বাহ্যিক উন্নতি নাকি আত্মিক সমৃদ্ধি?
বাহ্যিক উন্নতি নাকি আত্মিক সমৃদ্ধি?
اَلحَمْدُ لِلّٰهِ نَسْتَعِينُهُ وَنَعُوذُ بِاللهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ. وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ.
فَأَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ:
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً ۖ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿٩٧﴾
وَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اللَّهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَارْزُقْنَا اتِّبَاعَهُ وَأَرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلًا وَارْزُقْنَا اجْتِنَابَهُ. أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ.
---
আল্লাহ তাআলা নেক আমলের আদেশ দিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে সুন্দর জীবন দান করার ওয়াদা করেছেন। সুন্দর জীবন শুধু মৃত্যুর পরেই দেবেন—এমনটি নয়। আল্লাহ তাআলা এ কথা বলেননি যে, নেক আমল করলে দুনিয়াতে সুবিধা হবে না, কিন্তু মৃত্যুর পরে ভালো থাকতে পারবে। বরং আল্লাহ তাআলা উভয় জগতেই সুন্দর জীবনের ওয়াদা করেছেন নেক আমলের বিনিময়ে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এবং যদি জরিপও করা হয় তাহলে সাধারণভাবে দেখা যাবে, সব ব্যাপারে না হলেও অনেক ব্যাপারে কম দীনদাররা ভালো আছে। যেমন স্বচ্ছলতা। গ্রামে, শহরে বা জাতি হিসেবে পুরো দুনিয়াতে মুসলিম সমাজের মধ্যে যারা নামাজ পড়ে না, তাদের উপর যদি জরিপ ইত্যাদি করা হয় যে, যারা নামাজ পড়ে তাদের আয় কেমন আর যারা নামাজ পড়ে না তাদের আয় কেমন—তো ফলাফল সম্ভবত বেনামাজিদের আয় বেশি—এ জাতীয় হতে পারে। এরকম অনেক ধরনের জিনিস চোখে পড়ে। এমনটি নাও হতে পারে আবার সম্ভবত হতেও পারে; কিন্তু বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হয়, বেদীন খুব ভালো আছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যে নেক আমলের আদেশ দিয়েছেন এবং সুন্দর জীবনের ওয়াদা করেছেন, এটি যে আমাদের চোখের সামনে খুব দেখতে পাচ্ছি—এমনও নয়। আর স্বচ্ছলতা তো একটি মাত্র দিক, বেদীনরা ভালো আছে—এরকম আরও বহু ক্ষেত্র রয়েছে।
সেদিন মুজাকারার মধ্যে এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছিল যে, কেউ যদি অভাবের অভিযোগ করে যে, আমি অভাবের কারণে চলতে পারি না, তখন আল্লাহ তাআলা ঈসা আলাইহিস সালামকে দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখিয়ে দেন যে, তাঁর থেকে বেশি অভাবে আছ নাকি? কেউ যদি রোগের কথা বলে, তখন আইয়ুব আলাইহিস সালামকে দৃষ্টান্তস্বরূপ পেশ করেন যে, তাঁর চেয়ে বেশি রোগে-শোকে ভুগছ! তো রোগ-অভাব এগুলো তো দুনিয়াতে বড় বড় মুসিবত। আর এই মুসিবতে সবচেয়ে বেশি জর্জরিত ছিলেন নবীগণ। অতএব, এ কথা বলতে হয় যে, তাঁরা তো নবী ছিলেন; কিন্তু আমল ভালো ছিল না। এজন্য মুসিবতে ছিলেন। (নাউযুবিল্লাহ) এমনটি বলার কোনো উপায় নেই।
তো সুন্দর জীবনের দৃষ্টান্তস্বরূপ যারা নেক আমলি ছিলেন অর্থাৎ নবীগণ, তাঁরা যদি মুসিবতেরও দৃষ্টান্ত হন, তাহলে আমি যে সুন্দর জীবনের প্রতি অগ্রসর হচ্ছি এবং আশা করছি, সুন্দর জীবন পাব। সুন্দর জীবনের মধ্যে স্বাস্থ্যকর আবাসন জরুরি, ন্যূনতম স্বচ্ছলতা জরুরি। অতএব, সুন্দর জীবন তো জরুরি, কিন্তু সুন্দর জীবনে ঘটবে তার উল্টোটা; অর্থাৎ যা ছিল, তাও যাবে। অতএব সুন্দর জীবনে যদি আমার আমল উন্নততর হতে থাকে, তো যত বেশি আমার উন্নতি হবে, তত বেশি নবীর আমলের সাথে আমার সামঞ্জস্যতা বাড়বে। আর আমার অবস্থাও তখন তাঁদের মতো হতে থাকবে। সুতরাং বিষয়টি একটি ধাঁধা হয়ে গেল।
আল্লাহ তাআলা সুন্দর জীবনের ওয়াদা করেছেন এবং সুন্দর জীবনের এ ওয়াদাটি অবশ্যই সত্য। কিন্তু এটা শয়তানের কথা যে, নেক আমল দিয়ে আখিরাত পাওয়া যায়, দুনিয়া পাওয়া যায় না। এটা আল্লাহর কথা নয়; এটা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের কথাও না, এটা সাহাবাদের কথাও না; এটা শয়তানের কথা। আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতেও সুন্দর জীবনের ওয়াদা করেছেন, আখিরাতেও নিঃসন্দেহে সুন্দর জীবনের ওয়াদা করেছেন। তবে সুন্দর জীবনের আসবাব বা উপকরণগুলো কী—এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে ভুল ধারণা আছে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ মনে করে সুন্দর জীবন মানে হচ্ছে, সে যে অবস্থানে আছে, সে অবস্থা থেকে উন্নতি করা। অর্থাৎ, আমার অবস্থা আমার পক্ষে হয়ে গেল। এই যে মানুষ সুন্দর জীবনের ধারণা করে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে সুন্দর জীবন দান করেন, সে সুন্দর জীবন তার অবস্থা পরিবর্তন করে নয়, বরং তার নিজেকে পরিবর্তন করে।
আর এই সুন্দর জীবন শুধু তার অবস্থান পরিবর্তন করে নয়, বরং দীনের সব কথার মর্ম এটাই যে, মানুষের মেহনতের একটি হল, আমি যা আছি, তাই থাকলাম। আমার চারপাশের সবকিছু ভালো বা মন্দ হয়ে গেল। আর আরেকটি হল, আমার চারপাশে কিছুই পরিবর্তন হল না। শুধু আমি নিজে ভালো বা মন্দ হলাম।
দীনের সব আমলের ক্ষেত্রে তার প্রতিক্রিয়া আমলকারীর দিকে ধাবিত হয়। এর বিপরীতে দুনিয়াতে আমরা যাকে কাজ বলি অর্থাৎ, পুরো দুনিয়ার সমস্ত কাজ এবং কাজের সাথে শিক্ষাদীক্ষাসহ আনুষাঙ্গিক যা কিছু আছে, এই সবগুলো যে করছে, তার দিকে ধাবিত নয়, বরং তার চারপাশের অবস্থার দিকে ধাবিত হয়।
মনে করুন, ব্যবসা একটি কাজ, আর জিকির ও তাসবিহাত—এটি একটি আমল। ব্যবসায় যদি কেউ সফলতা অর্জন করে তবে তার লক্ষণ কী? লক্ষণ হল, আগে ছেঁড়া জামা পরত, এখন ভালো জামা পরে। আগে হেঁটে যেত, এখন সাইকেলে চলে। আগে সাইকেলে যেত, এখন গাড়ি কিনেছে। আগে থাকত কমলাপুরের পাশে, ড্রেন আর পলিথিনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, এখন একটা ছোটোখাটো বাড়ি নিয়েছে। আগে থাকত ফকিরাপুলে আর এখন থাকে ধনীপুরে। অর্থাৎ, পাড়াও পরিবর্তন করেছে। তো, এগুলোই হল লক্ষণ।
যে ব্যবসা পরিবর্তন করেছে, এর লক্ষণ কী? কেউ কোনো ভালো পীরের কাছে মুরিদ হল বা কোনো দীনদার পরিবেশে গিয়ে তালিম নিল। বা তাবলিগে বারবার করে চিল্লা দিল। এই কাজগুলোর কারণে তার যে দীনি মেহনত, এর সার্থকতা অর্জন করছে কিনা? বা করলে তার লক্ষণ কী বা মানদণ্ড কী? তাকে কীভাবে বিচার করবে? কারণ, তার চিল্লায় অবশ্যই ফায়দা হয়েছে।
এর লক্ষণ হল, আগে ছেঁড়াফাড়া জামা পরত, এখন দেখি ভালো ভালো জামাকাপড় পরে। তো নিশ্চয়ই তার চিল্লা কাজে লেগেছে। বা আগে ঝুপড়ি ঘরে থাকত, এখন ভালো বাড়িতে থাকে। সুতরাং নিশ্চয়ই তার চিল্লা ভালো হয়েছে। এ কথাও যদি কেউ বলে, তাহলে একজন সাধারণ শ্রোতাও বলবে, কী বলছ। তার কথার তো কোনো তাল বা মিল পাচ্ছি না।
চিল্লা দিলে, জিকির করলে বা নেক মানুষ হলে টাকা-পয়সা বাড়বে বা বড় বাড়িতে থাকব! এগুলোর সম্পর্ক তো নেকির সাথে নয়। এগুলোর সম্পর্ক তো টাকা-পয়সার সাথে। ব্যবসা যদি ভালো হয়, তবে তার লক্ষণ হল যে, ব্যবসা ভালো চলছে। নতুন গাড়ি কিনেছে, মানে ব্যবসা ভালো চলছে। কিন্তু জিকির খুব বেশি করে করছে, এটি নতুন গাড়ি কেনার লক্ষণ নয়; এটি হল, তার আচরণে পরিবর্তনের লক্ষণ।
এক লোক আগে খুব রাগী ছিল। অল্প-স্বল্প কথায় গালিগালাজ-মারধর-রাগারাগি করত। পথেঘাটে চলতে, নিচের ঘর বা অধীনস্থদের সাথেও নিষ্ঠুর ব্যবহার করত। এমনকি কাজের লোকদের মুখের উপর গরম চা ছুড়ে ফেলত ক্রোধ প্রকাশ করতে গিয়ে। অথবা ঠান্ডা চা দিলে লাথি মারত যে, চা কি ঠান্ডা খাবে? গরম দিলেও মুশকিল, ঠান্ডা দিলেও মুশকিল। তাকে নিয়ে বাড়ির লোক পেরেশান।
সেই লোক চিল্লায় গেল বা তার অন্তর আমলের মাধ্যমে পরিবর্তন হল কোনো নেক লোকের সান্নিধ্যে। এখন তার মধ্যে দীনদারি এসেছে। এখন সে জিকির করে, তেলাওয়াত করে, তাসবিহ আদায় করে।
একদিন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে... একজন লোক এমন বেপরোয়াভাবে ধাক্কা দিল যে, সে ড্রেনে পড়ে গেল। ইচ্ছে করে হয়তো ধাক্কা দেয়নি, কিন্তু সে তো পড়ে গেল। আচ্ছা, এখন যেহেতু সে আমার ধাক্কায় ড্রেনে পড়ে গেছে; এখন আমার দায়িত্ব হল, আমি দুঃখ প্রকাশ করব; তাকে ধরে উঠাব। কিন্তু না, সে এদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বেপরোয়া চলে গেল। এদিকে এই বেচারা যখন ড্রেন থেকে উঠল, তখন সে কিছুই বলল না। উঠে চলে গেল। কিছু চুপচাপ থাকল, কিছুই বলল না।
এই লোককে যারা চিনত, তারা বলল, এক বছর আগেও সে যেরকম ছিল, তখন এমনটি ঘটলে এ লোক এখান থেকে জিন্দা বের হতে পারত না। আর জিন্দা যেতে সক্ষম হলেও কমপক্ষে ভাঙা হাত তো থাকতই। তারপর বলবে, এই লোকটি অনেকদিন যাবৎ কোনো হুজুরের নিকট যায়। বা কেউ বলবে, চিল্লায় যায়। এই ঠান্ডা মেজাজ সম্ভব ওই চিল্লায় যাওয়ার আছর। যেহেতু নরম হয়ে গেছে।
এ কথা কেউ বলবে না যে, মনে হয় ব্যবসায় খুব লাভ হচ্ছে, এজন্য বিনয়ী হয়ে গেছে। ঠিক কিনা?
দুনিয়ার যত কাজ; সব কাজের লক্ষ্যই হল, আমাকে পরিবর্তন করা নয়; আমার পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে পরিবর্তন করা। আমার জামাকাপড় উন্নত করা, খাবার-দাবার উন্নত করা, ঘরবাড়ি উন্নত করা। এমনকি আশেপাশে যত মানুষ আছে, তাদেরকেও আমার ব্যাপারে উন্নত করা।
যেমন, আগে আমি যখন রাস্তা চলতাম, সাক্ষাতে আমি প্রথম সালাম দিতাম। আর এখন সালাম দিলে খুবই সংক্ষেপে বলে, উহ। কারণ, বিনা পয়সার সালাম। কারণ, এখন সালাম দিলে তো কোনো লাভ নেই। এ সালামে আর কী লাভ। এজন্য সে উত্তরও দেয় না। আমার টাকা-পয়সা-ঘর-বাড়ি হয়েছে। আমি চাই, এখন তারা সালাম দিক আর আমি উহ বলব। এটা হল আমার একটা সফলতা। আর এটি আমার কাজের পরিণতি।
আল্লাহ তাআলা আমল দিয়েছেন চারপাশের অবস্থা পরিবর্তন করার জন্য নয়, নিজেকে উন্নত করার জন্য। নিজেকে উন্নত—এর অর্থ আমার শরীরও নয়; আমার মনকে উন্নত করা।
আগে খুব স্বার্থপর ছিল। নিজের ভাই অসুস্থ। তার ওষুধের জন্য টাকা বের করে না; কিন্তু নিজে খুব ধুমধাম করে পার্টি করছে। একেক রাতে মেহমান বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে হাজারো টাকা খরচ করে। ফুফুর খাবার নেই; ভাইয়ের ওষুধ কেনার টাকা নেই; কিন্তু এগুলো দেয় না।
আর মন পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার পর এখন পুরোই উল্টো। নিজে না খেয়ে তার ফুফুর খোঁজ করে, ভাইয়ের খোঁজ করে। প্রতিবেশীর খোঁজ করে। সাহাবারা বা আল্লাহওয়ালারা যেমনটি করতেন। এখন লোকে বলছে, সে আর আগের মতো নেই। সে এখন ভিন্ন ব্যক্তি।
তো দীন ওই ব্যক্তিকে পরিবর্তন করে। তার আমলের দ্বারা চারপাশের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বদলায় না; আর এটি পরিবর্তনের আশাও করে না। আমলের মাধ্যমে নিজেকে পরিবর্তন করে।
কিছুটা বোঝার জন্য একটি গল্প বলা যেতে পারে; যদিও সেটি একই জিনিস নয়। কোনো একজন মহিলা নতুন সংসার আরম্ভ করেছে; অল্প বয়সে বিয়ে দিলে যেমনটি হয়। আগে তো বিয়েশাদি খুব অল্প বয়সেই হত। তারা একেবারেই গরিব। থাকেও কোনো রকমে একটি ছোট ঝুপড়িতে। তার খুব শখ, তার সুন্দর একটি বাড়ি হবে। এ শখ সবারই থাকে।
আল্লাহ তাআলা এমনই করলেন, ধীরে ধীরে সে সেই ঝুপড়ি থেকে উঠে এসে এখন বিরাট বাড়িতে থাকে। সেই বাড়িতে বর্তমানে যে পর্দা রয়েছে, তার মূল্যে আগের বাড়ির পর্দাগুলো দশবার কেনা যাবে। শুধু পর্দাই কয়েক লক্ষ টাকার। এছাড়াও রয়েছে বড় খাট, ড্রেসিং টেবিল ইত্যাদি।
বাড়ির এই উন্নত পরিবেশ দেখে তার আগের দিনের কথা মনে পড়ছে। সে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে এবং মুগ্ধ হচ্ছিল যে, আমি কোথায় ছিলাম আর এখন কোথায় এলাম! এক সময় ঝুপড়ির চেয়েও নিম্নস্তরে ছিলাম; এখন প্রায় রাজকুমারী। এসব ভাবতে ভাবতে তখন আয়নায় নিজের চেহারার দিকে নজর পড়ল।
নিজেকে ভালো করে লক্ষ করে তার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। এক সময় সে অত্যন্ত সুন্দরী ছিল যৌবনে। এই পরিবর্তনটি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই পরিবর্তনটি হতে গিয়ে তার জীবন থেকে চলে গিয়েছে প্রায় দশ বছর। এখন সে একজন বৃদ্ধা। যখন আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকাল, তার মন আবার খারাপ হয়ে গেল। লম্বা শ্বাস টেনে বলল:
'আমি সুন্দর ছিলাম
আমার কিছুই সুন্দর ছিল না।
আজ আমার সব সুন্দর
কিন্তু আমি আর সুন্দর নেই।'
এই সবকিছু হয়েছে ঠিকই এই চল্লিশ বছরে, কিন্তু এ সবকিছু আমার সৌন্দর্যের বিনিময়ে। এ তো ছিল দৈহিক সৌন্দর্যের দৃষ্টান্ত। কিছু বোঝার জন্য এই ঘটনাটি বললাম।
আসলে দীন এমনই, কিন্তু দীনের সৌন্দর্য হচ্ছে আভ্যন্তরীণ সিফাতের সৌন্দর্য। আল্লাহ তাআলার নামগুলোর প্রত্যেকটি নামই বিশেষ সৌন্দর্য প্রকাশ করে। আসমাউল হুসনা—হুসন সৌন্দর্যকে বলে। আল্লাহর নামগুলোই হচ্ছে সুন্দর নাম। এই সুন্দর নামসমূহের গুণের ওপর আমলের মেহনত করে নিজের মধ্যে সেই নামের সিফাত অর্জন করা।
যেমন আল্লাহর একটি নাম, 'আল-আদল' অর্থাৎ 'ন্যায় বিচারক'। বিচার যে শুধু বিচারকরাই করেন—এমনটি নয়। দুনিয়ায় এমন কোনো মানুষ নেই, যে বিচার করে না। প্রতিমুহূর্তে আমাদের কোনো না কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এগুলোই হলো বিচার। কিন্তু এগুলোর মধ্যে নানা ধরনের অন্যায় বা অশুদ্ধ সিদ্ধান্ত থাকে। তবে যত বেশি সেই সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে আদালত অর্থাৎ ন্যায়বিচার আসবে, তত বেশি তার সিদ্ধান্তগুলো শুদ্ধ হবে।
রাগ করে কতটুকু শাস্তি দেওয়া যায়, এ ব্যাপারেও শরিয়তের আহকাম (দিকনির্দেশনা) আছে। রাগ করব না, তাও নয়। যেখানে রাগ করা উচিত, সেখানে না করলে শরিয়তের দৃষ্টিতে সে দোষী। তার রাগ করা উচিত ছিল। যদি বেশি রাগ করে, তাও দোষী। যেখানে যা বলা দরকার, বলল না, তাহলে দোষী। বেশি বলল, তাহলে দোষী। নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। আর এই মান নির্ণয় করা সাধারণ মানুষের জন্য খুব সহজ নয়। আল্লাহ তাআলা যাকে সেই সিফাতে আদল দান করেছেন, আল্লাহ তাআলা তাকে সেই মানদণ্ড বোঝার তাওফিক নসিব করেন।
দানশীলতা—এটি সিফাত। আল্লাহ তাআলার মধ্যে এই সিফাত আছে। মেহমাননবাজ অর্থাৎ 'আল-কারিম'। বান্দার মধ্যে এই সিফাতগুলো যত বাড়বে, তত তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে।
এমন আমলের মাধ্যমে নিজেকে সুন্দর করে গড়ে তোলা যায়। আর দুনিয়াবি কাজের মাধ্যমে নিজে যা ছিল, তাই থাকে। চারপাশের অবস্থাগুলো সুন্দর হয়ে যায়। কিন্তু আমলের মাধ্যমে অবস্থা তেমনই থাকে না। এজন্য আল্লাহ তাআলা এটাকে তিজারত বলেছেন। অর্থাৎ, কিছু দিয়ে কিছু নিতে হয়।
অহংকারী ছিল। অহংকারী সুন্দর নয়। আল্লাহর দৃষ্টিতেও নয়, মানুষের দৃষ্টিতেও নয়। অহংকারীকে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না—অসুন্দর। মানুষও অহংকারীকে পছন্দ করে না।
তেমনিভাবে কোনো লোক খুব দান-খয়রাত করত। অনেক সময় দেখা যায়, ব্যবসায়ী লাখ লাখ টাকা, এমনকি কোটি টাকাও হতে পারে, যাকাত দিচ্ছে। কিন্তু যারা যাকাত গ্রহণ করে, তারা কেউ যাকাত প্রদানকারীকে ভালোবাসে না। তারা যাকাত নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসে না। তেমনিভাবে লোকটি যাকাত দিচ্ছে ঠিক, কিন্তু অহংকারী। তার যাকাত দেওয়ার ধরনেই অহংকার প্রকাশ পায়। যাকে দিচ্ছে, তাকে যাকাত তো ঠিকঠাক দিচ্ছে কিন্তু তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে দিচ্ছে। তাই যে তার কাছ থেকে উপকৃত হয়, সেও তাকে ভালোবাসে না; মারা গেলে দুঃখ করে না। কিন্তু এই চিন্তাও করে যে, সামনের বছর তো আর যাকাত দিতে পারবে না। কিন্তু তার জন্য যে চোখের পানি ফেলবে—তা কিন্তু নয়। সুতরাং অহংকারীকে আল্লাহও ভালোবাসেন না, মানুষও ভালোবাসে না।
দুনিয়ায় যে উন্নতি করল, কারণ সে উন্নতি করতে চেয়েছিল। পড়াশোনা করেছে, ফাস্ট হয়েছে। চাকরি করেছে, প্রমোশন পেয়েছে। এভাবে প্রমোশন পেয়ে পেয়ে ঊর্ধ্বতন দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছে। ব্যবসা করেছে, কোটিপতি হয়েছে। অর্থাৎ, উন্নতি করেছে। এই যে মেহনত করেছে উন্নতির জন্য, সে অহংকারী হওয়ার জন্য করেনি। করেছে উন্নতির জন্য। পরীক্ষার রেজাল্ট যেন ভালো হয়, আমি যেন ধনী হই, আমার যেন প্রমোশন হয়। কিন্তু এটা হতে হতে অজান্তেই সে অহংকারী হয়ে গেছে। অহংকারী হওয়া তার লক্ষ্য ছিল না।
ওষুধ যে রোগের জন্য খাওয়া হয়, সেটি ভালো হয়, কিন্তু প্রায় সব ওষুধেরই কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা সাইড ইফেক্ট থাকে। সুতরাং দুনিয়ার যত মেহনত আছে, সব মেহনত তাকে দুনিয়ার উন্নতি দান করে, সম্পদ দেয়, ক্ষমতা দেয়, খ্যাতি বা পরিচিতি দেয়। গরিব ছিল, কেউ তাকে চিনত না, এখন সবাই তাকে এক নামেই চেনে।
এক ব্যক্তির বাড়ির বিপরীত পার্শ্বে নতুন একটি বাড়ি হয়েছে। একজন ধনী ব্যক্তি বাড়িটি বানিয়েছে। বড় একটি গেট লাগিয়েছে। অপর পাশে যার বাড়ি, তার বাড়িটিতে বিশাল গেট নেই, যেহেতু অনেক পুরোনো বাড়ি। সে একটি রিকশাকে ডেকে তার বাড়ির অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করছে। যদিও তার বাড়িটি অনেক পুরোনো বাড়ি। রিকশাওয়ালা বলল, অমুক বিশাল গেটওয়ালা নতুন বাড়িটির বিপরীত দিকের বাড়িটি কি না? এমন কথা হজম করা তার জন্য সহজ কোনো বিষয় না। লোকেরা পাড়ার অন্যান্য বাড়ি চিনত আমার বাড়ি দিয়ে। এখন আমার বাড়ির পরিচয় হয় অমুকের বাড়ির নামে। এখন সে সিদ্ধান্ত নিল, ফিরে এসে সর্বপ্রথম তার ঘরের গেট ভেঙে বিশাল করে নতুন গেট স্থাপন করবে।
মানুষ পরিচিতি চায়, সম্পদ চায়। এগুলো চাইতে গিয়ে অজান্তে তার নিজের আভ্যন্তরীণ অনেক গুণ হারিয়ে ফেলে।
পরীক্ষায় আমি ভালো রেজাল্ট করতে চাই। এদিকে মায়ের জ্বর হয়েছে। এখন আমি বসে বসে মায়ের সেবা করতে পারব না। যদি বসে বসে তার সেবা করি তবে পরীক্ষায় নম্বর তিনটা কমে যাবে। ফাস্ট থেকে থার্ড ক্লাসে নেমে যাব না ঠিক, কিন্তু কিছু নম্বর তো কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর নম্বর যদি আমি কিছু বাড়াতে চাই, তাহলে মায়ের পাশে বসে থাকা চলবে না। সুতরাং দুনিয়ার উন্নতি করতে গিয়ে না চাইতেও নিজের গুণের মধ্যে কিছু অবনতি মেনে নেওয়া হয়। অহংকারী হয়, স্বার্থপর হয়। দুনিয়ার মানুষ যত উন্নতি করবে, তত স্বার্থপর হবে।
গ্রামের দুই ভাই। একজন মেট্রিক পাস করতে পারেনি আর আরেক ভাই অনেক উপরে উঠেছে। সে পড়াশোনায় ভালো ছিল। এভাবে সে অনেক উন্নতি করেছে। যে ভাই মেট্রিক পাস করতে পারেনি, সে এখন এক মুদি দোকানের সেলসম্যানের চাকরি করে, আর যে টপাটপ অনেক উপরে উঠেছে, সে এখন বিরাট মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বড় পদে চাকরি করে।
মা অসুস্থ, এখন কাউকে না কাউকে মায়ের কাছে এসে থাকতে হবে। অতএব যে বেচারা মুদির দোকানে চাকরি করত, সে তার চাকরি ছেড়ে মায়ের কাছে চলে এসেছে। আর যে ভাই বিরাট কোম্পানিতে চাকরি করছে, সে সেখান থেকে ফোনে খোঁজখবর নিচ্ছে যে, মা কেমন আছে? মাকে দেখতে না পেরে আমার মন খুব অস্থির; কিন্তু সবকিছু ফোনেই হবে; সে আসবে না। তার বড় দুনিয়া ছাড়া তার জন্য চলা খুবই কঠিন। অপরদিকে তার ভাই যে মুদি দোকানের কর্মচারি; তার আছেই বা কী, ছাড়লেই বা কী।
আল্লাহ তাআলা আমল দিয়েছেন। এই আমল দিয়ে নিজেকে উন্নত করা। নিজেকে উন্নত করতে গিয়ে তার বাইরে অনেক উন্নতি ছাড়তে হয়। অপরদিকে দুনিয়াবি কাজ দিয়ে অবস্থার উন্নতি করে। অবস্থার উন্নতি করতে গিয়ে নিজের ভেতরের অনেক গুণাবলি ছাড়তে হয়। ব্যক্তিগত পর্যায়েও; জাতিগত পর্যায়েও।
আজকের ইউরোপ-আমেরিকায় যদি যাওয়া হয়—এদের মধ্যে মায়েদের বিরাট একটি সংখ্যা বাচ্চাদের অন্যের কাছে রেখে লালনপালন করে। বেবিকেয়ারিং জাতীয় অনেক ব্যবসা আছে। দুনিয়ায় বহু ব্যবসা আছে, তার মধ্যে এটিও একটি ব্যবসা যে, পরের বাচ্চার দেখাশোনা করা। ইউরোপের মায়েরা এই বেবিকেয়ারিংয়ে বাচ্চা রেখে চলে যায়। সকালে যখন সে বাচ্চাকে রেখে চলে যায়, বাচ্চা চিৎকার করে কাঁদে আর মা চুপচাপ কাঁদে। মা চিৎকার করে না, চোখের পানি কাউকে দেখতেও দেয় না, কিন্তু তারও কষ্ট হয়। আর বাচ্চা তো প্রকাশই করে।
বাচ্চাটির সারাটা দিন কাটে এতিমের মতো; এ এক এতিমের জীবন। মাও নেই, বাবাও নেই; অবহেলিত। বিকেলবেলা যখন নেওয়ার সময় হয়, তখন তারা ডায়পার ইত্যাদি বদলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বাচ্চাটিকে মায়ের কাছে দেয়। এ ছাড়া সারাটা দিন সে ময়লার মধ্যে পড়ে থাকে, তখন বাচ্চাকে দেখেও না। বাচ্চার খাবারস্বরূপ যা কিছু দিয়েছে, সেগুলোর পুরোটা বাচ্চাকে না খাইয়ে নিজেরা খেয়ে ফেলে। সবাই যে এমন করে, তা বলছি না; কিন্তু করে না—তাও নয়; বেসিক অংশ করে। মাও যে জানে না—তাও নয়। কিছু জানে, কিছু জানে না; কিন্তু কিছুই করার নেই। কারণ, বাচ্চাকে যদি না রেখে যায়, তাহলে সামনের ছুটিতে দূর সমুদ্রে তার ভ্রমণে যাওয়া হবে না। আর ভ্রমণে যেতে হলে তার বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন। সেই অঙ্কের টাকা উপার্জন করতে হলে তাকে বাচ্চাটি এখানে রেখে যেতেই হবে।
মা-বাবা বৃদ্ধনিবাসী; একাকি থাকে। ছেলেমেয়েদের কেউ খোঁজ নিতে আসে না। বাবাদের সংখ্যা কম; বৃদ্ধনিবাসে বৃদ্ধারা থাকেন। সব জায়গায় নিজস্ব গল্পগুজব থাকে, কিছু সত্য, কিছু মিথ্যা। নিজে যে শুনিনি, তা নয়; খুব শুনেছি। এ জাতীয় মিথ্যা গল্প মহিলারা খুব বেশি করে থাকেন যে, আমার ছেলে কালকে এসেছিল; আমার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করেছে, খুব গল্প করেছে। অথচ বাস্তবতা হলো, ছেলে গত এক বছরে একবারও আসেনি। এ জাতীয় মিথ্যা গালগল্প। হয়তো মনে চায়, এজন্য কখনো কখনো কল্পনা করে আর বার্ধক্যের কারণে কখনো ধন্দ লেগে যায়। কখনো কখনো কল্পনা করে বলে যে, আমার ছেলে এসেছিল আর কখনো কখনো অন্যের কাছে নিজের মর্যাদা বাড়ানোর জন্য সচেতনভাবে বলে যে, ছেলে আমাকে দেখতে এসেছিল; অথচ কেউ আসেনি।
বছরে একটি মাদার্স ডে আসে। এই সন্তানরা মাদার্স ডে-তেও আসে না। আবার ব্যাংকে ফর্ম পূরণ করে রাখা আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক স্বউদ্যোগী হয়ে আর্থিক বিনিময়ের বদলে ফুলের তোড়া মাকে ডাকযোগে পাঠিয়ে দেয়; কিন্তু ছেলেরা আসে না। সংখ্যায় বিশাল একটি অংশ ফকিরের চেয়েও অবহেলিত বৃদ্ধনিবাসে ধুকে ধুকে মরছে বা বড় শোচনীয়ভাবে আছে। তার টাকায় বরাদ্দ ওষুধটি পর্যন্ত নার্সরা দেয় না; বলে, আমাকে টাকা দিতে হবে, নাহলে ওষুধ দেব না। এভাবে টাকা না দিলে খেতেও দেয় না। পকেটের টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় অন্যায়ভাবে। এমনটি যে সবাই করে—তাও নয়। আবার এমনটি যে ঘটে না—তাও নয়। ছেলেমেয়েরা জানে, আমার মা-বাবা এমন এমন মুসিবতের মধ্যে রয়েছেন; কিন্তু এমনটি তারা মেনে নিয়েছে।
আজ থেকে একশ বছর, মাত্র একশ বছর পেছনে চলে গেলে গোটা ইউরোপ খুঁজে একটি বৃদ্ধনিবাস পাওয়া যাবে না; ছিল না। তখন মা-বাবা কোথায় থাকতেন? ছেলেমেয়েরা দেখত; কিন্তু এখন আর দেখে না। সবাই দেখে না—তাও নয়; কিন্তু বেশ বড় একটি অংশ দেখে না। একশ বছর আগে গোটা ইউরোপ খুঁজে বেবিকেয়ারিং সিস্টেমটা পাওয়া যাবে না। মা সন্তানদের দেখত; এখন কি সব মায়েরা মরে গেছে? মায়েরা মরে যায়নি; বরং কাজে চলে গেছে।
বিনিময়ে কী পেয়েছে? বিনিময়ে বর্তমানে যে বিলাসিতাগুলো ঘরে ঘরে পাচ্ছে, এই বিলাসিতা একশ বছর আগে একটি রাজবাড়িতেও ছিল না। গরম পানি আর ঠান্ডা পানির জন্য আলাদা ট্যাপ রয়েছে। যেমন ইচ্ছা তেমন পানি আলাদা ট্যাপ থেকে পেতে পারবে। একটি বাড়ির ন্যূনতম জায়গা হচ্ছে বাথরুম। সেই বাথরুমে গেলে সুগন্ধে মন ভরে যাবে; দুর্গন্ধের কোনো লক্ষণই নেই। পানি আছে; সেই পানিও সমুদ্রের মতো স্বচ্ছ-হালকা নীল রঙের।
যে বিলাসিতা একশ বছর আগে দুনিয়ার কোনো রাজবাড়িতেও ছিল না, একশ বছর আগে বৃদ্ধদের ফেলে দেওয়ার জন্য বৃদ্ধনিবাস, যাকে বৃদ্ধদের ডাস্টবিন বলা যেতে পারে, সেই বৃদ্ধনিবাস বা বাচ্চাদের জন্য বেবিকেয়ারও ছিল না। অতঃপর এই বিলাসিতা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু মা-বাবা হারিয়ে, সন্তানকে হারিয়ে। আজ যদি মা-বাবা না থাকে, যদি সন্তান না থাকে, যদি স্বামী না থাকে, যদি স্ত্রী না থাকে তাহলে আমি আছি কোথায়!
এই বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে খুব ভালো বোঝা যাবে যে, একজনকে জিজ্ঞাসা করা হল: তুমি কেমন আছ?
—আমি খুব ভালো।
তোমার হাত কোথায়?
—হাত কাটা গেছে।
পা কোথায়?
—পা কাটা গেছে; কিন্তু আমি ভালো আছি।
---
দুনিয়াবি উন্নতি আমাদের বাহ্যিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়, কিন্তু আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য ও মানবিক গুণাবলি বিসর্জন দিতে হয়। আল্লাহর সিফাত অর্জনের মাধ্যমে আত্মার প্রকৃত সৌন্দর্য লাভ করা যায়, যা চিরস্থায়ী। বস্তুগত সমৃদ্ধি পেতে গিয়ে আমরা যদি আমাদের সম্পর্ক, মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিকতা হারিয়ে ফেলি, তাহলে সেই উন্নতি প্রকৃত অর্থে কোনো উন্নতিই নয়—বরং তা এক ধরনের পতন।
হাতও নেই, পাও নেই, চোখও নেই, কানও নেই; কিন্তু আমি ঠিকই আছি। যেমন আত্মীয়-পরিবার কিছুই নেই, তবুও ইউরোপ ভালো আছে।
প্রফেসর সরওয়ার হোসেন স্যার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়ের উপাচার্য ছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তিনি বিলেতে একসময় বড় একটি পদে চাকরিরত ছিলেন। একদিন অফিস শেষে বিকেলে ঘরে ফিরছিলেন। ইউরোপে সহকারী সাধারণত মহিলারা হয়ে থাকে; তাই তাঁর সহকারীও ঘরে ফিরছিল। অফিস থেকে বের হতে লম্বা লবি হেঁটে যেতে হয়। একসাথে হেঁটে বের হওয়ার সময় সহকারীকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি এখন কোথায় যাবে?"
সে বলল, "বাড়ি যাব। রান্না করব। ছেলেকে খাওয়াব।"
তার ছোট ছেলে আছে, স্বামীও আছে—প্রফেসর সাহেব এ বিষয়ে জানতেন। তাই জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমার স্বামীকেও খাওয়াবে?"
ব্যক্তিগত সহকারী বলল, "না, সে আলাদা খায়।"
যেহেতু বেশ কিছু পথ একসাথে হেঁটে বের হচ্ছিলেন, তাই গল্প করতে করতে সহকারী আরও বলল, তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক ও ভালোবাসা খুবই ভালো। তবে খাওয়া-দাওয়া আর বাজার—এগুলো আলাদা।
"সম্পর্ক যে ভালো, এর প্রমাণ কী?"
উত্তরে বলল, "একই বাড়িতে থাকি, একই রান্নাঘর ব্যবহার করি, সময়ও ভাগ করে নিয়েছি। তাই সম্প্রীতি বেশি থাকার কারণে একই বাড়িতে থাকতে কোনো সমস্যা হয় না; একই রান্নাঘর ভাগাভাগি করতেও কোনো সমস্যা হয় না। তাই সম্প্রীতি খুব বেশি।"
এই হলো সম্প্রীতির অবস্থা। অথচ একশ বছর পূর্বেও এমন অবস্থা ছিল না। বিলাসিতা কিনেছে ঠিকই, কিন্তু ভালো দাম দিয়ে কিনতে হয়েছে, বিনামূল্যে আসেনি। এর বিপরীতে আল্লাহ তাআলা দীন দিয়েছেন, উন্নত জীবন দিয়েছেন, কিন্তু তা বিনা পয়সায় নয়; মূল্য দিয়ে পেতে হয়েছে।
এক বিদেশি ভ্রমণে বের হয়েছিল। ঘুরতে ঘুরতে এক বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। বাগানের ভেতরে লক্ষ করল, বাগানের মালি সারাদিনের কাজ শেষে খাবারের জন্য বসেছে। মালিকের বাড়ি থেকে তার খাবার এসেছে। বাগানের মালিকের পক্ষ থেকে মালির জন্যও খাবার এসেছে। সবাই খাবার খেতে বসেছে, এমন সময় একটি কুকুর মালির সামনে এসে বসল এবং তার দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। অর্থাৎ কুকুরও খেতে চায়। সে তার খাবার থেকে একটি টুকরা কুকুরকে দিয়ে দিল। কুকুর সেটি সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে ফেলল। এরপর আবার মালির দিকে তাকিয়ে থাকল। মালি আবার খাবার দিল, কুকুর সেটি খেয়ে আবার তাকিয়ে থাকল। এভাবে দিতে দিতে মালি তার তিনটি রুটির তিনটিই দিয়ে দিল অথবা খাবারের সামান্য অংশ নিজে খেল আর বেশিরভাগ কুকুরকে দিল।
আগন্তুক দূর থেকে ওই দৃশ্য দেখছিল। তার কাছে এ দৃশ্যটি খুব সুন্দর লাগল।
মানুষের সৌন্দর্যবোধ ভিন্ন; কেউ সৌন্দর্য দেখে আচরণের মধ্যে আর কেউ সৌন্দর্য দেখে জিনিসের মধ্যে। বিরাট সুন্দর বাড়ি দেখল। ভেতরে কী? ভেতরে মানুষ। কিন্তু সেই মানুষ সম্পর্কে জানিও না যে, কেমন আছে। হয়তো সে সুন্দর বাড়ির ভেতর আত্মহত্যা করছে।
সেই আগন্তুকের দৃষ্টি জিনিসের প্রতি যাচ্ছে না, যাচ্ছে আচরণের দিকে যে, একটি কুকুরকে সব খাবার বা প্রায় সব খাবার খাইয়ে দিল আর নিজে খেল না বা প্রায় খেল না। তিনি মুগ্ধ ও আকৃষ্ট হয়ে মালির কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কে?"
"আমি এই বাগানের মালি।"
"এই বাগান কার?"
"উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর বংশধরদের বাগান।"
"তোমার মালিক কে?"
"অমুক। আমি তাদের গোলাম।"
আগন্তুক মালিকদের কাছে গিয়ে বললেন, "আপনাদের ওই বাগান আমি ক্রয় করতে চাই।" আগন্তুক ধনী ব্যক্তি ছিল। বাগানের মালিকপক্ষ এ প্রস্তাবে রেগে গেল না যে, আমরা কবে বললাম, আমরা বাগান বিক্রি করব! আমার কাছে যদি কেউ এসে বলে, "আপনার বাগান আমি কিনতে চাই," তাহলে তো আমি রেগে যাব। কিন্তু সেই বাগান মালিক যখন শুনল কিনতে চায়, বলল, "ঠিক আছে, আমি বিক্রি করে দিলাম।"
এখন আগন্তুক বলল, "মালি তথা গোলাম, তাকেও কিনতে চাই।" এখন বাগান মালিক একটু ইতস্তত করল যে, আমাদের অনেক দিনের পুরোনো সম্পর্ক। আমরাও তাকে ভালোবাসি, সেও আমাদের ভালোবাসে। আমরা তাকে দিতে রাজি নই। অনেক পীড়াপীড়ি করার পরে তারা রাজি হয়ে গেল। এভাবে আগন্তুক বাগান এবং বাগানের মালি উভয়কে কিনে নিল।
ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার পর আগন্তুক বাগান পরিদর্শনে গেল। মালিকে গিয়ে বলল, "তোমাকে আমি কিনে নিয়েছি তোমার মালিকের কাছ থেকে।"
মালি বলল, "আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ বরকত দিন।"
এরপর বলল, "এই বাগানও আমি কিনে নিয়েছি।"
মালি বলল, "আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ বরকত দিন।"
মালিক বলল, "আমি তোমাকে স্বাধীন করে দিলাম এবং এই বাগান তোমাকে হাদিয়া দিয়ে দিলাম।"
মালি বলল, "আলহামদুলিল্লাহ।"
কথা শেষ হল। এখন মালি বলল, "আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি বাগান আমার আগের মালিকদেরকে দিয়ে দিলাম। আর আমি তাঁর আগের গোলামই রয়ে গেলাম।"
এই তিনজনের কাছে এত বড় মূল্যবান বাগান একটি তুচ্ছ জিনিস। এর বিপরীতে মানুষ তো মানুষ, এর চেয়ে তুচ্ছ একটি কুকুরের সঙ্গে সম্পর্ক—এটি তার কাছে অনেক মূল্যবান যে, নিজে না খেয়ে কুকুরকে খাইয়েছে। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হল যে, "তুমি না খেয়ে কুকুরকে খাবারগুলো কেন খাইয়ে দিলে?"
উত্তরে সে বলল, "এ কুকুর এখানকার না; বাইরের কোথাও থেকে এসেছে। একটি ক্ষুধার্ত কুকুর আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে আর আমি খাব—বিষয়টি আমার কাছে লজ্জাকর। তাই আমি খাবারগুলো কুকুরকে দিয়ে দিলাম।"
এর পূর্বে বাগান মালিকের কাছে গিয়ে যখন বাগান কিনতে চাইল, মালিকও হয়তো এভাবে ভেবেছে যে, একজন মানুষ আমার বাগান কিনতে চেয়েছেন, আমি না বলি কীভাবে। লজ্জা লাগল, তাই দিয়ে দিলাম।
তো একটি কুকুরের সামনে লজ্জা করছে, নিজে না খেয়ে তাকে খাওয়াচ্ছে। অপরিচিত মানুষের সামনে লজ্জা করছে, এত বড় সম্পদ দিয়ে দিচ্ছে। তো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, এমনকি জীবজন্তুর সঙ্গেও সম্পর্ক—প্রতিটি পদক্ষেপে লজ্জা করা মানবীয় গুণাবলির সৌন্দর্য।
অনেক দিন আগের ঘটনা, চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর হতে পারে। গ্রীষ্মকালে ইউরোপের দেশগুলোতে স্থানীয় লোকসংখ্যা প্রায় কমেই যায় আর বিদেশি লোক বেড়ে যায়। এদিকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে পর্যটক আসা-যাওয়া করতেই থাকে। কিছু মানুষ ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে জাহাজে আসা-যাওয়া করত। আজকাল সরাসরি সড়কপথও হয়ে গিয়েছে। সম্ভবত সমুদ্রের মধ্য দিয়ে টানেল নির্মিত হয়েছে।
তো ওই রকম ছোটখাটো একটি জাহাজে যাচ্ছিলাম। সামনে ছোট্ট একটি টেবিল পাতা। দু-পাশে আমেরিকান দুটি ছেলে বসে রয়েছে। একজনের হাতে চিপসের প্যাকেট আর সে একটু পরপর সেখান থেকে খাচ্ছে। আর অপরজন তার ঠিক উল্টো দিকে বসে আছে। কথাবার্তা বলতে গিয়ে পরিচয় হল। পরিচয় পর্বে জানা গেল, তারা একই জায়গার, একই স্কুলের। এভাবে কথা বলতে বলতে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বও হয়ে গেল। আমি তাদের পাশেই বসে ছিলাম আর তাদের কথাবার্তাগুলো শুনছিলাম; কিন্তু আমি তাদের সঙ্গে কোনো আলাপ করিনি।
তারা গল্প করছে... তাদের একজন কিছুক্ষণ পরপর চিপস খাচ্ছে আর অপরজন দুঃখের কথা বলছে: সে খায়নি; তার টাকা হারিয়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এদিকে অন্যজন কেবল শুনছে আর "আহ্, আহ্" করছে যে, বড় দুঃখের কথা; কিন্তু তার হাত থেকে পটেটো চিপস দিচ্ছে না। তার হাতে প্যাকেট ভর্তি চিপস, একটু দিলেই বেচারার দুঃখ শেষ হয়ে যায়। আসল কথা হল, একজন ক্ষুধার্তকে খাবার দিতে হয়—এই বোধটিই তার নেই।
আমি তাকে কৃপণ বলব না। কেউ যদি তাকে বলত যে, সে ক্ষুধার্ত; তার কষ্ট হচ্ছে, তাকে খাবার দাও—তখন হয়তো সে তার হাত থেকে চিপস দিত; কিন্তু নিজ থেকে এ বোধটি তার নেই। তার খেয়ালই হচ্ছে না। এই অনুভূতিহীনতা যে সবসময় এ রকমই ছিল—তাও নয়। ওই আমেরিকাতেই একশ-দুইশ বছর পূর্বে এ রকম অবস্থা মোটেও ছিল না। এখনও যে সবাই এ রকম করে—তাও নয়; কিন্তু অনেকেই এমনটি করে।
একটি ব্যবসা করছে। এই ব্যবসায় কিছু দিয়েছে, বিনিময়ে কিছু নিয়েছে। নিজ সৌন্দর্য হারিয়েছে আর বাইরের সৌন্দর্য কিনেছে। প্যারিস ইত্যাদি বেশিরভাগ শহরের রাস্তাগুলো শুধু ঝাড়ু দেওয়া হয় না, পানি দিয়ে ধোয়াও হয়। প্রতিটি শহরে যে পরিমাণ পরিশ্রম তারা রাস্তার জন্য করে থাকে, সে পরিশ্রমের একটুখানি অংশ যদি তারা নিজেদের মনের জন্য করত! তাদের মনোজগত কোথায় কোন আবর্জনাগারে পড়ে আছে, তার কোনো খোঁজখবরই নেই।
আল্লাহ তাআলা আমল দিয়েছেন, দীন দিয়েছেন নিজেকে সুন্দর করার জন্য। কিন্তু তা এমনিতে হয় না। ওই যে বললাম, দুনিয়া উপার্জন করতে চেয়েছে, বিলাসিতা করতে চেয়েছে। এখন এই বিলাসিতার জন্য তার ছেলেকে হারানো উদ্দেশ্য ছিল না; মাকে হারানোও উদ্দেশ্য ছিল না। অর্থাৎ সন্তানকে কোনো শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে ফেলে রাখব, মা-বাবাকে বর্জ্য ফেলার স্থানে রেখে আসব—এটি তার উদ্দেশ্য নয়। তার লক্ষ্য হল সম্পদ আর বিলাসিতা। আর ওই বিলাসিতা আনতে গিয়ে এই বন্ধন ছুটে গেছে; সেই বন্ধন ধরে রাখা যায়নি।
অপরদিকে যে ওলি-আল্লাহর কথা বলা হল যে, মুহূর্তের মধ্যে বিরাট বাগান তিন হাত ঘুরে গেল। অর্থাৎ বাগানটি আগের মালিকের কাছে ছিল; নতুন ক্রেতা কিনল। অতঃপর মালিকে দান করে দিল। মালি আবার সেটি তার আগের মালিককে দান করে দিল। এত বড় সম্পদ কিছুক্ষণের মধ্যে তিন হাত ঘুরে গেল। আর তাদের মধ্যে একটা ভালোবাসার সম্পর্ক আগেই ছিল, সেটি আরও গভীর হল।
ওই মালি আর আগের মালিকের মধ্যে আগে থেকেই একটি ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। অতঃপর যখন মালি সেই বাগান তার আগের মালিককে দান করে দিল এবং নিজেও মালিকের কাছে দান হয়ে গেল, পরবর্তীতে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে যে, আসলে মালি কে আর মালিক কে—তো নির্ণয় করা মুশকিল। যে মালিক তার মালির কাছ থেকে এত বড় হাদিয়া পেয়েছে, সুতরাং এক্ষেত্রে ধনী বেশি কে—তাও নির্ণয় করা মুশকিল। আগেও ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল, এখন তা আরও বেড়ে গেল।
তারা নামে গোলাম-মালিক কিন্তু বাস্তবতা হল, একজন আরেকজনের হয়তোবা উস্তাদ। এমনও হতে পারে যে, ওই বাড়ির বড় কোনো সিদ্ধান্ত, যেমন ছেলের বিয়ে বা ব্যবসা-বাণিজ্য—এ জাতীয় বড় কোনো সিদ্ধান্ত ওই বিশেষ গোলামকে জিজ্ঞেস না করে করা হয় না। এ জাতীয় দৃষ্টান্ত মুসলমানদের জীবনে প্রচুর আছে যে, বহুদিনের বিশ্বস্ত গোলামকে জিজ্ঞেস না করে ছেলের নাম পর্যন্ত রাখা হয় না। সে গোলামকে জিজ্ঞেস করবে যে, ছেলের নাম কী রাখব? তারপর সে যে নাম বলবে, সে নামই রাখবে। মেয়েকে কার কাছে বিয়ে দেব? সে যে পরামর্শ দেবে, তাই করা হবে। অর্থাৎ নামে গোলাম আর বাস্তবে পুরো বাড়ির মালিক সে।
তো আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দীন দিয়েছেন নেক আমলের মাধ্যমে নিজেকে সুন্দর করার জন্য।
## আধ্যাত্মিক ব্যবসা
নিজেকে সুন্দর করতে গিয়ে আমার বাড়ি হয়তো নিম্নমানের হয়ে যাবে। জামাকাপড় হয়তো ছেঁড়া হয়ে যাবে। ছেঁড়া জুতা পরে চলতে হবে। এই ব্যবসার পথও আল্লাহ তাআলা দেখিয়েছেন:
**هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُّنْجِيْكُمْ مِّنْ عَذَابٍ أَلِيْمٍ**
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দীন দিয়েছেন আর এই দীনকে বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসা বলে অভিহিত করেছেন। এই ব্যবসা প্রধানত সম্পদ দেওয়া নয়, বরং সৌন্দর্য নেওয়া বা সৌন্দর্য দেওয়া। বা এই কথা বলা যেতে পারে যে, বাহ্যিক সৌন্দর্য দেওয়া বা হারানোর বিনিময়ে নিজ আত্মিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা।
ব্যবসা একতরফা হয় না। বিনা দামে একটি জিনিস নিয়ে এলাম, এটাকে ব্যবসা বলে না। এটা হয়তো দান, নতুবা চুরি। ব্যবসা হল দুটি ভালোর বিনিময় করা যে, টাকাও ভালো, মাছও ভালো। ভালো টাকা দিচ্ছি, ভালো মাছ কিনছি। অর্থাৎ দুটি ভালোর লেনদেন। বাহ্যিক সুন্দর বাড়ি, সুন্দর জামা—এগুলো কোনো খারাপ জিনিস নয়। বিলাসিতার মধ্যেও একটি আনন্দ আছে। এটাও ভালো জিনিস।
আর আল্লাহ তাআলা যে ব্যবসার কথা বলেছেন সেটি হল, বাহ্যিক জগতের ভালো জিনিস দিয়ে রুহানি জগতের ভালো জিনিস কেনা। আর দুনিয়াতে বাহ্যিক জগতের ভালো জিনিস কিনতে গিয়ে রুহানি জ
ব্যবসা-বাণিজ্যসহ এ জাতীয় বড় কোনো সিদ্ধান্ত ওই বিশেষ গোলামকে জিজ্ঞাসা না করে করা হতো না। এ জাতীয় দৃষ্টান্ত মুসলমানদের জীবনে প্রচুর আছে যে, বহু দিনের বিশ্বস্ত গোলামকে জিজ্ঞাসা না করে ছেলের নাম পর্যন্ত রাখা হতো না। সেই গোলামকে জিজ্ঞাসা করা হতো যে, ছেলের নাম কী রাখব? তারপর সে যে নাম বলত, সেই নামই রাখা হতো। মেয়েকে কার কাছে বিয়ে দেব? সে যে পরামর্শ দিত, তাই করা হতো। অর্থাৎ, নামে গোলাম আর বাস্তবে পুরো বাড়ির মালিক সে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীন দিয়েছেন নেক আমলের মাধ্যমে নিজেকে সুন্দর করার জন্য। নিজেকে সুন্দর করতে গিয়ে আমার বাড়ি হয়তো নিম্নমানের হয়ে যাবে। জামাকাপড় হয়তো ছেঁড়া হয়ে যাবে। ছেঁড়া জুতা পরে চলতে হবে।
এই ব্যবসার পথও আল্লাহ তাআলা দেখিয়েছেন:
**هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ**
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীন দিয়েছেন এবং এই দ্বীনকে বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসা বলে অভিহিত করেছেন। এই ব্যবসা প্রধানত সম্পদ দেওয়া নয়, বরং সৌন্দর্য নেওয়া বা সৌন্দর্য দেওয়া। অথবা এই কথা বলা যেতে পারে যে, বাহ্যিক সৌন্দর্য দেওয়া বা হারানোর বিনিময়ে নিজের আত্মিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা।
## ব্যবসার স্বরূপ
ব্যবসা এক তরফা হয় না। বিনা দামে একটি জিনিস নিয়ে এলাম, এটাকে ব্যবসা বলে না। এটা হয়তো দান, নতুবা চুরি। ব্যবসা হলো দুটি ভালোর বিনিময় করা—টাকাও ভালো, মাছও ভালো। ভালো টাকা দিচ্ছি, ভালো মাছ কিনছি। অর্থাৎ, দুটি ভালোর লেনদেন।
বাহ্যিক সুন্দর বাড়ি, সুন্দর জামা—এগুলো কোনো খারাপ জিনিস নয়। বিলাসিতার মধ্যেও একটি আনন্দ আছে। এটাও ভালো জিনিস। আর আল্লাহ তাআলা যে ব্যবসার কথা বলেছেন, সেটি হলো বাহ্যিক জগতের ভালো জিনিস দিয়ে রুহানি জগতের ভালো জিনিস কেনা।
আর দুনিয়াতে বাহ্যিক জগতের ভালো জিনিস কিনতে গিয়ে রুহানি জগতের সব হারায়। ওই যে বারবার বলছি, ইউরোপীয় সভ্যতার কেউ লক্ষ্য করেনি এবং এটা তাদের লক্ষ্যও ছিল না যে, " আগামী পঞ্চাশ বছর পরে আমাদের দেশের সব শিশু সম্পূর্ণরূপে অবহেলিত হবে।" এ রকম কোনো পরিকল্পনা কেউ কখনো করেনি। অথবা এমন কোনো পরিকল্পনাও পাওয়া যাবে না যে, "পিতা-মাতা বাড়ি থেকে বিতাড়িত হবেন।" এ জাতীয় কোনো পরিকল্পনাও কোনো দেশ করেনি। কিন্তু যে পরিকল্পনা তারা করেছে, সেই পরিকল্পনা অর্জন করতে গিয়ে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে গিয়েছে।
আল্লাহ তাআলাও দীন দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলাও এরকম পরিকল্পনা দেননি যে, দীনের উপর চললে তোমার জামা ছেঁড়া হয়ে যাবে, অর্ধেক বেলা খেতে হবে বা দুই দিনে এক বেলা খাবার জুটবে ইত্যাদি। কিন্তু যে সকল গুণাবলির পথ দেখিয়েছেন, সেসব গুণাবলি অর্জন করতে গিয়ে এগুলো অনেক সময় হয়েই যায়। যে এ পথে চলবে, সে এ পথে চলতে গিয়ে এগুলো মেনে নিয়েই চলতে হবে।
ক্যান্সার আজকাল একটি সাধারণ ব্যাধি হয়ে গিয়েছে। কেমোথেরাপি দিতে হয়। এই কেমোথেরাপির মাধ্যমে কিছু সুস্থতার আশা করা হয়, যদিও সম্পূর্ণরূপে নিরাময়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই কেমোথেরাপি নিলে রোগীর সব চুল পড়ে যাবে, অরুচি হবে, মাথা ঘুরাবে। একটি-দুটি নয়, হাজার ধরনের যন্ত্রণা আসবে। তারপরও রোগী কেমোথেরাপি নিতে রাজি হয়। এই যন্ত্রণাগুলো তার লক্ষ্য নয়, কিন্তু চিকিৎসকরা বলেন এবং সেও ধারণা করে যে, এই কেমোথেরাপির মাধ্যমে আরও দু-চার দিন বেশি হয়তো বাঁচবে। তাই সেও রাজি হয়ে যায়। সুতরাং কিছুর বিনিময়ে সে আরও কিছুদিনের আয়ুর আশা করে, ক্যান্সার নিরাময়ের আশা করে। আর এর বিনিময়ে তাকে কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। মাথার সব চুল পড়ে যাবে, সৌন্দর্য হারাবে, অরুচি হবে—অর্থাৎ সব কষ্ট। এই কষ্টগুলো আমি চাই না, কিন্তু আমি যদি থেরাপি নিই তাহলে আমাকে সব কষ্ট মেনে নিতে হবে।
ঠিক তেমনিভাবে আমি যদি বাইরের বিলাসিতা চাই তাহলে আমার অন্তরকে একেবারে নিঃস্ব বানিয়ে ছাড়তে হবে। আর আমি যদি আমার আভ্যন্তরীণ জগতের সৌন্দর্য চাই তাহলে বাইরের জগতের কিছু বিলাসিতা আমাকে ছাড়তে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের দীন দিয়েছেন। দীনের মাধ্যমে উন্নত অন্তর দান করেন। কেউ যদি উন্নত অন্তর পেয়ে যায় তাহলে তার কাছে এই বাইরের জিনিসগুলো কমে গেলেও এটি ক্ষতি মনে হবে না। এমন একজন আল্লাহওয়ালা পাওয়া যাবে না, যিনি দুঃখ করছেন, "হায়! আমি ধনী ছিলাম, এখন গরিব হয়ে গিয়েছি।"
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে একাধিক রাজকুমার ছিলেন। যেমন ফিরোজ দায়লামী নামের একজন, ওয়াইল ইবনে হুজর নামের একজন, এ ছাড়াও আরও বাদশাহ বা রাজকুমার ছিলেন। মুসলমান হওয়ার পর তারা একেবারে সাধারণ মানুষ হয়ে গিয়েছেন। যারা কিছুদিন আগেও রাজকুমার ছিলেন, এখন সাধারণ মানুষ। নিজেদের আগের দিনের সাথে বর্তমান দিনের তুলনা করে আল্লাহর নিকট মনভরে শুকরিয়া আদায় করতেন। দু'দিন আগে আমি রাজকুমার ছিলাম, এখন আমার কিছুই নেই, তবুও মনভরে শুকরিয়া আদায় করছেন যে, "হে আল্লাহ! তোমার মেহেরবানি, আমি কোথায় ছিলাম, এখন তুমি আমাকে কোথায় রেখেছ।" অর্থাৎ, দুঃখ তো নেই, বরং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছেন। অথচ তিনি নিজে রাজকুমার ছিলেন আর এখন হয়তো ভালোভাবে পেট ভরেও খেতে পারছেন না। তারপরও তারা শুকরিয়া আদায় করছেন। অর্থাৎ, এই দীন এত বড় সম্পদ যে, যদি হারাতে হয় তবে কেউ হারাতে কোনোভাবেই রাজি হবে না।
সন্তান-স্ত্রী-মা-বোন-আত্মীয়স্বজন সবাইকে নিয়ে বড় আনন্দের ভালোবাসার জীবন—এটিকে যে ভালোভাবে জানে, এর বিপরীত ভালোবাসাহীন বিলাসিতার জীবন সম্পর্কেও যদি কেউ জানে তাহলে কেউ এত দাম দিয়ে বিলাসিতা কিনতে রাজি হবে না। কিন্তু মানুষ যেহেতু জানে না, তাই বিলাসিতার জীবন বেছে নেয়।
আল্লাহ তাআলার বড় মেহেরবানি যে, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দীন দিয়েছেন। আল্লাহর পথে বের হয়ে আমরা আমাদের নিজেদেরকে সুন্দর বানানোর চেষ্টা করি। পুরো দুনিয়ার মানুষকে সুন্দরের পথ দেখাই।
যারা তাদের সন্তানকে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে রেখে চলে যায়, সন্তান যখন বড় হবে, তখন সেও মাকে রেখে চলে যাবে। অর্থাৎ মা সন্তানকে রেখে চলে যায়, সন্তানও মাকে রেখে চলে যাবে। তারা যদি জানত যে, এভাবে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে সন্তানকে রাখার প্রয়োজন নেই। আমি আমার সন্তানকে কোলে রাখতে পারি, আমি আমার সন্তানের যত্ন নিতে পারি।
সমাজে কিছু প্রতারণামূলক ব্যবসা আছে, যেখানে ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদিত হয়ে যাওয়ার পরও বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত দাম আদায় করে। ঠিক শয়তানও মায়েদের সাথে এরকম প্রতারণামূলক ব্যবসা করে। এই ইউরোপকে যদি আগেই বলে দিত যে, তুমি বিলাসিতা পাবে ঠিকই, কিন্তু এর বিনিময়ে তোমাকে এই এই জিনিস হারাতে হবে, তাহলে তারাও রাজি হতো না। কিন্তু শয়তান এগুলো গোপন রেখেছিল।
এই বিলাসিতার বদলে কী কী পাবে—এর খুব লোভ দেখিয়েছে, কিন্তু কী হারাতে হবে, এসবকিছু গোপন করেছে। এখন ফিরে আসার কোনো উপায় নেই। কারণ, শয়তানের কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছে। এজন্য এ থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দীনের উপর চলার তাওফিক নসিব করুন। আমিন।
সবাই নিয়ত করি, আমরা দীনের উপর চলব। এই দীনের উপর চলতে গিয়ে কিছু হারাতে হতে পারে, এটি কোনো দুঃখের বিষয় নয়, বরং আমি বড় আনন্দের সাথে মেনে নেব। আল্লাহ তাআলা এত বড় নেয়ামত দিয়েছেন, এর থেকে যদি আমার ছোটখাটো কিছু ছুটে যায়, এটি আমার জন্য কোনো দুঃখের বিষয় নয়।
নিজেকে প্রস্তুত করব। যদি গরিব হই তাহলে শয়তান ভয় দেখাতে পারে যে, তুমি গরিব হয়ে যাবে। না, এমনটি নয়। আল্লাহ তাআলা ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন, আল্লাহ নিশ্চয়ই দেবেন। ইনশাআল্লাহ।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআন জীবিত হয় মুমিনের দিলে
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আলেমদের মজমা তারিখ: ১১ অক্টোবর ২০১০ | স্থান: রংপুর | بِسْمِ اللهِ الرَّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
১০৮৫
কাজ ও আমল: বাস্তবতা ও গায়েবের নিরিখে
الحمد لله نستعينه ونعوذ به من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلله فلا ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
২২৪
নফি ও ইসবাত: দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، فَاعۡلَمۡ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
১৪৮৫
দ্বীনের মূল লক্ষ্য: মাহবুবিয়্যাত অর্জন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] اَلحَمْدُ للهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
২১২৬