রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০২৭
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
ওযূর ফযীলত: ওযূর সঙ্গে মসজিদে যাওয়া
১০২৭. হযরত উছমান ইবন আফফান রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওযূ করতে দেখেছি আমার এই ওযূর মতো। তারপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি এভাবে ওযূ করে, তার পেছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। ফলে তার নামায ও মসজিদের দিকে হেঁটে যাওয়া অতিরিক্ত নেকীর কারণ হবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২২৯। সুনানে ইবন মাজাহ: ২৮২; মুসনাদুল বাযযার: ৪৩২)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1027 - وعنه، قَالَ: رَأيتُ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - تَوَضَّأَ مِثْلَ وُضُوئِي هَذَا، ثُمَّ
قَالَ: «مَنْ تَوَضَّأ هكَذَا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَكَانَتْ صَلاَتُهُ وَمَشْيُهُ إِلَى المَسْجدِ نَافِلَةً». رواه مسلم. (1)

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: مسلم 1/ 142 (229) (8).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এখানে হাদীছটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্তারিত বর্ণনায় আছে-

"হযরত উছমান রাযি.-এর আযাদকৃত গোলাম হুমরান রহ. বলেন, আমি উছমান ইবন আফফানের কাছে ওযূর পানি নিয়ে আসলাম। তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে ওযূ করতেন তা দেখাব না? এই বলে তিনি ওযূ করলেন। প্রতিটি অঙ্গ তিনবার করে ধুইলেন। সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কয়েকজন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। তারপর বললেন, তোমরা শোনো! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওযূ করতে দেখেছি আমার এই ওযূর মতো। তারপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি এভাবে ওযূ করে, তার পেছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। ফলে তার নামায ও মসজিদের দিকে হেঁটে যাওয়া অতিরিক্ত নেকীর কারণ হবে। (সহীহ মুসলিম: ২২৯, ২৩০; মুসনাদুল হুমায়দী: ৩৫: বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২৪৬৮)

এ হাদীছ দ্বারা আমরা কয়েকটি বিষয় জানতে পারি। প্রথমত ওযূর গুরুত্ব। ওযূ এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। তারপর সাহাবায়ে কেরামও তাদের শিষ্যদেরকে অনুরূপ শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত উছমান গনী রাযি. তখন মুসলিম জাহানের খলীফা। হাজারও তাঁর ব্যস্ততা। তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে ওযূ করতেন তা তিনি নিজে ওযূ করে মানুষকে দেখিয়েছেন, যাতে করে তারা ওযূর সুন্নত পদ্ধতি থেকে দূরে সরে না যায়। ওযূ করা এক ইবাদত।

যে-কোনও ইবাদত ঠিক সেভাবেই করতে হবে, যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন। মনগড়া পদ্ধতিতে করলে তা আর যা-কিছুই হোক, ইবাদত হবে না।

দ্বিতীয়ত জানতে পারি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার সুরক্ষা ও তার প্রচারে সাহাবায়ে কেরাম কী পরিমাণ গুরুত্ব দিতেন। একজন খলীফাতুল মুসলিমীন হওয়া সত্ত্বেও হাজারও ব্যতিব্যস্ততার ভেতর দিয়ে হযরত উছমান রাযি. সে শিক্ষার সংরক্ষণ ও প্রচারে কেমন যত্নবান থেকেছেন। সাহাবায়ে কেরাম দীনের প্রতিটি বিষয়ে এ কর্মপন্থা অবলম্বন করেছেন। সে ধারায় আজও পর্যন্ত দীন তার পরিপূর্ণ রূপরেখায় সংরক্ষিত আছে। মানুষের নানা শিথিলতা ও বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও দীনের মূল চেহারায় কোনও আঁচড় লাগেনি। ইনশাআল্লাহ সাহাবায়ে কেরামের সত্যিকারের উত্তরসূরী সব যুগের উলামায়ে কেরামের মেহনত ও সতর্ক দৃষ্টির বদৌলতে কিয়ামত পর্যন্ত এ দীনের ইলম ও আমল যথাযথ রূপে সংরক্ষিত থাকবে।

তৃতীয়ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে ওযূ করেছেন, ঠিক সেরকম ওযূ করার প্রতিদান জানানো হয়েছে যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলা ওযূকারীর অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। এটা ওযূর এক বিরাট পুরস্কার। সহজ কাজের বিনিময়ে অনেক বড় পুরস্কার! গুনাহের মার্জনা জীবনের পরম লক্ষ্য। যা দ্বারা সে মার্জনা লাভ হবে, তা গুরুত্বের সঙ্গেই গ্রহণ করা উচিত।

চতুর্থত জানা যায়, ওযূর বদৌলত গুনাহ মাফ হবে তখনই, যখন ওযূ করা হবে সুন্নত মোতাবেক। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে ওযূ করেছেন ঠিক সেভাবে করা।

পঞ্চমত জানা যায়, মসজিদে হেঁটে যাওয়াও একটি নেক কাজ। এর বিনিময়েও ছাওয়াব আছে। এর দ্বারাও গুনাহ মাফ হয়, তবে যেহেতু ওযূর দ্বারাই গুনাহ মাফ হয়ে গেছে, তাই মসজিদে যাওয়ার দ্বারা গুনাহ মাফের বদলে বাড়তি নেকী লাভ হবে।

ষষ্ঠত জানতে পারি, নামায যেমন প্রভূত ছাওয়াবের এক মহান ইবাদত, তেমনি তা গুনাহ মাফেরও অসিলা বটে। তবে ওযূর বদৌলতে আগেই গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ায় নামাযের বিনিময়ে তার আর প্রয়োজন থাকে না। তাই গুনাহ মাফের বদলে অতিরিক্ত ছাওয়াব দান করা হবে।

উল্লেখ্য, যে-কোনও ইবাদত ও নেক আমলের বদৌলতে কেবল সগীরা গুনাহই মাফ হয়, কবীরা গুনাহ নয়। মানুষের হকও নয়। তা থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য তাওবা করা ও হক আদায় করা শর্ত।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. ওযূতে প্রতি অঙ্গ তিনবার ধোওয়া সুন্নত, যদিও একবার ধোওয়ার দ্বারা ফরয আদায় হয়ে যায়।

খ. যারা ওযূ জানে না, তাদেরকে হাতে-কলমে ওযূ শেখানো উচিত। আলেমগণ আম লোকদেরকে এবং বড়রা শিশুদেরকে ওযূ কীভাবে করতে হয় তা শিখিয়ে দেবে।

গ. ওযূর দ্বারা অতীতের গুনাহ মাফ হয়।

ঘ. যে-কোনও ইবাদত দ্বারা গুনাহ মাফের জন্য কিংবা ইবাদতের ছাওয়াব অর্জনের জন্য সে ইবাদত সুন্নত মোতাবেক হওয়া শর্ত।

ঙ. ইবাদত-বন্দেগীর বাস্তব রূপরেখা সংরক্ষণ করার প্রতিও যত্নবান থাকা উচিত।

চ. মসজিদে হেঁটে যাওয়া ছাওয়াবের কাজ ও গুনাহ মাফের অসিলা।

ছ. নামায দ্বারা যেমন আল্লাহ তা'আলার হুকুম পালন হয় ও ছাওয়াব পাওয়া যায়, তেমনি এর দ্বারা গুনাহের মাগফিরাতও লাভ হয়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
রিয়াযুস সালিহীন - হাদীস নং ১০২৭ | মুসলিম বাংলা