যে ব্যবসায় আত্মা সুন্দর হয়
যে ব্যবসায় আত্মা সুন্দর হয়
[আল্লাহ তায়ালা নেক আমলের বিনিময়ে উভয় জগতে ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন — এটি সত্য। কিন্তু আমাদের ভুল ধারণা হলো, ভালো জীবন মানে বাইরের অবস্থার উন্নতি। প্রকৃতপক্ষে আমলের ফল বাইরে নয়, ভেতরে পড়ে — মানুষের চরিত্র ও আচরণ পরিবর্তন হয়।
দুনিয়ার সব কাজের লক্ষ্য হলো বাইরের অবস্থা উন্নত করা, কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভেতরের সৌন্দর্য হারায় — মানুষ অহংকারী ও স্বার্থপর হয়ে পড়ে। ইউরোপ বিলাসিতা পেয়েছে, কিন্তু মা-সন্তানের বন্ধন হারিয়েছে, বৃদ্ধরা ডাস্টবিনে পড়ে আছেন — এটা তাদের পরিকল্পনায় ছিল না, শয়তানের ফাসিদ ব্যবসায় গোপনে এটা চলে গেছে।
বিপরীতে মালির গল্পে দেখা গেল — বিশাল বাগান তুচ্ছ, কিন্তু ক্ষুধার্ত কুকুরের সামনে লজ্জা অমূল্য। আমলের এই সৌন্দর্যই আসমাউল হুসনার সিফাত। রাজকুমার থেকে ফকির হওয়া সাহাবারা দুঃখ নয়, শোকর আদায় করেছেন — কারণ ভেতরের সম্পদ বাইরের সম্পদের চেয়ে বড়।
দীন হলো আল্লাহর ব্যবসা — বাহ্যিক ভালো জিনিস দিয়ে রুহানি সৌন্দর্য কেনা। শয়তানের ব্যবসা উল্টো — রুহানি সৌন্দর্য নিয়ে বাহ্যিক বিলাসিতা দেয়, কিন্তু ক্ষতির হিসাবটা গোপন রাখে।]
اَلحَمْدُ للهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعالِنَا، مَن يَّهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُّضْلِلْهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ. وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إلهَ إلَّا الله وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْبِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ
مَنۡ عَمِلَ صَالِحًا مِّنۡ ذَكَرٍ اَوۡ اُنۡثٰی وَهُوَ مُؤۡمِنٌ فَلَنُحۡیِیَنَّهٗ حَیٰوۃً طَیِّبَۃً ۚ وَلَنَجۡزِیَنَّهُمۡ اَجۡرَهُمۡ بِاَحۡسَنِ مَا كَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ﴿۹۷﴾
(সূরা নাহল: ৯৭)
وَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اللهم أرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَارْزُقْنَا اتِّبَاعَهُ وَأرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلًا وَارْزُقْنَا اجْتِنَابَهُ.
আল্লাহ তায়ালা নেক আমলের আদেশ দিয়েছেন আর এর বিনিময়ে ভালো জীবন দান করার ওয়াদা করেছেন। ভালো জীবন শুধু মৃত্যুর পরেই দেবেন, এমনটি নয়। আল্লাহ তায়ালা এই কথা বলেননি যে, নেক আমল করলে দুনিয়াতে সুবিধা হবে না, কিন্তু মৃত্যুর পরে ভালো থাকতে পারবে। বরং আল্লাহ তায়ালা উভয় জগতেই ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন নেক আমলের বদলায়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এবং যদি জরিপও করা হয় তাহলে আমভাবে দেখা যাবে, সব ব্যাপারে না হলেও অনেক ব্যাপারে কম দীনদাররা ভালো আছে। যেমন স্বচ্ছলতা। গ্রামে, শহরে বা জাতি হিসেবে পুরো দুনিয়াতে মুসলিম সমাজের মধ্যে যারা নামাজ পড়ে না, তাদের উপর যদি জরিপ ইত্যাদি করা হয় যে, যারা নামাজ পড়ে তাদের ইনকাম কেমন আর যারা নামাজ পড়ে না, তাদের ইনকাম কেমন — তো ফলাফল সম্ভবত বেনামাজিদের ইনকাম বেশি — এই জাতীয় হতে পারে। এইরকম অনেক ধরনের জিনিস চোখে পড়ে। এমনটি নাও হতে পারে আবার সম্ভবত হতেও পারে; কিন্তু বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হয়, বেদীন খুব ভালো আছে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যে নেক আমলের আদেশ দিয়েছেন আর ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন, এটি যে আমাদের চোখের সামনে খুব দেখতে পাচ্ছি — এমনও নয়। আর স্বচ্ছলতা তো একটি মাত্র দিক, বেদীনরা ভালো আছে — এইরকম আরও বহু ক্ষেত্র রয়েছে।
সেদিন মুযাকারার মধ্যে এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছিল যে, কেউ যদি অভাবের অভিযোগ করে যে, আমি অভাবের কারণে চলতে পারি না, তো আল্লাহ তায়ালা ঈসা আ.-কে দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখিয়ে দেন যে, তাঁর থেকে বেশি অভাবে আছ নাকি? কেউ যদি রোগের কথা বলে, তখন আইয়ূব আ.-কে দৃষ্টান্তস্বরূপ পেশ করেন যে, তার চেয়ে বেশি রোগে-শোকে ভুগছ! তো রোগ-অভাব এগুলো তো দুনিয়াতে বড় বড় মুসিবত। আর এই মুসিবতে সবচেয়ে বেশি জর্জরিত ছিলেন নবীরা।
অতএব এই কথা বলতে হয় যে, তাঁরা তো নবী ছিলেন, কিন্তু আমল ভালো ছিল না। এইজন্য মুসিবতে ছিলেন। (নাউযুবিল্লাহ) এমনটি বলার কোনো উপায় নেই। তো ভালো জীবনের দৃষ্টান্তস্বরূপ যারা নেক আমলি ছিলেন অর্থাৎ নবীগণ, তারা যদি মুসিবতেরও দৃষ্টান্ত হন, তাহলে আমি যে ভালো জীবনের প্রতি অগ্রসর হচ্ছি আর আশা করছি, ভালো জীবন পাব। ভালো জীবনের মধ্যে স্বাস্থ্যকর আবাসন জরুরি, ন্যূনতম স্বচ্ছলতা জরুরি। অতএব ভালো জীবন তো জরুরি, কিন্তু ভালো জীবনে ঘটবে তার উলটাটা; অর্থাৎ যা ছিল, তাও যাবে। অতএব ভালো জীবনে যদি আমার আমল উন্নততর হতে থাকে, তো যত বেশি আমার উন্নতি হবে, তত বেশি নবীর আমলের সাথে আমার সামঞ্জস্যতা বাড়বে। আর আমার অবস্থাও তখন তাঁদের মতো হতে থাকবে। সুতরাং বিষয়টি একটি ধাঁধা হয়ে গেল।
ভালো জীবন সম্পর্কে ভুল ধারণা
আল্লাহ তায়ালা ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন আর ভালো জীবনের এই ওয়াদাটি অবশ্যই সত্য। কিন্তু এটা শয়তানের কথা যে, নেক আমল দিয়ে আখেরাত পাওয়া যায়, দুনিয়া পাওয়া যায় না। এটা আল্লাহর কথা নয়; এটা আম্বিয়া আ.-এর কথাও না, এটা সাহাবাদের কথাও না; এটা শয়তানের কথা। আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতেও ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন, আখেরাতেও নিঃসন্দেহে ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন।
তবে ভালো জীবনের আসবাব বা উপকরণগুলো কী — এই ব্যাপারে আমাদের মধ্যে ভুল ধারণা আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ মনে করে ভালো জীবন মানে হচ্ছে, সে যে অবস্থানে আছে, সেই অবস্থা থেকে উন্নতি করা। অর্থাৎ, আমার অবস্থা আমার পক্ষে হয়ে গেল।
এই যে মানুষ ভালো জীবনের ধারণা করে, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যে ভালো জীবন দান করেন, সেই ভালো জীবন তার অবস্থা পরিবর্তন করে নয়, বরং তার নিজেকে পরিবর্তন করে।
আর এই ভালো জীবন শুধু তার অবস্থান পরিবর্তন করে নয়, বরং দীনের সব কথার মর্ম এটাই যে, মানুষের মেহনতের একটি হলো, আমি যা আছি তাই থাকলাম। আমার চারপাশের সবকিছু ভালো বা মন্দ হয়ে গেল। আর আরেকটি হলো, আমার চারপাশে কিছুই পরিবর্তন হলো না, শুধু আমি নিজে ভালো বা মন্দ হলাম। দীনের সব আমলের ক্ষেত্রে তার প্রতিক্রিয়া আমলকারীর দিকে ধাবিত হয়।
আমল ও কাজের পার্থক্য
এর বিপরীতে দুনিয়াতে আমরা যাকে কাজ বলি অর্থাৎ পুরো দুনিয়ার সমস্ত কাজ এবং কাজের সাথে শিক্ষা-দীক্ষাসহ আনুষঙ্গিক যা কিছু আছে, এই সবগুলো যে করছে তার দিকে ধাবিত নয়, বরং তার চারপাশের অবস্থার দিকে ধাবিত হয়।
মনে করুন, ব্যবসা একটি কাজ, আর যিকির ও তাসবিহাত — এটি একটি আমল। ব্যবসায় যদি কেউ সফলতা অর্জন করে তবে তার লক্ষণ কী? লক্ষণ হলো, আগে ছেঁড়া জামা পড়ত, এখন ভালো জামা পড়ে। আগে হেঁটে যেত, এখন সাইকেলে চলে। আগে সাইকেলে যেত, এখন গাড়ি কিনেছে। আগে থাকত কমলাপুরের পাশে, ড্রেন আর পলিথিনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, এখন একটা ছোটখাটো বাড়ি নিয়েছে। আগে থাকত ফকিরাপুলে আর এখন থাকে ধনীপুরে। অর্থাৎ পাড়াও পরিবর্তন করেছে। তো এগুলোই হলো ব্যবসায় উন্নতির লক্ষণ।
কেউ কোনো ভালো পীরের কাছে মুরিদ হলো বা কোনো দীনদার পরিবেশে গিয়ে তালিম নিলো। বা তাবলিগে বারবার করে চিল্লা দিলো। এই কাজগুলোর কারণে তার যে দীনি মেহনত, এর স্বার্থকতা অর্জন করছে কিনা? বা করলে তার লক্ষণ কী বা মানদণ্ড কী? ওকে কীভাবে বিচার করবে? কারণ ওর চিল্লায় অবশ্যই ফায়দা হয়েছে। এর লক্ষণ হলো, আগে ছেঁড়াফাড়া জামা পড়ত, এখন দেখি ভালো ভালো জামাকাপড় পড়ে। তো নিশ্চয়ই ওর চিল্লা কাজে লেগেছে। বা আগে ঝুপড়ি ঘরে থাকত, এখন ভালো বাড়িতে থাকে। সুতরাং নিশ্চয়ই তার চিল্লা ভালো হয়েছে।
এই কথাও যদি কেউ বলে, তাহলে একজন সাধারণ শ্রোতাও বলবে, কী বলে! তার কথার তো কোনো তাল বা মিল পাচ্ছি না। চিল্লা দিলে, যিকির করলে বা নেক মানুষ হলে টাকা-পয়সা বাড়বে বা বড় বাড়িতে থাকব! এগুলোর সম্পর্ক তো নেকির সাথে নয়। এগুলোর সম্পর্ক তো টাকা-পয়সার সাথে। ব্যবসা যদি ভালো হয়, তবে তার লক্ষণ হলো যে, ব্যবসা ভালো চলছে। নতুন গাড়ি কিনেছে, মানে ব্যবসা ভালো চলছে। কিন্তু যিকির খুব বেশি করে করছে, এটি নতুন গাড়ি কেনার লক্ষণ নয়; এটি হলো তার আচরণে পরিবর্তনের লক্ষণ।
রাগী মানুষের পরিবর্তনের উদাহরণ
এক লোক আগে খুব রাগি ছিল। অল্প-সল্প কথায় গালিগালাজ-মারধর-রাগারাগি করত। পথেঘাটে চলতে, নিচের ঘর বা অধীনস্থদের সাথেও নিষ্ঠুর ব্যবহার করত। এমনকি কাজের লোকদের মুখের উপর গরম চা ছুড়ে ফেলত ক্রোধ প্রকাশ করতে গিয়ে। অথবা ঠান্ডা চা দিলে লাথি মারত যে, চা কি ঠান্ডা খাবে? গরম দিলেও মুশকিল, ঠান্ডা দিলেও মুশকিল। তাকে নিয়ে বাড়ির লোক পেরেশান।
সেই লোক চিল্লায় গেল বা তার অন্তর আমলের মাধ্যমে পরিবর্তন হলো কোনো নেক লোকের সান্নিধ্যে। এখন তার মধ্যে দীনদারি এসেছে। এখন সে যিকির করে, তেলাওয়াত করে, তাসবিহ আদায় করে। একদিন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে... একজন লোক এমন বেপরোয়াভাবে ধাক্কা দিল যে, সে ড্রেনে পড়ে গেল।
ইচ্ছা করে হয়তো ধাক্কা দেয়নি, কিন্তু সে তো পড়ে গেল। আচ্ছা, এখন যেহেতু সে আমার ধাক্কায় ড্রেনে পড়ে গিয়েছে; এখন আমার দায়িত্ব হলো, আমি দুঃখ প্রকাশ করব; তাকে ধরে উঠাব। কিন্তু না, সে এদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বেপরোয়া চলে গেল। এদিকে এই বেচারা যখন ড্রেন থেকে উঠল, তখন সে কিছুই বলল না। উঠে চলে গেল। চুপচাপ থাকল, কিছুই বলল না।
এই লোককে যারা চিনত, তারা বলল, এক বছর আগেও ও যেরকম ছিল, তখন এমনটি ঘটলে এই লোক এখান থেকে জিন্দা বের হতে পারত না। আর জিন্দা যেতে সক্ষম হলেও কমপক্ষে ভাঙা হাত তো থাকতই। তারপর বলবে, এই লোকটি অনেকদিন যাবত কোনো হুজুরের নিকট যায়। বা কেউ বলবে, চিল্লায় যায়। এই ঠান্ডা মেজাজ সম্ভব ওই চিল্লায় যাওয়ার আছর। যেহেতু নরম হয়ে গিয়েছে। এই কথা কেউ বলবে না যে, মনে হয় ব্যবসায় খুব লাভ হচ্ছে, এইজন্য বিনয়ী হয়ে গিয়েছে। ঠিক কিনা?
আমল ও কাজের লক্ষ্য ভিন্ন
দুনিয়ার যত কাজ, সব কাজের লক্ষ্যই হলো আমাকে পরিবর্তন করা নয়; আমার পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে পরিবর্তন করা। আমার জামাকাপড় উন্নত করা, খাবার-দাবার উন্নত করা, ঘরবাড়ি উন্নত করা। এমনকি আশেপাশে যত মানুষ আছে, তাদেরকেও আমার ব্যাপারে উন্নত করা। যেমন, আগে আমি যখন রাস্তায় চলতাম, সাক্ষাতে আমি প্রথম সালাম দিতাম। আর এখন সালাম দিলে খুবই সংক্ষেপে বলে, "উঁহ।" কারণ বিনা পয়সার সালাম। কারণ এখন সালাম দিলে তো কোনো লাভ নেই। এইজন্য সে উত্তরও দেয় না। আমার টাকা-পয়সা-ঘর-বাড়ি হয়েছে। আমি চাই এখন তারা সালাম দিক আর আমি "উঁহ" বলব। এটা হলো আমার একটা সফলতার চিহ্ন। আর এটি আমার কাজের পরিণতি।
আল্লাহ তায়ালা আমাল দিয়েছেন চারপাশের অবস্থা পরিবর্তন করার জন্য নয়, নিজেকে উন্নত করার জন্য। নিজেকে উন্নত — এর অর্থ আমার শরীরও নয়; আমার মনকে উন্নত করা।
আগে খুব স্বার্থপর ছিল। নিজের ভাই অসুস্থ। তার ওষুধের জন্য টাকা বের করে না; কিন্তু নিজে খুব ধুমধাম করে পার্টি করছে। একেক রাতে মেহমান বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে হাজারো টাকা খরচ করে। ফুফুর খাবার নেই; ভাইয়ের ওষুধ কেনার টাকা নেই; কিন্তু এগুলো দেয় না। আর মন পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার পর এখন পুরোই উলটো। নিজে না খেয়ে তার ফুফুর খোঁজ করে, ভাইয়ের খোঁজ করে। প্রতিবেশির খোঁজ করে। সাহাবারা বা আল্লাহওয়ালারা যেমনটি করতেন। এখন লোকে বলছে, ও আর আগের মতো নেই। ও এখন ভিন্ন ব্যক্তি।
তো দীন ওই ব্যক্তিকে পরিবর্তন করে। তার আমলের দ্বারা চারপার্শ্বের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বদলায় না; আর এটি পরিবর্তনের আশাও করে না। আমলের মাধ্যমে নিজেকে পরিবর্তন করে।
মহিলার গল্প — দৈহিক সৌন্দর্যের উপমা
কিছুটা বোঝার জন্য একটি গল্প বলা যেতে পারে; যদিও সেটি একই জিনিস নয়। কোনো এক মহিলা নতুন সংসার আরম্ভ করেছে; অল্প বয়সে বিয়ে দিলে যেমনটি হয়। তারা একেবারেই গরিব। থাকেও কোনোরকমে একটি ছোট ঝুপড়িতে। তার খুব শখ, তার সুন্দর একটি বাড়ি হবে। এই শখ সবারই থাকে। আল্লাহ তায়ালা এমনই করলেন, ধীরে ধীরে সে সেই ঝুপড়ি থেকে উঠে এসে এখন বিরাট বাড়িতে থাকে। সেই বাড়িতে বর্তমান যে পর্দা রয়েছে, তার মূল্যে আগের বাড়ির পর্দাগুলো দশবার কেনা যাবে। শুধু পর্দাই কয়েক লাখ টাকার। এছাড়াও রয়েছে বড় খাট, ড্রেসিং টেবিল ইত্যাদি।
বাড়ির এই উন্নত পরিবেশ দেখে তার আগের দিনের কথা মনে পড়ছে। সে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে আর মুগ্ধ হচ্ছিল যে, আমি কোথায় ছিলাম আর এখন কোথায় এলাম! এক সময় ঝুপড়ির চেয়েও নিম্নস্তরে ছিলাম; এখন প্রায় রাজকুমারী। এসব ভাবতে ভাবতে তখন আয়নায় নিজের চেহারার দিকে নজর পড়ল, তখন নিজেকে ভালো করে লক্ষ করে তার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। এক সময় সে অত্যন্ত সুন্দরী ছিল যৌবনে। এই পরিবর্তনটি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই পরিবর্তনটি হতে গিয়ে তার জীবন থেকে চলে গিয়েছে প্রায় চল্লিশ বছর। এখন সে একজন বৃদ্ধা। তো আয়নায় যখন নিজের চেহারার দিকে তাকাল, তার মন আবার খারাপ হয়ে গেল। লম্বা শ্বাস টেনে বলল:
"আমি সুন্দর ছিলাম — আমার কিছুই সুন্দর ছিল না।
আজ আমার সব সুন্দর — কিন্তু আমি আর সুন্দর নেই।"
তো এই সবকিছু হয়েছে ঠিকই এই চল্লিশ বছরে, কিন্তু এই সবকিছু আমার সৌন্দর্যের বিনিময়ে।
এটো ছিল দৈহিক সৌন্দর্যের দৃষ্টান্ত। কিছু বোঝার জন্য এই ঘটনাটি বললাম। আসলে দীনও এইরকম, কিন্তু দীনের সৌন্দর্য হচ্ছে আভ্যন্তরীণ সিফাতের সৌন্দর্য।
আল্লাহর নামের সৌন্দর্য অর্জন করাই লক্ষ্য
আল্লাহ তায়ালার নামগুলোর প্রত্যেকটি নামই বিশেষ সৌন্দর্য প্রকাশ করে — আসমাউল হুসনা। হুসন সৌন্দর্যকে বলে। আল্লাহর নামগুলোই হচ্ছে সুন্দর নাম। এই সুন্দর নামসমূহের গুণের উপর আমলের মেহনত করে নিজের মধ্যে ওই নামের সিফাত অর্জন করা। যেমন আল্লাহর একটি নাম, আল-আদিল অর্থাৎ 'ন্যায় বিচারক।' সুতরাং কোনো ব্যক্তি আগে অন্যায় বিচার করত। বিচার যে শুধু জজরাই করেন — এমনটি নয়। দুনিয়াতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে বিচার করে না। প্রতিমুহূর্তে আমাদের কোনো না-কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এগুলোই হলো বিচার। কিন্তু এগুলোর মধ্যে নানা ধরনের অন্যায় বা অশুদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। তবে যত বেশি সেই সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে আদালত অর্থাৎ ন্যায়বিচার আসবে, তত বেশি তার সিদ্ধান্তগুলো শুদ্ধ হবে।
রাগ করে কতটুকু চড় মারা যায়, এই ব্যাপারেও শরিয়তের আহকাম আছে। রাগ করব না, তাও নয়। যেখানে রাগ করা উচিত, সেখানে না করলে শরিয়তের দৃষ্টিতে সে দোষী। তার রাগ করা উচিত ছিল। যদি বেশি রাগ করে, তাও দোষী। যেখানে যা বলা দরকার, বলল না, তাহলে দোষী। বেশি বলল, তাহলে দোষী। নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। আর এই মান নির্ণয় করা সাধারণ মানুষের জন্য খুব সহজ নয়। আল্লাহ তায়ালা যাকে ওই সিফাতে আদল দান করেছেন, আল্লাহ তায়ালা তাকে সেই মানদণ্ড বোঝার তওফিক নসিব করেন।
দানশীলতা, এটি সিফাত। আল্লাহ তায়ালার মধ্যে এই সিফাত আছে। মেহমানদারি অর্থাৎ আল-কারিম। বান্দার মধ্যে এই সিফাতগুলো যত বাড়বে, তত তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং এমন আমলের ভেতর দিয়ে নিজেকে সুন্দর করে গড়ে তোলা। আর কাজের মাধ্যমে নিজে যা ছিল, তাই থাকে। চারপাশের অবস্থাগুলো সুন্দর হয়ে যায়। কিন্তু আমলের মাধ্যমে অবস্থা তেমনই থাকে না। এইজন্য আল্লাহ তায়ালা এটাকে তিজারত বলেছেন। অর্থাৎ কিছু দিয়ে কিছু নিতে হয়।
অহংকার — আল্লাহর ও মানুষের কাছে অপছন্দনীয়
অহংকারী ছিল। অহংকারী সুন্দর নয়। আল্লাহর দৃষ্টিতেও নয়, মানুষের দৃষ্টিতেও নয়। অহংকারীকে আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন না, অসুন্দর। মানুষও অহংকারীকে পছন্দ করে না। তেমনিভাবে কোনো লোক খুব দান-খয়রাত করত। অনেক সময় দেখা যায়, ব্যবসায়ী লাখ লাখ টাকা, এমনকি কোটি টাকাও হতে পারে, যাকাত দিচ্ছে। এই যাকাত যারা গ্রহণ করে, তারা কেউ যাকাত প্রদানকারীকে ভালোবাসে না। তারা যাকাত নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসে না। তেমনিভাবে লোকটি যাকাত দিচ্ছে ঠিক, কিন্তু অহংকারী। তার যাকাত দেওয়ার ধরনেই অহংকার প্রকাশ করে। যাকে দিচ্ছে, তাকে যাকাত তো ঠিকঠাক দিচ্ছে কিন্তু তাচ্ছিল্যের ঢঙে দিচ্ছে। তাই যে তার কাছ থেকে উপকৃত হয়, সেও তাকে ভালোবাসে না; মারা গেলে দুঃখ করে না। কিন্তু এই চিন্তাও করে যে, সামনের বছর তো আর যাকাত দিতে পারবে না। কিন্তু তার জন্য যে চোখের পানি ফেলবে — তা কিন্তু নয়।
দুনিয়ার উন্নতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
সুতরাং অহংকারকে আল্লাহও ভালোবাসেন না, মানুষও ভালোবাসে না। দুনিয়াতে যে উন্নতি করল, কারণ সে উন্নতি করতে চেয়েছিল। পড়াশোনা করেছে, ফার্স্ট হয়েছে। চাকরি করেছে, প্রমোশন পেয়েছে। এভাবে প্রমোশন পেয়ে পেয়ে ঊর্ধ্বতন দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছে। ব্যবসা করেছে, কোটিপতি হয়েছে। অর্থাৎ উন্নতি করেছে।
এই যে মেহনত করেছে উন্নতির জন্য, সে অহংকারী হওয়ার জন্য করেনি। করেছে উন্নতির জন্য। পরীক্ষার রেজাল্ট যেন ভালো হয়, আমি যেন ধনী হই, আমার যেন প্রমোশন হয়। কিন্তু এটা হওয়াতে অজান্তেই সে অহংকারী হয়ে গিয়েছে। অহংকারী হওয়া তার লক্ষ্য ছিল না। ওষুধ যে রোগের জন্য খাওয়া হয় সেটি ভালো হয়, কিন্তু প্রায় সব ওষুধেরই কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা সাইড ইফেক্ট থাকে।
সুতরাং দুনিয়ার যত মেহনত আছে, সব মেহনতে তাকে দুনিয়ার উন্নতি দান করে, সম্পদ দেয়, ক্ষমতা দেয়, খ্যাতি বা পরিচিতি দেয়। গরিব ছিল, কেউ তাকে চিনতই না, এখন সবাই তাকে এক নামেই চেনে।
এক ব্যক্তির বাড়ির বিপরীত পাশে নতুন একটি বাড়ি হয়েছে। একজন ধনী ব্যক্তি বাড়িটি বানিয়েছে। বড় একটি গেট লাগিয়েছে। অপর সাইটে যার বাড়ি, তার বাড়িটিতে বিশাল গেইট নেই, যেহেতু অনেক পুরনো বাড়ি। তো সে একটি রিকশাকে ডেকে তার বাড়ির অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করছে। যদিও তার বাড়িটি অনেক পুরনো বাড়ি। রিকশাওয়ালা বলল, অমুক বিশাল গেইটওয়ালা নতুন বাড়িটির বিপরীত দিকের বাড়িটি কি না? এমন কথা হজম করা তার জন্য সহজ কোনো বিষয় না। লোকেরা পাড়ার অন্যান্য বাড়ি চিনত আমার বাড়ি দিয়ে। এখন আমার বাড়ির পরিচয় হয় অমুকের বাড়ির নামে। এখন সে সিদ্ধান্ত নিল, ফিরে এসে সর্বপ্রথম তার ঘরের গেট ভেঙে বিশাল করে নতুন গেইট স্থাপন করবে।
মানুষ পরিচিতি চায়, সম্পদ ইত্যাদি চায়। তো এগুলো চাইতে গিয়ে অজান্তে তার নিজের আভ্যন্তরীণ অনেক গুণ হারিয়ে ফেলে। পরীক্ষায় আমি ভালো রেজাল্ট করতে চাই। এদিকে মায়ের জ্বর হয়েছে। এখন আমি বসে বসে মায়ের সেবা করতে পারব না। যদি বসে বসে তার সেবা করি তবে পরীক্ষায় নম্বর তিনটা কমে যাবে। ফার্স্ট থেকে থার্ড ক্লাসে নেমে যাব না ঠিক, কিন্তু কিছু নম্বর তো কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর নম্বর যদি আমি কিছু বাড়াতে চাই, তাহলে মায়ের পাশে বসে থাকা চলবে না।
সুতরাং দুনিয়ার উন্নতি করতে গিয়ে না চাইতেও নিজের গুণের মধ্যে কিছু অবনতি মেনে নেওয়া হয়। অহংকারী হয়, স্বার্থপর হয়। দুনিয়ার মানুষ যত উন্নতি করবে, তত স্বার্থপর হবে।
গ্রামের দুই ভাই। একজন মেট্রিক পাশ করতে পারেনি আর আরেক ভাই অনেক উপরে উঠেছে। সে পড়াশোনায় ভালো ছিল। এভাবে সে অনেক উন্নতি করেছে। যে ভাই মেট্রিক পাশ করতে পারে নি আর আরেক ভাই অনেক উপরে উঠেছে। সে পড়াশোনায় ভালো ছিল। এভাবে সে অনেক উন্নতি করেছে। যে ভাই মেট্রিক পাশ করতে পারেনি, সে এখন এক মুদি দোকানের সেলসম্যানের চাকরি করে, আর যে টপাটপ অনেক উপরে উঠেছে, সে এখন বিরাট মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বড় পদে চাকরি করে। মা অসুস্থ, এখন কাউকে না কাউকে মায়ের কাছে এসে থাকতে হবে।
অতএব যে বেচারা মুদির দোকানে চাকরি করত, সে তার চাকরি ছেড়ে মায়ের কাছে চলে এসেছে। আর যে ভাই বিরাট কোম্পানিতে চাকরি করছে, সে ওখান থেকে ফোনে খোঁজখবর নিচ্ছে যে, মা কেমন আছে? মাকে দেখতে না পেরে আমার মন খুব অস্থির; কিন্তু সবকিছু ফোনেই হবে, সে আসবে না। তার বড় দুনিয়া ছাড়া ওর জন্য চলা খুবই কঠিন। অপরদিকে তার ভাই যে মুদি দোকানের কর্মচারী, তার আছেই বা কী, ছাড়লেই বা কী।
তো আল্লাহ তায়ালা আমাল দিয়েছেন। এই আমাল দিয়ে নিজেকে উন্নত করা। নিজেকে উন্নত করতে গিয়ে তার বাইরে অনেক উন্নতি ছাড়তে হয়। অপরদিকে দুনিয়াবি কাজ দিয়ে অবস্থার উন্নতি করে। অবস্থার উন্নতি করতে গিয়ে নিজের ভেতরের অনেক গুণাবলি ছাড়তে হয়। ব্যক্তিগত পর্যায়েও, জাতিগত পর্যায়েও।
ইউরোপের উদাহরণ — বিলাসিতার মূল্য
আজকের ইউরোপ-আমেরিকায় যদি যাওয়া হয়।
এদের মধ্যে মায়েদের বিরাট একটি সংখ্যা বাচ্চাদেরকে অন্যের কাছে রেখে লালন-পালন করে। বেবিকেয়ারিং জাতীয় অনেক ব্যবসা আছে। দুনিয়াতে বহু ব্যবসা আছে, তার মধ্যে এটিও একটি ব্যবসা যে, পরের বাচ্চার দেখাশোনা করা। ইউরোপের মায়েরা এই বেবিকেয়ারিং-এ বাচ্চা রেখে চলে যায়। সকালে যখন সে বাচ্চাকে রেখে চলে যায়, বাচ্চা চিৎকার করে কাঁদে আর মা চুপচাপ কাঁদে। মা চিৎকার করে না, চোখের পানি কাউকে দেখতেও দেয় না, কিন্তু তারও কষ্ট হয়। আর বাচ্চা তো প্রকাশই করে। বাচ্চাটির সারাটা দিন কাটে এতিমের মতো; এ এক এতিমের জীবন। মা-ও নেই, বাবাও নেই; অবহেলিত।
বিকালবেলা যখন নেওয়ার সময় হয়, তখন তারা ডায়াপার ইত্যাদি বদলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বাচ্চাটিকে মায়ের কাছে দেয়। এই ছাড়া সারাটা দিন সে ময়লার মধ্যে পড়ে থাকে, তখন বাচ্চাকে দেখেও না। বাচ্চার খাবারস্বরূপ যা কিছু দিয়েছে, সেগুলোর পুরোটা বাচ্চাকে না খাইয়ে নিজেরা খেয়ে ফেলে। সবাই যে এমন করে, তা বলছি না; কিন্তু করে না — তাও নয়। মা-ও যে জানে না — তাও নয়। কিছু জানে, কিছু জানে না; কিন্তু কিছুই করার নেই।
কারণ বাচ্চাকে যদি না রেখে যায়, তাহলে সামনের ছুটিতে দূর সমুদ্রে তার ভ্যাকেশনে যাওয়া হবে না। আর ভ্যাকেশনে যেতে হলে তার বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন। ওই অঙ্কের টাকা উপার্জন করতে হলে তাকে বাচ্চাটি এখানে রেখে যেতেই হবে।
মা-বাবা বৃদ্ধনিবাসে; একাকি থাকে। ছেলেমেয়েদের কেউ খোঁজ নিতে আসে না। বাবাদের সংখ্যা কম; বৃদ্ধনিবাসে বুড়ি মায়েরা থাকে। এই জাতীয় মিথ্যা গল্প মহিলারা খুব বেশি করে থাকে যে, আমার ছেলে কালকে এসেছিল; আমার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করেছে, খুব গল্প করেছে। অথচ বাস্তবতা হলো, ছেলে গত এক বছরে একবারও আসেনি।
বছরে একটি মাদারস ডে আসে। এই সন্তানরা মাদারস ডে-তেও আসে না। আবার ব্যাংকে ফর্ম পূরণ করে রাখা আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক স্বউদ্যোগী হয়ে আর্থিক বিনিময়ের বদলে ফুলের তোড়া মাকে ডাকযোগে পাঠিয়ে দেয়; কিন্তু ছেলেরা আসে না।
আজ থেকে একশ বছর, মাত্র একশ বছর পেছনে চলে গেলে গোটা ইউরোপ খুঁজে একটি বৃদ্ধনিবাস পাওয়া যাবে না; ছিল না। তখন মা-বাবা কোথায় থাকত? ছেলে-মেয়েরা দেখত। একশ বছর আগে গোটা ইউরোপ খুঁজে বেবিকেয়ারিং সিস্টেমটা পাওয়া যাবে না। মা সন্তানদের দেখত; এখন কি সব মায়েরা মরে গিয়েছে? মায়েরা মরে যায়নি; বরং কাজে চলে গেছে। বিনিময়ে কী পেয়েছে? বিনিময়ে বর্তমানে যে বিলাসিতাগুলো ঘরে ঘরে পাচ্ছে, এই বিলাসিতা একশ বছর আগে একটি রাজবাড়িতেও ছিল না। গরম পানি আর ঠান্ডা পানির জন্য আলাদা ট্যাপ রয়েছে।
যে বিলাসিতা একশ বছর আগে দুনিয়ার কোনো রাজবাড়িতেও ছিল না, একশ বছর আগে বৃদ্ধদের ফেলে দেওয়ার জন্য বৃদ্ধনিবাস, যাকে বুড়োদের ডাস্টবিন বলা যেতে পারে, সেই বৃদ্ধনিবাস বা বাচ্চাদের জন্য বেবিকেয়ারও ছিল না। অতঃপর এই বিলাসিতা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু মা-বাবা হারিয়ে, সন্তানকে হারিয়ে।
আজ যদি মা-বাপ না থাকে, যদি সন্তান না থাকে, যদি স্বামী না থাকে, যদি স্ত্রী না থাকে তাহলে আমি আছি কোথায়!
এই বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে খুব ভালো বোঝা যাবে যে, একজনকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তুমি কেমন আছ? — আমি খুব ভালো। তোমার হাত কোথায়? হাত কাটা গিয়েছে। পা কোথায়? পা কাটা গিয়েছে; কিন্তু আমি ভালো আছি। আমার হাতও নেই, পাও নেই, চোখও নেই, কানও নেই; কিন্তু আমি ঠিকই আছি। যেমন আত্মীয়-পরিবার কিছুই নেই, তবুও ইউরোপ ভালো আছে।
প্রফেসর সরওয়ার হোসেন সাহেবের ঘটনা
প্রফেসর সরওয়ার হোসেন সাহেব। রাজশাহী ইউনিভার্সিটির একসময় ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কিছুদিন আগে ইন্তেকাল করেছেন। তিনি বিলেতে একসময় বড় একটি পদে চাকুরিরত ছিলেন। তো অফিস শেষে বিকালবেলা ঘরে ফিরছেন। ইউরোপে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাধারণত মহিলারা হয়ে থাকে; তো তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ঘরে ফিরছিল। অফিস থেকে বের হতে লম্বা লবি হেঁটে যেতে হয়। তো একসাথে হেঁটে বের হওয়ার সময় অ্যাসিস্ট্যান্টকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এখন কোথায় যাবে? সে বলল, বাড়ি যাব। রান্না করব। ছেলেকে খাওয়াব। তার ছোট ছেলে আছে, স্বামীও আছে, প্রফেসর সাহেব জানতেন। তাই জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার স্বামীকেও খাওয়াবে? পিএ বলল, না, সে আলাদা খায়।
যেহেতু বেশকিছু পথ একসাথে হেঁটে হেঁটে বেরুচ্ছিলেন, তাই গল্প করতে করতে পিএ আরও বলল, তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক ও মহব্বত খুবই ভালো। তবে খাওয়া-দাওয়া আর বাজার এগুলো আলাদা। সম্পর্ক যে ভালো — এর প্রমাণ কী? উত্তরে বলল, একই বাড়িতে থাকি, একই রান্নাঘর ব্যবহার করি, সময়ও ভাগ করে নিয়েছি। তাই মিল-মহব্বত বেশি থাকার কারণে একই বাড়িতে থাকতে কোনো সমস্যা হয় না; একই রান্নাঘর শেয়ার করতেও তেমন কোনো সমস্যা হয় না; তাই মিল-মহব্বত খুব বেশি। এই হলো মিল-মহব্বতের অবস্থা।
অথচ একশ বছর পূর্বেও এমন অবস্থা ছিল না। বিলাসিতা কিনেছে ঠিকই, কিন্তু ভালো দাম দিয়ে কিনতে হয়েছে, ফ্রিতে আসেনি।
মালির সৌন্দর্যের গল্প
এর মোকাবেলায় আল্লাহ তায়ালা দীন দিয়েছেন, উন্নত জীবন পেয়েছে, কিন্তু তা বিনে পয়সায় নয়; মূল্য দিয়ে পেয়েছে।
এক বিদেশি ভ্রমণে বের হয়েছে। ঘুরতে ঘুরতে এক বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। বাগানের ভেতরে লক্ষ করল, বাগানের মালিক সারাদিনের কাজ শেষে খাবারের জন্য বসেছে। মালিকের বাড়ি থেকে তার খাবার এসেছে। বাগানের মালিকের পক্ষ থেকে তার মালির জন্যও খাবার এসেছে। সবাই খাবার খেতে বসেছে, এমন সময় একটি কুকুর মালির সামনে এসে বসল আর ওর দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। অর্থাৎ কুকুরও খেতে চায়। সে তার খাবার থেকে একটি টুকরো কুকুরকে দিয়ে দিল। কুকুর সেটি সাথে সাথে খেয়ে ফেলল। এরপর আবার মালির দিকে তাকিয়ে থাকল। মালি আবার খাবার দিল, কুকুর সেটি খেয়ে আবার তাকিয়ে থাকল। এভাবে দিতে দিতে মালি তার তিনটি রুটির তিনটিই দিয়ে দিল বা খাবারের কিছু অংশ নিজে খেল আর বেশিরভাগ কুকুরকে দিল।
আগন্তুক দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখছিল। তার কাছে এই দৃশ্যটি খুব সুন্দর লাগল। মানুষের সৌন্দর্যবোধ ভিন্ন; কেউ সৌন্দর্য দেখে আচরণের মধ্যে আর কেউ সৌন্দর্য দেখে জিনিসের মধ্যে। বিরাট সুন্দর বাড়ি দেখল।
ভেতরে কী? ভেতরে মানুষ। কিন্তু সেই মানুষ সম্পর্কে জানিও না যে কেমন আছে। হয়তো সেই সুন্দর বাড়ির ভেতরে আত্মহত্যা করছে। তো সেই আগন্তুকের দৃষ্টি জিনিসের প্রতি যাচ্ছে না, যাচ্ছে আচরণের দিকে যে, একটি কুকুরকে সব খাবার বা প্রায় খাবার খাইয়ে দিল আর নিজে খেল না বা প্রায় খেল না।
তিনি মুগ্ধ ও আকৃষ্ট হয়ে মালির নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে? — আমি এই বাগানের মালি। — এই বাগান কার? — উসমান ইবনে আফফান রা.-এর বংশধরদের বাগান। — তোমার মালিক কে? — অমুক। আমি তাদের গোলাম।
আগন্তুক মালিকদের কাছে গিয়ে বললেন, আপনাদের ওই বাগান আমি ক্রয় করতে চাই। আগন্তুক ধনী ব্যক্তি ছিল। বাগানের মালিকপক্ষ এই প্রস্তাবে রেগে গেল না। বলল, ঠিক আছে, আমি বিক্রি করে দিলাম।
এখন আগন্তুক বলল, মালি তথা গোলাম, তাকেও কিনতে চাই। এখন বাগানের মালিক একটু ইতস্তত করল যে, আমাদের অনেকদিনের পুরনো সম্পর্ক। আমরাও তাকে ভালোবাসি। সেও আমাকে ভালোবাসে। আমরা তাকে দিতে রাজি না। অনেক পীড়াপীড়ি করার পরে তারা রাজি হয়ে গেল। এভাবে আগন্তুক বাগান এবং বাগানের মালি উভয়কে কিনে নিল।
ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার পর আগন্তুক বাগান পরিদর্শনে গেল। মালিকে গিয়ে বলল, তোমাকে আমি কিনে নিয়েছি তোমার মালিকের কাছ থেকে। মালি বলল, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ বরকত দিন। এরপর মালিকে বলল, এই বাগানও আমি কিনে নিয়েছি। মালি বলল, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ বরকত দিন। মালিক বলল, আমি তোমাকে স্বাধীন করে দিলাম এবং এই বাগান তোমাকে হাদিয়া দিয়ে দিলাম। মালি বলল, আলহামদুলিল্লাহ। কথা শেষ হলো।
এখন মালি বলল, আপনি সাক্ষি থাকুন, আমি বাগান আমার আগের মালিকদেরকে দিয়ে দিলাম। আর আমি তার আগের মালিই রয়ে গেলাম।
এই তিনজনের কাছে এত বড় মূল্যবান বাগান একটি তুচ্ছ জিনিস। এর বিপরীতে মানুষ তো মানুষ, এর চেয়ে তুচ্ছ একটি কুকুরের সাথে সম্পর্ক, এটি উনার নিকট অনেক কদর যে, নিজে না খেয়ে কুকুরকে খাইয়েছে। তাকে যখন জিজ্ঞেস করলেন যে, তুমি না খেয়ে কুকুরকে খাবারগুলো কেন খাইয়ে দিলে? উত্তরে সে বলল, এ কুকুর এখানকার না; বাইরের কোথাও থেকে এসেছে। একটি ক্ষুধার্ত কুকুর আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে আর আমি খাব — বিষয়টি আমার নিকট লজ্জাস্কর। তাই আমি খাবারগুলো কুকুরকে দিয়ে দিলাম।
এর আগে বাগানের মালিকের কাছে গিয়ে যখন বাগান কিনতে চাইল, মালিকও হয়তো এভাবে ভেবেছে যে, একজন মানুষ আমার বাগান কিনতে চেয়েছেন, আমি না বলি কীভাবে। লজ্জা লাগল, তাই দিয়ে দিলাম।
তো একটি কুকুরের সামনে লজ্জা করছে, নিজে না খেয়ে তাকে খাওয়াচ্ছে। অপরিচিত মানুষের সামনে লজ্জা করছে, এত বড় সম্পদ দিয়ে দিচ্ছে। তো মানুষের সাথে সম্পর্ক, এমনকি জীব-জন্তুর সাথেও সম্পর্ক। প্রতিটি কদমে লজ্জা করা — মানবীয় গুণাবলির সৌন্দর্য।
ইংলিশ চ্যানেলের জাহাজে আমেরিকান ছেলেদের ঘটনা
অনেকদিন আগের ঘটনা, চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর হতে পারে। গ্রীষ্মকালে ইউরোপের দেশগুলোতে লোকসংখ্যা প্রায় কমেই যায় আর বিদেশি লোক বেড়ে যায়। এদিকে ফ্রান্সে ও ইংল্যান্ডে টুরিস্ট আসা-যাওয়া করতেই থাকে। কিছু মানুষ ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে জাহাজে আসা-যাওয়া করত। আজকাল সরাসরি সড়কপথও হয়ে গিয়েছে, সম্ভবত সমুদ্রের মধ্য দিয়ে টানেল নির্মিত হয়েছে। তো ওইরকম ছোটখাটো একটি জাহাজ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সামনে ছোট্ট একটি টেবিল পাতা। দু পাশে আমেরিকান দুটি ছেলে বসে রয়েছে। একজনের হাতে চিপসের প্যাকেট আর সে একটু পর পর সেখান থেকে খাচ্ছে। আর অপরজন তার ঠিক উলটো দিকে বসে আছে। কথাবার্তা বলতে গিয়ে পরিচয় হলো। পরিচয় পর্বে জানা গেল, তারা একই জায়গার, একই স্কুলের। এভাবে কথা বলতে বলতে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বও হয়ে গেল।
আমি তাদের পাশেই বসে আছি আর তাদের কথাবার্তাগুলো শুনছিলাম; কিন্তু আমি তাদের সাথে কোনো আলাপ করিনি। তারা গল্প করছে... তাদের একজন কিছুক্ষণ পর পর চিপস খাচ্ছে আর অপরজন দুঃখের কথা বলছে: সে খায়নি; তার টাকা হারিয়ে গেছে ইত্যাদি। এদিকে অন্যজন কেবল শুনছে আর আহ্ আহ্ করছে যে, বড় দুঃখের কথা; কিন্তু তার হাত থেকে চিপস দিচ্ছে না। তার হাতে প্যাকেট ভর্তি চিপস, একটু দিলেই বেচারার দুঃখ শেষ হয়ে যায়।
আসল কথা হলো, একজন ক্ষুধার্তকে খাবার দিতে হয় — এই বোধটিই তার নেই। আমি তাকে কৃপণ বলব না। কেউ যদি তাকে বলত যে, সে ক্ষুধার্ত; তার কষ্ট হচ্ছে, তাকে খাবার দাও — তখন হয়তো তার হাত থেকে চিপস দিত; কিন্তু নিজ থেকে এই বোধটি তার নেই। তার খেয়ালই হচ্ছে না।
এই অনুভূতিহীনতা যে সবসময় এইরকমই ছিল — তাও নয়। ওই আমেরিকাতেই একশ-দুইশ বছর আগে এইরকম অবস্থা মোটেও ছিল না। একটি ব্যবসা করছে, এই ব্যবসাতে কিছু দিয়েছে, বিনিময়ে কিছু নিয়েছে। নিজ সৌন্দর্য হারিয়েছে আর বাইরের সৌন্দর্য কিনেছে।
প্যারিস ইত্যাদি বেশিরভাগ শহরের রাস্তাগুলো শুধু ঝাড়ু দেওয়া হয় না, পানি দিয়ে ধোয়াও হয়। প্রতিটি শহরে যে পরিমাণ পরিশ্রম তারা রাস্তার জন্য করে থাকে, সেই পরিশ্রমের একটুখানি অংশ যদি তারা নিজেদের মনের জন্য করত! তাদের মনজগত কোথায় কোন ভাঁড়ারে পড়ে আছে, তার কোনো খোঁজখবরই নেই।
দুটি ব্যবসার তুলনা
আল্লাহ তায়ালা আমাল দিয়েছেন, দীন দিয়েছেন নিজেকে সুন্দর করার জন্য। কিন্তু তা এমনিতে হয় না। ওই যে বললাম, দুনিয়া উপার্জন করতে চেয়েছে, বিলাসিতা করতে চেয়েছে। এখন এই বিলাসিতার জন্য তার ছেলেকে হারানো উদ্দেশ্য ছিল না; মাকে হারানোও উদ্দেশ্য ছিল না। তার লক্ষ্য হলো সম্পদ আর বিলাসিতা। আর ওই বিলাসিতা আনতে গিয়ে এই বন্ধন ছুটে গেছে; ওটা ধরে রাখা যায়নি।
অপরদিকে যে আল্লাহওয়ালার কথা বলা হলো — মুহূর্তের মধ্যে বিরাট বাগান তিন হাত ঘুরে গেল। বাগানটি আগের মালিকের কাছে ছিল; নতুন ক্রেতা কিনল। অতঃপর মালিকে দান করে দিল। মালি আবার সেটি তার আগের মালিককে দান করে দিল। এতবড় সম্পদ কিছুক্ষণের মধ্যে তিন হাত ঘুরে গেল। আর তাদের মধ্যে একটা ভালোবাসার সম্পর্ক আগেই ছিল, সেটি আরও গভীর হলো।
তারা নামে গোলাম-মালিক কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন আরেকজনের হয়তোবা উস্তাদ। এমনও হতে পারে যে, ওই বাড়ির বড় কোনো সিদ্ধান্ত, যেমন ছেলের বিয়ে বা ব্যবসা-বাণিজ্য — এই জাতীয় বড় কোনো সিদ্ধান্ত ওই বিশেষ গোলামকে জিজ্ঞেস না করে করা হয় না। নামে গোলাম আর বাস্তবে পুরো বাড়ির মালিক সে।
তো আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দীন দিয়েছেন নেক আমলের মাধ্যমে নিজেকে সুন্দর করার জন্য। নিজেকে সুন্দর করতে গিয়ে হয়তো বাড়ি নিম্নমানের হয়ে যাবে। জামাকাপড় হয়তো ছেঁড়া হয়ে যাবে। ছেঁড়া জুতো পরে চলতে হবে।
এই ব্যবসার পথও আল্লাহ তায়ালা দেখিয়েছেন:
هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُّنْجِيْكُمْ مِّنْ عَذَابٍ أَلِيْمٍ
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দীন দিয়েছেন আর এই দীনকে বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসা বলে অভিহিত করেছেন। এই ব্যবসা প্রধানত সম্পদ দেওয়া নয়, বরং সৌন্দর্য নেওয়া বা সৌন্দর্য দেওয়া। বা এই কথা বলা যেতে পারে যে, বাহ্যিক সৌন্দর্য দেওয়া বা হারানোর বিনিময়ে স্বীয় আত্মিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা।
ব্যবসা এক তরফা হয় না। বিনা দামে একটি জিনিস নিয়ে এলাম, এটাকে ব্যবসা বলে না। এটা হয়তো দান, নতুবা চুরি। ব্যবসা হলো দুটি ভালোর বিনিময় করা যে, টাকাও ভালো মাছও ভালো। ভালো টাকা দিচ্ছি, ভালো মাছ কিনছি। অর্থাৎ দুটি ভালোর লেনদেন। বাহ্যিক সুন্দর বাড়ি, সুন্দর জামা এগুলো কোনো খারাপ জিনিস নয়। বিলাসিতার মধ্যেও একটি আনন্দ আছে। এটাও ভালো জিনিস। আর আল্লাহ তায়ালা যে ব্যবসার কথা বলেছেন সেটি হলো, বাহ্যিক জগতের ভালো জিনিস দিয়ে রুহানি জগতের ভালো জিনিস কেনা। আর দুনিয়াতে বাহ্যিক জগতের ভালো জিনিস কিনতে গিয়ে রুহানি জগতের সব হারায়।
শয়তানের ফাসিদ ব্যবসা
ইউরোপীয় সভ্যতার কেউ লক্ষ্য করেনি এবং এটা তাদের টার্গেটও ছিল না যে, বাচ্চাদেরকে অবহেলা করব। তারা পরিকল্পনা প্রণয়ন করে, দশ বছরের পরিকল্পনা, বিশ বছরের পরিকল্পনা। কখনো কোনো দেশের পরিকল্পনায় এটা খুঁজে পাওয়া যাবে না যে, আমরা আশা করছি, আগামী পঞ্চাশ বছর পরে আমাদের দেশের সব শিশুরা সম্পূর্ণ অবহেলিত হবে। এই জাতীয় কোনো পরিকল্পনাও কোনো দেশ করেনি; কিন্তু যে পরিকল্পনা করেছে, ওই পরিকল্পনা অর্জন করতে গিয়ে এটা অটোমেটিক হয়ে গিয়েছে।
আল্লাহ তায়ালাও এইরকম পরিকল্পনা দেননি যে, দীনের উপর চললে তোমার জামা ছেঁড়া হয়ে যাবে, আধা বেলা খেতে হবে বা দুই দিনে এক বেলা খাবার জুটবে। কিন্তু যেসব সিফাতের পথ দেখিয়েছেন, সেই সিফাত অর্জন করতে গিয়ে এইগুলো অনেক সময় হয়েই যায়। যে এই পথে চলবে, সে চলতে গিয়ে এগুলো মেনে নিয়েই চলতে হবে।
ক্যান্সার আজকাল একটি সাধারণ ব্যাধি হয়ে গিয়েছে। কেমো থেরাপি দিতে হয়। এই কেমো থেরাপি যদি নেয়, তার সব চুল পড়ে যাবে; অরুচি হবে; মাথাঘুরবে। একটি-দুটি নয়, হাজার ধরনের যন্ত্রণা আসবে; কিন্তু তারপরও কেমো থেরাপি নিতে রাজি হয়। এই যন্ত্রণাগুলো তার লক্ষ্য নয়, কিন্তু ডাক্তাররা বলে আর সেও ধারণা করে যে, এই কেমো থেরাপির মাধ্যমে আরও দু-চারদিন বেশি হয়তো বাঁচবে।
ঠিক তেমনিভাবে আমি যদি বাইরের বিলাসিতা চাই তাহলে আমার অন্তরকে একেবারে নিঃস্ব বানিয়ে ছাড়তে হবে। আর আমি যদি আমার আভ্যন্তরীণ জগতের সৌন্দর্য চাই তাহলে বাইরের জগতের কিছু বিলাসিতা আমাকে ছাড়তে হবে।
রাজকুমারদের শোকর
আল্লাহ তায়ালা আমাদের দীন দিয়েছেন। দীনের মাধ্যমে উন্নত অন্তর দান করেন। কেউ যদি উন্নত অন্তর পেয়ে যায় তাহলে তার কাছে বাইরের জিনিসগুলো কমে গেলেও এটি ক্ষতি মনে হবে না। এমন একজন আল্লাহওয়ালা পাওয়া যাবে না, যিনি দুঃখ করছেন — হায়! আমি ধনী ছিলাম; এখন গরিব হয়ে গিয়েছি।
রাসূল সা.-এর জামানায় একাধিক রাজকুমার। যেমন ফিরোজ দায়লামী নামের একজন, ওয়াইল ইবনে হুজর নামের একজন, এছাড়াও আরও বাদশাহ বা রাজকুমার ছিল। মুসলমান হওয়ার পর তারা একেবারে সাধারণ মানুষ হয়ে গিয়েছেন। যারা কিছুদিন আগেও রাজকুমার ছিলেন, এখন সাধারণ জনগণ। নিজেদের আগের দিনের সাথে বর্তমান দিনের তুলনা করে আল্লাহর নিকট মন ভরে শোকর আদায় করতেন। দুদিন আগে আমি রাজকুমার ছিলাম; এখন আমার কিছুই নেই, তবুও মন ভরে শোকর আদায় করছেন যে, হে আল্লাহ! তোমার মেহেরবানি, আমি কোথায় ছিলাম, এখন তুমি আমাকে কোথায় রেখেছ।
অর্থাৎ দুঃখ তো নেই; বরং আল্লাহর কাছে শোকর আদায় করছেন। অথচ সে নিজে রাজকুমার ছিল আর এখন হয়তো ভালো করে পেট ভরেও খেতে পারছে না। তারপরও তারা শোকর আদায় করছেন। অর্থাৎ এই দীন এত বড় সম্পদ যে, যদি হারাতে হয় তবে কেউ হারাতে কোনোভাবেই রাজি হবে না।
ছেলেমেয়ে-মা-বোন-আত্মীয়স্বজন সবাইকে নিয়ে বড় আনন্দের ভালোবাসার জীবন — এটাকে যে ভালো করে জানে, এর বিপরীত ভালোবাসাহীন বিলাসিতার জীবন সম্পর্কেও যদি কেউ জানে তাহলে কেউ এত দাম দিয়ে বিলাসিতা কিনতে রাজি হবে না। কিন্তু মানুষ যেহেতু জানে না, তাই বিলাসিতার জীবন বেছে নেয়।
শয়তান এইরকম ফাসিদ ব্যবসা করে। এই ইউরোপকে যদি আগেই বলে দিত যে, তুমি বিলাসিতা পাবে ঠিক, কিন্তু এর বিনিময়ে তোমাকে এই এই জিনিস হারাতে হবে, তাহলে তারাও রাজি হতো না। কিন্তু শয়তান এগুলো গোপন রেখেছিল। বিলাসিতার বদলে কী কী পাবে — এর খুব লোভ দেখিয়েছে, কিন্তু কী হারাতে হবে, এগুলোর সবকিছু গোপন করেছে। এখন ফিরে আসার কোনো উপায় নেই। কারণ শয়তানের কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছে।
এইজন্য এ থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দীনের উপর চলার তওফিক নসিব করুন। আমিন।
সবাই নিয়ত করি, আমরা দীনের উপর চলব। এই দীনের উপর চলতে গিয়ে কিছু হারাতে হতে পারে, এটি কোনো দুঃখের ব্যবসা নয়; বরং আমি বড় আনন্দের সাথে মেনে নেব। আল্লাহ তায়ালা এত বড় নেয়ামত দিয়েছেন, এর থেকে যদি আমার ছোটখাটো কিছু ছুটে, এটি আমার জন্য কোনো দুঃখের বিষয় নয়। নিজেকে প্রস্তুত করব। যদি গরিব হয় তাহলে শয়তান ভয় দেখাতে পারে যে, তুমি গরিব হয়ে যাবে। না, এমনটি নয়। আল্লাহ তায়ালা ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন, আল্লাহ নিশ্চয়ই দেবেন। ইনশাআল্লাহ।
সমাপ্ত
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
বাহ্যিক উন্নতি নাকি আত্মিক সমৃদ্ধি?
আল্লাহ তাআলা নেক আমলের আদেশ দিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে সুন্দর জীবন দান করার ওয়াদা করেছেন। সুন্দর জীবন...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৯৮৪
নিভৃতচারী আল্লাহওয়ালাদের খোঁজে
হজরতের গড়া ছোট্ট, অথচ সুন্দর মাদ্রাসা। মাদ্রাসা থেকে এক ছাত্রকে রাহবার হিসেবে সাথে নিয়ে যখন হজরতের ব...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১১৫৯৪
আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের শক্তি
মানুষের অনুসরণ প্রবণতা দুনিয়ার মানুষ একজন অন্যজনের কাছ থেকে শিখে, দেখে, অনুকরণ করে এবং অনুসরণ করে চ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২১ জানুয়ারী, ২০২৬
৪৩৩৭
প্রত্যাশা-হিসাব ও তাওয়াক্কুল-বরকত
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও ক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৯৫৬
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন