সবর ও ইয়াকিনের মাধ্যমে ইস্তিকামাত অর্জনের উপায়
সবর ও ইয়াকিনের মাধ্যমে ইস্তিকামাত অর্জনের উপায়
[ আল্লাহ তায়ালা বান্দার চেষ্টা দেখেন, ফলাফল তার হাতে। অনেক সময় কোনো নবীর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তার উম্মত হেদায়েত পায়নি, আবার কোনো পাপী ব্যক্তির মাধ্যমে অনেকে হেদায়েত পেয়েছে—এটা প্রমাণ করে যে, ফলাফলের ওপর নির্ভর করে মেহনতের সার্থকতা বিচার করা ঠিক নয়। বরং আসল সার্থকতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও কবুলিয়ত।
মানুষ স্বভাবতই যখন কাজের ফলাফল দেখতে পায়, তখন উৎসাহিত হয় এবং কাজ চালিয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃত ইস্তিকামাতের পরিচয় হলো—যখন কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না, তখনও ধৈর্যের সাথে মেহনত চালিয়ে যাওয়া। একেই বলে সবর। আর আল্লাহ তায়ালা সবরকারীদের সাথে আছেন এবং তাদের ভালোবাসেন।
সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো, মেহনত চালিয়ে যাওয়া, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং ইয়াকিন রাখা যে, আমাদের এই মেহনতের মূল্য আল্লাহর কাছে আছে। তিনিই যথাসময়ে এর ফল দেবেন। এটাই ইস্তিকামাত, আর ইস্তিকামতই হলো মুমিনের বড় গুণ।]
(চিল্লার সফর -২০০৭)
৩রা অক্টোবর ২০০৭, ২০শে রমজান, বুধবার, মৌলভীবাজার জেলার কনকপুর বাজার জামে মসজিদে তারাবির নামাজের পর ওই সকল সাথির মজমায় স্যার এ আলোচনা করেন, যারা দিনের বেলায় বিভিন্ন সময় গাশতে গিয়েছিল। সেই গাশতের এবং উসুলের কারগুজারি গুনার পর কিছু তারগিবি কথাও পেশ করেন
আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই শয়তানের থেকে, পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহ কারো ওপর তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।
আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরিফ প্রায় সম্পূর্ণই জিবরিল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে রাসুল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পাঠিয়েছেন। কুরআন শরিফের কিছু কিছু অংশ আল্লাহ তায়ালা নিজেই রাসুল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে দিয়েছেন। মেরাজের সময় আল্লাহর আরশে, আরশের মধ্যে একটা বিশেষ ভান্ডার আছে, ওখান থেকে এই আয়াতগুলো আল্লাহ তায়ালা জিবরিল আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে নয়, রাসুল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে আল্লাহ তায়ালা নিজেই মেরাজের সময় দিয়েছেন। সেসব অংশের মধ্যে সুরা বাকারার শেষ অংশও আছে, আরও কিছু অংশ আছে, আর ওই অংশের মধ্যে এই আয়াতও আছে, "لَا يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا" - বড়ই রহমতের কথা যে, আল্লাহ তায়ালা কোনো বান্দাকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব দেননি। "لاَ تُكَلَّفُ إِلاَّ نَفْسَكَ وَحَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ" - তোমার ওপরই তোমার দায়িত্ব, মুমিনদেরকে শুধু উৎসাহ দেও। হেদায়েতের ব্যাপারেও ওই কথা। "يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لاَ يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ" - তোমার ওপর তোমারই দায়িত্ব, তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যদি তুমি নিজে হেদায়েতের ওপর থাকো।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে মেহনতের দায়িত্ব দিয়েছেন, পরিণতির দায়িত্ব দেননি। এটা আল্লাহ তায়ালার বহুত বড় মেহেরবানি। কারণ, কোনো ব্যাপারেই পরিণতি মানুষের হাতে রাখেননি, চেষ্টা তার হাতে রেখেছেন। একজন কৃষক বীজ বপন করতে পারে, সার দিতে পারে, পানি দিতে পারে, ফসল হওয়া না-হওয়া ওটার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আল্লাহ যদি দেন তো ফল আসবে, যদি না দেন, তো ফল আসবে না, করার কিছু নেই। ওই রাজশাহী, ওদিকে খুব আমবাগান আছে, কোনো বছর খুব ফলন হয় আর কোনো বছর দেখা যায় যে, মুকুল আসেনি, শুধু পাতা এসেছে। পাতায় গাছ ভরে গেছে, মুকুল নেই। তো এখন কাকে কী বলবে? এই পাতা আসার কী দরকার? আমার তো মুকুলের দরকার, আমের দরকার। কিন্তু ওই গাছই, যে গাছ গত বছর খুব ভালো ফসল দিলো, অনেক আম পাওয়া গেল। ওই গাছ এবার শুধু পাতা দিচ্ছে। তো আল্লাহ তায়ালা কোনো ব্যাপারেই ফলাফল মানুষের হাতে রাখেননি। চেষ্টা বান্দার, ইচ্ছা আল্লাহর। আল্লাহ তায়ালা যখন যেটা চান তাকে তা দান করবেন।
দ্বীনের মেহনতের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা ওই একই কথা দিয়ে পাঠিয়েছেন। এ জন্যে দৃষ্টান্ত রেখেছেন, কোনো কোনো নবী এরকম আছেন যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের বড় উম্মত দিয়েছেন, উম্মতের মধ্যে বড় প্রসার হয়েছে, বড় বরকত হয়েছে, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম, মুসা আলাইহিস সালাম, ঈসা আলাইহিস সালাম আর সব শেষে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আল্লাহ তায়ালা উম্মতের মধ্যে হেদায়েত দিয়েছেন আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের মধ্যে হেদায়েত ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তায়ালা কেয়ামত পর্যন্ত জারি রাখবেন। আল্লাহর আরও নবী আছেন, যারা মকবুলিয়াতের দিক থেকে মোটেই কম না, আল্লাহর কাছে খুব মকবুল, কিন্তু উম্মতের মধ্যে হেদায়েত আসেনি। নুহ আলাইহিস সালাম, লুত আলাইহিস সালাম, মরতবা তাদের মোটেই কম নয়, আল্লাহর কাছে খুব মকবুল, কিন্তু উম্মতের মধ্যে হেদায়েত আসেনি। তো নবীর মকবুলিয়ত ওই উম্মতের হেদায়েত আসা না-আসার মধ্যে নয়; বরং তাঁর নিজ চেষ্টা আর চেষ্টার সিফতের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা দেখতে চান কেমন করে তুমি করো, "فَيَنظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُونَ" এখন আল্লাহ তায়ালা দেখতে চান তুমি কেমন করে করো, তোমার চেষ্টা কীরকম, এটা আল্লাহ তায়ালা দেখে পছন্দ করেন। ফলাফল তো আল্লাহর হাতে।
"وَإِنَّ اللَّهَ لَيُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ" আল্লাহ তায়ালা এই দ্বীনের সাহায্য তো ফাজির ব্যক্তির দ্বারাও করেন। একদিকে নবী মেহনত করলেন আর হেদায়েত এলো না, অপরদিকে একজন ফাজির ব্যক্তি, আর তার মাধ্যমে অনেক হেদায়েত হয়ে গেল। তো হেদায়েত হওয়া না-হওয়া ওটার ওপর অন্যের মকবুলিয়ত নির্ভরশীল নয়। আল্লাহ যদি কোনো একজনকে কবুল করেন, তো আল্লাহ তায়ালা কবুল করবেন; আল্লাহ তায়ালা চাইলে তাকে হেদায়েতের উপলক্ষ্য বানাবেন, চাইলে উপলক্ষ্যে বানাবেন না, ওটা ভিন্ন জিনিস। আর উপলক্ষ্য তো আল্লাহ তায়ালা ফাজির ব্যক্তিদেরকেও বানাতে পারেন, আমাদের কাজ চেষ্টা করা। নবীদের বড় একটা সিফত হচ্ছে আল্লাহর কাছ থেকে কবুলিয়তের আশা করা, পরিণতির আশা নয়। কবুলিয়তের আশা, দুটো ভিন্ন জিনিস।
দুনিয়ার মেহনত যেগুলোকে বলা হয়, ওই মেহনতের সামনের লক্ষ্য হলো একটা বিশেষ পরিণতি সে চায়। রোগীর চিকিৎসা করা হলো, রোগী ভালো হলো, তার চিকিৎসা সার্থক; ভালো হলো না, চিকিৎসা ব্যর্থ। ব্যবসা করল, লাভ হলো তো ব্যবসা সার্থক; লাভ হলো না, ব্যবসা ব্যর্থ। কৃষিকাজ করল, ফসল পেল, তার কাজ সার্থক হলো, ফসল পায়নি, চেষ্টা বৃথা গেল, খামাখাই এত পরিশ্রম এত টাকা গেল, গেল ওই কথাই বলে। দ্বীনের ব্যাপারে কোনো ফলাফলের ওপরে নয়, আল্লাহ যদি কবুল করেন তবে সার্থক, আল্লাহ যদি কবুল না করেন তবে বরবাদ। মেহনত করলেন লাখো-কোটি মানুষ হেদায়েত পেয়ে গেল, কিন্তু যিনি মেহনত করেছেন তার মেহনতকে আল্লাহ যদি কবুল না করেন, তো এই লাখো-কোটি মানুষের হেদায়েত পাওয়াতে মেহনত করনেওয়ালার নিজের কোনো লাভ হবে না। আর অপরদিকে যিনি মেহনত করেছেন, তার মেহনতকে আল্লাহ তায়ালা কবুল করলেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা অন্যের হেদায়েতের উপলক্ষ্য তাকে বানালেন না, তো তাদের এই উপলক্ষ্য না হওয়াতেও তাদের কোনো ক্ষতি হবে না, "لاَ يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ" - যারা গোমরাহ হয়েছে তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যদি তুমি হেদায়েতের ওপর থাকো। আল্লাহ তায়ালার বড় মেহেরবানি, তো আল্লাহ তায়ালা যে বড় মেহেরবানি করে আমাদের একটা কাজের উপলক্ষ্য করে আমাদের এখানে আসার তাওফিক দান করেছেন, আমরা যতটুকু পারি, এটা যে একটু মেহনত করতে পারছি, আল্লাহর কাছে শোকর আদায় করা। যেটার জন্যে দুঃখিত হওয়া আফসোস করা, এটা নয় যে তাশকিল হলো না-বা কী, আর হলো না-বা কী, আমার তো আল্লাহর কাছে আমি মকবুল হতে পারলাম কি পারলাম না। তো এ জন্যে মেহনত করতে থাকা আর আমি আমার জ্ঞানমতো তো ভালোই চাব; কিন্তু হবে তো ওটা, যেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। আর একজন ঈমানদারের সিফত যে আল্লাহর ফয়সালার ওপর তার সন্তুষ্ট হওয়া, নিজের দুর্বলতার ওপর তার আফসোস করা, ইস্তেগফার করা। যেগুলো ভালো, ওগুলো আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন; আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা।
"وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ" ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলছেন, আমি যদি অসুস্থ হই তাহলে আল্লাহ তায়ালা আমাকে সুস্থ করেন। বলুন, কবে কোন রোগী ওষুধ খায় অসুস্থ হওয়ার জন্যে? ইবরাহিম আলাইহিস সালাম সুস্থ হওয়ার জন্যে চেষ্টা করেছেন। একজন অসুস্থ রোগী সুস্থ হওয়ার জন্যে চেষ্টা করে। কিন্তু বলছেন উলটো। আমি যখন অসুস্থ হই আল্লাহ তায়ালা আমাকে ভালো করেন। মানুষের মনে হবে যে, অসুস্থ তো আল্লাহ করে আর সুস্থ আমি হই। মানুষের কাছে মনে হবে যে, অসুস্থ তো আল্লাহ করে আর সুস্থ আমি হই। আর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলছেন তার উলটো যে, অসুস্থ আমি হই আর সুস্থ আল্লাহ করেন। সুন্দর যা কিছু আল্লাহর মেহেরবানি, ভুলত্রুটি যেগুলো আমার পক্ষ থেকে; এ জন্যে আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া, ইস্তেগফার করা। তো আমি যেভাবে চাব সেভাবেই হয়ে যাবে তাও নয়, যেভাবে আল্লাহ তায়ালা দেন তার ওপর সন্তুষ্ট হওয়া; আর এর মধ্যে বড় হেকমত আছে। আমরা বড় দুর্বল, একটা মেহনত করলাম, মেহনত আমি যেভাবে করছি, যেভাবে চাই, সেভাবেই যদি ফলাফল হয়ে যায়, অনেক সময় শয়তান আমাদের ভেতর ওজোব ঢুকায় আত্মতুষ্টি; অর্থাৎ আমিই করলাম। আর এটা আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন না। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বদরের ময়দানের একজন সাহাবি ধরে এনেছেন আর এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পেশ করছেন যে, তাঁকে আমি ধরে এনেছি। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তিনি নন, অন্য একজন লোক খুব বিশাল শক্তিশালী, সে ধরে এনে হাতে দিয়ে দিয়েছে, ফেরেশতা ধরে বেঁধে দিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু এই আনসারি দেখেননি। কাফিররা ফেরেশতাদেরকে দেখেছে, মুসলমানরা দেখেনি বদরের ময়দানে। তাঁর ধারণা যে তিনিই করেছেন। তিনি বলছেন যে, আমিই এনেছি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মুখে হাত দিয়ে দিলেন, "أيدك الله بالملك الكريم". আল্লাহ তায়ালা একজন মেহেরবান ফেরেশতা দিয়ে তোমাকে সাহায্য করেছেন। তো আমি করেছি এ কথা আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন না, বলতেও দেননি। অনেক সময় ভুলের মধ্যে আমাদের বের হয়ে যায়। মুসা আলাইহিস সালামকে কেউ জিজ্ঞেস করল যে, আপনি-ই সবচেয়ে জাননেওয়ালা ব্যক্তি, না কি সবচেয়ে বেশি ইলমওয়ালা? নবী হিসেবে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ইলম দিয়েছেন; বড় শুদ্ধ কথা যে নবীরই তো বেশি ইলম থাকে। তিনি বললেন যে, হ্যাঁ আমিই সবচেয়ে বেশি ইলমওয়ালা। আল্লাহ তায়ালা বললেন, না, তোমার চেয়ে বেশি জাননেওয়ালা আরেকজন আছে। তখন তাঁর সন্ধানে বের হলেন। খিজির আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিস্সা তো আমাদের সবার জানা। তিনি আল্লাহর বিশেষ নবী ছিলেন। আল্লাহ তাকে বিশেষ ইলম দিয়েছিলেন।
আমাদের মধ্যেও অনেক সময় এমনটা ঘটে। আমরা মেহনত করি, চেষ্টা করি, আর তাশকিলও হয়ে গেল, তখন শয়তান ধোঁকা দেয় যে, তুমি মেহনত করে জামাতকে বের করেছ। জামাত বের হওয়াতে যে ফায়দা হলো, তার চেয়ে বহুত বেশি লোকসান হয়ে গেল আমার এই ওজোব-এর কারণেঃ আমি করেছি। তো আল্লাহ তায়ালা বড় মেহেরবানি করে আমাদের মেহনতকে পর্দার আড়ালের মধ্যে রাখেন; ফায়দা তো দেন ঠিকই, কিন্তু এমনভাবে আড়ালে ফায়দা দেন, যাতে আমার মধ্যে এই কথাটা শয়তান উসকাতে না পারে যে তুমি করেছ। মেহনত করলে আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই ফায়দা দেবেন। "إِنَّ اللَّهَ لاَ يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ" . আল্লাহ তায়ালা নেক আমল করনেওয়ালাদের পরিশ্রমকে নষ্ট করেন না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তারই হেফাজতের জন্যে সে যেভাবে তার ফায়দাকে চায়, যখন চায়, আল্লাহ তায়ালা তারই মঙ্গলের জন্যে সেভাবে দেন না; অন্যভাবে অন্য সময় দেন। কারণ, যদি সে সরাসরি দেখে যে ফায়দা পাচ্ছি, তার মনে আসে আমি করলাম; বড় ভয়। আল্লাহ তায়ালা বড় মেহেরবান, বড় হেকমতওয়ালা, কার কীসে ফায়দা, কার কীসে লোকসান আল্লাহ তায়ালা বেহতর জানেন। আর মেহনতের ওপর মজবুতি এটাও চায়, কেউ যখন কোনো একটা মেহনত করে আর ফায়দা পায়, তো সেই মেহনত করতেই থাকে। কিন্তু মজবুতি তো তখন আসে যে, লাভ হচ্ছে না তবুও সে করে যাচ্ছে। লাভ দেখলে তো উৎসাহ পায় আর সে চলতে থাকে। ব্যবসার লাভ হচ্ছে ব্যবসা করে যাচ্ছে; তো কোনো ব্যবসায়ী পাওয়া যাবে না যে লাভের সময় ব্যবসা ছেড়ে দেয়। পাওয়াই যাবে না, লাভ দেখলে সে তো ব্যবসা করতেই থাকে। কিন্তু মজবুতি তখন আসে যে, লাভ হচ্ছে না তবুও সে করে যাচ্ছে। লাভ হচ্ছে না তবুও সে করছে, তাহলে সে হলো সবর ওয়ালা। আল্লাহ তায়ালা সবরওয়ালাকে বড় পছন্দ করেন। "إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ" আল্লাহ তায়ালা সবরওয়ালার সাথে আর সবর ওই একই জিনিস, ফায়দা হচ্ছে না তবুও লেগে থাকে এটা হলো সবর। ফায়দা হচ্ছে তো সে উৎসাহ পায় আর সে চলতে থাকে। ফায়দার সময় কে না লেগে থাকে। ফায়দা দেখলে তো উৎসাহ পায় আর সে চলতে থাকে। ফায়দা হচ্ছে না তবুও সে করছে, তখনই সবরের প্রয়োজন হয়। আল্লাহ তায়ালা সবরওয়ালাকে বড় পছন্দ করেন। "إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ" আল্লাহ তায়ালা সবরওয়ালার সাথে আর সবর ওই একই জিনিস, ফায়দা হচ্ছে না তবুও লেগে থাকে। সবর। ফায়দা দেখলে সে ছাড়ে না। ফায়দার সময় লেগে থাকে। ফায়দা হচ্ছে না তবুও লেগে থাকা এটাই সবর। এখন আপনি কীভাবে এই অবস্থায় পৌঁছাবেন যে, লাভ হচ্ছে না তবুও মেহনত করে যাচ্ছেন? এজন্যে দরকার ইয়াকিন ও তাওয়াক্কুল। ইয়াকিন মানে নিশ্চিত বিশ্বাস যে, আল্লাহর কাছে এ মেহনতের মূল্য আছে। আর তাওয়াক্কুল মানে আল্লাহর ওপর ভরসা যে, তিনি যখন চাইবেন তখনই এর ফল দেবেন। আর আল্লাহ তায়ালা ইয়াকিন ও তাওয়াক্কুলওয়ালাদের ভালোবাসেন। তিনি বলেন, "إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ" – আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন। আর যারা তাঁর ওপর ভরসা রাখে, তাদের তিনি কখনো নিরাশ করেন না।
তো মেহনতের মধ্যে লেগে থাকা, ইয়াকিন ও তাওয়াক্কুলের সাথে লেগে থাকা, এটাই ইস্তিকামাত। আর এ ইস্তিকামাতের ওপর যারা থাকে, তাদের জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ আছে। সুরা হা-মীম সেজদায় আল্লাহ বলেন, "إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلائِكَةُ أَلاَّ تَخَافُوا وَلا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ" ○ "نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ" ○ "نُزُلاً مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ" ○ এই সুসংবাদগুলো দেওয়া হয়েছে ইস্তিকামতওয়ালার জন্যে, তো এ আয়াত ইস্তিকামতের ওপর। আর ইস্তিকামত কী? দৃঢ় থাকা। একটা আমলের ওপর দৃঢ় থাকা বলতে এটাই বোঝায় যে, মেহনত করছে, কোনো কাক্সিক্ষত পরিণতি কিছুই দেখা যাচ্ছে না; কিন্তু সে ছাড়ছে না। কাঙ্ক্ষিত পরিণতি যদি দেখা যায়, তখন তো দুর্বল ব্যক্তিও ছাড়ে না। ওই ফায়দাই তাকে টেনে নিয়ে যায়, দুর্বল মানুষও তখন সাহস পায়। ঠিক যেরকম যুদ্ধ চলছে আর শত্রুপক্ষ পলায়ন করছে আর আমাদের পক্ষ জিতছে, তখন তো কাপুরুষ বড় হিম্মতের সাথে দৌড়ায়, যে যুদ্ধ করেনি, ময়দানের সময় ছিল না। আর শত্রু যখন পেছন দিকে যাচ্ছে, পলায়ন করছে, তো সেও এসে দৌড়াতে আরম্ভ করে। তো ওটাতে ইস্তেকামত প্রমাণিত হয় না। বরং যখন শত্রু জোরে আক্রমণ করছে আর আমরা অগ্রসর হতে পারছি না, তখন যে অটল থাকে, সেটাই ইস্তেকামত। আল্লাহ তায়ালা সবরওয়ালাকে ভালোবাসেন।
তাই আমাদের কর্তব্য হলো, আমরা আমাদের মেহনত অব্যাহত রাখব, ধৈর্যের সাথে, ইয়াকিনের সাথে, আর আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে। আমরা যদি এভাবে মেহনত করি, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ইস্তিকামত দান করবেন। আর ইস্তিকামতই হচ্ছে সবচেয়ে বড় নিয়ামত।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ইস্তিকামতের সাথে মেহনত করার তাওফিক দিন। আমাদেরকে সবর করার তাওফিক দিন। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দিন।
সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা নাশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা নাস্তাগফিরুকা ওয়া নাতুবু ইলাইকা।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
নিভৃতচারী আল্লাহওয়ালাদের খোঁজে
হজরতের গড়া ছোট্ট, অথচ সুন্দর মাদ্রাসা। মাদ্রাসা থেকে এক ছাত্রকে রাহবার হিসেবে সাথে নিয়ে যখন হজরতের ব...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১১৫৯৬
আল্লাহর ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছা: পরিপূর্ণ বান্দা হওয়ার পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: বারিধারা ডি.ও.এইচ.এস. সময়: মাগরিবের পর :১০/০৬/২০০৬ তারিখ أعُوْذ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
২৩৯১
ত্যাগের বিনিময়ে সম্পর্ক: উম্মতের মহব্বতের বুনিয়াদ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: গাউসনগর জামে মসজিদ, ইস্কাটন রোড, ঢাকা তারিখ: ৯ জুন ২০০৬,বেলা:৩.৩...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
২০২৬
কাজ ও আমল: বাস্তবতা ও গায়েবের নিরিখে
দুনিয়ার মানুষ কাজে ব্যস্ত। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন মানুষকে কাজ থেকে সরিয...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৮০৩
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন