রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০২৪
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
ওযূর ফযীলত

الْوُضُوءُ শব্দটির উৎপত্তি الْوَضاءَةُ থেকে। এর অর্থ সৌন্দর্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও উজ্জ্বলতা। পানি দ্বারা বিশেষ তিন অঙ্গ ধোওয়া ও ভেজা হাত মাথায় বোলানোর কাজকে ওযূ বলা হয়। এ কাজের দ্বারা এ অঙ্গসমূহও পরিষ্কার হয়, এর সৌন্দর্যও বাড়ে ও এতে উজ্জ্বলতা আসে। বিশেষত আখিরাতে এরূপ লোকের উল্লিখিত অঙ্গসমূহ শুভ্র-সমুজ্জ্বল থাকবে। তাই এ কাজের নাম ওযূ।

ওযূ ইসলামের একদম শুরুর দিকের একটি বিধান। ইসলামের শুরুদিকে যখন নামাযের বিধান দেওয়া হয়, তখন একইসঙ্গে ওযূরও বিধান আসে। হযরত যায়দ ইবন হারিছা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে-

أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ أَتَاهُ فِي أَوَّلِ مَا أُوحِيَ إِلَيْهِ، فَعَلَّمَهُ الْوُضُوءَ وَالصَّلَاةَ.

'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সর্বপ্রথম যখন ওহী নাযিল হয়, তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম এসে তাঁকে ওযূ ও নামায শিক্ষাদান করেন। (মুসনাদে আহমাদ: ১৭৪৮০; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৩৯০১; মুসনাদুর্গ বাযযার: ১৩২১; সুনানে ইবন মাজাহ: ৪৬২)

ইসলামে ওযূ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। ওযূ ছাড়া নামায হয় না আর নামায ছাড়া জান্নাত লাভ হবে না। হযরত জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مِفْتَاحُ الْجَنَّةِ الصَّلَاةُ، وَمِفْتَاحُ الصَّلَاةِ الْوُضُوءُ

'জান্নাতের চাবি হলো নামায আর নামাযের চাবি ওযূ। (জামে' তিরমিযী: ৪; মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ১৮৯৯; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৪৩৬৪; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২৪৫৬)

ওযূ অত্যন্ত কল্যাণকর একটি ইবাদত। এটা দৈহিক ও আত্মিক পবিত্রতা অর্জনের উপায়। এর দ্বারা যেমন শরীর থেকে বাহ্যিক মলিনতা ও নাপাকি দূর হয়, তেমনি অন্তর থেকে দূর হয় গুনাহের মলিনতা।

শরীর-মনে এর প্রভাব অনেক গভীর। ওযূ দ্বারা শারীরিক পরিচ্ছন্নতাই লাভ হয় না; অবসাদ ও ক্লান্তিও দূর হয়। শারীরিক সুস্থতার পেছনে এর রয়েছে বিশেষ ভূমিকা।

এর দ্বারা নানা রকম রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকা যায়। ওযূ করার দ্বারা অন্তরে কাজের উদ্দীপনা জন্মায়। এটা বিতৃষ্ণা ও ক্রোধ নিবারণের প্রকৃষ্ট উপায়। ওযূ করার দ্বারা প্রাণে শান্ত-সমাহিত ভাব চলে আসে। মন তৃপ্তিতে ভরে যায়। অন্তরের আড়ষ্টতা দূর হয়ে সাচ্ছন্দ্য ও সাবলীলতা জন্মায়। যেন বুকের আগল খুলে যায়। তখন চিন্তারও দুয়ার খোলে। ভুলে যাওয়া বিষয় মনে পড়ে যায়। দুর্বোধ্য বিষয় বোঝা সহজ হয়ে যায়। যেন ওযূ জ্ঞান-বুঝেরও চাবিকাঠি। এর দ্বারা শয়তানের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভ হয়। কোনও কোনও রেওয়ায়েত দ্বারা জানা যায়, ওযূ দ্বারা আয়ুতে বরকত হয় ও ফিরিশতাদের মুহাব্বত লাভ হয়। যারা ওযূ অবস্থায় থাকে, ফিরিশতাগণ তাদের জন্য দু'আ করে। ওযূ দু'আ কবুলের পক্ষেও সহায়ক।

ওযূর দ্বারা বিনয়-নম্রতা, স্নেহ-মমতা প্রভৃতি কমনীয় গুণের বিকাশ ঘটে, যা কিনা গরিবারিক ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও পরস্পরের ভেতর সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি রুনায় অতীব প্রয়োজনীয়। এভাবে বিধানটি মানুষের পার্থিব জীবনের পক্ষেও অত্যন্ত কল্যাণকর।

কিয়ামতের দিন ওযূর ছাপ দ্বারাই অন্যসব জাতি থেকে এ উম্মাহকে আলাদাভাবে চেনা যাবে, যেমনটা আলোচ্য পরিচ্ছেদের হাদীছসমূহ দ্বারা জানা যাবে। সর্বোপরি ওযূ ঈমানের দলীল দলীল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

وَلَا يُحَافِظُ عَلَى الْوُضُوءِ إِلَّا مُؤْمِنٌ.

'কেবল মুমিন ব্যক্তিই ওযূতে যত্নবান থাকে। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৩৬; মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ১০৮৯: সুনানে দারিমী ৬৮১: সুনানে ইবন মাজাহ : ২৭৭: মুসনাদুল বাযযার: ২৩৬৭; সহীহ ইবন হিব্বান: ১০৩৭; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ১৪৪৪; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৪৪৭: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ২৪৫৭)

'ওযূর ফযীলত' সম্পর্কিত একটি আয়াত

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا قُمۡتُمۡ اِلَی الصَّلٰوۃِ فَاغۡسِلُوۡا وُجُوۡہَکُمۡ وَاَیۡدِیَکُمۡ اِلَی الۡمَرَافِقِ وَامۡسَحُوۡا بِرُءُوۡسِکُمۡ وَاَرۡجُلَکُمۡ اِلَی الۡکَعۡبَیۡنِ ؕ وَاِنۡ کُنۡتُمۡ جُنُبًا فَاطَّہَّرُوۡا ؕ وَاِنۡ کُنۡتُمۡ مَّرۡضٰۤی اَوۡ عَلٰی سَفَرٍ اَوۡ جَآءَ اَحَدٌ مِّنۡکُمۡ مِّنَ الۡغَآئِطِ اَوۡ لٰمَسۡتُمُ النِّسَآءَ فَلَمۡ تَجِدُوۡا مَآءً فَتَیَمَّمُوۡا صَعِیۡدًا طَیِّبًا فَامۡسَحُوۡا بِوُجُوۡہِکُمۡ وَاَیۡدِیۡکُمۡ مِّنۡہُ ؕ مَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیَجۡعَلَ عَلَیۡکُمۡ مِّنۡ حَرَجٍ وَّلٰکِنۡ یُّرِیۡدُ لِیُطَہِّرَکُمۡ وَلِیُتِمَّ نِعۡمَتَہٗ عَلَیۡکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ

অর্থ: হে মুমিনগণ! তোমরা যখন নামাযের জন্য উঠবে তখন নিজেদের চেহারা ও কনুই পর্যন্ত নিজেদের হাত ধুয়ে নেবে, নিজেদের মাথাসমূহ মাসাহ করবে এবং টাখনু পর্যন্ত নিজেদের পা (-ও ধুয়ে নেবে)। তোমরা যদি জানাবত অবস্থায় থাক তবে নিজেদের দেহ (গোসলের মাধ্যমে) ভালোভাবে পবিত্র করে নেবে। তোমরা যদি পীড়িত হও বা সফরে থাক কিংবা তোমাদের মধ্যে কেউ শৌচস্থান থেকে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে দৈহিক মিলন করে থাক এবং পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করবে এবং তা (মাটি) দ্বারা নিজেদের চেহারা ও হাত মাসাহ করবে। আল্লাহ তোমাদের উপর কোনও কষ্ট চাপাতে চান না; বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নি'আমত পরিপূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা শোকরগোযার হয়ে যাও। (সূরা মায়েদা (৫), আয়াত ৬)

ব্যাখ্যা
এ আয়াতটি ওযূর বিধানের উৎস। এতে নামাযের জন্য ওযূ ফরয করা হয়েছে। ওযূ ছাড়া নামায জায়েয হয় না। ওযূতে চারটি কাজ ফরয- সম্পূর্ণ চেহারা ধোওয়া, কনুই পর্যন্ত দুই বাহু ধোওয়া, মাথা মাসাহ করা ও টাখনু পর্যন্ত দুই পা ধোওয়া। এর যে-কোনও একটি ছুটে গেলে ওযূ হয় না।

জুনুবী ব্যক্তির জন্য কেবল ওযূই যথেষ্ট নয়। তার জন্য গোসল করা ফরয। বিনা গোসলে তার পক্ষে নামায জায়েয নয়। যদি কেউ অসুস্থ থাকার দরুন পানি ব্যবহার করতে না পারে কিংবা সফরে থাকার কারণে পানি না পায়, তবে তার জন্য ওযূ-গোসলের বিকল্প হিসেবে তায়াম্মুম জায়েয করা হয়েছে। তায়াম্মুম হলো মাটি বা মাটি জাতীয় বস্তু, যেমন পাথর, বালু ইত্যাদি, এর উপর হাত রেখে মুখমণ্ডল এবং কনুই পর্যন্ত দু'বাহুতে সে হাত বোলানো। এতটুকু দ্বারাই যার উপর ওযূ করা ফরয তারও পবিত্রতা অর্জিত হয় এবং যার জন্য গোসল ফরয সেও পবিত্র হয়ে যায়। ওযূর মতোই তায়াম্মুম দ্বারাও নামায পড়া, তিলাওয়াতের সিজদা করা, কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা, কা'বাঘরের তাওয়াফ করা সবই জায়েয। এটা মুসলিম উম্মাহর উপর আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দান। এটা এ উম্মতের বৈশিষ্ট্য। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

فُضِّلْتُ عَلَى الْأَنْبِيَاءِ بِسِتٍّ: أُعْطِيتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ وَنُصِرْتُ بِالرُّعْبِ وَأُحِلَّتْ لِيَ الْغَنَائِمُ وَجُعِلَتْ لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا وَأُرْسِلْتُ إِلَى الْخَلْقِ كَافَّةً وَخُتِمَ بِيَ النَّبِيُّونَ .

'সমস্ত নবীর উপর আমাকে ছয়টি বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাকে সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক কথা বলার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রভাব বিস্তার দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হয়েছে। আমার জন্য সমগ্র ভূখণ্ডকে মসজিদ ও পবিত্রকারক বানানো হয়েছে। আমাকে সমস্ত মানুষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং আমার দ্বারা নবীগণের পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছে। (জামে' তিরমিযী: ১৫৫৩; সহীহ বুখারী: ৩৩৫; সহীহ মুসলিম: ৫২১: সুনানে নাসাঈ: ৮১৭; সুনানে ইবন মাজাহ : ৫৬৬; মুসনাদে আহমাদ: ২৭৪২; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা : ৭৭৫২: তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার: ১০২৩; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৬৬৭৪)

তায়াম্মুমের বিধান দ্বারা মুসলিম উম্মাহর জন্য পবিত্রতা অর্জনকে সহজ করা হয়েছে। এ উম্মতের যাবতীয় বিধানই তুলনামূলক বেশি সহজ। কোনও বিধানে কঠোরতা রাখা হয়নি। আয়াতে বলা হয়েছে-

مَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیَجۡعَلَ عَلَیۡکُمۡ مِّنۡ حَرَج (আল্লাহ তোমাদের উপর কোনও কষ্ট চাপাতে মন না)। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা দীনের কোনও বিধান দ্বারা তোমাদেরকে কষ্ট ও অসুবিধায় ফেলতে চান না। এ বিষয়টাকে দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করার জন্য আল্লাহ তা'আলা মায়াতে অতিরিক্ত مِّنۡ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ওযূতে এ আসানি ও সহজতার বিষয়টা ইস্পষ্ট। কেননা ওযূতে চেহারা, দুই হাত ও দুই পা মাত্র এ তিনটি অঙ্গ ধোওয়া হয় আর মাত্র একটি অঙ্গ অর্থাৎ মাথা মাসাহ করা হয়। এর দ্বারাই গোটা শরীর পাক হয়ে যায়।

এটা বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ মেহেরবানি। তিনি চাইলে এ হুকুমও দিতে পারতেন যে, পবিত্র হওয়ার জন্য গোটা শরীর ধুইতে হবে অর্থাৎ গোসল করতে হবে। কিন্তু এতে বিধানটি কঠিন হয়ে যেত। বান্দার কষ্ট হতো। তাই তার কষ্ট লাঘবের জন্য আল্লাহ তা'আলা বিধানটি সহজ করে দিয়েছেন। তিনি নিজ দয়ায় ওযূকে মাত্র চারটি অঙ্গে সীমাবদ্ধ রেখেছেন এবং এর দ্বারাই গোটা শরীর পাক হয়ে যাওয়ার ফয়সালা দিয়ে দিয়েছেন। এ আসানি ও সহজতা কেবল ওযূ-গোসল ও পবিত্রতার বেলায়ই নয়; দীনের যাবতীয় বিধানই এরকম। অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-

وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ

'তিনি দীনের ভেতর তোমাদের প্রতি কোনও সংকীর্ণতা আরোপ করেননি। (সূরা হজ্জ, আয়াত ৭৮)


এর দ্বারা মানুষকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে যে, দেখো, দীনের কোনও বিধান পালন তোমাদের পক্ষে কঠিন নয়। অথচ প্রতিটি বিধানের মধ্যেই তোমাদের রয়েছে অশেষ কল্যাণ। তা সত্ত্বেও তোমরা কেন এসব বিধান পালন করবে না? সহজ চেষ্টায় অশেষ কল্যাণ অর্জনের লক্ষ্যে দীনের প্রতিটি বিধান তোমাদের অবশ্যই পালন করা উচিত। আয়াতের শেষে আল্লাহ তা'আলা বলছেন-

وَّلٰکِنۡ یُّرِیۡدُ لِیُطَہِّرَکُمۡ وَلِیُتِمَّ نِعۡمَتَہٗ عَلَیۡکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ (বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নি'আমত পরিপূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা শোকরগোযার হয়ে যাও)। অর্থাৎ তিনি তোমাদেরকে বাহ্যিক অপবিত্রতা থেকেও পবিত্র করতে চান এবং গুনাহ মাফ করার দ্বারা আত্মিক অপবিত্রতা থেকেও পবিত্র করতে চান। সে উদ্দেশ্যেই তিনি কঠোর-কঠিন বিধান না দিয়ে সহজসাধ্য বিধান তোমাদেরকে দিয়েছেন। আর এভাবে তিনি তোমাদের উপর তাঁর দীনী নি'আমত পরিপূর্ণ করতে চেয়েছেন। তোমরা যাতে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন করে আখিরাতে নাজাত পেতে পার, সে লক্ষ্যে তোমাদের যা-কিছু করণীয় তার পরিপূর্ণ নির্দেশনা দিতে চেয়েছেন। পবিত্রতা অর্জনের বিধানাবলি সে পরিপূর্ণ নির্দেশনা অর্থাৎ দীনেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি তোমাদেরকে নাজাত লাভের এমন সহজসাধ্য ও পূর্ণাঙ্গ বিধানাবলি এজন্যই দিয়েছেন, যাতে তোমরা এ অনুগ্রহের কারণে তাঁর শোকর আদায় কর।

আয়াতটির শিক্ষা

ক. নামাযের জন্য পবিত্রতা অর্জন করা ফরয, যা কখনও ওযূর মাধ্যমে অর্জিত হয়, আবার কখনও এর জন্য গোসল করা জরুরি হয়।

খ. ওযূর ফরয চারটি- সম্পূর্ণ চেহারা ধোওয়া, কনুই পর্যন্ত হাত ধোওয়া, মাথা মাসেহ করা ও টাখনু পর্যন্ত পা ধোওয়া।

গ. শরীয়তসম্মত ওজরবশত পানি ব্যবহার করার সুযোগ না হলে তায়াম্মুম করা জায়েয। তায়াম্মুম মাটি জাতীয় বস্তুতে দু'হাত লাগিয়ে তা দ্বারা শুধু চেহারা এবং কনুই পর্যন্ত দুই হাত মাসেহ করার দ্বারা সম্পন্ন হয়।

ঘ. সহবাস করার দ্বারা গোসল ফরয হয়।

ঙ. দীনের কোনও বিধান কঠিন নয়; বরং তা পালন করা সহজ।

চ. দীনের বিধানাবলি দ্বারা বান্দাকে প্রকাশ্য ও গুপ্ত নাপাকি থেকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করাও উদ্দেশ্য।

ছ. দীনের প্রতিটি বিধান বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ নি'আমত ও অনুগ্রহ।

জ. দীনের বিধানাবলি পাওয়ার কারণেও আল্লাহ তা'আলার শোকর আদায় করা জরুরি। প্রকৃত শোকর হলো বিধানাবলি যথাযথভাবে পালন করা।
১০২৪. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন আমার উম্মতকে এ অবস্থায় ডাকা হবে। যে, ওযূর আছরে তাদের কপাল ও হাত-পা থাকবে উজ্জ্বল (এর আরেক অর্থ হতে পারে, কিয়ামতের দিন আমার উম্মতকে “গুরুন মুহাজ্জালুন” বলে ডাকা হবে)। সুতরাং যার পক্ষে নিজ উজ্জ্বলতা বাড়ানো সম্ভব হয়, সে যেন তা করে। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী: ১৩৬; সহীহ মুসলিম: ২৪৬; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা। ৩৮৮১ শু'আবূল ঈমান: ২৪৮৭. বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২১৮)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
قَالَ الله تَعَالَى: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاَةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ} إِلَى قَوْله تَعَالَى: {مَا يُريدُ اللهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ حَرَجٍ وَلكِنْ يُريدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ} [المائدة: 6].
1024 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه - قَالَ: سَمِعْتُ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يقول: «إنَّ أُمَّتِي يُدْعَوْنَ يَوْمَ القِيَامَةِ غُرًّا (1) مُحَجَّلينَ (2) مِنْ آثَارِ الوُضُوءِ، فَمَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يُطِيلَ غُرَّتَهُ فَلْيَفْعَلْ». متفقٌ عَلَيْهِ. (3)

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) الغر: جمع الأغر: من الغرة: بياض الوجه، يريد بياض وجوههم بنور الوضوء يوم القيامة. النهاية 3/ 354.
(2) أي بيض مواضع الوضوء من الأيدي والوجه والأقدام. النهاية 1/ 346.
(3) أخرجه: البخاري 1/ 46 (136)، ومسلم 1/ 149 (246) (34).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

غُرَّةٌ এর অর্থ চেহারার উজ্জ্বলতা। কোনও কোনও ঘোড়ার কপালে যে সাদা ছাপ থাকে, তাকেও غُرَّةٌ বলা হয়। গবাদি পশুর কপালে এরকম ছাপ থাকলে তাকে। চাঁদকপালে বলা হয়ে থাকে। অন্যান্য পশুর তুলনায় এরূপ পশু বেশি সুন্দর দেখা যায়। তাই এর প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে। ফলে মূল্যও বেশি হয়। ওযূ করার দ্বারা মুসলিম ব্যক্তির চেহারা দুনিয়ায়ও উজ্জ্বল হয়ে যায়। আখিরাতে এ উজ্জ্বলতা অনেক বেশি হবে। আর এভাবে অন্যসব জাতির উপর তারা অধিকতর মর্যাদাবানরূপে পরিদৃষ্ট হবে।

محجلين শব্দটির উৎপত্তি تَحْجِيلٌ থেকে। এর অর্থ হাত-পায়ের উজ্জ্বলতা। ঘোড়ার চার পায়ের শুভ্রতা বোঝানোর জন্যও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বারবার ওযূ করার দ্বারা মুসলিম ব্যক্তির হাত-পা উজ্জ্বল হয়ে যায়। কিয়ামতে সে উজ্জ্বলতা সবার চোখেই ধরা পড়বে। এটা তার মর্যাদার নিদর্শন হবে।

হাদীছটিতে বলা হচ্ছে, কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতকে যখন ডাকা হবে, তখন তাদের চেহারা ও হাত-পা উজ্জ্বল থাকবে। এটা হবে ওযূর প্রভাবে। অর্থাৎ ওযূ যেসকল অঙ্গে করা হয়, কিয়ামতের দিন সে অঙ্গগুলো উজ্জ্বল দেখা যাবে। এ উম্মতের প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ এক মেহেরবানী এই যে, কেবল তাদেরই মধ্যকার ওযূকারীদের চেহারা ও হাত-পা উজ্জ্বল দেখা যাবে। এটা তাদের জন্য ওযূর পুরস্কার। এ পুরস্কার ওযূর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণও বটে। কেননা ওযূ শব্দের অর্থ উজ্জ্বলতা। ওযূ দ্বারা জাহিরী ও বাতেনী মলিনতা দূর হয়। ফলে অঙ্গসমূহ বাহ্যিকভাবেও উজ্জ্বল হয় এবং অভ্যন্তরীণ দিক থেকেও হয় নূরানী। সুতরাং আখিরাতে এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ পুরস্কার তাদের দেওয়া হবে। তাদের ওযূর অঙ্গসমূহ করা হবে সমুজ্জ্বল।

হাদীছটির অন্য অর্থ অনুযায়ী এ উম্মতকে ডাকাই হবে “গুরুন মুহাজ্জালুন” বলে। যেমন বলা হবে, হে গুরুন মুহাজ্জালুন! তোমরা সামনে এসো। অর্থাৎ তাদেরকে উম্মতে মুহাম্মাদী না বলে গুরুন মুহাজ্জালুন বলে ডাকা হবে। এটা তাদের বিশেষ সম্মাননা।

কিয়ামতের মাঠে হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্তকার সমগ্র মানুষ উপস্থিত থাকবে। দুনিয়ায় তারা ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে বিভক্ত ও ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন ইহুদী, নাসারা ইত্যাদি। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মত মুসলিম নামে পরিচিত। কিয়ামতের ময়দানে এ সমুদয় মানুষের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ পরিচিত হবে গুরুন মুহাজ্জালুন নামে। অর্থাৎ শুভ্র-সমুজ্জ্বল চেহারা ও শুভ্র-সমুজ্জ্বল হাত-পা বিশিষ্ট জাতি। এটা যেন হবে তাদের প্রতীকচিহ্ন বা লোগো। এর দ্বারা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে আলাদাভাবে চিনতে পারবেন। হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীছে আছে যে, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে বলেছিলেন, তোমরা হলে আমার আসহাব। আর আমার ভাই হলো তারা, যারা এখনও পর্যন্ত আসেনি। তারা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার উম্মতের যারা এখনও আসেনি, আপনি তাদের কীভাবে চিনবেন? তিনি বললেন-

أَرَأَيْتَ لَوْ أَنَّ رَجُلًا لَهُ خَيْلٌ غُرٌّ مُحَجَّلَةٌ بَيْنَ ظَهْرَيْ خَيْلٍ دُهْمٍ بُهْمٍ أَلَا يَعْرِفُ خَيْلَهُ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ فَإِنَّهُمْ يَأْتُونَ غُرًّا مُحَجَّلِينَ مِنَ الْوُضُوءِ وَأَنَا فَرَطُهُمْ عَلَى الْحَوْض

'তুমি কী মনে কর যদি কোনও ব্যক্তির ঘোর কালো এক পাল ঘোড়ার মধ্যে চাঁদকপালে ও সাদা পায়ের একটি ঘোড়া থাকে, সে কি তাও ওই ঘোড়াটি চিনতে পারবে না? তারা বললেন, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন তারা এভাবে উপস্থিত হবে যে, তাদের চেহারা ও হাত-পা ওযূর কারণে উজ্জ্বল থাকবে। আমি হাউযে কাউছারে তাদের অপেক্ষায় থাকব। (সহীহ মুসলিম: ২৪৯; মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৮১; মুসনাদুল বাযযার: ৮৩২২; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৬৫০২; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৭২০৯)

مِنْ آثَارِ الْوُضُوءِ (ওযূর আছরে)। অর্থাৎ তাদের চেহারা ও হাত-পায়ের এ উজ্জ্বলতা হবে ওযূর কারণে। ওযূ যেন এক নূর, এক সমুজ্জ্বল আলো। যে অঙ্গসমূহে এর স্পর্শ লাগবে, তা আলোকিত হয়ে যাবে। দুনিয়ায় দেখা না গেলেও আখিরাতে ঠিকই সকলের সামনে তা চমকাতে থাকবে। চেহারার এ চমক দেখা যাবে সিজদার কারণেও। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ

'তাদের আলামত তাদের চেহারায় পরিস্ফুট, সিজদার ফলে। (সূরা ফাতহ, আয়াত ২৯)

ওযূ, নামায, সিজদা- এসব পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। ওযূ ছাড়া নামায হয় না। সিজদা নামাযের এক প্রধান অঙ্গ। যারা নামায পড়ে, তারা অবশ্যই ওযূ করে। এসব আমলের কারণে কিয়ামতের দিন তারা সবার সামনে শুভ্র-সমুজ্জ্বলরূপে উপস্থিত থাকবে। ফলে অন্যসব জাতি থেকে তাদেরকে আলাদাভাবে চেনা যাবে।

এবার ভাবুন, মুসলিম হয়েও যারা ওযূ করে না, নামায পড়ে না, কিয়ামতের ময়দানে তারা অন্যদের থেকে কীভাবে আলাদারূপে পরিচিত হবে? কীভাবে তাদের আলাদাভাবে চেনা যাবে? যেই ছাপ দেখে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিনবেন বলে জানিয়েছেন, সেই ছাপ যখন তাদের চেহারায় থাকবে না, তখন হাউযে কাউছারে উপস্থিত হয়ে কীভাবে তারা তাঁর হাতে পানি পান করতে পারবে? এ হাদীছ দ্বারা তাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে সত্যিকারের ওযূকারী ও সত্যিকারের নামাযী বানিয়ে দিন।

فمَنِ استطاعَ منكُم أن يطيلَ غُرَّتَهُ فلْيَفْعلْ (সুতরাং যার পক্ষে নিজ উজ্জ্বলতা বাড়ানো সম্ভব হয়, সে যেন তা করে)। এটা হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর কথা। তিনি নিজে এ কথার উপর আমল করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি, সম্পর্কেও এরূপ আমল করার কথা বর্ণিত আছে। এর অর্থ হলো, ওযূর ফরয পরিমাণ আদায়ের পর বাড়তি কিছু করা। সম্পূর্ণ চেহারা ধোওয়ার পর কপালের উপর দিক থেকে মাথার কিছু অংশও এবং চোয়াল ও থুতনির নিচে বাড়তি কিছুটা ধোওয়া। কনুই পর্যন্ত হাত ধোওয়ার পর কনুইয়ের উপরও খানিকটা ধুয়ে নেওয়া। এমনিভাবে টাখনু পর্যন্ত পা ধোওয়ার পর টাখনুর উপরও খানিকটা ধোওয়া। এটা মুস্তাহাব।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. ওযূ অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ আমল। তাই ফরয তো বটেই, সুন্নত ও মুস্তাহাবের দিকে লক্ষ রেখেও নিয়মিত সুন্দরভাবে ওযূ করা উচিত।

খ. ওযূর কারণে কিয়ামতে মুসলিম উম্মাহ বিশেষ সম্মান লাভ করবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
রিয়াযুস সালিহীন - হাদীস নং ১০২৪ | মুসলিম বাংলা