নফি ও ইসবাত: দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি
নফি ও ইসবাত: দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত]
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، فَاعۡلَمۡ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا اللّٰہُ. وَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلى الله علَيْهِ وَسَلَّمَ، يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قُوْلُوْا لَا إِله إِلَّا الله، تُفْلِحُوْا. أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ.
দ্বীনের বিভিন্ন আলোচনার মধ্যে বিভিন্ন পরিবেশে যেসব কথা আসে, সেসব কথার মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুল উচ্চারিত একটি কথা হলো 'নফি' বা 'অস্বীকার করা' বা 'না' বলা। 'ইসবাত' মানে 'প্রতিষ্ঠিত করা' বা 'হ্যাঁ' বলা। কালিমার মধ্যেও নফি-ইসবাত আছে।
**لَا إِلَهَ** - নফি: 'কোনো মাবুদ নেই, কোনো উপাস্য নেই।'
**إِلَّا اللهُ** - ইসবাত: 'আল্লাহ ব্যতীত।'
'লা ইলাহা' নফির অংশ, 'ইল্লাল্লাহ' ইসবাতের অংশ। আমাদের বাস্তব জীবনে এমনি সব ইসবাতগুলোর সাথে নফি জড়িত আছে। আমি যদি বলি, 'দাঁড়িয়ে আছি,' এর অর্থ আমি বসে নেই। অর্থাৎ, এর মধ্যে একটি নফি সংযুক্ত আছে। যদিও 'বসে নেই' এ কথা আমি বলিনি। বলেছি, দাঁড়িয়ে আছি, এ কথার মধ্যেই 'বসে নেই' টি সুপ্ত আছে।
কখনো কখনো এই নফি বাক্যের মধ্যে বিশেষ জোর দেওয়ার জন্যও উচ্চারণ করা হয়। তখন বলবে, 'আমি বসে নেই, আমি দাঁড়িয়েই আছি।' শুধু 'দাঁড়িয়ে আছি' বললেও সে অর্থ ছিল যে, আমি বসে নেই। কিন্তু 'আমি বসে নেই, দাঁড়িয়ে আছি' - এটি জোর দেওয়ার জন্য বলা হলো।
দ্বীনের ময়দানে কথার মধ্যে, ঈমানের মধ্যে নফি এবং ইসবাত - এ দুটোর ওপর খুব জোর দেওয়া হয়। কারণ দ্বীনের প্রায় সব অংশে অথবা বিশাল একটি অংশে, বিশেষ করে ঈমানিয়্যাতে কোনো না কোনোভাবে নফি-ইসবাত জড়িত।
ওই নফি-ইসবাতের একটি বিশেষ অংশ, যা এই তাবলিগের কাজের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত যে, **আল্লাহর সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা বা শরিয়তের কথামতো চলা বা শরিয়ত মানা - এটি হলো ইসবাত, আল্লাহর হুকুম মানা। আর এর সাথে জড়িত অন্তরালে যা আছে, সেটি হলো অন্য কারও কথা না মানা।** আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করার সাথে নফির যে অংশ জড়িত আছে, সেটি হলো অন্য কারও সাথে সম্পর্ক না করা বা সম্পর্ক না রাখা।
সাহাবাদের জীবনে নফির বাস্তব নমুনা
সাহাবাদের জীবনে ওই নফি অংশের ওপর আলাদাভাবে জোর দেওয়া হতো না। পরিবেশ সেটি করে নিতো।
মুসআব বিন উমায়ের (রা.) খুব আদরে-আহ্লাদে লালিত-পালিত হয়েছেন। যখন ঈমান আনলেন, আল্লাহওয়ালাদের সাথে সম্পর্ক করলেন, তো মা-বাবা তার ওপর খুব রেগে গেলেন। আর এই মাত্রায় রেগে গেলেন যে, তার বেঁচে থাকার ওপর আশঙ্কা সৃষ্টি হলো যে, তাকে মেরেই না ফেলে। দুনিয়ার সব জায়গাতেই মা-বাবা তো কোনো না কোনো কারণে রেগেই থাকে, কিন্তু এই মাত্রার রেগে যাওয়া যে, ছেলে আশঙ্কা করছে তাকে মেরেই না ফেলে - এটি তো বড়ই ব্যতিক্রমী জিনিস। সুতরাং তিনি হিজরত করে মদিনায় চলে গেলেন।
আবদুল্লাহ যুল-বিজাদাইন (রা.)-এর ঘটনা
আবদুল্লাহ যুল-বিজাদাইন (রা.) ধারণা করলেন, তার চাচা হয়তো মুসলমান হয়ে যাবেন। এ ঘটনা ইসলাম আত্মপ্রকাশের প্রথম দিকের ঘটনা। চাচার সাথে সাথে তিনি নিজেও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। যেহেতু তার অভিভাবক তার চাচা ছিলেন, তার পিতার ইন্তেকালের পর চাচার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হচ্ছিলেন। তার চাচাও তাকে খুব আদর করতেন। আর তৎকালীন আরব সমাজে চাচা-দাদারা খুব দায়িত্ব পালন করতেন।
তো চাচা আবদুল্লাহকে খুব আদর করতেন। আবদুল্লাহ (রা.) লক্ষ্য করলেন, চাচা দ্বীনের দিকে আকৃষ্ট হয়েছেন। হয়তো অচিরেই মুসলমান হয়ে যাবেন। তাই তিনিও সিদ্ধান্ত নিলেন, আমার মুসলমান হওয়ার জন্য তাড়াহুড়ার কী দরকার। চাচা মুসলমান হলে আমিও মুসলমান হয়ে যাবো। অতএব, তিনি চাচার মুসলমান হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
ওদিকে চাচারও এই একই অবস্থা... মনে হচ্ছে, এখনই মুসলমান হয়ে যাচ্ছেন, এখনই হবেন... এমন করে করে আর মুসলমান হলেন না।
আরব দেশে গল্প আছে, উটের ঠোঁট ঝুলে থাকে। তো শিয়াল যখন দেখল, উটের ঠোঁট ঝুলে আছে। এখন শিয়াল ভাবল, হয়তো আর বেশিক্ষণ নেই, এখনই বুঝি পড়ে যাবে। আর পড়লেই আমি খাবো। তো এ কারণে শিয়াল উটের পিছন পিছন হাঁটা শুরু করল। যদিও উটের ঠোঁট ঝুলছে আর বাতাসে দুলছে। আর প্রত্যেকবারই মনে হচ্ছে, এখনই বুঝি ঝড়ে পড়বে, কিন্তু তা আর পড়ে না।
তো তার চাচারও এই একই অবস্থা, মনে হচ্ছে এখনই বুঝি ঈমান আনবেন, কিন্তু ঈমান আর আনেন না। এমনকি রাসূল কারিম (সা.) হিজরত করে মদিনায় চলে গেলেন। অথচ তার চাচার সেই একই অবস্থা, ওই দুলছেন আর দুলছেন।
মদিনাতে রাসূল (সা.)-এর হিজরতের প্রায় আট বছর অতিবাহিত হয়ে গেল সম্ভবত। তখন আবদুল্লাহ যুল-বিজাদাইন (রা.)-এর আশঙ্কা হলো যে, হুজুর (সা.) হয়তো দুনিয়া থেকে চলেই যাবেন অথচ আমার ঈমান আনা আর হবে না। আর ওই সময় এটাও জানা ছিল না যে, রাসূল (সা.)-এর ওফাত হয়ে গেলে হয়তো আমি আর ঈমান আনতেই পারব না। কারণ হয়তো রাসূল (সা.)-এর ইন্তিকালের কারণে ঈমান আনার পথ বন্ধই হয়ে যাবে।
এসব বিষয় চিন্তা করে আবদুল্লাহ (রা.) ঈমান আনার সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আমি মুসলমান হয়ে যাবো।
মুসলমান হয়ে চাচার সামনে উপস্থিত হয়ে বললেন, আমি তো মুসলমান হয়ে গিয়েছি। এ কথা শোনামাত্র তার চাচা - যার সম্পর্কে ধারণা ছিল, হয়তো এখনই মুসলমান হয়ে যাবেন - এতই রেগে গেলেন যে, তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। তাকে যে সহায়-সম্পত্তি দিয়েছিলেন, সেগুলোও ছিনিয়ে নিলেন। এমনকি তার গায়ে চাচার দেওয়া যে কাপড়খানা ছিল, সেটিও খুলে নিলেন আর উলঙ্গ করে ঘর থেকে বের করে দিলেন।
আবদুল্লাহ (রা.) এই অবস্থায় তার মায়ের কাছে গেলেন। মা তার গায়ের চাদর খুলে দিলেন। তিনি সে চাদর দু'টুকরো করে একটি অংশ লুঙ্গির মতো করে নিচে পরলেন আর আরেকটি অংশ গায়ে জড়িয়ে নিলেন। 'যুল-বিজাদাইন' মানে দু'টুকরো ওয়ালা, অর্থাৎ একটি চাদরকে দু'টুকরো করে একটি গায়ে চাদর হিসেবে আর আরেকটি লুঙ্গি হিসেবে পরিধান করেছেন বলে এ উপাধি দেওয়া হয়েছে।
অতঃপর এ অবস্থায় রাসূল কারিম (সা.)-এর নিকট এসে উপস্থিত হলেন। রাসূল (সা.) তাকে দেখে খুব খুশি হলেন। তিনি খুব আমলওয়ালা, আল্লাহর যাকের বান্দা ছিলেন। তাবুক যুদ্ধের সফরে তিনি শাহাদত বরণ করেন।
সম্পর্ক বিচ্ছিন্নতার বাস্তবতা
যে কথা বলছিলাম, নফির উচ্চারণ দরকার ছিল না যে, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করলাম তার মানে অন্যের সাথে সম্পর্ক করছি না। যে চাচা উলঙ্গ করে বাড়ি থেকে বের করে দেন, তার সাথে সম্পর্ক আর কী-বা বাকি থাকল। আর যে পিতা এমনভাবে আক্রমণ করল যে, ছেলে আশঙ্কা করছে তাকে মেরেই না ফেলে। তো সেই পিতার সাথে ছেলের আর কী-বা সম্পর্ক থাকল। আর হয়েছেও তাই।
বদরের যুদ্ধে এই মুসআব বিন উমায়ের (রা.)-এর ভাই কাফেরদের পক্ষ থেকে লড়ছিল আর উমায়ের (রা.) মুসলমানদের পক্ষ থেকে লড়ছিলেন। তো তার আনসারী ভাই, অর্থাৎ দ্বীনী ভাইয়ের - প্রত্যেক মুহাজিরের সাথে আনসারীদেরকে ভাই ভাই করে দেওয়া হয়েছিল - হাতে মুসআব (রা.)-এর আপন ভাই বন্দি হলেন।
মুসআব (রা.) দূর থেকে এই বিষয়টি লক্ষ্য করে তার আনসারী ভাইকে ডেকে বললেন, "হে ভাই! ওকে ভালো করে বাঁধো। কারণ, ওর মা খুব ধনী।" এর অর্থ হলো, ভালো মুক্তিপণ পাওয়া যাবে। কারণ, তার মা খুব ধনী।
এ কথাগুলো যে খুব কষ্টের সাথে ভারাক্রান্ত মনে বলছিলেন, তা নয়। যুদ্ধের ময়দানে খুব স্বতঃস্ফূর্ত ভাষায় বলছিলেন। তিনি যে মনের ভেতরের ওই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে গিয়েছেন যে, নিজের ভাইকে 'ওকে' সম্বোধন করছেন, নিজের মাকে 'ওর মা' সম্বোধন করছেন, আর আনসারী ভাইকে 'ভাই' সম্বোধন করছেন - এগুলোর কোনো খেয়ালই নেই। অর্থাৎ, ওই নফি হয়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি এ অবস্থা সৃষ্টি করে দিয়েছে। মুসলমান হওয়ার সাথে সাথেই পূর্বের সব সম্পর্ক চলে গেল, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। শত্রুতাও সৃষ্টি হয়ে গেল। সুতরাং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক হওয়ার সাথে সাথে অন্যের সাথে সম্পর্ক থাকল না। আর ধীরে ধীরে এ সম্পর্ক মজবুত থেকে মজবুততর হতে লাগল।
বর্তমান যুগে নফির প্রয়োগ
একজন মুসলমান, সে আগেও মুসলমান ছিল। তার পিতাও নামাজ পড়ে, তার মা-ও নামাজ পড়ে - এটি নতুন কোনো কিছু নয়। তবে কখনো কখনো সে তাবলিগ ইত্যাদিতে গেলে পরিবারে একটু হইচই হয়। এই হইচই হওয়াটা তো নফির অংশ। অর্থাৎ, দ্বীনে প্রবেশের কারণে এর অপর পিঠ তথা বেদ্বীনদারি থেকে মুক্ত হতে থাকে। এটি আল্লাহ তায়ালাই করে দেন। আর তার ঈমানের মজবুতিও হতে থাকে। তার ঈমানের মাত্রানুযায়ী আল্লাহ তায়ালা তাকে দ্বীনকে বোঝার তাওফিক নসিব করেন।
এই দ্বীনের পথে বের হওয়ার পদ্ধতিতে যে অতিক্রম করে, তার সুন্দর-সহজ রুহানি তরক্কি হয়। এর বিপরীতে যে এর ভেতর দিয়ে যায়নি বরং সহজেই চলে গিয়েছে, সে সেই সমান জিনিস পায় না।
একটি বাস্তব উদাহরণ
অনেক দিন আগের ঘটনা। একটি জামাতের সাথে যাচ্ছিলাম। ঢাকা ইউনিভার্সিটির একটি ছেলে পাশ করে জামাতে শরিক হয়েছে। সে তাবলীগের অনেক পুরোনো সাথী। প্রায় অনেক আগ থেকেই সময় লাগাচ্ছে। তো যেহেতু একই সফরে ছিলাম, তো সে তাবলীগ সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন করছিল। যদিও সে অনেক পুরোনো সাথী, কিন্তু সে তাবলীগ সম্পর্কে বিভিন্নধরনের প্রশ্ন করছিল। আমিও তার উত্তর দিয়েছি।
তো তার সাথে কথা বলতে গিয়ে আমার মাথায় একটি জিনিস বারবার ঘুরাফিরা করছিল যে, এই ছেলে তাবলিগে অনেক সময় দেওয়া। বহুত চিল্লা দিয়েছে, বহুত পুরোনো। কিন্তু কথাবার্তা বলছে একেবারে কাঁচা ছেলের মতো। আর আমি যদিও তার কথা শুনছি, উত্তর দিচ্ছি। কিন্তু আমার মনে মনে প্রশ্ন জাগছে যে, এই পুরোনো ছেলে এত কাঁচা কেন? এ সম্পর্কে আমি তাকে আর কিছু বলিনি। তবে আস্তে আস্তে আমি তার পরিচয়, তার পারিবারিক পরিচয় ইত্যাদি সব জেনে নিলাম।
তারপর আমি এর উত্তর পেয়ে গেলাম যে, তারা তাবলিগি পরিবার। এজন্য তাবলিগে যেতে হলে ওর কিছুই করতে হয় না। তার বাবা টাকা-পয়সা সব দিয়ে দেয়। ও শুধু ফ্রি ফ্রি তাবলিগে যায়। ফ্রি এ অর্থে যে, ওর তাবলিগে বের হতে কিছু করতে হয় না। তো স্বাভাবিক যে নফির অংশ আছে, তার জীবনে সে তার মুখোমুখি হয় না। আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম।
সুতরাং সাহাবায়ে কেরাম এত দ্রুত এত তরক্কি করতেন! একদিকে তো আল্লাহর রাসূল আছেন, এই প্রধান শক্তি তো আছেই। অন্যদিকে তাদের নফি তাদেরকে দ্রুত আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে দিত। সাহাবাদের ক্ষেত্রে এ জাতীয় আল্লাহর ইন্তেজাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যেত।
কুরআন-হাদিসে নফির আদেশ
আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন সময় এর আদেশও দিয়েছেন।
ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনা
আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম (আ.)-কে তার স্ত্রী হাজেরা (আ.)-কে আরবে রেখে আসতে বললেন। ইবরাহিম (আ.) রেখেও আসলেন। ইবরাহিম (আ.) কিন্তু হাজেরা (আ.)-কে এই সম্পূর্ণ ঘটনার কিছুই বোঝাননি। সাথে নিয়ে রওনা দিলেন, কিন্তু বললেন না যে, কোথায় রেখে আসবে। আবার মরুভূমিতে রেখে ফিরে চলে আসলেন। তখনও বলছেন না যে, কী করবে।
হাজেরা (আ.) তাকে বারবার জিজ্ঞাসা করছেন, আপনি কেন এমন করছেন? কোথায় যাচ্ছেন? আমাদেরকে কেন রেখে যাচ্ছেন?
ইবরাহিম আ. এর কোনো উত্তরও দিলেন না। চুপ থাকলেন। অবশেষে হাজেরা আ. জিজ্ঞেস করলেন, এটি কি আল্লাহর হুকুম? ইবরাহিম আ. উত্তর না দিয়ে শুধু ইঙ্গিতে বললেন, হ্যাঁ। এটুকুই। নিশ্চয়ই এ কথা না বলার মধ্যে গুরুত্ব আছে। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, এ গুরুত্বটি বোঝা কোনো কঠিন কাজ নয়।
যদি ইবরাহিম আ. আগে থেকেই সম্পূর্ণ কথাটি বুঝাতেন, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মানিয়ে ওখান থেকে ফিরে আসতেন, চোখের পানি ফেলে কান্নাকাটি করে বলতেন যে, "তোমারও মন খারাপ, আমারও মন খারাপ। আসলে আমি তো এগুলো করছি না, আল্লাহ তাআলা আদেশ দিয়েছেন বলেই করছি। সেজন্য তুমি এরকম মনে করো না যে, আমি তোমাকে ভালোবাসি না। আল্লাহ তাআলা করতে বলেছেন বলেই করতে হচ্ছে"—এরকম বিস্তারিতভাবে যদি বুঝাতেন, তাহলে মনের সম্পর্ক রয়ে যেত। যদিও মরুভূমিতে ফেলে আসতেন, তবুও মনের সম্পর্ক রক্ষা হয়ে যেত।
কিন্তু ফেলে চলে এলেন আর কিছু বললেনও না—এতে মনের সম্পর্ক থাকে না। আর সম্পূর্ণ ব্যাপার এটিই যে, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে আর অন্যের সাথে সম্পর্ক রাখবে না। অর্থাৎ, অন্যের সাথে সম্পর্ককে না—এটি নফি, আর আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে হ্যাঁ—এটি ইসবাত।
এসবগুলোর মধ্যে একটি হলো ওয়াসল (وصل), আরেকটি হলো কাতআ (قطع)। আমরা যে নামাজ পড়ি, এই নামাজের শাব্দিক অর্থ, সংযোগ বা যোগ স্থাপন করা বা এই জাতীয় অর্থ। এর বিপরীত অর্থ হচ্ছে কাতআ বা ইনকাতআ (বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া)।
ইবরাহিম আ.-কে আল্লাহ তাআলা তাঁর সাথে সংযোগ স্থাপন করার জন্য অন্য জিনিস থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাচ্ছেন। সম্পদ থেকে, সম্পর্ক থেকে। এজন্য হাজেরা আ.-কে সবকিছু বললেন না। যখন তিনি জানতে চাচ্ছেন যে, এগুলো সব আল্লাহর হুকুমে কি না, তখন এর উত্তর মুখে না বলে শুধু ইঙ্গিতে বললেন। কারণ, কথা বলার ইজাজত আল্লাহ তাআলা দেননি।
লুত আ.-এর ঘটনা
লুত আ.-কে আল্লাহ তাআলা হুকুম দিলেন দেশ ত্যাগ করার জন্য। আর দেশ ত্যাগ করার সময় পেছন ফিরে তাকাতেও নিষেধ করলেন। শুধু ত্যাগ করে চলে যাওয়া নয়, বরং সম্প্রদায়ের দিকে তাকাবেও না। কারণ, এই তাকানোটিও একটি সম্পর্ক।
যেমন আমরা বলি যে, 'চলে যাওয়ার সময় সে বহুদূরে দৃষ্টির আড়াল হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে ছিল।' তো এই তাকানোটিও একটি সম্পর্ক। ইবরাহিম আ. যে চলে যাচ্ছেন, মনের যে একটি সম্পর্ক ছিল, এটিও প্রকাশ করার অনুমতি নেই। কারণ, শুধু নামকাওয়াস্তে আমল করাই নয়, বরং সে আমলটিও সিফাতের সাথে করা।
ঈমানি আমল ঈমানি সিফাতের সাথে
হযরত মাওলানা ইনআমুল হাসান সাহেব খুব বেশি বলতেন, "ঈমানি আমল ঈমানি সিফাতের সাথে।"
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
اَمَّنۡ ہُوَ قَانِتٌ اٰنَآءَ الَّیۡلِ سَاجِدًا وَّقَآئِمًا یَّحۡذَرُ الۡاٰخِرَۃَ وَیَرۡجُوۡا رَحۡمَۃَ رَبِّہٖ ؕ قُلۡ ہَلۡ یَسۡتَوِی الَّذِیۡنَ یَعۡلَمُوۡنَ وَالَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ
তবে কি (এরূপ ব্যক্তি সেই ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে,) যে রাতের মুহূর্তগুলোতে ইবাদত করে, কখনও সিজদাবস্থায়, কখনও দাঁড়িয়ে, যে আখেরাতকে ভয় করে এবং নিজ প্রতিপালকের রহমতের আশা করে? বল, যারা জানে আর যারা জানে না উভয়ে কি সমান?
কিয়াম, সিজদা—এগুলো হলো আমল। আর আখেরাতের ভয়, আর আশা—এগুলো হচ্ছে আমলের সিফাত, আল্লাহর ভয় ও আশা। সুতরাং আল্লাহ তাআলা আমলের সাথে এর সিফাতও বর্ণনা করছেন যে, এগুলো হচ্ছে এই আমলের সিফাত। এই সিফাতের সাথে এই আমল করা। আল্লাহর ভয়ে, আল্লাহর রহমতে।
মানুষ কিয়াম করল, রুকু করল, সিজদা করল কিন্তু আখেরাতের ভয় নেই, আল্লাহর আশা নেই—তাহলে আমল তো হয়ে গেল; কিন্তু আমলের সাথে যে সিফাত আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন, সেই সিফাত থেকে সে বঞ্চিত হলো। আর আসল বিষয় হলো, এই সিফাতই।
যেমন কেউ যখন আম কেনে, তো সে ওই ওজনের জন্য বা তার আঁটির জন্য তো আম কেনে না; বরং আম কেনে তার স্বাদের জন্য। কিন্তু স্বাদ এমন একটি জিনিস যে, আম ছাড়া ফাঁকা ওই আঁটিতে সে স্বাদটি পাওয়াই মুশকিল। সেজন্য বাধ্য হয়ে সেই আমটি খেতে হয়।
যদি কোনো সুযোগ থাকত, তবে অন্তত ধনী লোকেরা বিনা আমে শুধু স্বাদ খেত। কারণ, আম খেয়ে পেট ভরে যায়, বেশিক্ষণ খাওয়া যায় না। কিন্তু আহ! যদি কেউ বিনা আমে স্বাদ খেতে পারত! জান্নাতে তো এমনই খাবে। সেজন্য পেট ভরবে না। তখন যত ইচ্ছা খেতে পারবে। কিন্তু দুনিয়াতে বাধ্য হয়েই খেতে হয়।
আমলের মূল উদ্দেশ্য
আমল তো সিফাতের বাহন। এর আসল লক্ষ্য হচ্ছে সিফাত। আল্লাহ তাআলা সিফাতেরই ধর্তব্য করবেন। রাসূল সা.-ও ওই সিফাতের দিকে বেশি নজর করতেন। যেমন রাসূল সা. দোয়া করতেন:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ سَرِيرَتي خَيْرًا مِّنْ عَلَانِيَّتِي، وَاجْعَلْ عَلَانِيَّتِي صَالِحًا
হে আল্লাহ! আমার অভ্যন্তরকে আমার প্রকাশ্য থেকে বেশি ভালো কর। আর আমার প্রকাশ্যকেও ভালো করে দাও।'
তিনি অভ্যন্তরকে বেশি ভালো করতে চেয়েছেন। ওটাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আর অভ্যন্তর এটি সিফাতের অংশ, আমল নয়। আমল তো বাহ্যিক অংশই করে। মনের ভেতরে সে আমলের সিফাত থাকে।
বাহ্যিক আমল হলো হাজেরা আ.-কে মরুভূমিতে রেখে যাওয়া। আর মনের আমল হলো, সম্পর্ক থেকে দূরে যাওয়া। আল্লাহ তাআলার আসল উদ্দেশ্য এটাই।
এজন্য পরবর্তীতে আবার পাঠালেন আর ওখানেও সেই একই ধরনের কথা। এসেই জবাই করার জন্য নিয়ে গেলেন। জবাই করলেনও। আবার এর পরবর্তীতে আবার এসে বিয়ের তো বন্দোবস্ত করেননি, যেমনটি সব বাবা-মা করে থাকেন যে, ছেলে বড় হলে বিয়েশাদি দিতে হবে। ইবরাহিম আ. ইসমাঈল আ.-এর বিয়ের ব্যাপারে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন মর্মে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না; কিন্তু বহুদিন পর সফর করে এসে তালাকের বন্দোবস্ত করেছেন। আর এর জন্য কোনো পরামর্শ বা পূর্বালোচনাও নেই।
তেমনিভাবে জবাই করার জন্য ডাকলেন কিন্তু আর কিছু বললেন না। প্রথমে এলেন, তৈরি করলেন আর নিয়ে গেলেন। তো সব জায়গায়-ই ঘুরে ফিরে একটি জিনিসই দেখা যাচ্ছে—একটি সম্পর্ক স্থাপন করা আর অপর সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা।
তাসাওউফের তরিকায় মুরিদগণ খানকায় চলে যান। তাদের ক্ষেত্রেও সেই একই জিনিস—সম্পর্ক থেকে, পরিবেশ থেকে তাদের মন বিচ্ছিন্ন করা, যাতে আল্লাহর দিকে তাদের মন খুব ধাবিত হয়। আর এক সম্পর্ক থেকে দূরে না গেলে অপর সম্পর্ক আসেও না।
সম্পর্কের উদাহরণ
যেমন একটি মেয়ের বিয়ে হলো, পিতার বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। প্রথম প্রথম মন খুব কাঁদে। কোনো না কোনো বাহানায় বাবার বাড়িতে খুব আসতে চায়। আর যখন আসে তো আর যেতে চায় না। একান্তই মনের বিরুদ্ধে যেতে হয়।
পুত্রবধু যদি এভাবেই থেকে যায় তবে কোনোদিনই তার শ্বশুরবাড়ির সাথে সম্পর্ক হবে না। কিন্তু যাদের শ্বশুরবাড়ির সাথে সম্পর্ক হয়ে যায়, তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে কিভাবে যে হয়ে গেল, বোঝায়ই যায় না। কিন্তু সম্পর্ক একপর্যায়ে গিয়ে হয়েই যায়।
এখন বাবার বাড়িতে আসলেও দু-চার দিন থাকার পর নিজ থেকেই অস্বস্তিবোধ করতে আরম্ভ করে আর ফিরে যাওয়ার জন্য ছটফট শুরু হয়ে যায়। কখনো কখনো এ কথা সরাসরি বলতে লজ্জাবোধ করে।
অথচ এক সময় বাপের বাড়ি আসার জন্য তাকে বাহানা বানাতে হতো যে, আব্বার শরীর, বোনের বিয়ে, ভাইয়ের অসুখ ইত্যাদি। আর এখন শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার জন্য তাকে এরকম বাহানা বানাতে হয়। আসলে তার মনে চাচ্ছে না থাকতে।
আবার শব্দ পরিবর্তন হয়ে যায়। অনেক দিন পর্যন্ত "আমাদের বাড়ি" বলতে বাবার বাড়ি বোঝাত। কবে-কখন-কিভাবে এটি পরিবর্তন হয়েছে এটি ধরা মুশকিল যে, এখন "আমাদের বাড়ি" বলতে শ্বশুরবাড়ি বোঝায়। আর সচেতনভাবে এ ভাষার পরিবর্তন সে করেনি, এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে গিয়েছে।
তো এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সম্পর্ক যদি না ছোটে তবে অপর সম্পর্ক জুড়ে না। আর সেই সম্পর্কের ফায়দা নিতে হলে সে সম্পর্কের গভীরে তাকে যেতে হবে।
কখনো কখনো এরকমও হয় যে, ভাসুরের ছেলেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তো ভাসুরের ছেলে বলছে, "চাচিআম্মা রাজি আছেন কি না? তিনি যদি রাজি থাকেন তবে আমার আপত্তি নেই। আর যদি চাচিআম্মার মত না থাকে, তবে উনার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে আমি বিবাহ করব না।"
অর্থাৎ, সে কী পরিমাণ জায়গা করে নিয়েছে যে, নিজের সন্তান তো রয়েছেই, ভাসুরের সন্তানও তার ইঙ্গিত ছাড়া চলে না। কিন্তু এর জন্য তাকে একটি সম্পর্ক করতে হয়েছে। যেভাবেই করুন, করতে হয়েছে।
আল্লাহর সাথে সম্পর্ক
আল্লাহ তাআলা চান এই সম্পর্ক হোক। ইরশাদ হয়েছে:
رُبَّ أشْعَثَ مَدْفُوعِ بِالأَبْوَابِ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللهِ لأَبَرَّهُ
'কিছু ধুলোমাখা শরীর, এলোমেলো চুল, প্রত্যেক দরজা থেকে বিতাড়িত—যদি আল্লাহর নামে কসম করে, তবে আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই সে কসম পূর্ণ করবেন।'
চৈত্রমাসে হঠাৎ বলে ফেলল, "আজকে বৃষ্টি হবে।" আল্লাহ তাআলার পরিকল্পনার মধ্যে বৃষ্টি দেওয়ার কথা ছিল না; কিন্তু সে বলে ফেলেছে। আল্লাহ তাআলার নিকট এই ব্যক্তির এরকম কদর যে, আল্লাহ তাআলা তাকদির বদলাবেন। আর সে যেরকম বলেছে, সেরকমই হবে। ওর কথা রক্ষা হবে।
বাহ্যিকভাবে এই হাদিস শরিফের অর্থ এরকমই। আর আল্লাহওয়ালাদের জীবনে এরকম দেখাও যায়। ব্যতিক্রমধর্মী জিনিস বলে আর ফলেও যায়। যদিও তেমনটি হওয়ার কথা ছিল না; কিন্তু এর আগে যে শব্দগুলো বলেছেন: 'কিছু ধুলোমাখা শরীর, এলোমেলো চুল, প্রত্যেক দরজা থেকে বিতাড়িত।'
যারা অন্য সব সম্পর্ক ছেড়েছে আর এক সম্পর্ককে ধরেছে, মজবুত করেছে। অতঃপর তার এই অবস্থা অর্জন হয়েছে।
অন্য এক জায়গায় রাসূল সা. আল্লাহ তাআলার কিছু সিফাত বর্ণনা করে বলেছেন, এগুলোকে রাসূল সা. বলেছেন হেদায়াতের প্রদীপ। ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الله يحِبُّ الْأَبْرَارَ الْأَنْقِيَاءَ الْأَخْفِيَاءَ الَّذِينَ إِذَا غَابُوْا لَمْ يُفْتَقَدُوا
'আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন পাক দিলওয়ালা, মুত্তাকি, পরহেজগার এবং গোপনীয়তা পছন্দকারীকে। যে ব্যক্তি অপরিচিত থাকা পছন্দ করে বা অপরিচিত থাকে, কেউ তাকে চিনে না, অনুপস্থিত থাকলে কেউ তার খোঁজ করে না, কেউ তাকে চিনে না, কেউ তাকে গুরুত্বও দেয় না। অনুপস্থিত থাকলে কেউ তার খোঁজ করে না আর উপস্থিত থাকলে কেউ তাকে কাছে টেনে বসায় না। কিন্তু তাদের অন্তর হেদায়াতের প্রদীপ।'
হেদায়াতের প্রদীপ তো তখনই হবে, যখন তার অন্তর থেকে আল্লাহ তাআলার নূর প্রকাশিত হবে। সুতরাং আমাদের করণীয় হলো, দ্বীনের জন্য আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা আর অন্য সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া।
খানকার উদ্দেশ্য
খানকা ইত্যাদিতে শুধু শারীরিকভাবে উপস্থিত হওয়া উদ্দেশ্য নয়, বরং ভিন্ন একটি সম্পর্কের মধ্যে তাকে নিয়ে আসা আর অন্য সম্পর্ক থেকে তাকে দূর করা।
আল্লাহ তাআলা মেহেরবানি করে আমাদেরকে ঘুরেফিরে ওই এক জিনিস দিয়েছেন যে, নিজের পরিবেশ থেকে, আত্মীয়-স্বজন থেকে ছিন্ন হয়ে অপর মহলে গিয়ে দ্বীনের খাতিরে সেই মহলের সাথে পরিচিত হওয়া। আর যে মহলের সাথে তার সম্পর্ক ছিল, সে মহলে অপরিচিত হওয়া।
অর্থাৎ, যেখানে সে পরিচিত ছিল সে মহল হবে অপরিচিত। আর যেখানে সে অপরিচিত ছিল অর্থাৎ, দ্বীনি মহল, সেখানে সে হবে পরিচিত। এই পরিচয় শুধু শারীরিকভাবে হবে না। শারীরিক দূরত্ব তো শুধু উপলক্ষ্য, আসল হচ্ছে মনের দূরত্ব, যা সেখানে চেষ্টা করা হয়।
ইবরাহিম আ.-এর নীরবতার তাৎপর্য
যে কথা বলছিলাম, হাজেরা আ.-এর সাথে ইবরাহিম আ. কোনো কথাই বললেন না। বারবার জিজ্ঞাসা করার পরেও মুখের ভাষায় উত্তর দিলেন না। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, আমাদেরকে এই মরুভূমিতে রেখে যাওয়া আল্লাহর হুকুমে কি না, তখন শুধুমাত্র এই হ্যাঁ-টা ইঙ্গিতে বলে দিলেন, ব্যাস।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যে তাবলিগের কাজ দিয়েছেন, এখানে শুধু শারীরিকভাবে যাওয়াই নয়, বরং সর্বপ্রকার সম্পর্ক থেকে দূরে যাওয়া। দূর বলতে শুধু ভৌগোলিক অর্থে দূরে নয়, বরং সর্বত্র দূরে।
আমি শারীরিকভাবে দূরে গেলাম, কিন্তু নিয়মিত যদি যোগাযোগ রাখি, তবে ওই যাওয়াটা প্রকৃত যাওয়া হলো না। অর্থাৎ, শারীরিকভাবে দূরে আছি, কিন্তু মূলত দূরে নয়। যেমন, নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছি যে, সকালবেলা ছেলে নাস্তা করল কি না? নাকের সর্দির কী অবস্থা?
অর্থাৎ, এর মানে দূরে থাকা নয়। যেন আমি বাড়িতেই আছি, শুধু শরীরটি দূরে আছে। অথচ দ্বীনের লক্ষ্য হলো, তার মন যেন দূরে যায়। দ্বীনের উদ্দেশ্য তার দেহ নয়, উদ্দেশ্য তার মন। মনটা যেন দূরে যায়। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন:
"আল্লাহ তাআলা তোমাদের আমলের দিকে তাকান না। বরং আল্লাহ তাআলা তোমাদের কলবের দিকে তাকান।
আরও ইরশাদ করেন:
"হাশরের দিন সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, সেদিন মাল এবং সন্তান—কিছুই তোমাকে উদ্ধার করবে না। তবে একটি সুস্থ দিল।" (সূরা শুআরা: ৮৮-৮৯)
আমলের প্রকৃত মাপকাঠি
আমল প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে: ১. শারীরিক আমল, ২. আর্থিক আমল। নামাজ ইত্যাদি শারীরিক আর হজ ও জাকাত শারীরিক ও আর্থিক উভয়টিই। শারীরিক আমল হোক কিংবা আর্থিক আমল হোক, আর যতই আমলই হোক—শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা এ দুটো মাপবেন না। শারীরিক আমলও বেশি মাপবেন না, আর্থিক আমলও মাপবেন না। তবে লক্ষ্য করবেন, এ দুটো থেকে কী বের হলো! অর্থাৎ, দেখবেন অন্তরকে। আমল হলো উপলক্ষ। আর লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক।
নামাজের আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু সে আদেশের মধ্যেও 'লক্ষ্য' ও 'সম্পর্ক' উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ করেছেন: **"নামাজ কায়েম করো আমার জিকিরের জন্য।"** অর্থাৎ, সম্পর্কের জন্য। নামাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় আমল বলা যেতে পারে সিজদাকে। আর এই সিজদাকে করা হয়েছে নৈকট্যের জন্য। ইরশাদ করেছেন: **"সিজদা করো এবং নৈকট্য অর্জন করো।"**
লক্ষ্য হলো জিকির, লক্ষ্য হলো নৈকট্য আর উপলক্ষ হলো এই আমলগুলো। এই আমলগুলোর কিছু হলো শরিয়তের আমল। যেমন রোজা দিয়েছেন। উপলক্ষ হলো সারাদিন না খাওয়া, দিনের বেলা নিষিদ্ধ কাজগুলো না করা, এগুলো থেকে দূরে থাকা। আর লক্ষ্য হলো তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহ বলেছেন: **"যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া আসে।"** আর এই তাকওয়া একটি ভিতরের সিফাত, অন্তরের সিফাত।
উপলক্ষ ও লক্ষ্যের পার্থক্য
এই নামাজ-রোজা-হজ, এগুলো আল্লাহ তাআলা আমাদের একটি পদ্ধতি হিসেবে দিয়েছেন অন্তরের মধ্যে সিফাত অর্জনের জন্য। এরপরেও আল্লাহ তাআলা আল্লাহওয়ালাদের মাধ্যমে আবার নতুন নতুন পদ্ধতিও দিয়ে থাকেন। যেমন, আল্লাহওয়ালাদের খানকা ইত্যাদি। যদিও রাসূল (সা.) সরাসরি এই পদ্ধতিগুলোর কথা বলে যাননি, কিন্তু আল্লাহওয়ালাদের মাধ্যমে সব জামানাতেই কিছু কিছু জিনিস দিয়ে থাকেন। যেগুলো মানুষের জন্য উপলক্ষ হয়ে থাকে। কিন্তু এই সবগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে ঈমান-আমল।
এখন আমাদের এই তিন চিল্লায় যাওয়া, এগুলো কোনো হাদীসের কিতাবে সরাসরি পাওয়া যাবে না। রাসূল (সা.) সরাসরি এগুলোর কথা বলে যাননি; কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহওয়ালারা মানুষের সুবিধার জন্য এই উপলক্ষগুলো বের করেছেন। যেমন, ইলম অর্জনের হুকুম দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মাদরাসার আদেশ বা হুকুম নেই। কুরআন শরিফে নেই, হাদীস শরিফে নেই, রাসূল (সা.)-এর সময় এরকম মাদরাসা সরাসরি ছিলও না। সে হিসেবে এটি নতুন জিনিস। তবে এগুলো বিদআতও নয়।
আল্লাহ তাআলা যা করতে বলেছেন, এই মাদরাসাগুলো সেগুলোর জন্য উপলক্ষ। মূল লক্ষ্য আল্লাহ তাআলার হুকুমে আছে। সেটি হলো ইলম অর্জন করা। আর এগুলোর উপলক্ষ আল্লাহ তাআলা আমাদের দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যে এই দ্বীনের মেহনত দিলেন—আল্লাহর পথে বের হওয়া, তিন দিন সময় দেওয়া, চিল্লা দেওয়া, এই সবগুলোর মধ্যে আসল কথা হলো, আমি আমার পরিচিত যে জীবনে ছিলাম, সে জীবন থেকে দূরে যাওয়া, মনকে দূরে নেওয়া। এতই দূরে যাওয়া যে, যেন ভুলে যাই।
আনজান হওয়ার শিক্ষা
পাকিস্তানের আবরার সাহেব। উনি তাবলিগে গেলেন, সময় লাগালেন। হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) অথবা হযরত মাওলানা ইউসুফ (রহ.)-এর জামানার কথা। বলা হলো, দ্বীন থেকে ফায়দা তখন হবে, যখন নিজেকে আনজান তথা 'আমি কিছুই জানি না' অবস্থার মতো নিজের মনকে বানিয়ে শিক্ষার্থী হিসেবে বসতে পারবে, সে ততবেশি ফায়দা নিতে পারবে। যেমন, আমি এইচএসসি পাশ করলাম, বিএ পাশ করলাম। আমি তো মূর্খ না, আমি আনজান কেমন করে হবো? আমি সব পাশ করে এখানে এসেছি, এখন আনজান আমি হবো কিভাবে?
তো মুরব্বিরা বলেন, 'আমি কিছুই জানি না'—মনকে এই অবস্থা বানিয়ে বসো। এখন তিনি আপত্তিকর কিছুই বলেননি। তবে মনে মনে এই ভাবনা যে, আমি আনজান হবো কিভাবে? এ বিষয়টি ভাবতে ভাবতে তিনি এ কথাটি জিজ্ঞাসা করে বসলেন। উত্তরে হযরতজি বললেন, তালিব (শিক্ষার্থী) হয়ে বসো। যত তালিব হয়ে বসবে, ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা ততবেশি ফায়দা দিবেন।
ভুলে যাওয়ার ঘটনা
সে জামানায় ইংরেজির খুব চর্চা ছিল। আর যাদের বিএসসি পাশ করতে হতো, তাদেরকে খুব ইংরেজি পড়তে হতো। এগুলোর ক্লাস তাকে নিতে হতো আর ছিলো প্রচুর এক্সারসাইজ, যার ফলে তার ইংরেজি অনেক বেশি শেখা হয়েছিল। তো উনি এক সময় দোয়া করলেন, আল্লাহ তাআলা যেন আমাকে ইংরেজি ভুলিয়ে দেন। সে দোয়া আল্লাহ তাআলা কবুলও করে নিলেন। পাকিস্তানে ইংরেজ ভাষীদের সাথে কথা বলার সময় আমিও এক সময় অনুবাদকের কাজ করেছি। তো মনে হলো, তিনি ঠিকই ইংরেজি ভুলে গিয়েছেন। যে জন্য তিনি দোয়াও করেছিলেন।
মানুষ শিখবার জন্য দোয়া করে, কেউ কি কখনো ভুলে যাওয়ার জন্য দোয়া করে! এর কারণ কী, যদিও তিনি কখনো এর ব্যাখ্যা করেননি। তবে এর একটি কারণ সম্ভবত এমন হতে পারে যে, বেদ্বীন সমাজের সাথে সম্পর্ক না রাখা। এ সম্পর্কে একটি হাদীস আছে:
"যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্যতা রাখবে, সে সেই জাতির অন্তর্ভুক্ত।"
তো সে হিসেবে আমি যদি কোনো একটি জাতির ভাষার সাথে সম্পর্ক রাখি, বলতে পারি, লিখতে পারি, পড়তে পারি, তাহলে এগুলোও আমাকে সে জাতির সাথে অনেকটা মিলিয়ে দেয়। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:
"যে কোনো জাতির সংখ্যা বৃদ্ধি করে, সে তাদের মধ্যে।"
সুতরাং প্রধান কারণ তো এটাই হবে যে, ইহুদি-নাসারাদের ভাষার সাথে আমি কোনো সম্পর্ক রাখবো না। যাতে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা না থাকে; কিন্তু তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার একটি ব্যাপারও থাকতে পারে যে, আমি যেন ওদের থেকে দূরে চলে যাই।
আর দ্বীনকে পেতে হলে ওইসব জিনিসকে ভুলতে হবে, দূরে যেতে হবে।
মুফতি যাইনুল আবেদিন সাহেবের ঘটনা
পাকিস্তানের একজন মুরব্বি ছিলেন। যারা একটু পুরোনো, তারা খুব ভালো করে চিনেন, মুফতি যাইনুল আবেদিন সাহেব (রহ.)। আল্লাহ তাআলা তাকে ইলম ইত্যাদি খুব দিয়েছিলেন আর তিনি দিলখুলে তাবলিগের খুব মেহনত করেছিলেন। তিনি তার সত্তার মধ্যে তাবলিগ ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। বর্তমানে যেমন উলামাদের এক বছরের জন্য তাবলিগে উদ্দেশ্যে বের হতে হয়, উনাদের সময়ে সে তারতিব ছিল সাত চিল্লা। তো উনি মাদরাসা থেকে ফারেগ হওয়ার পরপরই সাত চিল্লার জন্য বের হয়ে গেলেন।
বেশকিছুদিন পর বাড়িতে চিঠি লিখলেন। উনার ছোট বাচ্চা, সম্ভবত মেয়ে ছিল, তো চিঠিতে সালাম ইত্যাদির পর বাচ্চার নাম লিখতে গিয়ে দেখা গেল, উনি উনার বাচ্চার নাম ভুলে গিয়েছেন। এজন্য সেদিন আর চিঠি পোস্ট করা হলো না। রেখে দিলেন। তো পরবর্তীতে যখন তার বাচ্চার নাম মনে পড়লো, তখন লিখে চিঠি পোস্ট করলেন।
তো দ্বীন যে আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন, এর জন্য কিছু বিনিময়ও দিতে হবে। কম্পিউটারে যখন সব স্পেস ভরে যায়, তখন কিছু ডিলিট করতে হয়। তবেই তো নতুন কিছু রাখার জায়গা হবে। আমি যদি আমার অন্তর খালি না করি, তবে নতুন জিনিস রাখবো কী করে। তো তিনিও খালি করেছেন। উনার চার ছেলে, চারও ছেলের নাম ইউসুফ। ইউসুফ-১, ইউসুফ-২, ইউসুফ-৩, ইউসুফ-৪। মনে হয়, বাকি সব নাম ভুলে গিয়েছেন। ওই এক নামই মনে আছে।
কুরআনের আয়াতে কথা বলা
হায়াতুস সাহাবায় একটি ঘটনার উল্লেখ আছে। একজন সাহাবিয়্যাহ ছিলেন। নামটি ভুলে গিয়েছি। ইসলাম আত্মপ্রকাশের পর বেশ কিছুদিন পরের ঘটনা। উনার জীবনের শেষের একুশ বছরের কথা হায়াতুস সাহাবায় উল্লেখ আছে যে, তিনি কুরআন শরিফের বাইরের কোনো কথা বলেননি। তার স্বাভাবিক জীবনযাপন ছিল, ঘর-সংসার ইত্যাদি সবকিছু ছিল, কোনো বৈরাগ্যের জীবনও ছিল না, কোনো জঙ্গলেও গিয়ে থাকেননি; বরং স্বাভাবিক সাংসারিক কাজকর্ম করতেন। তবে সংসারে যত কথাবার্তা বলতে হতো, সব বলতেন কুরআন শরিফের আয়াত দিয়ে। কুরআন শরিফের বাইরে কোনো কথা তিনি একুশ বছরে বলেননি।
আল্লাহ তাআলা তাকে সুবিধাও দিয়েছিলেন যে, উনার সব ছেলেদের নাম নবীদের নামে ছিল। তো যার ফলে নামগুলো কুরআন শরীফে উল্লেখ ছিলই। সুতরাং সে নামগুলো ডাকতে হলে কুরআন শরিফের বাইরে যেতে হয় না। এভাবে সম্পূর্ণ সাংসারিক জীবন চালিয়ে গেছেন একুশ বছর, যে সময়ে কুরআন শরিফের আয়াতের বাইরে কোনো শব্দ তিনি উচ্চারণ করেননি। আল্লাহ তাআলা বাকিসব ভুলিয়ে দিয়েছিলেন। নইলে একুশ বছর সহজ কথা নয়। চেষ্টা করে, ইচ্ছা করে পারার ব্যাপার নয়, অথচ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়েছে। আল্লাহ তাআলাই বাকিগুলো ভুলিয়ে দিয়েছেন, তাকে তৈরি করেছেন।
সুতরাং যে মাত্রায় অন্য জিনিসকে ভুলতে পারবে, আল্লাহ তাআলা তত মাত্রায় তাকে দ্বীন নেওয়ার তাওফিক দান করবেন। আর আমি যদি ওগুলো না ভুলি বা না ভুলার পদক্ষেপ না নিই, তো ঘুরে বেড়ানো হবে, এক্সারসাইজ হবে; কিন্তু মূল যে উদ্দেশ্য, 'আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা'—এটি যে হবেই না, তা হয়তো বলা যাবে না—তবে যে রকম হওয়ার কথা ছিল, সে রকম হবে না। কারণ, আমি তো পিছনেরটি ছাড়তে রাজি হইনি। অর্থাৎ, আমার হাত যে জিনিস রয়েছে, এমতাবস্থায় আমি অন্য জিনিস ধরবো কিভাবে!
হাত খালি করার প্রয়োজন
একটি কৌশল সম্পর্কে শুনেছি যে, যখন কাউকে আক্রমণের ইচ্ছা করা হয়, তখন তার উভয় হাতে প্রিয় কোনো বস্তু ধরিয়ে দেওয়া হয়। অতঃপর তাকে আক্রমণ করা হয়। এখন আর সে আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারবে না। কারণ, তার উভয় হাতে তার প্রিয় বস্তু। এখন যদি সে তার কোনো প্রিয় বস্তুকে হাতছাড়া করে তবেই সে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। সুতরাং আমাদেরকেও আমার মনের ভেতর যে জিনিস আগে থেকেই ধরা আছে, তা ছাড়তে হবে।
এটি ছাড়ার জন্যই তো আমরা এখানে এসেছি। চিল্লা দিই, সাল লাগাই-যা কিছুই আমরা করি—সম্পূর্ণ দ্বীনই হচ্ছে, ওগুলো ছেড়ে নতুন জীবনে আসা। নতুন জীবনের শুরুতে অর্থাৎ, পোশাক-আশাক-দাড়ি-সুন্নতি লিবাস—এগুলোর গুরুত্ব অবশ্যই আছে; কিন্তু এরচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তার মনের ভেতর নতুন জীবন, নতুন উৎসাহ, নতুন সম্পর্ক। আর মানুষকে তার সম্পর্কই পরিচালনা করে। যার যেভাবে সম্পর্ক, সে সম্পর্কই তাকে চালায়। চাই তা ভালো কাজ হোক বা মন্দ কাজ।
সম্পর্কের প্রভাব
মন্দ কাজ যদি হয়, তো কোর্টে গিয়ে মিথ্যা সাক্ষী দিচ্ছে, মিথ্যা মামলা লড়ছে। বড় একটি অংশের দুটি কারণে হয়ে থাকে: ১. সম্পত্তির জন্য, ২. আত্মীয়তার সম্পর্কের জন্য। দেখা যাবে, মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছে হয়তো সম্পদের লোভে বা কারও ভালোবাসায়। হয়তো ভাতিজা বা ছেলে বা আত্মীয় ইত্যাদির ভালোবাসায়। আর অপর সাক্ষী অর্থাৎ, যে সাক্ষী দিচ্ছে সম্পত্তির লোভে—এটি খোঁজ করলে দেখা যাবে, এটিও কোনো না কোনো সম্পর্কের পরিণতি। যে ওই জাতীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে যাদের সম্পত্তির মোহ রয়েছে।
সব পরিবারের ছেলেদের সম্পত্তির লোভ সমান হয় না। যে পরিবার জমির সাথে জড়িত, তাদের সম্পত্তির প্রতি যে মোহ হয়, যে পরিবার সম্পত্তির সাথে জড়িত না, তাদের সে মোহ হয় না। যে পরিবার শিক্ষা-দীক্ষার সাথে জড়িত, তার ডিগ্রির সাথে যে টান থাকে, অন্যদের সে টান হয় না।
একটি পরিবারের ছেলে, আগে গ্রামে কৃষিকাজ করতো। এখন সে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। তার বোনের বিয়ে। মা-বাবা জিজ্ঞেস করলো, অমুক ছেলে সম্পর্কে তোমার কী মতামত? তো গ্রামের ছেলেটি পাত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো, ছেলে কী করে? বললো, জমিজমা ইত্যাদি আছে। ডিগ্রি কী আছে? বললো, ডিগ্রি পাশ। জিজ্ঞাসা করলো, হাল গরু কয়টি আছে? বললো, হাল গরুর কথা তো জানি না; তবে তারা বলেছে, ছেলে এমএ পাশ। তো তার উত্তর মোটামুটি এমনই হবে যে, 'সে কী ওই ডিগ্রি গুলো খাবে? সে খাবে কী! তার তো ডিগ্রির সবরত দিয়ে পেট ভরবে না।'
আবার শিক্ষার পরিবেশে যে আছে, তার কাছে যখন বলা হলো, অমুকে প্রস্তাব দিয়েছে। জিজ্ঞাসা করল, ছেলে কেমন? বলল, অনেক জমিজমা, হাল গরু ইত্যাদি আছে। জিজ্ঞাসা করল, লেখাপড়া কী? বলল, তা তো জানি না। তখন সে পাল্টা উত্তর দেবে, 'মানুষ কি গরু নাকি যে, ঘাস খেয়ে পেট ভরবে! একটা ভদ্র কালচারের দরকার।'
দুই পরিবেশে থাকার কারণে দুজনের কাছেই চাহিদা, বিচার, সম্পর্ক ভিন্ন। ওই যে, সম্পত্তির কারণে মিথ্যা স্বাক্ষী দিচ্ছে, এই সম্পত্তির মোহ—এটাও একটি পরিবেশ থেকে এসেছে। অন্য পরিবেশে থাকলে এটা হতো না।
আইয়ামে জাহিলিয়্যাতে আরবে দীন ছিল না, কিন্তু সম্পত্তির মোহ ছিল। সেই কাফেরদের মধ্যেও। অথচ ইসলাম গ্রহণ করার পর তারা অনায়াসে সম্পদ দিয়ে দিতে পারতেন। দান খয়রাতও প্রচুর করতেন। অথচ এক সময় তারা দীনদার ছিলেন না। তো এই যে মনের পরিবর্তন, এটি মূলত সম্পর্কের পরিবর্তন।
খুরুজের প্রকৃত ফায়দা
এজন্য আল্লাহ তাআলা বড় মেহেরবানি করে আমাদেরকে আল্লাহর পথে বের হওয়ার তাওফিক নসিব করেছেন। এই বের হওয়ার ফায়দা পরিপূর্ণভাবে আমি তখনই পাব, যখন আমি শুধু আমার শরীর নয়, বরং আমার মনকেও বিচ্ছিন্ন করব।
বের হলে ফায়দা তো অবশ্যই হবে, তবে বড় অংশের ফায়দা হবে না। কারণ, মন বের হয়নি, মন এখনো সম্পৃক্ত। ওই দীনের মজলিসে বসে বসে চিন্তা করব, যোগাযোগ করব, তাহলে তো মন অন্যস্থানে রয়েই গেল।
এজন্য আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক নসিব করুন। এই খুরুজ থেকে পরিপূর্ণ ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করব। এজন্য খুরুজ হলে জাহিরিভাবে তো বের হয়েই গেলাম, এরকমভাবে মনের দিক থেকেও বিচ্ছিন্ন হই। একে 'ইনক্বিতা' বলে।
নামাজে ইনক্বিতার শিক্ষা
আমলের মধ্যে এই দুটো খুব বেশি আছে। নামাজ আরম্ভ হওয়ার ক্ষেত্রে তাকবিরে তাহরিমা আছে, ইহরাম। যা নামাজ ব্যতীত সবকিছু নিষিদ্ধ করে। যখন নামাজ আরম্ভ করলাম, তখন নামাজ ব্যতীত সব নিষিদ্ধ।
নামাজ মানে সংযোগ স্থাপন করা। হাদিস শরিফে আছে, "যে তোমার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে, তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন কর।" সিলা মানে সম্পর্ক স্থাপন করা। তো একটি হলো 'ইনক্বিতা' বা 'কাত্বয়া', আর আরেকটি হলো 'সম্পর্ক স্থাপন করা'। অন্য সব সম্পর্ক থেকে ইনক্বিতা করে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা হলো নামাজ। এজন্য নামাজ আরম্ভই হয় তাকবিরে তাহরিমার মাধ্যমে।
নামাজের মধ্যে চলাফেরা বনাম সম্পর্ক স্থাপন
নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে যদি কিবলার দিকে তার বুক না থাকে। নামাজের মধ্যে বেশ হাঁটাহাঁটিও করা যায় প্রয়োজনে। সামনের লাইন থেকে পেছনের লাইনে যাওয়া যায়, পেছনের লাইন থেকে সামনের লাইনে যাওয়া যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজের ভেতরে থাকা অবস্থায় দরজা খুলে দিয়েছিলেন। একবার দরজা বন্ধ করা হয়নি। নামাজ আরম্ভ করে দিয়েছিলেন। হযরত হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু এসেছেন রাতের বেলা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজের মধ্যে ছিলেন। রাতে খুব শীত ছিল।
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পায়ের সাথে নিজের বুক জড়িয়ে ধরলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তার পিঠের চাদর টেনে টেনে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ঢেকে দিলেন নামাজের মধ্যেই। তো নামাজের মধ্যে অনেক কিছুই করেছিলেন।
একটি উদাহরণ
ধরুন, আমি নামাজ পড়ছি। মোবাইল রয়েছে বুক পকেটে। তো কল আসার পর রিসিভ করে বললাম, আমি নামাজের মধ্যে আছি। এখন মুফতি সাহেবকে জিজ্ঞাসা করা দরকার। কারণ, হরকত একেবারেই কম হয়েছে। কোনো হাঁটাহাঁটিও হলো না। শুধু কানে কানে বললাম, আমি নামাজের মধ্যে আছি।
মূলত এখানে অনেক কিছু বোঝার আছে যে, এখানে হাঁটাহাঁটি থেকেও অনেক বেশি কিছু হয়েছে। কারণ, হাঁটাহাঁটি যদিও করেছি, তখন আমি অন্য কারও সাথে সম্পর্ক স্থাপন করিনি। আর এখানে হাঁটাহাঁটি যদিও করিনি, কিন্তু নামাজের বাইরে অন্য আরেকজনের সাথে মাত্র একটি শব্দ উচ্চারণ করেছি, এতে অন্য আরেকজনের সাথে আমার সম্পর্ক স্থাপন হয়ে গিয়েছে। এই নামাজ টিকবে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক নসিব করুন। আল্লাহর পথে বের হয়েছি, এর থেকে পুরোপুরি ফায়দা নেওয়ার জন্য যা যা করণীয় সেগুলো করার চেষ্টা করি, যেন আল্লাহ তাআলা ফায়দা নসিব করেন। আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা: পরিপূর্ণ বান্দা হওয়ার পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: বারিধারা ডি.ও.এইচ.এস. সময়: মাগরিবের পর :১০/০৬/২০০৬ তারিখ أعُوْذ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৯২
দ্বীন ও দুনিয়া
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] দুনিয়ার সব মানুষের কাজকর্ম ও চেষ্টা-পরিশ্রমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—এক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৯৩
কুরআন জীবিত হয় মুমিনের দিলে
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আলেমদের মজমা তারিখ: ১১ অক্টোবর ২০১০ | স্থান: রংপুর | بِسْمِ اللهِ الرَّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৮৪
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১১ নভেম্বর, ২০২৪
১০৫৫৭