রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০৩০
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
ওযূর ফযীলত: অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ তিনটি আমল
১০৩০. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন কিছুর কথা বলে দেব না, যা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা পাপসমূহ মিটিয়ে দেন এবং তা দ্বারা (জান্নাতে তোমাদের) মর্যাদা উঁচু করেন? সাহাবীগণ বললেন, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ। তিনি বললেন, কষ্ট-ক্লেশের অবস্থায়ও পূর্ণাঙ্গরূপে ওযূ করা, মসজিদের দিকে বেশি বেশি হাঁটা এবং এক নামাযের পর পরবর্তী নামাযের অপেক্ষায় থাকা। এটাই তোমাদের রিবাত। এটাই তোমাদের রিবাত। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২৫১; জামে তিরমিযী: ৫১; সুনানে নাসাঈ ১৪৩; সহীহ ইবন খুযায়মা। ৫; সহীহ ইবন হিব্বান ১০৩৯; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৪৯৬৯)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1030 - وعنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «ألاَ أَدُّلُكُمْ عَلَى مَا يَمْحُو اللهُ بِهِ الخَطَايَا، وَيَرْفَعُ بِهِ الدَّرَجَاتِ؟» قالوا: بَلَى يَا رسول الله، قَالَ: «إسْبَاغُ الوُضُوءِ عَلَى المَكَارِهِ، وَكَثْرَةُ الخُطَا إِلَى المَسَاجِدِ، وَانْتِظَارُ الصَّلاَةِ بَعْدَ الصَّلاَةِ؛ فَذلِكُمُ الرِّبَاطُ؛ فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ». رواه مسلم. (1)

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) انظر الحديث (131).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছে তিনটি আমলকে সীমান্ত পাহারার সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং এর প্রত্যেকটির ফযীলত বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলা বান্দার পাপ মোচন করেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। বান্দার জীবনের পরম লক্ষ্য তো এ দু'টিই। বান্দার দ্বারা ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নানা পাপ হয়ে যায়। পাপের কারণে বান্দা আল্লাহ তা'আলা থেকে দূরে সরে যায়। অথচ তার প্রয়োজন আল্লাহর নৈকট্য। পাপ সে নৈকট্যের পথে বাধা। তাই পাপমোচন তার একান্ত জরুরি।

বান্দার জীবন-মরণ আল্লাহরই জন্য। তাঁরই সন্তুষ্টি ও তাঁরই নৈকট্য লাভ তার জীবনের শেষ মঞ্জিল। এ মঞ্জিলে পৌঁছা যায় সৎকর্মের দ্বারা। বান্দা একেকটি সৎকর্ম করতে থাকে আর এ মানযিলে মাকসুদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আলোচ্য হাদীছে যে আমলগুলোর কথা বলা হয়েছে, তা দ্বারা এ দু'টিই অর্জিত হয়। একদিকে পাপমোচন হয়, অন্যদিকে মর্যাদা বৃদ্ধি তথা আল্লাহর নৈকট্যের দিকে ক্রমোন্নতি লাভ হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে সাহাবায়ে কেরামের মনোযোগ আকর্ষণ ও উৎসাহ বর্ধনের উদ্দেশ্যে ইরশাদ করেন-

أَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى مَا يَمْحُو اللَّهُ بِهِ الْخَطَايَا وَيَرْفَعُ بِهِ الدَّرَجَاتِ؟ আমি কি তোমাদের এমন কিছুর কথা বলে দেব না, যা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা পাপসমূহ মিটিয়ে দেন এবং তা দ্বারা (জান্নাতে তোমাদের) মর্যাদা উঁচু করেন'?

তাঁরাও এতে খুব উৎসাহ বোধ করেন। সমস্বরে বলে উঠেন- بَلَى يَا رَسُوْلَ اللَّهِ (অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ)!

বস্তুত উৎসাহ বর্ধনের এটাও এক পন্থা যে, কোনও কাজের লাভ ও ফায়দা উল্লেখ করার পর কাজটি কী, সে সম্পর্কে শ্রোতা জানতে চায় কি না তা জিজ্ঞেস করা। এ জিজ্ঞাসা তাদের সচেতন করে তোলে এবং জানার জন্য তাদের মনে উৎসাহ জোগায়।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক। তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতিও ছিল অত্যন্ত হিকমতপূর্ণ। বিভিন্ন হাদীছের ভাষা ও বাকশৈলীর প্রতি লক্ষ করলে সেসব হিকমত উপলব্ধি করা যায়।

যা হোক, সাহাবায়ে কেরাম যখন জানার আগ্রহ প্রকাশ করলেন, তখন এক এক করে তিনটি আমল উল্লেখ করলেন। তার মধ্যে প্রথম হলো- إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عَلَى الْمَكَارِه (কষ্ট-ক্লেশের অবস্থায় পরিপূর্ণরূপে ওযূ করা)।

কষ্ট-ক্লেশ হতে পারে বিভিন্ন কারণে। শীতকালে যদি গরম পানির ব্যবস্থা না হয় তবে ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযূ করা কষ্ট বৈ কি। যদি পানির অভাব থাকে এবং ওযূ করার জন্য পানি কেনার প্রয়োজন হয়, তখন টাকাপয়সা খরচ করে পানি কিনতেও মনের উপর চাপ পড়তে পারে, বিশেষত যদি টাকাপয়সার অভাব থাকে। ধারেকাছে পানি না থাকলে তা খোঁজাখুঁজি করতেও একরকম কষ্ট হয়। এছাড়া কষ্ট হতে পারে স্বাস্থ্যগত কারণেও।

যেভাবেই কষ্ট হোক না কেন, তা সহ্য করে পূর্ণাঙ্গরূপে ওযূ করলে তখন হাদীছে বর্ণিত ফযীলত লাভ হয়। পূর্ণাঙ্গরূপে ওযূ করার মানে যেসব অঙ্গ ধুইতে হয় তার সব জায়গায় পানি পৌঁছানো। এমন তাড়াহুড়া না করা, যাতে কোনও অঙ্গের বিন্দু পরিমাণও শুকনো থেকে যায়। তাছাড়া অন্ততপক্ষে তিনবার ধোয়া, যেসব অঙ্গ খেলাল করতে হয় তা খেলাল করা এবং পূর্ণ মাথা মাসাহ করাও পরিপূর্ণতার অংশ। মোটকথা ফরযের সঙ্গে সঙ্গে সুন্নত, মুস্তাহাব ও আদবসমূহ রক্ষা করে ওযূ করলেই সে ওযূ পরিপূর্ণ হয়।

দ্বিতীয় আমল হচ্ছে- وَكثرةُ الخُطا إلى المسجِدِ (মসজিদের দিকে বেশি বেশি হাঁটা)। বেশি হাঁটার দুই অর্থ হতে পারে।

ক. মসজিদ থেকে বাড়ি দূরে হওয়ার কারণে বেশি পথ হাঁটা।

খ. বার বার মসজিদে যাওয়া-আসার কারণে বেশি বেশি হাঁটা।

হাদীছ দ্বারা উভয় অর্থই বোঝানো উদ্দেশ্য। দ্বিতীয় অর্থ তো অতি স্পষ্ট। পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে গিয়ে জামাতে পড়লে পাঁচ বার হাঁটা হয়। এছাড়া অন্যান্য দীনী জরুরতে মসজিদে যাওয়া-আসা করার দ্বারা যে হাঁটা হয় তাও এর মধ্যে আসবে। আর যদি বাড়ি দূরে হয়, তবে সে দূরত্বের কারণে যে বেশি হাঁটা হয় তা দ্বারাও বেশি হাঁটার ফযীলত অর্জিত হবে। এ কারণেই বনূ সালিমা গোত্র যখন তাদের এলাকা ছেড়ে মসজিদের কাছে চলে আসতে চাইল, তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে এই বলে নিষেধ করলেন-يَا بَنِي سَلِمَةَ دِيَارَكُمْ تُكْتَبْ آثَاركُم دِيَاركُمْ تكْتب آثَاركُم.

'হে বনু সালিমা! তোমরা আপন এলাকায়ই অবস্থান করো। তাতে তোমাদের প্রতি পদক্ষেপে ছাওয়াব লেখা হবে। তোমরা আপন এলাকায়ই অবস্থান করো। তাতে তোমাদের প্রতি পদক্ষেপে ছাওয়াব লেখা হবে। (সহীহ মুসলিম: ৬৬৫; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ২১৫৭; সহীহ ইবন হিব্বান: ২০৪২; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৪৫১; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৪৫৯৭; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৪৯৮১; শু'আবুল ঈমান ২৬২৯; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৪৭০)

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হুকুম সালিমা গোত্র খুশিমনে মেনে নিল। তারা তাদের বাসস্থান পরিবর্তন করল না।

মোটকথা মসজিদের পথে বেশি হাঁটার কাজটি যে কারণেই হোক না কেন, তা অত্যন্ত ফযীলতের কাজ। তাতে গুনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

তৃতীয় আমল হলো- وَانْتِظَارُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الصَّلَاةِ (এক নামাযের পর আরেক নামাযের জন্য অপেক্ষা করা)। অর্থাৎ এক নামায আদায় করার পর পরবর্তী নামাযে কখন শরীক হবে, মনেপ্রাণে সে অপেক্ষায় থাকাটাও একটি ছাওয়াবের কাজ। সে অপেক্ষা মসজিদেও হতে পারে, মসজিদের বাইরেও হতে পারে। মসজিদে অপেক্ষা করার মানে এক নামায আদায়ের পর মসজিদেই থাকা এবং পরবর্তী নামায আদায় না হওয়া পর্যন্ত বের না হওয়া। তা এই বের না হওয়াটা যেহেতু কেবলই নামাযের জন্য, তাই এটাও নামাযরূপে গণ্য হবে এবং এ কারণে সে ছাওয়াব পাবে।

প্রকাশ থাকে যে, এটা একটা নফল আমল। তাই এটা করতে গিয়ে কিছুতেই পরিবারের হক নষ্ট করা যাবে না। পরিবারের খাওয়া-পরার দায়িত্ব যার, সে যদি উপার্জনবিমুখ হয়ে মসজিদে দুই নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে বসে থাকে আর এতে করে পরিবারের লোকজন খাওয়া-পরায় কষ্ট পায়, তবে সে কঠিন গুনাহগার হবে। আখিরাতে এর জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তাই সর্বপ্রকার নফল আমল করার ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে যাতে সে কারণে কারও কোনও হক আদায়ে বিঘ্ন না ঘটে।

মসজিদের বাইরে নামাযের অপেক্ষায় থাকার অর্থ এক নামায আদায় করার পর বাড়িতে বা দোকানে কিংবা কর্মক্ষেত্রে গিয়ে নামাযের কথা ভুলে না যাওয়া। সে যেখানেই থাকুক না কেন, তার মন পড়ে থাকবে পরবর্তী নামাযের দিকে। দুনিয়ার কাজকর্ম তার মন ও চিন্তাচেতনাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলতে পারবে না যে, কখন নামায হয়ে গেছে সে খবরই তার নেই। এরূপ লোকদের প্রশংসায় আল্লাহ তা'আলা বলেন-

رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ ۙ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ

'এমন লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেচাকেনা আল্লাহর স্মরণ, নামায কায়েম ও যাকাত আদায় থেকে গাফেল করতে পারে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টি ওলটপালট হয়ে যাবে। (সূরা নূর, আয়াত ৩৭)

এরূপ লোকদের জন্য মসজিদের বাইরের জীবন কারাবাসের মতো। কখন নামাযের সময় হয়ে যাবে আর সে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নামাযের জন্য ছুটে যাবে, সেজন্য তার মন উতলা হয়ে থাকে। মনের এ অবস্থাকেই 'অপেক্ষা' শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে। এ অপেক্ষা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয়। এর দ্বারা তিনি বান্দার গুনাহ মাফ করেন এবং জান্নাতে তার মর্যাদা উঁচু করেন।

সীমান্ত পাহারা দেওয়ার ফযীলত
এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। এ সম্পর্কে হাদীছটিতে বলা হয়েছে- فذلِكُمُ الرِّباطُ ، فذلِكُمُ الرِّباطُ (এটাই তোমাদের রিবাত। এটাই তোমাদের রিবাত)। الرِّباطُ শব্দের অর্থ বাঁধা। পরিভাষায় রিবাত বলা হয় দেশের সীমান্তে পাহারাদারি করাকে, যাতে শত্রুসৈন্য দেশের মধ্যে ঢুকতে না পারে এবং মুসলমানদের জান-মালের ক্ষতিসাধনের সুযোগ না পায়। রিবাত বা সীমান্ত পাহারা অত্যন্ত ফযীলতের কাজ। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

رِبَاطُ يَوْمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا عَلَيْهَا

'আল্লাহর পথে একদিন পাহারাদারি করা দুনিয়া এবং এর মধ্যে যা-কিছু আছে তা অপেক্ষা উত্তম। (সহীহ বুখারী: ২৮৯২; মুসনাদে আহমাদ: ২২৮৭২; জামে তিরমিযী: ১৬৬৪; তাবারানী: ৬১৩৪; বায়হাকী: ১৭৮৮৭)

অপর এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-

رِبَاطُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ خَيْرٌ مِنْ صِيَامٍ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ، وَإِنْ مَاتَ جَرى عَلَيْهِ عَمَلُهُ الَّذِي كَانَ يَعْمَلُه

'একদিন ও একরাত সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস রোযা রাখা ও রাত জেগে ইবাদত করা অপেক্ষা উত্তম। আর এ অবস্থায় মারা গেলে সে যে আমল করত তার ছাওয়াব জারি থাকবে। (সহীহ মুসলিম: ১৯১৩; মুসনাদে আহমাদ: ২৩৭২৮; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর ৬০৬৪)

রিবাত ও সীমান্ত পাহারার ফযীলত সম্পর্কে আরও বহু হাদীছ আছে। এত বড় ফযীলতপূর্ণ আমলের সঙ্গে হাদীছে বর্ণিত আমল তিনটির তুলনা করা হয়েছে। অথচ সীমান্ত পাহারায় প্রাণের ঝুঁকি রয়েছে এবং বাস্তবেও শত্রুর আক্রমণে অনেক সময়ই সীমান্তরক্ষীকে প্রাণ হারাতে হয়, কিন্তু আলোচ্য আমল তিনটিতে প্রাণের কোনও ঝুঁকি নেই; বরং এ কাজ তিনটি বহাল তবিয়তেই করা যায়। তা সত্ত্বেও এ তুলনার কারণ কী?

সীমান্ত পাহারার সঙ্গে আমল তিনটির তুলনা কী হিসেবে

এর উত্তর এই যে, সীমান্ত পাহারায় যেমন নিজ দেহমনকে আবদ্ধ রাখতে হয়, পাহারাদারির কাজ ছেড়ে অন্য কিছুতে মন দেওয়া যায় না, নিজ অবস্থানস্থল ত্যাগ করে অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ থাকে না, ঠিক তেমনি এ কাজগুলোও পূর্ণ মনোযোগ ও দৈহিক সাধনার দাবি রাখে। দেহমনকে পরিপূর্ণরূপে এ কাজে বেঁধে রাখতে হয়।

এমনিভাবে সীমান্ত পাহারা দ্বারা যেমন শত্রুসৈন্য থেকে দেশের হেফাজত করা হয়, তেমনি এ তিনটি আমল দ্বারা নফসের হামলা থেকে ঈমান ও আমলের হেফাজত করা হয়। মানুষের নফসও বাইরের শত্রুর মতো শত্রুই বটে; বরং তারচে' আরও বড় শত্রু। কেননা বাইরের শত্রু তো মানুষের কেবল জান-মালের ক্ষতি করে আর সে ক্ষতি কেবলই দুনিয়ার ক্ষতি। পক্ষান্তরে নফস হামলা করে মানুষের ঈমান-আমলের উপর। সে হামলা প্রতিরোধ করতে না পারলে মানুষের ঈমান ও আমল বরবাদ হয়ে যায় এবং তার পরকালীন জীবন চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হাদীছে যে তিনটি আমলের কথা বলা হয়েছে, এর দ্বারা নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করা হয়। এ তিনটি আমল যেন এমন কঠিন পাহারাদারি, যা ভেদ করে নফস মানুষের ঈমান ও আমলের ক্ষতি করতে সক্ষম হয় না। তাই একে রিবাত বা সীমান্ত পাহারার সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ এর প্রত্যেকটির ছাওয়াব সীমান্ত পাহারার ছাওয়াবের মতো।

লক্ষণীয়, এ তিনটি কাজের সঙ্গে মসজিদের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। ওযূর সর্বাপেক্ষা বেশি প্রয়োজন পড়ে নামাযের জন্য। নামাযের মধ্যেও ফরয নামাযই আসল। এ নামায মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করা জরুরি। মসজিদে নামায আদায়ের জন্য বারবার আসা-যাওয়া করতে হয়। নামাযের জন্য অপেক্ষা করার কাজটিও মসজিদের সঙ্গেই সম্পৃক্ত। এভাবে তিনওটি আমলের কেন্দ্রবিন্দু হলো মসজিদ। মূলত মুসলিম জীবনেরও কেন্দ্রস্থল আল্লাহর ঘর মসজিদ। যে জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হয় মসজিদ, তাই সত্যিকারের মুসলিম জীবন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. শিক্ষাদানের কাজটি হওয়া উচিত আকর্ষণীয় পন্থায়।

খ. শিক্ষার্থীর ভেতর শিক্ষাগ্রহণের প্রতি আগ্রহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারা শিক্ষকের কৃতিত্বের পরিচায়ক।

গ. প্রত্যেক মুসলিমের আপন গুনাহ মাফ করানোর প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী থাকা উচিত।

ঘ. আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের উচ্চমর্যাদা লাভ মুসলিম বান্দার পরম লক্ষ্যবস্তু।

ঙ. কোনও সৎকর্মের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হলে তাতে সাড়া দিতে বিলম্ব করতে নেই।

চ. যত কষ্ট-ক্লেশই হোক না কেন, আমাদেরকে অবশ্যই ওযূ করতে হবে নিখুঁত ও পরিপূর্ণরূপে।

ছ. কষ্ট-ক্লেশ সত্ত্বেও মসজিদে যাতায়াতে অভ্যস্ত থাকা উচিত। মসজিদে আসা-যাওয়ার কোনও একটি কদমকেও অবহেলা করতে নেই।

জ. আমরা যখন যেখানেই থাকি না কেন, নামাযের প্রতি সজাগ সচেতন থাকতে হবে। এক নামায আদায়ের পর অন্য নামায আদায়ের জন্য উদগ্রীব থাকতে হবে।

ঝ. মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেওয়া অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ আমল।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
রিয়াযুস সালিহীন - হাদীস নং ১০৩০ | মুসলিম বাংলা