রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

رياض الصالحين من كلام سيد المرسلين

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা - এর পরিচ্ছেদসমূহ

মোট হাদীস ২৬ টি

হাদীস নং: ১০১৬
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ শরীয়তের দৃষ্টিতে রুক্‌য়া (ঝাড়ফুঁক, তাবীজ)

আমরা যাকে ঝাড়ফুঁক ও তাবীজ বলি, আরবীতে তাকে رقية (রুক্‌য়া) বলা হয়। কয়া শব্দটির উৎপত্তি উট থেকে। এর অর্থ উপরে ওঠা, আরোহণ করা। কুরআন মাজীদে ইরশাদ-

اَوۡ تَرۡقٰی فِی السَّمَآءِ ؕ وَلَنۡ نُّؤۡمِنَ لِرُقِیِّکَ حَتّٰی تُنَزِّلَ عَلَیۡنَا کِتٰبًا نَّقۡرَؤُہٗ

'অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে, কিন্তু আমরা তোমার আকাশে তারোহণকেও ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের প্রতি এমন এক কিতাব অবতীর্ণ করবে, যা আমরা পড়তে পারব। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৯৩)

শত্রুর হামলা ও বিপদ-আপদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য মানুষ উঁচু স্থানে আরোহণ করে থাকে। এ হিসেবে রক্ষা করা অর্থেও শব্দটির ব্যবহার আছে। ঝাড়ফুঁক দ্বারা মানুষকে রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করা হয়। তাই ঝাড়ফুঁক অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এখন তো রুক্‌য়া বলতে সাধারণত ঝাড়ফুঁককেই বোঝায়। এ অর্থে তাবীজ শব্দেরও ব্যবহার আছে।

তাবীজ শব্দটির আরবী উচ্চারণ تَعْوِيدٌ। এর উৎপত্তি عَوْذُ থেকে। অর্থ আশ্রয় গ্রহণ করা। তাবীজ অর্থ আশ্রয় দান করা। এর থেকেই সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে ممؤذتَان বলা হয়। কেননা এর দ্বারা রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-আপদ থেকে আল্লাহর আশ্রয় লাভ হয়। সুতরাং যে-কোনও সূরা বা আয়াত কিংবা দুআ পড়ে ঝাড়ফুঁক করাকে যেমন রুক্‌য়া বলা হয়, তেমনি এর জন্য তাবীজ শব্দেরও ব্যবহার আছে। তবে প্রচলিত অর্থে তাবীজ বলা হয় সূরা বা আয়াত কিংবা দুআ লিখিতরূপে ব্যবহার করাকে, তা কোনও মাদুলির ভেতরে হোক বা এমনিই সুতায় বেঁধে হোক।

ঝাড়ফুঁক ও তাবীজ সম্পর্কে চিন্তা ও কর্মগত প্রান্তিকতা

রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-আপদে ঝাড়ফুঁক করা ও তাবীজ ব্যবহার করা শরীয়তসম্মত। তবে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি আছে। কেউ একে সম্পূর্ণ নাজায়েয বলে, এমনকি শিরক সব্যস্ত করে। তাদের দৃষ্টিতে ঝাড়ফুঁক ও তাবীজের ব্যবহার কোনওভাবেই বৈধ নয়। এটা করা কঠিন গুনাহের কাজ। অপরদিকে একশ্রেণির লোক ঝাড়ফুঁক ও তাবীজকেই সবকিছু মনে করে। সকল উদ্দেশ্য পূরণে এটাই তাদের একমাত্র অবলম্বন। রোগ-ব্যাধি

হলে আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করবে না। ঝাড়ফুঁককেই তারা যথেষ্ট মনে করে। নিঃসন্তান বাবা-মা'ও এরূপ করে থাকে। যে-কোনও বিপদ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় তাদের দৃষ্টিতে তাবীজ ও ঝাড়ফুঁক। এমনকি নফল নামায পড়ে দুআ করা, দান-সদাকা করা, কুরআন মাজীদের কোনও সূরা বা আয়াত পড়া এবং হাদীছে বর্ণিত দুআসমূহ পড়ার চেয়েও তাদের কাছে তাবীজ ও ঝাড়ফুঁকের গুরুত্ব বেশি। এ বাড়াবাড়ি কোনওক্রমেই সংগত নয়।

যারা ঝাড়ফুঁককে নাজায়েয বলে, তাদের দলীল হলো- দীর্ঘ এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছিলেন যে, তাঁর উম্মতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে। সাহাবায়ে কেরাম জানতে চেয়েছিলেন তারা কারা। তিনি ইরশাদ করেন-

هُمُ الَّذِينَ لَا يَسْتَرْقُوْنَ، وَلَا يَتَطَيَّرُونَ، وَلَا يَكْتَوُوْنَ، وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

'তারা ওইসকল লোক, যারা রুক্‌য়া করে না, কোনওকিছুকে কুলক্ষণ মনে করে না, (চিকিৎসার উদ্দেশ্যে) শরীর দাগায় না; বরং তারা তাদের প্রতিপালকের উপরই ভরসা রাখে। (সহীহ বুখারী: ৫৭০৫; সহীহ মুসলিম: ২১৮; জামে তিরমিযী: ২৪৪৬; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৬২১; মুসনাদে আহমাদ: ২৪৪৯; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৭৫৬০; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ৫৩৪০; জামে' মা'মার ইবন রাশিদ: ১৯৫১৯; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৭১৪১)

অপর এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-

مَنْ اكْتَوَى أَوِ اسْتَرْقَى فَقَدْ بَرِئَ مِنَ التَّوَكُّلِ

'যে ব্যক্তি শরীর দাগায় বা রুক্‌য়া করায়, তাওয়াক্কুলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। (জামে' তিরমিযী: ২০৫৫: সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৪৮৯; মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী। ৭৩২; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৬২৩; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৮৯০। হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৮২৭৯: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ১৯৫৪৬; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৩২৪১)

এ হাদীছদু'টিতে রুক্‌য়া করাকে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থি সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাওয়াক্কুল করা অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা রাখা ফরয। তাই তাওয়াক্কুল পরিপন্থি কোনও কাজই জায়েয নয়। সুতরাং রুক্‌য়াও জায়েয নয়।

প্রকৃতপক্ষে এ হাদীছ সাধারণভাবে বর্তমানে প্রচলিত রুক্‌য়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এটা প্রযোজ্য জাহিলী যুগের রুক্‌য়ার ক্ষেত্রে। বর্তমানেও কারও রুক্‌য়া সেরকম হলে

হাদীছের দৃষ্টিতেও তাও নাজায়েয হবে। অর্থাৎ কারও মন-মানসিকতা যদি এমন হয় যে সে রুক্‌য়ার কাজটিকেই সবকিছু মনে করে, এরই উপর তার ভরসা, এর দ্বারা যে আল্লাহ তা'আলাই উপকার দেবেন সেদিকে লক্ষ রাখে না, তার জন্য রুক্‌য়া অবশ্যই নাজায়েয। ইসলামপূর্ব যুগে রুক্‌য়া এরকমই ছিল। সেকালে এক তো নানা রকম দুর্বোধ্য মন্ত্র পড়ে ঝাড়ফুঁক করা হতো। দ্বিতীয়ত তখন বিশ্বাস ছিল ঝাড়ফুঁক ও তাবীজ স্বয়ং শক্তিমান। তা আপন শক্তিতেই কাজ করে। তাছাড়া তাদের ঝাড়ফুঁকে দেব-দেবীর নাম থাকত। জিন-শয়তানদের আশ্রয় নেওয়া হতো। এ সবই সুস্পষ্ট শিরক। তাই সেকালের প্রচলিত রুক্‌য়াকে নাজায়েয ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ইসলামে যে রুক্‌য়া, তা মোটেই এরকম নয়। তা তাওয়াক্কুলবিরোধী নয়। শিরকের সঙ্গেও এর কোনও সম্পর্ক নেই।

তাওয়াক্কুলের অর্থ এ নয় যে, কোনও বিষয়ের সংশ্লিষ্ট আসবাব-উপকরণ গ্রহণ না করে এবং উপযুক্ত চেষ্টা-পরিশ্রম না করে হাত-পা ছেড়ে বসে থাকা হবে আর এভাবে আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করা হবে যে, তিনি তা সরাসরি সম্পন্ন করে দেবেন। এটা তাওয়াক্কুল তো নয়ই; বরং আল্লাহ তা'আলার হুকুমেরও বিপরীত। তাওয়াক্কুল অর্থ হলো প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র গ্রহণ করে এবং যথাযথ চেষ্টা অব্যাহত রেখে আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা রাখা যে, তিনি নিজ ইচ্ছা হিকমত অনুযায়ী এর ফলাফল দান করবেন।

বস্তুসামগ্রী যেমন আসবাব-উপকরণের অন্তর্ভুক্ত, তেমনি দুআ, ঝাড়ফুঁক, তাবীজ-তুমার ইত্যাদিও আসবাবের অন্তর্ভুক্ত বৈ কি। এর নিজস্ব কোনও শক্তি নেই। আল্লাহ তা'আলাই এর আছর ও ফলাফল প্রকাশ করেন। মুসলিম ব্যক্তি যখন কোনও সূরা বা আয়াত কিংবা দুআ পড়ার দ্বারা ঝাড়ফুঁক করে, তখন তার ভরসা তো আল্লাহ তা'আলার উপরই থাকে। এসবের মাধ্যমে তো সে আল্লাহ তা'আলারই আশ্রয় গ্রহণ করে। কাজেই শিরকের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক, বিশেষত যখন হাদীছে এর বৈধতার প্রমাণও আছে?

তাদের আরেকটি দলীল হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ-

إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ

'রুক্‌য়া, তাবীজ ও তিওয়ালা শিরক। (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৮৩; সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৫৩০; মুসনাদে আহমাদ: ৩৬১৫: মুসনাদে আবু ইয়া'লা ৫২০৮; সহীহ ইবন হিব্বান ৬০৯০: তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ১০৫০৩; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯৬০৩: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৩২৪০)

তিওয়ালা একপ্রকার জাদু। জাদু ইসলামে নিষিদ্ধ। এটা শিরকী কাজ। এ হাদীছে তিওয়ালার সঙ্গে রুক্‌য়া ও তাবীজকেও শিরক বলা হয়েছে। সুতরাং রুক্‌য়া ও তাবীজও জাদুর মতো হারাম বৈ কি।

প্রকৃতপক্ষে এর দ্বারাও প্রচলিত রুক্‌য়া ও তাবীজকে হারাম বলা যায় না। কেননা এ হাদীছে যে রুক্‌য়া ও তাবীজকে শিরক বলা হয়েছে, তার সঙ্গে প্রচলিত রুক্‌য়া ও তাবীজের সম্পর্ক নেই। কেননা এখন রুক্‌য়া ও তাবীজ করা হয় কুরআনের আয়াত বা হাদীছের দুআ দ্বারা। সেকালে করা হতো শিরকী মন্ত্র-তন্ত্র দ্বারা। সে কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নিষেধ করেছেন।

বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করেন, তখন এখানে রুক্‌য়া ও ঝাড়ফুঁকের প্রচলন ছিল। শিরকী কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি তা নিষেধ করে দেন। এ অবস্থায় একবার এক সাহাবীকে একটি বিষধর সাপ দংশন করে। বিষয়টা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হয়। তাঁকে আরও বলা হয়, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হাজম পরিবার বিষ নামানোর জন্য রুক্‌য়া করত। বিশেষত উমারার এ কাজে বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। কিন্তু আপনি নিষেধ করলে তারা তা ছেড়ে দেয়। তিনি বললেন, ঠিক আছে, উমারাকে ডেকে আনো। তাকে ডেকে আনা হলো। তিনি তাকে বললেন, তুমি কীভাবে রুক্‌য়া কর আমাকে বলো। উমারা তা বললেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে দূষণীয় কিছু দেখতে পেলেন না। ফলে তাদেরকে রুক্‌য়া করার অনুমতি দিলেন। তিনি বললেন-

مَا أَرَى بَأْسًا مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يَنْفَعَ أَخَاهُ فَلْيَنْفَعُهُ

'আমি কোনও দোষ দেখছি না। তোমাদের মধ্যে নিজ ভাইয়ের কোনও উপকার করার ক্ষমতা যার আছে, সে যেন তার উপকার করে। (সহীহ মুসলিম: ২১৯৯: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ১৯৫৯৫; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৫৩০: মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ১৯১৪: তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার ৭১৯৫)

এর দ্বারা বোঝা যায় রুক্‌য়া প্রথমে সাধারণভাবে নিষিদ্ধ ছিল। পরে নির্দোষ রুক্‌য়া বৈধও করে দেওয়া হয়। অতঃপর হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রুক্‌য়া করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে নিজের রুক্‌য়া করেছেন, তিনি অন্যকে রুক্‌য়া করেছেন এবং অন্যদেরকে রুক্‌য়া করার অনুমতি দিয়েছেন। একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হলে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তাঁর কাছে উপস্থিত হন এবং তাঁকে এই বলে রুক্‌য়া করেন-

بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَىْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيك

'আমি আল্লাহর নামে আপনার রুক্‌য়া করছি এমন সবকিছু থেকে, যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক প্রাণীর অনিষ্ট থেকে এবং ঈর্ষাকারীর চোখ থেকে। আল্লাহ আপনাকে শিফা দান করুন। আল্লাহর নামে আপনার রুক্‌য়া করছি। (সহীহ মুসলিম: ২১৮৬; জামে তিরমিযী: ৯৭২। সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৫২৩; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ১০৭৭৬: সহীহ ইবন হিব্বান: ৬০৯৫; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ১০৬৬)

এ দুআটি পড়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও অন্যদের রুক্‌য়া করতেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন দুআ পড়ে রুক্‌য়া করেছেন। যেমন কারও শরীরে কোনও বেদনা হলে বা ফোঁড়া হলে কিংবা কেউ জখম হলে তিনি তাঁর শাহাদাত আঙুল মাটিতে রাখতেন, তারপর সে আঙুল তুলে দুআ পড়তেন-

بِاسْمِ اللَّهِ تُرْبَةُ أَرْضِنَا بِرِيقَةِ بَعْضِنَا لِيُشْفَى بِهِ سَقِيمُنَا بِإِذْنِ رَبِّنَا

'আল্লাহর নামে। আমাদের ভূমির মাটি আমাদের কারও থুথুর সঙ্গে। এর দ্বারা আমাদের রুগ্ন ব্যক্তি নিরাময় লাভ করবে আমাদের প্রতিপালকের ইচ্ছায়। (সহীহ মুসলিম: ২১৯৪: সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৯৫; মুসনাদুল হুমায়দী: ২৫৪: হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৮২৬৬; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৪১৫)


এ সবকিছু দ্বারা প্রমাণিত হয় রুক্‌য়া শরীয়তসম্মত। এটা করা জায়েয। হাদীছে যে রুক্‌য়াকে শিরক বলা হয়েছে, তা দ্বারা এমন রুক্‌য়া বোঝানো উদ্দেশ্য, যাতে কুফরী বাক্য ব্যবহৃত হয়।

রুক্‌য়ার প্রকারভেদ ও শরীয়তসম্মত রুক্‌য়া

ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, রুক্‌য়া তিন প্রকার। (ক) ইসলামপূর্ব যুগে প্রচলিত রুক্‌য়া, যাতে দুর্বোধ্য মন্ত্র পাঠ করা হতো। (খ) এমন রুক্‌য়া, যা আল্লাহ তা'আলার নাম ও তাঁর কারাম দ্বারা করা হয়। (গ) এমনসব রুক্‌য়া, যাতে ফিরিশতা, ওলী-বুযুর্গ, আরশ প্রভৃতি গায়রুল্লাহর নাম ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে প্রথম প্রকার রুক্‌য়া এ কারণে হারাম যে, তাতে শিরকে লিপ্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার রুক্‌য়া বৈধ; বরং হাদীছে বর্ণিত নিয়মে করা হলে তা পছন্দনীয়। আর তৃতীয় প্রকার রুক্‌য়ায় যদি গায়রুল্লাহকে সম্মান করা উদ্দেশ্য হয়, তবে তা পরিহার করা জরুরি। আর সেরকম উদ্দেশ্য না থাকলে তা জায়েয হবে বটে, তবে তা থেকেও বেঁচে থাকা উত্তম।

এর দ্বারা বোঝা যায়, রুক্‌য়ায় যা পাঠ করা হয় তা নির্দোষ কথা হলে শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হবে। ইমাম মালিক রহ.-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, উত্তম কথা দ্বারা যে রুক্‌য়া করা হয় তাতে কোনও দোষ নেই। ইমাম শাফিয় রহ. বলেন, আল্লাহর কিতাব ও বোধগম্য যিকির দ্বারা রুক্‌য়া করা হলে তাতে কোনও অসুবিধা নেই।

বস্তুত রুক্‌য়া সঠিক পন্থায় হলে তা সকল মাযহাবেই জায়েয। ইমাম রাযী বহ, বলেন, আল্লাহর নাম ও তাঁর কিতাব দ্বারা যে রুক্‌য়া করা হয়, তা বৈধ হওয়ার বিষয়ে কোনও মতভেদ নেই। ইমাম ইবন হাজার রহ. বলেন, তিনটি শর্ত সাপেক্ষে উলামায়ে কেরাম রুক্‌য়া বৈধ হওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। শর্তগুলো হলো- (ক) রুক্‌য়া হতে হবে আল্লাহর কালাম, তাঁর নামসমূহ কিংবা তাঁর গুণাবলি দ্বারা। (খ) তা আরবী ভাষা বা এমন কোনও ভাষার দ্বারা হতে হবে, যার অর্থ বোঝা যায়। (গ) বিশ্বাস রাখতে হবে যে, রুক্‌য়ার নিজস্ব কোনও শক্তি নেই। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায়ই তা ক্রিয়াশীল হয়।

লক্ষণীয়, তিনটি শর্তেরই সারমর্ম হলো তাওহীদের সংরক্ষণ। অর্থাৎ রুক্‌য়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে বিশ্বাস ও কর্ম কোনওদিক থেকেই শিরকের মলিনতা দ্বারা তাওহীদের পবিত্রতা নষ্ট হতে না পারে।

যেসব ক্ষেত্রে রুক্‌য়া করা যায়

প্রশ্ন হচ্ছে, রুক্‌য়া কোন কোন ক্ষেত্রে করা যাবে? এ প্রশ্ন এসেছে এ কারণে যে, এক হাদীছে আছে-

لَا رُقْيَةَ إِلَّا مِنْ عَيْنٍ أَوْ حُمَةٍ.
'নজর ও বিষ ছাড়া অন্য কিছুতে রুক্‌য়া নেই। (সহীহ বুখারী: ৫৭০৫; সহীহ মুসলিম: ২২০; সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৮৪; জামে' তিরমিযী। ২০৫৭: সুনানে ইবন মাজাহ ৩৫১৩; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৫৩১; মুসনাদুল হুমায়দী: ৮৫৮; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৫৮৭: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯৫৪৫)

এ হাদীছের ভিত্তিতে কেউ কেউ মনে করেন রুক্‌য়া কেবল এ দুই ক্ষেত্রেই জায়েয। কারও উপর বদনজর লাগলে কিংবা বিষাক্ত কোনও প্রাণী কাউকে দংশন করলে কেবল তার নিরাময়ের জন্য রুক্‌য়া করা যাবে, অন্য কোনও ক্ষেত্রে করা যাবে না। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। কেননা এর বাইরেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে রুক্‌য়ার ব্যবহার প্রমাণিত। উলামায়ে কেরাম এ হাদীছটির ব্যাখ্যা করেছেন এই যে, এ দুই ক্ষেত্রে রুক্‌য়া খুব বেশি কার্যকর এবং এ দুই ক্ষেত্রে রুক্‌য়া শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা। যেমন বলা হয়-لَا سَيْفَ إِلَّا ذُو الْفِقارِ (যুলফিকার ছাড়া তরবারি নেই)। অর্থাৎ যুলফিকার শ্রেষ্ঠ তরবারি।

রুক্‌য়া যে অন্যান্য ক্ষেত্রেও জায়েয, বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা তা প্রমাণিত। যেমন হযরত আনাস ইবন মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত-

رُخِّصَ فِي الْحُمَةِ وَالنَّمْلَةِ وَالْعَيْنِ.

'বিষ, ফোঁড়া ও বদনজর থেকে নিরাময়ের জন্য রুক্‌য়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। (সহীহ মুসলিম : ২১৯৬; জামে তিরমিযী: ২০৫৬; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৭৪৯৯; সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৫১৬; মুসনাদে আহমাদ: ১২১৭৩; সহীহ ইবন হিব্বান : ৬১০৪)

অনেক সময় শিশুরা কান্নাকাটি করে। সে কান্নার কোনও কারণ না বাবা-মা খুঁজে পায়, না চিকিৎসক। ফলে বাবা-মা পেরেশান হয়ে পড়ে। রুক্‌য়াও পেরেশানি দূর করার একটা উপায় হতে পারে। একবার এক শিশু কান্নাকাটি করছিল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন-

مَا لِصَيِّكُمْ هَذَا يَبْكِي، فَهَلَا اسْتَرْقَيْتُمْ لَهُ مِنَ الْعَيْنِ.

'তোমাদের এই শিশুটি কাঁদছে কেন? তোমরা কেন তাকে বদনজরের রুক্‌য়া করছ না? (মুসনাদে আহমাদ: ২৪৪৮৬; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৪২৯৫)

বোঝা গেল এ শিশুর কান্নার কারণ ছিল বদনজর। আর এরূপ ক্ষেত্রে রুক্‌য়া দ্বারা সুফল লাভ হয়। মোটকথা শারীরিক-মানসিক সর্বপ্রকার রোগ-ব্যাধি, মানুষের বদনজর, হিংসুকের হিংসা, জিনের স্পর্শ, সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদি বিষধর প্রাণীর দংশন, জখম-ফোঁড়া প্রভৃতি ক্ষেত্রে রুক্‌য়া বা ঝাড়ফুঁক উপকারী হয়ে থাকে। নেককারদের জবানিতে এটা করা হলে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় উপকারলাভের সম্ভাবনা বেশি। এ কয়া নিজে নিজের বেলায়ও করা যেতে পারে, অন্যের দ্বারাও করানো যেতে পারে। সর্বাবস্থায় ব্যক্তির সৎ ও নেককার হওয়াটা উপকারলাভের পক্ষে সহায়ক। কিন্তু এরূপ লোক বিরল হওয়ায় মানুষ রুক্‌য়া ছেড়ে আধুনিক চিকিৎসাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

পূর্বে যে দু'আ উল্লেখ করা হয়েছে, " بِاسْمِ اللَّهِ تُرْبَةُ أَرْضِنَا بِرِيقَةِ بَعْضِنَا لِيُشْفَى بِهِ سَقِيمُنَا بِإِذْنِ رَبِّنَا "- এটির বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরীরের যে-কোনও রোগ-ব্যাধি, ফোঁড়া ও জখম সবকিছুতেই এর দ্বারা রুক্‌য়া করতেন। এমনিভাবে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে দম করার দ্বারা যে-কোনও রোগ-ব্যাধি ও বালা-মসিবত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বলে বিভিন্ন হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, যেমনটা পেছনে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং রুক্‌য়া জাদুটোনা, বদনজর, রোগ-ব্যাধি, ফোঁড়া-জখম, বালা-মসিবত ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

সতর্কতা: মনে রাখতে হবে, রুক্‌য়ার উদ্দেশ্য কেবলই নিজের বা অন্যের উপকার সাধন। কাজেই কারও ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে রুক্‌য়ার ব্যবহার কিছুতেই জায়েয হবে না। অন্যের ক্ষতি করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও কঠিন গুনাহের কাজ।

যা-কিছু দ্বারা রুক্‌য়া করা যাবে

রুক্‌য়ার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবস্থা হলো কুরআন মাজীদ। কুরআন মাজীদের কোনও সূরা বা আয়াত পড়া, পড়ে শরীরে দম করা, পানিতে দম করে সেই পানি পান করা বা তা দ্বারা গোসল করা, হাতে ফুঁ দিয়ে সেই হাত দ্বারা শরীর মোছা হলো সর্বোত্তম রুক্‌য়া। এর দ্বারা উদ্দিষ্ট বিষয়ে উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা সবচে' বেশি। এটা কুরআনুল কারীমের যে-কোনও আয়াত দ্বারাই করা যেতে পারে। সারা কুরআনই শিফা। তা অন্তরের বা রূহানী শিফা তো বটেই, শারীরিক নিরাময়ও এর দ্বারা লাভ হয়ে থাকে। অবশ্য সুনির্দিষ্টভাবে কোনও কোনও সূরা ও আয়াতের কথাও বিভিন্ন হাদীছে বিশেষভাবে বর্ণিত আছে। যেমন সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইয়াসীন, সূরা ফালাক ও সূরা নাস।

জাদুটোনা ও বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি থেকে নিরাময়ের জন্য হাদীছে যেসব দু'আ বর্ণিত হয়েছে বা যেসব উপায় অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, নিঃসন্দেহে তার মধ্যেও অনেক খায়র ও বরকত রয়েছে। কাজেই দৃঢ় বিশ্বাস ও ভক্তির সঙ্গে তার উপরও আমল করা চাই। উদাহরণত জিন শয়তানের ক্ষতি ও বদনজরের কুফল থেকে মুক্তির জন্য পাঠ করা-

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

'আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের, প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত প্রাণী থেকে এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর চোখ থেকে। (সহীহ বুখারী: ৩৩৭১)

এ দু'আ টি অন্যের উপরও পড়া যেতে পারে, বিশেষত শিশুদের উপর। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল ও ইসহাক আলাইহিমাস সালামের উপর এ দু'আ পড়তেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান ও হুসায়ন রাযি.-এর উপরও এ দু'আর দ্বারা রুক্‌য়া করতেন। (সহীহ বুখারী: ৩৩৭১: সুনানে আবূ দাউদ: ৪৭৩৭; জামে তিরমিযী: ২০৬০; সুনানে ইবন মাজাহ ৩৫২৬; মুসনাদে আহমাদ ২১১১; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৭৬৭৯; তহাবী, শারহু মশকিলিল আছার: ২৮৮৫; খারাইতী, মাকারিমল আখলাক: ১০৫৬: হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৪৭৮১)
সে ক্ষেত্রে দু'জনের বেলায় বলতে হবে-

أُعِيْذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لامَّةٍ

আর একজনের বেলায় বলতে হবে-

أُعِيْذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لامَّةٍ

শরীরের কোনও অঙ্গে যে-কোনও রকম ব্যথা-বেদনার জন্য ব্যথার স্থানে ডান হাত বুলিয়ে সাতবার বিশেষ একটি দু'আ পড়ার কথা হাদীছে বর্ণিত আছে। হযরত উছমান ইবন আবূল 'আস রাযি.-এর শরীরের এক অঙ্গে বেদনা ছিল। খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

امْسَحْهُ بِيَمِينِكَ سَبْعَ مَرَّاتٍ وَقُلْ أَعُوذُ بِعِزَّةِ اللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِد

'তুমি ব্যথার জায়গাটিতে সাতবার তোমার ডান হাত বুলাও আর বলো-

أَعُوذُ بِعِزَّةِ اللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِد (আল্লাহর ক্ষমতা ও শক্তির আশ্রয় গ্রহণ করছি)। জামে' তিরমিযী: ২০৮০; সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৯১; সুনানে ইবন মাজাহ ৩৫২২: নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৭৫০৪; সহীহ ইবন হিব্বান ২৯৬৫; ইবনুস সুন্নী, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লায়লা ৫৪৫; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ১২৭১: বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ২৫৭

তাবীজ প্রসঙ্গ

তাবীজ শব্দটির আরবী উচ্চারণ تَعْوِيدٌ, যেমন পূর্বে বলা হয়েছে। যে-কোনও সূরা আয়াত কিংবা দু'আ পড়ে ঝাড়ফুঁক করাকে যেমন রুক্‌য়া বলা হয়, তেমনি এর জন্য তাবীজ শব্দেরও ব্যবহার আছে। তবে প্রচলিত অর্থে তাবীজ বলা হয় সূরা বা আয়াত কিংবা দু'আ লিখিতরূপে ব্যবহার করাকে, তা কোনও মাদুলির ভেতরে হোক বা এমনিই সুতায় বেঁধে হোক। এটা সাধারণত গলায় ঝুলিয়ে বা বাহুতে বেঁধে ব্যবহার করা হয়। আরবীতে একে تَمِيمَةٌ বলে।

রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-আপদে ঝাড়ফুঁক করার মতো তাবীজ ব্যবহার করাও শরীয়তসম্মত। তবে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি আছে। কেউ একে সম্পূর্ণ নাজায়েয বলে, এমনকি শিরক সাব্যস্ত করে। অপরদিকে একশ্রেণির লোক ঝাড়ফুঁক ও তাবীজকেই সবকিছু মনে করে। সকল উদ্দেশ্য পূরণে এটাই তাদের একমাত্র অবলম্বন। রোগ-ব্যাধি হলে কোনওমতেই আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করবে না। এ বাড়াবাড়ি কোনওক্রমেই সংগত নয়।

ইসলামপূর্ব যুগেও তাবীজের ব্যবহার ছিল। বিশেষত কুদৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য তারা এর ব্যবহার করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, তাবীজের এমন নিজস্ব শক্তি আছে, যা বদনজরসহ সমস্ত বালা-মসিবত দূর করতে পারে। বলাবাহুল্য, এরূপ বিশ্বাস সম্পূর্ণ শিরক। কোনও মাখলুকেরই নিজস্ব কোনও ক্ষমতা নেই। কোনও বস্তুর দ্বারা যে উপকার লাভ হয়, তা সম্পূর্ণই আল্লাহ তা'আলার দান ও তাঁর ইচ্ছার প্রকাশ। তিনি ইচ্ছা না করলে কারও দ্বারাই কোনও উপকার লাভ বা কারও দ্বারা কোনও ক্ষতি হওয়া সম্ভব নয়। জাহিলী যুগে মানুষ যেহেতু তাবীজের নিজস্ব ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিল, তাছাড়া তারা তাবীজের ভেতর দুর্বোধ্য মন্ত্র যোগ করত, তাই শুরুতে ইসলাম এটাকে হারাম করেছিল। হযরত আলী রাযি. ও হযরত ইবন মাস'উদ রাযি. থেকে বর্ণিত আছে-

«إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ»

'রুক্‌য়া, তাবীজ ও তিওয়ালা শিরক। সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৮৩; সুনানে ইবন মাজাহ ৩৫৩০; মুসনাদে আহমাদ: ৩৬১৫; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৫২০৮; সহীহ ইবন হিব্বান ৬০৯০; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ১০৫০৩; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯৬০৩; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৩২৪০

এ হাদীছে ইসলামপূর্ব কালের রেওয়াজ হিসেবেই তাবীজকে শিরক সাব্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং যে তাবীজে শিরকের কোনও বিষয় থাকবে না, তা জায়েয হবে বৈ কি। কোনও মুসলিম তাবীজের নিজস্ব ক্ষমতায় বিশ্বাস রাখে না। তাদের বিশ্বাস আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতার উপর।

দ্বিতীয়ত তারা তাবীজে কোনও দুর্বোধ্য মন্ত্র বা শিরকী কথাবার্তা যোগ করে না। মুসলিমগণ যে তাবীজ ব্যবহার করে, তাতে কুরআন মাজীদের কোনও সূরা বা আয়াত থাকে কিংবা থাকে হাদীছে বর্ণিত কোনও দু'আ । তাই এরূপ তাবীজে শিরকের কোনও বিষয় নেই। বরং এর দ্বারা নির্ভর করা হয় আল্লাহ তা'আলার উপরই। তাবীজে যে দু'আ লেখা হয়, তা দ্বারা মূলত আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করা হয়, যাতে তিনি বান্দার উদ্দেশ্য পুরণ করেন। আর যদি কুরআন মাজীদের সূরা বা আয়াত লেখা হয়, তবে তার উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহ তা'আলার কালামের বরকত লাভ করা। প্রকারান্তরে এটা আল্লাহ তা'আলারই আশ্রয় গ্রহণ। আল্লাহর কালামে মানুষের অন্তরের রোগ-ব্যাধির যেমন শিফা আছে, তেমনি শিফা আছে শারীরিক রোগ-ব্যাধিরও। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-

وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ

'আমি নাযিল করছি এমন কুরআন, যা মুমিনদের পক্ষে শেফা ও রহমত। সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৮২

সুতরাং তাবীজ ব্যবহার সম্পূর্ণ বৈধ। এর বৈধতা সম্পর্কে হানাফী, মালিকী ও শাফি'ঈ মাযহাবের ইমামগণ একমত। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রহ. থেকেও এর বৈধতা প্রমাণিত আছে। বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাযি. নিজেও তাবীজ লিখেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর থেকে হাদীছ বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ ঘুমের ভেতর ভয় পেলে সে যেন পড়ে-

بِسْمِ اللهِ ،أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ ، مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ ، وَشَرِّ عِبَادِهِ ، وَمِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ ، وَأَنْ يَحْضُرُونِ.

(আল্লাহর নামে। আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের, তাঁর ক্রোধ থেকে, তাঁর শাস্তি থেকে, তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট থেকে, শয়তানদের প্ররোচনা এবং আমার কাছে তাদের উপস্থিতি থেকে)।

এ দু'আ পড়লে শয়তানেরা তার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাযি. তাঁর বালেগ সন্তানদেরকে এ দু'আ শিখিয়ে দিতেন। আর যারা নাবালেগ ছিল, তাদের গলায় এ দু'আ টি কোনও কাগজে লিখে ঝুলিয়ে দিতেন। জামে' তিরমিযী: ৩৫২৮; সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৯৩: মুসনাদে আহমাদ: ৬৬৯৬; বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ৪০৭

বিখ্যাত তাবি'ঈ সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহ.-কে তাবীজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, চামড়ায় লেখা হলে কোনও দোষ নেই।

প্রসিদ্ধ তাবি'ঈ আতা ইবন আবী রাবাহ রহ. বলেন, কুরআন গলায় ঝোলানো হলে কোনও সমস্যা নেই।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি.-এর বিখ্যাত ছাত্র মুজাহিদ রহ, মানুষকে তাবীজ লিখে দিতেন। এমনিভাবে ইমাম বাকির ও ইমাম ইবন সীরীন রহ. থেকেও এর বৈধতা প্রমাণিত। সুতরাং তাবীজকে গড়পড়তায় শিরক ও নাজায়েয বলে দেওয়া নিতান্তই বাড়াবাড়ি। তবে এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনও জরুরি। তাবীজ অবশ্যই আল্লাহর কালাম, হাদীছে বর্ণিত দু'আ বা উৎকৃষ্ট কথার দ্বারা হতে হবে। যে তাবীজে শিরকী মন্ত্র বা দুর্বোধ্য কথাবার্তা থাকে, তা ব্যবহার করা কিছুতেই জায়েয হবে না। জায়েয তাবীজের ক্ষেত্রেও মনে রাখতে হবে যে, এটা কেবলই জায়েয, কোনও ছাওয়াবের কাজ নয়।

ছাওয়াবের কাজ হলো সরাসরি কুরআন তিলাওয়াত করা বা আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'আ করা। কুরআন তিলাওয়াত ও দু'আ পাঠ করা ইবাদত। তাই যে-কোনও নেক মাকসাদ পূরণের জন্য তাবীজ অপেক্ষা এ ব্যবস্থা অবলম্বন করাই উত্তম। উদ্দেশ্য পূরণ না হলেও এ ব্যবস্থা বৃথা যায় না। কেননা তিলাওয়াত ও দু'আর ছাওয়াব তো অবশ্যই পাওয়া যাবে। বান্দার সবচে' বড় লক্ষ্যবস্তু তো ছাওয়াব হাসিল করাই।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে রুক্‌য়া ও তাবীজ

বিপদ আসার পূর্বে বা বদনজর থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থ হিসেবেও রুক্‌য়া ও তাবীজ জায়েয। বহু হাদীছ দ্বারা এর বৈধতা প্রমাণিত। যেমন একবার এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ রাতে আমি দংশিত হয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, কীসে তোমাকে দংশন করেছে? সে বলল, বিচ্ছুতে। তিনি বললেন, তুমি যদি সন্ধ্যাকালে পাঠ করতে أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ (আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের আশ্রয় গ্রহণ করছি তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে), তবে আল্লাহর ইচ্ছায় তা তোমার কোনও ক্ষতি করতে পারত না। সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৯৮; মুসনাদুল বাযযার ৯০৬৬; মুসনাদে ইবনুল জা'দ ১৫৮৫। নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ১০৩৫০; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার ১৬: খারাইডী মাকারিমুল আখলাক ৮৬৯; সহীহ ইবন হিব্বান: ১০২১; বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ৩৬৫

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান ও হুসায়ন রাযি.-কে বদনজর থেকে রক্ষার জন্য বিশেষ একটি দু'আর দ্বারা রুক্‌য়া করতেন। তিনি বলতেন, তোমাদের পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্র ইসমাঈল ও ইসহাক আলাইহিমাস সালামকে এর দ্বারা রুক্‌য়া করতেন। দু'আ টি হলো-

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ.

'আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের, প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত প্রাণি থেকে এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর চোখ থেকে। সহীহ বুখারী: ৩৩৭১

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও ঘুমের আগে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে দু'হাতে ফুঁ দিতেন এবং তা দ্বারা চেহারা ও দেহের যতটুকু সম্ভব মুছে নিতেন। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এছাড়াও বিভিন্ন দু'আ ও আমলের কথা বহু হাদীছে বর্ণিত আছে।

তাবীজ ও ঝাড়ফুঁকের আর্থিক বিনিময় গ্রহণ

ঝাড়ফুঁক ও তাবীজ করে বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয। এ বিষয়ে একটি সুন্দর ঘটনা বর্ণিত আছে। একবার সাহাবায়ে কেরামের একটি দল কোথাও জিহাদের সফর করছিলেন। তারা ছিলেন ৩০ জন। পথে তারা কোনও এক লোকালয়ে যাত্রাবিরতি দেন। তারা ক্ষুধার্ত ছিলেন। তাই সেখানকার লোকজনের কাছে আতিথেয়তার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু সেখানকার লোকজন স্পষ্ট জানিয়ে দিল- আমরা তোমাদের খাবার দিতে পারব না। ওদিকে তাদের গোত্রপতিকে বিচ্ছু দংশন করেছিল। অনেক চেষ্টা করেও তারা তার বিষ নামাতে পারেনি। অগত্যা তারা সাহাবায়ে কেরামের সেই দলটির শরণাপন্ন হলো। আশা ছিল তাদের কাছে রুক্‌য়া জানা কোনও লোক থাকতে পারে। তারা এসে বিনয়ের সঙ্গে জানাল, আমাদের গোত্রপতিকে বিচ্ছু দংশন করেছে। আমরা অনেক চেষ্টা-তদবির করেও তার বিষ নামাতে পারিনি। আপনাদের কাছে কি রুক্‌য়া জানে এমন কেউ আছে?

বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. এ দলে ছিলেন। তিনি বললেন, তা তো আছেই। কিন্তু আমরা তোমাদের কাছে আতিথেয়তা চেয়েছিলাম। তোমরা আমাদের আতিথেয়তা করনি। কাজেই আমি কিছুতেই তোমাদের রুক্‌য়া করব না। অবশ্য তোমরা যদি মজুরি দাও, তবে ভিন্ন কথা। শেষে স্থির হলো তারা একপাল বকরি দেবে। কোনও কোনও বর্ণনায় আছে ৩০টি বকরি দেবে। এতে তিনি রাজি হলেন।

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাযি. তাদের সঙ্গে তাদের গোত্রপতির কাছে গেলেন। সাতবার সূরা ফাতিহা পড়ে তাকে ঝাড়লেন। ফলে সে তখনই ভালো হয়ে গেল। উঠে এমনভাবে হাঁটা শুরু করল, যেন তার কোনও ব্যথাই নেই।

তারা কথা রাখল এবং একপাল বকরি তাঁকে দিয়ে দিল। তিনি বকরির পাল নিয়ে সঙ্গীদের কাছে ফিরে আসলেন। তাদের কেউ কেউ বললেন, এগুলো আমাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হোক। কিন্তু হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. তাতে সম্মত হলেন না। তিনি বললেন, আমি তো রুক্‌য়া ভালো জানি না। তাও এ বকরিগুলো নিয়েছি। কাজেই আমরা এখন এগুলো খাব না; বরং আগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে যাই এবং সবটা বৃত্তান্ত তাঁকে জানাই। তারপর তিনি যা বলেন সেইমতো কাজ করব। সকলে এ কথা মেনে নিলেন। তারপর তারা মদীনায় ফিরে আসলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবটা বৃত্তান্ত শুনে বললেন-

وَمَا يُدْرِيكَ أَنَّهَا رُقْيَةٌ، ثُمَّ قَالَ: قَدْ أَصَبْتُمُ اقْسِمُوا وَاضْرِبُوا لِي مَعَكُمْ سَهْمًا، فَضَحِكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم

'তুমি কী করে জানলে এটা রুক্‌য়া (অর্থাৎ সূরা ফাতিহা দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা যায়)? তা তোমরা সঠিক করেছ। এখন এগুলো বণ্টন করে ফেলো। তোমাদের সঙ্গে আমাকেও একটা ভাগ দিয়ো। এই বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। সহীহ বুখারী: ২২৭৬; জামে' তিরমিযী: ২০৬৪ সুনানে ইবন মাজাহ: ২১৫৬; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৭৪৯০; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৬০১৮: সহীহ ইবন হিব্বান: ৬১১২; হাকিম, আল মুসতাদরাক ২০৫৪; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান ২২৩৭: বাগাৰী, শারহুস সুন্নাহ: ১১৮৯

এ ঘটনা দ্বারা কেবল ঝাড়ফুঁকের বৈধতাই প্রমাণ হয় না; সেইসঙ্গে এটাও প্রমাণ হয় যে, ঝাড়ফুঁক করে আর্থিক বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয আছে। অপর এক হাদীছে উপরে বর্ণিত ঘটনার বিবরণে আছে, সাহাবীগণ বলেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো কুরআনের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন-

«إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ»

'তোমরা যার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ কর, তার মধ্যে কুরআনই শ্রেষ্ঠ। সহীহ বুখারী: ৫৭৩৭; সহীহ ইবন হিব্বান ৫১৪৬; সুনানে দারা কতনী: ৩০৩৮: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ২০১৯; শু'আবূল ঈমান: ২৩৯৩; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২১৮৭

অপর এক সাহাবী একাধারে তিন দিন সকাল-সন্ধ্যা সূরা ফাতিহা দ্বারা এক পাগলকে রুক্‌য়া করেছিলেন। তাতে সে লোকটি সুস্থ হয়ে যায়। তারা সেই সাহাবীকে আর্থিক বিনিময় দিয়েছিল। সাহাবী এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন-

كُلْ فَلَعَمْرِي لَمَنْ أَكَلَ بِرُقْيَةٍ بَاطِلٍ لَقَدْ أَكَلْتَ بِرُقْيَةٍ حَقٍّ

'খাও। আল্লাহর কসম! ওরা তো ভ্রান্ত রুক্‌য়ার বিনিময়ে খেয়ে থাকে। তুমি খাবে সত্য-সঠিক রুক্‌য়ার বিনিময়ে। সুনানে আবূ দাউদ: ৩৪২০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২২৫৮৬; মুসনাদে আবূ দাউদ ওয়ালিসী: ১৪৫৯; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৬০১৭; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৫০৯; ইবনুস সুন্নী, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লায়লা ৬৩০; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২১৫০
এসব হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, ঝাড়ফুঁক ও তাবীজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয। তবে অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের মতো এ ক্ষেত্রেও সততা জরুরি। মানুষকে ঠকিয়ে বা কোনওরকম প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কারও কাছ থেকে অর্থকড়ি হাতিয়ে নেওয়া জায়েয নয় কোনও ক্ষেত্রেই। ঝাড়ফুঁক ও তাবীজ-কবজও তার ব্যতিক্রম নয়। আজকাল যারা এ কাজকে পেশা বানিয়ে নিয়েছে, যারা এর মাধ্যমেই অর্থ উপার্জন করে, তাদের অধিকাংশই এ বিষয়ে সচেতন নয়। এতে করে তাদের উপার্জন যেমন অবৈধ হয়ে যায়, তেমনি কুরআন-হাদীছকেও একরকম অবমাননা করা হয়। কুরআন-হাদীছ ও মাসনূন দু'আসমূহকে অসৎ অর্থোপার্জনের মাধ্যম বানানো এক কঠিনতম পাপকর্ম। এর থেকে বিরত থাকা সকলের জন্য একান্ত অপরিহার্য।

সূরা মুলকের ফযীলত
১০১৬. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কুরআনের ত্রিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা আছে। সূরাটি এক ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করল। ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো। সে সূরাটি হলো تبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ। -আবূ দাউদ ও তিরমিযী। (সুনানে আবূ দাউদ: ১৪০০: জামে' তিরমিযী: ২৮৯১: নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা। ১১৫৪৮: সুনানে ইবন মাজাহ ৩৭৮৬; মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৬২: মুসনাদে ইসহাক ই রাহুয়াহ : ১২২: মুসনাদুল বাযযার ৯৫০৪; সহীহ ইবন হিব্বান ৭৮৭: হাকিম, আল মুসতাদরাক: ২০৭৫)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1016 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «مِنَ القُرْآنِ سُورَةٌ ثَلاثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُلٍ حَتَّى غُفِرَ لَهُ، وَهِيَ: {تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ المُلْكُ}». رواه أَبُو داود والترمذي، (1) وقال: «حديث حسن».
وفي رواية أَبي داود: «تَشْفَعُ».
হাদীস নং: ১০১৭
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ রাতের বেলা সূরা বাকারার শেষের আয়াতদু'টি পড়া
১০১৭. হযরত আবূ মাস'উদ আল-বাদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোনও রাতে সূরা বাকারার শেষের দুই আয়াত পাঠ করে, (সে রাতে) তার জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যায়। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী: ৪০০৮; সহীহ মুসলিম: ৮০৮; সুনানে আবূ দাউদ: ১৩৯৭; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৭৯৪৯; জামে' তিরমিযী: ২৮৮১; সুনানে ইবন মাজাহ ১৩৬৭; সুনানে দারিমী: ১৫২৮; সহীহ ইবন খুযায়মা: ১১৪১; সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৮১; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৫৪১)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1017 - وعن أَبي مسعودٍ البَدْرِيِّ - رضي الله عنه - عن النبي - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «مَنْ قَرَأَ بِالآيَتَيْنِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ البَقَرَةِ في لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ». متفقٌ عَلَيْهِ. (1)
قِيلَ: كَفَتَاهُ الْمَكْرُوهَ تِلْكَ اللَّيْلَةَ، وَقِيلَ: كَفَتَاهُ مِنْ قِيامِ اللَّيْلِ.
হাদীস নং: ১০১৮
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ সূরা বাকারার ফযীলত
১০১৮. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ে ফেলো না। যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, সে ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়। -মুসলিম (সহীহ মুসলিম: ৭৮০, জামে' তিরমিযী: ২৮৭৭; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৭৯৬১: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১১৯৩; মুসনাদে আহমাদ: ৭৮০৭। বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান : ২১৬৪; মুসনাদুল বাযযার: ৯০৯১; সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৮৩)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1018 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «لاَ تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ البَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ البَقرَةِ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০১৯
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠতম আয়াত
১০১৯. হযরত উবাঈ ইবন কা'ব রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবূল মুনযির। তুমি কি জান তোমার সঙ্গে আল্লাহর যে কিতাব আছে তার শ্রেষ্ঠতম আয়াত কোনটি? আমি বললাম- اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ তিনি আমার বুকে চাপড় মেরে বললেন, হে আবূল মুনযির। ইলম তোমার জন্য উপভোগ্য হোক। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ৮১০; সুনানে আবূ দাউদ: ১৪৬০; মুসনাদে আহমাদ: ২০৫৮৮: মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ৫৫২; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৬০০১: তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর : ৫২৬: হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৫৩২৬; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান ২১৬৯, বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১১৯৫)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1019 - وعن أُبَيِّ بنِ كَعبٍ - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم: «يَا أَبَا الْمُنْذِرِ، أَتَدْري أيُّ آيَةٍ مِنْ كِتَابِ الله مَعَكَ أعْظَمُ؟» قُلْتُ: {اللهُ لاَ إلَهَ إِلاَّ هُوَ الحَيُّ القَيُّومُ} فَضَرَبَ فِي صَدْرِي، وقال: «لِيَهْنِكَ العِلْمُ أَبَا الْمُنْذِرِ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০২০
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ আয়াতুল কুরসীর ফযীলত ও এ সম্পর্কিত চমৎকার একটি ঘটনা
১০২০. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রমাযানের যাকাত (সদাকাতুল ফিতর) রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিলেন। (আমি দায়িত্ব পালন করতে থাকলাম। এ অবস্থায়) এক আগন্তুক আমার কাছে আসল এবং সে (সদাকাতুল ফিতরের) খাদ্যবস্তু থেকে খাবলা ভরে তুলে নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম। তারপর বললাম, আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত করব। সে বলল, আমি একজন অভাবী লোক। আমার উপর পরিবারবর্গের ভারও রয়েছে। আমার প্রচণ্ড অভাব। ফলে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। তারপর রাত পোহাল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, হে আবূ হুরায়রা! গেল রাতে তোমার বন্দি কী করল? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে তার প্রচণ্ড অভাব ও পরিবারবর্গের কথা বলল। ফলে তার প্রতি আমার দয়া হলো। তাই তাকে ছেড়ে দিলাম। তিনি বললেন, শোনো হে! সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। সে আবার আসবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথায় আমার নিশ্চিত বিশ্বাস হলো সে আবার আসবে। কাজেই আমি তার জন্য ওত পেতে থাকলাম। ঠিকই সে এসে খাবলা ভরে খাদ্যবস্তু নিতে শুরু করল। আমি বললাম, আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত করব। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি একজন অভাবী লোক। আমার উপর পরিবারবর্গের ভারও রয়েছে। আমি আর আসব না। তার প্রতি আমার দয়া হলো। ফলে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। তারপর রাত পোহাল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, হে আবূ হুরায়রা! তোমার বন্দি কী করল? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে তার প্রচণ্ড অভাব ও পরিবারবর্গের কথা বলল। ফলে তার প্রতি আমার দয়া হলো। তাই তাকে ছেড়ে দিলাম। তিনি বললেন, শোনো হে! সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। সে আবার আসবে।
আমি তার জন্য তৃতীয়বার ওত পেতে থাকলাম। ঠিকই সে এসে খাবলা ভরে খাদ্যবস্তু নিতে শুরু করল। আমি বললাম, আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত করব। এটা তিনবারের শেষবার যে, তুমি বলছ আর আসবে না, অথচ তারপরও আসছ। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে এমন কিছু কথা শেখাব, যা দ্বারা আল্লাহ তোমাকে উপকৃত করবেন। বললাম, তা কী? সে বলল, তুমি যখন তোমার বিছানায় যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ থেকে শেষ পর্যন্ত আয়াতটি পড়বে। এটা পড়লে আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার জন্য একজন হেফাজতকারী নিযুক্ত থাকবে এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।
তারপর আমার রাত পোহাল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, গেল রাতে তোমার বন্দি কী করল? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে বলল, আমাকে কিছু কথা শিখিয়ে দেবে, যা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা আমাকে উপকৃত করবেন। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। তিনি বললেন, তা কী? বললাম, সে আমাকে বলল, তুমি যখন তোমার বিছানায় যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّوْمُ থেকে শেষ পর্যন্ত আয়াতটি পড়বে। এটা পড়লে আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার জন্য একজন হেফাজতকারী নিযুক্ত থাকবে এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, শোনো! সে তোমাকে সত্য বলেছে বটে, কিন্তু সে একজন ঘোর মিথ্যুক। তুমি কি জান হে আবূ হুরায়রা, তিন রাত যাবৎ তুমি কার সঙ্গে কথা বলছিলে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সে এক শয়তান। -বুখারী (সহীহ বুখারী: ২৩১১; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ১০৭২৯; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান। ২১৭০: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১১৯৭; সহীহ ইবন খুযায়মা: ২৪২৪)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1020 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه - قَالَ: وَكَّلَنِي رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم - بِحِفْظِ زَكَاةِ رَمَضَانَ، فَأتَانِي آتٍ فَجَعَلَ يَحْثُو مِنَ الطَّعَام، فَأخَذْتُهُ فقُلتُ: لأَرْفَعَنَّكَ إِلَى رسولِ الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: إنِّي مُحْتَاجٌ، وَعَليَّ عِيَالٌ، وَبِي حَاجَةٌ شَدِيدَةٌ، فَخَلَّيْتُ عَنْهُ، فَأصْبَحْتُ، فَقَالَ رسول الله - صلى الله عليه وسلم: «يَا أَبَا هُريرة، مَا فَعَلَ أَسِيرُكَ البَارِحَةَ؟» قُلْتُ: يَا رسول الله، شَكَا حَاجَةً وَعِيَالًا، فَرحِمْتُهُ فَخَلَّيْتُ سَبيلَهُ. فَقَالَ: «أمَا إنَّهُ قَدْ كَذَبَكَ وَسَيَعُودُ» فَعَرَفْتُ أنَّهُ سَيَعُودُ، لقولِ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - فَرَصَدْتُهُ، فَجاء يَحْثُو مِنَ الطَّعَامِ، فَقُلتُ: لأَرْفَعَنَّكَ إِلَى رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: دَعْنِي فَإنِّي مُحْتَاجٌ، وَعَلَيَّ عِيَالٌ لاَ أعُودُ، فَرحِمْتُهُ فَخَلَّيْتُ سَبيلَهُ، فَأصْبَحْتُ فَقَالَ لي رسول الله - صلى الله عليه وسلم: «يَا أَبَا هُريرة، مَا فَعَلَ أَسِيرُكَ البَارِحَةَ؟» قُلْتُ: يَا رسول الله، شَكَا حَاجَةً وَعِيَالًا، فَرحِمْتُهُ فَخَلَّيْتُ سَبيلَهُ. فَقَالَ: «إنَّهُ قَدْ كَذَبَكَ وَسَيَعُودُ» فَرَصَدْتُهُ الثَّالثَة، فَجاء يَحْثُو مِنَ الطَّعَامِ فَأخَذْتُهُ، فَقُلتُ: لأَرْفَعَنَّكَ إِلَى رسولِ الله - صلى الله عليه وسلم - وهذا آخِرُ ثلاثِ مَرَّاتٍ أنَّكَ تَزْعُمُ أنَّكَ لاَ تَعُودُ! فَقَالَ: دَعْنِي فَإنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ يَنْفَعُكَ اللهُ بِهَا، قُلْتُ: مَا هُنَّ؟ قَالَ: إِذَا أَوَيْتَ إِلَى فِرَاشِكَ فَاقْرَأْ آيَةَ الكُرْسِيِّ، فَإنَّهُ لَنْ يَزَالَ عَلَيْكَ مِنَ الله حَافِظٌ، وَلاَ يَقْرَبُكَ شَيْطَانٌ حَتَّى تُصْبِحَ، فَخَلَّيْتُ سَبِيلَهُ، فَأصْبَحْتُ، فَقَالَ لي رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم: «مَا فَعَلَ أسِيرُكَ البَارِحَةَ؟» قُلْتُ: يَا رسول الله، زَعَمَ أنَّهُ يُعَلِّمُنِي كَلِمَاتٍ يَنْفَعُنِي اللهُ بِهَا، فَخَلَّيْتُ سَبيلَهُ، قَالَ: «مَا هِيَ؟» قُلْتُ: قَالَ لي: إِذَا أَوَيْتَ إِلَى فِرَاشِكَ فَاقْرَأْ آيَة الكُرْسِيِّ مِنْ أوَّلِهَا حَتَّى تَخْتِمَ الآية: {اللهُ لاَ إلَهَ إِلاَّ هُوَ الحَيُّ القَيُّومُ} وقال لِي: لاَ يَزَالُ عَلَيْكَ مِنَ اللهِ حَافِظٌ، وَلَنْ يَقْرَبَكَ شَيْطَانٌ حَتَّى تُصْبِحَ. فَقَالَ النبيُّ - صلى الله عليه وسلم: «أمَا إنَّهُ قَدْ صَدَقَكَ وَهُوَ كَذُوبٌ، تَعْلَمُ مَنْ تُخَاطِبُ مُنْذُ ثَلاَثٍ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ؟» قُلْتُ: لاَ. قَالَ: «ذَاكَ شَيْطَانٌ». رواه البخاري. (1)
হাদীস নং: ১০২১
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াতের ফযীলত
১০২১. হযরত আবূদ দারদা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি আাসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি সূরা কাহফের প্রথম ১০টি আয়াত মুখস্থ করবে, তাকে দাজ্জাল থেকে রক্ষা করা হবে।

অপর এক বর্ণনায় আছে, সূরা কাহফের শেষের ১০ আয়াত। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ৮০৯; সুনানে আবূ দাউদ: ৪৩২৩; জামে তিরমিযী: ২৮৮৬: নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৭৯৭১; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৬০২২: সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৮৫: হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৩৩৯১: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ৫৯৯৬; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১২০৪)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1021 - وعن أَبي الدرداءِ - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الكَهْفِ، عُصِمَ مِنَ الدَّجَّالِ».
وفي رواية: «مِنْ آخِرِ سُورَةِ الكَهْفِ». رواهما مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০২২
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ সূরা ফাতিহা ও সূরা বাকারার শেষ আয়াতসমূহের ফযীলত
১০২২. হযরত ইবন আব্বাস রাযি. বলেন, একদা হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসা ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি উপরের দিক থেকে একটি আওয়াজ শুনলেন। তিনি উপরের দিকে মাথা তুলে বললেন, এটি আসমানের একটি দরজা। আজ এটি খোলা হয়েছে। আজ ছাড়া আর কখনও এটি খোলা হয়নি। তারপর সেখান থেকে একজন ফিরিশতা নেমে আসলেন। হযরত জিবরীল বললেন, ইনি এমন এক ফিরিশতা, যিনি আজই পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন। এর আগে তিনি কখনও অবতরণ করেননি। সে ফিরিশতা এসে সালাম দিলেন এবং বললেন, আপনি এমন দু'টি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন, যা আপনাকে দেওয়া হয়েছে, আপনার আগে অন্য কোনও নবীকে দেওয়া হয়নি। তা হলো সূরা ফাতিহা এবং সূরা বাকারার শেষ আয়াতসমূহ। আপনি এর যে-কোনও একটি বাক্য পড়বেন, আপনাকে তা অবশ্যই দেওয়া হবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম : ৮০৬; সুনানে নাসাঈ: ৮১২; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩১৭০১৯ মুসনাদে আবূ ইয়া'লা ২৪৮৮; সহীহ ইবন হিব্বান ৭৭৮; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ১২২৫৫: বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান ২১৪৫: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১২০১)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1022 - وعن ابنِ عَبَّاسٍ رضي الله عنهما: بَيْنَمَا جِبْريلُ - عليه السلام - قَاعِدٌ عِنْدَ النبي - صلى الله عليه وسلم - سَمِعَ نَقيضًا مِنْ فَوقِهِ، فَرَفَعَ رَأسَهُ، فَقَالَ: هَذَا بَابٌ مِنَ السَّمَاءِ فُتِحَ اليَوْمَ وَلَمْ يُفْتَحْ قَطٌّ إِلاَّ اليَوْمَ، فنَزلَ منهُ مَلكٌ، فقالَ: هذا مَلكٌ نَزلَ إلى الأرضِ لم ينْزلْ قطّ إلاّ اليومَ فَسَلَّمَ وقال: أبْشِرْ بِنُورَيْنِ أُوتِيتَهُمَا لَمْ يُؤتَهُمَا نَبيٌّ قَبْلَكَ: فَاتِحَةُ الكِتَابِ، وَخَواتِيمُ سُورَةِ البَقَرَةِ، لَنْ تَقْرَأَ بِحَرْفٍ مِنْهَا إِلاَّ أُعْطِيتَه. رواه مسلم. (1)
«النَّقِيضُ»: الصَّوْتُ.
হাদীস নং: ১০২৩
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ কুরআনপাঠের উদ্দেশ্যে লোকজন একত্র হওয়া: কোথাও একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত ও কুরআন বোঝার চেষ্টা করা
১০২৩. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহর কোনও ঘরে লোকজন একত্র হয়ে যদি আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং নিজেদের মধ্যে তার পাঠচক্র করে, তবে তাদের উপর অবশ্যই সাকীনা নাযিল হয়, রহমত তাদেরকে ঢেকে ফেলে, ফিরিশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে এবং আল্লাহ তাঁর কাছে যারা আছে তাদের সামনে তাদের কথা উল্লেখ করেন। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম : ২৬৯৯; সুনানে আবূ দাউদ: ১৪৫৫; জামে তিরমিযী: ২৪৯৫; সুনানে ইবন মাজাহ: ২২৫; মুসনাদে আহমাদ: ৭৪২১; সুনানে দারিমী: ৩৬৮; মুসনাদুল বাযযার। ৯১২৭: মুসনাদুল বাযযার: ৯১২১; শু'আবূল ঈমান ১৫৭২; সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৬৮; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১২৭)
كتاب الفضائل
باب استحباب الاجتماع عَلَى القراءة
1023 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رسول الله - صلى الله عليه وسلم: «وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ يَتلُونَ كِتَابَ اللهِ، وَيَتَدَارَسُونَهُ بينهم، إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيتْهُمُ الرَّحْمَةُ، وَحَفَّتْهُمُ المَلاَئِكَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০২৪
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ওযূর ফযীলত

الْوُضُوءُ শব্দটির উৎপত্তি الْوَضاءَةُ থেকে। এর অর্থ সৌন্দর্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও উজ্জ্বলতা। পানি দ্বারা বিশেষ তিন অঙ্গ ধোওয়া ও ভেজা হাত মাথায় বোলানোর কাজকে ওযূ বলা হয়। এ কাজের দ্বারা এ অঙ্গসমূহও পরিষ্কার হয়, এর সৌন্দর্যও বাড়ে ও এতে উজ্জ্বলতা আসে। বিশেষত আখিরাতে এরূপ লোকের উল্লিখিত অঙ্গসমূহ শুভ্র-সমুজ্জ্বল থাকবে। তাই এ কাজের নাম ওযূ।

ওযূ ইসলামের একদম শুরুর দিকের একটি বিধান। ইসলামের শুরুদিকে যখন নামাযের বিধান দেওয়া হয়, তখন একইসঙ্গে ওযূরও বিধান আসে। হযরত যায়দ ইবন হারিছা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে-

أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ أَتَاهُ فِي أَوَّلِ مَا أُوحِيَ إِلَيْهِ، فَعَلَّمَهُ الْوُضُوءَ وَالصَّلَاةَ.

'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সর্বপ্রথম যখন ওহী নাযিল হয়, তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম এসে তাঁকে ওযূ ও নামায শিক্ষাদান করেন। (মুসনাদে আহমাদ: ১৭৪৮০; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৩৯০১; মুসনাদুর্গ বাযযার: ১৩২১; সুনানে ইবন মাজাহ: ৪৬২)

ইসলামে ওযূ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। ওযূ ছাড়া নামায হয় না আর নামায ছাড়া জান্নাত লাভ হবে না। হযরত জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مِفْتَاحُ الْجَنَّةِ الصَّلَاةُ، وَمِفْتَاحُ الصَّلَاةِ الْوُضُوءُ

'জান্নাতের চাবি হলো নামায আর নামাযের চাবি ওযূ। (জামে' তিরমিযী: ৪; মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ১৮৯৯; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৪৩৬৪; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২৪৫৬)

ওযূ অত্যন্ত কল্যাণকর একটি ইবাদত। এটা দৈহিক ও আত্মিক পবিত্রতা অর্জনের উপায়। এর দ্বারা যেমন শরীর থেকে বাহ্যিক মলিনতা ও নাপাকি দূর হয়, তেমনি অন্তর থেকে দূর হয় গুনাহের মলিনতা।

শরীর-মনে এর প্রভাব অনেক গভীর। ওযূ দ্বারা শারীরিক পরিচ্ছন্নতাই লাভ হয় না; অবসাদ ও ক্লান্তিও দূর হয়। শারীরিক সুস্থতার পেছনে এর রয়েছে বিশেষ ভূমিকা।

এর দ্বারা নানা রকম রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকা যায়। ওযূ করার দ্বারা অন্তরে কাজের উদ্দীপনা জন্মায়। এটা বিতৃষ্ণা ও ক্রোধ নিবারণের প্রকৃষ্ট উপায়। ওযূ করার দ্বারা প্রাণে শান্ত-সমাহিত ভাব চলে আসে। মন তৃপ্তিতে ভরে যায়। অন্তরের আড়ষ্টতা দূর হয়ে সাচ্ছন্দ্য ও সাবলীলতা জন্মায়। যেন বুকের আগল খুলে যায়। তখন চিন্তারও দুয়ার খোলে। ভুলে যাওয়া বিষয় মনে পড়ে যায়। দুর্বোধ্য বিষয় বোঝা সহজ হয়ে যায়। যেন ওযূ জ্ঞান-বুঝেরও চাবিকাঠি। এর দ্বারা শয়তানের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভ হয়। কোনও কোনও রেওয়ায়েত দ্বারা জানা যায়, ওযূ দ্বারা আয়ুতে বরকত হয় ও ফিরিশতাদের মুহাব্বত লাভ হয়। যারা ওযূ অবস্থায় থাকে, ফিরিশতাগণ তাদের জন্য দু'আ করে। ওযূ দু'আ কবুলের পক্ষেও সহায়ক।

ওযূর দ্বারা বিনয়-নম্রতা, স্নেহ-মমতা প্রভৃতি কমনীয় গুণের বিকাশ ঘটে, যা কিনা গরিবারিক ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও পরস্পরের ভেতর সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি রুনায় অতীব প্রয়োজনীয়। এভাবে বিধানটি মানুষের পার্থিব জীবনের পক্ষেও অত্যন্ত কল্যাণকর।

কিয়ামতের দিন ওযূর ছাপ দ্বারাই অন্যসব জাতি থেকে এ উম্মাহকে আলাদাভাবে চেনা যাবে, যেমনটা আলোচ্য পরিচ্ছেদের হাদীছসমূহ দ্বারা জানা যাবে। সর্বোপরি ওযূ ঈমানের দলীল দলীল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

وَلَا يُحَافِظُ عَلَى الْوُضُوءِ إِلَّا مُؤْمِنٌ.

'কেবল মুমিন ব্যক্তিই ওযূতে যত্নবান থাকে। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৩৬; মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ১০৮৯: সুনানে দারিমী ৬৮১: সুনানে ইবন মাজাহ : ২৭৭: মুসনাদুল বাযযার: ২৩৬৭; সহীহ ইবন হিব্বান: ১০৩৭; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ১৪৪৪; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৪৪৭: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ২৪৫৭)

'ওযূর ফযীলত' সম্পর্কিত একটি আয়াত

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا قُمۡتُمۡ اِلَی الصَّلٰوۃِ فَاغۡسِلُوۡا وُجُوۡہَکُمۡ وَاَیۡدِیَکُمۡ اِلَی الۡمَرَافِقِ وَامۡسَحُوۡا بِرُءُوۡسِکُمۡ وَاَرۡجُلَکُمۡ اِلَی الۡکَعۡبَیۡنِ ؕ وَاِنۡ کُنۡتُمۡ جُنُبًا فَاطَّہَّرُوۡا ؕ وَاِنۡ کُنۡتُمۡ مَّرۡضٰۤی اَوۡ عَلٰی سَفَرٍ اَوۡ جَآءَ اَحَدٌ مِّنۡکُمۡ مِّنَ الۡغَآئِطِ اَوۡ لٰمَسۡتُمُ النِّسَآءَ فَلَمۡ تَجِدُوۡا مَآءً فَتَیَمَّمُوۡا صَعِیۡدًا طَیِّبًا فَامۡسَحُوۡا بِوُجُوۡہِکُمۡ وَاَیۡدِیۡکُمۡ مِّنۡہُ ؕ مَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیَجۡعَلَ عَلَیۡکُمۡ مِّنۡ حَرَجٍ وَّلٰکِنۡ یُّرِیۡدُ لِیُطَہِّرَکُمۡ وَلِیُتِمَّ نِعۡمَتَہٗ عَلَیۡکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ

অর্থ: হে মুমিনগণ! তোমরা যখন নামাযের জন্য উঠবে তখন নিজেদের চেহারা ও কনুই পর্যন্ত নিজেদের হাত ধুয়ে নেবে, নিজেদের মাথাসমূহ মাসাহ করবে এবং টাখনু পর্যন্ত নিজেদের পা (-ও ধুয়ে নেবে)। তোমরা যদি জানাবত অবস্থায় থাক তবে নিজেদের দেহ (গোসলের মাধ্যমে) ভালোভাবে পবিত্র করে নেবে। তোমরা যদি পীড়িত হও বা সফরে থাক কিংবা তোমাদের মধ্যে কেউ শৌচস্থান থেকে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে দৈহিক মিলন করে থাক এবং পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করবে এবং তা (মাটি) দ্বারা নিজেদের চেহারা ও হাত মাসাহ করবে। আল্লাহ তোমাদের উপর কোনও কষ্ট চাপাতে চান না; বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নি'আমত পরিপূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা শোকরগোযার হয়ে যাও। (সূরা মায়েদা (৫), আয়াত ৬)

ব্যাখ্যা
এ আয়াতটি ওযূর বিধানের উৎস। এতে নামাযের জন্য ওযূ ফরয করা হয়েছে। ওযূ ছাড়া নামায জায়েয হয় না। ওযূতে চারটি কাজ ফরয- সম্পূর্ণ চেহারা ধোওয়া, কনুই পর্যন্ত দুই বাহু ধোওয়া, মাথা মাসাহ করা ও টাখনু পর্যন্ত দুই পা ধোওয়া। এর যে-কোনও একটি ছুটে গেলে ওযূ হয় না।

জুনুবী ব্যক্তির জন্য কেবল ওযূই যথেষ্ট নয়। তার জন্য গোসল করা ফরয। বিনা গোসলে তার পক্ষে নামায জায়েয নয়। যদি কেউ অসুস্থ থাকার দরুন পানি ব্যবহার করতে না পারে কিংবা সফরে থাকার কারণে পানি না পায়, তবে তার জন্য ওযূ-গোসলের বিকল্প হিসেবে তায়াম্মুম জায়েয করা হয়েছে। তায়াম্মুম হলো মাটি বা মাটি জাতীয় বস্তু, যেমন পাথর, বালু ইত্যাদি, এর উপর হাত রেখে মুখমণ্ডল এবং কনুই পর্যন্ত দু'বাহুতে সে হাত বোলানো। এতটুকু দ্বারাই যার উপর ওযূ করা ফরয তারও পবিত্রতা অর্জিত হয় এবং যার জন্য গোসল ফরয সেও পবিত্র হয়ে যায়। ওযূর মতোই তায়াম্মুম দ্বারাও নামায পড়া, তিলাওয়াতের সিজদা করা, কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা, কা'বাঘরের তাওয়াফ করা সবই জায়েয। এটা মুসলিম উম্মাহর উপর আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দান। এটা এ উম্মতের বৈশিষ্ট্য। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

فُضِّلْتُ عَلَى الْأَنْبِيَاءِ بِسِتٍّ: أُعْطِيتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ وَنُصِرْتُ بِالرُّعْبِ وَأُحِلَّتْ لِيَ الْغَنَائِمُ وَجُعِلَتْ لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا وَأُرْسِلْتُ إِلَى الْخَلْقِ كَافَّةً وَخُتِمَ بِيَ النَّبِيُّونَ .

'সমস্ত নবীর উপর আমাকে ছয়টি বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাকে সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক কথা বলার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রভাব বিস্তার দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হয়েছে। আমার জন্য সমগ্র ভূখণ্ডকে মসজিদ ও পবিত্রকারক বানানো হয়েছে। আমাকে সমস্ত মানুষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং আমার দ্বারা নবীগণের পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছে। (জামে' তিরমিযী: ১৫৫৩; সহীহ বুখারী: ৩৩৫; সহীহ মুসলিম: ৫২১: সুনানে নাসাঈ: ৮১৭; সুনানে ইবন মাজাহ : ৫৬৬; মুসনাদে আহমাদ: ২৭৪২; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা : ৭৭৫২: তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার: ১০২৩; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৬৬৭৪)

তায়াম্মুমের বিধান দ্বারা মুসলিম উম্মাহর জন্য পবিত্রতা অর্জনকে সহজ করা হয়েছে। এ উম্মতের যাবতীয় বিধানই তুলনামূলক বেশি সহজ। কোনও বিধানে কঠোরতা রাখা হয়নি। আয়াতে বলা হয়েছে-

مَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیَجۡعَلَ عَلَیۡکُمۡ مِّنۡ حَرَج (আল্লাহ তোমাদের উপর কোনও কষ্ট চাপাতে মন না)। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা দীনের কোনও বিধান দ্বারা তোমাদেরকে কষ্ট ও অসুবিধায় ফেলতে চান না। এ বিষয়টাকে দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করার জন্য আল্লাহ তা'আলা মায়াতে অতিরিক্ত مِّنۡ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ওযূতে এ আসানি ও সহজতার বিষয়টা ইস্পষ্ট। কেননা ওযূতে চেহারা, দুই হাত ও দুই পা মাত্র এ তিনটি অঙ্গ ধোওয়া হয় আর মাত্র একটি অঙ্গ অর্থাৎ মাথা মাসাহ করা হয়। এর দ্বারাই গোটা শরীর পাক হয়ে যায়।

এটা বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ মেহেরবানি। তিনি চাইলে এ হুকুমও দিতে পারতেন যে, পবিত্র হওয়ার জন্য গোটা শরীর ধুইতে হবে অর্থাৎ গোসল করতে হবে। কিন্তু এতে বিধানটি কঠিন হয়ে যেত। বান্দার কষ্ট হতো। তাই তার কষ্ট লাঘবের জন্য আল্লাহ তা'আলা বিধানটি সহজ করে দিয়েছেন। তিনি নিজ দয়ায় ওযূকে মাত্র চারটি অঙ্গে সীমাবদ্ধ রেখেছেন এবং এর দ্বারাই গোটা শরীর পাক হয়ে যাওয়ার ফয়সালা দিয়ে দিয়েছেন। এ আসানি ও সহজতা কেবল ওযূ-গোসল ও পবিত্রতার বেলায়ই নয়; দীনের যাবতীয় বিধানই এরকম। অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-

وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ

'তিনি দীনের ভেতর তোমাদের প্রতি কোনও সংকীর্ণতা আরোপ করেননি। (সূরা হজ্জ, আয়াত ৭৮)


এর দ্বারা মানুষকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে যে, দেখো, দীনের কোনও বিধান পালন তোমাদের পক্ষে কঠিন নয়। অথচ প্রতিটি বিধানের মধ্যেই তোমাদের রয়েছে অশেষ কল্যাণ। তা সত্ত্বেও তোমরা কেন এসব বিধান পালন করবে না? সহজ চেষ্টায় অশেষ কল্যাণ অর্জনের লক্ষ্যে দীনের প্রতিটি বিধান তোমাদের অবশ্যই পালন করা উচিত। আয়াতের শেষে আল্লাহ তা'আলা বলছেন-

وَّلٰکِنۡ یُّرِیۡدُ لِیُطَہِّرَکُمۡ وَلِیُتِمَّ نِعۡمَتَہٗ عَلَیۡکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ (বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নি'আমত পরিপূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা শোকরগোযার হয়ে যাও)। অর্থাৎ তিনি তোমাদেরকে বাহ্যিক অপবিত্রতা থেকেও পবিত্র করতে চান এবং গুনাহ মাফ করার দ্বারা আত্মিক অপবিত্রতা থেকেও পবিত্র করতে চান। সে উদ্দেশ্যেই তিনি কঠোর-কঠিন বিধান না দিয়ে সহজসাধ্য বিধান তোমাদেরকে দিয়েছেন। আর এভাবে তিনি তোমাদের উপর তাঁর দীনী নি'আমত পরিপূর্ণ করতে চেয়েছেন। তোমরা যাতে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন করে আখিরাতে নাজাত পেতে পার, সে লক্ষ্যে তোমাদের যা-কিছু করণীয় তার পরিপূর্ণ নির্দেশনা দিতে চেয়েছেন। পবিত্রতা অর্জনের বিধানাবলি সে পরিপূর্ণ নির্দেশনা অর্থাৎ দীনেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি তোমাদেরকে নাজাত লাভের এমন সহজসাধ্য ও পূর্ণাঙ্গ বিধানাবলি এজন্যই দিয়েছেন, যাতে তোমরা এ অনুগ্রহের কারণে তাঁর শোকর আদায় কর।

আয়াতটির শিক্ষা

ক. নামাযের জন্য পবিত্রতা অর্জন করা ফরয, যা কখনও ওযূর মাধ্যমে অর্জিত হয়, আবার কখনও এর জন্য গোসল করা জরুরি হয়।

খ. ওযূর ফরয চারটি- সম্পূর্ণ চেহারা ধোওয়া, কনুই পর্যন্ত হাত ধোওয়া, মাথা মাসেহ করা ও টাখনু পর্যন্ত পা ধোওয়া।

গ. শরীয়তসম্মত ওজরবশত পানি ব্যবহার করার সুযোগ না হলে তায়াম্মুম করা জায়েয। তায়াম্মুম মাটি জাতীয় বস্তুতে দু'হাত লাগিয়ে তা দ্বারা শুধু চেহারা এবং কনুই পর্যন্ত দুই হাত মাসেহ করার দ্বারা সম্পন্ন হয়।

ঘ. সহবাস করার দ্বারা গোসল ফরয হয়।

ঙ. দীনের কোনও বিধান কঠিন নয়; বরং তা পালন করা সহজ।

চ. দীনের বিধানাবলি দ্বারা বান্দাকে প্রকাশ্য ও গুপ্ত নাপাকি থেকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করাও উদ্দেশ্য।

ছ. দীনের প্রতিটি বিধান বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ নি'আমত ও অনুগ্রহ।

জ. দীনের বিধানাবলি পাওয়ার কারণেও আল্লাহ তা'আলার শোকর আদায় করা জরুরি। প্রকৃত শোকর হলো বিধানাবলি যথাযথভাবে পালন করা।
১০২৪. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন আমার উম্মতকে এ অবস্থায় ডাকা হবে। যে, ওযূর আছরে তাদের কপাল ও হাত-পা থাকবে উজ্জ্বল (এর আরেক অর্থ হতে পারে, কিয়ামতের দিন আমার উম্মতকে “গুরুন মুহাজ্জালুন” বলে ডাকা হবে)। সুতরাং যার পক্ষে নিজ উজ্জ্বলতা বাড়ানো সম্ভব হয়, সে যেন তা করে। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী: ১৩৬; সহীহ মুসলিম: ২৪৬; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা। ৩৮৮১ শু'আবূল ঈমান: ২৪৮৭. বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২১৮)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
قَالَ الله تَعَالَى: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاَةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ} إِلَى قَوْله تَعَالَى: {مَا يُريدُ اللهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ حَرَجٍ وَلكِنْ يُريدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ} [المائدة: 6].
1024 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه - قَالَ: سَمِعْتُ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يقول: «إنَّ أُمَّتِي يُدْعَوْنَ يَوْمَ القِيَامَةِ غُرًّا (1) مُحَجَّلينَ (2) مِنْ آثَارِ الوُضُوءِ، فَمَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يُطِيلَ غُرَّتَهُ فَلْيَفْعَلْ». متفقٌ عَلَيْهِ. (3)
হাদীস নং: ১০২৫
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ওযূর ফযীলত: ওযূ করার দ্বারা জান্নাতে অলংকার লাভ করা
১০২৫. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বলেন, আমি আমার বন্ধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, মুমিনের অলংকার ওই পর্যন্ত পৌঁছাবে, যে পর্যন্ত তার ওযূর পানি পৌঁছায়। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২৫০; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ১৪২: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ২৫৭: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২১৯; মুসনাদুল বাযযার ৯৭৪৬; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৭)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1025 - وعنه، قَالَ: سَمِعْتُ خليلي - صلى الله عليه وسلم - يقول: «تَبْلُغُ الحِلْيَةُ مِنَ المُؤمِنِ حَيْثُ يَبْلُغُ الوُضُوءُ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০২৬
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ওযূর ফযীলত: ওযূ করার দ্বারা গুনাহ মাফ হওয়া
১০২৬. হযরত উছমান ইবন আফফান রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ওযূ করে এবং খুব ভালোভাবে ওযূ করে, তার শরীর থেকে তার গুনাহসমূহ বের হয়ে যায়। এমনকি তা বের হয় তার নখের নিচ থেকেও। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২৪৫; মুসনাদে আহমাদ: ৪৭৬; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৪৯: বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান ২৪৭৫: মুসনাদুল বাযযার ৪৩৩; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর। ৭৫৬৭)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1026 - وعن عثمان بن عفان - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رسول الله - صلى الله عليه وسلم: «من تَوَضَّأ فَأَحْسَنَ الوُضُوءَ، خَرَجَتْ خَطَايَاهُ مِنْ جَسَدِهِ حَتَّى تَخْرُج مِنْ تَحْتِ أَظْفَارِهِ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০২৭
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ওযূর ফযীলত: ওযূর সঙ্গে মসজিদে যাওয়া
১০২৭. হযরত উছমান ইবন আফফান রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওযূ করতে দেখেছি আমার এই ওযূর মতো। তারপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি এভাবে ওযূ করে, তার পেছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। ফলে তার নামায ও মসজিদের দিকে হেঁটে যাওয়া অতিরিক্ত নেকীর কারণ হবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২২৯। সুনানে ইবন মাজাহ: ২৮২; মুসনাদুল বাযযার: ৪৩২)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1027 - وعنه، قَالَ: رَأيتُ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - تَوَضَّأَ مِثْلَ وُضُوئِي هَذَا، ثُمَّ
قَالَ: «مَنْ تَوَضَّأ هكَذَا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَكَانَتْ صَلاَتُهُ وَمَشْيُهُ إِلَى المَسْجدِ نَافِلَةً». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০২৮
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ওযূর ফযীলত: ওযূ দ্বারা ওযূর অঙ্গসমূহের গুনাহ মাফ হওয়া
১০২৮. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মুসলিম বান্দা অথবা (তিনি বলেছেন) মু'মিন বান্দা যখন ওযূ করে আর তাতে তার চেহারা ধোয়, তখন পানির সাথে বা পানির শেষ ফোঁটার সাথে তার চেহারা থেকে ওইসকল গুনাহ বের হয়ে যায়, যা তার দু'চোখ দিয়ে দেখে করেছে। যখন সে তার দু'হাত ধোয়, তখন পানির সাথে বা পানির শেষ ফোঁটার সাথে তার ওইসকল গুনাহ বের হয়ে যায়, যা সে তার দু'হাত দিয়ে ধরে করেছে। যখন সে তার দু'পা ধোয়, তখন পানির সাথে বা পানির শেষ ফোঁটার সাথে ওইসকল গুনাহ বের হয়ে যায়, যেদিকে সে তার দু'পা দিয়ে হেঁটে গেছে। পরিশেষে সে সমস্ত গুনাহ হতে পবিত্র হয়ে যায়। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২৪৪; জামে তিরমিযী: ২; মুসনাদে আহমাদ: ৮০০৭; মুআত্তা মালিক: ৬১। সহীহ ইবন খুযায়মা : ৪; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ৩৮১; শু'আবূল ঈমান : ২৪৭৬: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৫১; সুনানে দারিমী: ৭৪৫; সহীহ ইবন হিব্বান: ১০৪০)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1028 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «إِذَا تَوَضَّأ العَبْدُ المُسْلِمُ - أَو المُؤْمِنُ - فَغَسَلَ وَجْهَهُ، خَرَجَ مِنْ وَجْهِهِ كُلُّ خَطِيئَةٍ نَظَرَ إِلَيْهَا بِعَيْنَيْهِ مَعَ المَاءِ، أَوْ مَعَ آخِرِ قَطْرِ المَاءِ، فَإذَا غَسَلَ يَدَيْهِ، خَرَجَ مِنْ يَدَيْهِ كُلُّ خَطِيئَةٍ كَانَ بَطَشَتْهَا يَدَاهُ مَعَ المَاءِ، أَو مَعَ آخِرِ قَطْرِ المَاءِ، فَإذَا غَسَلَ رِجْلَيْهِ، خَرَجَتْ كُلُّ خَطِيئَةٍ مَشَتْهَا رِجْلاَهُ مَعَ المَاءِ، أَو مَعَ آخِرِ قَطْرِ المَاءِ، حَتَّى يَخْرُجَ نَقِيًّا مِنَ الذُّنُوبِ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০২৯
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ওযূর ফযীলত: আখিরাতে মুসলিম উম্মাহর পরিচয়-চিহ্ন
১০২৯. হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরস্থানে আসলেন। তিনি বললেন- السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لاَحِقُونَ (হে মুমিন সম্প্রদায়ের নিবাসের বাসিন্দাগণ! তোমাদের প্রতি সালাম। ইনশাআল্লাহ আমরা তোমাদের সঙ্গে মিলিত হব)। আমার তো আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, আমরা আমাদের ভাইদের দেখব। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি আপনার ভাই নই? তিনি বললেন, তোমরা আমার সাহাবী। আমার ভাই তারা, যারা এখনও আসেনি। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার উম্মতের যারা এখনও পর্যন্ত আসেনি, আপনি তাদের কীভাবে চিনবেন? তিনি বললেন, বলো তো, কোনও ব্যক্তির সাদা কপাল ও সাদা পায়ের ঘোড়া যদি (অন্যদের) ঘোর কালো ঘোড়াদের মধ্যে মিশে থাকে, তবে সে কি তার নিজ ঘোড়া চিনতে পারবে না? তারা বললেন, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন, তারা তো এমন অবস্থায় আসবে যে, ওযূর কারণে তাদের চেহারা ও হাত-পা থাকবে উজ্জ্বল (তা দেখে আমি তাদের চিনতে পারব)। আমি তাদের আগে আগেই হাউযে কাউছারে পৌঁছে যাব। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২৪৯; সুনানে নাসাঈ ১৫০; সুনানে ইবন মাজাহ: ৪৩০৬; মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৮১; মুআত্তা মালিক: ২৮; মুসনাদুল বাযযার: ৮৩২২; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ৬৫০২; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার: ৩৮০৬; সহীহ ইবন হিব্বান : ৭২৪০; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৩৮৮)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1029 - وعنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - أتى المقبرة، فَقَالَ: «السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَومٍ مُؤْمِنِينَ، وَإنَّا إنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لاَحِقُونَ، وَدِدْتُ أنَّا قَدْ رَأَيْنَا إخْوانَنَا» قالوا: أوَلَسْنَا إخْوَانَكَ يَا رسول الله؟ قَالَ: «أنْتُمْ أصْحَابِي، وَإخْوَانُنَا الَّذِينَ لَمْ يَأتُوا بَعْدُ» قالوا: كَيْفَ تَعْرِفُ مَنْ لَمْ يَأتِ بَعْدُ مِنْ أُمَّتِكَ يَا رَسولَ الله؟ فَقَالَ: «أرَأيْتَ لَوْ أنَّ رَجُلًا لَهُ خَيلٌ غُرٌّ مُحَجَّلَةٌ بَيْنَ ظَهْرَيْ خَيْلٍ دُهْمٍ (1) بُهْمٍ (2)، ألا يَعْرِفُ خَيْلَهُ؟» قالوا: بَلَى يَا رسول الله، قَالَ: «فإنَّهُمْ يَأتُونَ غُرًّا مُحَجَّلينَ مِنَ الوُضُوءِ، وأنَا فَرَطُهُمْ عَلَى الحَوْضِ». رواه مسلم. (3)
হাদীস নং: ১০৩০
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ওযূর ফযীলত: অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ তিনটি আমল
১০৩০. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন কিছুর কথা বলে দেব না, যা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা পাপসমূহ মিটিয়ে দেন এবং তা দ্বারা (জান্নাতে তোমাদের) মর্যাদা উঁচু করেন? সাহাবীগণ বললেন, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ। তিনি বললেন, কষ্ট-ক্লেশের অবস্থায়ও পূর্ণাঙ্গরূপে ওযূ করা, মসজিদের দিকে বেশি বেশি হাঁটা এবং এক নামাযের পর পরবর্তী নামাযের অপেক্ষায় থাকা। এটাই তোমাদের রিবাত। এটাই তোমাদের রিবাত। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২৫১; জামে তিরমিযী: ৫১; সুনানে নাসাঈ ১৪৩; সহীহ ইবন খুযায়মা। ৫; সহীহ ইবন হিব্বান ১০৩৯; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৪৯৬৯)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1030 - وعنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «ألاَ أَدُّلُكُمْ عَلَى مَا يَمْحُو اللهُ بِهِ الخَطَايَا، وَيَرْفَعُ بِهِ الدَّرَجَاتِ؟» قالوا: بَلَى يَا رسول الله، قَالَ: «إسْبَاغُ الوُضُوءِ عَلَى المَكَارِهِ، وَكَثْرَةُ الخُطَا إِلَى المَسَاجِدِ، وَانْتِظَارُ الصَّلاَةِ بَعْدَ الصَّلاَةِ؛ فَذلِكُمُ الرِّبَاطُ؛ فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০৩১
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ওযূর ফযীলত: পবিত্রতার গুরুত্ব
১০৩১. হযরত আবূ মালিক আল-আশ'আরী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২২৩; জামে তিরমিযী: ৩৫১৭; সুনানে ইবন মাজাহ: ২৮০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৩৭; সুনানে দারিমী: ৬৭৯: তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৩৪২৪; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ১৮৫; শু'আবুল ঈমান ১২; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৪৮)

এটি একটি দীর্ঘ হাদীছের অংশ। হাদীছটি 'সবর' অধ্যায়ে পূর্ণাঙ্গরূপে গত হয়েছে। আলোচ্য অধ্যায়ে হযরত আমর ইবন আবাসা রাযি. বর্ণিত একটি হাদীছও উল্লেখযোগ্য। সে হাদীছটি 'আশা' অধ্যায়ের শেষদিকে গত হয়েছে (হাদীছ নং ৪৩৮)। সেটি অনেকগুলো কল্যাণকর উপদেশমূলক বাক্য সংবলিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সারগর্ভ এক হাদীছ।
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1031 - وعن أَبي مالك الأشعري - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رسول الله - صلى الله عليه وسلم: «الطُّهُورُ شَطْرُ الإيمَانِ». رواه مسلم. (1)
وَقَدْ سبق بطوله في باب الصبر، وفي البابِ حديث عمرو بن عَبَسَة - رضي الله عنه - السابق (2) في آخر باب الرَّجَاءِ، وَهُوَ حديث عظيم؛ مشتمل عَلَى جمل من الخيرات.
হাদীস নং: ১০৩২
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ওযূর ফযীলত: ওযূর দু'আ ও তার ফযীলত
১০৩২. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই ওযূ করে এবং সে ওযূ করে পরিপূর্ণরূপে, তারপর বলে- أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُه (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই। এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল), তার জন্য জান্নাতের আটও দরজা খুলে দেওয়া হয়। সে তার যেটি দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২৩৪; সুনানে আবু দাউদ: ১৬৯; সুনানে ইবন মাজাহ: ৪১৯; সহীহ ইবন খুযায়মা: ২২২; সহীহ ইবন হিব্বান: ১০৫০; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৩৬৮)

তিরমিযীর বর্ণনায় (দু'আটিতে) অতিরিক্ত আছে- اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ (হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন)। (জামে' তিরমিযী: ৫৫; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৪৮৯৫)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1032 - وعن عمر بن الخطاب - رضي الله عنه - عن النبيِّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «مَا مِنْكُمْ مِنْ أحَدٍ يَتَوَضَّأُ فَيُبْلغُ - أَوْ فَيُسْبِغُ - الوُضُوءَ، ثُمَّ يقول: أشهَدُ أَنْ لا إلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، وَأشْهَدُ أنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ؛ إِلاَّ فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ الجَنَّةِ الثَّمَانِيَةُ يَدْخُلُ مِنْ أَيِّهَا شَاءَ». رواه مسلم. (1)
وزاد الترمذي: «اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ، وَاجْعَلْنِي مِنَ المُتَطَهِّرِينَ».
হাদীস নং: ১০৩৩
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ আযানের ফযীলত

আযানের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

الأَذَان (আযান) শব্দের অর্থ ঘোষণা, আহ্বান। শাব্দিক অর্থ হিসেবে যে-কোনও ডাক ও ঘোষণার জন্যই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কা'বাঘর নির্মাণের পর মানুষকে হজ্জের জন্য আহ্বান জানানোর যে হুকুম আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে দিয়েছিলেন, কুরআন মাজীদে তা এভাবে বর্ণিত হয়েছে-

وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ

'এবং মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা দাও। (সূরা হজ্জ, আয়াত ২৭)

মক্কাবিজয়ের পর হিজরী ৯ম সনে হজ্জের সময় মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সে ঘোষণা সম্পর্কেও কুরআন মাজীদে আযান শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-

وَأَذَانٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ ۙ وَرَسُولُهُ

'বড় হজ্জের দিন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে সমস্ত মানুষের জন্য ঘোষণা করা যাচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন এবং তাঁর রাসূলও। সূরা তাওবা, আয়াত ৩

তবে ইসলামী পরিভাষায় সাধারণত আযান বলা হয় নামাযের জন্য সুনির্দিষ্ট শব্দে আহ্বান জানানোকে। কাজেই আযান বললে মুসলিম মাত্রই বুঝতে পারে যে, এটা ওই ঘোষণার নাম, যা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে জামাতে শামিল হওয়ার জন্য দেওয়া হয়ে থাকে। এ আযান অত্যন্ত সারগর্ভ। এটা ইসলামের নিদর্শন। এটা সমুচ্চ শব্দে আল্লাহ তা'আলার যিকির। এটা ইসলামের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাসের ঘোষণা। এটা মানুষের দোজাহানের সাফল্যের পথনির্দেশ।

আযানের সূচনা
শুরুতে নামাযের জন্য ডাকার এ ব্যবস্থা ছিল না। মক্কা মুকাররামায় তো প্রকাশ্যে জামাতে নামায পড়ার সুযোগই ছিল না। তাই তখন আযানেরও প্রয়োজন হয়নি। এর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে মদীনা মুনাউওয়ারায়। এখানে প্রথমে মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাযও জামাতের সঙ্গে পড়া শুরু হয়। কিন্তু সবাই যাতে একসঙ্গে মিলিত হয়ে নামায পড়তে পারে, সেজন্য ডাকার কোনও ব্যবস্থা না থাকায় সাহাবায়ে কেরামের বেশ সমস্যা হতো। তারা অনুমান করে মসজিদে আসতেন। তাতে অনেকেরই জামাত ছুটে যেত। বিষয়টা নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে পরামর্শে বসেন। এ নিয়ে একেকজন একেক মত দিচ্ছিলেন। কেউ বলছিলেন নামাযের সময় আগুন জ্বালানো হোক। তা দেখে সবাই বুঝতে পারবে জামাতের সময় হয়ে গেছে। কিন্তু অগ্নিপূজারীরা এ ব্যবস্থা অবলম্বন করত বলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন না। কেউ বললেন শিঙা বাজানো হোক। কিন্তু এটা ছিল ইহুদিদের রীতি। তাই এ প্রস্তাবও বাতিল হয়ে যায়। কেউ বললেন ঘণ্টা বাজানো হোক। কিন্তু খ্রিষ্টানদের রীতি হওয়ায় এ প্রস্তাবও গৃহীত হলো না। ফলে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া গেল না। সাহাবায়ে কেরাম এ নিয়ে ভাবতে থাকলেন।

বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-ও বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। রাতের বেলা এ চিন্তার ভেতরই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। স্বপ্নে দেখেন সবুজ পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি কোথাও যাচ্ছে। তার হাতে একটি ঘণ্টা। তিনি তার কাছ থেকে সে ঘণ্টাটি নিতে চাইলেন। লোকটি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এর দ্বারা আমরা মানুষকে নামাযের জন্য ডাকব। সে ব্যক্তি বলল, আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু শিখিয়ে দেব? এ বলে সেই ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-কে আযানের বাক্যগুলো শিখিয়ে দিলেন। পরদিন ভোরবেলা হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাঁর স্বপ্নের বৃত্তান্ত পেশ করলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই এটি একটি সত্য স্বপ্ন। অনুরূপ স্বপ্ন দেখেছিলেন হযরত উমর ফারূক রাযি.-ও। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা জানানোর আগেই হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি. তাঁর স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। আরও একাধিক সাহাবী সম্পর্কে জানা যায় যে, তারাও একইরকম স্বপ্ন দেখেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ স্বপ্নকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নির্দেশনারূপে গণ্য করলেন। তিনি স্বপ্নের বাক্যগুলোকে নামাযের ডাকরূপে অনুমোদন করলেন। তারপর হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-কে বললেন, বিলালকে বাক্যগুলো শিখিয়ে দাও। তিনি শিখিয়ে দিলেন। হযরত বিলাল রাযি. ছিলেন সুউচ্চ আওয়াজ ও সুন্দর সুরের অধিকারী। তিনি একটি উঁচু স্থানে উঠে বাক্যগুলো উচ্চারণ করলেন। এভাবে এ সুন্দর বাক্যগুলো দ্বারা জামাতের জন্য ডাকার নিয়ম চালু হলো। হযরত বিলাল রাযি. ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম মুআযযিন।

আযানের শব্দাবলি, অর্থ ও তাৎপর্য
ইসলামের এ আযান-ব্যবস্থা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যান্য ধর্মের ব্যবস্থা অর্থহীন কোনও আওয়াজমাত্র, যেমন ঘণ্টা পেটানো বা শিঙা বাজানো। কোনও ধর্মে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু এর কোনও ব্যবস্থাই কোনও গভীর ভাব ও তাৎপর্য বহন করে না। ইসলামের ব্যবস্থা অভিনব ও নিগূঢ় মর্মবাহী। এতে সুনির্দিষ্ট কিছু বাক্য আছে, যা সংক্ষেপে পূর্ণ ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে।

আযানের প্রথম বাক্য হলো الله أكبرُ। এর দ্বারা সর্বপ্রথম নামায যার জন্য পড়া হয় সেই আল্লাহর প্রভুত্ব ও মহত্ব ঘোষণা করা হয়। বোঝানো উদ্দেশ্য যে, নামায ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগী মানুষের নিজ কল্যাণার্থেই করা জরুরি। এতে আল্লাহর নিজের কোনও উপকার নেই। তিনি এমনই মহামহিম সত্তা যে, কারও ইবাদত-উপাসনায় তাঁর কোনও প্রয়োজন নেই এবং তা করা না করায় তাঁর প্রভুত্বে কিছুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে না, ঘটার অবকাশও নেই। কেননা الله أَكْبَرُ 'আল্লাহ মহান, তিনি যাবতীয় প্রয়োজন ও কমতির ঊর্ধ্বে'। এটা এক পরম সত্য। এ সত্যের প্রতি দৃঢ়তা জ্ঞাপনের জন্য বাক্যটি দু'বার উচ্চারণ করা হয়।

দ্বিতীয় বাক্য হলো- أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا الله (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই)। অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগীর উপযুক্ত কেবল আল্লাহ তা'আলাই। এতে তাঁর কোনও শরীক নেই। এই তাওহীদী বিশ্বাসই ইসলামের মূলমন্ত্র। এরই উপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের মহাপ্রাসাদ।

তৃতীয় বাক্য হলো- أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের এ সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে জানানো হয় যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে ইবাদত-বন্দেগীর সেই পন্থাই গ্রহণযোগ্য, যা তিনি তাঁর এ মহান রাসূলের মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং হে মানুষ! তোমরা তাঁর দাওয়াতে সাড়া দাও এবং তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করো, বিশেষত এই মুহূর্তে এসে নামাযের জামাতে শামিল হও।

চতুর্থ পর্যায়ে আযান যেই জন্য দেওয়া হচ্ছে সেই শ্রেষ্ঠতম ইবাদত নামাযে আসার জন্য ডাক দেওয়া হয়। বলা হয় حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ (তোমরা নামাযে এসো)।

পঞ্চম বাক্যে রয়েছে নামায ও অন্যান্য ইবাদতের তাৎপর্যের দিকে ইঙ্গিত। বলা হয়- حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ (এসা সফলতার দিকে)। নামায ও অন্যান্য ইবাদতেই মানুষের প্রকৃত সফলতা নিহিত। এর দ্বারা আখিরাতের প্রতিও ইশারা হয়ে গেছে। কেননা চূড়ান্ত সফলতা হচ্ছে আখিরাতের মুক্তিলাভ। যা ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। ব্যাপকার্থে ইবাদত হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। লৌকিক জীবনের সবকিছুই তার অন্তর্গত। তা মেনে চলার দ্বারা আখিরাতের মুক্তি তো বটেই, পার্থিব জীবনের মুক্তি ও সফলতাও অর্জিত হয়। সুতরাং বিশেষভাবে দুনিয়া বা আখিরাত কোনও একটির সাথে যুক্ত না করে সাধারণভাবে 'এসো সফলতার দিকে' বলে দোজাহানের সফলতা নিশ্চিত হয় যে দীনে ইসলাম দ্বারা, তা আঁকড়ে ধরার ডাক দেওয়া হয়েছে।

সবশেষে মৌল বিশ্বাসে জোর সৃষ্টির লক্ষ্যে পুনরায় আল্লাহর মহিমা ও তাওহীদের বাণী ঘোষণা দ্বারা আযান শেষ করা হয়। কাজেই নামাযের আযান কেবল নামাযের ডাকই নয়; বরং এটা দীনে ইসলামের প্রতি উদাত্ত আহ্বান। প্রতিদিন পাঁচবার মুআযযিন তার সুউচ্চ ধ্বনিতে ইসলামের মৌলবাণী ঘোষণার মাধ্যমে অমুসলিমের সামনে ঈমানের দাওয়াত পেশ করে এবং মুসলিম মন-মানসে ঈমানের মর্মবাণীকে উজ্জীবিত করে তোলে।

আযানের মাহাত্ম্য
আযান ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যে জনপদে আযান হয়, আযান সে জনপদবাসীর মুসলিম হওয়ার পরিচয় বহন করে। তাই তার বাসিন্দাদের একান্ত কর্তব্য আযানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং পাঁচও ওয়াক্তে যাতে আযান হয়, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কেননা এ আযান তাদের জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তার গ্যারান্টি। অর্থাৎ মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী যখন কোনও এলাকায় আযানের ধ্বনি শুনবে, তখন তারা সেখানকার বাসিন্দাদের মুসলিম গণ্য করে তাদের উপর অভিযান চালানো হতে বিরত থাকবে। তাছাড়া ইসলামের পরিচয় বহনকারী গৌরবজনক এ ঘোষণা থেকে কোনও মুসলিম জনপদ বঞ্চিত থাকবে, তা কীভাবে মেনে নেওয়া যেতে পারে? এটা আযানের বিপুল খায়র ও বারাকাত থেকেও তাদের বঞ্চিত থাকার কারণ বটে।

আযান সারা জাহানের জন্যই আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ নি'আমত। সারা বিশ্ব ঘুরেফিরে প্রতি মুহূর্তে এর কল্যাণে সিক্ত হতে থাকে। কেননা নামাযের ওয়াক্তসমূহ সূর্য পরিক্রমণের সাথে যুক্ত হওয়ায় ইসলামের এই সোচ্চার ডাকও বিশ্বভ্রমণ করে বেড়ায়। ফলে এ ডাক প্রতি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও ধ্বনিত হতে থাকে। যিনি এ জগৎ সৃষ্টি করেছেন, প্রতি মুহূর্তে তাঁর নাম কোথাও না কোথাও উচ্চারিত হতে থাকে। ইসলাম সারা বিশ্বের দীন হওয়ায় সারা বিশ্ব সর্বক্ষণ তাঁর নামের ধ্বনিতে মুখর থাকে। সেইসঙ্গে সারা বিশ্বের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান নামের বরকতও এ বিশ্ব লাভ করতে থাকে প্রতিটি মুহূর্তে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন-

وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ

'এবং আমি তোমার কল্যাণে তোমার চর্চাকে উচ্চমর্যাদা দান করেছি। (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ৪)

আযান এ আয়াতের বাস্তব চিত্র। মোটকথা আযানের মাধ্যমে আল্লাহর তাওহীদ ও মুহাম্মাদী রিসালাতের ঘোষণা অনুক্ষণ নিখিল বিশ্বের এক নিরবচ্ছিন্ন ব্যঞ্জনা হয়ে থাকে।

সাধারণভাবে সকল ওয়াক্তের জন্যই একই রকম বাক্যে আযান দেওয়া হয়। কেবল ফজরের আযানে حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ -এর পর দু'বার অতিরিক্ত বলা হয়- الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِّنَ النَّوْمِ (ঘুম অপেক্ষা নামায শ্রেষ্ঠ)। এর দ্বারা ক্ষণিকের আরাম ও অলসতা ঝেড়ে ফেলে নামাযের প্রতি উৎসাহ জোগানো উদ্দেশ্য, যাতে মানুষ এই ক্ষণিকের আরাম-আয়েশের বদলে আখিরাতের স্থায়ী অনন্ত সুখ-শান্তি লাভ করতে পারে।

আযানের সম্পর্ক নামাযের ওয়াক্তের সঙ্গে। কাজেই আযান প্রত্যেক ওয়াক্তের দাবি। তাই প্রত্যেক নামাযের আযান দিতে হয় নামাযের ওয়াক্ত হলে পরে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। আল্লাহর দরবারে আমার হাজির হওয়ার সময় এসে গেছে। আমাকে এজন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। কাজেই ওয়াক্ত হওয়ার আগে দিলে সে আযান শুদ্ধ হয় না। কেননা তাতে আযানের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। জামা'আত শুরু হওয়ার এতটুকু আগে আযান দেওয়া চাই, যাতে আযান শুনে মানুষ ওযূ-ইস্তিঞ্জাসহ নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পায়।

তারপর জামা'আত শুরু হওয়ার প্রাক্কালে আরও একবার নামাযের জন্য ডাক দেওয়া হয়। এ ডাককে ইকামত বলে। ইকামতের বাক্যসমূহ আযানেরই অনুরূপ। কেবল حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ -এর পর দু'বার قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ 'নামায শুরু হয়ে গেছে' অতিরিক্ত বলতে হয়।

আযান ও ইকামত উভয়টিই 'সুন্নতে মুআক্কাদা'। শ্রোতার কর্তব্য এতে সাড়া দিয়ে জামা'আতে হাজির হওয়া। সেইসঙ্গে মৌখিক উত্তর দেওয়াও মুস্তাহাব। অর্থাৎ মুআযযিন আযান-ইকামতে যেসব শব্দ উচ্চারণ করে, শ্রোতাও হুবহু তাই উচ্চারণ করবে। শুধু حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ ও حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ - এর স্থানে বলবে -لا حَوْلَ وَ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِالله (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সৎকাজ করা ও অসৎকাজ থেকে বিরত থাকা কারও পক্ষে সম্ভব নয়)।

আযান দেওয়ার ফযীলত
১০৩৩. হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, লোকে যদি জানত আযান দেওয়ায় ও প্রথম কাতারে কী (ফযীলত) আছে আর লটারি ধরা ছাড়া তা লাভের কোনও সুযোগ না পেত, তবে অবশ্যই সেজন্য লটারি ধরত। এমনিভাবে তারা যদি জানত নামাযে আগে আগে আসার মধ্যে কী আছে, তবে তারা সেজন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো। আর তারা যদি জানত ইশা ও ফজরের নামাযে কী আছে, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাতে আসত। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী: ৬১৫; সহীহ মুসলিম: ৪৩৭; সুনানে নাসাঈ ৫৪০; মুসনাদে আহমাদ: ৭২২৬; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ২০০৭; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা। ২০১২)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1033 - عن أَبي هريرة - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا في النِّدَاءِ والصَّفِ الأَوَّلِ، ثُمَّ لَمْ يَجِدُوا إِلاَّ أَنْ يَسْتَهِمُوا عَلَيْهِ لاسْتَهَمُوا عَلَيْهِ، ولو يَعْلَمُونَ مَا فِي التَّهْجِيرِ لاَسْتَبَقُوا إِلَيْهِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِي العَتَمَةِ (1) وَالصُّبْحِ لأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا». متفقٌ عَلَيْهِ. (2)
«الاسْتِهَامُ»: الاقْتِرَاعُ، وَ «التَّهْجِيرُ»: التَّبْكِيرُ إِلَى الصَّلاةِ.
হাদীস নং: ১০৩৪
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ মুআযযিনের মর্যাদা
১০৩৪. হযরত মু'আবিয়া রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন মুআযযিনদের গর্দান সর্বাপেক্ষা উঁচু হবে।-মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৭; সুনানে ইবন মাজাহ ৭২৫; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১৮৬১। মুসনাদে ইসহাক ইবন রাহুয়াহ: ১৫১; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার: ২০৮; সহীহ ইবন হিব্বান: ১৬৬৯; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৭৩৬; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ২০৩৭)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1034 - وعن معاوية - رضي الله عنه - قَالَ: سَمِعْتُ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يقولُ: «المُؤَذِّنُونَ أطْوَلُ النَّاسِ أعْناقًا يَوْمَ القِيَامَةِ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০৩৫
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ আযানের ফযীলত: মুআযযিনের পক্ষে তার আযানের শব্দ শ্রবণকারী সকলের সাক্ষ্যদান
১০৩৫. আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুর রহমান ইবন আবী সা'সা'আ থেকে বর্ণিত যে, হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. তাকে বললেন, আমি দেখছি তুমি ছাগল ও পল্লি ভালোবাস। সুতরাং তুমি যখন তোমার ছাগলপালের সঙ্গে কিংবা পল্লিতে থাকবে আর এ অবস্থায় আযান দেবে, তখন আযানে তোমার আওয়াজ উঁচু করবে। কেননা মুআযযিনের আযান যতদূর পৌঁছায়, ততদূর পর্যন্ত যত জিন, মানুষ ও অন্য কোনওকিছু তা শুনতে পায়, তারা সকলেই কিয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। আবূ সা'ঈদ রাযি. বলেন, আমি এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শুনেছি। -বুখারী। (সহীহ বুখারী: ৬০৯; সুনানে নাসাঈ ৬৪৪; সহীহ ইবন হিব্বান ১৬৬১; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৮৬০; সহীহ ইবন খুযায়মা ৩৮৯; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৩১৩১)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1035 - وعن عبدِ الله بن عبدِ الرَّحْمانِ بن أَبي صَعصعة: أنَّ أَبَا سَعيد الخدريَّ - رضي الله عنه - قَالَ لَهُ: «إنِّي أرَاكَ تُحبُّ الغَنَمَ وَالبَادِيَةَ فَإذَا كُنْتَ في غَنَمِك - أَوْ بَادِيتِكَ - فَأذَّنْتَ للصَّلاَةِ، فَارْفَعْ صَوْتَكَ بِالنِّدَاءِ، فَإنَّهُ لا يَسْمَعُ مَدَى صَوْتِ المُؤذِّنِ جِنٌّ، وَلاَ إنْسٌ، وَلاَ شَيْءٌ، إِلاَّ شَهِدَ لَهُ يَومَ القِيَامَةِ» قَالَ أَبُو سَعيدٍ: سمعتُهُ مِنْ رَسولِ الله - صلى الله عليه وسلم. رواه البخاري. (1)