দাওয়াতের প্রাণ মুহাব্বত
দাওয়াতের প্রাণ মুহাব্বত
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত]
أعوذ بالله من الشيطان الرجيم بسم الله الرحمن الرحيم ، وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ
আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে ইখলাসের হুকুম দিয়েছেন।
ইবাদতের মধ্যে যেমন ইখলাস দিয়েই তার মূল্য।
পরিমাণে খুবই অল্প, কিন্তু ইখলাসের সাথে করা হয়েছে, ঐটার আল্লাহর কাছে খুবই কদর।
পরিমাণে অনেক বেশি কিন্তু ইখলাস কম, ঐটার আল্লাহর কাছে মূল্য নেই।
আমলের যে কবুলিয়ত, সৌন্দর্য; ঐটা তার সিফতের ওপর নির্ভর করে।
আর আল্লাহ তাআ’লা আমাদের কাছে পরিমাণ চান না, আল্লাহ তাআ’লা আমাদের কাছে সিফত চান।
لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
সুন্দর আমল চান। কেমন করে তুমি করলে।
فَيَنظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُون
كَمْ تَعْمَلُونْ - কত করলে নয়।
كَيْفَ تَعْمَلُون - কেমন করে করলে।
অল্পই হোক না কেন সুন্দর করে কর।
ইবাদতের সৌন্দর্য তো ইখলাসের মধ্যে।
দাওয়াতের সৌন্দর্য কি?
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ
মাকসাদ হিসেবে এই দুটো- ইবাদত এবং মানুষের জন্য বের করা হয়েছে
অর্থাৎ দাওয়াত; অন্যের উপকারের জন্যে।
উপকার মানুষ বিভিন্নভাবে করে থাকে। আমরা সাধারণত যে উপকার দেখে থাকি, মানুষ করে- ঐটা যার উপকার করছে তার ঠেকা মনে করে করে।
একজন লোক বিপদে পড়েছে, আমি তার সাহায্য করলাম। ওর ঠেকা মনে করে করে থাকি। আমার ঠেকা নয়। আমি তার উপকার করছি, একটা ভাল কাজ করছি, এটা তার ঠেকা।
কিন্তু যার উপকার সে করছে, সে যদি তার কাছে খুবই প্রিয় হয়; তাহলে তার উপকার যে করছে, ঐটা উপকার হিসেবে মনেও হয় না আর ঠেকা নিজের মনে হয়।
যেমন আমার পাড়ার এক ছেলে অসুস্থ। ও গরিব, চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পারে না; আমাকে আল্লাহ তাআ’লা ধন দৌলত দিয়েছেন, আমি ভাবলাম যে এই বেচারা গরিব, কষ্ট পাচ্ছে, চিকিৎসা করাতে পারছে না, আমি সাহায্য করি। চিকিৎসা করালাম। তো এই যে সাহায্য করছি, ভাল কাজ করছি, সওয়াব আশা করি।
খোদা নাখাস্তা, নিজের ছেলেই অসুস্থ হয়ে গেল। নিজের ছেলের যখন চিকিৎসা করি, এর জন্য অর্থ ব্যয় করি, এই কথা খেয়ালও হয় না যে আমার সওয়াব হচ্ছে। এটা যে উপকার করছি, তাও তো খেয়াল হয় না।
উপকার করলে না সওয়াব হবে। কেন খেয়াল হয় না? ভালবাসা বেশি থাকার কারণে, গালেব থাকার কারণে, উপকার করছি এই খেয়াল থাকে না, আমি তো আমার কাজ করছি। পরের কাজ হলে না উপকার হবে। আমি আমার কাজ করছি। সেজন্য উপকার করছি এটাও মনে থাকে না। আর ঐটা যেহেতু মনে থাকে না; সেই জন্যে এইখান থেকে আমি যে সওয়াব আশা করব, ঐ দিকেও ধ্যান যায় না।
যখন সম্পর্ক গভীর হয়, আর সে প্রিয় হয়, ঊপকারকে উপকার মনে হয় না, বরং নিজের ঠেকা মনে হয়।
আর কেউ যদি এতে অংশগ্রহণ করে, তখন মনে হয় সে যেন আমার সাহায্য করল।
আমার ছেলে অন্য জায়গায় অসুস্থ। আমি নিজেও অসুস্থ। ও ঢাকায় অসুস্থ, আমি যে দেখতে যাব, আমার পক্ষ থেকে আমার একজন প্রতিবেশি বা আত্মীয় ভাতিজা গেল দেখার জন্য। ও গিয়ে দেখা সাক্ষাত, খোঁজ খবর করে এসে জানাল যে ভালই আছে। ও যে আমার ছেলেকে দেখতে গেল, এর জন্যে ওর কাছে আমি কৃতজ্ঞ হই।
পাড়ার এক অসুস্থ ছেলেকে আরেকজন দেখতে যেতে চাইল। কিন্তু তার কাছে ভাড়া নেই। আমি বললাম যে ঠিক আছে আমি ভাড়া দিব। তো আমি ভাড়া দিলাম আর সে দেখতে গেল। তখন আমার মনে হয় যে আমি এটা সদকা করেছি। তার ওপর আমি অনুগ্রহ করেছি।
যে গেছে তার ওপর অনুগ্রহ, যাকে দেখতে গেল তার ওপর অনুগ্রহ। আর এজন্য আমি সওয়াবও আশা করি, যদি আল্লাহর ওয়াস্তে করে থাকি।
আমার ছেলেকে যখন দেখতে গেল, তখন আমার মনে হয় না যে আমার অনুগ্রহ, আমি ভাড়া দিয়ে পাঠালাম। বরং মনে হয় যে তার অনুগ্রহ আমার ওপর; সে অনুগ্রহ করে দেখতে গেল।
পার্থক্য কোথায়?
পার্থক্য হল যে একজন আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয়, তাই ওর জন্য যা কিছু করা হয় ওগুলো যেন আমিই করলাম, আর এজন্য যদি কেউ সহায়তা করে, আমি যদি তাকে টাকাও দেই যে আমার ছেলেকে একটু দেখে আস, আর সে আমার টাকা দিয়েই যায়, আর শুধু ভাড়াই নয়, ব্যক্তিগত খরচের জন্য পকেট মানিও দিয়ে দিলাম; এসব কিছুর পরেও মনে হয় যে ও আমার ওপর এহসান করল।
‘দাওয়াত’- আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে ঐ আমল দিয়েছেন, যেটা ঐ প্রচলিত অনুগ্রহের মত নয়।
যে তার ঠেকা, আমি তাকে গাস্ত করলাম। বরং এটাতো ভালবাসার সাথে যেন হয়; যেন এটা আমার ঠেকা হয়ে যায়। আজ আমরা যদি তাবলীগ করিও, মনে করি যে ওর ঠেকা।
আমরা যদি মেহেরবানি করে গাস্ত টাস্ত করে কাউকে নামাযি বানিয়ে দিতে পারি, মুসলমান বানিয়ে দিতে পারি, দ্বীনদার বানিয়ে দিতে পারি আর ও জাহান্নাম থেকে বাঁচল তো আমি মনে করি যে ওকে উদ্ধার করলাম।
আর যদি ও হিদায়াতের পথে না আসে, তারপর এক পর্যায়ে গাস্ত টাস্ত করে যখন কোনভাবেই তাশকীল করা যায় না; তখন শেষে রাগ টাগ করে বলি যাক জাহান্নামে যাক। ও জাহান্নামে যাক তো আমার কি? ওর যদি ঐটাই ভাল লাগে তো ও যাক।
(কিন্তু) নিজের ছেলে যদি হত। তাহলে কখনও তাকে ছেড়ে দিতে পারতাম না।
পাড়ার ছেলে নেশা করে। পাড়ার আরেকজন ভাল লোক ঐ ছেলেকে নেশা থেকে উদ্ধার করতে চায়। নেশা থেকে উদ্ধার করার জন্য কিছু হাসপাতাল জাতীয় জিনিসও আছে। ওগুলো বেশ ব্যয়বহুল। অনেক টাকা দিতে হয়। সবার জন্য টাকা দেওয়াও মুশকিল। ঐ ভদ্রলোক বললেন যে ঠিক আছে আমি টাকা দিব। ওখানে গিয়ে চারমাস থাকুক। বেশ লম্বা সময় থাকতে হয় আর অনেক টাকাও লাগে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেক বলা কওয়ার পরেও ঐ ছেলেকে আর রাজি করানো গেল না; সে হাসপাতালে গেল না। তখন ঐ লোক রাগ হয়ে বলল- যাক, জাহান্নামে যাক।
(কিন্তু) নিজের ছেলে হত, তো ছাড়তাম না। এইটা না করে ঐটা, ঐটা না করে ঐটা, আর শেষ পর্যন্ত কোনটাই যদি না হয় – দুঃখ করতাম। হায়! আমার কপাল খারাপ। ঐ অন্য ছেলে যখন গেলনা, তখন বলে জাহান্নামে যাক। চেষ্টা করলাম, ঠিক হলনা, ও নেশাই করুক। আর নিজের ছেলে যদি না যায়, বলব না যে জাহান্নামে যাক। বলব আমারই কপাল খারাপ। ওর কপাল খারাপ বলছি না, বলছি আমারই কপাল খারাপ। কারণ ভালবাসা গালেব।
দ্বীন আমাদেরকে দাওয়াত শেখায়; ঐ দাওয়াত ওরকম নয় যে ওর ঠেকা আমি সাহায্য করছি; চেষ্টা করলাম, মেহেনত করলাম, না হলে ও জাহান্নামে গেল। বরং আমার ঠেকা।
ঐ ঠেকা তো বাহ্যিকভাবে বোঝা যায়না। ওটা দিলের ভেতর একটা অবস্থার নাম। এটা শিখতে হয়। যেমন অ, আ, ক, খ, আলিফ, বা, তা, সা শিখতে হয়; দিলের বিভিন্ন অবস্থা এটাও শিখতে হয়; আর এইটাই আসল শিক্ষা। মনের অবস্থার বিরাট একটা পরিবর্তন।
ফাতাহ মক্কার পরে রসূল করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াহশী বিন হারব রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে দাওয়াত দিয়ে পাঠালেন।
উনি ছিলেন হামযা রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাতেল। হামযা রাদিয়াল্লাহু আনহু রসূল করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বড় মুহাব্বতের চাচা ছিলেন। ওহূদের সময় শহীদ হয়েছেন আর হত্যা করেছে ওয়াহশী বিন হারব; তখন মুসলমান ছিলেন না। পরে হয়েছেন রাদিয়াল্লাহু আনহ। এত প্রিয় চাচাকে যে হত্যা করেছে, তার ওপর কত রাগ থাকা উচিত- জাহান্নামে তো যাক, আর ও যেন ছোট খাটো জাহান্নামে না যায়, আরও ভাল করে বলতে- জাহান্নামের একেবারে নিচে ওকে ফেল। কিন্তু তা নয়। দাওয়াত একটা কাজের নাম নয়, দাওয়াত একটা মুহাব্বতের নাম।
যে রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচার কাতেল, আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতাহ মক্কার পরে অন্যান্যদের সাথে খাস এহতেমামের সাথে ওনার কাছেও দাওয়াত দিয়ে পাঠালেন।
ওনার কাছে যখন দাওয়াত নিয়ে গেলেন, উনি বললেন- তোমরা তো বল অর্থাৎ কুরআন শরীফের আয়াতের কথা বলছেন- “যে শিরক করল না, অন্যায় কতল করল না, আর যিনা করল না; আর যে এই ভাবে করে (ওসব গুনাহ), সে জাহান্নামে যাবে, অপদস্থ হবে, ওখানেই থাকবে। তারপর আজাবকে বাড়িয়ে দেওয়া হবে, লাঞ্ছিত হয়ে সে ওখানে থাকবে” ।
ওয়াহশী রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন যে- আমি তো এর সব করেছি। শিরকও করেছি, কতলও করেছি, যিনাও করেছি। আমি তো জাহান্নামেই যাব; আমার আর লাভ কি? উত্তর নিয়ে রসূল করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দূত ফিরে এলেন। এসে বললেন যে উনি তো এভাবে বলেন।
আয়াত নাযিল হল-
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
“কিন্তু যে তওবা করেছে, ঈমান এনেছে, নেক আমল করেছে; আল্লাহ তাআ’লা তার গুনাহ কে নেকী দ্বারা বদলে দিবেন, আর আল্লাহ তাআ’লা জবরদস্ত মাফ করনেওয়ালা” ।
এই উত্তর দিয়ে ওয়াহশী রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আবার পাঠালেন।
উনি শুনে বললেন- ঠিক আছে তওবা তো করতে পারব, ঈমানও আনতে পারব, কিন্তু আমি তো বুঝতে পারছি না যে নেক আমল করতে পারব কি না? আমার তো এতে হবে না, কারণ নেক আমলের একটা শর্ত আছে। দূত আবার ফিরে এলেন। এসে বললেন যে উনি তো এভাবে উত্তর দিচ্ছেন। ঈমান আনলেন না।
আবার আয়াত নাযিল হল-
إِنَّ اللّهَ لاَ يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلاَلاً بَعِيدًا
“আল্লাহ তাআ’লা শিরক তো মাফ করেন না; এছাড়া সব গুনাহ মাফ করেন, যাকে চান” ।
আবার ওনার কাছে দাওয়াত নিয়ে গেলেন। ওয়াহশী বিন হারব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন- আল্লাহ তাআ’লা যাকে চান মাফ করে দিবেন। কিন্তু আমার ব্যাপারে চাইবেন কি না আমি তো বুঝতে পারছি না। [মজমার হাসি] ঈমান আনলেন না। দূত আবার ফিরে এলেন।
আবার আয়াত নাযিল হল-
يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“আমার ঐসকল বান্দারা, যারা বেশি গুনাহ করেছে, তাদেরকে জানিয়ে দাও, তারা যেন আল্লাহর প্রতি নিরাশ না হয়; আল্লাহ তাআ’লা সব গুনাহকে মাফ করে দেন। আল্লাহ তাআ’লা বহুতই বেশি মাফ করনে ওয়ালা” ।
এই আয়াত নিয়ে যখন গেলেন, ওয়াহশী রাদিয়াল্লাহ আনহু হললেন- হ্যাঁ এইটা ঠিক আছে। ঈমান আনলেন।
এই যে বারবার রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূত পাঠাচ্ছেন আর উনি মানছেন না, আয়াত নাযিল হচ্ছে, আবার যাচ্ছেন। এই গোটা ব্যাপারের মধ্যে মনে হবে, আয়াত তো আল্লাহ তাআ’লা নাযিল করছেন আর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূত পাঠাচ্ছেন, ওয়াহশী রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিজের কোন ঠেকা নেই, আল্লাহ এবং আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে মহা ঠেকা।
এরকমই তো মনে হয়। উনি শর্ত লাগাচ্ছেন আর ইনারা শর্ত আদায় করছেন। যার ঠেকা থাকে সে না শর্ত আদায় করে। যার কোন ঠেকা নাই ও নতুন নতুন শর্ত লাগাবে। তো উনি এত ঠেকা মুক্ত হলেনই বা কেমন করে আর আল্লাহ এবং আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত ঠেকায় পড়লেনই বা কেমন করে?
উনি ঠেকামুক্ত তার নিজের জেহালতের কারণে। জাহেল তার সমস্যা বোঝে না, ও বেপরোয়া। যে ছেলে নেশা করে, ওর যদি জ্ঞান বুদ্ধি থাকত, ও এত বেপরোয়া নেশা করতে পারত? ও নিজের ভালমন্দ বুঝেই না। বাপের ঠেকা কেন? বাপের ঠেকা ওর মুহাব্বতের কারণে। মুহাব্বত যদি না থাকত, বাপও বেপরোয়া হত; যাক জাহান্নামে, আমার কি। কিন্তু মুহাব্বতের কারণে ছাড়তে পারেনা। যদিও বিভিন্ন সময়ে রাগ করে বলে- যা। কিন্তু পরে আবার কাছে টানে। আবার ওকে নিয়ে চিন্তা করে। আবার কাউকে ডেকে পরামর্শ করে, কি করা যায়?
দাওয়াত শুধু একটা কাজের নাম নয় যে দাওয়াত দিতে গেলাম; দাওয়াত হল মনের ভিতর ঐ অনুভূতি যে আমি ঠেকায় আছি। ঐ মাত্রার মুহাব্বত থাকবে যে ওর নাজাতের জন্য ওর চেয়ে আমার ঠেকা বেশি। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের পিছনে মেহেনত করেছেন, যাদের কাছে দাওয়াত পাঠিয়েছেন, যাদের জন্য দুয়া করেছেন, যাদের জন্য কেঁদেছেন ওরা নিজেরাও তো বেপরোয়া; ঘুরে বেড়াচ্ছে ঐ কাফেররা, পরবর্তী সময়ে সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহু হয়েছেন। ঐ ছেলে গুলো যেমন বেপরোয়া থাকে, মা-বাপের ঠেকা।
আমি আবার বলছি, দাওয়াত শুধু একটা কাজের নাম নয়, বরং দাওয়াতের প্রাণ হচ্ছে মুহাব্বত।
ইবাদতের প্রাণ যেমন ইখলাস; আল্লাহর মুহাব্বত।
আল্লাহর মুহাব্বত যত বেশি থাকবে, তো ঐ দুই রাকাত নামাযের কদর ততবেশি বাড়বে। ছোট একটা আমল, দেখতে ছোট; কিন্তু ইখলাসের কারনে ঐ দেখতে ছোট আমল অনেক বড় আমল হয়ে যায়। ঠিক ওরকম দাওয়াতের মধ্যে যত বেশি এই মুহাব্বত থাকবে, ততবেশি ঐ আমল বড় হবে।
একটা হচ্ছে তার জাহির, আরেকটা হল তার প্রাণ।
নামাযের জাহির যেমন কিয়াম, রুকু, সিজদাহ ইত্যাদি আর প্রাণ হল আল্লাহর মুহাব্বত। ঐটাই তার মধ্যে কবুলিয়্যাত পয়দা করে। আর ঐটা যদি না থাকে তো ওর মধ্যে কবুলিয়্যাতের সিফতের অভাব। দাওয়াতের প্রাণ হল তার প্রতি মুহাব্বত।
ঐ মুহাব্বত যত বেশি থাকবে, তার দাওয়াতের মধ্যে ততবেশি তাছির হবে। আর তা না হলে শুধু বাহ্যিক সুরত। গেলাম, তার সাথে দ্বীনের কথাবার্তা বললাম, দাওয়াত দিলাম, যদি কুরআন-হাদিস জানা থাকে ওগুলো দিয়ে দালায়েলও পেশ করলাম, না জানি তো এইভাবে সেইভাবে অন্য কথা বললাম, অনেক ভাল ভাল সুন্দর কথা বললাম- এই সব গুলো হল ঐ বাহ্যিক সুরত; কিন্তু এর প্রাণ হল তার প্রতি মুহাব্বত।
আল্লাহ তাআ’লা আম্বিয়া আলাইহিস সালাতু আসসালামকে যে ক্বওমের কাছে পাঠিয়েছেন, ঐ ক্বওমের মুহাব্বত ঐ নবীর দিলের মধ্যে দিয়ে পাঠিয়েছেন।
প্রত্যেক নবীইযে যে ক্বওমের কাছে প্রেরিত, প্রত্যেক নবীর দিলের মধ্যেই নিজ নিজ ক্বওমের প্রতি মুহাব্বত ছিল অত্যন্ত প্রবল। ক্বওমের খয়ের খাঁ হয়েই নবীরা এসেছেন। এর জন্য তারা অন্য কিচ্ছু চাইতেন না– لاَّ أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا “আমি তোমাদের কাছে কিচ্ছু চাই না”।
মানুষ যখন মুহাব্বতের কারণে কিছু একটা করে, কোন বিনিময় চায়না। ব্যাস আমি এটাই চাই যে তুমি হিদায়াত পেয়ে যাও, তুমি বেঁচে যাও। সব নবীদের এই কথাই ছিল যে আমি তোমাদের কাছে কিছুই চাই না। ক্বওম গালাগালি দিচ্ছে, যা করবার করছে, কিন্তু ওনারা নিজের কাজ করেই যাচ্ছেন; যেন ওরা নাযাত পেয়ে যায়।
দাওয়াতের এই কাজ যেই করবে; যত বেশি নিজের ভিতর সে ঐ মুহাব্বত তৈরি করতে পারবে, তত বেশি তার দ্বারা কাজ হবে। মুহাব্বত যত বেশি কম হবে; জাহিরি সুরত হবে, কিন্তু নিঃষ্প্রাণ হবে। সাহাবারা নিজেদের মধ্যে এই মুহাব্বত পয়দা করেছিলেন।
আর এইটাই রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শিখেছেন। আমরা যেরকম বলি সূরা ফাতিহা শেখা, সূরা ওয়াক্বিয়াহ শেখা- এগুলো তো কথা শেখা। আসল শেখা তো হল দিলের মধ্যে একটা অবস্থা বানানো। ঐটাই তো আসল শিক্ষা, যেটা শিখেছেন রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ছেলে ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। তায়েফের দিনে অর্থাৎ হুনাইনের পরে তায়েফের বনু সাক্বিফের সাথে যে যুদ্ধ ছিল; তাদের তীর এসে লাগল আর ঐ তীরে উনি যখম হলেন আর পরবর্তীতে ঐ যখমে তিনে ইন্তেকাল করলেন।
রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষের দিকের ঘটনা মোটামুটি। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু খলিফা হলেন, ইতিমধ্যে বনু সাক্বিফও মুসলমান হয়ে গেছেন।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু খলিফা হওয়ার পর বনু সাক্বিফের একটি দল তাঁর সাথে দেখা করবার জন্য এসেছেন।
যেই তীরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ছেলে মারা গিয়েছিল, সেই তীর ওনার কাছে ছিল আর তিনি জানেন যে ঐ তীর বনু সাক্বিফের। ঐটা বের করে এই দলকে দেখালেন আর জিজ্ঞেস করলেন- তোমাদের মধ্যে কি কেউ এই তীর কে চিনতে পারছ? যার তীর ছিল, যিনি ঐ তীর নিক্ষেপ করেছিলেন সাদ ইবনে ওবায়েদ ওনার নাম; উনি বললেন – হ্যাঁ, আমি এই তীরকে চিনতে পারছি। এই তীর আমি বানিয়েছি, এটাকে আমি ধার দিয়েছি, এর পেছনে আমি পালক লাগিয়েছি আর আমি নিক্ষেপ করেছি। তীর বানানো থেকে নিয়ে ওনার ছেলেকে হত্যা করা পর্যন্ত ঐ একই ব্যক্তি দায়ী।
আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু এই সম্পূর্ণ বর্ণনা শোনার পর বললেন- সব তারিফ ঐ আল্লাহর; যিনি তোমার হাতে আমার ছেলেকে সম্মান দান করেছেন আর আমার ছেলের হাতে তোমাকে লাঞ্চিত করেন নি।
যিনি তাঁর ছেলেকে হত্যা করেছেন, তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের কোন বন্দোবস্ত করছেন না, ক্বতলের কোন বন্দোবস্ত করছেন না, তার বিরুদ্ধে কোন বদদুয়াও করছেন না। বরং এ যে জাহান্নাম থেকে নাযাত পেয়ে গেল, এতে আনন্দিত হলেন।
সেদিন যদি উনার ছেলের হাতে ইনি কাফির অবস্থায় ক্বতল হতেন, তাহলে তো হামেশাই জাহান্নামে থাকতেন। তা না হয়ে ছেলে শহীদ হয়ে গেল আর ইনিও মুমিন হলেন; কত ভাল হল। আর এজন্য শুকুর আদায় করছেন। [আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহু আকবার ]
অথচ দাম কি দিতে হয়েছে? আমার ছেলে হত্যা হয়েছে। কিন্তু ঐ দামও উনার কাছে বড় দাম মনে হচ্ছে না; যেহেতু এই লোক নাজাত পেয়ে গেছে। আর তা না হলে আমার ছেলের হাতে যদি ও মারা যেত তো হামেশা জাহান্নামে থাকত। ঐ দুঃখ অনেক বেশি ছিল। এটাই ছিল দাওয়াতের ঐ প্রাণ যে একজন কাফের, একজন মুশরিক – ওর নাজাতের আনন্দ এতবেশি যে আমার ছেলের মৃত্যুও এর তুলনায় তুচ্ছ।
রসূল সঃ এর কাছ থেকে কি শিখেছেন? সূরা শিখলেন, আয়াত শিখলেন, হাদিস শিখলেন, ফেক্বাহর হুকুম শিখলেন। ওগুলো শিখেছেন ঠিক আছে, কিন্তু আসল কথা ছিল এই প্রাণ শিখেছেন। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছোহবতের বরকত যদি না থাকত, তাহলে আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রথম সুযোগেই উনাকে হত্যা করতেন- আমার ছেলের ক্বাতিল, তুমি এখান থেকে জিন্দা ফিরে যাচ্ছনা। পরিষ্কার কথা, তোমাকে আমি হত্যা করবোই। এটাই হবার কথা ছিল।
ওখান থেকে কোথায় এসেছেন? – প্রথম ধাপে এমন এক জায়গায় এসেছেন; ঠিক আছে মাফ করলাম, সবর করলাম। কিন্তু মনে কষ্ট। সবর করতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু ছেড়ে দিলেন। আর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মাফও করছেন না, সবরও করছেন না, (বরং) শুকুর করছেন। ওটাকে অতিক্রম করেছেন। ইনি যদি কাফের হয়ে যেতেন তাহলে জাহান্নামে যেতেন, এখন যদি মরেন তাহলে মুমিন হয়ে যাবেন।
এই যে একজন কাফের ঈমান আনল আর নাজাত পেল এইটার খুশি এত বেশি, এইটার শুকুর ওনার ছেলের হত্যার ব্যাথার চেয়ে অনেক বেশি। আর এইটা উনাকে সব কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। তাই সম্পূর্ণ ঘটনা শুকুরের আওতার মধ্যে পড়ে গেছে। সবরের অংশ হারিয়ে গেছে, চাপা পড়ে গেছে। শুকুরের অংশটাই বড়। আর শুকুর কেন? – একজন কাফের নাজাত পেয়ে গেল। আর সম্পূর্ণ ঘটনার মধ্যে দুটো ব্যাপারই সুন্দর লাগছে।
মানুষের কোন জিনিস কখন সুন্দর লাগে? আমি যদি কাউকে ভালবাসি, ও যা করে তাই সুন্দর লাগে। আর যদি তাকে ভাল না বাসি, ওর সবই খারাপ লাগে। তো মদু’ যে যাকে দাওয়াত দেওয়া হয়, ওর প্রতি মুহাব্বত এত গালেব; তার সবই ভাল লাগে। ঈমানদার হয়ে গেছে, নাজাত পেয়ে গেছে। আমার ছেলেকে হত্যা করেছে- এই ভাবে ঘটনাটাকে না দেখে বরং আমার ছেলে শহীদ হয়ে কতবড় মর্তবা পেয়েছে, এই ভাবে দেখছেন। একটা জিনিসকে তো কত ভাবে দেখা যায়। নির্ভর করে তার জজ্ববা কি বলে। যদি ভালবাসে তাহলে ভালভাবে দেখবে, যদি ভাল না লাগে খারাপ ভাবে দেখবে।
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে দ্বীন দিয়েছেন; দ্বীন আমাদের কাছে এটাি দাবি করে- আল্লাহর পথে বের হয়ে ঈমানী এমন একটা মেহেনত করব, যে মেহেনত আল্লাহর সাথে আমার এত মুহাব্বত কায়েম করে যে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার কাছে যেটা আসে আমার ঐটাই ভাল লাগবে। যার কাছে আমি প্রেরিত তার প্রতি আমার মুহাব্বত এত গালেব থাকবে যে সে যদি হিদায়াত পেয়ে যায়, এটার শুকুর এত প্রবল হবে যে এর মোকাবিলায় নিজের ছেলের মৃত্যুও তুচ্ছ হয়ে যাবে। এটা হচ্ছে দাওয়াত।
আমরা যে বলি আল্লাহর পথে বের হতে হবে, দাওয়াত দেওয়া শিখতে হবে; দাওয়াত দেওয়া শেখা মানে টেকনিক নয় যে খুসুসি গাস্ত কিভাবে করতে হয়, উসুলি গাস্ত কিভাবে করতে হয়, আলেমদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় আর ব্যবসায়ীদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়। এগুলো তো হল বাহ্যিক একটা সুরত, আসল তো হল তার প্রাণ। ঐ প্রাণ যদি থাকে কোন টেকনিকের দরকার নাই। সম্পর্ক যখন থাকবে কোন টেকনিক লাগবে না। সম্পর্ক যখন থাকে সব চলে। মুহাব্বত যখন থাকবে, বিনা টেকনিকে সব কাজ চলবে।
একজন সাহাবী, রাদিয়াল্লাহু আনহু হবেন। গ্রামের লোক ছিলেন, খুব সাদাসিধে। তাওয়াফ করছেন। আর তাওয়াফ করতে করতে আল্লাহকে বলছেন- ও আল্লাহ ভাল করে দেখে নাও যে তোমার ঘর তাওয়াফ করছি। পরে আবার বলে দিও না যে তোমার ঘর তাওয়াফ করিনি। [মজমার হাসি] কত ঘনিষ্ট সম্পর্ক, আল্লাহর সাথে কথা বলছে যেন আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহঃ একটি ঘটনা বলেছেন। মদিনায় একবার অনাবৃষ্টি ছিল। মসজিদ থেকে সবাই বের হয়েছে বৃষ্টির জন্য নামায পড়বে, দুয়া করবে। নামায পড়েছে, কিন্তু বৃষ্টি কিছু হয়নি। মসজিদের ভিতরে একজন অপরিচিত ব্যক্তি চুপচাপ ছিল। যখন বৃষ্টি-টৃষ্টি কিছু হলনা তখন সেই লোকটা হাত উঠাল। হাত উঠিয়ে দুআ করল। দুআর তো কিছু আদব-নিয়ম আছে। আল্লাহ তাআ’লার হামদ, রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ শরীফ, তারপর খুব বিনয়ের সাথে, নম্রতার সাথে কথা বলা। ওর এই দুআর মধ্যে এগুলো কোন আদবই নেই। না আল্লাহর হামদ, না দরূদ, না বিনয়ের কথা বলা; হাত তুলেই বলল যে- ইয়া আল্লাহ, এরকম তো কথা ছিলনা।
[মজমার হাসি] বৃষ্টি দাও। এখুনি, এখুনি, এখুনি। যেন একদম ধমক দিয়ে। সাথে সাথে বৃষ্টি আসল। খুব বৃষ্টি হল।
পেছনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহঃ মসজিদের ভিতরে ছিলেন। উনি এইসব ঘটনা দেখছেন, চুপচাপ। কিন্তু সেই লোক তো ইনাকে দেখেনি। সে ভেবেছে- আমি একা। তারপর সে ওখান থেকে বের হয়ে গেল, এক বাড়িতে ঢুকল।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহঃ, উনিও পেছন পেছন গেলেন। দুনিয়া উনার পেছনে হাঁটে আর উনি এর পেছনে হাঁটছেন। বাড়িতে ঢুকলেন। বাড়ির মালিক উনাকে দেখে মহা খুশি। এরকম একজন মেহমান এসেছেন; বড় সম্মান, বড় গৌরবের কথা। বাড়ির মালিক বললেন- আপনার কি খেদমত করতে পারি? উনি বললেন- আপনার গোলামদের মধ্য থেকে একজন গোলামকে কিনতে চাই। জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নাই; আন্দাজ করতে পেরেছেন, একজন গোলামই হবে।
বাড়ির মালিক বললেন যে- আমি হাদিয়া দিব। উনি বললেন- না, আমি কিনতে চাই। গোলামদের দেখান। তো বাড়িওয়ালার দৃষ্টিতে যেগুলো ভাল গোলাম ওদেরকে দেখালেন। তো সেই লোককে উনি পেলেন না। জিজ্ঞেস করলেন- আর নেই। উত্তরে বললেন – আরেকজন আছে, কিন্তু দেখাতে চাচ্ছি না। কেন? অসুস্থ, দূর্বল, কোন কাজের না। ওকে দিয়ে আপনার কোন লাভ হবে না, বোঝা হবে। বললেন- না, তাকেও দেখান। দেখলেন যে সেই লোক। উনি কিনলেন।
কিনে নিয়ে চলে আসছেন। হাঁটতে হাটঁতে সেই লোক উনাকে জিজ্ঞেস করল- আপনি আমাকে কেন কিনলেন? আমি তো অসুস্থ, দূর্বল, কোন কাজের না, আপনার ওপর বোঝা হব। উত্তরে বললেন- তোমাকে কোন কাজের জন্য আমি কিনছি না। তাহলে কি? মসজিদে যে ঘটনা দেখেছেন, সেটা বললেন। সাথে সাথে বুঝতে পারল, ইনি আমাকে দিয়ে কোন কাজ তো করাবেই না, মাথার ওপর বসিয়ে রাখবে। এটা উনার পছন্দ না। আবার হাত ওঠালেন। আর হাত উঠিয়ে আবার ওই একই ভাবে বললেন-ইয়া আল্লাহ, এরকম তো কথা ছিলনা। আমাকে নিয়ে নাও। এখুনি, এখুনি, এখুনি। আর ওখানেই পড়ে মরে গেল।
যে প্রসঙ্গে কথাটা এনেছিলাম- দুয়ার আদব, নিয়ম কিছু আছে; কিছু লাগে না যদি সম্পর্ক থাকে গভীর। কিন্তু সম্পর্ক যদি না থাকে, আদাবে বেশি ধরেও না। আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু দাওয়াতের আদবও জানেন, কিন্তু আসল প্রাণ হচ্ছে মদু’র জন্য মুহাব্বত। মুহাব্বত এত গালিব যে এর জন্য এমন কোন মূল্য নাই যা দিতে প্রস্তুত নয়।
আমাদের মধ্যে যেমন, ছেলের চিকিতসার জন্য সারা জীবনের সঞ্চয়, তাও দিয়ে দেবে। অন্য কিছুর জন্য এটা কল্পনাও করতে পারত না। সারা জীবন খাটতে খাটতে একটা বাড়ি বানিয়েছি, সেই বাড়ি বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসায়। ছেলের চিকিৎসার জন্য এমন কোন জিনিস নেই যে সে করতে রাজি নয়।
তাঁদের দ্বীল ছিল এরকম যে দাওয়াতের জন্য, একজন মানুষের হেদায়াতের জন্য এমন কিছু নাই যে দিতে রাজি নয়। যদি নিজের ছেলেকে দিতে হয় তাও সন্তুস্ট। আর শুকুর আদায় করছেনও। আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে দাওয়াতের যে কাজ দিয়েছেন; দাওয়াত শেখা মানে ঐ আদব ইত্যাদি শেখার নাম নয়। বরং আসল শেখা হল, ভিতরে সেই মুহাব্বত পয়দা করা।
যেরকম নামায শেখার মানে কিয়াম আর রুকুর মাসায়েল শেখা নয়, নামায শেখার মানে হল নিজের ঈমান কে ঐ মাত্রায় মজবুত করা যেন আল্লাহকে চোখের সামনে সে দেখতে পায়। ইবাদতের প্রাণ হচ্ছে ইখলাস, এহসান, আল্লাহকে সামনে দেখতে পারা আর দাওয়াতের প্রাণ হচ্ছে যাকে আমি দাওয়াত দিচ্ছি তার মুহাব্বত গালেব হওয়া যেন দ্বীল ঐটার জন্য চলে যায়।
ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু শাম দেশের দিকে সফরে গেছেন। খ্রিস্টানদের দেশ ছিল। জঙ্গলের মধ্যে নির্জন জায়গায় এক খ্রিস্টান পাদ্রী থাকে, খুব ইবাদত করে। খবর পেল খলিফা এসেছে; সে বেচারা দেখা করতে এল।
ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন তার দিকে তাকালেন; দেখেই বুঝতে পারলেন যে খুব কষ্ট করে, সাধনা করে। সাধনা করা, কম খাওয়া, কম ঘুমানোর কারণে তার চেহারার মধ্যে ছাপ ফুটে উঠেছে। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার চেহারার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে লাগলেন। উনার সঙ্গীরা বলল যে ও তো খ্রিস্টান। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন – আমি কেমন করে কাঁদব না- “আমল করে, কষ্ট করে, জাহান্নামে যাবে।”
ঐ যে কান্না; একজন মানুষের ক্ষতি দেখে, দুর্ভাগ্য দেখে চোখে পানি আসছে, আর ঐ পানিকে সামলাতেও পারছেন না – এটাই হল দাওয়াত; দাওয়াতের প্রাণ। আজ আমরা দাওয়াত তো দেই আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর মেহেরবানি; কিন্তু নিঃষ্প্রাণ। কাউকে দাওয়াত দিলাম, ওর পিছে ঘুরাঘুরি করলাম, কিন্তু গেল তো নাই বরং শুনি আমার বিরুদ্ধে অপরের কাছে বদনাম করে।
তখন আরও রেগে যাই। আর বলি যে ওর তো জাহান্নামেই যাওয়া উচিত। ঐটাই ওর উপযুক্ত স্থান। গাস্ত করেছি ঠিকই- কিন্তু ভালবাসা নেই, মুহাব্বত নেই। প্রাণ নেই। একটা নিঃষ্প্রাণ জিনিস পঁচে তো দূর্গন্ধ বের হয়। আর প্রাণ যেটার আছে ওটা চলে।
আল্লাহ তাআ’লা বহুত মেহেরবানি করে আমাদেরকে দাওয়াতের মেহেনত দিয়েছেন; বাইরের ছুরত আসছে, এটাকেই যথেষ্ট মনে না করা।
এর ভেতর প্রাণ যেন আসে এজন্য চেষ্টা, দুয়া করা। আরম্ভ তো হবে বাহ্যিক ছুরত দিয়েই। রসূল কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “ওরকম নামায পড় যেরকম আমাকে নামায পড়তে দেখ।” কথাটা বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হবে অনেক পেঁচানো।
সোজাসুজি বললেই হত যে – আমার মত নামায পড়। কিন্তু তা না বলে অনেক ঘুরিয়ে বললেন। এই ঘুরানোর মধ্যে বড় হেকমত আর উম্মতের প্রতি বড়ই সোহলত।
দেখা যায় শুধু বাহ্যিকটাই; তার সিফত কিছুই দেখা যায় না। আর যদি বলতেন- আমি যেরকম নামায পড়ি ওরকম নামায পড়; তাহলে ঐ সব সিফতসহই হতে হবে। তার প্রাণ, তার হাক্বিকত, তার ধ্যান, তার এহসান সবই হতে হবে। ওটা কেউ পারবেই না। বড় সহজ করে দিয়েছেন; যেটা তুমি বাইরে থেকে দেখতে পাও ঐটা করে নাও; আর এইটুকু যদি কেউ করতে থাকে, আগ্রহী হয়ে, সচেষ্ট হয়ে – ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে আল্লাহ তাআ’লা তার ভিতর প্রাণ ঢালবেন। [সুবহানাল্লাহ]
আগে বাহ্যিক খোলস বানানো হয়, তারপর প্রাণ ঢালা হয়। মায়ের পেটে বাচ্চার একটা সেকেল পয়দা হয়, তারপর প্রাণ ঢালা হয়। নামাযের একটা সেকেল পয়দা হবে, তারপর প্রাণ ঢালবেন।
আমরা দাওয়াতের যে কাজ করছি; ঐ জাতীয় নামাযের মত – “ওরকম নামায পড় যেরকম আমাকে নামায পড়তে দেখ।” যেটুকু দেখা যায় ঐটুকু করি।
কিন্তু ঐটুকু যদি মনে প্রাণে করি, চেষ্টা করি, দুয়া করি; ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাতে প্রাণ ঢালবেন। কিন্তু ঐটার জন্য আমাকে আগ্রহী হওয়া দরকার। আমি যদি মনে করি ওএটাই যথেষ্ট; পাঁচ কাজ করছি, চিল্লা দিচ্ছি, তিন চিল্লা দিচ্ছি; তাহলে আমি তালিব না; আর যে তালিব না তাকে দেওয়াও হয় না।
বাহ্যিক ভাবে আমি যতটুকু করতে পারলাম তাকে যথেষ্ট মনে না করে যদি চাই যে আল্লাহ তাআ’লা এর ওপর হাক্বিকত ঢালেন; ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তআ’লা দেবেন। যেরকম নামায পড়ে যদি আমি তাকে যথেষ্ট মনে করি, তবে তো আমি ওখানেই রয়ে গেলেম। আর যদি চাই যে, আল্লাহ তুমি আমার এই নামাযকে হাক্বিকি নামায বানিয়ে দাও, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআ’লা সেটাও দেবেন। ঠিক ওরকম ইবাদতও যেটা করতে পারছি করি, এর ওপর সন্তুষ্ট না হয়ে আল্লাহর কাছে তার হাক্বিকত চাই। তদ্রুপ দাওয়াতও যতটুকু দিতে পারছি, এর ওপর সন্তুষ্ট না হয়ে আল্লাহর কাছে চাই যে আল্লাহ তুমি এতে হাক্বিকত দান কর।
ঠিক আছে না ভাই ইনশাআল্লাহ। এর ওপর দুয়া করতে থাকি, চলতে থাকি- ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআ’লা মেহেরবানি করে তার মধ্যে হাক্বিকতও দেবেন, প্রাণও দেবেন। [ইনশাআল্লাহ]।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা: পরিপূর্ণ বান্দা হওয়ার পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: বারিধারা ডি.ও.এইচ.এস. সময়: মাগরিবের পর :১০/০৬/২০০৬ তারিখ أعُوْذ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
১২৭৪
ত্যাগের বিনিময়ে সম্পর্ক: উম্মতের মহব্বতের বুনিয়াদ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: গাউসনগর জামে মসজিদ, ইস্কাটন রোড, ঢাকা তারিখ: ৯ জুন ২০০৬,বেলা:৩.৩...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
১২০৮
অনলাইন দাওয়াহ
অনলাইনে দাওয়াহর মূল উদ্দেশ্য কী? মূল টার্গেট অডিয়েন্স কারা? লেখালেখিসহ অন্যান্য কন্টেন্টের কোন উদ্...
আসিফ আদনান
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১৪৪৬৩
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১১১০২