বাসিরাতের সাথে দাওয়াত
বাসিরাতের সাথে দাওয়াত
[এখানে দাওয়াতের কাজে 'বাসিরাত' বা দূরদৃষ্টির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বাসিরাত হলো পরিণতি সম্পর্কে আগেই নিশ্চিত জ্ঞান থাকা, যা কঠিন পথকে সহজ করে দেয়। এই দূরদৃষ্টি আল্লাহ নবীদের দিয়েছেন, যাতে তারা জীবনের কঠিন পরীক্ষাগুলো মোকাবিলা করতে পারেন।
উদাহরণ হিসেবে ইউসুফ (আ.)-এর কথা বলা হয়েছে—শৈশবে দেখা স্বপ্নের মাধ্যমে তিনি জানতেন, শেষ পর্যন্ত তার সামনে সিজদা করা হবে। এই জ্ঞানের কারণে কুয়ায় নিক্ষেপ, গোলামি, কারাবাস—সব কষ্ট তার জন্য সহজ হয়ে গিয়েছিল। মুসা (আ.)-কেও সূরা কাসাসের শুরুতে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে তিনি ও বনি ইসরাইল বিজয়ী হবেন, আর ফেরাউন পরাজিত হবে। এই নিশ্চয়তার কারণেই তার জীবনের সব সংকট সহজ হয়েছে।
আধুনিক প্রসঙ্গে প্যারাট্রুপারদের প্রশিক্ষণের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে—তাদের বারবার শেখানো হয় যে প্যারাসুট খুলবে, তারা নিরাপদে নামবে। এই বাসিরাতের কারণেই তারা প্লেন থেকে লাফ দিতে সাহস পায়। অনুরূপভাবে, রাসুল (সা.)-কে মক্কায় নির্যাতনের সময় সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছিল যে এই দ্বীন সারা পৃথিবীতে পৌঁছাবে—এমন কোনো ঘর নেই যেখানে কালিমা প্রবেশ করবে না। এই পরিণতি জানার কারণেই তিনি সব কষ্ট সহ্য করেছেন।
মূলকথা হলো, দাওয়াতের কাজে হতাশা আসে তখনই যখন মনে হয় 'খামোখা করছি'। কিন্তু যদি পরিণতি সম্পর্কে বাসিরাত থাকে, তবে সব কষ্ট সহজ হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা যায়।]
আল্লাহ তাআলা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াতের কাজ দিয়ে পাঠিয়েছেন, আর এই দাওয়াতের কাজের বড় একটা বৈশিষ্ট্য হল- বাসিরাতের সাথে করা। দূরদৃষ্টি। আর এই দূরদৃষ্টি দিয়ে আল্লাহ তাআলা নবীদের কঠিন কাজকে সহজ করে দিয়েছেন। সূরা ইউসুফের মধ্যে ইউসুফ আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পূর্ণ জীবন, আর এই জীবনের কষ্ট, মুজাহাদা, আখলাক ইত্যাদি বিভিন্ন কঠিন অবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। ভাইয়েরা উনার সাথে কেমন করে হিংসা করল, উনাকে নিয়ে গেল, কষ্ট দিল, কূয়ায় ফেলে দিল। বিক্রি হলেন, গোলাম হিসেবে খাটলেন, তারপর জেল হয়ে গেল। জেল থেকে বের হলেন, তারপর আবার ওখানে মন্ত্রী হলেন। ঐ ভাইয়েরা উনার কাছে নত হয়ে এল কিন্তু প্রতিশোধ নিলেন না, মাফ করে দিলেন। আর এইসব জিনিস দেখালেন কঠিন অবস্থার ভেতর দিয়ে। আল্লাহ তাআলা এই সব কঠিন কাজগুলো উনার জন্য সহজ করে দিয়েছেন প্রথম দিকের একটা কথা বলে যে স্বপ্ন (ইউসুফ আ:), স্বপ্ন দেখেছিলেন ‘আমি দেখলাম তারকাগুলো আর সূর্য- চন্দ্র আমার কাছে এসে সিজদা করছে।’ আর উনার বাবা যিনি যিনি একজন নবী; তিনি তার (স্বপ্নের) তাবির করলেন। নবীর তাবির তো শুদ্ধই। পরিণতি সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা উনাকে প্রথমেই জানিয়ে দিলেন, একেবারে শৈশবে। শেষপর্যন্ত এইটাই হবে। ঐ পরিণতি জেনে নেওয়ার কারণে মাঝখানের সব কাজ সহজ হয়ে গেল। উনাকে কুয়াতে ফেলে দিচ্ছে, তাদের (ভাইদের) ধারণা তাকে (ইউসুফ আঃ) কে মেরে ফেলবে। উনি যদি এই কথা জানেন, আর জানেন নিশ্চয়ই, যেহেতু বলে দেওয়া হয়েছে- উনাকে রাজ সিংহাসনে পৌঁছানো হবে। তো উনার জন্য এই কুয়াতে ফেলে দেওয়া- মোটামুটি ভাবে বলা যেতে পারে যে রাজ বাড়ীতে যেতে হলে এই আগে কুয়াতে আগে গোসল করতে হবে! এই জাতীয় জিনিসই কিছু একটা। কারণ ঐটা তো জানেন। আর মানুষের ভয় পরিণতির কারণে হয়, অবস্থার কারণে নয়।
আর্মি ইত্যাদিতে একটা অংশ আছে, প্যারাট্রুপারস বলে, প্যারাসুট দিয়ে প্লেন থেকে লাফ দিয়ে পড়ে। সবাই যেতে রাজি হয়না, যারা আগ্রহী তারাই শুধু যায়। উদ্ভুদ্ধ করা হয়, যে উৎসাহী তাকে নেওয়া হয়, ট্রেনিং দেওয়া হয়। এরপর এক পর্যায়ে গিয়ে তাকে ট্রেনিং ইত্যাদি দেওয়ার পর বাস্তবেই লাফ দেওয়ানো হয়। উড়ন্ত প্লেন থেকে লাফ দিয়ে পড়বে, সহজ ব্যাপার নয়! আর প্যারাসুট আছে ঠিকই কিন্তু প্যারাসুট তো পিঠে বন্ধ। ঐটা যদি খোলা থাকতো তাও একটু সাহস পাওয়া যায়। আর বলা হয়েছে যে লাফ দিলে পরে খুলবে। যদি না খুলে? তারপরেও আবার বাংলাদেশি ব্যাপার! সরকারি জিনিস, কিনা কি হয়! কত কথা আছে! যদি না খুলে! কিন্তু লাফ দেয়, এজন্য লাফ দেয় যে তাকে এই ব্যাপারে বাসিরাত দেওয়া হয়েছে, বিভিন্নভাবে। বিভিন্ন কথার মাধ্যমে, বিভিন্ন ছবি দেখানোর মাধ্যমে, অন্যের লাফ দেওয়া দেখানোর মাধ্যমে তার ভিতরে এই বাসিরাত আগে আগে জাগানো হয়েছে যে ‘তুমি পড়বে না’। দ্রুত পরবেনা, পাথরের মত পড়বে না। প্যারাসুট খুলে যাবে আর আস্তে আস্তে গিয়ে নামবে। এই পরবর্তী কথা অগ্রিম জানানো হয়, আর ঐ অগ্রিম জানানোর নাম ট্রেনিং। লম্বা ট্রেনিং দিয়ে মাত্র একটা কথা তার মনের ভিতরে ঢুকানো হয়েছে যে ভয় পাওয়ার নয়। ট্রেনিং হয়েছে অনেকদিন, বিভিন্নভাবে। তো সব ট্রেনিংয়ের সারকথা ঐ একটা বাসিরাত যে লাফ দিতে যেন সাহস পায়।
ইউসুফ আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সব কথা আল্লাহ তাআলা একটা জিনিস দিয়ে প্রথমেই সহজ করে দিয়েছেন যে শেষ কথা কিন্তু সবাই সিজদা করবে তোমাকে। এটা হল ফাইনাল কথা। এর আগে যা কিছু হয়- ঐটা তো উনার জানা আছে। ঐ জিনিস জানা থাকার কারণে; কুয়াতে ফেলে দিচ্ছে, তাও কিছু নয়। বাজারে বিক্রি হচ্ছেন, তাও কিছু নয়। গোলাম হয়ে ওদের গোলামী করলেন - তাও কিছু নয়। জেল খাটলেন, তাও কিছু নয়। কারণ শেষ একটা কথা জানেন।
সূরা ক্বাসাসের মধ্যে মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পূর্ণ জীবনি দেওয়া দেওয়া আছে। সূরার আরম্ভতেই বলা হয়েছে যে ‘আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্ত মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আর বনী ইসরাঈলকে আল্লাহ তাআলা আবার উপরে উঠাবেন, আর ফেরাউন এবং হামানকে আল্লাহ তাআলা নিচে নামাবেন’। আর ইনাদেরকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করবেন আর তাদেরকে ইমাম বানাবেন। সূরা কাসাসের একেবারে প্রথম আয়াতের দিকে এই ঘোষণাগুলো দেয়া আছে। এরপরে থেকে মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেমন করে নদীতে ফেলে দেয়া হলো, আর ফেরাউন কেমন করে উঠালো, আর তারপরে উনাকে একটা মানুষের কতলের জন্য উনার কতলের ফয়সালা হলো, উনি দেশ ত্যাগ করলেন। পালালেন, কষ্ট করলেন- সব লম্বা কিসসা। কিন্তু ফাইনালটা আল্লাহ তাআলা আগেই বলে দিয়েছেন। মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ঐ ফাইনাল জানার কারণে সব জিনিস সহজ। জানেনই তো!
নৈরাশ্যের কারণে মানুষের (মধ্যে) দুর্বলতা আসে যে ‘এগুলো খামোখাই করছি’! যদি এই কথা মনে হয় যে খামোখাই করছি, ঐ খামোখা মনে করাটাই তার অন্তরের মৃত্যু। আর যদি মনে করে যে খামোখা নয়, একটা ফল ধরবে, ফুল ফুটবে, ফল বেরোবে- তো শেষ পর্যন্ত সে লড়তে পারবে।
রাসূল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাতে দাওয়াত দিচ্ছেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় থুতু দিচ্ছে! ঐসময় সম্ভবত হযরত যয়নব রাঃ বা ফাতেমা রাঃ হতে পারেন; উনার মেয়েদের মধ্যে কেউ এসেছেন। আর এসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই অবস্থা দেখে খুব ব্যথিত, চোখে পানি হয়তো পড়ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটু সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, পানি দিয়ে চেহারা ধুয়ে দিলেন। বালু ফেলেছে, থুতু ফেলেছে, চেহারা ধুয়ে দিলেন আর উনি মনের কষ্টে কাঁদছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সান্তনা দিলেন যে তুমি দুঃখ করো না। আর কী বলে সান্ত্বনা দিলেন? ‘এমন কোন কাঁচা বা পাকা ঘর নেই, যেই ঘরের ভিতরে এই কালেমা ঢুকবেনা।’
بِعِزِّ عَزِيزٍ أَوْ بِذُلِّ جَلِيلٍ
সম্মানিতকে (আরো) সম্মানিত করে বা অপদস্তকে (আরো) অপদস্ত করে, কিন্তু কালিমা এটা ঢুকবেই। এই জাতীয় ঘটনা কয়েকবার হয়েছে। আরেকবার বলেছেন- ‘এমন কোন জায়গা নেই যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায়, আর এই কালেমা পৌঁছাবে না।’ পৌঁছাবেই! এই কথা আল্লাহ তাআলা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, এইটাই উনার বাসিরাত। এই বাসিরাতের পরে বাকি সবকিছু আল্লাহ সহজ করে দিয়েছেন।
...............….............
*বয়ান:* বাসিরাতের সাথে দাওয়াত
> *মাজালিসে মুশফিক আহমাদ রহ:* চতুর্থ খন্ডে প্রকাশিত হবে ইনশাআল্লাহ।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
আল্লাহর হাতে সোপর্দ: দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের পথ
ছোট বাচ্চাকে নিয়ে মা-বাবা সফর করছেন। সফরে ট্রেনের ঝামেলা ইত্যাদি নানান অসুবিধায় মা-বাবা পেরেশান! ব...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৯৯৮
অনলাইন দাওয়াহ
অনলাইনে দাওয়াহর মূল উদ্দেশ্য কী? মূল টার্গেট অডিয়েন্স কারা? লেখালেখিসহ অন্যান্য কন্টেন্টের কোন উদ্...
আসিফ আদনান
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১৬২২৩
জরুরত - মানুষের প্রয়োজন ও ইবাদত
আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৬৮৭
দ্বীনের মূল লক্ষ্য: মাহবুবিয়্যাত অর্জন
আল্লাহ তাআলা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন পাঠালেন পুরো দুনিয়ার হেদায়েতের জন্...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
৪১৪৪
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন