রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০৩২
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
ওযূর ফযীলত: ওযূর দু'আ ও তার ফযীলত
১০৩২. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই ওযূ করে এবং সে ওযূ করে পরিপূর্ণরূপে, তারপর বলে- أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُه (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই। এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল), তার জন্য জান্নাতের আটও দরজা খুলে দেওয়া হয়। সে তার যেটি দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২৩৪; সুনানে আবু দাউদ: ১৬৯; সুনানে ইবন মাজাহ: ৪১৯; সহীহ ইবন খুযায়মা: ২২২; সহীহ ইবন হিব্বান: ১০৫০; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৩৬৮)

তিরমিযীর বর্ণনায় (দু'আটিতে) অতিরিক্ত আছে- اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ (হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন)। (জামে' তিরমিযী: ৫৫; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৪৮৯৫)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1032 - وعن عمر بن الخطاب - رضي الله عنه - عن النبيِّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «مَا مِنْكُمْ مِنْ أحَدٍ يَتَوَضَّأُ فَيُبْلغُ - أَوْ فَيُسْبِغُ - الوُضُوءَ، ثُمَّ يقول: أشهَدُ أَنْ لا إلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، وَأشْهَدُ أنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ؛ إِلاَّ فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ الجَنَّةِ الثَّمَانِيَةُ يَدْخُلُ مِنْ أَيِّهَا شَاءَ». رواه مسلم. (1)
وزاد الترمذي: «اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ، وَاجْعَلْنِي مِنَ المُتَطَهِّرِينَ».

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: مسلم 1/ 144 (234) (17)، والترمذي (55).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছের মূল বিষয়বস্তু তিনটি- সুন্দরভাবে ওযূ করা, ওযূর পর ওযূর দু'আ পড়া এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে এ আমলের পুরস্কার। সুন্দরভাবে ওযূ করা সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ يَتَوَضَّأُ فَيُبْلِغُ - أَوْ فَيُسْبِغُ - الْوَضُوءَ (তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই ওযূ করে এবং সে ওযূ করে পরিপূর্ণরূপে)। অর্থাৎ প্রয়োজন পরিমাণ পানি ব্যবহার করে, প্রত্যেক অঙ্গ ভালোভাবে ধৌত করে এবং ওযূর ফরযসমূহ আদায়ের পর সুন্নত ও মুস্তাহাবসমূহও পূরণ করে। এভাবে ওযূ করলে সে ওযূ হয় পরিপূর্ণ। তারপর কী দু'আ পড়তে হবে, সে সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-

أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُ

(আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই। এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল)। তিরমিযী শরীফের বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে-

اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ (হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন)। সুতরাং তিরমিযী শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী দু'আটির পরিপূর্ণ রূপ হলো-

أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُ اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ

দু'আটির প্রথম অংশ হলো কালেমায়ে শাহাদাত। এর দ্বারা ওযূকারী আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে নিজ ঈমানের ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে সে নিজ ঈমান তাজা করে এবং ঈমানকে শক্তিশালী করে তোলে।

দু'আটির দ্বিতীয় অংশে আছে আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'টি প্রার্থনা। এক প্রার্থনা হলো তাওবা সম্পর্কে, যেন আল্লাহ তা'আলা তাকে বেশি বেশি তাওবা করার তাওফীক দেন, যাতে ওযূর মাধ্যমে যেমন তার দৈহিক পবিত্রতা অর্জিত হয়, তেমনি তাওবা দ্বারা গুনাহমাফির মাধ্যমে আত্মিক পবিত্রতাও অর্জিত হয়।

দ্বিতীয় প্রার্থনা হলো সাধারণভাবে পাক-পবিত্রতা সম্পর্কে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তা'আলা যেন তাকে সর্বপ্রকার পবিত্রতা অর্জনে সচেষ্ট রাখেন। জাহিরী ও বাতেনী সর্বপ্রকার পবিত্রতা রক্ষায় মনোযোগী থাকার তাওফীক দান করেন। ওযূ-গোসল, তাওবা-ইস্তিগফার, তাকওয়া-পরহেযগারি, ইখলাস ও আল্লাহমুখিতা সবই এ সাধারণ পবিত্রতার অন্তর্ভুক্ত।

উল্লেখ্য, এখানে হাদীছটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিস্তারিত বর্ণনা খুবই চমৎকার ও হৃদয়গ্রাহী। বিস্তারিত সে বর্ণনা নিম্নরূপ।

হযরত উকবা ইবন আমি রাযি. বর্ণনা করেন, আমরা নিজেরা নিজেদের কাজ করতাম। পালাক্রমে উট চরাতাম। একবারকার কথা। আমার উট চরানোর পালা আসল। আমি উট চরাতে থাকলাম। সন্ধ্যাবেলা আমি সেগুলো নিয়ে ফিরে আসলাম। এসে দেখি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে মানুষের সামনে বক্তব্য রাখছেন। আমি তাঁর বক্তব্যের যে অংশ পেয়েছিলাম, তা ছিল এরকম যে, তিনি বলছিলেন-

مَا مِنكُمْ مِنْ أَحَدٍ يَتَوَضَّأَ ، فَيَبْلُغُ الْوُضُوءَ، ثُمَّ يَقُومُ فَيَرْكَعُ رَكْعَتَيْنِ يُقْبِلُ عَلَيْهِمَا بِقَلْبِهِ وَوَجْهِهِ إِلَّا وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ وَغُفِرَ لَهُ.

'তোমাদের মধ্যে যে-কেউ পরিপূর্ণরূপে ওযূ করে, তারপর উঠে দু'রাকাত নামায গড়ে, যে নামাযে সে শরীর-মনে অভিনিবিষ্ট থাকে, তার জন্য জান্নাত নিশ্চিত হয়ে যায় এবং তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।'

হযরত উকবা রাযি. বলেন, আমি বলে উঠলাম- مَا أَجْوَدَ هَذَا؟ (কী উত্তম কথা!) আমার এ মন্তব্য শুনে সামনের এক ব্যক্তি বলল, হে উকবা! এর আগের কথাটি ছিল আরও বেশি সুন্দর।

উকবা রাযি. বলেন, আমি লক্ষ করে দেখলাম তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব। বললাম, হে আবু হাফস (এটি হযরত উমর রাযি.-এর উপনাম)। সে কথাটি কী? তিনি বললেন, তুমি আসার আগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

ما مِنكُمْ من أَحَدٌ يَتَوَضَّأُ فَيَبْلُغُ الْوُضُوءَ فَيَقُولُ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ ، إِلَّا فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ الثَّمَانِيَةُ يَدْخُلُ مِنْ أَيُّهَا شَاءَ.

'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই ওযূ করে এবং সে ওযূ করে পরিপূর্ণরূপে, তারপর أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই। এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল), তার জন্য জান্নাতের আটও দরজা খুলে দেওয়া হয়। সে তার যেটি দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে। (সুনানে আবু দাউদ: ১৬৯: বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ২৪৯৮)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. ওযূ করতে হবে খুব যত্নের সঙ্গে পরিপূর্ণরূপে।

খ. ওযূর পর হাদীছে বর্ণিত দু'আটি মনোযোগের সঙ্গে পড়তে হবে। দু'আটির অর্থও জেনে নেওয়া চাই।

গ. জান্নাতের আটটি দরজা আছে। উত্তমরূপে ওযূ করা এবং তারপর এ দু'আটি পড়ার দ্বারা তার যে-কোনও দরজা দিয়ে প্রবেশ করার এখতিয়ার লাভ হবে।

ঘ. তাওবা করা অত্যন্ত জরুরি আমল। যতবেশি সম্ভব এটা করা উচিত।

ঙ. দৈহিক ও আত্মিক উভয় রকম পাক-পবিত্রতা অর্জনে সচেষ্ট থাকা দীনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান