শুনি। সে আমার কথা কবুল করুন, আমিও তার কথা কবুল করি। না — মুয়াজ্জিন আজান দেবে উচ্চ গলায় আর নিজ কানে দেবে আঙুল। নিজের কথা জোরে অন্যকে শোনাবে কিন্তু অন্যের কোনো কথা সে শুনবে না।
দাই হবে — আমার চালচলন, আচার-আচরণ এগুলো সবার উপর আমি পেশ করব, কিন্তু অন্যের কিছুই আমি গ্রহণ করব না। এমনকি রাসূল সা. এই বিষয়টি পর্যন্ত সাবধান করে দিয়েছেন যে, সাদা দাড়িতে খেজাব লাগাবে। আমরা খেজাব বলতে মনে করি কালো; অথচ খেজাব হলো রং দেওয়া; শুধু কালো ব্যতীত।
কারণ ইহুদিরা খেজাব লাগায় না। বড় আশ্চর্যের কথা, দাড়ি সাদা হয়ে গেছে বয়সের কারণে, অথচ এই কারণে সে দোষের মধ্যে পড়ে যায় যে, ইহুদিদের মতো হয়ে গেলাম কি না! যদিও এটা মোটেই ইচ্ছাকৃত নয়। কেউ এই কথা বলতে পারবে না যে, ইহুদিদের নকল করছে; কিন্তু ভাবতে তো পারে। সুতরাং যখন এই সামঞ্জস্য এসে গেছে, ওইটা থেকেও নিজেকে বাঁচাতে হবে। যেটা ঘটনাক্রমে হয়ে যায়, অনিচ্ছায় হয়ে যায়, সেই সামঞ্জস্যও যেন আসতে না পারে। আর ইচ্ছাকৃত সামঞ্জস্যের তো প্রশ্নই ওঠে না। এতটা সাবধান করা হয়েছে।
একজন দাই এই ফিকির করবেন না যে, আমি তার কাছে গ্রহণযোগ্য কি না। নিজেকে গ্রহণযোগ্য বানানোর জন্য আমিও তার মতো কিছু পোশাক পরি, তার মতো কিছু কথা বলি, তার মতো আমারও কিছু জ্ঞানভান্ডারে জ্ঞান বাড়াই — বরং কিছু যদি বাড়ায় তবে সব নষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা রাসূলে কারিম সা.-কে যে জিনিস দিয়ে পাঠিয়েছেন, শুধুমাত্র তা দিয়েই দাই দাওয়াতের কাজ করবেন, অন্য কিছু দিয়ে নয়।
[
জাগতিক প্রয়োজনে দাই-এরও জ্ঞানের প্রয়োজন আছে, আর তাদের জ্ঞান ছাড়া আমার চলবে না — এই কথাও সত্য নয়। প্রথম থেকেই আল্লাহ তা'আলা সব প্রয়োজনের বুনিয়াদ ঈমান-আমলেই দিয়েছেন, যে ঈমান-আমল দিয়ে আল্লাহ তা'আলা রাসূলে কারিম সা.-কে পাঠিয়েছেন। ঈমান-আমল তার জাগতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
রাসূল সা. মদিনায় এলেন। মদিনার লোকেরা কৃষিকাজ করত। কৃষিকাজের মধ্যে একটি রীতি ছিল, নর খেজুরের ডাল এনে মাদ্দা খেজুরের ডালের সাথে বেঁধে দেওয়া উৎপাদন বাড়ানোর জন্য। এই রীতিকে 'লিকাহ' বলে। রাসূল সা.-এর কথার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কেউ কেউ ভাবল, রাসূল সা. হয়তো এটা পছন্দ করেননি; এজন্য পরবর্তীতে তারা আর এটা করলেন না। রাসূল সা. যখন জানতে পারলেন তখন বললেন, এই সব কাজ তোমরা যেভাবে জানো, সেভাবে করো। রাসূল সা. এতে হস্তক্ষেপ করেননি। এভাবে এখানে কোনো শিক্ষা দেননি; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা রাসূল সা.-কে যে ইলম দিয়ে পাঠিয়েছেন, সেই ইলম সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার দাবি পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন: 'এই ইলম কামেল, মুকাম্মাল।' আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন:
اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَاَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا
'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।'
সুতরাং যে ইলমের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিয়ামতকে মুকাম্মাল করে দিয়েছেন, সেই ইলম যদি কেউ অর্জন করে, আর বাইরের কিছু অর্জন না করার কারণে যদি সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ও, তাতে প্রমাণিত হলো, এই ইলম মুকাম্মাল নয়; অথচ আল্লাহ তা'আলা যে ইলম দিয়েছেন, সেই ইলম সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা দাবি করছেন, এই ইলম পরিপূর্ণ। যদি কোনোভাবে অন্য কারো কাছে এই ঠেকা রয়ে যায় যে, যদি ওই কৃষিপদ্ধতি অবলম্বন করা না হয় তবে উৎপাদন কম হবে, উৎপাদন যদি কম হয় তবে আমাদের জীবনে কষ্ট হবে — তার মানে, ওই বিষয়ে জানার ঠেকাও আমার আছে; না জানলে ক্ষতিগ্রস্ত হব।
এর উত্তর হলো, ইহুদি-নাসারাদের কাছে কোনো জ্ঞান আছে, সেটা গণিত হোক, বিজ্ঞান হোক বা প্রযুক্তি হোক, যা না জানলে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব; যেটা কুরআন শরিফের ইলমের অংশ নয়। তাই যদি হয় যে, ওই ইলম না জানলে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হই, তাহলে এই ইলমকে পরিপূর্ণ ইলম বলা যায় না; একটি অংশ এই ইলমের বাইরে রয়ে গেছে। অথচ আল্লাহ তা'আলার পরিষ্কার কথা, এটা পরিপূর্ণ। অথচ ফায়দা তো পাচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা দেখাবেন — কেমন করে পরিপূর্ণ।
পরবর্তীতে আল্লাহ তা'আলা যখন প্রাচুর্য দিলেন আর গোটা দুনিয়ার খারাজ (কর) ইত্যাদি আসতে লাগল তখন দেখা গেল, মদিনাবাসী কৃষিকাজ শিখেছে ঠিকই, তবে এই ফসলের কারণে তারা লাভবান হচ্ছে না; বরং ফসলের দিকে তাদের নজরও পড়ছে না। তারা তো তাদের মাঠ ফেলে দিয়ে দাওয়াতের কাজের মধ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা ওই পর্যায়ে চলে গিয়েছেন যে, উন্নত পদ্ধতি জানলে কী হবে; লিকাহ ইত্যাদি জানেন তো ঠিকই, কিন্তু করেছেন না কোনোটাই; বরং তারা দাওয়াতি সফর করছেন।
আর এই বিষয়ে যেন ফাঁক রয়ে না যায় দাওয়াতের ক্ষেত্রে, এজন্য আল্লাহ তা'আলা তাঁর কুদরত দেখালেন। আর সেটি হলো, তাবুক যুদ্ধের সময় ফসল ভালো হলো; কিন্তু ঠিক ওই সময়ই দীর্ঘ সফরে পাঠিয়ে দিলেন, যাতে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। আর এতে তাদের রিজিক কমে যায়নি, বরং পুরো অঞ্চলের সব ফসল তাদের কাছে চলে এসেছে। আর অঞ্চলের সব ফসল যে তাদের নিকট চলে আসছে, এটা ওই ঈমান-আমলের দাওয়াতের বুনিয়াদের উপরই আসছে; কৃষিকাজের উপর নয়। পরবর্তীতে যে প্রাচুর্য মদিনায় এলো, ওই প্রাচুর্যের ছোট্ট একটি অংশও তারা তাদের কৃষিকাজের মাধ্যমে অর্জন করতে পারতেন না। এরকম বহু বিষয় আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন তাদের ঈমান ও আমলের বুনিয়াদের উপর।
এরও আগে, বদরের ময়দানে গিয়েছেন। তাদের কাছে অস্ত্র ছিল না, সওয়ারিও ছিল না। রাসূলে কারিম সা. যেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন সেখানে পানির উপরেও দখল ছিল না। হাব্বাব ইবনে মুনযির রা. এসে প্রস্তাব দিলেন, আমরা একটু এগিয়ে অবস্থান নিই, তাতে পানির উপর আমাদের দখল থাকবে। এই প্রস্তাবটি রাসূল সা. গ্রহণ করলেন। যুদ্ধ হলো, জয়যুক্ত হলেন।
কেউই এই কথা বলতে পারবেন না যে, পানির উপর দখল নেওয়ার কারণে তারা জয়যুক্ত হয়েছেন। রাসূল সা. ইবনে মুনযিরের আবেদন মেনে নিয়েছেন, আপত্তি করেননি; কিন্তু এর দ্বারা প্রমাণিত হলো, এর মাধ্যমে মুসলমানদের কোনো ক্ষতিও হয়নি, লাভও হয়নি। যুদ্ধে যে জিতেছেন, ওইটা তো আসমানি ফায়সালার কারণে জিতেছেন; যা আল্লাহ তা'আলা তাদের আমলের কারণে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
اِذْ تَسْتَغِيْثُوْنَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ
'আর স্মরণ করো, যখন তোমরা তোমাদের রবের নিকট সাহায্য চাইলে তখন তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন।'
এই কথা বলা হয়নি যে, আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করলেন তোমাদের ইস্তিকামাত আর তোমাদের পানি থাকার কারণে; বরং ওই পানি থাকার কোনো দখল নেই এই ব্যাপারে। ওইটা থাকলেই বা কী, আর না থাকলেই বা কী। মানুষ যেহেতু চেয়েছে তাই দিয়েছেন; কিন্তু পরবর্তীতে পরিষ্কার দেখা গিয়েছে, এর সাথে কোনো লাভ বা ক্ষতির সম্পৃক্ততা নেই। ঠিক তেমনিভাবে মদিনার প্রাচুর্যের সাথে মদিনার কৃষিকাজেরও সম্পৃক্ততা নেই; কারণ তারা কৃষিকাজে সময়ই দিতে পারেননি; তাদের নিজেদের বাগানের ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বরং সব ফসল বাইর থেকে এসেছে। আর এগুলো তাদের দীনি দাওয়াতের কারণেই এসেছে। এই ধারা কেয়ামত পর্যন্ত এটাই চলতে থাকবে।
দ্বীন এভাবেই মজবুত হবে, আর সব আসবাবওয়ালারা আসবাব থাকুক বা না-থাকুক, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকেই উপরে রাখবেন। আল্লাহ তা'আলা এই কথাই পরিষ্কার বলেছেন, তবে শুধু ঈমানের শর্ত আরোপ করেছেন:
وَلَا تَهِنُوْا وَلَا تَحْزَنُوْا وَاَنْتُمُ الْاَعْلَوْنَ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ ﴿۱۳۹﴾
'তোমরা হীনবল ও দুঃখিত হয়ো না, বস্তুত তোমরাই জয়ী থাকবে যদি তোমরা মুমিন হও।'
একটি শর্তই তো বিদ্যমান আছে; এর সাথে আরো অন্যান্য শর্ত নিজ থেকে যোগ করে দিতে হবে — এমন নয়। একটি শর্তই যথেষ্ট। তখনও যথেষ্ট ছিল আর কেয়ামত পর্যন্ত তা যথেষ্ট থাকবে। বদরের ময়দানের কথা শেষ হয়নি, ইয়ারমুকের ময়দানেও তারা লড়েছেন। রোমীয়দের সাথে তারা লড়েছেন।
রোমীয়রা পরাজয়ের পর তাদের রাজা হিরাক্লিউস পালিয়ে গেল আন্তাকিয়ায়। আরবি ভাষায় তাকে হিরাক্লিস বলে। আন্তাকিয়া তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিমের একটি শহর; এখনো শহরটি বিদ্যমান আছে। হিরাক্লিউসের পলায়নকারী সৈন্য-সামন্তরাও আন্তাকিয়ায় এসে একত্র হলো। তাদের কাছে হিরাক্লিউস জানতে চাইল, আমাদের পরাজয়ের কারণ কী? যদিও তারা যুদ্ধে হেরে গেছে; কিন্তু রোম সাম্রাজ্য এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তাই তাদের ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিতে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা চলছে। তারা কি সংখ্যায় আমাদের থেকে বেশি — ইত্যাদি নানান ধরনের সম্ভাব্য প্রশ্ন করল। সব প্রশ্নের উত্তর হলো এটাই যে, রোমীয়দেরই জেতার কথা; কিন্তু মুসলমানরাই জিতেছে।
সবশেষে প্রশ্ন করল, আমরা কেন পরাজিত হলাম আর ওরা কেমন করে জয়যুক্ত হলো? একজন প্রবীণ সিপাহি, জ্ঞানী ব্যক্তি। সে দাঁড়িয়ে বলল, হে মহান রাজা! আমি বলছি, আমরা কেন হারলাম আর তারা কেন জিতল। যে এই কথা বলছে, সে মুসলমান ছিল না; সে ছিল খ্রিস্টান। সেই কারণগুলো বলল, 'মুসলমানরা রাত জেগে ইবাদত করে। ন্যায়বিচার করে। মদ খায় না। ওয়াদা রক্ষা করে। দাম না দিয়ে কারো জিনিস জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয় না।' এই যে কথাগুলো বলল, এই ইলমই রাসূল সা. নিয়ে এসেছেন। এই কথার মধ্যে গণিতের কোনো প্রভাব নেই, কোনো বিজ্ঞান নেই, কোনো প্রযুক্তি নেই। এই কথাগুলো সব ইবাদতের, আখলাকের, মুয়ামালাতের; যে ইলম আল্লাহ তা'আলা রাসূল সা.-কে দিয়ে পাঠিয়েছেন। একজন খ্রিস্টান স্বীকার করছে, তাদের যুদ্ধে পরাজয়ের কারণ, মুসলমানদের কাছে ইবাদত আছে; আখলাক আছে; সহিহ মুয়ামালাত আছে।
পরাজিত রোমীয়দের কাছে ওই জামানায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ইত্যাদি ছিল; কিন্তু যুদ্ধে তা কোনো দাগ কাটেনি। কথা সেখানেই শেষ হয়নি, পারস্যের সাথে পরবর্তীতে যুদ্ধ হয়েছে। ওখানেও হেরেছে। ইরানি রাজা হরমুজানকে কয়েদি করে আনা হয়েছিল মদিনায়। উমর রা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হরমুজান কেমন আছ? হরমুজান উত্তরে বলল, হে উমর! তোমার ও আমাদের মধ্যে কোনো মোকাবেলা ছিল না। আরব ও ইরানের মধ্যে কোনো সমকক্ষতা ছিল না। তাদের মোকাবেলা তো রোমীয়দের সাথে ছিল; আরবদের কোনো অস্তিত্বই তো ছিল না। কিন্তু হে উমর! মাঝখানে তোমাদের রব এসে গেছেন।
এই কথাগুলোও যে বলছে, সেও মুসলমান নয়। সে ঈমানদার নয়, তাকে অগ্নিপূজক বলা হয়। সুতরাং এই দ্বীন যে মুকাম্মাল, তা খ্রিস্টানরাও বলছে, অগ্নিপূজকরাও বলছে। তারা যুদ্ধের ময়দানে স্বীকার করছে, যেখানে প্রযুক্তি ইত্যাদি সরাসরি প্রয়োগ হয়।
রাসূল সা. যে ইলম নিয়ে এসেছেন, আল্লাহ তা'আলা যাকে মুকাম্মাল বলছেন — মুকাম্মাল মানে, 'যে মানে না, যে দেখার পরে বিশ্বাস করে — সেও মানতে বাধ্য হয়েছে।' তার আকিদার কারণে নয়; বরং সে সরাসরি দেখেছে। অতঃপর মানতে বাধ্য হয়েছে। ওই সাহাবিরা, যারা এই ঈমান, আমল, আখলাক ইত্যাদি ছাড়া আর কিছুই জানতেন না, তারাই এই দুনিয়ায় আধিপত্য পেয়ে গেলেন।
আবু হুরায়রা রা. সম্ভবত উমর রা.-এর জামানায় হিমাস অঞ্চলের আমির ছিলেন। তিনি একবার খারাজ (কর) সঙ্গে নিয়ে মদিনায় এলেন। উমর রা. জিজ্ঞেস করলেন, কত? — চারশত হাজার বা চার লক্ষ। উমর রা. সন্দেহ করলেন — চার (৪) সংখ্যাটি বুঝেছেন কি না। তাই জিজ্ঞেস করলেন, চার বুঝেছ? উত্তরে আবু হুরায়রা রা. আঙুল গুনে গুনে বোঝালেন, এক, দুই, তিন, চার। উমর রা. তার গণিতের জ্ঞান দেখে মুগ্ধ হলেন যে, চার পর্যন্ত শুদ্ধভাবে গুনেছেন। এই আবু হুরায়রা রা.-কে অঞ্চলের আমির বানানো হয়েছিল। তার অঞ্চলে অধীনস্থ বেশুমার বৈজ্ঞানিক আছে; কিন্তু মানুষ পরিচালনা, দেশে আইন-শৃঙ্খলা, দেশে শান্তি তথা ভালো জীবনের সাথে যা-কিছু জড়িত, তা প্রতিষ্ঠা করার জ্ঞান আবু হুরায়রা রা.-এর কাছে ছিল।
আফসোসের কথা হলো আজ আমরা মনে করি, তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। দূরের অন্যদের কাছে তো দূরের কথা, মুসলিম সমাজের ভেতর যারা একটু দ্বীন থেকে দূরে, আর অন্যান্য সভ্যতায় প্রভাবিত, তাদের কাছে দাওয়াত দেওয়ার সময় মনে করে, তাদের কাছে আমি নিজেকে গ্রহণযোগ্য করিনি। তাই তার মতো কিছু পোশাক, তার মতো কিছু চালচলন ইত্যাদি। অথচ এই দীনি দাওয়াতে কামনা হলো, নিজেকে তার মতো সাজাবে না, বরং ঘটনাক্রমে যদি কোনো সামঞ্জস্য এসেও যায়, তা থেকেও নিজেকে পবিত্র করব। যেন ভুলবশতও কোনো সামঞ্জস্য না এসে যায়। আর হুশিয়ার থাকা, তার অনুরূপ কিছু না হওয়া; আমি ভিন্ন। রাসূল সা. ইরশাদ করেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
'যদি কেউ কোনো কারণে কারো অনুকরণ করল, সে তাদের মতো হয়ে গেল।'
ওদের মতোই যদি সে হয়ে গেল, তবে তাকে কী আর দাওয়াত দেবে? তার দিলের মধ্যে যদি সে ঢুকে যায় তবে সে তো ওই দিলেরই অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। রাসূল সা. ইরশাদ করেন:
مَنْ كَثَّرَ سَوَادَ قَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
এজন্য নিজের পরিচয়কে অক্ষত রেখে দাওয়াত দেওয়া। সাহাবাগণ নিজের পরিচয়কে সম্পূর্ণভাবে অক্ষত রেখেছেন। আর ওই দাওয়াতের মাঝেই ছিল শক্তি। আল্লাহ তা'আলা সেই সম্ভাবনা আজও আমাদের কাছে রেখেছেন। এই দাওয়াত নিয়ে আমরা যাই পুরো দুনিয়ার কাছে, নিজের সমাজের কাছে ঈমান ও আমল নিয়ে। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে দিয়ে আবার দ্বীন জিন্দা করাবেন; কিন্তু এই ধারায় না পড়ি যে, আমাদের নিজেদেরকে অন্যদের নিকট গ্রহণযোগ্য বানাতে হবে; তার মতো কিছু করতে হবে। যাতে সে মনে করে যে, হ্যাঁ, ইনিও সভ্য লোক।
সাহাবায়ে কেরাম এই বিষয়ে খুব সতর্ক ছিলেন যে, কেউ যেন তাকে এই উম্মি কওমের বহির্ভূত কিছু মনে না করে। নিজের উম্মিপনাকে বড় সতর্কতার সাথে যত্ন করে রেখেছেন; যাতে এর উপর কোনো দাগ না পড়ে। এটাই বড় গৌরব। আল্লাহ তা'আলা আমাদের তাওফিক নসিব করুন, আমাদের ঈমান-আমলের বুনিয়াদের উপর নিজেদের জীবন গড়ি, পুরো উম্মত গড়ি। আর যখন ঈমান-আমলের বুনিয়াদের উপর এই উম্মত উঠবে, তখন অন্যান্য জাতিগুলো নিজে থেকেই চলে আসবে ইসলামের দিকে।
সাহাবাগণ গিয়ে তাদেরকে বোঝান; কিন্তু না তাদের কাছে ভাষা ছিল তাদেরকে বোঝানোর জন্য, আর না সাহাবাগণ তাদের ভাষা জানতেন, আর না সাহাবাদের ভাষা তারা জানত। আর এর চেয়েও কঠিন বিষয় ছিল যে, বোঝানোর জন্য চিন্তাধারার মধ্যে সামঞ্জস্য তথা যুক্তি ইত্যাদির অভাব। সাহাবাদের কাছে ওইসব যুক্তিজ্ঞান ছিল না যে, তার ভাষায় তার যুক্তি দিয়ে বোঝাবেন। না তার ভাষা ছিল, না তার যুক্তি ছিল; বোঝানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু এমন দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন, আর ওই দাওয়াতের মাঝে এমন এক শক্তি ছিল যে, এক কথাতেই মেনে নিয়েছে।
ইরতিদাদকারীরা যারা করেছিল যে, তারা জাকাত দেবে না — তাদের বিরুদ্ধে যখন আবু বকর রা. জিহাদের ফায়সালা করলেন, তখন অন্যান্য সাহাবাদের মধ্যে হযরত উমর রা.-ও এসে বাধা দিলেন যে, এখন না। আমরা দুর্বল, একটু সুধরে যাক; এরপর মোকাবেলা করা হবে; তবে এখন না। আবু বকর সিদ্দিক রা. উমর রা.-এর কোনো যুক্তি মানতে চাইলেন না। এক পর্যায়ে তাঁর বুকের উপর হাত মেরে জোরে এই কথা বললেন, 'এই জিহাদ... এটাই শুদ্ধ, এটাই হক।' (وَاللهِ وَالْحَقُّ) এই কথা বলে উমর রা.-এর বুকে জোরে চাপড় মারলেন। যখন বুকে মারলেন, তখন উমর রা. মেনে নিলেন, হ্যাঁ, এটাই ঠিক।
আশরাফ আলী থানবি রহ. এই প্রসঙ্গে বলেন, وَاللهِ وَالْحَقُّ 'এটাই শুদ্ধ, এটাই হক' — এটা কোনো যুক্তি নয়। বোঝানো বলতে যা বোঝায় যে, যুক্তি ও তর্ক দিয়ে বোঝানো, 'এটা করা উচিত' — এর কিছুই এর মধ্যে নেই। বুকে হাত মেরে বললেন, এটাই ঠিক; আর বড় আশ্চর্যের কথা যে, উমর রা. বুঝেও নিলেন। এটা আবার কী ধরনের যুক্তি? — এটাই আসল যুক্তি। যে জিনিসকে আমরা যুক্তি বলি, ওই যুক্তি দিয়ে বড়জোর একজন মানুষকে এইটুকু মানানো যায় যে, 'হ্যাঁ, আপনি যা বলছেন, তা ঠিক।' 'হ্যাঁ, এটাকে ঠিক বলা যেতে পারে।' এই দুর্বল যুক্তির উপর একজন মানুষ তার ধর্ম ত্যাগ করে, তার আত্মীয়-স্বজন, মা-বাপ, শ্বশুর-শাশুড়ি, ছেলেমেয়ে, ভাই-বোন — সব ত্যাগ করে নতুন ধর্মে চলে আসে।
তার সম্পূর্ণ জীবন পরিত্যাগ করে নতুন জীবনে এলো। সাহাবিরা সেই সব যুক্তিতে আসল, যে যুক্তিতে আবু বকর রা. উমর রা.-কে মানিয়েছেন وَاللهِ وَالْحَقُّ — 'এটাই শুদ্ধ, এটাই হক'। এক কথায় দিল বদলে গেল। কিছুক্ষণ আগে বলছিলেন, এটা বেঠিক; এখন বলছেন এটাই ঠিক। কোনো যুক্তি নেই, শুধু দিল বদলে গেল। যুক্তি দিয়ে দিল বদলানো যায় না, এর জন্য ওই শক্তিশালী কথারই প্রয়োজন, যে তালকিনে এক কথায় বদলে গেছে সব।
এইটা তখনই আসবে যখন আমলি শক্তিকে সাথে নিয়ে যাবে। আর আমলি শক্তিকে যুক্তি দিয়ে কলুষিত করবে না, দুর্বল বানাবে না; বরং সোজা আমলি শক্তি নিয়ে দাওয়াত দিয়ে যাবে। তখন ওরা দাওয়াত গ্রহণ করবে। দাওয়াতকারী বুঝতেও পারবে না যে, কেন তার কথা মেনে নেওয়া হয়েছে। এই কথার পেছনে কোনো যুক্তি নেই, কিন্তু যাকে বলল, সে ঠিকই মেনে নিল। কেন মেনে নিল — সে তা কখনো বুঝতে পারবে না। সে বুঝতে পারবে না, তার দিল বদলে গেছে। তো সাহাবায়ে কেরাম ওই দাওয়াত নিয়ে গিয়েছেন; সাহাবাদের উপস্থিতির কারণে মানুষের দিল বদলে গেছে। দাওয়াত তো এমনই হতে হবে। আজও আমরা যখন ঈমান-আমলের দাওয়াত নিয়ে যাব, তাকে বোঝানোর চেষ্টা করব না যুক্তি দিয়ে, বরং আমল, আখলাক, ইবাদতের শক্তি দিয়ে যখন বোঝাব — তখন তার কথার দাওয়াত গ্রহণ করবে এবং তার দিল বলবে, এটাই ঠিক।
প্রতিটি জামানায় দাওয়াত এভাবেই হয়েছে। যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে একেবারেই হয়নি — এমন নয়; কিন্তু তুলনামূলকভাবে ওইটা দুর্বল। যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে আজও মানুষ ইসলামের দিকে আসছে, কিন্তু তাদের সংখ্যা একেবারেই কম। যারা আসে, তাদের কাছে কোনো যুক্তি নেই; এমনিতেই আসছে। ফ্রান্সে একজন মুসলমান ছিল। একটু দুর্বল ধরনের। যদিও মুসলমান হয়েছে কিন্তু আমল ইত্যাদি অতটা মজবুত ছিল না। আমাদের সাথে একটু সম্পর্ক ছিল।
সে আলজেরিয়ার কিছু মানুষের সাথে ঘোরাফেরা করত। আলজেরিয়ার কিছু মানুষ দেয়াল ইত্যাদিতে বাঘ, হরিণের ছবি আঁকতে পছন্দ করে; আমাদের দেশেও এমন মানুষ আছে। তো তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তুমি মুসলমান কেন হলে? তখন সে উত্তরে বলল, 'তাদের ঘরে বাঘ-ভালুকের ছবি আমার খুব ভালো লেগেছে। তাদের ঘরে বাঘ, হরিণ ইত্যাদির ছবিযুক্ত কার্পেট দেখে আমি মুসলমান হয়ে গিয়েছি।' এই কথার মধ্যে কী যুক্তি আছে? আলজেরিয়ানদের বাঘের ছবি পছন্দ হয়েছে — এজন্য মুসলমান হয়ে গেলাম? এর চেয়ে উদ্ভট যুক্তি আর কী হতে পারে। আসল কথা এটা নয়; মূলত সে নিজেও জানে না, সে কেন মুসলমান হয়েছে। তার দিলের উপর এমন আসর পড়েছে, যে আসর সে ব্যাখ্যা করতে পারছে না।
আমরা যে এখানে তাবলিগে সময় লাগাতে এসেছি। কাকরাইলের ঘটনা, এক সাথির সাথে গল্প করছিলাম সালের সফরে। কেমন করে মুসলমান হয়েছ — এই প্রশ্ন সাধারণত আমি করি না। কারণ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই প্রশ্নে একটু বিরক্ত হয়। বিরক্ত হওয়ার কারণ হলো, এই প্রশ্নকারীর সম্মুখীনতায় তাকে বারবার হতে হচ্ছে। সেজন্য এই প্রশ্ন আমি কখনো করি না। কখনো আবার খুব ঘনিষ্ঠ হলে নিজ থেকেই বলতে চায়। তো সেই সাথি নিজ থেকেই বলল — কেমন করে আমি মুসলমান হলাম।
বলছিল কাকরাইলে বসে। আমাদের একটি জামাত গিয়েছিল প্যারিসে। তো ওই জামাতের একজন বাংলাদেশ অ্যাম্বেসিতে তার কোনো কাজের জন্য গিয়েছে। যেহেতু এদেশি লোক, তার কিছু কাজ আছে। অপরদিকে ওই ব্যক্তি বেড়াতে আসবে বাংলাদেশে, তাই সেও ভিসার জন্য গিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাম্বেসিতে। তখনই জামাতের সাথিভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ হয়। তখন সে বলল, তুমি বাংলাদেশে যাবে; ঠিক আছে। আমরা আছি অমুক জায়গায়। আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করো; তোমার সাথে গল্পগুজব করা যাবে।
পরবর্তীতে সে আগ্রহ নিয়ে সাক্ষাৎ করতে এলো। যেহেতু ওদের দেশেই যাবে, এজন্য তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেল। গিয়েছিল সকাল ১০টার দিকে। তখন জামাতের সাথিরা নাস্তা ইত্যাদি শেষ করে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব ও হাসাহাসি করছিল। তাদের মধ্যে কিছু ছিল সাদা দাড়ি আর কিছু ছিল কালো দাড়িবিশিষ্ট। সবাই এক মজলিসে বসে গল্প করছিল আর হাসছিল। ঠিক ওই সময় সে গিয়ে ঢুকেছে। একই মজলিসে সাদা দাড়ি ও কালো দাড়িবিশিষ্ট ব্যক্তিরা বসে বসে গল্প করছে এবং হাসছে — এই দৃশ্যটি তার কাছে এতটাই ভালো লাগল যে, সে মুসলমান হয়ে গেল। (সুবহানাল্লাহ)
আবারো সেই একই কথা। এর চেয়ে উদ্ভট যুক্তি আর কী হতে পারে! এটা কোনো যুক্তিই না। মুসলমান হয়ে যাওয়ার কারণ কোনো কিতাবে এই ঘটনাগুলো দলিল হিসেবে লিখলে যে, এভাবে এভাবে দাওয়াত দিয়েছে — তো এর চেয়ে বেওকুফি কথা আর কী হতে পারে! কিন্তু কথা সত্য। আসলে তার দিলের উপর আঘাত পড়েছে। কেন পড়েছে — এর কারণ সে নিজেও ভালো করে জানে না। আমলের মধ্যে, নামাজ ইত্যাদির মধ্যে এমন একটি শক্তি আছে, যা কোথাও পাওয়া যায় না।
নিউইয়র্কে একটি জামাত গিয়েছিল অনেক আগে। একজন সাংবাদিক যিনি খুবই শিক্ষিত ও মেধাবী ছিলেন, তিনি ওই জামাতকে নুসরাত করেছিলেন। এক পর্যায়ে সাথিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল যে, এই শিক্ষিত ও মেধাবী যুবককে যে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিয়েছে, সে নিশ্চয়ই বড় শিক্ষিত হবে। তো তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কেমন করে মুসলমান হলে? উত্তরে সে বলল, আমি মরক্কো গিয়েছিলাম ভ্রমণে।
মরুভূমি অঞ্চল... সন্ধ্যাবেলা যাচ্ছি তো দেখলাম, এক লোক রাস্তার পাশে তার মাথার বোঝা রাখল। নামাজ পড়ল। আবার সে তার টুকরি মাথায় উঠিয়ে চলে গেল। এই দৃশ্য দেখে আমি মুসলমান হয়ে গেলাম।
এই সব ঘটনা এই দিকে ইঙ্গিত করে যে, এগুলো প্রচলিত অর্থে যেগুলোকে যুক্তি বলে — এর কোনোটির মধ্যে পড়ে না; কিন্তু আমলের মধ্যে কোনো এক শক্তি নিহিত ছিল যে, দিলের উপর আঘাত করেছে। সাহাবিরা এই শক্তি নিয়েই গিয়েছেন। কোনো কথাবার্তা কিছু ছিল না। আমাদের মতো দুর্বল আমলের মানুষ যদি এত শক্তি বিস্তার করতে পারে তো সাহাবাদের মতো আমল কী করতে পারত! (আল্লাহু আকবার)
আমার এক বন্ধু ছিল আফ্রিকান আর আরেকজন বিলেতি। তো একবার কোনো কারণে দুজন একসাথে নামাজ পড়ছিলাম আর বিলেতি বন্ধু চেয়ারে বসে বসে দেখছিল। আমাদের নামাজ যে খুব উন্নত মানের ছিল না — এটা আমরা খুব ভালো করেই বুঝছিলাম। কারণ, আমি নামাজ পড়ছিলাম আর বারবার লক্ষ্য করছিলাম, ও কী করছে। আর এর মাধ্যমে আমার নামাজের খুশু-খুজুর একটা ধারণা করা যায়। আর ইমাম যে আফ্রিকান ছিল, ও বেচারা ইমামতি করত ঠিকই, কিন্তু বোঝা মুশকিল — কী তিলাওয়াত করছে। সে তার আঞ্চলিক কেরাতেই পড়ত। এই ছিল নামাজের জাহেরি সুরত।
প্রায় ৬ মাস পর আমি যখন চলে আসব, তখন ওই বন্ধু যে চেয়ারে বসে আমাদের নামাজ দেখছিল, তার নাম মিশেল ফাদানি; এখনো বেঁচে আছে কি না জানি না; তখন অসুস্থ ছিল। সে আমাকে এগিয়ে দিতে এলো। বিদায়ের সময় শেষ কথা বলল, 'সেই ভোর (যখন আমাদের ফজরের নামাজ পড়তে দেখছিল) আমি কখনো ভুলব না।' অতএব, এত দুর্বল নামাজে যদি এত জবরদস্ত আসর হতে পারে, তাহলে আল্লাহওয়ালাদের নামাজে কী শক্তি আছে! সুতরাং সাহাবায়ে কেরাম যে দাওয়াত দিতে গিয়েছিলেন, তারা তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সভ্যতা, যুক্তি ও দর্শনের জ্ঞান নিয়ে যাননি, তারা গিয়েছেন তাদের আমল ও আখলাক নিয়ে। ওই আমল ও আখলাক তাদেরকে বাধ্য করেছে। তারা তাদের সবকিছু ছেড়ে দিয়ে পাগল হয়ে চলে এসেছে।
ওই জামানায় নিজ ধর্ম ত্যাগ করে চলে আসা হলো আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার মতোই। নিজেরা সম্পূর্ণভাবে না হারালে সজ্ঞানে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। ঠিক যেরকম প্রদীপ জ্বলে আর পোকাগুলো এসে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তো সজ্ঞানে এই আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়াও কঠিন। যদি সে একেবারে নিজেকে না হারায়, ওই প্রদীপ দেখে সে একেবারে বিভ্রান্ত না হয়, তবে সে আগুনে পড়তে পারত না। সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াতে ওই শক্তি ছিল যে, নিজেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে এই দাওয়াতের মধ্যে চলে এসেছেন। চিন্তা করলে সম্ভব নয় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। একটু ঠান্ডা মাথায় যদি সে চিন্তা করে যে, মা-বাবার কী হবে, আমার স্ত্রীর কী হবে, ছেলেমেয়েদের কী হবে — তাহলে সে থেমে যাবে। কিন্তু সে যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে — এর কোনোটাই সে ভাবছে না; এমনিতেই সে চলে আসছে। এজন্য ভাই দাওয়াত দিলে যে আসবে, ঈমান ও আমলের কারণেই আসবে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের তাওফিক নসিব করুন।
আমরা পাকা ফায়সালা করে ফেলি: ইনশাআল্লাহ, এই দাওয়াতেরই কাজ করব। আর এই দাওয়াতের জন্য ঈমান ও আমল যা একজন মুসলমান, একজন দাই-এর হওয়া উচিত, আমরা সেগুলো অর্জন করার চেষ্টা করব। আল্লাহর কাছে তাওফিক চাইব, আল্লাহ তা'আলা যেন এই ঈমান ও আমল আমাদের দান করেন। (আমিন)
এজন্য আল্লাহর পথে বের হয়ে মেহনত করতে হয় আর নিজ অঞ্চলেও মেহনত করতে হয়। আমরা ফায়সালা করি ইনশাআল্লাহ। আর ফায়সালা যদি আগে থেকেই থাকে, তাহলে আবার করো; বারবার করে করো। ফায়সালাকে মজবুত করো। যেমন একই নামাজ বারবার পড়তে হয়, একই জিকির বারবার করতে হয়, ঠিক সেভাবে আবারো মজবুত করো যে, ইনশাআল্লাহ, মাকামি কাজ মজবুতির সাথে করব। প্রতিদিন নিজ মসজিদে সময় দেব। কমপক্ষে আড়াই ঘণ্টা দেওয়ার চেষ্টা করব। আর আগে থেকে যদি চিল্লা দেওয়া থাকে তাহলে এখন থেকে নিয়ত করি, প্রতি বছর তিন চিল্লা দেওয়ার চেষ্টা করব। আল্লাহ তা'আলা তাওফিক নসিব করুন। (আমিন)
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ
[বয়ান সমাপ্ত]
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দুআ কবুল না হওয়ার কারণ: আমরা কি ভুল চাইছি?
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] أعوذ بالله من الشيطان الرجيم. بسم الله الرحمن الرحيم مَنۡ عَمِلَ صَالِح...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৪৭৩১
দ্বীন ও দুনিয়া
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] দুনিয়ার সব মানুষের কাজকর্ম ও চেষ্টা-পরিশ্রমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—এক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৩৪৭
ত্যাগের বিনিময়ে সম্পর্ক: উম্মতের মহব্বতের বুনিয়াদ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: গাউসনগর জামে মসজিদ, ইস্কাটন রোড, ঢাকা তারিখ: ৯ জুন ২০০৬,বেলা:৩.৩...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
২৭৫১
প্রত্যাশা-হিসাব ও তাওয়াক্কুল-বরকত
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও ক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৪৬৩১
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন