প্রবন্ধ
সাহাবায়ে কেরামকে ভালোবাসা ঈমানের দাবি
২৪ আগস্ট, ২০২৬
৩৪
০
প্রত্যেক মুসলিমের ওপর আবশ্যকীয় ঈমানের অংশ হলো—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁর আহলে বাইতকে ভালোবাসা এবং অন্যান্য সকল মুসলিমের তুলনায় তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করা। আর এ বিশ্বাস রাখা যে, ইসলামে অগ্রগামিতার ভিত্তিতে তাঁদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের স্তর একে অপরের থেকে ভিন্ন।
আমরা সকলেই জানি, সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম এমন এক সৌভাগ্যবান যুগে জীবনযাপন করেছেন, যে যুগে ওহী নাযিল হয়েছে এবং আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের মাঝে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে কুরআন-সুন্নাহর ইলম শিক্ষা করেছেন, তাঁর পবিত্র সাহচর্য লাভ করেছেন এবং নিজেদের জীবনকে তাঁর আদর্শে গড়ে তুলেছেন। পরবর্তীতে তাঁরা সেই ইলম, হিদায়াত ও দ্বীনের আমানত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁদের মাধ্যমেই কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা যুগের পর যুগ আমাদের কাছে সংরক্ষিত ও পৌঁছেছে।
সাহাবায়ে কেরাম এমন একটি যুগে বসবাস করেছেন, যাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজাতির সর্বোত্তম যুগ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি:) থেকে সহীহাইনে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
“মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম হলো আমার যুগের মানুষ; এরপর যারা তাদের পরবর্তী যুগের; এরপর যারা তাদের পরবর্তী যুগের।”
এরপর বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয় নাকি চতুর্থবারে বলেছেন, তা স্মরণ নেই। তিনি বলেছেন, পরবর্তীতে এমন একদল লোক আসবে, যাদের মধ্যে কোনো কোনো ব্যক্তি সাক্ষ্য দেওয়ার আগেই কসম করবে এবং কসম করার আগেই সাক্ষ্য দেবে।
—সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬৪২৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৫৩৩
আল্লাহ তাআলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াতে তিনি তাঁদের এ মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন, মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَالسّٰبِقُوۡنَ الۡاَوَّلُوۡنَ مِنَ الۡمُہٰجِرِیۡنَ وَالۡاَنۡصَارِ وَالَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡہُمۡ بِاِحۡسَانٍ ۙ رَّضِیَ اللّٰہُ عَنۡہُمۡ وَرَضُوۡا عَنۡہُ وَاَعَدَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ تَحۡتَہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা ঈমানে প্রথমে অগ্রগামী হয়েছে এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যানরাজি তৈরি করে রেখেছেন, যার তলদেশে নহর বহমান। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। এটাই মহা সাফল্য। — সূরা আত-তাওবাহ্, আয়াত নং: ১০০
এবং মহান আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন —
مُحَمَّدٌ رَّسُوۡلُ اللّٰہِ ؕ وَالَّذِیۡنَ مَعَہٗۤ اَشِدَّآءُ عَلَی الۡکُفَّارِ رُحَمَآءُ بَیۡنَہُمۡ تَرٰىہُمۡ رُکَّعًا سُجَّدًا یَّبۡتَغُوۡنَ فَضۡلًا مِّنَ اللّٰہِ وَرِضۡوَانًا ۫ سِیۡمَاہُمۡ فِیۡ وُجُوۡہِہِمۡ مِّنۡ اَثَرِ السُّجُوۡدِ ؕ
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। তাঁর সঙ্গে যারা আছে, তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং আপসের মধ্যে একে অন্যের প্রতি দয়ার্দ্র। তুমি তাদেরকে দেখবে (কখনও) রুকুতে, (কখনও) সিজদায়, আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি সন্ধানে রত। সূরা আল-ফাতহ, আয়াত নং: ২৯
সুতরাং একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো—সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুমের প্রতি অন্তরে গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান পোষণ করা এবং তাঁদের মর্যাদার ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক ও সংযত থাকা। তাঁদের সম্পর্কে কোনো ধরনের বেয়াদবিপূর্ণ মন্তব্য, কটূক্তি, বিদ্রূপ কিংবা অবমাননাকর আলোচনা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা আবশ্যক। বিশেষত এমন কোনো কথা বা বক্তব্য পেশ করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে তাঁদের সম্মান ও মর্যাদায় আঘাত আসে।
সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গী, দ্বীনের প্রথম বাহক এবং কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান উম্মতের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মহান মাধ্যম। তাই তাঁদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা মূলত ইসলামের ইতিহাস ও দ্বীনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বদের অবমাননা করার শামিল। এ কারণেই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো—সকল সাহাবায়ে কেরামকে ভালোবাসা, তাঁদের সম্মান করা, তাঁদের জন্য কল্যাণের দু‘আ করা এবং তাঁদের ব্যাপারে অশালীন ও অবমাননাকর বক্তব্য থেকে নিজেকে সংযত রাখা।
দুঃখজনকভাবে কিছু বাতিল ফিরকা ও ভ্রান্ত মতাদর্শের অনুসারীরা সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে গালাগালি, নিন্দা ও অবমাননার পথ অবলম্বন করেছে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে গালি দিতে এবং তাঁদের অসম্মান করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তাঁদের গালি দেওয়া নিঃসন্দেহে ভয়াবহ অপরাধ এবং মুমিনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক পথ। এটি মানুষের ঈমান, আকীদা ও দ্বীনদারির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে এবং তাকে ফিসক ও পাপাচারের দিকে ঠেলে দিতে পারে; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কুফরির মতো ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কাও সৃষ্টি করতে পারে। তাই সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে জবানকে সংযত রাখা এবং তাঁদের সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
مَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
“যে ব্যক্তি আমার সাহাবাদের গালি দেবে, তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ, ফেরেশতাদের অভিশাপ এবং সকল মানুষের অভিশাপ।”
—কানযুল উম্মাল, হাদীস নং: ৩২৪৮৮
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন:
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ
“তোমরা আমার সাহাবীদের গালি দিও না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহর পথে অকাতরে দানও করে, তবুও তা আমার কোনো একজন সাহাবির এক মুদ (এক অঞ্জলি) বা তার অর্ধেক পরিমাণ দানের সমতুল্য হবে না।”
—সহিহ বুখারি, হাদীস: ৩৬৭৩; সহিহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৪০
এই হাদীস সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও তাঁদের আমলের বিশেষ ফযীলনের এক সুস্পষ্ট প্রমাণ। পরবর্তী যুগের কোনো ব্যক্তি যত বিপুল পরিমাণ সম্পদই আল্লাহর পথে ব্যয় করুক না কেন, সাহাবায়ে কেরামের ঈমান, ইখলাস, ত্যাগ, কুরবানি এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্যের যে মর্যাদা, তা পরবর্তী কারও আমল দ্বারা অর্জন করা সম্ভব নয়।
এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে জবান সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁদের ছোট করে দেখা, তাঁদের গালি দেওয়া কিংবা তাঁদের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কোনোভাবেই একজন মুমিনের শোভা পায় না। বরং তাঁদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধা পোষণ করা এবং তাঁদের জন্য কল্যাণের দু‘আ করা ঈমানদারির পরিচয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন:
اللَّهَ اللَّهَ فِي أَصْحَابِي، لَا تَتَّخِذُوهُمْ غَرَضًا بَعْدِي، فَمَنْ أَحَبَّهُمْ فَبِحُبِّي أَحَبَّهُمْ، وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ فَبِبُغْضِي أَبْغَضَهُمْ، وَمَنْ آذَاهُمْ فَقَدْ آذَانِي، وَمَنْ آذَانِي فَقَدْ آذَى اللَّهَ، وَمَنْ آذَى اللَّهَ فَيُوشِكُ أَنْ يَأْخُذَهُ
আমার সাহাবীগণের বিষয়ে তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে। আমার পরে তাদেরকে আক্রমণের লক্ষ্যস্থল বানিয়ে নিয়ো না। যারা তাদের ভালবাসবে, আমার প্রতি ভালবাসার জন্যই তারা তাদের ভালবাসবে। আর যে ব্যক্তি তাদের প্রতি বিদ্বেষ ভাব পোষণ করবে, সে আমার প্রতি বিদ্বেষ ভাব পোষণের কারণেই তাদের প্রতি বিদ্বিষ্ট হবে। যে ব্যক্তি তাদের কষ্ট দিল, সে আমাকেই কষ্ট দিল। আর যে ব্যক্তি আমাকে কষ্ট দিল, সে আল্লাহ্ তা'আলাকেই কষ্ট দিল। যে আল্লাহকে কষ্ট দিল, শীঘ্রই তিনি তাকে পাকড়াও করবেন। —জামে' তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৮৬২
সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব বোঝাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসার সাহাবীদের ব্যাপারেও অত্যন্ত সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। হযরত বারাআ ইবনে আযিব (রাযি:) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন—
لَا يُحِبُّهُمْ إِلَّا مُؤْمِنٌ، وَلَا يُبْغِضُهُمْ إِلَّا مُنَافِقٌ، مَنْ أَحَبَّهُمْ أَحَبَّهُ اللَّهُ، وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ أَبْغَضَهُ اللَّهُ
“মুমিনরাই তাদের মুহব্বত করে থাকে এবং মুনাফিকরাই তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। যারা তাঁদের ভালবাসে আল্লাহ তাদের ভালবাসেন, যারা তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে আল্লাহ তাদের ঘৃণা করেন।”
হযরত আনাস (রাযি:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
آيَةُ الْإِيمَانِ حُبُّ الْأَنْصَارِ، وَآيَةُ النِّفَاقِ بُغْضُ الْأَنْصَارِ
“আনসারদের ভালোবাসা ঈমানের নিদর্শন এবং আনসারদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা নিফাকের নিদর্শন।”
আনসার সাহাবীরা ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেই মহান সাহাবিগণ, যাঁরা মদিনায় ইসলাম ও মুসলমানদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাঁরা মুহাজির সাহাবাদের নিজেদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং আল্লাহর দ্বীনের জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও সামর্থ্য উজাড় করে দিয়েছিলেন। তাঁদের ঈমান, ত্যাগ, কুরবানি ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসা ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের ভালোবাসাকে ঈমানের নিদর্শন এবং তাঁদের প্রতি বিদ্বেষকে নিফাকের নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। শুধু তাই নয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও জানিয়েছেন—যে ব্যক্তি আনসারদের ভালোবাসবে, আল্লাহ তাআলা তাকে ভালোবাসবেন; আর যে তাঁদের ঘৃণা করবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন।
এ হাদীস থেকে স্পষ্ট হয় যে, সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ভালোবাসা কোনো সাধারণ আবেগ বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা নয়; বরং এটি ঈমানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্বাচিত সঙ্গী ও দ্বীনের প্রথম সাহায্যকারীদের প্রতি ভালোবাসা একজন মুমিনের অন্তরের ঈমানি অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক।
অতএব, আমাদের উচিত সাহাবায়ে কেরামের জীবন ও ত্যাগের কথা স্মরণ করা, তাঁদের প্রতি অন্তরে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা লালন করা এবং তাঁদের সম্পর্কে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ও অবমাননাকর আলোচনা থেকে নিজেদের জবান ও অন্তরকে হেফাজত করা।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ্ (রহ) তাঁর “আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, "যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সাহাবীদের দ্বীন বা ধর্মের কারণে গালি দেবে—তা কুফরি ও মুরতাদ হয়ে যায়; আর যদি নিজের ভেতরের হিংসা ও ক্ষোভের কারণে গালি দেয় তবে সে ফাসিক।
সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদার মধ্যে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযি:) মর্যাদা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয়তমা স্ত্রী, উম্মুল মুমিনীন এবং দ্বীনের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও হাদীসের অন্যতম প্রধান বর্ণনাকারী। তাঁর পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার সাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে প্রদান করেছেন। তাই তাঁর চরিত্রের প্রতি অপবাদ আরোপ করা নিছক কোনো ব্যক্তিকে অপমান করা নয়; বরং তা কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণাকে অস্বীকার করার পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ) তাঁর “আস-সারিমুল মাসলূল ‘আলা শাতিমির রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” গ্রন্থে হযরত আয়েশা (রাযি:) প্রতি অপবাদ আরোপের বিধান আলোচনা করতে গিয়ে কাজী আবু ইয়া‘লা (রহ) বক্তব্য উল্লেখ করেছেন—
من قذف عائشة بما برأها الله منه كفر بلا خلاف
“যে ব্যক্তি আয়েশা (রাযি:)-কে এমন বিষয়ে অপবাদ দেবে, যা থেকে আল্লাহ তাআলা তাঁকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন, সে কুফরিতে লিপ্ত হবে, এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই।”
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ) বলেন—
اتفقت الأمة على كفر قاذفها
“হযরত আয়েশা (রাযি:)-কে অপবাদ প্রদানকারীর কুফরির ব্যাপারে উম্মত একমত হয়েছেন।”
ইমাম সুয়ূতি (রহ) ইফকের আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, আলেমগণ হযরত আয়েশা (রাযি:)-র প্রতি অপবাদকে কুফরি বলেছেন; কারণ এর মাধ্যমে কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যকে অস্বীকার করা হয়।
বদরুদ্দীন যরকাশী (রহ) বলেন—
من قذفها فقد كفر لتصريح القرآن الكريم ببراءتها
“যে ব্যক্তি তাঁর প্রতি অপবাদ আরোপ করবে, সে কুফরিতে পতিত হবে; কারণ পবিত্র কুরআন তাঁর পবিত্রতা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে।”
ইমাম নববী (রহ) শরহু সহিহ মুসলিম-এ হাদীসে ইফকের বিভিন্ন শিক্ষা আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, হযরত আয়েশা (রাযি:)-র অপবাদ থেকে পবিত্রতা কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। এরপর তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি (আল্লাহ না করুন) তাঁর পবিত্রতার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে, তাহলে সে কুফরিতে পতিত হবে এবং মুসলিমদের ইজমা অনুযায়ী মুরতাদ গণ্য হবে।
অতএব, একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন—সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম এমন মহান ব্যক্তিত্ব, যাঁদের মর্যাদা ও পবিত্রতার সাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে দিয়েছেন। তিনি তাঁদের প্রশংসা করেছেন, তাঁদের প্রতি সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন এবং তাঁদের ঈমান, ত্যাগ, কুরবানি ও আনুগত্যের কথা উম্মতের সামনে তুলে ধরেছেন। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দা ও অলীদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারেও অত্যন্ত সতর্ক করেছেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ
“যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে দিলাম।”
হাদীসে কুদসির এই বাণী আমাদের জন্য অত্যন্ত গভীর একটি শিক্ষা বহন করে। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণকারীর বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। আর সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম তো ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্যে গড়ে ওঠা সেই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম, যাঁদের ঈমান ও ত্যাগের প্রশংসা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা করেছেন এবং যাঁদের প্রতি তিনি সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন।
সুতরাং তাঁদের মর্যাদা নিয়ে কটূক্তি করা, তাঁদের অবমাননা করা কিংবা তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা একজন মুমিনের জন্য কোনোভাবেই শোভনীয় নয়। বরং আমাদের কর্তব্য হলো—সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অন্তরে গভীর ভালোবাসা রাখা, তাঁদের জন্য দু‘আ করা, তাঁদের মর্যাদা স্বীকার করা এবং তাঁদের জীবন থেকে ঈমান, তাকওয়া, ত্যাগ ও কুরবানির শিক্ষা গ্রহণ করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরকে সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ করুন এবং তাঁদের ব্যাপারে সব ধরনের বিদ্বেষ, কটূক্তি ও অসম্মান থেকে আমাদের জবান ও অন্তরকে হেফাজত করুন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ইসলামই পৃথিবীর ভবিষ্যত
...
শান্তি সম্প্রীতি ও উদারতার ধর্ম ইসলাম
নামে যার শান্তির আশ্বাস তার ব্যাপারে আর যাই হোক, সন্ত্রাসের অপবাদ দেয়ার আগে তার স্বরূপ উদঘাটনে দু'দণ...
ইলমে দীন ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ভাবনা
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعم...
মূর্তি ও ভাস্কর্যপ্রীতি : ইসলাম কী বলে?
ইসলামের যে বিষয়গুলোর নিষিদ্ধতা অকাট্য ও মুতাওয়াতিরভাবে প্রমাণিত তার মধ্যে প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণ ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন