রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০১৮
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
সূরা বাকারার ফযীলত
১০১৮. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ে ফেলো না। যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, সে ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়। -মুসলিম (সহীহ মুসলিম: ৭৮০, জামে' তিরমিযী: ২৮৭৭; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৭৯৬১: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১১৯৩; মুসনাদে আহমাদ: ৭৮০৭। বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান : ২১৬৪; মুসনাদুল বাযযার: ৯০৯১; সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৮৩)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1018 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «لاَ تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ البَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ البَقرَةِ». رواه مسلم. (1)

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: مسلم 2/ 188 (780) (212).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

সূরা বাকারা কুরআন মাজীদের সবচে' দীর্ঘ সূরা। এর সর্বমোট আয়াত সংখ্যা ২৮৬। এর পরিমাণ প্রায় আড়াই পারা। এ সূরায় মুমিন, কাফের ও মুনাফিক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে। এতে আছে আকাইদ ও আহকামের বিস্তারিত বিবরণ। এ সূরায় রয়েছে মানবসৃষ্টির সূচনা, দুনিয়ার মানুষের আগমন ও বংশ বিস্তার, নবী-রাসূলগণের দাওয়াত ও তাদের কওমের প্রতিক্রিয়া, বিশেষত বনী ইসরাঈলের বিভিন্ন ঘটনা, বিভিন্ন উপমা ও দৃষ্টান্ত, বিভিন্ন দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে অবিশ্বাসী সম্প্রদায়সমূহের ভ্রান্ত মতের খণ্ডন, নানা অলৌকিক ঘটনা, উপদেশমূলক কাহিনি, আল্লাহ তা'আলার বিশিষ্ট বান্দাদের বৃত্তান্ত, ইবলীস-শয়তানের ছলচাতুরীর উল্লেখ ও তার নিন্দা ইত্যাদি নানারকম আলোচনার সমাহার। সবচে' মহীয়ান যে আয়াতুল কুরসী, তা এ সূরারই অংশ। তাই এ সূরার ফযীলতও অনেক বেশি। বিভিন্ন হাদীছে এর বিভিন্ন মাহাত্ম্য তুলে ধরা হয়েছে। আলোচ্য হাদীছটির মূল বিষয়বস্তুও সূরাটির ফযীলত। এতে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

কুরআন তিলাওয়াতবিহীন ঘর কবরতুল্য
لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِر (তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ে ফেলো না)। অর্থাৎ তোমাদের ঘরবাড়িকে কেবল ঘুমানোর স্থান বানিয়ো না, যেখানে নামায, কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর যিকির হয় না। ঘুম তো মৃত্যুতুল্য। কাজেই ঘরকে কেবল ঘুমানোর জায়গা বানালে তা মৃত ব্যক্তির জায়গার মতোই হলো। মৃতব্যক্তির জায়গা হলো কবর। কাজেই ঘরকে যিকির ও ইবাদত-বন্দেগী থেকে খালি রাখলে তা হবে কবরের মতো আর তোমরা হবে মৃতের মতো। মোটকথা ইবাদত-বন্দেগী ও দীনী কাজকর্ম হলো ঘরের প্রাণ। এ প্রাণ না থাকলে ঘর কবরতুল্য হয়ে যায় এবং এরূপ ব্যক্তিও হয়ে যায় মৃত ব্যক্তির মতো। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مَثَلُ الْبَيْتِ الَّذِي يُذْكَرُ اللَّهُ فِيهِ وَالْبَيْتِ الَّذِي لاَ يُذْكَرُ اللَّهُ فِيهِ مَثَلُ الْحَىِّ وَالْمَيِّت

'যে ঘরে আল্লাহর যিকির হয় আর যে ঘরে আল্লাহর যিকির হয় না, তার দৃষ্টান্ত হলো জীবিত ও মৃত। (সহীহ মুসলিম: ৭৭৯; সহীহ ইবন হিব্বান: ৮৫৪; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৭৩০৬, বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ৫৩২)

তোমরা যখন মুমিন-মুসলিম, তখন তোমাদের ঘর তো এমন হওয়া উচিত না। কারণ মুমিন হলো সত্যিকারের প্রাণসমৃদ্ধ। সে সত্যিকারের জীবিত। জীবিত মানুষ তো কবরে থাকে না। কবরে থাকে মৃত মানুষ। তোমাদের ঘর যদি বন্দেগীবিহীন হয়, তবে তা যেমন কবরতুল্য হবে, তেমনি তোমরা হয়ে যাবে মৃত মানুষের মতো। জীবিত থাকা সত্ত্বেও মৃত। যে ব্যক্তি যিকির করে না, সে যেন জীবিত থাকা সত্ত্বেও মৃত। অপর এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مَثَلُ الْبَيْتِ الَّذِي يُذْكَرُ اللَّهُ فِيهِ وَالْبَيْتِ الَّذِي لاَ يُذْكَرُ اللَّهُ فِيهِ مَثَلُ الْحَىِّ وَالْمَيِّت

'যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের যিকির করে আর যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের যিকির করে না, তারা হলো জীবিত ও মৃতের সমতুল্য। (সহীহ বুখারী: ৬৪০৭; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১২৪২)

মৃত ব্যক্তির মধ্যে কোনও কল্যাণ নেই। তা গলিতব্য লাশ মাত্র। তা কোনও কাজের থাকে না। মৃত লাশের ভেতর যেমন কোনও কল্যাণ নেই, তেমনি মৃত ঘর তথা কবরেরও কোনও কল্যাণ নেই। কারণ ইহজীবনে তা কোনও কাজে আসে না। যে ঘরে ইবাদত-বন্দেগী নেই তা যেহেতু কবরতুল্য, তাই তার ভেতরেও কল্যাণ থাকে না। থাকে না শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা। বিশালাকার বাড়ি হলেও অশান্তির কারণে তা বাসিন্দাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা তোমাদের ঘরকে কবরে পরিণত করো না; বরং ইবাদত-বন্দেগী দ্বারা আবাদ রেখো, জীবিত রেখো। ঘর জীবন্ত থাকলে তা কল্যাণময় হবে। তাতে শান্তি ও স্বস্তি থাকবে। নিরাপত্তা থাকবে। সংকীর্ণ ঘরও তার বাসিন্দাদের জন্য বিস্তৃত ভুবন হয়ে যাবে। ঘর আবাদ হয় ইবাদত-বন্দেগীর দ্বারা, বিশেষত যিকিরের দ্বারা। কুরআন তিলাওয়াত শ্রেষ্ঠতম যিকির। তার মধ্যেও সূরা বাকারা যেহেতু সবচে' বড় ও সবচে' বেশি আলোচনা সমৃদ্ধ, তাই এর তিলাওয়াতে বরকতও বেশি হয়। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

সূরা বাকারার তিলাওয়াত দ্বারা শয়তান বিতাড়ন
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَة ( যে ঘরে সুরা বাকারা পড়া হয়, সে ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়)। শয়তান পালায় এ কারণে যে, সে সূরা বাকারার নূর সইতে পারে না। এ সূরা অত্যন্ত জ্যোতির্ময়। এর একটি নাম হলো الزَّهْرَاءُ (সমুজ্জ্বল জ্যোতি)। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
اقْرَءُوا الزَّهْرَاوَيْنِ الْبَقَرَةَ وَسُورَةَ آلِ عِمْرَانَ فَإِنَّهُمَا تَأْتِيَانِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ أَوْ كَأَنَّهُمَا غَيَايَتَانِ أَوْ كَأَنَّهُمَا فِرْقَانِ مِنْ طَيْرٍ صَوَافَّ تُحَاجَّانِ عَنْ أَصْحَابِهِمَا اقْرَءُوا سُورَةَ الْبَقَرَةِ فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةٌ وَتَرْكَهَا حَسْرَةٌ وَلاَ تَسْتَطِيعُهَا الْبَطَلَةُ
'তোমরা সমুজ্জ্বল সূরাদু'টি পড়ো। অর্থাৎ সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান। সে দু'টি যেন শামিয়ানা অথবা দুই খণ্ড মেঘ অথবা সে দু'টি যেন সারিবদ্ধ দুই ঝাঁক পাখি। তারা তাদের সঙ্গীর পক্ষে বিতর্ক করবে। তোমরা সূরা বাকারা পড়ো। কেননা এটি অবলম্বন করা বরকত এবং পরিত্যাগ করা আক্ষেপ। জাদুকরেরা এ সূরা মুখস্থ করতে পারে না। (সহীহ মুসলিম: ৮০৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৫৯৯১; মুসনাদুল বাযযার: ৮৫৪৭: তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৭৫৪৪; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৩১৩৫; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ১৮২৬)

তো এ সূরার নূর ও বরকতের কারণে শয়তান হতাশ হয়ে যায়। সে বুঝে ফেলে এ সূরা যখন পড়া হয়েছে, তখন এর বাসিন্দাদের কোনও ক্ষতি করা বা তাদেরকে বিপথগামী করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। তাই ব্যর্থ মনোরথ হয়ে সে এরকম ঘর থেকে দূর হয়ে যায়। বরং সে যিকিরপূর্ণ ঘরে ঢুকতেই পারে না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لاَ تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ وَإِنَّ الْبَيْتَ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ الْبَقَرَةُ لاَ يَدْخُلُهُ الشَّيْطَانُ. 'তোমরা তোমাদের ঘরসমূহকে কবরস্থান বানিয়ো না। নিশ্চয়ই যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, সে ঘরে শয়তান প্রবেশ করে না। (জামে' তিরমিযী: ২৮৭৭)

এর দ্বারা বোঝা গেল সূরা বাকারা তিলাওয়াত করার দ্বারা ঘর আবাদ হয়। যে ঘরে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা হয়, সে ঘর জ্যান্ত ঘর হয়ে ওঠে। সে ঘরকে কবরের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। ঘর আবাদ হয় নামায দ্বারাও। নামাযও তো যিকিরই বটে। তাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপর এক হাদীছে ইরশাদ করেছেন-

اجْعَلُوا فِي بُيُوتِكُمْ مِنْ صَلَاتِكُمْ وَلَا تَتَّخِذُوهَا قُبُورًا

'তোমরা তোমাদের ঘরে নামাযের একটা অংশ রেখো। তোমরা ঘরগুলোকে কবরে পরিণত করো না। (সহীহ বুখারী: ৪৩২; সহীহ মুসলিম: ৭৭৭; সুনানে আবূ দাউদ: ২০৪; মুসনাদে আহমাদ। ৪৬৫৩; মুসনাদুল বাযযার: ৫৪২১; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৪৮৬৭; সহীহ ইবন খুযায়মা। ১২০৫; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা। ৩০৩৯; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৫০৭)

মোটকথা সূরা বাকারা অশেষ বরকতপূর্ণ এক সূরা। এর কল্যাণ অপরিমিত। ঘরবাড়ির রূহানী আবাদ করার জন্য এ সূরাটির তিলাওয়াত সর্বোত্তম ব্যবস্থা। এটি সর্বোত্তম উপায় সর্বপ্রকার অনিষ্ট থেকে ঘরবাড়ির সুরক্ষার জন্যও। শয়তানও এ সূরাটিকে বেজায় ভয় পায়। সর্ববিচারে এটি কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠতম সূরা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

لِكُلِّ شَيْءٍ سَنَامٌ وَإِنَّ سَنَامَ الْقُرْآنِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ وَفِيهَا آيَةٌ هِيَ سَيِّدَةُ آىِ الْقُرْآنِ هِيَ آيَةُ الْكُرْسِيِّ

'প্রত্যেক বস্তুর একটা চূড়া (শ্রেষ্ঠতম স্থান) আছে। কুরআনের চূড়া হলো সূরা বাকারা। তাতে এমন একটি আয়াত আছে, যা কুরআনের আয়াতসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তা হলো আয়াতুল কুরসী। (জামে' তিরমিযী: ২৮৭৮; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৬০১৯; মুসনাদুল হুমায়দী: ১০২৪। সুনানে দারিমী: ৩৪২০; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা ৭৫৫৪; সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৮০% হাকিম, আল মুসতাদরাক: ২০৫৮; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর। ৫৮৬৪; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২১৫৮)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. মুসলিম ব্যক্তি ঈমানের প্রাণশক্তি দ্বারা সত্যিকারের জীবিত। সে যেহেতু জীবিত, তাই তার বাসস্থানকে জীবিত ব্যক্তির বাসস্থানরূপে আবাদ রাখা উচিত। তা আবাদ করতে হলে একদিকে শয়তান থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে, অন্যদিকে তা প্রাণবন্ত রাখতে হবে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত দ্বারা। অন্যথায় সে ঘর কবরতুল্য হয়ে যায়। নফল নামায, যিকির, দু'আ ও কুরআন তিলাওয়াত এমন বরকতপূর্ণ ও নূরানী ইবাদত, যা দ্বারা শয়তান থেকে ঘরের সুরক্ষা হয় এবং তা হয়ে ওঠে জীবন্ত ঘর। তাই আমাদেরকে আপন আপন ঘরে নিয়মিত নফল ইবাদত-বন্দেগী করতে হবে, কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত করতে হবে, বিশেষত সূরা বাকারা পাঠ করতে হবে।

২. যে ব্যক্তি যিকির ও তিলাওয়াত করে না, সে মৃত মানুষের মতো, যার ঠিকানা হয় কবর। তাই সত্যিকারের জীবিত থাকার জন্য নিয়মিত যিকিরকারী হয়ে থাকতে হবে। কুরআন তিলাওয়াত করা শ্রেষ্ঠ যিকির।

গ. শয়তান মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টায় লেগে থাকে। তার ক্ষতি থেকে বাঁচার শ্রেষ্ঠ উপায় কুরআন তিলাওয়াত করা।

ঘ. কুরআন তিলাওয়াত বিশেষত সূরা বাকারার তিলাওয়াত দ্বারা শয়তানের অনিষ্ট থেকে ঘরের সুরক্ষা হয়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান