রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ
৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
হাদীস নং: ১০৩১
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
ওযূর ফযীলত: পবিত্রতার গুরুত্ব
১০৩১. হযরত আবূ মালিক আল-আশ'আরী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২২৩; জামে তিরমিযী: ৩৫১৭; সুনানে ইবন মাজাহ: ২৮০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৩৭; সুনানে দারিমী: ৬৭৯: তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৩৪২৪; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ১৮৫; শু'আবুল ঈমান ১২; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৪৮)
এটি একটি দীর্ঘ হাদীছের অংশ। হাদীছটি 'সবর' অধ্যায়ে পূর্ণাঙ্গরূপে গত হয়েছে। আলোচ্য অধ্যায়ে হযরত আমর ইবন আবাসা রাযি. বর্ণিত একটি হাদীছও উল্লেখযোগ্য। সে হাদীছটি 'আশা' অধ্যায়ের শেষদিকে গত হয়েছে (হাদীছ নং ৪৩৮)। সেটি অনেকগুলো কল্যাণকর উপদেশমূলক বাক্য সংবলিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সারগর্ভ এক হাদীছ।
এটি একটি দীর্ঘ হাদীছের অংশ। হাদীছটি 'সবর' অধ্যায়ে পূর্ণাঙ্গরূপে গত হয়েছে। আলোচ্য অধ্যায়ে হযরত আমর ইবন আবাসা রাযি. বর্ণিত একটি হাদীছও উল্লেখযোগ্য। সে হাদীছটি 'আশা' অধ্যায়ের শেষদিকে গত হয়েছে (হাদীছ নং ৪৩৮)। সেটি অনেকগুলো কল্যাণকর উপদেশমূলক বাক্য সংবলিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সারগর্ভ এক হাদীছ।
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1031 - وعن أَبي مالك الأشعري - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رسول الله - صلى الله عليه وسلم: «الطُّهُورُ شَطْرُ الإيمَانِ». رواه مسلم. (1)
وَقَدْ سبق بطوله في باب الصبر، وفي البابِ حديث عمرو بن عَبَسَة - رضي الله عنه - السابق (2) في آخر باب الرَّجَاءِ، وَهُوَ حديث عظيم؛ مشتمل عَلَى جمل من الخيرات.
وَقَدْ سبق بطوله في باب الصبر، وفي البابِ حديث عمرو بن عَبَسَة - رضي الله عنه - السابق (2) في آخر باب الرَّجَاءِ، وَهُوَ حديث عظيم؛ مشتمل عَلَى جمل من الخيرات.
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
__________
(1) انظر الحديث (25).
(2) انظر الحديث (438).
হাদীসের ব্যাখ্যা:
الطهور এর ط হরফটি পেশযুক্ত হলে অর্থ হবে পবিত্র করা। এ হিসেবে হাদীছটির অর্থ হবে অপবিত্র শরীর, পোশাক ইত্যাদি পবিত্র করা ঈমানের অর্ধেক। আর যবরযুক্ত হলে অর্থ হবে পবিত্রতা অর্জনের উপকরণ (পানি ও মাটি)। দ্বিতীয় অবস্থায় হাদীছটির অর্থ হবে পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্যে তার উপকরণ ব্যবহার করা ঈমানের অর্ধেক। উভয় অবস্থায় বোঝানো উদ্দেশ্য তাহারাত অর্থাৎ পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক, তাই তাহারাত বা পবিত্রতার প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ রাখা জরুরি।
পবিত্রতা কীভাবে ঈমানের অর্ধেক
প্রশ্ন হচ্ছে, ঈমান ও ইসলামের শাখা-প্রশাখা বহু। তার একটি হলো পবিত্রতা অর্জন। হাজারও শাখা-প্রশাখার মধ্যে মাত্র একটি কীভাবে ঈমানের অর্ধেক হয়? উলামায়ে কেরাম এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যথা-
(এক) তাহারাত ও পবিত্রতা অর্জন ছাড়া ঈমানের আর যত শাখা-প্রশাখা আছে, যেমন নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তিলাওয়াত, দান-খয়রাত ইত্যাদি, তা মানুষের আত্মাকে পবিত্র করে। আর তাহারাতের বিধান পালন দ্বারা পবিত্র হয় মানুষের দেহ। দেহ ও আত্মার সমষ্টিই হলো মানুষ। তাহলে দেখা যাচ্ছে মানুষের অর্ধাংশ পবিত্র হয় তাহারাত দ্বারা আর বাকি অর্ধেক অন্যান্য ইবাদত দ্বারা। এ হিসেবে ঈমান তথা ঈমানের কার্যাবলি দুই ভাগে বিভক্ত হলো। এক ভাগ দ্বারা মানুষের জাহির পবিত্র হয়, অন্যভাগ দ্বারা পবিত্র হয় মানুষের বাতেন। তাই বলা হয়েছে 'তাহারাত ঈমানের অর্ধেক'।
(দুই) এ হাদীছে ঈমান দ্বারা নামায বোঝানো হয়েছে, যেমন আয়াত- وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضِيْعَ إِيمَائِهُمْ (আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের ঈমান নিষ্ফল করে দেবেন।) (সূরা বাকারা, আয়াত ১৪৩)
-এর ঈমান শব্দ দ্বারা নামায বোঝানো উদ্দেশ্য। আয়াতে বলা হয়েছে, কিবলা পরিবর্তনের আগে তোমরা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে যেসব নামায পড়েছ, আল্লাহ তা নিষ্ফল করবেন না। তদ্রূপ এ হাদীছেও ঈমান দ্বারা নামায বোঝানো উদ্দেশ্য। এ হিসেবে 'তাহারাত ঈমানের অর্ধেক'-এর অর্থ দাঁড়ায়, পাক-পবিত্রতা নামাযের অর্ধেক, যেহেতু এছাড়া নামায হয় না।
(তিন) এক হাদীছে আছে-
ما مِن مُسلِمٍ يَتَطَهَّرُ، فيُتِمُّ الطُّهورَ الذي كَتَبَ اللهُ عليه، فيُصَلِّي هذه الصَّلَواتِ الخَمسَ، إلَّا كانَت كَفَّاراتٍ لِما بينَها
'যে-কোনও মুসলিম আল্লাহর বিধান অনুসারে পরিপূর্ণ তাহারাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, তার ওইসকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়, যা এর ওয়াক্তসমূহের মাঝখানে হয়ে যায়। (সহীহ মুসলিম: ২৩১; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ২৪৭০)
দেখা যাচ্ছে গুনাহ মাফ হয় তাহারাত ও নামায- এ দুয়ের সমষ্টি দ্বারা। সুতরাং গুনাহ হতে ক্ষমাপ্রাপ্তির দিক থেকে তাহারাত ঈমানের তথা নামাযের অর্ধেক।
(চার) নামায বেহেশতের চাবি। আবার ওযূ নামাযের চাবি। তাহলে ওযূ ও নামায- এ দুয়ের সমষ্টি দ্বারা জান্নাতের দুয়ার খোলা হয়, যা কিনা ঈমানের লক্ষ্যবস্তু। সে হিসেবে তাহারাত ঈমানের অর্ধেক হলো।
(পাঁচ) পবিত্রতাকে ব্যাপক অর্থেও ধরা যেতে পারে। তার মানে জাহিরী ও বাতেনী উভয় প্রকার পবিত্রতা। জাহিরী পবিত্রতা অর্জিত হয় ওযূ, গোসল ও তায়াম্মুম দ্বারা, আর বাতেনী তথা আত্মিক পবিত্রতা অর্জিত হয় শিরক ও পাপাচার পরিহার দ্বারা। এই উভয়বিধ পবিত্রতা দ্বারা মানুষের পূর্ণাঙ্গ পরিশুদ্ধি লাভ হয়। বাকি থাকল শোভা ও সৌন্দর্যবিধানের ব্যাপার। তা সম্পন্ন হয় নামায, রোযা, যিকির, তিলাওয়াত ইত্যাদি ইবাদত-বন্দেগী দ্বারা। এভাবে মানবজীবনে ঈমানের পরিপূর্ণতা সাধিত হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।
(ছয়) আবার এমনও বলা যায়, মানুষের করণীয় কাজ দু'প্রকার। একটা অর্জনমূলক, আরেকটা বর্জনমূলক। এ দুয়ের সমন্বিত রূপই ঈমান। আল্লাহ তা'আলা যা-কিছু করার আদেশ করেছেন সেগুলো অর্জনমূলক কাজ। অর্জনমূলক কাজ দ্বারা মানুষের দেহমন অলংকৃত হয়। পরিভাষায় একে তাহলিয়া বলে (অর্থাৎ অলংকরণ ও সুসজ্জিতকরণ করা)। আর আল্লাহ তা'আলা যা-কিছু করতে নিষেধ করেছেন সেগুলো বর্জনমূলক কাজ। সেই বর্জনমূলক কাজসমূহ দ্বারা মানুষের শরীর ও মন পবিত্র হয়। পরিভাষায় একে তাখলিয়া বলে (অর্থাৎ পরিশোধন ও বিশুদ্ধীকরণ করা)।
আলোচ্য হাদীছে যে তাহারাতকে ঈমানের অর্ধেক বলা হয়েছে, তা দ্বারা কেবল ওযূ-গোসলের মাধ্যমে অর্জিত তাহারাত বোঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং বাহ্যিক নাপাকি ও অভ্যন্তরীণ নাপাকি তথা নিষিদ্ধ কাজকর্মে লিপ্ত হওয়ার গুনাহ উভয় থেকে পবিত্রতা অর্জন বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আপনি যেমন ওযূ-গোসল দ্বারা বাহ্যিক নাপাকি থেকে পবিত্র হবেন, তেমনি তাওবা-ইস্তিগফার দ্বারা গুনাহের পঙ্কিলতা থেকেও পবিত্র হবেন এবং সবরকম গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবেন। এটাই সত্যিকারের তাহারাত। এই তাহারাত দ্বারা তাখলিয়ার কাজ হয় বিধায় একে ঈমানের অর্ধেক বলা হয়েছে।
(সাত) তাহারাত দ্বারা ইখলাসও বোঝানো যেতে পারে। অর্থাৎ ঈমানের এক হলো মৌখিক স্বীকৃতি তথা কালেমা পড়ার দ্বারা নিজেকে মু'মিন ও মুসলিমরূপে প্রকাশ করা। এর মাধ্যমে মানুষের কাছে একজন ব্যক্তি মু'মিনরূপে বিবেচিত হয়, তাতে তার অন্তরে বিশ্বাস থাকুক বা নাই থাকুক। কিন্তু আল্লাহর কাছে মু'মিন সাব্যস্ত হওয়ার জন্যে ইখলাস ও মনের বিশ্বাসও জরুরি। অন্যথায় সে আখিরাতে মুক্তি পাবে না। তাহলে পরিপূর্ণ ঈমান অর্থাৎ যেই ঈমান দ্বারা আখিরাতে মুক্তিলাভ হবে, তার অর্ধেক হচ্ছে ইখলাস, যাকে 'তাহারাত' শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। তাকে তাহারাত শব্দে ব্যক্ত করার উদ্দেশ্য এ কথা বোঝানো যে, তার কালেমা পাঠ মুখের কথামাত্র নয়; বরং এটা তার প্রকৃত ঈমান ও মনের বিশ্বাস, যা লোকদেখানোর মনোভাব ও মুনাফিকীর আবিলতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
(আট) দ্রুত শব্দটি যেমন 'অর্ধেক' অর্থে ব্যবহৃত হয়, তেমনি এর দ্বারা কোনও বস্তুর যে-কোনও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা অঙ্গকেও বোঝানো হয়ে থাকে। আলোচ্য হাদীছে শব্দটি দ্বিতীয় অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে। সে হিসেবে অর্থ হবে, পাক-পবিত্রতা ঈমানের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
প্রকৃতপক্ষে এসব ব্যাখ্যা পরস্পরবিরোধী নয়। একটির সঙ্গে অন্যটির কোনও দ্বন্দ্ব নেই। মূলত হাদীছটির শব্দাবলি সংক্ষিপ্ত হলেও এর ভাব ও মর্ম অতি ব্যাপক। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাওয়ামি'উল কালিম (ভাষা সংক্ষেপ কিন্তু ভাব ব্যাপক, এমন বাক্য) ব্যবহারের ক্ষমতা রাখতেন। এ বাক্যটি সেরকম। উপরে যা-কিছু ব্যাখ্যা করা হলো, সবই এ বাক্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. পাক-পবিত্রতা ঈমানের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
খ. আমাদেরকে অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পাক-পবিত্রতার প্রতি লক্ষ রাখতে হবে।
গ. ওযূ-গোসল দ্বারা যেমন বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জনে যত্নবান হতে হবে, তেমনি তাওবা-ইস্তিগফার করা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করার দ্বারা আত্মিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জনেও সচেষ্ট থাকতে হবে।
ঘ. ঈমানই আমাদের শ্রেষ্ঠতম সম্পদ। তাই সর্বদা সর্বাবস্থায় নিজ ঈমানের হেফাজত ও পূর্ণতাবিধানই হতে হবে আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
ওযূ করার সময় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে গুনাহ ঝরে যাওয়া
ইমাম নববী রহ. হযরত আমর ইবন আবাসা রাযি. বর্ণিত যে হাদীছটির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যা 'আশা' অধ্যায়ে ৪৩৮ ক্রমিক নম্বরে গত হয়েছে, সে হাদীছটি বেশ দীর্ঘ। হাদীছটির যে অংশ আলোচ্য পরিচ্ছেদের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, তা এখানে উল্লেখ করা যাচ্ছে।
فَقلت يَا نَبِيَّ اللَّهِ فَالْوُضُوءُ حَدِّثْنِي عَنْهُ قَالَ: «مَا مِنْكُم رجل يقرب وضوءه فيتمضمض ويستنشق فينتثر إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا وَجْهِهِ وَفِيهِ وَخَيَاشِيمِهِ ثُمَّ إِذَا غَسَلَ وَجْهَهُ كَمَا أَمَرَهُ اللَّهُ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا وَجْهِهِ مِنْ أَطْرَافِ لِحْيَتِهِ مَعَ الْمَاءِ ثُمَّ يَغْسِلُ يَدَيْهِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا يَدَيْهِ مِنْ أَنَامِلِهِ مَعَ الْمَاءِ ثُمَّ يَمْسَحُ رَأْسَهُ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا رَأْسِهِ مِنْ أَطْرَافِ شَعْرِهِ مَعَ الْمَاءِ ثُمَّ يَغْسِلُ قَدَمَيْهِ إِلَى الْكَعْبَيْنِ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا رِجْلَيِهِ مِنْ أَنَامِلِهِ مَعَ الْمَاءِ فَإِنْ هُوَ قَامَ فَصَلَّى فَحَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ وَمَجَّدَهُ بِالَّذِي هُوَ لَهُ أَهْلٌ وَفَرَّغَ قَلْبَهُ لِلَّهِ إِلَّا انْصَرَفَ مِنْ خَطِيئَتِهِ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ وَلَدَتْهُ أُمُّه
'আমর ইবন আবাসা রাযি. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ওযূ সম্পর্কে চেহারা, মুখ ও নাকের বাঁশি দিয়ে গুনাহসমূহ ঝরে যায়। তারপর যখন সে তার আমাকে কিছু বলুন। তিনি বললেন, তোমাদের যে-কেউ ওযূর পানি কাছে নেয়, তারপর কুলি করে ও নাকে পানি দেয় এবং নাকে পানি টেনে নিয়ে ঝেড়ে ফেলে, তার চেহারা ধোয়, যেমনটা আল্লাহ তা'আলা তাকে আদেশ করেছেন, তখন দাড়ির সকল কিনারা থেকে তার চেহারার গুনাহসমূহ পানির সঙ্গে ঝরে যায়। তারপর সে যখন কনুই পর্যন্ত দুই হাত ধোয়, তখন আঙুলসমূহ থেকে দু'হাতের গুনাহসমূহ পানির সঙ্গে ঝরে যায়। তারপর যখন তার মাথা মাসাহ করে, তখন চুলের আগা থেকে পানির সঙ্গে মাথার গুনাহসমূহ ঝরে যায়। তারপর যখন টাখনু পর্যন্ত পা ধোয়, তখন পায়ের আঙুলসমূহ থেকে পানির সঙ্গে পায়ের গুনাহসমূহ ঝরে যায়। তারপর সে যদি দাঁড়িয়ে নামাযে রত হয় এবং আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করে, তাঁর গুণাবলি বর্ণনা করে এবং তাঁর যথোপযুক্ত মহিমা ঘোষণা করে আর একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্য তার অন্তর খালি করে দেয়, তবে (সে নামায শেষে যখন ঘরে ফেরে, তখন) তার মা যেদিন তাকে ভূমিষ্ঠ করেছে, সেদিনের মতো গুনাহমুক্ত হয়ে ফেরে।' (সহীহ মুসলিম: ৮:৩২: বায়হাকী, আস্ সুনানুল কুবরা: ৪৩৮৫)
আমল সংক্ষিপ্ত, কেবল সুচারুরূপে ওযূ করা ও নামায পড়া, কিন্তু ছাওয়াব ও কল্যাণ বিপুল। একদম অভাবনীয়। কেউ অবাক হয়ে ভাবতে পারে, এত অল্প আমলে এত বেশি লাভ! এমনকি কারও মনে খটকাও দেখা দিতে পারে। সে খটকার নিরসন হাদীছটির বর্ণনার মধ্যেই রয়েছে। হযরত আমর ইবন আবাসা রাযি, যখন হাদীছটি বর্ণনা করেন, তখন উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু উমামা রাযি.-ও ছিলেন। তিনি হযরত আমর রাযি.-কে প্রশ্ন করেই বসলেন-
يَا عَمْرَو بْنَ عَبَسَةَ انْظُرْ مَا تَقُولُ فِي مَقَامٍ وَاحِدٍ يُعْطَى هَذَا الرَّجُل؟ 'হে আমর ইবন আবাসা! তুমি কী বলছ চিন্তা করে দেখো। একই স্থানে ওই ব্যক্তিকে এতকিছু দেওয়া হবে?'
এর উত্তরে হযরত আমর ইবন আবাসা রাযি. বললেন-
يَا أَبَا أُمَامَةَ لَقَدْ كَبِرَتْ سِنِّي وَرَقَّ عَظْمِي وَاقْتَرَبَ أَجَلِي وَمَا بِي حَاجَةٌ أَنْ أَكْذِبَ عَلَى اللَّهِ وَلاَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ لَوْ لَمْ أَسْمَعْهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِلاَّ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا - حَتَّى عَدَّ سَبْعَ مَرَّاتٍ - مَا حَدَّثْتُ بِهِ أَبَدًا وَلَكِنِّي سَمِعْتُهُ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ .
'আমর রাযি. বললেন, হে আবূ উমামা। আমার বয়স বুড়িয়ে গেছে। আমার হাড় জরাজীর্ণ হয়ে গেছে এবং আমার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে। আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যা আরোপ করার কোনও প্রয়োজন আমার নেই। আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ হাদীছটি মাত্র একবার বা দু'বার কিংবা তিনবার শুনতাম, এভাবে তিনি সাত পর্যন্ত গুনে বললেন, তবে আমি এটি কখনও বর্ণনা করতাম না। বস্তুত আমি এটি তাঁর কাছ থেকে এরচে'ও বেশিবার শুনেছি।'
অর্থাৎ এ হাদীছটির বিষয়বস্তুতে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। কেননা এ বক্তব্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। আর এটা যে তাঁরই বক্তব্য, তাতেও কোনও সন্দেহ নেই। কেননা আমি তাঁর মুখে এ হাদীছ সাত বারেরও বেশি শুনেছি। যেখানে বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার জন্য একবার শোনাটাই যথেষ্ট ছিল, সেখানে সাত বা তারও বেশি বার শুনলে সন্দেহের অবকাশ থাকে কোথায়? সাব্যস্ত হলো, এ বক্তব্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই।
বাকি থাকল এর বিষয়বস্তু নিয়ে কথা। অল্প আমলে এত বিপুল ছাওয়াব কীভাবে হয়? বাস্তবিকপক্ষে এ প্রশ্নেরও অবকাশ নেই। কেননা বান্দাকে আল্লাহ তা'আলার ছাওয়াব ও পুরস্কারদানের বিষয়টা ইনসাফের উপর নয়; বরং রহমত ও অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। তিনি একটি কাজের ছাওয়াব দেন দশ গুণ থেকে সাতশ' গুণ পর্যন্ত বেশি; বরং ক্ষেত্রবিশেষে অপরিমিত। আমাদের যা অবস্থা, তাতে একটি আমলের বিপরীতে একটি নেকী পাওয়াই তো কঠিন। কোথায় আমাদের ইখলাস? কেমনই বা আমাদের আমলের সুষ্ঠুতা ও সৌন্দর্য? তা সত্ত্বেও যখন প্রত্যেক আমলের বিপরীতে এত বেশি ছাওয়াব আল্লাহ তা'আলা দিয়ে থাকেন, তখন অশেষ দয়ালু-দয়াময় ও মহা প্রাচুর্যময় সেই সত্তা ওযূ ও নামাযের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের বিপরীতে এমন অকল্পনীয় পুরস্কার দিলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং এর জন্য দরকার তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ কৃতজ্ঞ থেকে এসব ইবাদত-বন্দেগী অধিকতর গুরুত্ব ও উৎসাহের সঙ্গে পালন করে যাওয়া। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. ওযূ দ্বারা বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জনের পাশাপাশি পাপের মলিনতা থেকেও পবিত্রতা লাভ হয়।
খ. আমাদেরকে ওযূ করতে হবে সুন্দর ও সুচারুরূপে।
গ. ওযূ করার সময় হাদীছে বর্ণিত ছাওয়াব ও পুরস্কার অর্জনের নিয়তও রাখা চাই।
ঘ. ওযূ করার পর সম্ভব হলে দু'রাকাত নফল নামায পড়ে নেওয়া উত্তম।
ঙ. নামায যাতে খুশু-খুযু ও ধ্যানমগ্নতার সঙ্গে আদায় হয়, সে চেষ্টা অব্যাহত রাখা চাই।
চ. আল্লাহ তা'আলার তাসবীহ ও হাম্দ-ছানা উত্তম যিকির। এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভ হয়, গুনাহ মাফ হয়।
ছ. আল্লাহ তা'আলার অপার দয়া ও অনুগ্রহের প্রতি লক্ষ করে সর্বতোভাবে তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করা উচিত।
পবিত্রতা কীভাবে ঈমানের অর্ধেক
প্রশ্ন হচ্ছে, ঈমান ও ইসলামের শাখা-প্রশাখা বহু। তার একটি হলো পবিত্রতা অর্জন। হাজারও শাখা-প্রশাখার মধ্যে মাত্র একটি কীভাবে ঈমানের অর্ধেক হয়? উলামায়ে কেরাম এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যথা-
(এক) তাহারাত ও পবিত্রতা অর্জন ছাড়া ঈমানের আর যত শাখা-প্রশাখা আছে, যেমন নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তিলাওয়াত, দান-খয়রাত ইত্যাদি, তা মানুষের আত্মাকে পবিত্র করে। আর তাহারাতের বিধান পালন দ্বারা পবিত্র হয় মানুষের দেহ। দেহ ও আত্মার সমষ্টিই হলো মানুষ। তাহলে দেখা যাচ্ছে মানুষের অর্ধাংশ পবিত্র হয় তাহারাত দ্বারা আর বাকি অর্ধেক অন্যান্য ইবাদত দ্বারা। এ হিসেবে ঈমান তথা ঈমানের কার্যাবলি দুই ভাগে বিভক্ত হলো। এক ভাগ দ্বারা মানুষের জাহির পবিত্র হয়, অন্যভাগ দ্বারা পবিত্র হয় মানুষের বাতেন। তাই বলা হয়েছে 'তাহারাত ঈমানের অর্ধেক'।
(দুই) এ হাদীছে ঈমান দ্বারা নামায বোঝানো হয়েছে, যেমন আয়াত- وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضِيْعَ إِيمَائِهُمْ (আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের ঈমান নিষ্ফল করে দেবেন।) (সূরা বাকারা, আয়াত ১৪৩)
-এর ঈমান শব্দ দ্বারা নামায বোঝানো উদ্দেশ্য। আয়াতে বলা হয়েছে, কিবলা পরিবর্তনের আগে তোমরা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে যেসব নামায পড়েছ, আল্লাহ তা নিষ্ফল করবেন না। তদ্রূপ এ হাদীছেও ঈমান দ্বারা নামায বোঝানো উদ্দেশ্য। এ হিসেবে 'তাহারাত ঈমানের অর্ধেক'-এর অর্থ দাঁড়ায়, পাক-পবিত্রতা নামাযের অর্ধেক, যেহেতু এছাড়া নামায হয় না।
(তিন) এক হাদীছে আছে-
ما مِن مُسلِمٍ يَتَطَهَّرُ، فيُتِمُّ الطُّهورَ الذي كَتَبَ اللهُ عليه، فيُصَلِّي هذه الصَّلَواتِ الخَمسَ، إلَّا كانَت كَفَّاراتٍ لِما بينَها
'যে-কোনও মুসলিম আল্লাহর বিধান অনুসারে পরিপূর্ণ তাহারাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, তার ওইসকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়, যা এর ওয়াক্তসমূহের মাঝখানে হয়ে যায়। (সহীহ মুসলিম: ২৩১; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ২৪৭০)
দেখা যাচ্ছে গুনাহ মাফ হয় তাহারাত ও নামায- এ দুয়ের সমষ্টি দ্বারা। সুতরাং গুনাহ হতে ক্ষমাপ্রাপ্তির দিক থেকে তাহারাত ঈমানের তথা নামাযের অর্ধেক।
(চার) নামায বেহেশতের চাবি। আবার ওযূ নামাযের চাবি। তাহলে ওযূ ও নামায- এ দুয়ের সমষ্টি দ্বারা জান্নাতের দুয়ার খোলা হয়, যা কিনা ঈমানের লক্ষ্যবস্তু। সে হিসেবে তাহারাত ঈমানের অর্ধেক হলো।
(পাঁচ) পবিত্রতাকে ব্যাপক অর্থেও ধরা যেতে পারে। তার মানে জাহিরী ও বাতেনী উভয় প্রকার পবিত্রতা। জাহিরী পবিত্রতা অর্জিত হয় ওযূ, গোসল ও তায়াম্মুম দ্বারা, আর বাতেনী তথা আত্মিক পবিত্রতা অর্জিত হয় শিরক ও পাপাচার পরিহার দ্বারা। এই উভয়বিধ পবিত্রতা দ্বারা মানুষের পূর্ণাঙ্গ পরিশুদ্ধি লাভ হয়। বাকি থাকল শোভা ও সৌন্দর্যবিধানের ব্যাপার। তা সম্পন্ন হয় নামায, রোযা, যিকির, তিলাওয়াত ইত্যাদি ইবাদত-বন্দেগী দ্বারা। এভাবে মানবজীবনে ঈমানের পরিপূর্ণতা সাধিত হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।
(ছয়) আবার এমনও বলা যায়, মানুষের করণীয় কাজ দু'প্রকার। একটা অর্জনমূলক, আরেকটা বর্জনমূলক। এ দুয়ের সমন্বিত রূপই ঈমান। আল্লাহ তা'আলা যা-কিছু করার আদেশ করেছেন সেগুলো অর্জনমূলক কাজ। অর্জনমূলক কাজ দ্বারা মানুষের দেহমন অলংকৃত হয়। পরিভাষায় একে তাহলিয়া বলে (অর্থাৎ অলংকরণ ও সুসজ্জিতকরণ করা)। আর আল্লাহ তা'আলা যা-কিছু করতে নিষেধ করেছেন সেগুলো বর্জনমূলক কাজ। সেই বর্জনমূলক কাজসমূহ দ্বারা মানুষের শরীর ও মন পবিত্র হয়। পরিভাষায় একে তাখলিয়া বলে (অর্থাৎ পরিশোধন ও বিশুদ্ধীকরণ করা)।
আলোচ্য হাদীছে যে তাহারাতকে ঈমানের অর্ধেক বলা হয়েছে, তা দ্বারা কেবল ওযূ-গোসলের মাধ্যমে অর্জিত তাহারাত বোঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং বাহ্যিক নাপাকি ও অভ্যন্তরীণ নাপাকি তথা নিষিদ্ধ কাজকর্মে লিপ্ত হওয়ার গুনাহ উভয় থেকে পবিত্রতা অর্জন বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আপনি যেমন ওযূ-গোসল দ্বারা বাহ্যিক নাপাকি থেকে পবিত্র হবেন, তেমনি তাওবা-ইস্তিগফার দ্বারা গুনাহের পঙ্কিলতা থেকেও পবিত্র হবেন এবং সবরকম গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবেন। এটাই সত্যিকারের তাহারাত। এই তাহারাত দ্বারা তাখলিয়ার কাজ হয় বিধায় একে ঈমানের অর্ধেক বলা হয়েছে।
(সাত) তাহারাত দ্বারা ইখলাসও বোঝানো যেতে পারে। অর্থাৎ ঈমানের এক হলো মৌখিক স্বীকৃতি তথা কালেমা পড়ার দ্বারা নিজেকে মু'মিন ও মুসলিমরূপে প্রকাশ করা। এর মাধ্যমে মানুষের কাছে একজন ব্যক্তি মু'মিনরূপে বিবেচিত হয়, তাতে তার অন্তরে বিশ্বাস থাকুক বা নাই থাকুক। কিন্তু আল্লাহর কাছে মু'মিন সাব্যস্ত হওয়ার জন্যে ইখলাস ও মনের বিশ্বাসও জরুরি। অন্যথায় সে আখিরাতে মুক্তি পাবে না। তাহলে পরিপূর্ণ ঈমান অর্থাৎ যেই ঈমান দ্বারা আখিরাতে মুক্তিলাভ হবে, তার অর্ধেক হচ্ছে ইখলাস, যাকে 'তাহারাত' শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। তাকে তাহারাত শব্দে ব্যক্ত করার উদ্দেশ্য এ কথা বোঝানো যে, তার কালেমা পাঠ মুখের কথামাত্র নয়; বরং এটা তার প্রকৃত ঈমান ও মনের বিশ্বাস, যা লোকদেখানোর মনোভাব ও মুনাফিকীর আবিলতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
(আট) দ্রুত শব্দটি যেমন 'অর্ধেক' অর্থে ব্যবহৃত হয়, তেমনি এর দ্বারা কোনও বস্তুর যে-কোনও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা অঙ্গকেও বোঝানো হয়ে থাকে। আলোচ্য হাদীছে শব্দটি দ্বিতীয় অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে। সে হিসেবে অর্থ হবে, পাক-পবিত্রতা ঈমানের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
প্রকৃতপক্ষে এসব ব্যাখ্যা পরস্পরবিরোধী নয়। একটির সঙ্গে অন্যটির কোনও দ্বন্দ্ব নেই। মূলত হাদীছটির শব্দাবলি সংক্ষিপ্ত হলেও এর ভাব ও মর্ম অতি ব্যাপক। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাওয়ামি'উল কালিম (ভাষা সংক্ষেপ কিন্তু ভাব ব্যাপক, এমন বাক্য) ব্যবহারের ক্ষমতা রাখতেন। এ বাক্যটি সেরকম। উপরে যা-কিছু ব্যাখ্যা করা হলো, সবই এ বাক্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. পাক-পবিত্রতা ঈমানের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
খ. আমাদেরকে অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পাক-পবিত্রতার প্রতি লক্ষ রাখতে হবে।
গ. ওযূ-গোসল দ্বারা যেমন বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জনে যত্নবান হতে হবে, তেমনি তাওবা-ইস্তিগফার করা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করার দ্বারা আত্মিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জনেও সচেষ্ট থাকতে হবে।
ঘ. ঈমানই আমাদের শ্রেষ্ঠতম সম্পদ। তাই সর্বদা সর্বাবস্থায় নিজ ঈমানের হেফাজত ও পূর্ণতাবিধানই হতে হবে আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
ওযূ করার সময় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে গুনাহ ঝরে যাওয়া
ইমাম নববী রহ. হযরত আমর ইবন আবাসা রাযি. বর্ণিত যে হাদীছটির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যা 'আশা' অধ্যায়ে ৪৩৮ ক্রমিক নম্বরে গত হয়েছে, সে হাদীছটি বেশ দীর্ঘ। হাদীছটির যে অংশ আলোচ্য পরিচ্ছেদের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, তা এখানে উল্লেখ করা যাচ্ছে।
فَقلت يَا نَبِيَّ اللَّهِ فَالْوُضُوءُ حَدِّثْنِي عَنْهُ قَالَ: «مَا مِنْكُم رجل يقرب وضوءه فيتمضمض ويستنشق فينتثر إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا وَجْهِهِ وَفِيهِ وَخَيَاشِيمِهِ ثُمَّ إِذَا غَسَلَ وَجْهَهُ كَمَا أَمَرَهُ اللَّهُ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا وَجْهِهِ مِنْ أَطْرَافِ لِحْيَتِهِ مَعَ الْمَاءِ ثُمَّ يَغْسِلُ يَدَيْهِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا يَدَيْهِ مِنْ أَنَامِلِهِ مَعَ الْمَاءِ ثُمَّ يَمْسَحُ رَأْسَهُ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا رَأْسِهِ مِنْ أَطْرَافِ شَعْرِهِ مَعَ الْمَاءِ ثُمَّ يَغْسِلُ قَدَمَيْهِ إِلَى الْكَعْبَيْنِ إِلَّا خَرَّتْ خَطَايَا رِجْلَيِهِ مِنْ أَنَامِلِهِ مَعَ الْمَاءِ فَإِنْ هُوَ قَامَ فَصَلَّى فَحَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ وَمَجَّدَهُ بِالَّذِي هُوَ لَهُ أَهْلٌ وَفَرَّغَ قَلْبَهُ لِلَّهِ إِلَّا انْصَرَفَ مِنْ خَطِيئَتِهِ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ وَلَدَتْهُ أُمُّه
'আমর ইবন আবাসা রাযি. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ওযূ সম্পর্কে চেহারা, মুখ ও নাকের বাঁশি দিয়ে গুনাহসমূহ ঝরে যায়। তারপর যখন সে তার আমাকে কিছু বলুন। তিনি বললেন, তোমাদের যে-কেউ ওযূর পানি কাছে নেয়, তারপর কুলি করে ও নাকে পানি দেয় এবং নাকে পানি টেনে নিয়ে ঝেড়ে ফেলে, তার চেহারা ধোয়, যেমনটা আল্লাহ তা'আলা তাকে আদেশ করেছেন, তখন দাড়ির সকল কিনারা থেকে তার চেহারার গুনাহসমূহ পানির সঙ্গে ঝরে যায়। তারপর সে যখন কনুই পর্যন্ত দুই হাত ধোয়, তখন আঙুলসমূহ থেকে দু'হাতের গুনাহসমূহ পানির সঙ্গে ঝরে যায়। তারপর যখন তার মাথা মাসাহ করে, তখন চুলের আগা থেকে পানির সঙ্গে মাথার গুনাহসমূহ ঝরে যায়। তারপর যখন টাখনু পর্যন্ত পা ধোয়, তখন পায়ের আঙুলসমূহ থেকে পানির সঙ্গে পায়ের গুনাহসমূহ ঝরে যায়। তারপর সে যদি দাঁড়িয়ে নামাযে রত হয় এবং আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করে, তাঁর গুণাবলি বর্ণনা করে এবং তাঁর যথোপযুক্ত মহিমা ঘোষণা করে আর একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্য তার অন্তর খালি করে দেয়, তবে (সে নামায শেষে যখন ঘরে ফেরে, তখন) তার মা যেদিন তাকে ভূমিষ্ঠ করেছে, সেদিনের মতো গুনাহমুক্ত হয়ে ফেরে।' (সহীহ মুসলিম: ৮:৩২: বায়হাকী, আস্ সুনানুল কুবরা: ৪৩৮৫)
আমল সংক্ষিপ্ত, কেবল সুচারুরূপে ওযূ করা ও নামায পড়া, কিন্তু ছাওয়াব ও কল্যাণ বিপুল। একদম অভাবনীয়। কেউ অবাক হয়ে ভাবতে পারে, এত অল্প আমলে এত বেশি লাভ! এমনকি কারও মনে খটকাও দেখা দিতে পারে। সে খটকার নিরসন হাদীছটির বর্ণনার মধ্যেই রয়েছে। হযরত আমর ইবন আবাসা রাযি, যখন হাদীছটি বর্ণনা করেন, তখন উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু উমামা রাযি.-ও ছিলেন। তিনি হযরত আমর রাযি.-কে প্রশ্ন করেই বসলেন-
يَا عَمْرَو بْنَ عَبَسَةَ انْظُرْ مَا تَقُولُ فِي مَقَامٍ وَاحِدٍ يُعْطَى هَذَا الرَّجُل؟ 'হে আমর ইবন আবাসা! তুমি কী বলছ চিন্তা করে দেখো। একই স্থানে ওই ব্যক্তিকে এতকিছু দেওয়া হবে?'
এর উত্তরে হযরত আমর ইবন আবাসা রাযি. বললেন-
يَا أَبَا أُمَامَةَ لَقَدْ كَبِرَتْ سِنِّي وَرَقَّ عَظْمِي وَاقْتَرَبَ أَجَلِي وَمَا بِي حَاجَةٌ أَنْ أَكْذِبَ عَلَى اللَّهِ وَلاَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ لَوْ لَمْ أَسْمَعْهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِلاَّ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا - حَتَّى عَدَّ سَبْعَ مَرَّاتٍ - مَا حَدَّثْتُ بِهِ أَبَدًا وَلَكِنِّي سَمِعْتُهُ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ .
'আমর রাযি. বললেন, হে আবূ উমামা। আমার বয়স বুড়িয়ে গেছে। আমার হাড় জরাজীর্ণ হয়ে গেছে এবং আমার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে। আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যা আরোপ করার কোনও প্রয়োজন আমার নেই। আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ হাদীছটি মাত্র একবার বা দু'বার কিংবা তিনবার শুনতাম, এভাবে তিনি সাত পর্যন্ত গুনে বললেন, তবে আমি এটি কখনও বর্ণনা করতাম না। বস্তুত আমি এটি তাঁর কাছ থেকে এরচে'ও বেশিবার শুনেছি।'
অর্থাৎ এ হাদীছটির বিষয়বস্তুতে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। কেননা এ বক্তব্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। আর এটা যে তাঁরই বক্তব্য, তাতেও কোনও সন্দেহ নেই। কেননা আমি তাঁর মুখে এ হাদীছ সাত বারেরও বেশি শুনেছি। যেখানে বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার জন্য একবার শোনাটাই যথেষ্ট ছিল, সেখানে সাত বা তারও বেশি বার শুনলে সন্দেহের অবকাশ থাকে কোথায়? সাব্যস্ত হলো, এ বক্তব্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই।
বাকি থাকল এর বিষয়বস্তু নিয়ে কথা। অল্প আমলে এত বিপুল ছাওয়াব কীভাবে হয়? বাস্তবিকপক্ষে এ প্রশ্নেরও অবকাশ নেই। কেননা বান্দাকে আল্লাহ তা'আলার ছাওয়াব ও পুরস্কারদানের বিষয়টা ইনসাফের উপর নয়; বরং রহমত ও অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। তিনি একটি কাজের ছাওয়াব দেন দশ গুণ থেকে সাতশ' গুণ পর্যন্ত বেশি; বরং ক্ষেত্রবিশেষে অপরিমিত। আমাদের যা অবস্থা, তাতে একটি আমলের বিপরীতে একটি নেকী পাওয়াই তো কঠিন। কোথায় আমাদের ইখলাস? কেমনই বা আমাদের আমলের সুষ্ঠুতা ও সৌন্দর্য? তা সত্ত্বেও যখন প্রত্যেক আমলের বিপরীতে এত বেশি ছাওয়াব আল্লাহ তা'আলা দিয়ে থাকেন, তখন অশেষ দয়ালু-দয়াময় ও মহা প্রাচুর্যময় সেই সত্তা ওযূ ও নামাযের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের বিপরীতে এমন অকল্পনীয় পুরস্কার দিলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং এর জন্য দরকার তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ কৃতজ্ঞ থেকে এসব ইবাদত-বন্দেগী অধিকতর গুরুত্ব ও উৎসাহের সঙ্গে পালন করে যাওয়া। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. ওযূ দ্বারা বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জনের পাশাপাশি পাপের মলিনতা থেকেও পবিত্রতা লাভ হয়।
খ. আমাদেরকে ওযূ করতে হবে সুন্দর ও সুচারুরূপে।
গ. ওযূ করার সময় হাদীছে বর্ণিত ছাওয়াব ও পুরস্কার অর্জনের নিয়তও রাখা চাই।
ঘ. ওযূ করার পর সম্ভব হলে দু'রাকাত নফল নামায পড়ে নেওয়া উত্তম।
ঙ. নামায যাতে খুশু-খুযু ও ধ্যানমগ্নতার সঙ্গে আদায় হয়, সে চেষ্টা অব্যাহত রাখা চাই।
চ. আল্লাহ তা'আলার তাসবীহ ও হাম্দ-ছানা উত্তম যিকির। এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভ হয়, গুনাহ মাফ হয়।
ছ. আল্লাহ তা'আলার অপার দয়া ও অনুগ্রহের প্রতি লক্ষ করে সর্বতোভাবে তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করা উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)