ফকিরি — আল্লাহর দান লাভের পূর্বশর্ত
ফকিরি — আল্লাহর দান লাভের পূর্বশর্ত
[আল্লাহর বিশেষ দান, সাহায্য ও নৈকট্য লাভের পূর্বশর্ত হলো ‘ফকিরি’—অর্থাৎ দুনিয়ার দৃষ্টিতে অসহায়, অপদস্থ ও আল্লাহমুখী অবস্থায় পৌঁছানো।
আল্লাহ যাকে বড় কিছু দিতে চান, তাকে প্রথমে ফকির বানিয়ে নেন। হাজেরা ও ইসমাইল (আ.) পানির অভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হয়ে মুযতার (পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাওয়া) অবস্থায় পৌঁছার পরই পেলেন জমজম।
মুসা (আ.) একমাত্র সম্পদ লাঠি হারিয়ে গোলামের মতো নিঃস্ব হওয়ার পর পেলেন মুজিজার লাঠি। বদর যুদ্ধে সাহাবারা সংখ্যা ও অস্ত্রে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় ছিলেন বলেই এলো আল্লাহর বিশেষ নুসরাত। সালমান ফারসি (রা.) হেদায়েতের সন্ধানে গিয়ে ক্রীতদাসে পরিণত হওয়ার পরই পেলেন রাসূল (সা.)-এর সান্নিধ্য।
আল্লাহর নিয়ম হলো—বান্দা যখন আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো অবলম্বন (কচুরিপানাও) না পায়, তখন তার ডাকাই ‘ইসমে আযম’-এর স্তরে পৌঁছে এবং দানের দরজা খুলে যায়। হাদিসে কুদসিতে আছে, বান্দা নফলের মাধ্যমে এগোলে আল্লাহ তার চোখ-কান-হাত হয়ে যান।
আসল ফকিরি অর্জনের চেষ্টাই আসল বিষয়। নকল ফকিরি হলেও আল্লাহ তা কদর করেন এবং বঞ্চিত করেন না। আল্লাহ আমাদের ফকিরি অর্জনের তাওফিক দান করুন।]
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমাদ রহঃ
স্থান: মাদানীনগর মাদরাসা। চিটাগাং রোড। নায়ায়নগনজ। ঢাকা।
اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَعُوْذُ بِهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ. وَنَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَنَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ.
فَأَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ،
وَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:
কে ফকির? কারণ, আল্লাহর নিকট যারা পায়, এই সিফাত তাদের জন্যই। এজন্য আল্লাহ তাআলা তাঁর দানগুলো যে দান করেন, ফকিরের বিভিন্ন অবস্থার সাথে এই দানগুলোকে জড়িত করেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ
'বদরে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে সাহায্য করেছিলেন, যখন তোমরা অপদস্থ ছিলে।'
তো সাহায্য পাওয়ার জন্য অপদস্থ হওয়া — এটি ফকিরিরই আরেকটি বৈশিষ্ট্য।
ফকিরের দুর্নাম এই যে, সে অপদস্থ হতে থাকে, যলিল হতে থাকে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
أَمَّنْ يُجِيْبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ
আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াতে 'মুযতার্রান' শব্দ ব্যবহার করেছেন। মুযতার কাকে বলে? যে আর কোনো পথ পাচ্ছে না, একেবারে পিঠ থেকে গিয়েছে — এমন মুযতারিব অবস্থায় হারামও হালাল হয়ে যায়। একজন মুহতাজিব হয়ে গিয়েছে; একজন মুযতারিবের জন্য সাধারণ হারামও হালাল হয়ে যায়। সেই সময় তার জন্য পেশাবও হালাল, মদও হালাল — জান বাঁচানোর জন্য। তবে স্বাভাবিক অবস্থায় মদ হালাল ছিল না। তো কেউ যদি ওই মুযতারিব অবস্থায় পৌঁছে, তবে এটি আল্লাহ তাআলার সাহায্য পাওয়ার একটি অবস্থা। আর এগুলো সবই তার ফকিরির বিভিন্ন অবস্থা। আল্লাহ তাআলা যেসব বান্দাদেরকে দেওয়ার ফয়সালা করেছেন, তাদেরকে দেওয়ার আগে ফকির বানিয়ে নেন।
ইবরাহিম আ.-এর উপর প্রথম আদেশ হলো, পূর্ব দেশ অর্থাৎ শাম দেশ — যেখানে তিনি ছিলেন — তা ত্যাগ করে মরুভূমিতে চলে যাওয়া। তাঁর বংশধরকে ফলের রিযিক দেবেন — এটি আল্লাহ তাআলা ফয়সালা করেছেন; কিন্তু ফল পাওয়ার জন্য উপযুক্ত হালাত বানান। মরুভূমিতে যাওয়ার পরে, সালাত কায়েম করার পরে, আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আ.-কে বললেন, এখন তুমি ফলের জন্য দোয়া করো।
وَارْزُقْهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُوْنَ
সুতরাং ফলের দোয়া করানোর আগে ফল পাওয়ার উপযুক্ত অবস্থা বানিয়েছেন। আর এটি, দুনিয়ার মানুষের দৃষ্টিতে যাকে উপযুক্ত অবস্থা বলা হয় — তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
আসবাবের জগতে যদি ফল খেতে হয়, তবে মরুভূমি ত্যাগ করে উর্বর জমিতে যেতে হবে। তাহলে ফল পাওয়ার একটি অবস্থা হবে। এখন ফল ফলাতে পারবে, খেতে পারবে। আর আল্লাহ তাআলা ফল খাওয়ানোর জন্য — তিনি ছিলেন উর্বর ভূমির বাগানের দেশে — তাঁকে পাঠালেন মরুভূমিতে। কারণ, ফল খাওয়াবেন। তো আল্লাহ তাআলা দেওয়ার জন্য তাঁর উপযুক্ত অবস্থান সৃষ্টি করেছেন।
ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা সিদ্ধান্ত নিলেন ইবরাহিম আ. ও তাঁর বংশধরকে এমন এক ঘাট দেবেন, যে ঘাট কিয়ামত পর্যন্ত আবাদ থাকবে এবং শুধু ওই অঞ্চলের মানুষ নয়, পুরো দুনিয়ার মানুষ পানি নিয়ে যাবে; কিন্তু পানি শুকাবে না। অথচ আদম আ.-এর পর থেকে অনেক ঘাট শুকিয়ে গেছে, বে-আবাদ হয়ে গেছে। কোনো স্থান আবাদহীন হয়ে পড়ার বিভিন্ন কারণের মধ্যে এটিও একটি কারণ যে, ওই ঘাটে কেউ আর যায় না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَكَمْ مِنْ قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَىٰ عُرُوشِهَا...
অতীতের সেসব জনপদ, তাদের ঘাটগুলো বে-আবাদ হয়ে গেছে।
কখনো রাজবাড়ি ছিল, এখন ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে, বট গাছ জন্ম নিয়েছে; অথচ একসময় বড় ধুমধাম ছিল, এখন কেউ এর ধারেকাছেও যায় না, বে-আবাদ হয়ে পড়ে আছে। এর মোকাবেলায় আল্লাহ তাআলা ফয়সালা করেছেন যে, ইবরাহিম আ.-কে এমন ঘাট দেবেন, যে ঘাস কিয়ামত পর্যন্ত আবাদ থাকবে এবং ওই ঘাটে শুধু অঞ্চলের মানুষ নয়; বরং পুরো দুনিয়ার প্রান্ত পর্যন্ত ওই ঘাটের পানি নিয়ে যাবে। কিন্তু ওই ঘাট পাওয়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশের দরকার। উপযুক্ত পরিবেশ কী? সেটি হলো, হাজেরা আ. ও ইসমাইল আ. মরুভূমির মধ্যে ছটফট করতে করতে পানির অভাবে প্রায় মৃত্যুর অবস্থা হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা আগে মুযতার বানাচ্ছেন। যেমনটি তিনি ইরশাদ করেন:
أَمَّنْ يُجِيْبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ
অর্থাৎ, পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে, তো ভালো করে ঠেকাচ্ছেন। কারণ, ঘাটটিও দেবেন ভালো। যদি ঘাট আধা আধা হতো, তবে পিঠ দেওয়ালেও আধা আধা ঠেকত। যেহেতু আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন পূর্ণ ঘাটের, তাই ওই মুযতার হালাতও পূর্ণমাত্রায় নিলেন। এরপরই দিয়েছেন ওই পানি, যে পানি আর শুকাবে না।
মুসা আ.-কে আল্লাহ তাআলা দেওয়ার ফয়সালা করেছেন। তাঁকে এমন এক লাঠি দেবেন, যে লাঠি দ্বারা পানিতে আঘাত করলে রাস্তা হয়, পাথরে আঘাত করলে পানি বের হয়, আর সাপের সামনে ছেড়ে দিলে সাপ খেয়ে ফেলে; কিন্তু ওই লাঠি দেওয়ার আগে হাতে যে ছোটখাটো লাঠি ছিল, যা দিয়ে ছাগল চরাতেন, সেটিও গেল। ওই লাঠি ফেলে দেওয়ার পরে যে সাপ বানানো হলো, সেই সাপটি এমন ভয়ংকর হলো যে, ওর দিকে যেতেও পারেন না।
এই লাঠিটি মুসা আ.-এর একমাত্র সম্পদ ছিল। এই অর্থে যে, তিনি ছিলেন রাখাল। আর রাখালের সম্পদই হচ্ছে লাঠি। যেমন ডাক্তার, ডাক্তারের সম্পদই হচ্ছে কলম। প্রেসক্রিপশন যদি লিখতে না পারে, তাহলে রোগীরা কোন ওষুধ খাবে! তো রাখাল যদি লাঠির কারণে ছাগল চরাতে না পারে, তাহলে খাবে কী? তো সেজন্য মুসা আ.-এর জন্য লাঠি ফেলে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে তাঁর জীবনের অবলম্বন ফেলে দেওয়া। আল্লাহ তাআলা তাঁর ভরসার জিনিসকে এমন অবস্থা করলেন যে, তিনি পালাতে পারলেই বাঁচেন। তারপর আল্লাহ তাআলা এমন লাঠি দিলেন যে লাঠি সাপও খায়, পানির উপর আঘাত করলে রাস্তা করে দেয়, পাথরের উপর আঘাত করলে পানি বের করে; কিন্তু এই লাঠি দেওয়ার আগে একেবারে নিঃস্ব করে ফকির বানিয়ে দিলেন।
বনি ইসরাইলকে আল্লাহ তাআলা সমুদ্রের ভেতরে পথ দিয়েছেন, কিন্তু তার আগে এমন অবস্থায় নিয়ে এসেছেন যে, তারা পেরেশান হয়ে বলে উঠেছে:
إِنَّا لَمُدْرَكُوْنَ
এখন তো পালানোর কোনো পথই নেই।
সামনে সমুদ্র আর পেছনে ফেরাউন, যাবো কোথায়? বান্দা যখন ওই অবস্থায় পৌঁছায়, আর আল্লাহকে ডাকে, আর আল্লাহকে ডাকার স্থলে অন্য কোনো খেয়াল আসে না, অন্য কোনো আশ্রয়স্থলের কথা আসে না — তো আল্লাহওয়ালাগণ বলেন, ওইটিই হলো ইসমে আযম।
কাউকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ইসমে আযম কী? তো তিনি বললেন, সমুদ্রের মধ্যে যখন ডুবতে শুরু করে আর আশপাশে তক্তা তো নেই, এমনকি কচুরিপানাও নেই — তখন যেভাবে ডাকে, ওইটাই ইসমে আযম। আর কচুরিপানার কথাও উল্লেখযোগ্য এই জন্য যে, মানুষ যখন ডুবতে শুরু করে তখন যদি সে কচুরিপানাও পায় তবে সেটাকেও অবলম্বন হিসেবে ধরতে চায়। ডুবন্ত মানুষকে কখনো কখনো এমন অবস্থায়ও পাওয়া যায় যে, ঘাসকে মজবুত করে ধরে আছে, বা কচুরিপানাকে মজবুত করে ধরে আছে। অর্থাৎ সে অন্য কোনো তুলনামূলক ভারো অবলম্বন না পেয়ে শেষ পর্যন্ত কচুরিপানাকেও অবলম্বন হিসেবে ধরে আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা জবাব কখন দেবেন, যখন তার সামনে কোনো অবলম্বন থাকবে না। এমনকি কেনো কচুরিপানাও দেখা যাবে না।
বনি ইসরাইলকে আল্লাহ তাআলা এমন অবস্থায় দিয়েছিলেন, যখন জান বাঁচানোর জন্য কচুরিপানার মতো অবলম্বনও ছিল না। সামনে সমুদ্র আর পেছনে ফেরাউন। এতক্ষণ যা কিছু ছিল, এখন আল্লাহ ছাড়া আর কাকে ডাকবে? তো বান্দা যখন ওই মাত্রার ফকির হয়, তখন আল্লাহ তাআলা তার দানের দরজা খুলে দেন। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ
শুধু সদকাত নয়, হরফে তাকিদ 'ইন্নামা' সহকারে এসেছে। ইন্নামাকে বলা হয় হরফে মুতাহাদ্দাহ অর্থাৎ, এটি সীমিত করবে। অর্থাৎ, ফকির হতেই হবে; নাহলে পাওয়া যাবে না। আল্লাহ তাআলা বদরের সময় মুসলমানদের সাহায্য করলেন যখন তারা (আজিল্লাহ) গরিব ছিলেন; অপদস্থ ছিলেন। তারা সংখ্যায় কম ছিলেন। যারা সংখ্যায় কম, আবার অস্ত্রও নেই, তাদের তো শোচনীয় অবস্থা। যদি সংখ্যায় কম হয়, কিন্তু কিছু অস্ত্র যদি থাকে, তাহলেও মোকাবেলা করা যায়; কিন্তু তারা সবাই ছিলেন খালি হাতে, এখন সংখ্যা থাকলেই বা লাভ কী। এখন সংখ্যা তো কম, এর সাথে সাথে অস্ত্রও নেই। এর বিপরীতে কাফেররা একেবারেই সুসজ্জিত — যেমন মক্কাবাসী অস্ত্রেও সাগরে ডুবে আছে। ঢাল-তলোয়ার-বর্শা ইত্যাদি সব ধরনের অস্ত্রে সজ্জিত, লোহার টুপি ও জামা গায়ে — আর মুসলমানরা তাদের মোকাবেলা করছেন, যাদের লোহার টুপি ও জামা তো ছিলই না, এমনকি কোনো তলোয়ারও ছিল না।
গোটা মুসলিম বাহিনীর মধ্যে সম্ভবত শুধুমাত্র দু'খানা তলোয়ার ছিল। কারণ, সাহাবারা ওই অবস্থায়ই যুদ্ধে শরিক হয়েছেন, যে সামর্থ্যই তাদের ছিল। রাসূল সা. যখন গাযওয়ার ডাক দিয়েছেন, তখন ডাকটি এমনই ছিল যে, যে যেভাবে আছো, চলে আসো। তো আমাদের বর্তমান সমাজে যে যে অবস্থায় যায়, তার কাছে তো একটি ব্লেডও থাকবে না। কিন্তু আরবদের রেওয়াজ ছিল, তির-ধনুক যেগুলো সাধারণত সাথেই থাকত। কারণ, বাইরে যাওয়া মানে অন্যান্য জিনিসের সাথে শিকারের একটি সম্ভাবনাও আছে; খরগোশ ইত্যাদি হতে পারে। আর সবসময়ই কিছু না কিছু মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি থাকত। কারণ নিরাপত্তার বন্দোবস্ত বর্তমান সভ্য সমাজের মতো এমন নিরাপদ ছিল না। এ জন্য এমন কিছু কিছু অস্ত্র-শস্ত্র সাথে থাকতই, কিন্তু একেবারে যুদ্ধের প্রস্তুতি থাকত না। এজন্য ওই অবস্থায়ই সবাই বের হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছু ছিল, কিন্তু একেবারে ঢাল-তরবারি ছিল না।
সম্ভবত আঠারোটি বর্শা ছিল, দু'খানা তলোয়ার ছিল — ব্যস। রাসূল সা. সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-কে একটি খেজুরের ডাল দিলেন। তাঁর হাতে খেজুরের ডাল, আর যার সাথে মোকাবেলা করছেন, তার হাতে ঢাল-তলোয়ার-লোহার জামা-লোহার টুপি। তো খেজুরের ডাল দিয়ে কী করতে পারবে! তো এর চেয়ে বেশি একেবারে অসহায়-অপদস্থ আর কিছু হতে পারে না। আর এরকম অপদস্থ যখন হয়েছেন, তখন আল্লাহ তাআলা সাহায্য করেছেন। কুরআনে যেমনটি বর্ণিত হয়েছে:
إِذِ اسْتَغَثْتُمْ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ
তোমাদের রবের নিকট যখন তোমরা সাহায্য চাইলে, তখন আল্লাহ তাআলা সাহায্য করলেন।
সুতরাং আল্লাহ তাআলা দিয়ে থাকেন, কিন্তু আল্লাহর দেওয়ার নিয়ম হলো যে, তাকে ফকির হতে হবে। আর যার ব্যাপারে দেওয়ার ফয়সালা করেই ফেলেছেন, তার ব্যাপারেও এই নিয়ম রক্ষা করেই দিয়ে থাকেন। আল্লাহই তাকে ফকির বানাবেন। যাতে কেউ এই কথা বলতে না পারে যে, অমুককে আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন, অথচ সে তো ফকির ছিল না। সুতরাং আল্লাহ তাআলা ফকির বানিয়ে ফেলেন।
সব যামানায় নিয়ম এটিই। নিজের কাঁধে আল্লাহ তাআলার দেওয়ার ফয়সালা যতটুকু ছেড়েছেন, তার চেয়ে বড় জিনিস দেওয়ার ফয়সালা থাকে, তাহলে বাকি যতটুকু ছাড়েননি, ওটা শুকিয়ে নেন। কিছু নিজে করেন, কিছু বান্দাকে দিয়ে করিয়ে নেন। আমলের ক্ষেত্রেও ওইরকম, মানুষ কিছু আমল করে, কিছু আমল করিয়ে নেন। যে আমল করতে চায়, কয়েক ধাপে হয়। প্রথমে কিছু ধাপে তার অসুবিধাগুলো দূর হয়।
ঢাকায় ছিলেন বাবু বশির সাহেব রহ., পরবর্তীতে যিনি তাবলিগের আমির ছিলেন। এখানে তাঁর পোস্টিং ছিল। তিনি ঢাকার মোটামুটি প্রধান অফিসার। কোনো মন্ত্রী-আমলা আসলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সারাক্ষণ মন্ত্রীর সাথে থাকতে হয়। এয়ারপোর্টে মন্ত্রীকে রিসিভ করে নিয়ে আসা পর্যন্ত। যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন আবদুস সবুর খান, খুলনার। বাবু বশির সাহেব মেহমানের সাথেই আছেন। তাঁর একটি নিয়ম ছিল, আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত তাবলিগ করা। এখন মন্ত্রী এসেছেন আর ঢাকার প্রধান হিসেবে মন্ত্রীর সাথে থাকতে হবে, তাই মনে মনে পেরেশান যে, আজ আমার ঘাটতি যাবে। সকাল থেকে দুপুর হয়ে গেল, এখন তিনি মনে মনে পেরেশান কী করা যায়? মন্ত্রীকে নিয়ে ছুটি নিয়ে নেবেন কি না? অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করা যায় কি না, এমন যতকিছু সম্ভব খতিয়ে দেখছেন।
আসরের একটু আগে আবদুস সবুর খান তাঁকে ডেকে বললেন, আসরের পর থেকে গাশতে যাওয়া কি আপনার প্রতিদিনের অভ্যাস? তিনি বললেন, জি, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, ঠিক আছে, আপনি যান। অর্থাৎ, বলতে হলো না। মন্ত্রী নিজেই ডেকে তাঁকে আমলের সুযোগ করে দিলেন। অর্থাৎ, প্রথম ধাপে আল্লাহ তাআলা অসুবিধাগুলো দূর করেন। আর যদি আল্লাহ তাআলা আরও বেশি দিতে চান, তাহলে তাকে আমলে বাধ্য করেন।
হযরত রুহুল কিশতি সাহেব রহ. বলছিলেন যে, তিনি একবার তাঁর বোনের বাসায় গিয়েছিলেন। দীর্ঘ সফরের পর বিশ্রামের দরকার ছিলো। ফজর নামায পরই বিশ্রাম নিবেন। বোন আগে থেকেই জানতেন উনি ফজরের পর তেলাওয়াত করেন তাই কোরআন শরীফ দিলেন উনি তেলাওয়াত করলেন । এরপরে বিশ্রামে যাবেন ভাবছিলেন ইতিমধ্যে ভাগ্নে জায়নামাজ দিলেন ইশরাক পড়ার জন্য। আল্লাহতালা দুর্বলতার মধ্যেও আমাল কে পুরা করে নিলেন।
তো বান্দা কিছু করেন, আর কিছু আল্লাহ তাআলা সাহায্য করেন। আল্লাহ তাআলা হাদিসে কুদসিতে বলেন:
إنَّ اللَّهَ قَالَ: مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ، وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ، وَمَا تَرَدَّدْتُ عَنْ شَيْءٍ أَنَا فَاعِلُهُ تَرَدُّدِي عَنْ نَفْسِ الْمُؤْمِنِ؛ يَكْرَهُ الْمَوْتَ، وَأَنَا أَكْرَهُ مَسَاءَتَهُ.
'যে ব্যক্তি আমার বন্ধুর সাথে শত্রুতা করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমার বান্দা আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় আমি যা ফরয করে দিয়েছি তার মাধ্যমে। নফলের মাধ্যমে সে আমার নিকটবর্তী হতেই থাকে এমনকি আমি তাকে ভালোবাসি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যে কান দিয়ে সে শ্রবণ করে; আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে; আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে; আমি তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে হাঁটে। আমার বান্দা যদি আমার কাছে কিছু চায়, তবে আমি তাকে তা প্রদান করি। যদি সে আমার কাছে কোনো কিছু থেকে আশ্রয় চায়, তবে আমি তাকে তা থেকে আশ্রয় দিই। যে কাজ আমি করব সেই কাজ করতে আমি ততটা দ্বিধান্বিত হই না, যতটা দ্বিধান্বিত হই মুমিন ব্যক্তির জান কবজ করতে; সে মৃত্যু অপছন্দ করে, আর তাঁকে কষ্ট দেওয়া আমি অপছন্দ করি।'
তো আল্লাহ তাআলা যার চোখ-হাত-পা-কান হয়ে যান, তাকে ধাপে ধাপে সাহায্য করেন। প্রথম ধাপ হলো, তাকে আমলের সুযোগ করে দেন। পরের ধাপ হলো, আমলের বাধাগুলো দূর করে দেন। আর পরের ধাপ হলো, আল্লাহ তাআলা তাকে আমলে বাধ্য করেন। যখন অসুবিধা দূর হয়ে গেল, তখন তো সে নিজেই আমলে উদ্যোগী হয়ে যায়। তো আল্লাহ তাআলা ধাপে ধাপে তাকে আমলে আরও আগে নিয়ে যান।
সালমান ফারসি রহ.। তখন তিনি অল্পবয়সী, যুবক বলা যায়। ইরান দেশ ত্যাগ করলেন হেদায়েতের খোঁজে। অথচ তিনি ছিলেন ওই অঞ্চল প্রধানের ছেলে। তিনি বড় আরামের বাড়ি-গাড়ি ছেড়ে এই পথে নামলেন। বহু বছর দামেশকের প্রধান পাদ্রির নিকট থাকলেন। সে মারা যাওয়ার পর পরবর্তী প্রধান পাদ্রির নিকট থাকলেন। সে মারা যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করলেন, আমি এখন কোথায় থাকব? উত্তরে পাদ্রি বলল, তুমি এখন অমুকের নিকট যাও। তিনি গেলেন। তাঁর নিকটও অনেকদিন থাকলেন। তার মৃত্যুর আবার জিজ্ঞাসা করলেন, এখন আমি কোথায় যাব? তিনি বললেন, মাওসিল যাও। তিনি গেলেন। এরপর সেই ধর্মযাজককে বললেন, এখন আমি কোথায় যাব? তিনি বললেন, এই ধর্মের যামানা শেষ হয়ে গিয়েছে। আখেরি যামানার নবির সময় এসে গেছে। এখন তুমি আখেরি যামানার নবির সন্ধানে যাও। কিছু লক্ষণ বলে দিলেন যে, তিনি উটের দেশে হবেন। হিজরত করে খেজুরের দেশে চলে যাবেন। সদকা খাবেন না, হাদিয়া খাবেন। পিঠে একটি বিশেষ চিহ্ন আছে। এই তিনটি বিশেষ গুণ বলে দিলেন।
আল্লাহ তাআলা অন্তরে ঢেলে দিলেন দ্বীনের আলো। যাবেন কীভাবে? শাম দেশে এক ব্যবসায়ী কাফেলা পেলেন। সেই সময় ব্যবস্থার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন শহরের ব্যবসায়ীরা দল বেঁধে ভ্রমণ করত, এইরকম একটি কাফেলা পেলেন। তাঁর নিকট যে অল্পকিছু সম্পদ ছিল, সেই ব্যবসায়ী কাফেলাকে দিয়ে বললেন, তোমাদের সাথে আমাকে নিয়ে যাও। তারা তাঁকে নিল; কিন্তু কিছুদূর গিয়ে তারা সালমান ফারসি রা.-কে গোলাম হিসেবে বিক্রি করে দিল। এতদিন তিনি সক্ষম ছিলেন, ইরান ছেড়ে দামেশক গেলেন, দামেশক ছেড়ে মাওসিল গেলেন, মাওসিল ছেড়ে আমুরিয়া গেলেন। শেষ সময়ে তিনি এলেন — এতদিন পর্যন্ত টাকাপয়সা না থাকলেও নিজের কর্মক্ষমতা ছিল, আর গোলাম সম্পূর্ণ অক্ষম।
সব ভিন্ন হওয়ার পর এবং সম্পূর্ণ অক্ষম হওয়ার পর আল্লাহ তাআলার নিজ দায়িত্বে যারা কিনল তারা ছিল শাম দেশীয় ইহুদি। তাদের আত্মীয় ছিল মদিনার বনু কুরায়যা। তারা তাদের মদিনার আত্মীয় বনু কুরায়যার কাছে সালমান ফারসি রা.-কে বিক্রি করে দিল। তিনি তো জানতেন না, তাঁকে কোথায় বিক্রি করা হবে, কী হবে। আসলে তিনি আসেননি, বরং তাঁকে মদিনায় আনা হয়েছে। মদিনায় এনে তাদের খেজুরের ক্ষেতে কাজে লাগাল।
সালমান ফারসি রা. খেজুরের গাছে কাজ করছেন, এমন সময় মালিকের নিকট একজন মেহমান এল। সে গল্প করছিল, মক্কা থেকে একজন লোক এসেছে; সে নিজেকে নবী দাবি করছে। সালমান ফারসি রা. এতদিন এই সংবাদের আশাই করে আসছিলেন। ওই মালি আর মেহমান মনে করছে, তারা গল্প করছে; কিন্তু আল্লাহ তাআলা সালমান ফারসিকে এই খবর দেওয়ার জন্য তাদেরকে একত্র করেছেন।
সালমান ফারসি রা. গাছের উপর কাজ করছিলেন। এই সংবাদ শোনার পর তাঁর এত আনন্দ হয়েছে যে, গাছ থেকে প্রায় পড়ে যাওয়ার অবস্থা। কোনোরকমে গাছ থেকে নেমে ওই লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, কী বললে? গোলাম এসে মালিকের আলোচনায় শরিক হওয়া পেস্টিজের বিষয়। তারা বলল, কী হয়েছে তোমার? তুমি যাও, তোমার কাজ করো। এখন তারা যাই বলুন, তিনি তো তাঁর কাঙ্ক্ষিত বিষয় শুনে নিয়েছেন। অতঃপর তিনি রাসূল সা.-এর নিকট গেলেন আর আল্লাহ তাআলা তাঁকে হেদায়েতের গন্তব্যে পৌঁছাল।
এই হেদায়েতের জন্য সালমান ফারসি রহ. নিজে ফকির হয়েছেন। আর যা অল্পকিছু বাকি ছিল, আল্লাহ তাআলা করে দিয়েছেন। আর নিজের যা ছিল সব ছেড়ে দিয়েছেন; কিন্তু নিজের কর্মক্ষমতাও নিজের ছিল, আল্লাহ তাআলা ওটাও কেড়ে নিয়েছেন আর গোলাম বানিয়েছেন। কেননা, গোলাম সম্পূর্ণ অক্ষম; তার কিছুই নেই। তার চেয়ে বড় ফকির আর কেউ নেই। এরপর আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বড় মেহেরবানি করে আমাদেরকে দ্বীন দিয়েছেন। এই দ্বীন পেতে হলে ফকির হতে হবে। তবে ফকির দু'ধরনের: ১. নকল, ২. আসল। দুনিয়াতে নকল ফকির জাহিলরা, ধোঁকাবাজি; গর্হিত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বড় মেহেরবান; আল্লাহ তাআলা নকল ফকিরকেও কদর করেন। আসল তো আসলই; কিন্তু নকল ফকিরও খালি হাতে যায় না। রাসূল সা.-এর কাছে নকল ফকিরকেও দিয়ে দেন। সুতরাং দ্বীনের ব্যাপারে নকল হয় তবুও দিয়ে দেন। কান্না না আসে তাহলে কান্নার ভান কর। এটাও আল্লাহতালা কবুল করেন।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর অনেক গোলাম ছিল। তাদের মধ্যে যে একটু ভালো ও সুন্দর করে নামায পড়ত, তাকে আজাদ করে দিতেন। গোলামরা যখন বিষয়টি বুঝতে পারল, তখন তারা বেশি বেশি নামায পড়তে লাগল আর তিনি আজাদ করে দিতে লাগলেন। কেউ একজন বলল, ওরা তো নামাযের মাধ্যমে আপনাকে ঠকাচ্ছে। তখন আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বললেন, নামাযি যদি আমাকে ঠকায় তাকে আমি ঠকাতে রাজি আছি।
অতএব আসল তো আসল, কিন্তু যদি নকলও হয় তাহলেও ক্ষমা পাবে। এজন্য ফকিরি অর্জনের চেষ্টা করি; তবে এই চেষ্টাটাই আসল। যদি সত্যিকার অর্থে আমরা নিজেদেরকে ফকিরি অবস্থায় নিতে পারি, তখন আল্লাহ তাআলা তার নুসরত দেবেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন।
---
*(বয়ান সমাপ্ত)*
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
অনলাইন দাওয়াহ
অনলাইনে দাওয়াহর মূল উদ্দেশ্য কী? মূল টার্গেট অডিয়েন্স কারা? লেখালেখিসহ অন্যান্য কন্টেন্টের কোন উদ্...
আসিফ আদনান
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১৭২১৩
ত্যাগের বিনিময়ে সম্পর্ক: উম্মতের মহব্বতের বুনিয়াদ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] স্থান: গাউসনগর জামে মসজিদ, ইস্কাটন রোড, ঢাকা তারিখ: ৯ জুন ২০০৬,বেলা:৩.৩...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১১ জানুয়ারি, ২০২৬
২৭৫১
নফি ও ইসবাত: দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، فَاعۡلَمۡ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلّ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারি, ২০২৬
৩২৭৬
নিভৃতচারী আল্লাহওয়ালাদের খোঁজে
হজরতের গড়া ছোট্ট, অথচ সুন্দর মাদ্রাসা। মাদ্রাসা থেকে এক ছাত্রকে রাহবার হিসেবে সাথে নিয়ে যখন হজরতের ব...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১২১৪৩
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন