দুআ কবুল না হওয়ার কারণ: আমরা কি ভুল চাইছি?
দুআ কবুল না হওয়ার কারণ: আমরা কি ভুল চাইছি?
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত]
أعوذ بالله من الشيطان الرجيم. بسم الله الرحمن الرحيم
مَنۡ عَمِلَ صَالِحًا مِّنۡ ذَکَرٍ اَوۡ اُنۡثٰی وَہُوَ مُؤۡمِنٌ فَلَنُحۡیِیَنَّہٗ حَیٰوۃً طَیِّبَۃً ۚ وَلَنَجۡزِیَنَّہُمۡ اَجۡرَہُمۡ بِاَحۡسَنِ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ (سورة النحل: ٩٧)
وقال تعالى: اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ (سورة الرعد: ٢٨)
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «إن الله تعالى قال: من عادى لي وليا فقد آذنته بالحرب، وما تقرب إلي عبدي بشيء أحب إلي مما افترضت عليه، وما يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه، فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به، وبصره الذي يبصر به، ويده التي يبطش بها، ورجله التي يمشي بها، وإن سألني أعطيته، ولئن استعاذني لأعيذنه». أو كما قال عليه الصلاة والسلام (رواه البخاري)
দীনদারদের জন্য ভালো জীবনের ওয়াদা
দীনের অনুসারীদের জন্য আল্লাহ তাআলা ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন। এ কথা বলেননি যে, শুধু মৃত্যুর পরই ভালো জীবন পাবে; বরং দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গায় ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ তাআলার ওয়াদা সত্য।
ভালো জীবনের যেসব উপাদান আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো মনে তৃপ্তি থাকা। মন যদি অস্থির হয় তবে কোনো ভালো জীবন হতে পারে না। শরীরের কষ্ট মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু অশান্তির সাথে বাঁচা যায় না। তাই সবাই চেষ্টা করে মন যেন শান্ত থাকে, স্থির থাকে।
আল্লাহ তাআলার মেহেরবানী, মুসলমানরা নিজ নিজ সাধ্যমতো দীনের ওপর থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে... আমরাও করে যাচ্ছি। সে হিসেবে আমাদেরও প্রত্যাশা 'ভালো জীবন'। আমাদের নিজেদের ব্যাপারে অথবা আমাদের কাছের যারা আছেন তাদের দিকে যদি তাকাই, তবে আল্লাহ তাআলা যে ওয়াদা করেছেন সে ওয়াদার বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
দীনের বিভিন্ন লাইনে যারা মেহনত করছেন বা নামাজ-রোজা করছেন, তারা যে অন্যান্যদের তুলনায় একটু শান্ত মন নিয়ে আছেন—এটা খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। বিভিন্ন কারণে দুনিয়ার বাকি মানুষ যেমন পেরেশান, নামাজ-রোজার পাবন্দ ব্যক্তি একেবারে সমানভাবে না হলেও উল্লেখযোগ্য তেমন পার্থক্য দেখা যায় না।
এমনকি আরেক ধাপ এগিয়ে বলা যায়, যারা তাবলিগে গিয়েছে, চিল্লা দিয়েছে, দাড়ি রেখেছে, টুপি পরে—তারাও যে খুব একটা আনন্দের মধ্যে, শান্তির মধ্যে, সন্তুষ্টির জীবন পাচ্ছে, এমনটা নয়। তারাও যখন আপনজনদের সাথে বসে কথা বলে, তখন নানান অভিযোগ আর দুশ্চিন্তা ব্যক্ত করে, নানান সমস্যার কথা বলে।
দীনের অন্যান্য যে মেহনতগুলো আছে, যেগুলো শুদ্ধ-সহিহ মেহনতের সাথে যারা জড়িত আছেন (কোনো বাতিল মেহনতের কথা বলছি না), তারাও নানান ধরনের সমস্যার মধ্যে ডুবে আছেন। আর যারা দীনের মেহনতের সাথে নেই, তাদের সমস্যাগুলোর জরিপ যদিও কেউ করেনি, কিন্তু খুব জোর দিয়ে বলা যায় না যে তাদের সমস্যাগুলো কেটে গিয়েছে বা তারা উন্নত জীবন পেয়েছে।
তবে ব্যতিক্রমও কিছু আছে। সেই ব্যতিক্রম তো বেনামাজিদের মধ্যেও পাওয়া যায়। নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না... কিন্তু সে দাবি করে, আমি ভালো আছি। হাবভাবও মনে হয় তাই। আবার নামাজও পড়ে, রোজাও রাখে, অথচ যখন সে বলে "আমি সমস্যার মধ্যে আছি", তাহলে তো এটা ভালো কোনো নির্দেশনা দেয় না। কারণ, ব্যাপকভাবে এমনটা বলা হচ্ছে। যদি একজন-দুজন হতো, তাহলে তো ব্যতিক্রমই বলা যেত।
আল্লাহ তাআলা যে ওয়াদা করেছেন, আল্লাহর ওয়াদা চিরসত্য এবং আমরা যে দীনের ওপর চলছি না, এমনও তো নয়। অতএব, বড় একটা কঠিন ধরনের গড়মিলের মধ্যে যেন পড়ে গেলাম।
বাহলুলের ঘটনা
খলিফা হারুনুর রশিদের যামানায় এক দরবেশ ছিলেন, যিনি বাহলুল নামে পরিচিত। বাহলুল সম্পর্কে অনেক ঘটনা, অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে। কোনটা ঘটনা আর কোনটা গল্প—সব আলাদা করে বোঝা মুশকিল। কেননা অনেক কিছুই বলা হয়ে থাকে।
বাহলুলকে জিজ্ঞাসা করা হলো, "বাহলুল, কেমন আছ?" উত্তরে বাহলুল বললেন, "তার কথা কি জিজ্ঞাসা কর, যার ইচ্ছায় জগৎ চলে।"
প্রশ্নকারী হতবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, "তুমি প্রভুত্বের দাবি করছ নাকি যে, তোমার ইচ্ছায় জগৎ চলে? তোমার কথা তো এমনই মনে হচ্ছে।"
বাহলুল উত্তর দিলো, "আমি রুবুবিয়্যাতের (প্রভুত্বের) দাবি করছি না, আমি আবদিয়্যাতের (দাসত্বের) দাবি করছি। আমি আল্লাহর বান্দা হয়ে গিয়েছি; গোলাম হয়ে গিয়েছি। যেহেতু আমি বান্দা হয়েছি, তো আমার স্বতন্ত্র কোনো ইচ্ছা নেই। আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, আমার ইচ্ছাও তাই। যেহেতু আল্লাহর ইচ্ছায় জগৎ চলে, তো আমার ইচ্ছাতেই জগৎ চলে। অন্তরে ইতমিনান এসে গিয়েছে।"
ইতমিনান তো হাসিল হলো। ইতমিনান হাসিল হওয়ার জন্য জিকির শর্ত। জিকির আদায় হওয়ার জন্য শর্ত হলো, মন থেকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক থাকা চাই।
মনগড়া প্রত্যাশা এবং হতাশা
যদি সে দীনের জন্য কিছু করে আর প্রত্যাশা করে এমন জিনিসের যা আল্লাহ তাআলা দিতেও চাননি এবং ওয়াদাও করেননি, কিন্তু সে নিজ থেকে ধারণা করে বসে আছে। সে তো তার ধারণার ওপর ভর করে অগ্রসর হচ্ছে—নামাজ পড়ছে, রোজা রাখছে, হজ করছে, জাকাত দিচ্ছে, অথচ তার কল্পনামতো দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেননি।
যেমন, আল্লাহ তাআলা ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন যে, ভালো জীবন দিবেন। এখন যদি সে ছাত্র হয়, হয়তো তার পরীক্ষা সন্নিকটে। এখন সে নিজ থেকে ভেবে নেবে যে, ভালো জীবন মানে হচ্ছে পরীক্ষায় অনেক নম্বর পাওয়া, ভালো রেজাল্ট করা। এটা কেউ তাকে বলেনি; বরং এটা তার মস্তিষ্কপ্রসূত।
এখন যদি সে পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পায় বা পরবর্তী পরীক্ষায় যদি সে ভালো নম্বর না পায়, তবে সে মুসলমান হওয়ার কারণে এ কথা তো বলবে না যে, আল্লাহ তাআলার ওয়াদা ঠিক নয়; কিন্তু তার মনের ভেতর অস্থিরতা আসবে। ভাববে, হুজুররা বলেছেন, দীনের পথে চলবে প্রশান্তি আছে। আমি তো নামাজও পড়লাম, রোজাও রাখলাম, সদকাও করলাম, আরো অনেক কিছু করলাম... অথচ ভালো কিছু তো পেলাম না। সুতরাং স্বাভাবিকভাবে তার মনে অস্থিরতা আসবে।
আল্লাহ তাআলা যে ওয়াদা করেছেন, رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً—এটা তো সে মোটেও পাচ্ছে না। কলবের ইতমিনান... তো নামাজ-রোজাও তো জিকির। সব ইবাদতকেই জিকির বলা হয়। আল্লাহর সব আদেশ পালনও জিকির। এ সংজ্ঞানুযায়ী সে তো জিকির করেছে; কিন্তু সে তো কিছুই পেল না।
এমনিভাবে যদি সে ব্যবসায়ী হয়, সেও এর সত্যায়ন করবে। ভেবে নেবে, অনেক টাকা লাভ হবে। যদি সে নেতা হয় আর ইলেকশন সন্নিকটে হয় তবে সে ধরে নেবে এর মানে হচ্ছে, আগত ইলেকশনে বিজয়ী হওয়া।
ফাজায়েলের কিতাবে رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে কিছু কথা হযরত মাওলানা জাকারিয়া রহ. লিখেছেন। উনি তো লিখেছেন আল্লাহওয়ালাদের কথা, সাহাবাদের কথা, তাবেঈদের কথা যে حَسَنَةً فِي الدُّنْيَا বলতে কী বোঝায়। সাহাবা ও তাবেঈদের মাঝেও অনেক পার্থক্য যে, فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً বলতে কি বোঝায়।
বর্তমানে যদি কেউ চট্টগ্রাম বাজারে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, "বলো তো, رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً দ্বারা কি বোঝায়?" তো প্রত্যেকে তার নিজস্ব আন্দাজে বলবে; নিজ নিজ ধারণানুযায়ী বলবে। যেমন, কেউ চায়ে অভ্যস্ত; খুব চা পান করে। আর বাজারে চায়ের দাম বেড়ে গিয়েছে। তখন সে বলবে, "فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً -র অর্থ হলো, চায়ের দাম কম হওয়া।" সিগারেটপানকারী বলবে, "সিগারেট সস্তা হওয়া।"
অর্থাৎ, প্রত্যেকে তার নিজ কাঙ্ক্ষিত জিনিসকেই দুনিয়াতে 'হাসানা'-র ব্যাখ্যা করে নেবে। শুধু ব্যাখ্যা করেই ক্ষান্ত দেবে—এমন নয়; বরং সে এমনটা প্রত্যাশাও করবে। অথচ আল্লাহ তাআলা তো এমনটা ওয়াদা করেননি। যাইহোক, এই বিষয়ে আমি একটু অতিরঞ্জিত করে বললাম যে, সিগারেটওয়ালা বলবে, সিগারেট সস্তা হয়ে যাওয়া। মূলত, বাস্তবে এমনটাই ঘটে; এর ব্যতিক্রমও নয়।
বান্দা যা চায় তা তার জন্য কল্যাণকর নয়
মানুষ যা চাচ্ছে, তার বেশিরভাগের মধ্যে কোনো মঙ্গল নেই। আল্লাহ তাআলার মেহেরবানী যে, আল্লাহ তাআলা বান্দার কথামতো তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসগুলো দেন না। মানুষ যা চায় যদি তাই দেওয়া হতো তবে নিজের ক্ষতি আরো বেশি করে করতো।
বর্তমানে আমাদের সমাজের একেকজন মানুষ নিজেকে গরিব মনে করে। এ কাজটা সে অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে নয়; বরং নিজে নিজেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, "আমি গরিব।" এ হিসেবে সে চায়, তার দারিদ্র্য যেন দূর হোক। যখন সে নিজেকে গরিবের স্তরে রেখে দেয় যে, "আমি গরিব"—আর এ কথা যখন সে বলছে, তখন সে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথেই বলছে, "আমি গরিব মানুষ।"
অথচ তার দৈনন্দিন জীবনে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সে প্রচুর অপচয় করে থাকে। অপচয় করে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে; অপচয় করে জামাকাপড়ের ব্যাপারে... ইত্যাদি আরো বিভিন্নভাবে। অথচ সে প্রার্থনা করে, "আমার অভাব যেন দূর হয়।" সে যখন আরো অর্থ-সম্পদ পাবে, তখন আরো অপচয় করবে। আর হিসাবের বোঝা তার ওপর আরো ভারি হতে থাকবে। এতএব, তার চাওয়া মোতাবেক তো আল্লাহ তাআলা দিবেন না। আল্লাহ তাআলা দিবেন তাঁর নিজ ইলম মতো তার জন্য যা মঙ্গলজনক।
বান্দা যখন নিজ আমলগুলো করতে থাকে আর সাথে সাথে তার মনের ভেতর যে স্বপ্ন লালন করছিল, সেদিকে অগ্রসর হওয়ার আশা ধরে রাখে তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সে সেই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা পাবে না।
আল্লাহ তাআলা বান্দাদের ওপর যত মেহেরবানী আছে, তার মধ্যে এটাও একটা মেহেরবানী যে, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে তার কথামতো দিবেন না।
আমি থাকি ইউনিভার্সিটিতে। এখন যদি এখানে আল্লাহ তাআলা সবার দোয়া কবুল করতেন, তবে পরের দিন ক্যাম্পাসে শুধু লাশই লাশ পাওয়া যাবে। এই পার্টির দোয়া যেন ওই পার্টি শেষ হয়ে যায়। ওই পার্টির দোয়া যেন এই পার্টি শেষ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলার বহুৎ বড় মেহেরবানী যে, আল্লাহ তাআলা কারো দোয়াই কবুল করেননি। দোয়া কবুল করলে কারোরই উপায়ই থাকতো না।
ইতমিনানের জীবনের শর্ত
আল্লাহ তাআলা যে ইতমিনানের জিন্দেগি দিবেন, তো ইতমিনানের জিন্দেগির জন্য বাহ্যিক আমল শুদ্ধ হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং বাহ্যিক আমল তো খুবই ছোট অংশ। আমি যে খুব জোর দিয়ে বললাম "ছোট অংশ"—এর দলিল কী? দলিল হলো, আল্লাহ তাআলা আমালের ইতিবার করবেন নিয়তের ওপর। নিয়ত যদি শুদ্ধ হয় তবে আমল গ্রহণযোগ্য। আর আমল যদি শুদ্ধ হয় আর নিয়ত যদি ভুল হয় তবে আমল অগ্রহণযোগ্য। নিয়ত হলো ইচ্ছা, যা মনের ভেতরে থাকে।
আল্লাহ তাআলা ইতমিনানের জিন্দেগির ওয়াদা করেছেন। ইতমিনানের জিন্দেগি তখনই আসবে যখন সে তার বাহ্যিক আমলকে সংশোধন করার সাথে সাথে অভ্যন্তরকে সংশোধন করবে।
বর্তমান তারতিব হিসেবে বললাম। নচেৎ রাসুল সা.-এর ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাসুল সা. বাহ্যিক আমল সংশোধনের ওপর হাতই দেননি আভ্যন্তরীণ সংশোধন যথেষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে। মক্কার তেরো বছরে বাহ্যিক কোনো আমল সংশোধনের দিকে নজর দেওয়া হয়নি। মদ পান করতো—নিষেধ করা হয়নি; সুদ খেতো—নিষেধ করা হয়নি; নারী-পুরুষে অবাধ মেলামেশা ছিল—নিষেধ করা হয়নি। একটা জিনিসেরই আমল ছিল—নিজের অভ্যন্তরকে ঠিক করা; নিজের ঈমানকে ঠিক করা। আল্লাহ তাআলার সাথে ভালোবাসা কায়েম করা।
ঈমানই হচ্ছে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক, وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ—"যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহকে অনেক বেশি ভালোবাসে।"
মনের ফাসাদ কী জিনিস? মনের ভুল কী জিনিস? মনের ভুল হচ্ছে, এমন জিনিসকে ভালোবাসা, যে জিনিসকে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না। এই তাহারাতের (পবিত্রতার) ওপর সর্বাগ্রে আমল করতে হবে।
নামাজের মধ্যে যেমন পবিত্রতার শর্ত রয়েছে—কাপড় পবিত্র হতে হবে, জায়গা পবিত্র হতে হবে, শরীর পবিত্র হতে হবে। বাহ্যিক নাপাকি যদি থাকে বা এমন কিছু জিনিস যদি লেগে থাকে যা আল্লাহ তাআলা পাক হিসেবে গ্রহণ করেন না, যেমন জামায় যদি গোবর লেগে থাকে বা কাপড়ে পেশাব লেগে থাকে বা গায়ে থাকে—অর্থাৎ অপবিত্র জিনিস লাগলে যেমন শরীর নাপাক হয়, ঠিক তেমনিভাবে অন্তরে খারাপ মহব্বত থাকলে অন্তর নাপাক হয়।
বাহ্যিক নাপাকি যেমন শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে নামাজ ফাসেদ করে, ঠিক তেমনিভাবে অভ্যন্তরীণ নাপাকির ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা সহজতা রেখেছেন যে শরয়ি দিক থেকে ফাসেদ হবে না, কিন্তু সেই আমল গ্রহণযোগ্যও হবে না।
কুরআন স্পর্শের শর্ত: বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ
আল্লাহ তাআলা দ্বীনের জন্য কিতাব দিয়েছেন। এই কিতাব থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা শর্তও দিয়েছেন। বাহ্যিক শর্ত হলো এই কিতাবকে স্পর্শ করা যাবে না নাপাক অবস্থায়—'নাপাক অবস্থায় যেন কুরআন শরীফ স্পর্শ না করে।' বাহ্যিক স্পর্শ করার জন্য এইটুকু শর্ত।
আর তার দিলটি যেন কুরআনকে ছুঁতে পারে, তার দিলটি যেন কুরআন শরীফ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, এজন্য আল্লাহ তাআলা অভ্যন্তরীণ শর্ত রেখেছেন। যদি অপবিত্র হয় তাহলে সে কুরআন শরীফ স্পর্শ করতে পারবে না, ঠিক তেমনিভাবে মুত্তাকি যদি না হয় অর্থাৎ তার অন্তর যদি পবিত্র না হয় তাহলে তার অন্তর কুরআন শরীফের মর্মার্থ স্পর্শ করতে পারবে না।
সেই অবস্থায় সে কুরআন শরীফ পাঠ করে যেতে থাকে আর অর্থ সে নিজে নিজে বের করে। স্বাভাবিকভাবে সেটা শুদ্ধ হয় না—আল্লাহ তাআলা যে ধরনের বলেছেন সে ধরনের নয়।
ভুল বোঝার দৃষ্টান্ত
কেউ কেউ এর দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন, যা বাস্তব নাকি কাল্পনিক আমি ঠিক জানি না। এক ব্যক্তি কুরআনের অর্থ জানে, আরবি জানে, তাকে নামাজ পড়তে বলা হলো। সে উত্তর দিলো, আমার ওপর নামাজ ফরজ নয়। কেন? কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ঈমানদারদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা হবে নামাজ কায়েমের মাধ্যমে—'দুনিয়াতে তাকে প্রতিষ্ঠিত করবে নামাজ কায়েম করে।'
আমি প্রতিষ্ঠিত নই। অস্থায়ী চাকরি করি, ভাড়া বাড়িতে থাকি। আর যদি প্রবাসী কেউ হয় সে বলবে, আমি তো এখনও সিটিজেনশিপ পাইনি। তো কোনোভাবেই আমি প্রতিষ্ঠিত হইনি। অতএব আমার ওপর নামাজ ফরজ নয়। অতএব এ অবস্থায় নামাজ পড়া ঈমানদারির কাজ হবে না। কেননা ঈমানদারদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হলে নামাজ কায়েম হবে। আমি যেহেতু প্রতিষ্ঠিত না, তাই এ অবস্থায় নামাজ পড়া এটি বেঈমানির কাজ হবে।
আরেকজনকে নামাজ পড়তে বলা হলো। সে আরও একধাপ এগিয়ে উত্তর দিলো, নামাজ পড়া তো জায়েজই নয়। কেন? কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'নামাজের নিকটবর্তীও হয়ো না।' তখন তাকে বলা হলো, তুমি তো অর্ধেক আয়াত বললে। সম্পূর্ণ আয়াত পড়লেই তো তুমি সঠিক অর্থ বুঝতে।
তখন সে বললো, 'কুরআনের সেটাই পড়ো যা তোমার জন্য সহজ'—সূরা মুযযাম্মিলের আয়াত। তাহলে সমস্যাটি কোথায়? ভাষার সমস্যা নয়, বোঝার সমস্যাও নয়। সমস্যা হলো তার অন্তরের ভুল গতিপথ। তার মনে যা চায় সে সেদিকেই ধাবমান। সুতরাং তার দৃষ্টি যদি ঠিক না হয় তাহলে যা দেখবে সবই বেঠিক।
কুরআনের অপব্যবহার
যাদুর বিষয়টি ধরুন! হিন্দুরাও যাদু করে, মুসলমানরাও করে। মুসলমানদের অনেকে কুরআন শরীফের আয়াত দিয়ে করে, হাদিস শরীফের কথা দিয়ে করে। তো আয়াত তো কুরআন শরীফের, পবিত্র; কিন্তু আয়াত দিয়ে সে যে কাজ করছে সেই কাজে তো কাফের হয়ে যাবে। কারণ আল্লাহ তাআলা এজন্য কুরআন দেননি, অন্য কাজের জন্য দিয়েছেন।
সুতরাং একজন যাদুকর যেভাবে কুরআন শরীফের আয়াতকে বেজায়গায় লাগায়—কারণ তার অন্তর বেঠিক, কিন্তু আয়াত বেঠিক নয়, আয়াত ঠিক। কিন্তু এর মাধ্যমে তার নামাজ-রোজা-হজ-জাকাত তথা সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে যদি সে ঠিক পথে না চলে তাহলে স্বাভাবিকভাবে তার অন্তর অস্থির থাকবে, পেরেশান থাকবে।
মুসা (আ.) ও কারুনের পথের দৃষ্টান্ত
এর দৃষ্টান্ত হলো—এক ব্যক্তি আমল ঠিকঠাকমতো করেছে, মুসা (আ.)-এর পথে চলছে। আর মনে মনে আশা করছে কারুনের বাড়িতে পৌঁছাবে। সুতরাং সে যত বেশি মুসা (আ.)-এর পথে চলবে, ধাপে ধাপে তত বেশি মুসা (আ.)-এর ঝুপড়ি নজরে আসবে আর তত বেশি কারুনের ঐশ্বর্য থেকে দূরে সরে যাবে।
তার পথ চলা তো ঠিক যে সে মুসা (আ.)-এর পথেই যাচ্ছে, কিন্তু সে পথে গিয়ে যদি সে আশা করে এই পথে চললে আমি কারুনের মহল পাবো, তবে সে বড়ই পেরেশানির মধ্যে আছে। কারণ এটি কারুনের পথ নয়, মুসা (আ.)-এর ঝুপড়ির পথ। এ পথে কারুনের মহল পাওয়া যাবে না, আর আল্লাহ তাআলা এর ওয়াদাও করেননি। এটি শুধু সে নিজের ধারণাবশত করছে। মানুষ তার ধারণার ওপরই চলে।
দ্বীনের মেহনতের প্রয়োজন
আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জামানায় শুধু দ্বীনের কথাই বলেননি, বরং সাথে সাথে প্রত্যেকের জন্য মেহনতও দিয়ে দিয়েছেন। এই মেহনত আমলের মধ্য দিয়ে, পরিবেশের মধ্য দিয়ে তার মনের ইচ্ছার সংশোধন করে। পরীক্ষা-সংশোধন ছাড়া যদি সে কথাগুলো পায় তবে কথাগুলোর সে সঠিক ব্যবহার করবে না।
আমাদের সমাজের চিত্র
আমাদের দেশে ঘরে ঘরে যদি দ্বীনি কিতাবের জরিপ করা হয় যে সাধারণত ঘরগুলোতে কী কী দ্বীনি কিতাব পাওয়া যেতে পারে, ঘরে কী ধরনের দ্বীনি প্রচলন আছে—দেখা যাবে বেহেশতি জেওর জাতীয় কিতাব খুব বেশি পাওয়া যাবে না। বরং এর চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া যাবে অন্যসব কিতাব যেগুলো দিয়ে নানান ধরনের মোকদ্দমা জেতা যায়, রোগ সারানো যায়, প্রতিবেশীকে ধ্বংস করা যায়, বিবিকে বশ করা যায়, স্বামীকে বশ করা যায়, শ্বশুরের সম্পদ কীভাবে দখল করা যায়। এসব আমলই পাওয়া যাবে, আর ঘরে ঘরেই পাওয়া যাবে।
এগুলো যদিও কুরআনি বা হাদিসের আমল, আর আয়াতও বেঠিক নয়, সঠিক আয়াত। আর এই আয়াতগুলো দিয়ে যদি আমলগুলো করা হয় তবে এটি কার্যকরও বটে। আয়াতগুলো কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলেও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সে এই আয়াতগুলো দিয়ে এ আমল করে তবে সম্ভাবনা আছে যে তার প্রতিবেশী ধ্বংস হবে বা শ্বশুর তার সব সম্পত্তি দিয়ে দেবে।
অথচ আল্লাহ তাআলা কুরআন শরীফ দিয়েছেন, এটি তিনি প্রতিবেশীকে ধ্বংস করতে দেননি, শ্বশুরের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য দেননি। দিয়েছেন অন্য কাজে, অথচ আমরা এ কাজে প্রয়োগ করছি। কেন প্রয়োগ করছি? কারণ যার অন্তরের রুখ যেদিকে, সে হাতের কাছে যা পায় সব সেদিকেই লাগায়।
ইসলাহ: বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ
আল্লাহ তাআলা দ্বীনের মেহনত দিয়েছেন। দ্বীনের মেহনতের প্রধান কাজ হলো অন্তরের সংশোধন। এ ক্ষেত্রে 'ইসলাহ' শব্দটি খুব প্রচলিত ও পরিচিত। সাধারণত আমরা ইসলাহ বলতে বুঝি আমলের সংশোধন—নামাজ পড়ে না, পড়তে শুরু করা; মদ পান করে, মদ পান ত্যাগ করা; সুদ খায়, সুদ খাওয়া ছেড়ে দেওয়া; মিথ্যা বলে, মিথ্যা বলা ছেড়ে দেওয়া। এগুলো হলো ইসলাহ।
নিশ্চয়ই ইসলাহের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ আমলকে সংশোধন করা, কিন্তু ইসলাহের প্রধান অংশ হচ্ছে তার অন্তরের ইচ্ছার সংশোধন করা।
অভ্যন্তরীণ ইচ্ছার সমস্যা
সব ভালো আমলগুলো সে করতে থাকে, কিন্তু তার ইচ্ছা যদি ফাসেদ হয় তবে সে পেরেশানির মধ্যে থাকবে। সে সত্য কথা বলে, নামাজ পড়ে, মদ পান ছেড়েছে, সুদ খাওয়া ছেড়েছে; কিন্তু পূর্বে যে ইচ্ছা ছিল—সে বিরাট ধনী হবে—সে ইচ্ছা এখনও আছে।
এখন যেহেতু সে মদ পান ছেড়েছে, সুদ খাওয়া ছেড়েছে, অতএব ধন-সম্পদ বেশি কামাইয়ের যে সম্ভাবনা ছিল এটি ক্রমেই তার থেকে দূরে সরে যাবে। এবং যেগুলো ছিল সেগুলোও তার হাতছাড়া হয়ে যাবে। কারণ সে তার ব্যবসাকে যেভাবে গড়ে তুলেছিল—ভালো কন্ট্র্যাক্ট পেতে হলে পার্টিতে যেতে হয়, মদ পান করতে হয়, মদ পান করাতে হয়—ইত্যাদি নানা বিষয় জড়িত ছিল।
এখন সে বাহ্যিক আমলের তো ইসলাহ করে ফেলেছে যে এখন সে মদ পান করছে না, পান করাচ্ছেও না, পার্টিতেও যায় না, কিন্তু এরপরেও তার অন্তরের ইচ্ছার ইসলাহ হয়নি। আগে যেমন সে ধনী হতে চাইতো, এখনও সে সেরকমভাবে ধনী হতে চায়। আর ধনী হওয়ার জন্য যে পথ ছিল সে পথে ধনী হওয়ার উপায় নেই।
মনের ইচ্ছা যদি সকলের পূরণ হতো তবে কেউই কাফের থাকতো না, কেউই ফাসেক থাকতো না। আর নানান ধরনের গুনাহের নানান ধরনের ফায়দা বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাময়িকভাবে দেখা যায়। আর দেখা যায় বলেই গুনাহের কাজগুলো দুনিয়াতে টিকে আছে, এবং থাকবেও।
মাতালের দৃষ্টান্ত
গুনাহের কাজ দ্বারা যে ফায়দা সে পেত সে ফায়দা এখনও চায়, যদিও গুনাহের কাজ সে ছেড়ে দিয়েছে। এর একটি দৃষ্টান্ত হলো মাতাল। মাতাল হওয়ার মাঝে বড়ই আনন্দ লাগে। যখন কেউ মাতাল হয় তো দেখা যায় সে কারও কথায় নাচছে, গান গাইছে, যেন খুবই আনন্দবিভোর হয়ে আছে।
তো তার মাতাল হওয়ার শখ এখনও বাকি আছে, যদিও সে মদ পান ছেড়ে দিয়েছে। মাতাল হতে হলে মদ পান করতেই হবে, এ ছাড়া মাতাল হওয়ার অন্য কোনো পথ নেই। তার বাহ্যিক আমল তো ঠিক করেছে, কিন্তু অন্তর মাতাল রয়ে গেছে। আর সে খারাপ জিনিসগুলোই চায়।
অন্তরের সংশোধনের গুরুত্ব
আল্লাহ তাআলা বড় মেহেরবানি করে আমাদেরকে দ্বীন দিয়েছেন। যেরকমভাবে দ্বীনের মাঝে বাহ্যিক আমলের সংশোধন করতে হয়, ঠিক তেমনিভাবে অভ্যন্তরীণ সংশোধন জরুরি—বরং অত্যন্ত জরুরি তার ভেতরের অংশকে সংশোধন করা।
বেশি জরুরি এজন্য বললাম যে রাসুল (সা.) এভাবেই দোয়া করেছেন—
اللَّهُمَّ اجْعَلْ سَرِيرَتِي خَيْرًا مِنْ عَلَانِيَّتِي وَاجْعَلْ عَلَانِيَتِي صَالِحَةً
'হে আল্লাহ, তুমি আমার অভ্যন্তরকে আমার বাহ্যিকের চেয়ে বেশি ভালো করে দাও' (এটি বেশি চেয়েছেন), আর এরপর চেয়েছেন 'আমার বাহ্যিকও ঠিক করে দাও।' বাহ্যিক যে খারাপ হবে তা নয়, তবে ভেতরের সংশোধন বেশি চেয়েছেন।
নিয়তের গুরুত্ব
নিয়ত হলো ভেতরের জিনিস। নিয়ত শুদ্ধ হয়ে আমল যদি ভুলও হয় তবুও আল্লাহ তাআলা কবুল করেন। আর নিয়ত যদি ভুল হয় আর আমল যদি শুদ্ধ হয় তবে তা প্রত্যাখ্যাত। সুতরাং বোঝা গেল ভেতরেরটিই বেশি জরুরি।
কেবলা পরিবর্তনের ঘটনা
সাহাবাগণ বাইতুল মাকদিস অভিমুখী হয়ে নামাজ পড়তেন। রাসুল (সা.)-ও পড়তেন। পরবর্তীতে যখন হুকুম হলো বাইতুল্লাহর দিকে ঘুরে গেলেন। ইহুদিরা বললো, মুসলমানরা বাইতুল মাকদিস অভিমুখী হয়ে এতদিন যত নামাজ পড়েছে সব বাতিল হয়ে গেলো।
আল্লাহ তাআলা উত্তরে বললেন—'আল্লাহ তাআলা তোমাদের ঈমানকে নষ্ট করেননি।' উলামাগণ বলেন, এ জায়গায় ঈমান বলতে নামাজ বোঝায়।
সুতরাং প্রশ্ন আসতে পারে যে নামাজই যদি বোঝায় তবে আল্লাহ তাআলা কেন সরাসরি বললেন না যে 'আল্লাহ তাআলা তোমাদের নামাজকে নষ্ট করেননি!' আল্লাহ তাআলা তো তাঁর দ্বীনকে সহজ করে দিয়েছেন, খামাখা কঠিন বানাবেন না। আল্লাহ তাআলা তো সাহিত্যিক আর কবিদের মতো নন যারা খামাখা কঠিন বানায়। আল্লাহ তাআলা সহজই করতে চান।
এর উত্তর হলো—বাহ্যিকভাবে সবার নামাজই ঠিক হয়েছে। কেননা কেবলামুখী হওয়া নামাজের রুকনের অন্তর্ভুক্ত। আর সবাই কেবলামুখীই হয়েছে। কারণ শুধু বাহ্যিক নামাজই নয়, আল্লাহ তাআলা নিয়তকেও ধর্তব্য করেন। আর যেহেতু সবার অন্তরে ঈমান ছিল, অতএব নামাজ হয়েছে। আর এ ঈমানটাই উদ্দেশ্য।
আল্লাহর পথে বের হওয়া
এজন্য ভাই, বড় জবরদস্ত মেহনতের প্রয়োজন যে আমি আল্লাহর পথে বের হয়ে আমার অন্তরের ইসলাহ করি। আর দোয়া করার সময় এই দোয়াগুলোই করব যে দোয়াগুলো আল্লাহর নিকট পছন্দ হয়।
সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-এর ঘটনা
মুস্তাজাবাতুদ দাওয়াহ (যাদের দুআ কবুল হয়) ছিলেন অনেক সাহাবি। তাদের মধ্যে হজরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. ও একজন, যার দুআ কবুল হতো। তার কাছে লোকেরা এসে বিভিন্ন বিষয়ে দুআ করার জন্য আবেদন করত। তিনি দুআ করতেন আর দুআ কবুল হয়ে যেত।
শেষ জীবনে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এক ব্যক্তি তাকে বলল, 'আপনি কত মানুষের জন্য দুআ করেছেন এবং আল্লাহ তায়ালা তা কবুলও করেছেন। এখন আপনি নিজের জন্য আল্লাহর কাছে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য দুআ করুন।'
তিনি বললেন, "আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য যা পছন্দ করেছেন, সেটি আমার নিজের পছন্দের চেয়ে অনেক বেশি ভালো।"
তার ক্ষেত্রে এমন হয়নি যে, দুআ করেছি কিন্তু কবুল হয়নি, তাই সবর করলাম। বরং তিনি দুআ করতেই রাজি হননি এই ভেবে যে, আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য যা চেয়েছেন, আমি এর বিপরীত কেন চাইব!
বনি ইসরাইলের দৃষ্টান্ত
বনি ইসরাইলের মতো নয় যারা মুসা আলাইহিস সালামকে বলেছিল, "আমাদের মান্না-সালওয়া আর ভালো লাগে না। আমাদের পেঁয়াজ দাও... রসুন দাও..."। আর আল্লাহ তায়ালা নারাজ হয়ে বলেছিলেন, 'ভালোর পরিবর্তে খারাপ চাও!'
তো সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা আমাকে যা দিয়েছেন, তা ভালোর জন্যই দিয়েছেন। এর উপরই আমি সন্তুষ্ট। আমি এটি বদলাতে চাই না।'
সুতরাং যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট থাকবে, আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য প্রশান্তির (ইতমিনান) ওয়াদা করেছেন।
সন্তুষ্টি এবং মানসিক প্রশান্তি
দুনিয়ার জীবনে অন্ধ হয়ে যাওয়া বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বড়ই মুসিবত। এটি দুই বেলা ভাত না পাওয়ার মতো নয়, অভাবে পড়ার মতো নয়; বরং অনেক বেশি কষ্টের। তবুও তিনি এর বিপরীতে দুআই করতে চাচ্ছেন না; বরং এতেই তিনি সন্তুষ্ট।
তো সন্তুষ্ট অবস্থায় অন্তরে পেরেশানি আসবে কোথা থেকে? অন্তরে পেরেশানি তো তখনই আসবে যখন মনে চায় এক জিনিস আর হয় অন্য জিনিস।
আল্লাহওয়ালাদের আত্মসমর্পণ
আল্লাহওয়ালারা আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর নিজেকে এমনভাবে সমর্পণ করতেন, যেভাবে পাখি নিজেকে বাতাসের স্রোতের উপর ছেড়ে দেয়। পাখিগুলো কোনো পরিশ্রমই করে না, আর বিনা পরিশ্রমে উপরে উঠতে থাকে।
এমনিভাবে আল্লাহওয়ালাদের জীবনে কোনো পেরেশানি থাকে না। অস্থিরতা আর পেরেশানি দুনিয়াদারদের বড় অংশজুড়ে রয়েছে।
ওলি-আল্লাহদের যদি এই শব্দগুলো নানানভাবে, নানান শব্দে, নানান প্রতিশব্দে আর ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, তবে শেষ পর্যন্ত তারা বুঝতে পারবে না যে টেনশন কাকে বলে, হতাশা কাকে বলে। কারণ এ সম্পর্কে তো তাদের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই, বুঝবে কীভাবে? তারা তো আল্লাহ তায়ালার সিদ্ধান্তের উপর সন্তুষ্ট, অসন্তুষ্ট হবে কখন!
আল্লাহর পথে চলার আহ্বান
এজন্য ভাই, আল্লাহর পথে বের হই, আল্লাহর নির্দেশমতো চলা শিখি। শুধু বাহ্যিকভাবে নয় যে, আল্লাহ তায়ালা যেভাবে হুকুম দিয়েছেন—হালালকে ধরা, হারামকে ছাড়া। এটি তো করতেই হবে। কিন্তু এর সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা আমাকে যেখানে নিয়ে যেতে চান, আমি যেন সেখানে যেতে রাজি হয়ে যাই।
ঘোড়ার উদাহরণ (প্রশংসনীয়)
ঘোড়ার উদাহরণটি পছন্দনীয়। ঘোড়া এমন যে, মালিক তাকে যেদিকেই ইশারা দেয়, সে সেদিকেই দৌড়ে যায়। একেবারে টানাটানির শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করে না। একটি পরিণত ঘোড়া ইঙ্গিত বোঝে। ইঙ্গিতমতো মালিক যেদিকে যেতে চায়, সে সেদিকেই নিয়ে যায়।
ছাগলের দৃষ্টান্ত (নিন্দনীয়)
এর বিপরীতে ছাগলের দৃষ্টান্ত একেবারেই উল্টো। ছাগলকে দিয়ে নবীদের প্রশিক্ষণ করানো হয়েছে। কারণ এটি বড়ই উগ্র মেজাজের।
গৃহস্থ যখন সকালে তাকে বাইরে নিয়ে যেতে যায় যেখানে তার খাবার আছে, সে পা দুটো সামনে শক্ত করে আটকে টাইট হয়ে বসে যায়। সে আগে যাবেই না। কী কারণে? কী যুক্তিতে? কিছু নেই—সে যাবে না, ব্যস।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত গৃহস্থের মারধর খেয়ে বাধ্য হয়ে সামনে যায়। সামনে ঠিকই গেল আর খামোখা এ মারধরের কষ্ট পেল।
আবার সন্ধ্যাবেলা যখন তাকে নিয়ে আসবে, তখনও সে উল্টো কথা—সে আসবে না।
তো বেশিরভাগ মানুষ এই ছাগলের মতো উল্টো। আল্লাহ তায়ালা তাকে কল্যাণের দিকে ডাকছে আর সে তার উল্টো দিকে চলে যাচ্ছে। কেন? এর কোনো কারণ নেই। তাহলে তো পেরেশানি হবেই।
ছাগলের অস্থিরতার আরেকটি উদাহরণ
মনের এই অস্থিরতার কারণে ছাগল সর্বদা পেরেশান থাকে। ছাগলকে বেঁধে দেওয়া হল, দড়ি পাঁচ হাত লম্বা। ছাগলকে দেখা যাবে, একেবারে প্রান্তের পাতাগুলো যেগুলো বড় কষ্ট করে নাগাল পাবে, যে পাতাগুলো খেতে গিয়ে দড়িতে টান লাগে, হাঁটু গেড়ে, জিহ্বা লম্বা করে সে পাতাগুলো খাচ্ছে। কাছের সহজে নাগালসাধ্য পাতাগুলো সে খাবে না।
এখন যদি দড়ি আরও পাঁচ হাত লম্বা করে দেওয়া হয়—আগে পাঁচ হাত ছিল, এখন যদি দশ হাত করে দেওয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে, কিছুক্ষণ আগে যে পাতাগুলো বহু কষ্টে খেতে চাচ্ছিল, সেগুলো আর খাবে না। আবারও টান টান করে সর্বশেষ পাতা ধরতে যাবে।
অর্থাৎ, সে নিজেই নিজের জন্য পেরেশানিকে বেছে নেয়। যেখানে তাকে থাকতে বলা হয়েছে, সেখানে সে থাকতে চায় না।**
সীমার মধ্যে থাকার গুরুত্ব
মানুষ যদি তার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এর মধ্যে থাকতে না চায় তবে সে পেরেশান থাকবে। আর তার জন্য নির্ধারিত সীমার মধ্যে যদি না থাকে, তবে তার জীবনের আরাম চলে যাবে।
এজন্য ভাই, আল্লাহর পথে বের হই। আল্লাহর ইচ্ছামতো, আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য যে জীবন পছন্দ করেন, আমি সে জীবনকে গ্রহণ করি। আর এ গ্রহণ মুখের কথায় নয়, বরং বড় মেহনত দিয়ে এটি হৃদয়ের মধ্যে নিতে হবে। এজন্য সময় লাগাতে হবে। এটি বড় মেহনতের জিনিস।
অন্তর পরিশুদ্ধির মেহনত
সেজন্য সব যুগে সফল ব্যক্তিরা বড় কঠোর মেহনত করে মনে এ পরিবর্তনগুলো এনেছেন।
মক্কার তেরো বছরের মেহনত-কোরবানি... অন্য কিছু নয়। পরবর্তী যুগে কেউ কেউ পীরের কাছে বছরের পর বছর অবস্থান করতেন। কেউ ঘোড়ার আস্তাবলে পড়ে থাকতেন, কেউ ঘোড়ার গোবর পরিষ্কার করতেন।
তো বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, গোবর পরিষ্কার করার বড়ই প্রয়োজন। মূলত গোবর পরিষ্কার করার কোনো প্রয়োজনই ছিল না; বরং অন্তরকে পরিষ্কার করার জন্যই গোবর পরিষ্কার করানো হচ্ছিল।
নিজেকে ঠিক করার গুরুত্ব
বলা হয়, 'অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে তুমি এখানে চলে এসেছ! অস্ট্রেলিয়ার সবাই কি দ্বীনদার হয়ে গেছে?' আবার এখান থেকে যখন যায়, তখন বলা হয়, 'এখানের সবাই কি দ্বীনদার হয়ে গেছে?'
সবাই দ্বীনদার হয়েছে কি হয়নি, এটি বড় কথা নয়। এর মেহনত করে নিজেকে ঠিক করতে হবে।**
এই মেহনতের (বাহ্যিক ও অন্তর সংশোধন) বিভিন্ন দিক রয়েছে, তার মধ্যে এটিও (আল্লাহর পথে বের হওয়া) একটি।
এজন্য ভাই, আল্লাহর পথে বের হয়ে আমি আমার নিজেকে ঠিক করি।
নিজেকে ঠিক করার দুটি প্রধান দিক
আর নিজেকে ঠিক করার জন্য প্রধানত দুটি জিনিস:
১. বাহ্যিক আমলকে ঠিক করা
২. মনের ইচ্ছাকে ঠিক করা
তিন চিল্লার আহ্বান
এজন্য বুজুর্গরা তিন চিল্লার জন্য বলেন। যাদের আগেই তিন চিল্লা হয়ে গেছে, তারা প্রতি বছরই তিন চিল্লার নিয়ত করি। আর যাদের তিন চিল্লা হয়নি, তারা তিন চিল্লার নিয়ত করি।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা: পরিপূর্ণ বান্দা হওয়ার পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: বারিধারা ডি.ও.এইচ.এস. সময়: মাগরিবের পর :১০/০৬/২০০৬ তারিখ أعُوْذ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৯২
নিভৃতচারী আল্লাহওয়ালাদের খোঁজে
হজরতের গড়া ছোট্ট, অথচ সুন্দর মাদ্রাসা। মাদ্রাসা থেকে এক ছাত্রকে রাহবার হিসেবে সাথে নিয়ে যখন হজরতের ব...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১১ নভেম্বর, ২০২৪
৮৯১৩
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১১ নভেম্বর, ২০২৪
১০৫৫৭
দ্বীন ও দুনিয়া
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] দুনিয়ার সব মানুষের কাজকর্ম ও চেষ্টা-পরিশ্রমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—এক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৯৩