ব্যক্তির ভেতর ও বাহিরের সংশোধন
ব্যক্তির ভেতর ও বাহিরের সংশোধন
[ প্রকৃত শান্তি বা ভালো জীবন (হায়াতে তাইয়্যেবা) শুধু বাহ্যিক আমল-ইবাদতে পাওয়া যায় না। এর জন্য মনের সংশোধন বা অন্তরের শান্তি জরুরি। অনেকে নামাজ-রোজা করেও অস্থির থাকেন, কারণ তাদের আমল ও প্রত্যাশার মধ্যে গরমিল থাকে। আল্লাহ যা দেননি, তা প্রত্যাশা করলে হতাশা আসে। প্রকৃত ইতমিনান আসে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থেকে, নিয়ত শুদ্ধ করে এবং তাঁর স্মরণে অন্তরকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে। তাই বাহ্যিক আমলের চেয়ে মনের ইসলাহ বা সংশোধন বেশি জরুরি।]
২৭ শে নভেম্বর ২০০৭, মঙ্গলবার, মাগরিবের পর, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মিনার ভাইয়ের চিল্লার জামাতের নুসরতে, ব্যাটারি গলি মাদরাসা মসজিদ, চট্টগ্রাম
আমি আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই। পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহ তাআলা বলেন, "যে পুরুষ বা নারী ঈমানদার অবস্থায় সৎকাজ করবে, আমি তাকে পবিত্র জীবনে জীবিত করব এবং তারা যা কিছু করত, তার সর্বোত্তম প্রতিদান আমি তাদেরকে প্রদান করব।" তিনি আরও বলেন, "জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর শান্তি পায়।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমার কোনো বন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা করল, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। আমার বান্দা আমি যা ফরজ করেছি, তার চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো জিনিসের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে না। আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, এমনকি আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। তারপর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শোনে; তার চোখ হয়ে যাই, যা দ্বারা সে দেখে; তার হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধর করে এবং তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি এবং সে যদি আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।" নবীজী (সা.) এমনই বলেছেন।
আল্লাহ তাআলা ভালো জীবনের (হায়াতে তাইয়্যেবা) ওয়াদা করেছেন দ্বীনের ওপর অটল থাকার জন্য। তিনি একথা বলেননি যে শুধু মৃত্যুর পরেই ভালো জীবন পাওয়া যাবে; বরং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গাতেই ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহর ওয়াদা সত্য। ভালো জীবনের সবচেয়ে বড় উপাদান হলো মনের তৃপ্তি ও প্রশান্তি। মন যদি অস্থির হয়, তবে বাহ্যিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও তাকে ভালো জীবন বলা যায় না; বরং তখন কেবল দৈহিক কষ্ট মেনে নেওয়া হয়, কিন্তু মন যেন শান্ত ও সন্তুষ্ট থাকে না। ভালো জীবনের জন্য মনের এই প্রশান্তি অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা এই ওয়াদা করেছেন। আর এই মনের প্রশান্তি ও ভালো জীবনের প্রত্যাশা নিয়েই আল্লাহর পথে চলার চেষ্টা আমাদের সবার থাকা উচিত।
আমরা নিজেরা দ্বীনের ওপর চলার চেষ্টা করছি এবং অন্যদেরও চলার তালিম দিচ্ছি। কিন্তু আমাদের সমাজের বিভিন্ন স্তরে যারা দ্বীনের মেহনত করছেন, তাদের অনেকের মধ্যেই দেখা যায় নানা ধরনের মানসিক অস্থিরতা ও সমস্যা। নামাজ-রোজা পালনকারী, তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, দাড়ি-টুপিওয়ালা অনেকের জীবনেও সেই প্রত্যাশিত প্রশান্তি ও আনন্দ দেখা যায় না। বরং তারা নিজেদের মধ্যে নানান অভিযোগ, দুশ্চিন্তা ও সমস্যার কথা বলে থাকেন।
অন্যান্য দ্বীনের কাজ-কর্ম যেমন শুদ্ধ ও সহিহ থাকা সত্ত্বেও যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তারা কেন নানা সমস্যায় জর্জরিত? আর যারা দ্বীনের সঙ্গে নেই, তাদের চেয়ে কি তাদের সমস্যা কম? সাধারণত দেখা যায়, দ্বীনের পথে চলা ব্যক্তিরা যেন একধরনের বিশেষ পেরেশানির মধ্যে দিন কাটান। অথচ আল্লাহ তাআলা তো তাদের জন্য ইতমিনানের (মনের প্রশান্তি) জীবন দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাহলে এই গড়মিল কোথায়?
হারুনুর রশিদের আমলে এক দরবেশ ছিলেন, বাহলুল নামে পরিচিত। বাহলুলের জীবন নিয়ে নানা ঘটনা, গল্প ও উপাখ্যান প্রচলিত আছে। একবার কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "বাহলুল, কেমন আছো?" উত্তরে বাহলুল বললেন, "তুমি আমার কথা আর কী জিজ্ঞাসা করছো? যার ইচ্ছায় জগৎ চলে, সেই রবের ইচ্ছায় আমি চলছি কি না, সেটাই তো বড় কথা!" প্রশ্নকারী হতবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কি তাহলে রুবুবিয়াতের (প্রভুত্বের) দাবি করছ? তুমি কি রব হয়ে গেছ? তোমার ইচ্ছায় জগৎ চলে, নাকি?"
বাহলুল বললেন, "না, আমি রুবুবিয়াতের দাবি করছি না। আমি আবদিয়াতের (বান্দাত্ব) দাবি করছি। আমি আল্লাহর বান্দা হয়ে গেছি, তাঁর গোলাম হয়ে গেছি। আমার নিজস্ব কোনো ইচ্ছা নেই। আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, সেটাই আমার ইচ্ছা। আর আল্লাহর ইচ্ছায় জগৎ চলে, তাই আমার ইচ্ছাতেই জগৎ চলে।"
তিনি আরও বললেন, "ইতমিনান তো ঠিকই হাসিল হবে, কিন্তু সেই ইতমিনানের জন্য জিকির শর্ত, আর জিকিরের শর্ত হলো, তার অন্তরে আল্লাহর সাথে যেন সম্পর্ক থাকে। যদি কেউ দ্বীনের ওপর চলছে, আর সেই চলার মধ্যে তার প্রত্যাশা যদি কিছু থেকে থাকে, যা আল্লাহ তাআলা দেবেন বলে ওয়াদা করেননি, তবে তার মনে অস্থিরতা আসা স্বাভাবিক। হুজুররা বলেছেন, আল্লাহর নির্দেশ মেনে চললেই সফলতা আসে। কিন্তু আমরা অনেকে নামাজ পড়ছি, রোজা রাখছি, সদকা করছি, কিন্তু 'জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্তি পায়'—এই সত্যিটা অনুভব করতে পারছি না। তার কারণ, তার জিকির সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি; সে কেবল বাহ্যিক আমলকেই জিকির বলছে, কিন্তু সেই আমলের আনুগত্যের মধ্যেও সঠিক নিয়ত ও অন্তরের গভীর সম্পর্কের অভাব রয়েছে। সে অনেক কিছুই করছে, কিন্তু কিছুই পাচ্ছে না।
এক ব্যবসায়ী যদি তার নিজের মতো করে তাফসির করে নেয় যে, 'আমার অনেক টাকা লাভ হবে', অথবা একজন নেতা যদি মনে করে ইলেকশনে জয়ী হওয়াই তার জন্য 'ফিদ দুনইয়া হাসানাহ', তাহলে সে তো তার নিজের মাপকাঠিতে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে বসে আছে। চায়ের দোকানি বলবে চায়ের দাম কমে যাওয়া, বিডিওয়ালা বলবে বিডি সস্তা হওয়া—প্রত্যেকেই নিজের মতো করে 'হাসানাহ' বা মঙ্গলের ব্যাখ্যা তৈরি করে বসে থাকে। আর সেই ব্যাখ্যা অনুযায়ী সে কিছু আশাও করে। অথচ আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে এমন কোনো ওয়াদা করেননি। তিনি যা দেবেন, তা তাঁর নিজস্ব জ্ঞানমতো, বান্দার জন্য প্রকৃত মঙ্গল কী, সেটাই তিনি দেবেন।
বান্দা যখন আমল করে, আর তার মনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট প্রত্যাশা পোষণ করে—যেটা আল্লাহ তায়ালা দেবেন বলে ওয়াদা করেননি—অথবা আল্লাহ তা দিতেও পারেন, কিন্তু সে নিজের ইচ্ছামতো সেটাকে ধরে নিয়ে অগ্রসর হয়, তখন তার মনের ভেতর একটা বড় গরমিল থেকে যায়। যেমন কোনো ছাত্র সামনে একটা পরীক্ষা আছে জেনেও যদি নিজের মনের মতো করে তাফসির করে নেয় যে "ভালো জীবন মানে পরীক্ষায় অনেক নম্বর পাওয়া", অথচ কোনো মুফতি তাকে সেটা বলেননি, বরং এটা ওর নিজের তৈরি একটা ধারণা। এখন সে যদি ভালো নম্বর না পায়, তবে খুব সহজেই মনে করতে পারে আল্লাহর ওয়াদা তো ঠিক হলো না, কিন্তু সেটা তো আল্লাহর ওয়াদা ছিল না। সে নিজেই নিজের মনের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা তৈরি করে নিয়েছে।
নানা কারণে দুনিয়ার মানুষ যেভাবে পেরেশান, ঠিক সেভাবেই নামাজি-রোজাদাররাও পেরেশান হন—এমন কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায় না। বরং একটু আগে গিয়ে যারা তাবলিগে যাচ্ছেন, চিল্লা দিচ্ছেন, দাড়ি-টুপি রাখছেন, তারাও সেই একই আনন্দ-শান্তির মধ্যে নেই। কারণ তাদের কাছেও সেই ইতমিনান পৌঁছায়নি। তাদের ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনায় নানান অভিযোগ ও দুশ্চিন্তার কথাই শোনা যায়। যারা দ্বীনের বিভিন্ন লাইনে আছেন, যেসব মেহনত সহিহ ও নির্ভুল, তাদের অবস্থাও কি অন্যদের চেয়ে ভিন্ন? বলা যায় না। বরং তারা নানা সমস্যার মধ্যেই ডুবে আছেন। আর দ্বীনের কাজের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষদের চেয়ে তাদের এই সমস্যা কম নয়।
যেমন, আল্লাহ তায়ালা অনেক বড় মেহেরবানি করেছেন কুরআন শরিফ স্পর্শ করার জন্য। তিনি বলেন, "পবিত্র ব্যক্তিরাই কেবল এটি স্পর্শ করবে।" নাপাক অবস্থায় কুরআন শরিফ স্পর্শ করা যায় না। মুত্তাকি না হলে অর্থাৎ দিল যদি পাক না হয়, তাহলে সে কুরআন শরিফের অর্থ স্পর্শ করতে পারবে না। অর্থ সে নিজে নিজে বের করার চেষ্টা করে। স্বাভাবিকভাবে সেটা শুদ্ধ অর্থ হয় না; আল্লাহ তাআলা সেজন্য কুরআনকে স্পর্শ করার বাহ্যিক শর্ত দিলেও, দিলের পবিত্রতা ছাড়া কুরআনের গভীর অর্থ উপলব্ধি করা সহজ নয়। যদি বাহ্যিক আমলের সংশোধন হয়, কিন্তু তার সঙ্গে যদি অন্তরের সংশোধন না হয়, তাহলে কি ইতমিনান পাওয়া যায়?
মদ খাওয়া, সুদ খাওয়া, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা—এসবের নিষেধাজ্ঞা যেমন আছে, তেমনি এসব থেকে নিজেকে বাঁচানোও এক ধরনের বাহ্যিক সংশোধন। কিন্তু এর পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা ঈমানের কথাও বলেছেন। ঈমান হলো অন্তরের অবস্থা, আল্লাহর সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলা। "যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।" এখন মনের ফাসাদ (অশান্তি) কী? মনের ভুল কী? মনের ভুল হলো এই ভালোবাসার জায়গায় ভুল করা; এমন জিনিসকে ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেননি। তাই এই তৎপরতাগুলো আগে করতে হবে মনের সংশোধনের জন্য। নামাজের জন্য যেমন বাহ্যিক পবিত্রতা, জায়গা পাক হওয়া, কাপড় পাক হওয়া, শরীর পাক হওয়া জরুরি—বাহ্যিক নাপাকি কী কী কারণে হয় সেসব বিবেচনা করা হয়। কোনো বস্তু যদি নাপাক লাগে, তাহলে জামাকাপড় যেমন নাপাক হয়, তেমনি দিলেও যদি খারাপ মহব্বত (ভালোবাসা) লাগে, তাহলে দিলও নাপাক হয়। বাহ্যিক নাপাকিতে শরয়ি নিয়ম অনুযায়ী নামাজ ফাসিদ হয়ে যায়। কিন্তু দিলের নাপাকিতে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা যায় না। বাহ্যিক নামাজ যদি ঠিকমতো আদায় করা সম্ভব হয়, কিন্তু দিল যদি আল্লাহর স্মরণবিমুখ ও অন্য বস্তুর প্রতি আসক্ত থাকে, তাহলে সেই আমল আল্লাহর কাছে কবুল হবে কি? তিনি তো দিলের দিকে তাকান। আমরা যেমনিভাবে বলছি, বাহ্যিক আমল ঠিক করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়ে বেশি জরুরি হলো অন্তর্নিহিত ইচ্ছা ও নিয়তের সংশোধন। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "নিশ্চয়ই সকল কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের ওপর।" নিয়ত শুদ্ধ হলে আমল গ্রহণযোগ্য হয়, এমনকি আমলে ভুল-ত্রুটি থাকলেও আল্লাহ তায়ালা তা ক্ষমা করেন। আর নিয়ত যদি ভুল হয়, তাহলে আমল শুদ্ধ হলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়।
সাহাবিরা যখন বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামাজ পড়তেন, তখনও তারা নামাজ পড়তেন। পরবর্তী সময়ে যখন কিবলা পরিবর্তনের হুকুম এলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের সঙ্গে বায়তুল্লাহমুখী হয়ে নামাজ পড়লেন। তখন ইহুদিরা বলতে শুরু করল, "এতদিন যে নামাজ পড়েছিলে, তা সব বরবাদ হয়ে গেল!" উত্তরে আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাজিল করলেন, "আল্লাহ তোমাদের ঈমান (এখানে নামাজ বোঝানো হয়েছে) কখনো নষ্ট করবেন না।" আলেমরা ব্যাখ্যা করেন, এই আয়াতে 'ঈমান' বলে নামাজ বোঝানো হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তায়ালা তোমাদের আগের নামাজ নষ্ট করেননি। বাহ্যিক নামাজ যদি নির্দিষ্ট কিবলামুখী না হওয়ায় কোনো আপাত সমস্যা ছিল, তবুও আল্লাহ তায়ালা সেই নামাজগুলোকে কবুল করেছেন, কারণ বান্দার নিয়ত ছিল বিশুদ্ধ। তিনি কিবলা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন বলে বান্দা তার আনুগত্য করেছে। তাই যখন তিনি নতুন কিবলা দিলেন, বান্দা সেটাও মেনে নিল। কিবলার দিকে মুখ করে নামাজ পড়া নামাজের রুকন বা শর্তের মধ্যে একটি। কিন্তু কিবলা ভিন্ন হওয়ায় নামাজ বাতিল হয়ে যায়নি। কারণ আল্লাহ তায়ালা দেখেছেন বান্দার দিলের ঈমান ও সৎ নিয়ত।
তাই বাহ্যিক আমল ঠিক করার পাশাপাশি নিজের ভেতরের অবস্থা সংশোধন করাও অন্তত সমান গুরুত্বপূর্ণ, বরং বেশি জরুরি। আল্লাহ তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দোয়া শিখিয়েছিলেন, "হে আল্লাহ! তুমি আমার অভ্যন্তরীণ অবস্থাকে আমার বাহ্যিক অবস্থার চেয়েও বেশি ভালো করে দাও। আর আমার বাহ্যিক অবস্থাকেও ঠিক করে দাও।" তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন অন্তরের সংশোধনে। বাহ্যিক আমল যদি ফরজ হয়েও যায়—যেমন কুরআন তেলাওয়াত করা, নামাজ পড়া—তা কিন্তু বেহুদা বা জায়েজ নয়, কিন্তু তা কবুল হওয়ার জন্য নিয়তই মুখ্য।
সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) ছিলেন মুস্তাজাবুদ দাওয়াত, অর্থাৎ তার দোয়া আল্লাহ তায়ালা কবুল করতেন। বহু মানুষ তার কাছে দোয়া চাইতে আসতেন। তিনি তাদের জন্য দোয়া করতেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি নিজেই অন্ধ হয়ে গেলেন। কেউ তাকে বললেন, "আপনি তো এত লোকের দোয়া কবুলের কারণ হয়েছেন, নিজের জন্য আল্লাহর কাছে চাইলেই তো চোখ ফিরে পেতে পারতেন!" উত্তরে তিনি বললেন, "আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য যা ইচ্ছা ও পছন্দ করেছেন, সেটাই আমার নিজের পছন্দের চেয়ে উত্তম।" তিনি এভাবে দোয়া করার চেয়ে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকাকেই শ্রেয় মনে করলেন। দোয়া করলেই যে সব কিছু হবে, তা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া ফয়সালাতেই সন্তুষ্ট থাকাই হলো দোয়া কবুল হওয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়।
বনি ইসরাইলের নবীর কাছে তারা পেঁয়াজ-রসুন চেয়েছিল। উত্তম মান্না-সালওয়া ছেড়ে দিয়ে তারা তুচ্ছ জিনিস চাইল। আল্লাহ তায়ালা নারাজ হয়ে বললেন, "ভালোর পরিবর্তে খারাপটা চাইছ?" বান্দার আবদার সব সময় তার মঙ্গলের জন্য হয় না।
সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকাটাকেই ভালো মনে করেছেন। এর অর্থ এই নয় যে আল্লাহর হুকুম অমান্য করা কিংবা ফরজ ইবাদত না করা, বরং তা করেই আল্লাহ যা দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকা। আর এই জিনিসটা হলো অন্তরের ব্যাপার। আর এই অন্তরের পেরেশানি থেকে মুক্তি পেতে হলে আল্লাহর স্মরণই একমাত্র পথ। আর জিকিরের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি লাভের জন্য দরকার আল্লাহর হুকুমের ওপর পূর্ণ আস্থা ও আনুগত্য।
মনে রাখতে হবে, আমরা আল্লাহর বিধান পালন করছি, তিনি আমাদের ভালোবাসেন বলে। তিনি আমাদের জন্য যা পছন্দ করেছেন, সেটাই আমাদের জন্য শ্রেয়, তাৎক্ষণিকভাবে বাহ্যিক দৃষ্টিতে যা ভালো মনে হোক না কেন। এই বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনই প্রকৃত ইসলাহ বা সংশোধন। যেমন একটি ঘোড়া তার মালিকের ইশারা বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী চলে, তাকে খুব টানাটানি করতে হয় না। কিন্তু ছাগলের বেলায় তার বিপরীত। গৃহস্থ যখন সকালে ছাগলকে চারণভূমিতে নিয়ে যেতে চায়, যেখানে তার প্রচুর খাবার থাকে, ছাগল তখন পিছনের পা দিয়ে গাড় হয়ে বসে যায় এবং টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে হয়। এই অনীহা ও টানাটানির কারণে সে নিজের জন্যই পেরেশানি ডেকে আনে। মানুষও তেমনি। আল্লাহ তায়ালা তার জন্য যা মঙ্গলজনক তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যদি সে তাতে সন্তুষ্ট থেকে থাকে, তাহলে অনায়াসে জীবন চলে যাবে। আর যদি না চায়, তাহলে পেরেশান থাকবে।
অতএব, নিজেকে সংশোধন করতে হলে দুইটি জিনিসই জরুরি—বাহ্যিক আমল ঠিক করা এবং তার সাথে অন্তরের ইচ্ছা ও নিয়তকে আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। ঠিক না ইনশাআল্লাহ, তিন চিল্লার ইরাদাকারীরা যাদের আগে চিল্লা হয়ে গেছে, প্রতিবছর তিন চিল্লার ইরাদা করি। যাদের এখনো চিল্লা হয়নি, তারাও নিয়ত করুক। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন। সুবহানা রাব্বিকা রাব্বিল ইযযাতি আম্মা ইয়াসিফুন, ওয়া সালামুন আলাল মুরসালিন, ওয়াল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, আমিন।
২৭ শে নভেম্বর ২০০৭, মঙ্গলবার, মাগরিবের পর, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মিনার ভাইয়ের চিল্লার জামাতের নুসরতে, ব্যাটারি গলি মাদরাসা মসজিদ, চট্টগ্রাম
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দ্বীনের মেহনতের ফায়দা নাকি দুনিয়া শিকারের ধান্দা
একজনের অসুখ হয়েছে, আর কিছুদিন পরপর সে তার নিজের স্বাস্থ্যের অবস্থার দিকে তাকায়। শক্তি বাড়ছে কিনা,...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২৩ জানুয়ারী, ২০২৬
৪৪৫১
দাওয়াতের প্রাণ মুহাব্বত
আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে ইখলাসের হুকুম দিয়েছেন। ইবাদতের মধ্যে যেমন ইখলাস দিয়েই তার মূল্য। পরিমাণে খুবই...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৪০৯৪
মন চাহি জিন্দেগী, রব চাহি জিন্দেগী
হিন্দুস্তানের মেওয়াতীরা তাদের গ্রাম্য সাদাসিধা ভাষায় একটা কথা বলতেন, এখনো বলেন অনেকে: জীবন দুই ধরন...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৪৩০১
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১৩৫৩৯
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন