রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০১৭
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
রাতের বেলা সূরা বাকারার শেষের আয়াতদু'টি পড়া
১০১৭. হযরত আবূ মাস'উদ আল-বাদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোনও রাতে সূরা বাকারার শেষের দুই আয়াত পাঠ করে, (সে রাতে) তার জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যায়। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী: ৪০০৮; সহীহ মুসলিম: ৮০৮; সুনানে আবূ দাউদ: ১৩৯৭; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৭৯৪৯; জামে' তিরমিযী: ২৮৮১; সুনানে ইবন মাজাহ ১৩৬৭; সুনানে দারিমী: ১৫২৮; সহীহ ইবন খুযায়মা: ১১৪১; সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৮১; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৫৪১)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1017 - وعن أَبي مسعودٍ البَدْرِيِّ - رضي الله عنه - عن النبي - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «مَنْ قَرَأَ بِالآيَتَيْنِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ البَقَرَةِ في لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ». متفقٌ عَلَيْهِ. (1)
قِيلَ: كَفَتَاهُ الْمَكْرُوهَ تِلْكَ اللَّيْلَةَ، وَقِيلَ: كَفَتَاهُ مِنْ قِيامِ اللَّيْلِ.

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: البخاري 5/ 107 (4008)، ومسلم 2/ 198 (808) (256).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীছটিতে সূরা বাকারার সর্বশেষ আয়াতদু'টির ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। আয়াতদু'টির ফযীলত সম্পর্কে আছে বহু হাদীছ। আমরা প্রথমে আয়াতদু'টি জেনে নিই এবং তার তরজমা ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর বুঝে নিই। আয়াতদু'টি হলো-

اٰمَنَ الرَّسُوۡلُ بِمَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡہِ مِنۡ رَّبِّہٖ وَالۡمُؤۡمِنُوۡنَ ؕ کُلٌّ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَمَلٰٓئِکَتِہٖ وَکُتُبِہٖ وَرُسُلِہٖ ۟ لَا نُفَرِّقُ بَیۡنَ اَحَدٍ مِّنۡ رُّسُلِہٖ ۟ وَقَالُوۡا سَمِعۡنَا وَاَطَعۡنَا ٭۫ غُفۡرَانَکَ رَبَّنَا وَاِلَیۡکَ الۡمَصِیۡرُ(٢٨٥) لَا یُکَلِّفُ اللّٰہُ نَفۡسًا اِلَّا وُسۡعَہَا ؕ  لَہَا مَا کَسَبَتۡ وَعَلَیۡہَا مَا اکۡتَسَبَتۡ ؕ  رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذۡنَاۤ اِنۡ نَّسِیۡنَاۤ اَوۡ اَخۡطَاۡنَا ۚ  رَبَّنَا وَلَا تَحۡمِلۡ عَلَیۡنَاۤ اِصۡرًا کَمَا حَمَلۡتَہٗ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِنَا ۚ  رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلۡنَا مَا لَا طَاقَۃَ لَنَا بِہٖ ۚ  وَاعۡفُ عَنَّا ٝ  وَاغۡفِرۡ لَنَا ٝ  وَارۡحَمۡنَا ٝ  اَنۡتَ مَوۡلٰىنَا فَانۡصُرۡنَا عَلَی الۡقَوۡمِ الۡکٰفِرِیۡنَ ( ٢٨٦)

'রাসূল (অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাতে ঈমান এনেছে, যা তাঁর উপর তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ হতে নাযিল করা হয়েছে এবং (তাঁর সাথে) মুমিনগণও। তাঁরা সকলে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছে। (তারা বলে,) আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কোনও পার্থক্য করি না (যে, কারও প্রতি ঈমান আনব এবং কারও প্রতি আনব না)। এবং তাঁরা বলে, আমরা (আল্লাহ ও রাসূলের বিধানসমূহ মনোযোগ সহকারে) শুনেছি এবং তা (খুশিমনে) পালন করছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার মাগফিরাতের ভিখারী, আর আপনারই কাছে আমাদের প্রত্যাবর্তন। আল্লাহ কারও উপর তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব অর্পণ করেন না। তার কল্যাণ হবে সে কাজেই, যা সে স্বেচ্ছায় করে এবং তার ক্ষতিও হবে সে কাজেই, যা সে স্বেচ্ছায় করে। (হে মুসলিমগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে এই দু'আ করো যে,) হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দ্বারা যদি কোনও ভুলত্রুটি হয়ে যায় তবে সেজন্য তুমি আমাদের পাকড়াও করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের প্রতি সেই রকমের দায়িত্বভার অর্পণ করো না, যেমন তা অর্পণ করেছিলে আমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর এমন ভার চাপিয়ো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের (ত্রুটিসমূহ) মার্জনা করো, আমাদের ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো। তুমিই আমাদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করো।'

শানে নুযূল : আয়াতদু'টি নাযিল হয়েছে সাহাবায়ে কেরামের অন্তরের একটা টকা দূর করার জন্য। তাদের সে খটকাটি দেখা দিয়েছিল এর আগের আয়াতের বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে। তাতে আছে- وَاِنۡ تُبۡدُوۡا مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ اَوۡ تُخۡفُوۡہُ یُحَاسِبۡکُمۡ بِہِ اللّٰہُ (তোমাদের অন্তরে যা আছে তা তোমরা প্রকাশ কর বা গোপন কর, আল্লাহ তোমাদের থেকে তার হিসাব নেবেন)। এর দ্বারা বাহ্যত বোঝা যাচ্ছিল, অন্তরে অনিচ্ছাকৃত যেসব ধারণা-কল্পনা জাগে তারও হিসাব নেওয়া হবে। এতে সাহাবায়ে কেরাম খুব চিন্তায় পড়ে যান। তারা আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের তো জানা ছিল আমাদের হিসাব নেওয়া হবে কেবল ইচ্ছাকৃত কাজের। মনে অনিচ্ছাকৃত যে কল্পনা আসে, তার হিসাব নেওয়া হবে না। কিন্তু এ আয়াত দ্বারা জানা গেল তারও হিসাব নেওয়া হবে। এতে তো শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া খুবই কঠিন হবে। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন যে, এর দ্বারা মূলত ইচ্ছাকৃত বিষয়ই বোঝানো হয়েছে, অনিচ্ছাকৃত ধারণা-কল্পনা নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি নিজের পক্ষ থেকে কোনও উত্তর না দিয়ে ওহীর অপেক্ষায় থাকলেন। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি তাদের বললেন, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে যে হুকুম আসে, মুমিনের কাজ তা নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া, তা সহজ হোক বা কঠিন। তোমাদের তো উচিত ছিল এ কথা বলা যে- سَمِعۡنَا وَاَطَعۡنَا ٭۫ غُفۡرَانَکَ رَبَّنَا وَاِلَیۡکَ الۡمَصِیۡر (আমরা শুনেছি এবং তা পালন করছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার মাগফিরাতের ভিখারী, আর আপনারই কাছে আমাদের প্রত্যাবর্তন)। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা আয়াতদু'টি নাযিল করেন।

আয়াতে সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসা
প্রথম আয়াতে সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসা করা হয়েছে আর দ্বিতীয় আয়াতে তাদের মনের সংশয়ের নিরসন করা হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসা করতে গিয়ে তাদের ঈমানের পরিপক্বতা তুলে ধরা হয়েছে। সে প্রসঙ্গে উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে ইসলামের সর্বপ্রধান আকীদাসমূহ। বলা হয়েছে- کُلٌّ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَمَلٰٓئِکَتِہٖ وَکُتُبِہٖ وَرُسُلِہٖ (তাঁরা সকলে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছে)। এতে যে আকীদাসমূহের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা নিম্নরূপ-

(ক) আল্লাহর প্রতি ঈমান। অর্থাৎ আল্লাহ এক, তাঁর কোনও শরীক নেই। তিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক। তিনি অনাদি, অনন্ত। তিনি সর্বশক্তিমান। তিনি স্থান-কালের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এক অসীম সত্তা। কোনওদিক থেকেই তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, কিন্তু সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। তাঁর মতো ও তাঁর সদৃশ আর কেউ নেই। তিনিই একমাত্র মাবুদ। তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের উপযুক্ত নয়।

(খ) তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান। ফিরিশতাগণ আল্লাহর মাখলুক। তাদের সংখ্যা অগণিত। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত করে রেখেছেন। আল্লাহ তা'আলা যখন যে আদেশ করেন, তারা তা অবশ্যই পালন করেন। তাঁর কোনও হুকুম তারা অমান্য করেন না।

(গ) আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মানুষের হিদায়াতের জন্য যুগে যুগে বহু কিতাব নাযিল করেছেন। তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ কিতাব হলো তাওরাত, ইনজীল, যাবুর ও কুরআন। কুরআন সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ আসমানী কিতাব। কুরআনই একমাত্র কিতাব, যা যেমন নাযিল হয়েছিল তেমনি সংরক্ষিত আছে। কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে। কেউ কখনও এর মধ্যে বিকৃতি ঘটাতে পারবে না। কুরআন ছাড়া অন্যসব কিতাবের মধ্যে মানুষ নানারকম বিকৃতি ঘটিয়েছে। তাই সেসব কিতাব যেমন নাযিল হয়েছিল, তেমনি হুবহু বিদ্যমান নেই।

(ঘ) রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যুগে যুগে মানুষের হিদায়াতের জন্য বহু নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। কুরআন মাজীদে যাদের কথা উল্লেখ আছে, তাদের প্রত্যেকেই সত্যনবী ছিলেন। তাদের প্রত্যেকেই আপন আপন যুগে নবী হিসেবে নিজ নিজ দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করেছেন। তাদের প্রত্যেকে প্রেরিত হয়েছিলেন নির্দিষ্ট জাতির জন্য ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। সবশেষে আল্লাহ তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠিয়েছেন। তিনি কিয়ামত পর্যন্ত সারা জাহানের সকল মানুষের নবী। তিনি খাতামুন নাবিয়্যীন। তাঁর পরে আর কোনও নবী আসবে না।

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আল্লাহ তা'আলা যা-কিছু ওহী নাযিল করেছেন, তার সবটার প্রতি তিনি নিজে এবং সমস্ত মুমিন অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম ঈমান এনেছেন। তারা বলেন-

لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُّسُلِهِ (আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কোনও পার্থক্য করি না)। অর্থাৎ অন্যসব নবী-রাসূলের প্রতি তাদের ঈমানে কোনও তারতম্য নেই। সকলকেই তারা নবী বলে বিশ্বাস করেন। এমন নয় যে, কাউকে নবী বলে বিশ্বাস করেন এবং কাউকে নয়। যেমন ইহুদী সম্প্রদায় হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী বলে স্বীকার করে না। অপরদিকে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় সর্বশেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি বিশ্বাস রাখে না।

وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا (এবং তাঁরা বলে, আমরা শুনেছি এবং তা পালন করছি)। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদের প্রতি যেসকল বিধি-বিধান এসেছে, তা তারা যেমন শুনেছেন তেমনি পালন করেছেন। এমন নয় যে, শুনলেন কিন্তু মানলেন না বা কিছু মানলেন কিছু মানলেন না। এমনও নয় যে, সেসব বিধানের মধ্যে নিজেদের পক্ষ হতে হেরফের করে নিজেদের ইচ্ছামতো পালন করেছেন। বরং তারা পরিপূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে প্রত্যেকটি বিধান যথাযথভাবে পালন করেছেন।

غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَ إِلَيْكَ الْمَصِيرُ (হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার মাগফিরাতের ভিখারী, আর আপনারই কাছে আমাদের প্রত্যাবর্তন)। অর্থাৎ এতটা আনুগত্য সত্ত্বেও তারা অত্যন্ত বিনয়ী। তাদের অন্তরে পরিপূর্ণ আল্লাহভীতি বিদ্যমান। সারা জাহানের মালিকের সামনে তারা নিজেদেরকে অপরাধী গণ্য করেন। তাদের ভাবনা হলো বুঝি বা আল্লাহর মর্জিমতো তাঁর আদেশ পালন করা হয়নি। না জানি কোনও অসতর্ক মুহূর্তে কোনও গুনাহ হয়ে গেছে। তাই তারা সেজন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। তারা বলেন- غُفْرَانَكَ رَبَّنَا। অর্থাৎ হে আমাদের প্রতিপালক। আমরা আপনার কাছে নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করছি।

وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ (আর আপনারই কাছে আমাদের প্রত্যাবর্তন)। অর্থাৎ পরকাল ও পুনরুত্থান দিবসের প্রতি তাদের রয়েছে গভীর বিশ্বাস। পরকালের প্রতি তাদের পরিপূর্ণ বিশ্বাস তো রয়েছেই। তারা তার ভয়ে ভীতও। তাদের মনে ভয়, একদিন আল্লাহ তা'আলার কাছে ফিরে যেতে হবে। তাঁর সামনে দাঁড়াতে হবে। সেদিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। না জানি সেই মহাবিচারে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে কী ফয়সালা আসে! এই বিশ্বাস ও ভীতির প্রকাশ করে তারা আল্লাহ তা'আলার কাছে নিজেদের অসহায়ত্ব তুলে ধরেন এবং তাঁর রহমত ও দয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের ঈমান-আনুগত্যের প্রশংসা করে আমাদেরকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে যেন আমরাও তাদের মতো পরিপূর্ণ ঈমানদার হই এবং পরিপূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি।

ইসলামের কোনও বিধানের অনুসরণ মানুষের সাধ্যাতীত না হওয়া
প্রথম আয়াতে ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের ঈমান-আনুগত্যের প্রশংসা। দ্বিতীয় আয়াতে রয়েছে তাদের সংশয়ের জবাব। এতে দু'টি অংশ আছে। প্রথম অংশে শরীয়তের দু'টি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন -

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَ عَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ (আল্লাহ কারও উপর তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব অর্পণ করেন না। তার কল্যাণ হবে সে কাজেই, যা সে স্বেচ্ছায় করে এবং তার ক্ষতিও হবে সে কাজেই, যা সে স্বেচ্ছায় করে)। এতে প্রথম মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বান্দার উপর যা-কিছু আদেশ-নিষেধ জারি করেছেন, তার কোনওটিই তাদের সাধ্যের অতীত নয়। তার প্রত্যেকটি পালন করার পূর্ণ ক্ষমতা তাদের রয়েছে। সাধ্যের অতীত কোনও আদেশ বা নিষেধ তিনি আরোপ করেনই না। আবার যেসব আদেশ-নিষেধ তিনি আরোপ করেছেন, তা পালনে যদি কারও ব্যক্তিগত কোনও ওজর দেখা দেয়, তবে সে ওজরও গৃহীত হয়। সে ক্ষেত্রে তার জন্য তার অবস্থা অনুযায়ী অবকাশ থাকে। যেমন দাঁড়িয়ে নামায পড়তে না পারলে বসে পড়বে, অসুস্থতা বা অন্য কোনও ওজরে রমাযান মাসে রোযা রাখতে না পারলে পরে কাযা করবে, ক্ষুধা মেটানোর জন্য হালাল খাবার না পেলে প্রাণ রক্ষার্থে হারাম খাবারই খেয়ে নেবে ইত্যাদি।

এ মূলনীতির আলোকে লক্ষ করলে দেখা যাবে গোটা শরীয়তই মানুষের সাধ্যের অন্তর্ভুক্ত। শরীয়তের এমন কোনও বিধান নেই, যা পালন করার ক্ষমতা মানুষের নেই। কাজেই শরীয়তের কোনও বিধানের ক্ষেত্রে মানুষের এ অজুহাত দেখানোর সুযোগ নেই যে, তা পালন করার ক্ষমা তার নেই, তাই সে পালন করছে না।

এ মূলনীতি দ্বারা সাহাবায়ে কেরামের সংশয়ের নিরসন হয়ে গেছে। কেননা মনের অনিচ্ছাকৃত ধারণা-কল্পনা মানুষের ক্ষমতার বাইরের বিষয়। মানুষ তা চাইলেও ঠেকাতে পারে না। কাজেই আয়াতের মূলনীতি অনুযায়ী সে বিষয়ে আল্লাহ মানুষকে পাকড়াও করবেন না এবং কোনও হিসাবও নেবেন না। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় মূলনীতিটি এমনিই বোঝা যায়। তা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, যাতে মুমিনগণ পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন-

لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ (তার কল্যাণ হবে সে কাজেই, যা সে স্বেচ্ছায় করে এবং তার ক্ষতিও হবে সে কাজেই, যা সে স্বেচ্ছায় করে)। অর্থাৎ শরীয়তপ্রদত্ত প্রতিটি বিধান যেহেতু মানুষের এখতিয়ারভুক্ত, তাই যে ব্যক্তি তা পালন করবে, সে অবশ্যই কল্যাণ লাভ করবে, দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান পাবে। আর যে ব্যক্তি পালন করবে না, সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত ও গুনাহগার। যেসব কাজ মানুষ স্বেচ্ছায় করে না, তা ভালো হোক বা মন্দ, তাতে কোনও ছাওয়াব বা গুনাহও তার হবে না। কাজেই অন্তরে মাঝেমধ্যে অনিচ্ছাকৃত যেসব সংশয়-সন্দেহ, ধারণা-কল্পনা ও কুচিন্তা জেগে ওঠে, সে অনুযায়ী যতক্ষণ কাজ করা না হয়, ততক্ষণ তা নিয়ে পেরেশান হওয়ার কোনও কারণই নেই, যেহেতু সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। হাঁ, যদি সে অনুযায়ী কাজ করা হয়, তবে কাজ করাটা যেহেতু ইচ্ছাকৃত, সেজন্য অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হবে।

خَطَاٌ ও نِسْيَانٌ এর পার্থক্য
আয়াতটির দ্বিতীয় অংশ মহান রব্বের কাছে বান্দার প্রার্থনা। এ প্রার্থনা সাহাবায়ে কেরাম করতেন। এর ভেতর কয়েকটি বিষয় চাওয়া হয়েছে। যথা- رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذۡنَاۤ اِنۡ نَّسِیۡنَاۤ اَوۡ اَخۡطَاۡنَا (হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দ্বারা যদি কোনও ভুল-ত্রুটি হয়ে যায় তবে সেজন্য তুমি আমাদের পাকড়াও করো না)। এখানে দু'টি বিষয় আছে। একটি হলো نِسْيَانٌ (ভুলে যাওয়া, বিস্মৃত হওয়া)। আরেকটি হলো خَطَاٌ (অনিচ্ছাকৃত ত্রুটিবিচ্যুতি)। মানুষের দ্বারা অনিচ্ছাকৃত যেসব অনুচিত কাজ হয়, তার কোনওটি হয় বিস্মৃতিবশত।

মনে করুন এক ব্যক্তির আল্লাহ তা'আলার দেওয়া একটি বিধান জানা আছে। কিন্তু যখন সেটি পালন করার কথা, তখন সে তা ভুলে গেল। ফলে তার সেটি পালন করা হলো না। যেমন নামাযের সময় কোনওকিছুতে মগ্ন থাকার কারণে নামাযের কথা ভুলে গেল। ফলে ওয়াক্ত চলে গেল এবং তার নামায পড়া হলো না। রোযা অবস্থায় রোযার কথা ভুলে গিয়ে কিছু খেয়ে ফেলল। কাউকে কোনও ওয়াদা দিয়েছিল, কিন্তু সে ওয়াদার কথা ভুলে যাওয়ায় তা পালন করা হলো না। ওযূ করার পর কারও ওযূ ভেঙে গেল। কিন্তু তার সে কথা মনে নেই। কেবল এতটুকুই মনে আছে যে, সে ওযূ করেছিল। আর এভাবে সে বিনা ওযূতে নামায পড়ে ফেলল। এসব হলো (ভুলে যাওয়া, বিস্মৃত হওয়া)।

কোনও কোনও অনুচিত কাজ হয় ইচ্ছাকৃত কোনও কাজের বিচ্যুতির কারণে। যেমন এক ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও জন্তু লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিল, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তা গিয়ে লাগল কোনও মানুষের গায়ে আর তাতে সে ব্যক্তি মারা গেল বা জখম হলো। কেউ ওযূ করার জন্য কুলি করছিল, কিন্তু অসাবধানতার কারণে পানি নেমে গেল গলার নিচে আর এভাবে রোযা ভেঙে গেল। এসব ক্ষেত্রে করার ইচ্ছা থাকে একটা, কিন্তু হয়ে যায় আরেকটা। এটা হলো خَطَاٌ (অনিচ্ছাকৃত ত্রুটিবিচ্যুতি)।

আরেক হলো كُرْهٌ (অন্যের হুমকি-ধমকিতে কোনও কাজ করা)। যেমন কোনও রোযাদার ব্যক্তি অন্যের জুলুম-নিপীড়নে বাধ্য হয়ে রোযা ভেঙে ফেলল। কারও জুলুম-অত্যাচারে মুখে কুফরী কথা উচ্চারণ করল, কিন্তু অন্তরে ঈমান ঠিকই আছে। এ তিনও প্রকারের দোষ ক্ষমাযোগ্য। অর্থাৎ এসব কাজে গুনাহ হবে না, যদিও কোনও কোনও ক্ষেত্রে এভাবে কৃত কাজের প্রতিকার করা জরুরি হয়। যেমন ছুটে যাওয়া নামায পড়ে নেওয়া এর ক্ষেত্রে রোযা কাযা করা ইত্যাদি। গুনাহ যে হবে না, সে বিষয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِنَّ اللهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْه

'আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের বিচ্যুতি, বিস্মৃতি এবং যে (অন্যায়) কাজে তাদেরকে বাধ্য করা হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। (সুনানে ইবন মাজাহ: ২০৪৪: তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার ৪৬৪৯; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১১৪১৬; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ১৮০৩৬; সুনানে দারা কুতনী: ৪৩৫১; সুনানে সা'ঈদ ইবন মানসূর: ১১৪৫; সহীহ ইবন হিব্বান: ৭২১৯; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ১৪৩০)

তো বান্দা বলছে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা বড় দুর্বল। ভুল-বিচ্যুতিবশত আমাদের দ্বারা অনেক কিছু হয়ে যায়। সেজন্য আমাদেরকে পাকড়াও না করে বরং সেগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখুন। এ দু'আ কবুল হয়েছে, যেমনটা উল্লিখিত হাদীছ দ্বারা বোঝা যাচ্ছে।

رَبَّنَا وَلَا تَحۡمِلۡ عَلَیۡنَاۤ اِصۡرًا کَمَا حَمَلۡتَہٗ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِنَا

(হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের প্রতি সেই রকমের দায়িত্বভার অর্পণ করো না, যেমন তা অর্পণ করেছিলে আমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি)। অর্থাৎ আমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি যেমন কঠিন কঠিন বিধান ছিল, সেরকম বিধান আমাদের দিয়ো না। উদাহরণত বনী ইসরাঈলের প্রতি হুকুম ছিল কাপড়ের কোথাও নাপাক লাগলে নাপাকীর জায়গাটা কেটে ফেলতে হবে বা পুড়ে ফেলতে হবে, পানি দিয়ে ধোওয়ার দ্বারা পাক হবে না। কোনও কোনও গুনাহের ক্ষেত্রে কেবল মৌখিক তাওবা যথেষ্ট ছিল না; বরং নিজেকে হত্যা করা জরুরি ছিল। হে আল্লাহ! এরকম কঠিন বিধান আমাদের প্রতি আরোপ করো না।

رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ (হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর এমন ভার চাপিয়ো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই)। অর্থাৎ দুনিয়ায় আমাদের উপর এমন কঠিন বিপদ-আপদ ও বালা-মসিবত অবতীর্ণ করো না, যা আমরা সইতে পারব না। অথবা এর অর্থ- আমাদের উপর এমন কঠিন বিধি-বিধান আরোপ করো না, যা পালন করার ক্ষমতা আমাদের নেই।

প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহ তা'আলা তো বলেই দিয়েছেন যে, তিনি বান্দার সাধ্যাতীত বিধান আরোপ করেন না, তা সত্ত্বেও এরূপ দু'আ করার অর্থ কী?

এর উত্তর হলো, আল্লাহ তা'আলা বান্দার উপর সাধ্যাতীত বিধান আরোপ করেন না কেবল তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে। না হয় আল্লাহ তা'আলার তা করার এখতিয়ার অবশ্যই আছে। তিনি সারা জাহানের খালেক ও মালিক। মালিক তার মালিকানাধীন মাখলুকের উপর যা ইচ্ছা বিধান আরোপ করতেই পারেন। তাতে তার উপর আপত্তি তোলার অধিকার কারও নেই। সে দৃষ্টিকোণ থেকে একজন বান্দার পক্ষ হতে এরূপ প্রার্থনা পুরোপুরি যুক্তিযুক্ত।
অথবা বলা যেতে পারে, এ দু'আ তো করেছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন যে-কোনও বিধান মানসূখ বা রহিত হয়ে যাওয়ার অবকাশ ছিল। কাজেই আল্লাহ তা'আলা সাধ্যাতীত কোনও বিধান আরোপ করেন না বলে ঘোষণা দিলেও পরে এ নীতি চাইলে তিনি তুলেও নিতে পারতেন। তা যেন না নেন, সেজন্যই এ প্রার্থনা।

وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا 'আমাদের (ত্রুটিসমূহ) মার্জনা করো, আমাদের ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো'। অর্থাৎ আমাদের গুনাহ ও ত্রুটিবিচ্যুতির জন্য কোনওরকম শাস্তির সম্মুখীন না করে আমাদেরকে পুরোপুরি ক্ষমা করে দিন এবং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে আমাদেরকে আপনার রহমতের ছায়াতলে রাখুন।

اَنۡتَ مَوۡلٰىنَا فَانۡصُرۡنَا عَلَی الۡقَوۡمِ الۡکٰفِرِیۡنَ (তুমিই আমাদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করো)। অর্থাৎ দুনিয়ায় যত অমুসলিম সম্প্রদায় আছে, তারা সকলেই আমাদের শত্রু। আমাদের বিরুদ্ধে তারা একজোট। তারা যেমন দলীল-প্রমাণ ও যুক্তি-তর্ক দ্বারা আমাদের হারিয়ে দিতে চায়, তেমনি অস্ত্রের জোরেও আমাদেরকে পরাভূত করতে চায়। আপনার সাহায্য ছাড়া আমরা তাদের উপর জয়ী হতে পারব না। আপনিই আমাদের অভিভাবক। আপনিই আমাদের সাহায্যকারী। আপনি আমাদের সাহায্য করুন, যাতে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক ও দলীল-প্রমাণের শক্তিতেও তাদের উপর জয়ী থাকতে পারি এবং সামরিক শক্তিতেও।

এর দ্বারা বোঝা যায় মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক উভয় শক্তিতে বলীয়ান থাকতে হবে। উভয় শক্তি অর্জনের জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে। সবদিক থেকে অমুসলিমদের উপর বিজয়ী থাকা কুরআন-হাদীছের দৃষ্টিতেই কাম্য। আজ এ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর উদাসীনতা অত্যন্ত ভয়াবহ এবং অমার্জনীয় পর্যায়ের। তারই পরিণাম আজ মুসলিম জাহান ভোগ করছে। শত্রুর মনে তাদের প্রতি কোনও ভয় নেই; বরং তারাই শত্রুদের ভয় করছে। এর থেকে উত্তরণের একই পথ- জ্ঞানশক্তি ও বস্তুগত শক্তি, উভয় শক্তির ব্যাপক চর্চা করতে হবে। উভয় শক্তিতে নিজেদেরকে বলীয়ান করে তুলতে হবে।

উল্লেখ্য, এ আয়াতে যতগুলো দু'আর উল্লেখ আছে, তার প্রত্যেকটিই কবুল হয়েছে। বর্ণিত আছে, প্রত্যেকটি দু'আর জবাবে আল্লাহ তা'আলা উত্তর দেন- نَعَمْ কোনও কোনও বর্ণনায় আছে- قَدْ فَعَلْتُ (হাঁ আমি এটা করলাম)। (সহীহ মুসলিম : ১২৫; জামে তিরমিযী: ২৯৯২; মুসনাদে আহমাদ: ২০৭০; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ১০৯৯৩; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার ১৬২৯; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২১৮৪; সহীহ ইবন হিব্বান: ১৩৯)

আয়াতদু'টির ফযীলত
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলোচ্য হাদীছে এ আয়াতদু'টির ফযীলত সম্পর্কে বলেছেন, যে ব্যক্তি রাতে এ আয়াতদু'টি পড়বে, كَفَتَاهُ (তার জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যায়)। ইমাম নববী রহ. এর দু'টি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। এক ব্যাখ্যা করেছেন এই যে- كَفَتَاهُ الْمَكْرُوْهَ تِلْكَ اللَّيْلَةَ (সেই রাতে সকল অনিষ্ট থেকে তার রক্ষার জন্য আয়াতদু'টি যথেষ্ট হয়ে যাবে)। অর্থাৎ কোনও মানুষ ও জিন তার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। অপর এক হাদীছ দ্বারাও এর সমর্থন পাওয়া যায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ كِتَابًا قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ بِأَلْفَيْ عَامٍ، أَنْزَلَ مِنْهُ آيَتَيْنِ خَتَمَ بِهِمَا سُورَةَ الْبَقَرَةِ، وَلَا يُقْرَآنِ فِي دَارٍ ثَلَاثَ لَيَالٍ فَيَقْرَبُهَا شَيْطَانٌ.

'আল্লাহ তা'আলা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দু'হাজার বছর আগে একটি কিতাব লিখেছেন। তা থেকে তিনি দু'টি আয়াত নাযিল করে তা দ্বারা সূরা বাকারা সমাপ্ত করেছেন। সে আয়াতদু'টি কোনও বাড়িতে তিন দিন পড়া হলে শয়তান তার কাছেও যেতে পারে না। (জামে' তিরমিযী: ২৮৮২; সুনানে দারিমী: ৩৪৩০; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ১০৭৩৭; মুসনাদুল বাযযার: ৩২৯৬; সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৮১; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৭৮৪৬; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান ২১৭৯: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১২০)

ইমাম নববী রহ. এর দ্বিতীয় ব্যাখ্যা করেছেন- كَفَتَاهُمِنْ قِيامِ اللَّيْلِ (রাতে উঠার বিষয়ে আয়াতদু'টি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে)। অর্থাৎ শয়তান তার কানে পেশাব করতে পারবে না এবং তার কপালে বসতে সক্ষম হবে না। এভাবে সে শয়তানের বাধা থেকে বেঁচে যাবে, ফলে রাতে উঠে ইবাদত-বন্দেগী করতে সক্ষম হবে।

ইমাম ইবন হাজার আসকালানী রহ. বলেন, كَفَتَاهُ ক্রিয়াপদটির কর্মপদ উহ্য রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কোন বিষয়ে যথেষ্ট হবে তা উল্লেখ করা হয়নি। আরবী ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী কর্মপদ উহ্য রাখার দ্বারা ব্যাপকতা বোঝানো হয়ে থাকে। সে হিসেবে এর অর্থ হবে, রাতে আয়াতদু'টি পাঠ করার দ্বারা সর্বপ্রকার অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষা লাভ হবে এবং সর্বপ্রকার কল্যাণ অর্জিত হবে। সুতরাং যে ব্যক্তি রাতের বেলা এ আয়াতদু'টি পড়বে, সে মানুষ ও জিনের অনিষ্ট থেকে বেঁচে যাবে, রাতের বেলা নফল ইবাদত দ্বারা যে ছাওয়াব অর্জন করা সম্ভব তা এ আয়াতদু'টি পড়ার দ্বারাই অর্জিত হয়ে যাবে। এমনিভাবে নিজ ঈমান তাজা করা, আল্লাহর সম্মুখে নিজ আনুগত্য প্রকাশ করা, রাতের বেলা কুরআন তিলাওয়াত করা ও আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'আ করা-এ সবকিছুর বিপরীতে কেবল এ আয়াতদু'টির তিলাওয়াতই যথেষ্ট।

সবচে' বড় কথা হলো এ আয়াতদু'টিতে সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসা করা হয়েছে, তাদের ঈমান ও আনুগত্যের উচ্চতা তুলে ধরা হয়েছে এবং তাদের দু'আ ও প্রার্থনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কাজেই এ আয়াতের মর্মবাণী উপলব্ধি করতে পারলে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি গভীর মুহাব্বত সৃষ্টি হবে। তাদের প্রতি মুহাব্বত ও ভালোবাসা রাখা ঈমানের অঙ্গ ও আখিরাতে নাজাতের অসিলা। এমনিভাবে সে মর্মবাণী উপলব্ধি করে ভক্তি-মুহাব্বতের সঙ্গে যদি আমরা এর নিয়মিত তিলাওয়াত করি ও এর অনুসরণে বদ্ধপরিকর থাকি, তবে তাদের সঙ্গে আমাদের ঈমান ও আনুগত্যের সাদৃশ্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এর দ্বারা আমরা ঈমানের অনেক উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারি। ইবাদত-আনুগত্যে আমরা হয়ে উঠতে পারি পরিপূর্ণ মুসলিম। এমন পরিপূর্ণ মুমিন-মুসলিম হওয়ার জন্য এ আয়াতদু'টির হিদায়াত ও অনুপ্রেরণা আমাদের জন্য যথেষ্ট।

আয়াতদু'টির ফযীলত সম্পর্কে আরও কিছু হাদীছ
এ আয়াতদু'টির ফযীলত সম্পর্কে আরও বহু হাদীছ আছে। যেমন হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাযি. থেকে বর্ণিত আছে-

فَأُعْطِيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثَلاَثًا أُعْطِيَ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسَ وَأُعْطِيَ خَوَاتِيمَ سُورَةِ الْبَقَرَةِ وَغُفِرَ لِمَنْ لَمْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ مِنْ أُمَّتِهِ شَيْئًا الْمُقْحِمَاتُ .

'(মি'রাজের রাতে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনটি বিষয় দেওয়া হয়। তাঁকে দেওয়া হয় পাঁচ (ওয়াক্তের) নামায, তাঁকে দেওয়া হয় সূরা বাকারার শেষাংশ এবং তাঁর উম্মতের মধ্যে যে-কেউ আল্লাহর সঙ্গে কোনওকিছুকে শরীক করে না, তার বড় বড় গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হয় (অর্থাৎ এরূপ ব্যক্তিকে অনন্তকাল জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে না)। (সহীহ মুসলিম: ১৭৩; জামে তিরমিযী: ৩২৭৬; সুনানে নাসাঈ ৪৫১; মুসনাদে আহমাদ। ২৬৬৫; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৩১৬৯৭; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৫৩০৩। বায়হাকী শু'আবূল ঈমান: ২১৭৭: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৩৭৫৭)

হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

‌فُضِّلْنَا ‌عَلَى ‌النَّاسِ ‌بِثَلَاثٍ: ‌جُعِلَتِ ‌الأَرْضُ ‌كُلُّهَا ‌مَسْجِدًا، وَجُعِلَ تُرْبَتُهَا لَنَا طَهُورًا، وَجُعِلَتْ صُفُوفُنَا كَصُفُوفِ الْمَلَائِكَةِ، وَأُوتِيتُ هَؤُلَاءِ الآيَاتِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ الْبَقَرَةِ مِنْ كَنْزٍ تَحْتَ الْعَرْشِ لَمْ يُعْطَهُ أَحَدٌ قَبْلِي، وَلَا يُعْطَى أَحَدٌ بَعْدِي".

'সমস্ত মানুষের উপর আমাদেরকে তিনটি বিষয় দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে।

আমাদের জন্য সারা পৃথিবীকে মসজিদ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এর মাটিকে আমাদের জন্য পবিত্রকারক বানানো হয়েছে। আমাদের (নামাযের) কাতারকে ফিরিশতাদের কাতারের মতো করা হয়েছে। আমাকে আরশের তলদেশের ভান্ডার থেকে সূরা বাকারার শেষের আয়াতসমূহ দেওয়া হয়েছে, যা আমার আগে কাউকে দেওয়া হয়নি এবং আমার পরেও কাউকে দেওয়া হবে না।' (সহীহ ইবন হিব্বান: ১৬৯৭; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩১৬৪৯; মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ৪১৮; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৭৯৬৮; সহীহ ইবন খুযায়মা ২৬৪; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার ১০২৪; মুসনাদুল বাযযার: ২৮৪৫; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১০২৩)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন, একদিন জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বসা ছিলেন। এ অবস্থায় উপর দিকে একটি আওয়াজ শুনলেন। তিনি তাঁর মাথা তুললেন। তারপর বললেন, এটা আসমানের একটি দরজা (খোলার আওয়াজ)। আজ এটি খোলা হয়েছে। এর আগে কখনও খোলা হয়নি। এ দরজা দিয়ে একজন ফিরিশতা নেমে এসেছে। এ ফিরিশতা পৃথিবীতে এই প্রথম নামল। আজ ছাড়া আর কখনও সে নামেনি। তারপর সেই ফিরিশতা সালাম দিয়ে বলল-

أَبْشِرْ بِنُورَيْنِ أُوتِيتَهُمَا لَمْ يُؤْتَهُمَا نَبِيٌّ قَبْلَكَ فَاتِحَةُ الْكِتَابِ وَخَوَاتِيمُ سُورَةِ الْبَقَرَةِ لَنْ تَقْرَأَ بِحَرْفٍ مِنْهُمَا إِلَّا أَعْطيته .

'সুসংবাদ গ্রহণ করুন দুই নূরের, যা আপনাকে দেওয়া হয়েছে, আপনার আগে অন্য কোনও নবীকে দেওয়া হয়নি। তা হলো (ক) সূরা ফাতিহা এবং (খ) সূরা বাকারার শেষ আয়াতসমূহ। আপনি এর যে-কোনও কথা পড়বেন, আপনাকে তা অবশ্যই দেওয়া হবে।' (সহীহ মুসলিম: ৮০৬; সুনানে নাসাঈ ৯১২; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩১৭০১; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ২৪৮৮; সহীহ ইবন হিব্বান ৭৭৮; মুসনাদুল বাযযার ৫১১৮; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ১২২৫৫; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ২০২৫: বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২১৪৫)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. সূরা বাকারার শেষের আয়াতদু'টি অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ। এ আয়াতদু'টি সকলেরই মুখস্থ থাকা উচিত।

খ. এ আয়াতদু'টির অর্থ ও মর্মবাণী হৃদয়ঙ্গম করা উচিত।

গ. আয়াতদু'টির অর্থ চিন্তা করলে সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা উপলব্ধি করা যায়।

ঘ. আয়াতদু'টির বিষয়বস্তুতে চিন্তাফিকির করা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি মুহাব্বত সৃষ্টির পক্ষে সহায়ক।

ঙ. এ আয়াতদু'টি পাঠ করা রাতের একটি আমল। এ আমল আমরা অবশ্যই করব।

চ. রাতের বেলা এ আয়াতদু'টি পাঠ করার দ্বারা সর্বপ্রকার অনিষ্ট থেকে হেফাজত হয়।

ছ. রাতের নফল ইবাদত ও দু'আ হিসেবে এ আয়াতদু'টির তিলাওয়াত যথেষ্ট।

জ. কুরআন মাজীদের কোনও কোনও সূরা ও আয়াতের স্বতন্ত্র ফযীলত ও মহিমা আছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান