রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০২৮
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
ওযূর ফযীলত: ওযূ দ্বারা ওযূর অঙ্গসমূহের গুনাহ মাফ হওয়া
১০২৮. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মুসলিম বান্দা অথবা (তিনি বলেছেন) মু'মিন বান্দা যখন ওযূ করে আর তাতে তার চেহারা ধোয়, তখন পানির সাথে বা পানির শেষ ফোঁটার সাথে তার চেহারা থেকে ওইসকল গুনাহ বের হয়ে যায়, যা তার দু'চোখ দিয়ে দেখে করেছে। যখন সে তার দু'হাত ধোয়, তখন পানির সাথে বা পানির শেষ ফোঁটার সাথে তার ওইসকল গুনাহ বের হয়ে যায়, যা সে তার দু'হাত দিয়ে ধরে করেছে। যখন সে তার দু'পা ধোয়, তখন পানির সাথে বা পানির শেষ ফোঁটার সাথে ওইসকল গুনাহ বের হয়ে যায়, যেদিকে সে তার দু'পা দিয়ে হেঁটে গেছে। পরিশেষে সে সমস্ত গুনাহ হতে পবিত্র হয়ে যায়। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২৪৪; জামে তিরমিযী: ২; মুসনাদে আহমাদ: ৮০০৭; মুআত্তা মালিক: ৬১। সহীহ ইবন খুযায়মা : ৪; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ৩৮১; শু'আবূল ঈমান : ২৪৭৬: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৫১; সুনানে দারিমী: ৭৪৫; সহীহ ইবন হিব্বান: ১০৪০)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1028 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «إِذَا تَوَضَّأ العَبْدُ المُسْلِمُ - أَو المُؤْمِنُ - فَغَسَلَ وَجْهَهُ، خَرَجَ مِنْ وَجْهِهِ كُلُّ خَطِيئَةٍ نَظَرَ إِلَيْهَا بِعَيْنَيْهِ مَعَ المَاءِ، أَوْ مَعَ آخِرِ قَطْرِ المَاءِ، فَإذَا غَسَلَ يَدَيْهِ، خَرَجَ مِنْ يَدَيْهِ كُلُّ خَطِيئَةٍ كَانَ بَطَشَتْهَا يَدَاهُ مَعَ المَاءِ، أَو مَعَ آخِرِ قَطْرِ المَاءِ، فَإذَا غَسَلَ رِجْلَيْهِ، خَرَجَتْ كُلُّ خَطِيئَةٍ مَشَتْهَا رِجْلاَهُ مَعَ المَاءِ، أَو مَعَ آخِرِ قَطْرِ المَاءِ، حَتَّى يَخْرُجَ نَقِيًّا مِنَ الذُّنُوبِ». رواه مسلم. (1)

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) انظر الحديث (129).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

ওযূ দ্বারা বান্দা কেবল বাহ্যিকভাবেই নয়; আত্মিকভাবেও পবিত্র হয়ে যায়। অর্থাৎ তার গুনাহসমূহ মাফ হয়ে যায়। পেছনের হাদীছেও এটা বলা হয়েছে। তবে এ হাদীছে বিষয়টা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
বান্দার জন্য বাহ্যিক পবিত্রতার পাশাপাশি আত্মিক পবিত্রতা অর্জনও জরুরি। কেননা জান্নাতে যাওয়ার জন্য আত্মার পবিত্রতা শর্ত। নাপাক আত্মা জান্নাতের উপযুক্ত নয়। পাপকর্ম হচ্ছে আত্মিক অপবিত্রতা। এর দ্বারা মানুষের আত্মা মলিন ও অপবিত্র হয়ে যায়, যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-

كَلَّا ۖ بَلْ ۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ

'কখনও নয়। বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের অন্তরে জং ধরিয়ে দিয়েছে।'

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا أَذْنَبَ كَانَتْ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ فِي قَلْبِهِ، فَإِنْ تَابَ وَاسْتَغْفَرَ، صُقِلَ قَلْبُهُ، وَإِنْ زَادَ، زَادَتْ حَتَّى تَعْلُوْا قَلْبَهُ، فَذَلِكُمُ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَهُ اللَّهُ تَعَالَى: {كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ}

'মুমিন ব্যক্তি যখন কোনও গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো বিন্দু পড়ে যায়। যদি সে তাওবা করে ও গুনাহ ছেড়ে দেয় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তবে তার অন্তর পরিষ্কার হয়ে যায়। যদি আরও গুনাহ করে, তবে আরও কালো বিন্দু পড়ে। পরিশেষে তার গোটা অন্তরের উপর তা ছেয়ে যায়। এটাই হচ্ছে সেই رَانَ জং, যে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- كَلَّا ۖ بَلْ ۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ (কখনও নয়। বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের অন্তরে জং ধরিয়ে দিয়েছে)। (মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৫২: সুনানে ইবন মাজাহ: ৪২৪৪: হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৩৯০৮)

সে অপবিত্রতা দূর হয় কেবল তখনই, যখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। গুনাহ মাফের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে। একটি ব্যবস্থা হলো তাওবা-ইস্তিগফার করা। তাওবা ও ইস্তিগফার দ্বারা সর্বপ্রকার গুনাহ মাফ হয়ে যায়। মানুষ সাধারণত তাওবা করে কবীরা গুনাহের ক্ষেত্রে। সগীরা গুনাহের প্রতি বিশেষ লক্ষ থাকে না। তাই তার জন্য অনেক সময় তাওবা করা হয় না। ফলে সেসব গুনাহ থেকে যায়। কিন্তু গুনাহ তো গুনাহই, তা ছোট হোক বা বড়। যেমন আগুন বড় হোক বা ছোট, তা আগুনই। বড় আগুনের মতো ছোট আগুনও জ্বালায়, পোড়ায়। বরং ছোট আগুনকে অবহেলা করলে তা অনেক বড় অগ্নিকাণ্ডের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সুতরাং সগীরা গুনাহ থেকে মুক্তির অন্য কোনও ব্যবস্থাও থাকা দরকার, যাতে তাওবা করা না হলেও সেই ব্যবস্থা দ্বারা তা মাফ হয়ে যায়। দয়াময় আল্লাহ সে ব্যবস্থাও দিয়েছেন।

তা হলো বিভিন্ন প্রকার ইবাদত ও সৎকর্ম। ওযূও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সৎকর্ম। এর দ্বারাও বান্দার গুনাহ ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায়। একেকটি অঙ্গ ধোওয়া হতে থাকে আর গুনাহ থেকে আত্মা পরিষ্কার হতে থাকে। এভাবে যখন ওযূ শেষ হয়ে যায়, তখন সে গুনাহ থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ।

এ হাদীছে চেহারা ধোওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে-

فغسلَ وجهَهُ ، خَرجَت مِن وجهِهِ كلُّ خطيئةٍ نظرَ إليها بعَينيهِ معَ الماءِ - أو معَ آخرِ قطرِ الماءِ (আর যখন তার চেহারা ধোয়, তখন পানির সঙ্গে বা পানির শেষ ফোঁটার সঙ্গে তার চেহারা থেকে ওইসকল গুনাহ বের হয়ে যায়, যা তার দু'চোখ দিয়ে দেখে করেছে)। চেহারা ধোওয়ার সময় পানির সাথে চোখের গুনাহ বের হয়ে যায়। এখানে প্রশ্ন হতে পারে, চেহারায় তো কেবল চোখই নয়; নাক ও মুখও আছে, তাহলে কেবল চোখের গুনাহ মাফ হওয়ার কথা বলা হলো, নাক ও মুখের গুনাহ যে রয়ে গেল? সেসকল গুনাহ মাফ হওয়ার কথা কেন বলা হলো না?

উলামায়ে কেরাম এর দু'টি ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথম ব্যাখ্যা এই যে, চেহারায় চোখই প্রধান অঙ্গ। মানুষের কাছে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে চোখই সবচে' বেশি প্রিয়। তাছাড়া অনেক সময় চোখ দিয়েই বেশি গুনাহ হয়। তো চোখের গুনাহ যখন মাফ হয়ে যায়, তখন বাকি অঙ্গগুলোর গুনাহও যে মাফ হয়ে যায়, তা এমনিই বোঝা যায়। তা আলাদাভাবে বলার দরকার পড়ে না।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো নাকের জন্য নাকে পানি দেওয়া এবং মুখের জন্য কুলি করার আলাদা আমল আছে। তা দ্বারাই নাক ও মুখের গুনাহ দূর হয়ে যায়। তাই চেহারা ধোওয়ার ক্ষেত্রে সে দু'টি অঙ্গের উল্লেখ করার প্রয়োজন ছিল না। পক্ষান্তরে চোখের জন্য স্বতন্ত্র কোনও আমল নেই। তাহলে চোখের গুনাহ কীভাবে মাফ হবে? বলা হয়েছে, চেহারা ধোওয়ার দ্বারা বিশেষভাবে চোখের গুনাহ দূর হয়ে যায়।

হাদীছটিতে চোখ, হাত ও পা সম্পর্কে জানানো হয়েছে যে, ওযূ দ্বারা এসব অঙ্গ দ্বারা কৃত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তার মানে এর প্রত্যেকটি অঙ্গ দ্বারা গুনাহ হয়ে যায়। ইচ্ছাকৃতও করা হয়। এসব অঙ্গ আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত। প্রয়োজন ছিল মনেপ্রাণে এর জন্য শোকর আদায় করা। এর আসল শোকর হলো এগুলোকে বৈধ ও নেককাজে ব্যবহার করা, গুনাহের কাজে ব্যবহার না করা। কিন্তু তা সত্ত্বেও এসব বঙ্গ দ্বারা গুনাহ করে থাকি। মূলনীতি অনুযায়ী নেক আমল দ্বারা মাফ হয় সগীরা গুনাহ, কবীরা গুনাহ নয়। কিন্তু এসব অঙ্গ দ্বারা আমরা বিভিন্ন কবীরা গুনাহও করে থাকি, যা কিনা এসব অঙ্গের কঠিন নাশোকরি। এ নাশোকরি থেকে বাঁচা দরকার। খুব সতর্ক থাকা দরকার যাতে এর দ্বারা কোনও গুনাহ না হয়। কোনও গুনাহ হয়ে গেলে অবিলম্বে তাওবা করা উচিত। কেননা আল্লাহ তা'আলার নি'আমতের দাবি তাঁর শোকর আদায় করা, তা দ্বারা তাঁর নাফরমানী করা নয়। ইরশাদ হয়েছে-

وَاللَّهُ أَخْرَجَكُم مِّن بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ ۙ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

'আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে এমন অবস্থায় বের করেছেন যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের জন্য কান, চোখ ও অন্তঃকরণ সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা শোকর আদায় কর। (সূরা আন নাহ্‌ল, আয়াত ৭৮)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. এ হাদীছ দ্বারা ওযূর ফযীলত জানা গেল যে, এর দ্বারা বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জনের সাথে সাথে আত্মিক পবিত্রতাও অর্জিত হয় অর্থাৎ গুনাহ মাফ হয়ে যায়।

খ. ওযূ একটি সহজ আমল, অথচ এর পুরস্কার কত বড়। সুতরাং আমল যত সহজ ও সাধারণই হোক না কেন, তাকে তুচ্ছ মনে করতে নেই।

গ. নিজ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের শরীয়তসম্মত ব্যবহার করতে হবে, যাতে দ্বারা কোনও গুনাহ না হয়ে যায়। গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করতে হবে এবং এমন কোনও উপায় অবলম্বন করতে হবে, যাতে তা থেকে মাগফিরাত লাভ হয়।

ঘ. হাদীছটি দ্বারা আল্লাহ তা'আলার অসীম দয়া ও রহমতের পরিচয় পাওয়া যায়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান