রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ
৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
হাদীস নং: ১০৩৩
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
আযানের ফযীলত
আযানের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
الأَذَان (আযান) শব্দের অর্থ ঘোষণা, আহ্বান। শাব্দিক অর্থ হিসেবে যে-কোনও ডাক ও ঘোষণার জন্যই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কা'বাঘর নির্মাণের পর মানুষকে হজ্জের জন্য আহ্বান জানানোর যে হুকুম আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে দিয়েছিলেন, কুরআন মাজীদে তা এভাবে বর্ণিত হয়েছে-
وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ
'এবং মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা দাও। (সূরা হজ্জ, আয়াত ২৭)
মক্কাবিজয়ের পর হিজরী ৯ম সনে হজ্জের সময় মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সে ঘোষণা সম্পর্কেও কুরআন মাজীদে আযান শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَأَذَانٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ ۙ وَرَسُولُهُ
'বড় হজ্জের দিন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে সমস্ত মানুষের জন্য ঘোষণা করা যাচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন এবং তাঁর রাসূলও। সূরা তাওবা, আয়াত ৩
তবে ইসলামী পরিভাষায় সাধারণত আযান বলা হয় নামাযের জন্য সুনির্দিষ্ট শব্দে আহ্বান জানানোকে। কাজেই আযান বললে মুসলিম মাত্রই বুঝতে পারে যে, এটা ওই ঘোষণার নাম, যা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে জামাতে শামিল হওয়ার জন্য দেওয়া হয়ে থাকে। এ আযান অত্যন্ত সারগর্ভ। এটা ইসলামের নিদর্শন। এটা সমুচ্চ শব্দে আল্লাহ তা'আলার যিকির। এটা ইসলামের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাসের ঘোষণা। এটা মানুষের দোজাহানের সাফল্যের পথনির্দেশ।
আযানের সূচনা
শুরুতে নামাযের জন্য ডাকার এ ব্যবস্থা ছিল না। মক্কা মুকাররামায় তো প্রকাশ্যে জামাতে নামায পড়ার সুযোগই ছিল না। তাই তখন আযানেরও প্রয়োজন হয়নি। এর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে মদীনা মুনাউওয়ারায়। এখানে প্রথমে মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাযও জামাতের সঙ্গে পড়া শুরু হয়। কিন্তু সবাই যাতে একসঙ্গে মিলিত হয়ে নামায পড়তে পারে, সেজন্য ডাকার কোনও ব্যবস্থা না থাকায় সাহাবায়ে কেরামের বেশ সমস্যা হতো। তারা অনুমান করে মসজিদে আসতেন। তাতে অনেকেরই জামাত ছুটে যেত। বিষয়টা নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে পরামর্শে বসেন। এ নিয়ে একেকজন একেক মত দিচ্ছিলেন। কেউ বলছিলেন নামাযের সময় আগুন জ্বালানো হোক। তা দেখে সবাই বুঝতে পারবে জামাতের সময় হয়ে গেছে। কিন্তু অগ্নিপূজারীরা এ ব্যবস্থা অবলম্বন করত বলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন না। কেউ বললেন শিঙা বাজানো হোক। কিন্তু এটা ছিল ইহুদিদের রীতি। তাই এ প্রস্তাবও বাতিল হয়ে যায়। কেউ বললেন ঘণ্টা বাজানো হোক। কিন্তু খ্রিষ্টানদের রীতি হওয়ায় এ প্রস্তাবও গৃহীত হলো না। ফলে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া গেল না। সাহাবায়ে কেরাম এ নিয়ে ভাবতে থাকলেন।
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-ও বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। রাতের বেলা এ চিন্তার ভেতরই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। স্বপ্নে দেখেন সবুজ পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি কোথাও যাচ্ছে। তার হাতে একটি ঘণ্টা। তিনি তার কাছ থেকে সে ঘণ্টাটি নিতে চাইলেন। লোকটি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এর দ্বারা আমরা মানুষকে নামাযের জন্য ডাকব। সে ব্যক্তি বলল, আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু শিখিয়ে দেব? এ বলে সেই ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-কে আযানের বাক্যগুলো শিখিয়ে দিলেন। পরদিন ভোরবেলা হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাঁর স্বপ্নের বৃত্তান্ত পেশ করলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই এটি একটি সত্য স্বপ্ন। অনুরূপ স্বপ্ন দেখেছিলেন হযরত উমর ফারূক রাযি.-ও। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা জানানোর আগেই হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি. তাঁর স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। আরও একাধিক সাহাবী সম্পর্কে জানা যায় যে, তারাও একইরকম স্বপ্ন দেখেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ স্বপ্নকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নির্দেশনারূপে গণ্য করলেন। তিনি স্বপ্নের বাক্যগুলোকে নামাযের ডাকরূপে অনুমোদন করলেন। তারপর হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-কে বললেন, বিলালকে বাক্যগুলো শিখিয়ে দাও। তিনি শিখিয়ে দিলেন। হযরত বিলাল রাযি. ছিলেন সুউচ্চ আওয়াজ ও সুন্দর সুরের অধিকারী। তিনি একটি উঁচু স্থানে উঠে বাক্যগুলো উচ্চারণ করলেন। এভাবে এ সুন্দর বাক্যগুলো দ্বারা জামাতের জন্য ডাকার নিয়ম চালু হলো। হযরত বিলাল রাযি. ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম মুআযযিন।
আযানের শব্দাবলি, অর্থ ও তাৎপর্য
ইসলামের এ আযান-ব্যবস্থা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যান্য ধর্মের ব্যবস্থা অর্থহীন কোনও আওয়াজমাত্র, যেমন ঘণ্টা পেটানো বা শিঙা বাজানো। কোনও ধর্মে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু এর কোনও ব্যবস্থাই কোনও গভীর ভাব ও তাৎপর্য বহন করে না। ইসলামের ব্যবস্থা অভিনব ও নিগূঢ় মর্মবাহী। এতে সুনির্দিষ্ট কিছু বাক্য আছে, যা সংক্ষেপে পূর্ণ ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে।
আযানের প্রথম বাক্য হলো الله أكبرُ। এর দ্বারা সর্বপ্রথম নামায যার জন্য পড়া হয় সেই আল্লাহর প্রভুত্ব ও মহত্ব ঘোষণা করা হয়। বোঝানো উদ্দেশ্য যে, নামায ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগী মানুষের নিজ কল্যাণার্থেই করা জরুরি। এতে আল্লাহর নিজের কোনও উপকার নেই। তিনি এমনই মহামহিম সত্তা যে, কারও ইবাদত-উপাসনায় তাঁর কোনও প্রয়োজন নেই এবং তা করা না করায় তাঁর প্রভুত্বে কিছুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে না, ঘটার অবকাশও নেই। কেননা الله أَكْبَرُ 'আল্লাহ মহান, তিনি যাবতীয় প্রয়োজন ও কমতির ঊর্ধ্বে'। এটা এক পরম সত্য। এ সত্যের প্রতি দৃঢ়তা জ্ঞাপনের জন্য বাক্যটি দু'বার উচ্চারণ করা হয়।
দ্বিতীয় বাক্য হলো- أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا الله (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই)। অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগীর উপযুক্ত কেবল আল্লাহ তা'আলাই। এতে তাঁর কোনও শরীক নেই। এই তাওহীদী বিশ্বাসই ইসলামের মূলমন্ত্র। এরই উপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের মহাপ্রাসাদ।
তৃতীয় বাক্য হলো- أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের এ সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে জানানো হয় যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে ইবাদত-বন্দেগীর সেই পন্থাই গ্রহণযোগ্য, যা তিনি তাঁর এ মহান রাসূলের মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং হে মানুষ! তোমরা তাঁর দাওয়াতে সাড়া দাও এবং তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করো, বিশেষত এই মুহূর্তে এসে নামাযের জামাতে শামিল হও।
চতুর্থ পর্যায়ে আযান যেই জন্য দেওয়া হচ্ছে সেই শ্রেষ্ঠতম ইবাদত নামাযে আসার জন্য ডাক দেওয়া হয়। বলা হয় حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ (তোমরা নামাযে এসো)।
পঞ্চম বাক্যে রয়েছে নামায ও অন্যান্য ইবাদতের তাৎপর্যের দিকে ইঙ্গিত। বলা হয়- حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ (এসা সফলতার দিকে)। নামায ও অন্যান্য ইবাদতেই মানুষের প্রকৃত সফলতা নিহিত। এর দ্বারা আখিরাতের প্রতিও ইশারা হয়ে গেছে। কেননা চূড়ান্ত সফলতা হচ্ছে আখিরাতের মুক্তিলাভ। যা ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। ব্যাপকার্থে ইবাদত হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। লৌকিক জীবনের সবকিছুই তার অন্তর্গত। তা মেনে চলার দ্বারা আখিরাতের মুক্তি তো বটেই, পার্থিব জীবনের মুক্তি ও সফলতাও অর্জিত হয়। সুতরাং বিশেষভাবে দুনিয়া বা আখিরাত কোনও একটির সাথে যুক্ত না করে সাধারণভাবে 'এসো সফলতার দিকে' বলে দোজাহানের সফলতা নিশ্চিত হয় যে দীনে ইসলাম দ্বারা, তা আঁকড়ে ধরার ডাক দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে মৌল বিশ্বাসে জোর সৃষ্টির লক্ষ্যে পুনরায় আল্লাহর মহিমা ও তাওহীদের বাণী ঘোষণা দ্বারা আযান শেষ করা হয়। কাজেই নামাযের আযান কেবল নামাযের ডাকই নয়; বরং এটা দীনে ইসলামের প্রতি উদাত্ত আহ্বান। প্রতিদিন পাঁচবার মুআযযিন তার সুউচ্চ ধ্বনিতে ইসলামের মৌলবাণী ঘোষণার মাধ্যমে অমুসলিমের সামনে ঈমানের দাওয়াত পেশ করে এবং মুসলিম মন-মানসে ঈমানের মর্মবাণীকে উজ্জীবিত করে তোলে।
আযানের মাহাত্ম্য
আযান ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যে জনপদে আযান হয়, আযান সে জনপদবাসীর মুসলিম হওয়ার পরিচয় বহন করে। তাই তার বাসিন্দাদের একান্ত কর্তব্য আযানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং পাঁচও ওয়াক্তে যাতে আযান হয়, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কেননা এ আযান তাদের জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তার গ্যারান্টি। অর্থাৎ মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী যখন কোনও এলাকায় আযানের ধ্বনি শুনবে, তখন তারা সেখানকার বাসিন্দাদের মুসলিম গণ্য করে তাদের উপর অভিযান চালানো হতে বিরত থাকবে। তাছাড়া ইসলামের পরিচয় বহনকারী গৌরবজনক এ ঘোষণা থেকে কোনও মুসলিম জনপদ বঞ্চিত থাকবে, তা কীভাবে মেনে নেওয়া যেতে পারে? এটা আযানের বিপুল খায়র ও বারাকাত থেকেও তাদের বঞ্চিত থাকার কারণ বটে।
আযান সারা জাহানের জন্যই আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ নি'আমত। সারা বিশ্ব ঘুরেফিরে প্রতি মুহূর্তে এর কল্যাণে সিক্ত হতে থাকে। কেননা নামাযের ওয়াক্তসমূহ সূর্য পরিক্রমণের সাথে যুক্ত হওয়ায় ইসলামের এই সোচ্চার ডাকও বিশ্বভ্রমণ করে বেড়ায়। ফলে এ ডাক প্রতি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও ধ্বনিত হতে থাকে। যিনি এ জগৎ সৃষ্টি করেছেন, প্রতি মুহূর্তে তাঁর নাম কোথাও না কোথাও উচ্চারিত হতে থাকে। ইসলাম সারা বিশ্বের দীন হওয়ায় সারা বিশ্ব সর্বক্ষণ তাঁর নামের ধ্বনিতে মুখর থাকে। সেইসঙ্গে সারা বিশ্বের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান নামের বরকতও এ বিশ্ব লাভ করতে থাকে প্রতিটি মুহূর্তে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন-
وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
'এবং আমি তোমার কল্যাণে তোমার চর্চাকে উচ্চমর্যাদা দান করেছি। (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ৪)
আযান এ আয়াতের বাস্তব চিত্র। মোটকথা আযানের মাধ্যমে আল্লাহর তাওহীদ ও মুহাম্মাদী রিসালাতের ঘোষণা অনুক্ষণ নিখিল বিশ্বের এক নিরবচ্ছিন্ন ব্যঞ্জনা হয়ে থাকে।
সাধারণভাবে সকল ওয়াক্তের জন্যই একই রকম বাক্যে আযান দেওয়া হয়। কেবল ফজরের আযানে حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ -এর পর দু'বার অতিরিক্ত বলা হয়- الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِّنَ النَّوْمِ (ঘুম অপেক্ষা নামায শ্রেষ্ঠ)। এর দ্বারা ক্ষণিকের আরাম ও অলসতা ঝেড়ে ফেলে নামাযের প্রতি উৎসাহ জোগানো উদ্দেশ্য, যাতে মানুষ এই ক্ষণিকের আরাম-আয়েশের বদলে আখিরাতের স্থায়ী অনন্ত সুখ-শান্তি লাভ করতে পারে।
আযানের সম্পর্ক নামাযের ওয়াক্তের সঙ্গে। কাজেই আযান প্রত্যেক ওয়াক্তের দাবি। তাই প্রত্যেক নামাযের আযান দিতে হয় নামাযের ওয়াক্ত হলে পরে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। আল্লাহর দরবারে আমার হাজির হওয়ার সময় এসে গেছে। আমাকে এজন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। কাজেই ওয়াক্ত হওয়ার আগে দিলে সে আযান শুদ্ধ হয় না। কেননা তাতে আযানের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। জামা'আত শুরু হওয়ার এতটুকু আগে আযান দেওয়া চাই, যাতে আযান শুনে মানুষ ওযূ-ইস্তিঞ্জাসহ নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পায়।
তারপর জামা'আত শুরু হওয়ার প্রাক্কালে আরও একবার নামাযের জন্য ডাক দেওয়া হয়। এ ডাককে ইকামত বলে। ইকামতের বাক্যসমূহ আযানেরই অনুরূপ। কেবল حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ -এর পর দু'বার قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ 'নামায শুরু হয়ে গেছে' অতিরিক্ত বলতে হয়।
আযান ও ইকামত উভয়টিই 'সুন্নতে মুআক্কাদা'। শ্রোতার কর্তব্য এতে সাড়া দিয়ে জামা'আতে হাজির হওয়া। সেইসঙ্গে মৌখিক উত্তর দেওয়াও মুস্তাহাব। অর্থাৎ মুআযযিন আযান-ইকামতে যেসব শব্দ উচ্চারণ করে, শ্রোতাও হুবহু তাই উচ্চারণ করবে। শুধু حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ ও حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ - এর স্থানে বলবে -لا حَوْلَ وَ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِالله (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সৎকাজ করা ও অসৎকাজ থেকে বিরত থাকা কারও পক্ষে সম্ভব নয়)।
আযান দেওয়ার ফযীলত
আযানের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
الأَذَان (আযান) শব্দের অর্থ ঘোষণা, আহ্বান। শাব্দিক অর্থ হিসেবে যে-কোনও ডাক ও ঘোষণার জন্যই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কা'বাঘর নির্মাণের পর মানুষকে হজ্জের জন্য আহ্বান জানানোর যে হুকুম আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে দিয়েছিলেন, কুরআন মাজীদে তা এভাবে বর্ণিত হয়েছে-
وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ
'এবং মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা দাও। (সূরা হজ্জ, আয়াত ২৭)
মক্কাবিজয়ের পর হিজরী ৯ম সনে হজ্জের সময় মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সে ঘোষণা সম্পর্কেও কুরআন মাজীদে আযান শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَأَذَانٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ ۙ وَرَسُولُهُ
'বড় হজ্জের দিন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে সমস্ত মানুষের জন্য ঘোষণা করা যাচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন এবং তাঁর রাসূলও। সূরা তাওবা, আয়াত ৩
তবে ইসলামী পরিভাষায় সাধারণত আযান বলা হয় নামাযের জন্য সুনির্দিষ্ট শব্দে আহ্বান জানানোকে। কাজেই আযান বললে মুসলিম মাত্রই বুঝতে পারে যে, এটা ওই ঘোষণার নাম, যা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে জামাতে শামিল হওয়ার জন্য দেওয়া হয়ে থাকে। এ আযান অত্যন্ত সারগর্ভ। এটা ইসলামের নিদর্শন। এটা সমুচ্চ শব্দে আল্লাহ তা'আলার যিকির। এটা ইসলামের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাসের ঘোষণা। এটা মানুষের দোজাহানের সাফল্যের পথনির্দেশ।
আযানের সূচনা
শুরুতে নামাযের জন্য ডাকার এ ব্যবস্থা ছিল না। মক্কা মুকাররামায় তো প্রকাশ্যে জামাতে নামায পড়ার সুযোগই ছিল না। তাই তখন আযানেরও প্রয়োজন হয়নি। এর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে মদীনা মুনাউওয়ারায়। এখানে প্রথমে মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাযও জামাতের সঙ্গে পড়া শুরু হয়। কিন্তু সবাই যাতে একসঙ্গে মিলিত হয়ে নামায পড়তে পারে, সেজন্য ডাকার কোনও ব্যবস্থা না থাকায় সাহাবায়ে কেরামের বেশ সমস্যা হতো। তারা অনুমান করে মসজিদে আসতেন। তাতে অনেকেরই জামাত ছুটে যেত। বিষয়টা নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে পরামর্শে বসেন। এ নিয়ে একেকজন একেক মত দিচ্ছিলেন। কেউ বলছিলেন নামাযের সময় আগুন জ্বালানো হোক। তা দেখে সবাই বুঝতে পারবে জামাতের সময় হয়ে গেছে। কিন্তু অগ্নিপূজারীরা এ ব্যবস্থা অবলম্বন করত বলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন না। কেউ বললেন শিঙা বাজানো হোক। কিন্তু এটা ছিল ইহুদিদের রীতি। তাই এ প্রস্তাবও বাতিল হয়ে যায়। কেউ বললেন ঘণ্টা বাজানো হোক। কিন্তু খ্রিষ্টানদের রীতি হওয়ায় এ প্রস্তাবও গৃহীত হলো না। ফলে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া গেল না। সাহাবায়ে কেরাম এ নিয়ে ভাবতে থাকলেন।
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-ও বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। রাতের বেলা এ চিন্তার ভেতরই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। স্বপ্নে দেখেন সবুজ পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি কোথাও যাচ্ছে। তার হাতে একটি ঘণ্টা। তিনি তার কাছ থেকে সে ঘণ্টাটি নিতে চাইলেন। লোকটি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এর দ্বারা আমরা মানুষকে নামাযের জন্য ডাকব। সে ব্যক্তি বলল, আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু শিখিয়ে দেব? এ বলে সেই ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-কে আযানের বাক্যগুলো শিখিয়ে দিলেন। পরদিন ভোরবেলা হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাঁর স্বপ্নের বৃত্তান্ত পেশ করলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই এটি একটি সত্য স্বপ্ন। অনুরূপ স্বপ্ন দেখেছিলেন হযরত উমর ফারূক রাযি.-ও। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা জানানোর আগেই হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি. তাঁর স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। আরও একাধিক সাহাবী সম্পর্কে জানা যায় যে, তারাও একইরকম স্বপ্ন দেখেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ স্বপ্নকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নির্দেশনারূপে গণ্য করলেন। তিনি স্বপ্নের বাক্যগুলোকে নামাযের ডাকরূপে অনুমোদন করলেন। তারপর হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-কে বললেন, বিলালকে বাক্যগুলো শিখিয়ে দাও। তিনি শিখিয়ে দিলেন। হযরত বিলাল রাযি. ছিলেন সুউচ্চ আওয়াজ ও সুন্দর সুরের অধিকারী। তিনি একটি উঁচু স্থানে উঠে বাক্যগুলো উচ্চারণ করলেন। এভাবে এ সুন্দর বাক্যগুলো দ্বারা জামাতের জন্য ডাকার নিয়ম চালু হলো। হযরত বিলাল রাযি. ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম মুআযযিন।
আযানের শব্দাবলি, অর্থ ও তাৎপর্য
ইসলামের এ আযান-ব্যবস্থা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যান্য ধর্মের ব্যবস্থা অর্থহীন কোনও আওয়াজমাত্র, যেমন ঘণ্টা পেটানো বা শিঙা বাজানো। কোনও ধর্মে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু এর কোনও ব্যবস্থাই কোনও গভীর ভাব ও তাৎপর্য বহন করে না। ইসলামের ব্যবস্থা অভিনব ও নিগূঢ় মর্মবাহী। এতে সুনির্দিষ্ট কিছু বাক্য আছে, যা সংক্ষেপে পূর্ণ ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে।
আযানের প্রথম বাক্য হলো الله أكبرُ। এর দ্বারা সর্বপ্রথম নামায যার জন্য পড়া হয় সেই আল্লাহর প্রভুত্ব ও মহত্ব ঘোষণা করা হয়। বোঝানো উদ্দেশ্য যে, নামায ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগী মানুষের নিজ কল্যাণার্থেই করা জরুরি। এতে আল্লাহর নিজের কোনও উপকার নেই। তিনি এমনই মহামহিম সত্তা যে, কারও ইবাদত-উপাসনায় তাঁর কোনও প্রয়োজন নেই এবং তা করা না করায় তাঁর প্রভুত্বে কিছুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে না, ঘটার অবকাশও নেই। কেননা الله أَكْبَرُ 'আল্লাহ মহান, তিনি যাবতীয় প্রয়োজন ও কমতির ঊর্ধ্বে'। এটা এক পরম সত্য। এ সত্যের প্রতি দৃঢ়তা জ্ঞাপনের জন্য বাক্যটি দু'বার উচ্চারণ করা হয়।
দ্বিতীয় বাক্য হলো- أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا الله (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই)। অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগীর উপযুক্ত কেবল আল্লাহ তা'আলাই। এতে তাঁর কোনও শরীক নেই। এই তাওহীদী বিশ্বাসই ইসলামের মূলমন্ত্র। এরই উপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের মহাপ্রাসাদ।
তৃতীয় বাক্য হলো- أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের এ সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে জানানো হয় যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে ইবাদত-বন্দেগীর সেই পন্থাই গ্রহণযোগ্য, যা তিনি তাঁর এ মহান রাসূলের মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং হে মানুষ! তোমরা তাঁর দাওয়াতে সাড়া দাও এবং তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করো, বিশেষত এই মুহূর্তে এসে নামাযের জামাতে শামিল হও।
চতুর্থ পর্যায়ে আযান যেই জন্য দেওয়া হচ্ছে সেই শ্রেষ্ঠতম ইবাদত নামাযে আসার জন্য ডাক দেওয়া হয়। বলা হয় حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ (তোমরা নামাযে এসো)।
পঞ্চম বাক্যে রয়েছে নামায ও অন্যান্য ইবাদতের তাৎপর্যের দিকে ইঙ্গিত। বলা হয়- حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ (এসা সফলতার দিকে)। নামায ও অন্যান্য ইবাদতেই মানুষের প্রকৃত সফলতা নিহিত। এর দ্বারা আখিরাতের প্রতিও ইশারা হয়ে গেছে। কেননা চূড়ান্ত সফলতা হচ্ছে আখিরাতের মুক্তিলাভ। যা ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। ব্যাপকার্থে ইবাদত হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। লৌকিক জীবনের সবকিছুই তার অন্তর্গত। তা মেনে চলার দ্বারা আখিরাতের মুক্তি তো বটেই, পার্থিব জীবনের মুক্তি ও সফলতাও অর্জিত হয়। সুতরাং বিশেষভাবে দুনিয়া বা আখিরাত কোনও একটির সাথে যুক্ত না করে সাধারণভাবে 'এসো সফলতার দিকে' বলে দোজাহানের সফলতা নিশ্চিত হয় যে দীনে ইসলাম দ্বারা, তা আঁকড়ে ধরার ডাক দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে মৌল বিশ্বাসে জোর সৃষ্টির লক্ষ্যে পুনরায় আল্লাহর মহিমা ও তাওহীদের বাণী ঘোষণা দ্বারা আযান শেষ করা হয়। কাজেই নামাযের আযান কেবল নামাযের ডাকই নয়; বরং এটা দীনে ইসলামের প্রতি উদাত্ত আহ্বান। প্রতিদিন পাঁচবার মুআযযিন তার সুউচ্চ ধ্বনিতে ইসলামের মৌলবাণী ঘোষণার মাধ্যমে অমুসলিমের সামনে ঈমানের দাওয়াত পেশ করে এবং মুসলিম মন-মানসে ঈমানের মর্মবাণীকে উজ্জীবিত করে তোলে।
আযানের মাহাত্ম্য
আযান ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যে জনপদে আযান হয়, আযান সে জনপদবাসীর মুসলিম হওয়ার পরিচয় বহন করে। তাই তার বাসিন্দাদের একান্ত কর্তব্য আযানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং পাঁচও ওয়াক্তে যাতে আযান হয়, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কেননা এ আযান তাদের জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তার গ্যারান্টি। অর্থাৎ মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী যখন কোনও এলাকায় আযানের ধ্বনি শুনবে, তখন তারা সেখানকার বাসিন্দাদের মুসলিম গণ্য করে তাদের উপর অভিযান চালানো হতে বিরত থাকবে। তাছাড়া ইসলামের পরিচয় বহনকারী গৌরবজনক এ ঘোষণা থেকে কোনও মুসলিম জনপদ বঞ্চিত থাকবে, তা কীভাবে মেনে নেওয়া যেতে পারে? এটা আযানের বিপুল খায়র ও বারাকাত থেকেও তাদের বঞ্চিত থাকার কারণ বটে।
আযান সারা জাহানের জন্যই আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ নি'আমত। সারা বিশ্ব ঘুরেফিরে প্রতি মুহূর্তে এর কল্যাণে সিক্ত হতে থাকে। কেননা নামাযের ওয়াক্তসমূহ সূর্য পরিক্রমণের সাথে যুক্ত হওয়ায় ইসলামের এই সোচ্চার ডাকও বিশ্বভ্রমণ করে বেড়ায়। ফলে এ ডাক প্রতি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও ধ্বনিত হতে থাকে। যিনি এ জগৎ সৃষ্টি করেছেন, প্রতি মুহূর্তে তাঁর নাম কোথাও না কোথাও উচ্চারিত হতে থাকে। ইসলাম সারা বিশ্বের দীন হওয়ায় সারা বিশ্ব সর্বক্ষণ তাঁর নামের ধ্বনিতে মুখর থাকে। সেইসঙ্গে সারা বিশ্বের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান নামের বরকতও এ বিশ্ব লাভ করতে থাকে প্রতিটি মুহূর্তে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন-
وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
'এবং আমি তোমার কল্যাণে তোমার চর্চাকে উচ্চমর্যাদা দান করেছি। (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ৪)
আযান এ আয়াতের বাস্তব চিত্র। মোটকথা আযানের মাধ্যমে আল্লাহর তাওহীদ ও মুহাম্মাদী রিসালাতের ঘোষণা অনুক্ষণ নিখিল বিশ্বের এক নিরবচ্ছিন্ন ব্যঞ্জনা হয়ে থাকে।
সাধারণভাবে সকল ওয়াক্তের জন্যই একই রকম বাক্যে আযান দেওয়া হয়। কেবল ফজরের আযানে حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ -এর পর দু'বার অতিরিক্ত বলা হয়- الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِّنَ النَّوْمِ (ঘুম অপেক্ষা নামায শ্রেষ্ঠ)। এর দ্বারা ক্ষণিকের আরাম ও অলসতা ঝেড়ে ফেলে নামাযের প্রতি উৎসাহ জোগানো উদ্দেশ্য, যাতে মানুষ এই ক্ষণিকের আরাম-আয়েশের বদলে আখিরাতের স্থায়ী অনন্ত সুখ-শান্তি লাভ করতে পারে।
আযানের সম্পর্ক নামাযের ওয়াক্তের সঙ্গে। কাজেই আযান প্রত্যেক ওয়াক্তের দাবি। তাই প্রত্যেক নামাযের আযান দিতে হয় নামাযের ওয়াক্ত হলে পরে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। আল্লাহর দরবারে আমার হাজির হওয়ার সময় এসে গেছে। আমাকে এজন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। কাজেই ওয়াক্ত হওয়ার আগে দিলে সে আযান শুদ্ধ হয় না। কেননা তাতে আযানের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। জামা'আত শুরু হওয়ার এতটুকু আগে আযান দেওয়া চাই, যাতে আযান শুনে মানুষ ওযূ-ইস্তিঞ্জাসহ নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পায়।
তারপর জামা'আত শুরু হওয়ার প্রাক্কালে আরও একবার নামাযের জন্য ডাক দেওয়া হয়। এ ডাককে ইকামত বলে। ইকামতের বাক্যসমূহ আযানেরই অনুরূপ। কেবল حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ -এর পর দু'বার قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ 'নামায শুরু হয়ে গেছে' অতিরিক্ত বলতে হয়।
আযান ও ইকামত উভয়টিই 'সুন্নতে মুআক্কাদা'। শ্রোতার কর্তব্য এতে সাড়া দিয়ে জামা'আতে হাজির হওয়া। সেইসঙ্গে মৌখিক উত্তর দেওয়াও মুস্তাহাব। অর্থাৎ মুআযযিন আযান-ইকামতে যেসব শব্দ উচ্চারণ করে, শ্রোতাও হুবহু তাই উচ্চারণ করবে। শুধু حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ ও حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ - এর স্থানে বলবে -لا حَوْلَ وَ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِالله (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সৎকাজ করা ও অসৎকাজ থেকে বিরত থাকা কারও পক্ষে সম্ভব নয়)।
আযান দেওয়ার ফযীলত
১০৩৩. হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, লোকে যদি জানত আযান দেওয়ায় ও প্রথম কাতারে কী (ফযীলত) আছে আর লটারি ধরা ছাড়া তা লাভের কোনও সুযোগ না পেত, তবে অবশ্যই সেজন্য লটারি ধরত। এমনিভাবে তারা যদি জানত নামাযে আগে আগে আসার মধ্যে কী আছে, তবে তারা সেজন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো। আর তারা যদি জানত ইশা ও ফজরের নামাযে কী আছে, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাতে আসত। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী: ৬১৫; সহীহ মুসলিম: ৪৩৭; সুনানে নাসাঈ ৫৪০; মুসনাদে আহমাদ: ৭২২৬; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ২০০৭; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা। ২০১২)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1033 - عن أَبي هريرة - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا في النِّدَاءِ والصَّفِ الأَوَّلِ، ثُمَّ لَمْ يَجِدُوا إِلاَّ أَنْ يَسْتَهِمُوا عَلَيْهِ لاسْتَهَمُوا عَلَيْهِ، ولو يَعْلَمُونَ مَا فِي التَّهْجِيرِ لاَسْتَبَقُوا إِلَيْهِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِي العَتَمَةِ (1) وَالصُّبْحِ لأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا». متفقٌ عَلَيْهِ. (2)
«الاسْتِهَامُ»: الاقْتِرَاعُ، وَ «التَّهْجِيرُ»: التَّبْكِيرُ إِلَى الصَّلاةِ.
«الاسْتِهَامُ»: الاقْتِرَاعُ، وَ «التَّهْجِيرُ»: التَّبْكِيرُ إِلَى الصَّلاةِ.
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
__________
(1) العتمة: وقت صلاة العشاء الأخيرة. لسان العرب 9/ 41 (عتم).
(2) أخرجه: البخاري 1/ 159 - 160 (615)، ومسلم 2/ 31 (437) و (129).
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীছে বিশেষ পাঁচটি আমলের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। তা হলো আযান দেওয়া, নামাযে প্রথম কাতারে দাঁড়ানো, নামাযে আগে আগে যাওয়া, ইশা ও ফজরের জামাতে শামিল হওয়া। আযান দেওয়া ও প্রথম কাতারে দাঁড়ানো সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
و يَعلَمُ النَّاسُ ما في النِّداءِ والصَّفِّ الأوَّلِ (লোকে যদি জানত আযান দেওয়ার ও প্রথম কাতারে কী আছে)। অর্থাৎ এ দু'টি আমলের কী ফযীলত, এর ছাওয়াব কত বেশি এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে কত বেশি পছন্দ-
ثُمَّ لَمْ يَجِدُوا إِلَّا أَنْ يَسْتَهِمُوا عَلَيْهِ لَاسْتَهَمُوا عَلَيْهِ (আর লটারি ধরা ছাড়া তা করার কোনও সুযোগ না পেত, তবে অবশ্যই সেজন্য লটারি ধরত)। অর্থাৎ ফযীলত জানার কারণে প্রত্যেকেই আযান দিতে চাইত এবং প্রত্যেকেই প্রথম কাতারে দাঁড়াতে চাইত। আবার আযান তো এমন কাজ নয়, যাতে সকলেই অংশ নিতে পারবে। এ কাজের জন্য যে-কোনও একজনই যথেষ্ট। আর সামনের কাতারের বেলায়ও এ সমস্যা স্বাভাবিকভাবেই দেখা দিতে পারে। স্থান যদি সংকীর্ণ হয় আর লোকসংখ্যা হয় বেশি, তখন সকলের পক্ষেই প্রথম কাতারে সুযোগ পাওয়া সম্ভব হয় না। অন্যদিকে ফযীলত জানার কারণে প্রত্যেকেই যেহেতু এর আগ্রহ রাখত, তাই প্রত্যেকে এ সুযোগ লাভের জন্য সবটা উপায়ও অবলম্বন করত। হয়তো শক্তিও ব্যবহার করত। ফলে ঝগড়া-ফাসাদ ও মারামারি লেগে যেত। শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান সম্ভব হতো না। হাঁ, শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপায় থাকত একটাই। আর তা হলো লটারির মাধ্যমে মীমাংসা করা। ব্যস লটারিতে যে জিতবে, সেই অগ্রাধিকার পাবে। হাদীছের শব্দ হলো اِسْتَهمُوا। এর উৎপত্তি اَلْاسْتِهَامُ থেকে। এর মূল হলো سهم (তির, অংশ)। সেকালে লটারি ধরা হতো তির দ্বারা। তিরে কখনও নাম লেখা থাকত, কখনও অংশ লেখা থাকত। সেই নাম বা সেই অংশ অনুযায়ী ফয়সালা হতো। পরবর্তীতে শব্দটি সাধারণভাবে যে-কোনও পদ্ধতির লটারির জন্যই ব্যবহৃত হতে থাকে।
আযানের জন্য এরূপ লটারি হযরত উমর ফারুক রাযি.-এর যমানায় করা হয়েছিল। বিখ্যাত সাহাবী হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রাযি. ছিলেন ইরান অঞ্চলীয় জিহাদসমূহের সেনাপতি। তাঁর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক কাদেসিয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে যখন বিজয় অর্জিত হয়, তখন ছিল যোহরের ওয়াক্ত। যুদ্ধে মুআযযিন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। এখন কে আযান দেবে? সকলের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে গেল। প্রত্যেকেই আযান দিতে চাইল। এমনকি সে প্রতিযোগিতা তরবারির যুদ্ধে রূপ নেওয়ার উপক্রম হলো। শেষে সেনাপতি হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রাযি. তাদেরকে শান্ত করতে সক্ষম হলেন। তিনি তাদের মধ্যে ফয়সালা করলেন লটারি দ্বারা। লটারিতে যে ব্যক্তি জিতল, তিনি তাকেই আযান দেওয়ার অনুমতি দিলেন।
লটারি কোন ক্ষেত্রে জায়েয, কোন ক্ষেত্রে জায়েয নয়
উল্লেখ্য, যখন কোনও অনির্ধারিত অধিকারের উপর একাধিক ব্যক্তি দাবিদার হয়, তখন লটারির মাধ্যমে অধিকার সাব্যস্ত করা জায়েয। এমনিভাবে একাধিক ব্যক্তির মালিকানাধীন কোনও যৌথ সম্পদ থাকলে এবং তার মূল্যমান সমান না হলে প্রথমে তার মূল্য নির্ধারণ করে ন্যায়সম্মত বণ্টন করা হবে, তারপর কার কোন অংশ তা নির্ধারণ করার জন্য লটারি করা যাবে। আযান ও ইমামতের বিষয়টা এরকমই। উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রেও এ নিয়ম প্রযোজ্য। অর্থাৎ উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে যাদের অংশ সমান, তাদের কে কোন অংশ পাবে, তা লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করা জায়েয।
যেসব ক্ষেত্রে কারও অধিকার নির্ধারিত থাকে, সে ক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে অন্য কাউকে তার উপর অগ্রাধিকার দেওয়া জায়েয নয়। এমনিভাবে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে যদি শরীয়ত-নির্ধারিত হিস্যা উপেক্ষা করা হয় এবং তারপর লটারির মাধ্যমে সে সম্পদ কটন করা হয়, তবে তাও জায়েয হবে না। কেননা তাতে শরীয়ত-নির্ধারিত অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়। যেমন কোনও ব্যক্তির একটি বাড়ি, একটি গাড়ি ও একটি দোকান আছে। তার ওয়ারিশ তিনজন। এক ছেলে দুই মেয়ে। এ ক্ষেত্রে 'মেয়ের দ্বিগুণ ছেলে'-শরীয়ত-নির্ধারিত এ নীতি উপেক্ষা করে লটারির মাধ্যমে তিন ওয়ারিশের মধ্যে উল্লিখিত তিনটি সম্পদ ভাগ করে দেওয়া কিছুতেই জায়েয হবে না। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত মাসায়েল উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ইদানীংকার প্রচলিত বেশিরভাগ লটারিতে জুয়ার উপাদান থাকে। জুয়া সম্পূর্ণ হারাম। তাই এসব লটারিতে শরীক হতে চাইলে তার আগে অবশ্যই বিজ্ঞ আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে হবে।
আযানের বহুবিধ কল্যাণ
আযানের সবচে' গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর দ্বারা তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত আযান গাফেল ও উদাসীনদের সচেতনকারী। যারা নানা কাজেকর্মে ব্যস্ত থেকে নামায সম্পর্কে অসচেতন হয়ে পড়ে, আযান দ্বারা তাদের সচেতন করা হয়, যেন তারা ওয়াক্তের দাবি পূরণে নামাযের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
আযান যিকিরকারীদের অনুপ্রেরণাদায়ী। আযান নিজেই এক শ্রেষ্ঠতম যিকির। যারা আযানের ধ্বনি শোনে, তারাও হুবহু আযানের বাক্যগুলো উচ্চারণ করে, ফলে মুআযযিনের মতো তারাও যিকিরকারী হয়ে যায়।
আযান নিজ ইসলামের নবায়নও বটে। কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ দ্বারা যেমন অমুসলিম ব্যক্তি মুসলিম হয়ে যায়, তেমনি মুসলিম ব্যক্তি এর উচ্চারণ দ্বারা নিজ ঈমান ও ইসলামকে নবায়ন করে। ফলে এ ব্যক্তি যখন নামাযে দাঁড়ায়, তখন তাজা ঈমান নিয়ে দাঁড়ায়। তখন তার অন্তরে নফস ও শয়তানের ঈমান সম্পর্কিত কোনও ওয়াসওয়াসা বা খটকা বাকি থাকে না। সে এক আলোকিত ও নূরানী অন্তর নিয়ে আল্লাহর অভিমুখী হয়।
এছাড়াও আযানের ভেতর আরও বহুবিধ কল্যাণ রয়েছে, যা সামনের হাদীছগুলোতে আসবে। এতসব কল্যাণ আযানের মধ্যে নিহিত রয়েছে। তাই হাদীছটিতে নির্দিষ্ট কোনও ফায়দার কথা না বলে সাধারণভাবে বলা হয়েছে 'মানুষ যদি জানত আযানের মধ্যে কী আছে'। অর্থাৎ এর ফায়দা অনেক বেশি। সুতরাং তোমরা আযান দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করো।
প্রথম কাতারের ফযীলত
জামাতের প্রথম কাতার অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এর রয়েছে প্রচুর কল্যাণ ও বরকত। এ কাতার ইমামের সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী। ইমাম মুসল্লীদের নামাযের নেতৃত্ব দানকারী। নেতার পাশাপাশি থাকাটা এমনিই মর্যাদাপূর্ণ। তদুপরি এ কাতারে শামিল হতে চাইলে মসজিদে আগে আগে আসতে হয়। মসজিদে আগে আসাটা ফযীলতপূর্ণ কাজ।
ইমামের যত বেশি কাছে থাকা যায়, তত বেশি স্পষ্টভাবে তার কিরাআত শোনা যায়। তার দেখাদেখি নামাযের পদ্ধতি ও নামাযের মাসায়েল শেখা যায়। কারণ ইমামের সবটা কাজ ও সবটা অবস্থাই তার সামনে স্পষ্ট থাকে। তাছাড়া ইমামের কোনও ভুল হলে তার কাছের লোকের পক্ষেই সে ভুল সম্পর্কে তাকে সচেতন করা সহজ হয়।
আগে আগে এসে প্রথম কাতারে স্থান নিতে পারলে অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকেও বাঁচা যায়। যারা পরে এসে সামনে যেতে চায়, তারা মানুষের কাঁধ ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে অগ্রসর হয়। ফলে মানুষকে কষ্ট দেওয়া হয়। হাদীছে এটা সুস্পষ্টভাবেই নিষেধ করা হয়েছে।
এমনিভাবে যে ব্যক্তি ইমামের কাছে থাকে, সে সরাসরি ইমামকে দেখে দেখে নিজ নামায আদায় করে। যারা আরও পেছনে থাকে, তারা সামনের ব্যক্তির অনুসরণ করে। এভাবে প্রথম কাতারের ব্যক্তি পরবর্তী কাতারের লোক ও ইমামের মাঝখানে মধ্যস্থতাকারীর মতো হয়ে যায়। ফলে তার পেছনে নামায আদায়কারীদের ছাওয়াবের অনুরূপ ছাওয়াব তার আমলনামায়ও যুক্ত হয়।
এতসব কল্যাণ প্রথম কাতারে নিহিত রয়েছে। তাই হাদীছটিতে সাধারণভাবে বলা হয়েছে 'মানুষ যদি জানত প্রথম কাতারে কী আছে'। অর্থাৎ ফায়দা যেহেতু অনেক বেশি, তাই নির্দিষ্ট কোনও একটির কথা না বলে বরং প্রচ্ছন্নভাবে সবগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে দেওয়া হয়েছে। প্রথম কাতারের ফযীলত সম্পর্কে বহু হাদীছ বর্ণিত আছে। যেমন হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে-
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ صُفُوفِ الرِّجَالِ أَوَّلُهَا وَشَرُّهَا آخِرُهَا وَخَيْرُ صُفُوفِ النِّسَاءِ آخِرُهَا وشرها أَولهَا.
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, পুরুষদের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কাতার হলো প্রথম কাতার আর তাদের সর্বাপেক্ষা মন্দ কাতার হলো পেছনের কাতার। মহিলাদের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কাতার পেছনের কাতার আর তাদের সর্বাপেক্ষা মন্দ কাতার সামনের কাতার। (সহীহ মুসলিম: ৪৪০; সুনানে আবূ দাউদ: ৬৭৮; জামে তিরমিযী: ২২৪; সুনানে নাসাঈ: ৮২০; সুনানে ইবন মাজাহ ১০০১; মুসনাদে আহমাদ ৭৩৫৬; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩৮০৭; মুসনাদুল হুমায়দী: ১০৩০; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৫১১০; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৭৬৯২)
অর্থাৎ পুরুষেরা পেছনের কাতারে দাঁড়াবে না। কেননা তাতে তারা মহিলাদের পেছনে পড়ে যাবে। আর নারীরা সামনের কাতারে দাঁড়াবে না। কেননা তাতে তাদের পুরুষদের সামনে দাঁড়ানো হবে। এটা নারী-পুরুষ উভয়ের পক্ষেই ফিতনা। তাতে নামাযের মনোযোগ বিনষ্ট হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। যথেষ্ট আশঙ্কা থাকে গুনাহে লিপ্ত হওয়ারও। সুতরাং সর্বাপেক্ষা সামনের কাতার ফযীলতের বটে, তবে তা পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট। এর মানে মহিলাদের ছাওয়াব থেকে বঞ্চিত থাকা নয়। ছাওয়াব তো পাওয়া যায় শরীয়তের হুকুম মানার দ্বারা। কাজেই হাদীছের নির্দেশনা মোতাবেক মহিলাগণ সামনের কাতারে না দাঁড়িয়ে পেছনের কাতারে দাঁড়ালেই বেশি ছাওয়াব পাবে।
হযরত জাবির ইবন সামুরা রাযি. থেকে বর্ণিত হাদীছে আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
أَلَا تَصُفُّونَ كَمَا تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا؟» فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا؟ قَالَ: «يُتِمُّونَ الصُّفُوفَ الْأُولَى وَيَتَرَاصُّونَ فِي الصَّف
'তোমরা কি ঠিক সেরকম কাতারবদ্ধ হবে না, যেমন কাতারবদ্ধ হয় ফিরিশতাগণ?
সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। ফিরিশতাগণ কীভাবে কাতারবদ্ধ হয়? তিনি বললেন, তারা প্রথমে সামনের কাতার পূর্ণ করে। আর তারা পরস্পর মিশে মিশে দাঁড়ায়। (সহীহ মুসলিম: ৪৩০; সুনানে আবু দাউদ: ৬৬১৮; সুনানে নাসাঈ: ৮১৬; সুনানে ইবন মাজাহ : ৯৯১; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩৫৩৯; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ২৪৩২; মুসনাদুল বাযযার: ৪২৮৯; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৭৪৭৪; সহীহ ইবন খুযায়মা: ১৫৪৪; সহীহ ইবন হিব্বান: ২১৫৪)
হযরত বারা ইবন আযিব রাযি. বলেন-
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُ : إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى الصَّفِ الْأَوَّلِ.
'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা'আলা প্রথম কাতারের উপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতাগণ প্রথম কাতারের জন্য রহমতের দু'আ করেন। (সুনানে ইবন মাজাহ ৯৯৭; সুনানে নাসাঈ ৬৪৬; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩৮০৩; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ২৪৩১; মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী ৭৭৭; মুসনাদুল বাযযার: ৩২২৪; সহীহ ইবন খুযায়মা ১৫৫৭; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ১৮৮৪; সহীহ ইবন হিব্বান: ২১৫৭)
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বলেন-
اسْتَغْفَرَ رَسُولُ اللهِ ﷺ لِلصَّفِ الْأَوَّلِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، وَلِلصَّفِ الثَّانِي مَرَّتَيْنِ، وَالثَّالِثِ مَرَّةً.
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম কাতারের জন্য তিনবার মাগফিরাতের দু'আ করেছেন। দ্বিতীয় কাতারের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করেছেন দুবার। আর তৃতীয় কাতারের জন্য একবার। (তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৮৮১৯)
প্রথম কাতারে পৌঁছার জন্য অন্যকে কষ্ট না দেওয়া
প্রথম কাতারের জন্য এতসব ফযীলত হাদীছসমূহে বর্ণিত হয়েছে। তবে সবকিছুরই আদব আছে। আদব ইসলামী শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাতারে অংশগ্রহণের একটি আদব হলো মানুষকে ডিঙিয়ে সামনে না যাওয়া। কেননা তাতে মানুষ কষ্ট পায়। তাই পরে এসে নির্দোষভাবে সামনে যাওয়ার সুযোগ না হলে সামনে যাবে না। পেছনে যেখানে স্থান পাওয়া যায়, সেখানেই দাঁড়াবে। মানুষকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থেকে পেছনের কাতারে দাঁড়ালে বরং আরও বেশি ছাওয়াব পাওয়া যাবে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
من ترك الصفَّ الأولَ مخافةَ أن يُؤذيَ أحدًا، أضعفَ اللهُ له أجرَ الصفِّ الأوَّلِ.
'মানুষকে কষ্ট দেওয়া হতে পারে এই আশঙ্কায় যে ব্যক্তি প্রথম কাতারে যাওয়া হতে বিরত থাকবে, তাকে আল্লাহ তা'আলা প্রথম কাতারের দ্বিগুণ ছাওয়াব দেবেন। (তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৫৩৭)
আগে আগে নামাযে উপস্থিত হওয়া
আগে আগে নামাযে উপস্থিত হওয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে- وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِي التَّهْجِيرِ لاَسْتَبَقُوا إِلَيْهِ (এমনই ভাবে তারা যদি জানতো নামাযে আগে আগে আসার মধ্যে কী আছে, তবে তারা সেজন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো)। التَّهْجِيرِ শব্দটির উৎপত্তি الهاجرة থেকে। এর অর্থ দুপুর। মূল অর্থ যোহরের নামাযে দুপুরবেলা যাওয়া। অর্থাৎ আগে আগে যাওয়া। ব্যাপক অর্থে যে-কোনও নামাযে আউওয়াল ওয়াক্তে অর্থাৎ ওয়াক্ত শুরু হওয়া মাত্র যাওয়াকে التهجير বলা হয়। এর দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য ওয়াক্ত হওয়া মাত্র নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণ করা; নামায শুরু করে দেওয়া বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। কেননা বিভিন্ন হাদীছে সুস্পষ্টভাবেই বলা আছে, গরম কালে যোহরের নামায দেরি করে পড়া উত্তম। এমনিভাবে ফজরের নামায সারা বছরই খানিকটা ফরসা হয়ে ওঠার পর পড়া উত্তম।
নামাযের ওয়াক্ত হলে অবিলম্বে নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণ করা বন্দেগীসুলভ আচরণ। পাঁচ ওয়াক্তে পাঁচ নামায আল্লাহ তা'আলার ফরয বিধান। একজন সত্যিকার আল্লাহপ্রেমিক বান্দা আল্লাহর বিধান পালনে তৎপর থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে তাঁর হুকুম পালনের জন্য তৎপর ও অগ্রগামী হতে আদেশ করেছেন। এমনকি এ ক্ষেত্রে কে কার সামনে চলে যেতে পারে, সেজন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে উৎসাহিত করেছেন। অর্থাৎ এ প্রতিযোগিতা ও অগ্রগামিতা আল্লাহ তা'আলার পছন্দ। তিনি এতে সন্তুষ্ট হন। তিনি যে কাজে সন্তুষ্ট হন, তার প্রতিদানও যে তাঁর সন্তুষ্টি মোতাবেক হবে, তা বলাই বাহুল্য। সেজন্যই বলা হয়েছে নামাযে আগে আগে যাওয়ার ভেতর কী রয়েছে, তা জানতে পারলে মানুষ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো।
ইশা ও ফজরের জামাতে শামিল হওয়ার গুরুত্ব
তারপর ইশা ও ফজরের জামাতে শামিল হওয়া সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে- ولو يَعلَمونَ ما في العَتَمةِ والصُّبحِ لَأتَوهما ولو حَبوًا. (আর তারা যদি জানত এশা ও ফজরের নামাযে কী আছে, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাতে আসত)। অর্থাৎ ফজর ও ইশার নামায আদায় করার ছাওয়াব কত বেশি এবং আল্লাহ তা'আলা তাতে কত বেশি সন্তুষ্ট হন, তা জানতে পারলে যে ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না সেও এ দুই নামাযের জামাতে শামিল হতো, তাতে যতই কষ্ট হোক না কেন। এমনকি হামাগুড়ি দিয়ে হলেও মসজিদে চলে যেত।
এ দুই নামাযে অংশগ্রহণের একটা বড় দিক তো হলো এই যে, এতে নিজ দেহমনের উপর চাপ পড়ে। শরীর ক্লান্ত থাকে। থাকে ঘুমের চাপ। তাই ইশার নামাযে যেতে অলসতা লাগে। আবার সকাল বেলার ঘুম খুব আরামের। শরীর বিছানা ছাড়তে চায় না। মন চায় আরেকটু ঘুমাই। এ অবস্থায় বিছানা ছেড়ে ফজরের জামাতে শামিল হওয়া কষ্টের বৈ কি। এ কষ্ট সত্ত্বেও এ দুই নামাযের জামাতে শামিল হতে চাইলে অবশ্যই নফসের সঙ্গে মুজাহাদা করতে হয়। তাই এতে ছাওয়াবও বেশি হয়।
তাছাড়া এ দুই নামায তুলনামূলক বেশি রিয়ামুক্ত হয়। কেননা অন্যান্য ওয়াক্তের তুলনায় এ দুই ওয়াক্তে লোকজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কম হয়। নফস ও শয়তানের ওয়াসওয়াসায় অধিকাংশ লোকেরই ইবাদত-বন্দেগীতে রিয়া ঢুকতে চায়। মানুষ দেখুক আমি কতটা ইবাদতকারী, এরূপ মানসিকতা পেয়ে বসে। লোকদেখানোর এ মানসিকতা ইবাদতের প্রাণবস্তু নষ্ট করে দেয়। যেহেতু এ দুই ওয়াক্তে লোকজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কম হয়, তাই মানুষকে দেখানোর মনোভাবও এ দুই নামাযে কম থাকে। ফলে নামায তুলনামূলক বেশি নিখুঁত হয়। এ কারণে ছাওয়াবও বেশি হয়।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. আযান দেওয়া অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ একটি আমল। তাই প্রত্যেকেরই সহীহ-শুদ্ধভাবে আযান শেখা উচিত এবং আযান দেওয়ার আগ্রহ থাকা উচিত।
খ. নামাযে প্রথম কাতারে ছাওয়াব বেশি। তাই প্রথম কাতার পাওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা করা উচিত নয়।
গ. কোনও কোনও বিষয়ে লটারি দ্বারা মীমাংসা করা জায়েয আছে। আবার কোনও কোনও বিষয়ে জায়েয নেই। এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে ভালোভাবে জেনেই আমল করা উচিত।
ঘ. ওয়াক্ত হওয়া মাত্র নামাযের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
৪. আউওয়াল ওয়াক্তে মসজিদে যাওয়া উত্তম।
চ. ইশা ও ফজরের নামায অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ দুই নামাযের বেলায় তুলনামূলক বেশি সতর্ক থাকা উচিত, যাতে কোনও ক্রমেই কাযা না হয় বা জামাত ছুটে না যায়।
و يَعلَمُ النَّاسُ ما في النِّداءِ والصَّفِّ الأوَّلِ (লোকে যদি জানত আযান দেওয়ার ও প্রথম কাতারে কী আছে)। অর্থাৎ এ দু'টি আমলের কী ফযীলত, এর ছাওয়াব কত বেশি এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে কত বেশি পছন্দ-
ثُمَّ لَمْ يَجِدُوا إِلَّا أَنْ يَسْتَهِمُوا عَلَيْهِ لَاسْتَهَمُوا عَلَيْهِ (আর লটারি ধরা ছাড়া তা করার কোনও সুযোগ না পেত, তবে অবশ্যই সেজন্য লটারি ধরত)। অর্থাৎ ফযীলত জানার কারণে প্রত্যেকেই আযান দিতে চাইত এবং প্রত্যেকেই প্রথম কাতারে দাঁড়াতে চাইত। আবার আযান তো এমন কাজ নয়, যাতে সকলেই অংশ নিতে পারবে। এ কাজের জন্য যে-কোনও একজনই যথেষ্ট। আর সামনের কাতারের বেলায়ও এ সমস্যা স্বাভাবিকভাবেই দেখা দিতে পারে। স্থান যদি সংকীর্ণ হয় আর লোকসংখ্যা হয় বেশি, তখন সকলের পক্ষেই প্রথম কাতারে সুযোগ পাওয়া সম্ভব হয় না। অন্যদিকে ফযীলত জানার কারণে প্রত্যেকেই যেহেতু এর আগ্রহ রাখত, তাই প্রত্যেকে এ সুযোগ লাভের জন্য সবটা উপায়ও অবলম্বন করত। হয়তো শক্তিও ব্যবহার করত। ফলে ঝগড়া-ফাসাদ ও মারামারি লেগে যেত। শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান সম্ভব হতো না। হাঁ, শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপায় থাকত একটাই। আর তা হলো লটারির মাধ্যমে মীমাংসা করা। ব্যস লটারিতে যে জিতবে, সেই অগ্রাধিকার পাবে। হাদীছের শব্দ হলো اِسْتَهمُوا। এর উৎপত্তি اَلْاسْتِهَامُ থেকে। এর মূল হলো سهم (তির, অংশ)। সেকালে লটারি ধরা হতো তির দ্বারা। তিরে কখনও নাম লেখা থাকত, কখনও অংশ লেখা থাকত। সেই নাম বা সেই অংশ অনুযায়ী ফয়সালা হতো। পরবর্তীতে শব্দটি সাধারণভাবে যে-কোনও পদ্ধতির লটারির জন্যই ব্যবহৃত হতে থাকে।
আযানের জন্য এরূপ লটারি হযরত উমর ফারুক রাযি.-এর যমানায় করা হয়েছিল। বিখ্যাত সাহাবী হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রাযি. ছিলেন ইরান অঞ্চলীয় জিহাদসমূহের সেনাপতি। তাঁর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক কাদেসিয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে যখন বিজয় অর্জিত হয়, তখন ছিল যোহরের ওয়াক্ত। যুদ্ধে মুআযযিন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। এখন কে আযান দেবে? সকলের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে গেল। প্রত্যেকেই আযান দিতে চাইল। এমনকি সে প্রতিযোগিতা তরবারির যুদ্ধে রূপ নেওয়ার উপক্রম হলো। শেষে সেনাপতি হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রাযি. তাদেরকে শান্ত করতে সক্ষম হলেন। তিনি তাদের মধ্যে ফয়সালা করলেন লটারি দ্বারা। লটারিতে যে ব্যক্তি জিতল, তিনি তাকেই আযান দেওয়ার অনুমতি দিলেন।
লটারি কোন ক্ষেত্রে জায়েয, কোন ক্ষেত্রে জায়েয নয়
উল্লেখ্য, যখন কোনও অনির্ধারিত অধিকারের উপর একাধিক ব্যক্তি দাবিদার হয়, তখন লটারির মাধ্যমে অধিকার সাব্যস্ত করা জায়েয। এমনিভাবে একাধিক ব্যক্তির মালিকানাধীন কোনও যৌথ সম্পদ থাকলে এবং তার মূল্যমান সমান না হলে প্রথমে তার মূল্য নির্ধারণ করে ন্যায়সম্মত বণ্টন করা হবে, তারপর কার কোন অংশ তা নির্ধারণ করার জন্য লটারি করা যাবে। আযান ও ইমামতের বিষয়টা এরকমই। উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রেও এ নিয়ম প্রযোজ্য। অর্থাৎ উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে যাদের অংশ সমান, তাদের কে কোন অংশ পাবে, তা লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করা জায়েয।
যেসব ক্ষেত্রে কারও অধিকার নির্ধারিত থাকে, সে ক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে অন্য কাউকে তার উপর অগ্রাধিকার দেওয়া জায়েয নয়। এমনিভাবে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে যদি শরীয়ত-নির্ধারিত হিস্যা উপেক্ষা করা হয় এবং তারপর লটারির মাধ্যমে সে সম্পদ কটন করা হয়, তবে তাও জায়েয হবে না। কেননা তাতে শরীয়ত-নির্ধারিত অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়। যেমন কোনও ব্যক্তির একটি বাড়ি, একটি গাড়ি ও একটি দোকান আছে। তার ওয়ারিশ তিনজন। এক ছেলে দুই মেয়ে। এ ক্ষেত্রে 'মেয়ের দ্বিগুণ ছেলে'-শরীয়ত-নির্ধারিত এ নীতি উপেক্ষা করে লটারির মাধ্যমে তিন ওয়ারিশের মধ্যে উল্লিখিত তিনটি সম্পদ ভাগ করে দেওয়া কিছুতেই জায়েয হবে না। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত মাসায়েল উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ইদানীংকার প্রচলিত বেশিরভাগ লটারিতে জুয়ার উপাদান থাকে। জুয়া সম্পূর্ণ হারাম। তাই এসব লটারিতে শরীক হতে চাইলে তার আগে অবশ্যই বিজ্ঞ আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে হবে।
আযানের বহুবিধ কল্যাণ
আযানের সবচে' গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর দ্বারা তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত আযান গাফেল ও উদাসীনদের সচেতনকারী। যারা নানা কাজেকর্মে ব্যস্ত থেকে নামায সম্পর্কে অসচেতন হয়ে পড়ে, আযান দ্বারা তাদের সচেতন করা হয়, যেন তারা ওয়াক্তের দাবি পূরণে নামাযের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
আযান যিকিরকারীদের অনুপ্রেরণাদায়ী। আযান নিজেই এক শ্রেষ্ঠতম যিকির। যারা আযানের ধ্বনি শোনে, তারাও হুবহু আযানের বাক্যগুলো উচ্চারণ করে, ফলে মুআযযিনের মতো তারাও যিকিরকারী হয়ে যায়।
আযান নিজ ইসলামের নবায়নও বটে। কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ দ্বারা যেমন অমুসলিম ব্যক্তি মুসলিম হয়ে যায়, তেমনি মুসলিম ব্যক্তি এর উচ্চারণ দ্বারা নিজ ঈমান ও ইসলামকে নবায়ন করে। ফলে এ ব্যক্তি যখন নামাযে দাঁড়ায়, তখন তাজা ঈমান নিয়ে দাঁড়ায়। তখন তার অন্তরে নফস ও শয়তানের ঈমান সম্পর্কিত কোনও ওয়াসওয়াসা বা খটকা বাকি থাকে না। সে এক আলোকিত ও নূরানী অন্তর নিয়ে আল্লাহর অভিমুখী হয়।
এছাড়াও আযানের ভেতর আরও বহুবিধ কল্যাণ রয়েছে, যা সামনের হাদীছগুলোতে আসবে। এতসব কল্যাণ আযানের মধ্যে নিহিত রয়েছে। তাই হাদীছটিতে নির্দিষ্ট কোনও ফায়দার কথা না বলে সাধারণভাবে বলা হয়েছে 'মানুষ যদি জানত আযানের মধ্যে কী আছে'। অর্থাৎ এর ফায়দা অনেক বেশি। সুতরাং তোমরা আযান দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করো।
প্রথম কাতারের ফযীলত
জামাতের প্রথম কাতার অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এর রয়েছে প্রচুর কল্যাণ ও বরকত। এ কাতার ইমামের সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী। ইমাম মুসল্লীদের নামাযের নেতৃত্ব দানকারী। নেতার পাশাপাশি থাকাটা এমনিই মর্যাদাপূর্ণ। তদুপরি এ কাতারে শামিল হতে চাইলে মসজিদে আগে আগে আসতে হয়। মসজিদে আগে আসাটা ফযীলতপূর্ণ কাজ।
ইমামের যত বেশি কাছে থাকা যায়, তত বেশি স্পষ্টভাবে তার কিরাআত শোনা যায়। তার দেখাদেখি নামাযের পদ্ধতি ও নামাযের মাসায়েল শেখা যায়। কারণ ইমামের সবটা কাজ ও সবটা অবস্থাই তার সামনে স্পষ্ট থাকে। তাছাড়া ইমামের কোনও ভুল হলে তার কাছের লোকের পক্ষেই সে ভুল সম্পর্কে তাকে সচেতন করা সহজ হয়।
আগে আগে এসে প্রথম কাতারে স্থান নিতে পারলে অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকেও বাঁচা যায়। যারা পরে এসে সামনে যেতে চায়, তারা মানুষের কাঁধ ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে অগ্রসর হয়। ফলে মানুষকে কষ্ট দেওয়া হয়। হাদীছে এটা সুস্পষ্টভাবেই নিষেধ করা হয়েছে।
এমনিভাবে যে ব্যক্তি ইমামের কাছে থাকে, সে সরাসরি ইমামকে দেখে দেখে নিজ নামায আদায় করে। যারা আরও পেছনে থাকে, তারা সামনের ব্যক্তির অনুসরণ করে। এভাবে প্রথম কাতারের ব্যক্তি পরবর্তী কাতারের লোক ও ইমামের মাঝখানে মধ্যস্থতাকারীর মতো হয়ে যায়। ফলে তার পেছনে নামায আদায়কারীদের ছাওয়াবের অনুরূপ ছাওয়াব তার আমলনামায়ও যুক্ত হয়।
এতসব কল্যাণ প্রথম কাতারে নিহিত রয়েছে। তাই হাদীছটিতে সাধারণভাবে বলা হয়েছে 'মানুষ যদি জানত প্রথম কাতারে কী আছে'। অর্থাৎ ফায়দা যেহেতু অনেক বেশি, তাই নির্দিষ্ট কোনও একটির কথা না বলে বরং প্রচ্ছন্নভাবে সবগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে দেওয়া হয়েছে। প্রথম কাতারের ফযীলত সম্পর্কে বহু হাদীছ বর্ণিত আছে। যেমন হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে-
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ صُفُوفِ الرِّجَالِ أَوَّلُهَا وَشَرُّهَا آخِرُهَا وَخَيْرُ صُفُوفِ النِّسَاءِ آخِرُهَا وشرها أَولهَا.
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, পুরুষদের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কাতার হলো প্রথম কাতার আর তাদের সর্বাপেক্ষা মন্দ কাতার হলো পেছনের কাতার। মহিলাদের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কাতার পেছনের কাতার আর তাদের সর্বাপেক্ষা মন্দ কাতার সামনের কাতার। (সহীহ মুসলিম: ৪৪০; সুনানে আবূ দাউদ: ৬৭৮; জামে তিরমিযী: ২২৪; সুনানে নাসাঈ: ৮২০; সুনানে ইবন মাজাহ ১০০১; মুসনাদে আহমাদ ৭৩৫৬; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩৮০৭; মুসনাদুল হুমায়দী: ১০৩০; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৫১১০; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৭৬৯২)
অর্থাৎ পুরুষেরা পেছনের কাতারে দাঁড়াবে না। কেননা তাতে তারা মহিলাদের পেছনে পড়ে যাবে। আর নারীরা সামনের কাতারে দাঁড়াবে না। কেননা তাতে তাদের পুরুষদের সামনে দাঁড়ানো হবে। এটা নারী-পুরুষ উভয়ের পক্ষেই ফিতনা। তাতে নামাযের মনোযোগ বিনষ্ট হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। যথেষ্ট আশঙ্কা থাকে গুনাহে লিপ্ত হওয়ারও। সুতরাং সর্বাপেক্ষা সামনের কাতার ফযীলতের বটে, তবে তা পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট। এর মানে মহিলাদের ছাওয়াব থেকে বঞ্চিত থাকা নয়। ছাওয়াব তো পাওয়া যায় শরীয়তের হুকুম মানার দ্বারা। কাজেই হাদীছের নির্দেশনা মোতাবেক মহিলাগণ সামনের কাতারে না দাঁড়িয়ে পেছনের কাতারে দাঁড়ালেই বেশি ছাওয়াব পাবে।
হযরত জাবির ইবন সামুরা রাযি. থেকে বর্ণিত হাদীছে আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
أَلَا تَصُفُّونَ كَمَا تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا؟» فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا؟ قَالَ: «يُتِمُّونَ الصُّفُوفَ الْأُولَى وَيَتَرَاصُّونَ فِي الصَّف
'তোমরা কি ঠিক সেরকম কাতারবদ্ধ হবে না, যেমন কাতারবদ্ধ হয় ফিরিশতাগণ?
সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। ফিরিশতাগণ কীভাবে কাতারবদ্ধ হয়? তিনি বললেন, তারা প্রথমে সামনের কাতার পূর্ণ করে। আর তারা পরস্পর মিশে মিশে দাঁড়ায়। (সহীহ মুসলিম: ৪৩০; সুনানে আবু দাউদ: ৬৬১৮; সুনানে নাসাঈ: ৮১৬; সুনানে ইবন মাজাহ : ৯৯১; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩৫৩৯; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ২৪৩২; মুসনাদুল বাযযার: ৪২৮৯; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৭৪৭৪; সহীহ ইবন খুযায়মা: ১৫৪৪; সহীহ ইবন হিব্বান: ২১৫৪)
হযরত বারা ইবন আযিব রাযি. বলেন-
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُ : إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى الصَّفِ الْأَوَّلِ.
'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা'আলা প্রথম কাতারের উপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতাগণ প্রথম কাতারের জন্য রহমতের দু'আ করেন। (সুনানে ইবন মাজাহ ৯৯৭; সুনানে নাসাঈ ৬৪৬; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩৮০৩; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ২৪৩১; মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী ৭৭৭; মুসনাদুল বাযযার: ৩২২৪; সহীহ ইবন খুযায়মা ১৫৫৭; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ১৮৮৪; সহীহ ইবন হিব্বান: ২১৫৭)
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বলেন-
اسْتَغْفَرَ رَسُولُ اللهِ ﷺ لِلصَّفِ الْأَوَّلِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، وَلِلصَّفِ الثَّانِي مَرَّتَيْنِ، وَالثَّالِثِ مَرَّةً.
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম কাতারের জন্য তিনবার মাগফিরাতের দু'আ করেছেন। দ্বিতীয় কাতারের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করেছেন দুবার। আর তৃতীয় কাতারের জন্য একবার। (তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৮৮১৯)
প্রথম কাতারে পৌঁছার জন্য অন্যকে কষ্ট না দেওয়া
প্রথম কাতারের জন্য এতসব ফযীলত হাদীছসমূহে বর্ণিত হয়েছে। তবে সবকিছুরই আদব আছে। আদব ইসলামী শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাতারে অংশগ্রহণের একটি আদব হলো মানুষকে ডিঙিয়ে সামনে না যাওয়া। কেননা তাতে মানুষ কষ্ট পায়। তাই পরে এসে নির্দোষভাবে সামনে যাওয়ার সুযোগ না হলে সামনে যাবে না। পেছনে যেখানে স্থান পাওয়া যায়, সেখানেই দাঁড়াবে। মানুষকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থেকে পেছনের কাতারে দাঁড়ালে বরং আরও বেশি ছাওয়াব পাওয়া যাবে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
من ترك الصفَّ الأولَ مخافةَ أن يُؤذيَ أحدًا، أضعفَ اللهُ له أجرَ الصفِّ الأوَّلِ.
'মানুষকে কষ্ট দেওয়া হতে পারে এই আশঙ্কায় যে ব্যক্তি প্রথম কাতারে যাওয়া হতে বিরত থাকবে, তাকে আল্লাহ তা'আলা প্রথম কাতারের দ্বিগুণ ছাওয়াব দেবেন। (তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৫৩৭)
আগে আগে নামাযে উপস্থিত হওয়া
আগে আগে নামাযে উপস্থিত হওয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে- وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِي التَّهْجِيرِ لاَسْتَبَقُوا إِلَيْهِ (এমনই ভাবে তারা যদি জানতো নামাযে আগে আগে আসার মধ্যে কী আছে, তবে তারা সেজন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো)। التَّهْجِيرِ শব্দটির উৎপত্তি الهاجرة থেকে। এর অর্থ দুপুর। মূল অর্থ যোহরের নামাযে দুপুরবেলা যাওয়া। অর্থাৎ আগে আগে যাওয়া। ব্যাপক অর্থে যে-কোনও নামাযে আউওয়াল ওয়াক্তে অর্থাৎ ওয়াক্ত শুরু হওয়া মাত্র যাওয়াকে التهجير বলা হয়। এর দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য ওয়াক্ত হওয়া মাত্র নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণ করা; নামায শুরু করে দেওয়া বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। কেননা বিভিন্ন হাদীছে সুস্পষ্টভাবেই বলা আছে, গরম কালে যোহরের নামায দেরি করে পড়া উত্তম। এমনিভাবে ফজরের নামায সারা বছরই খানিকটা ফরসা হয়ে ওঠার পর পড়া উত্তম।
নামাযের ওয়াক্ত হলে অবিলম্বে নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণ করা বন্দেগীসুলভ আচরণ। পাঁচ ওয়াক্তে পাঁচ নামায আল্লাহ তা'আলার ফরয বিধান। একজন সত্যিকার আল্লাহপ্রেমিক বান্দা আল্লাহর বিধান পালনে তৎপর থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে তাঁর হুকুম পালনের জন্য তৎপর ও অগ্রগামী হতে আদেশ করেছেন। এমনকি এ ক্ষেত্রে কে কার সামনে চলে যেতে পারে, সেজন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে উৎসাহিত করেছেন। অর্থাৎ এ প্রতিযোগিতা ও অগ্রগামিতা আল্লাহ তা'আলার পছন্দ। তিনি এতে সন্তুষ্ট হন। তিনি যে কাজে সন্তুষ্ট হন, তার প্রতিদানও যে তাঁর সন্তুষ্টি মোতাবেক হবে, তা বলাই বাহুল্য। সেজন্যই বলা হয়েছে নামাযে আগে আগে যাওয়ার ভেতর কী রয়েছে, তা জানতে পারলে মানুষ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো।
ইশা ও ফজরের জামাতে শামিল হওয়ার গুরুত্ব
তারপর ইশা ও ফজরের জামাতে শামিল হওয়া সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে- ولو يَعلَمونَ ما في العَتَمةِ والصُّبحِ لَأتَوهما ولو حَبوًا. (আর তারা যদি জানত এশা ও ফজরের নামাযে কী আছে, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাতে আসত)। অর্থাৎ ফজর ও ইশার নামায আদায় করার ছাওয়াব কত বেশি এবং আল্লাহ তা'আলা তাতে কত বেশি সন্তুষ্ট হন, তা জানতে পারলে যে ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না সেও এ দুই নামাযের জামাতে শামিল হতো, তাতে যতই কষ্ট হোক না কেন। এমনকি হামাগুড়ি দিয়ে হলেও মসজিদে চলে যেত।
এ দুই নামাযে অংশগ্রহণের একটা বড় দিক তো হলো এই যে, এতে নিজ দেহমনের উপর চাপ পড়ে। শরীর ক্লান্ত থাকে। থাকে ঘুমের চাপ। তাই ইশার নামাযে যেতে অলসতা লাগে। আবার সকাল বেলার ঘুম খুব আরামের। শরীর বিছানা ছাড়তে চায় না। মন চায় আরেকটু ঘুমাই। এ অবস্থায় বিছানা ছেড়ে ফজরের জামাতে শামিল হওয়া কষ্টের বৈ কি। এ কষ্ট সত্ত্বেও এ দুই নামাযের জামাতে শামিল হতে চাইলে অবশ্যই নফসের সঙ্গে মুজাহাদা করতে হয়। তাই এতে ছাওয়াবও বেশি হয়।
তাছাড়া এ দুই নামায তুলনামূলক বেশি রিয়ামুক্ত হয়। কেননা অন্যান্য ওয়াক্তের তুলনায় এ দুই ওয়াক্তে লোকজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কম হয়। নফস ও শয়তানের ওয়াসওয়াসায় অধিকাংশ লোকেরই ইবাদত-বন্দেগীতে রিয়া ঢুকতে চায়। মানুষ দেখুক আমি কতটা ইবাদতকারী, এরূপ মানসিকতা পেয়ে বসে। লোকদেখানোর এ মানসিকতা ইবাদতের প্রাণবস্তু নষ্ট করে দেয়। যেহেতু এ দুই ওয়াক্তে লোকজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কম হয়, তাই মানুষকে দেখানোর মনোভাবও এ দুই নামাযে কম থাকে। ফলে নামায তুলনামূলক বেশি নিখুঁত হয়। এ কারণে ছাওয়াবও বেশি হয়।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. আযান দেওয়া অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ একটি আমল। তাই প্রত্যেকেরই সহীহ-শুদ্ধভাবে আযান শেখা উচিত এবং আযান দেওয়ার আগ্রহ থাকা উচিত।
খ. নামাযে প্রথম কাতারে ছাওয়াব বেশি। তাই প্রথম কাতার পাওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা করা উচিত নয়।
গ. কোনও কোনও বিষয়ে লটারি দ্বারা মীমাংসা করা জায়েয আছে। আবার কোনও কোনও বিষয়ে জায়েয নেই। এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে ভালোভাবে জেনেই আমল করা উচিত।
ঘ. ওয়াক্ত হওয়া মাত্র নামাযের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
৪. আউওয়াল ওয়াক্তে মসজিদে যাওয়া উত্তম।
চ. ইশা ও ফজরের নামায অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ দুই নামাযের বেলায় তুলনামূলক বেশি সতর্ক থাকা উচিত, যাতে কোনও ক্রমেই কাযা না হয় বা জামাত ছুটে না যায়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)