রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ
৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
হাদীস নং: ১০২৩
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
কুরআনপাঠের উদ্দেশ্যে লোকজন একত্র হওয়া: কোথাও একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত ও কুরআন বোঝার চেষ্টা করা
১০২৩. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহর কোনও ঘরে লোকজন একত্র হয়ে যদি আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং নিজেদের মধ্যে তার পাঠচক্র করে, তবে তাদের উপর অবশ্যই সাকীনা নাযিল হয়, রহমত তাদেরকে ঢেকে ফেলে, ফিরিশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে এবং আল্লাহ তাঁর কাছে যারা আছে তাদের সামনে তাদের কথা উল্লেখ করেন। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম : ২৬৯৯; সুনানে আবূ দাউদ: ১৪৫৫; জামে তিরমিযী: ২৪৯৫; সুনানে ইবন মাজাহ: ২২৫; মুসনাদে আহমাদ: ৭৪২১; সুনানে দারিমী: ৩৬৮; মুসনাদুল বাযযার। ৯১২৭: মুসনাদুল বাযযার: ৯১২১; শু'আবূল ঈমান ১৫৭২; সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৬৮; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১২৭)
كتاب الفضائل
باب استحباب الاجتماع عَلَى القراءة
1023 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رسول الله - صلى الله عليه وسلم: «وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ يَتلُونَ كِتَابَ اللهِ، وَيَتَدَارَسُونَهُ بينهم، إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيتْهُمُ الرَّحْمَةُ، وَحَفَّتْهُمُ المَلاَئِكَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ». رواه مسلم. (1)
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
__________
(1) أخرجه: مسلم 8/ 71 (2699) (38).
হাদীসের ব্যাখ্যা:
কুরআন মাজীদ আল্লাহ তা'আলার কালাম। এটা মানুষের হিদায়াতগ্রন্থ ও জীবন গঠনের মূলমন্ত্র। এ নূর ও বরকতে পরিপূর্ণ এক কিতাব। এ গ্রন্থ বেশি বেশি পড়া দরকার। সাধ্যমতো বুঝতে চেষ্টা করা ও এর মর্মবাণী আহরণের সাধনা অব্যাহত রাখাও জরুরি। মুমিনগণ যাতে এ কিতাব বেশি বেশি পড়ে এবং এর হিদায়াত ও শিক্ষার চর্চা করে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি এর বিপুল ফযীলতও বর্ণনা করেছেন।
আলোচ্য হাদীছটিতে কুরআন মাজীদ কেন্দ্রিক দু'টি কাজের কথা বলা হয়েছে। এক হলো এর তিলাওয়াত, আর দ্বিতীয় হলো এর অর্থ ও মর্ম অনুধাবন। হাদীছটিতে এ উভয় কাজই দলবদ্ধভাবে করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتِ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللهِ (আল্লাহর কোনও ঘরে লোকজন একত্র হয়ে যদি আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে)। সরাসরি আল্লাহর ঘর বলতে মসজিদকে বোঝায়। তবে ব্যাপকার্থে বাসগৃহও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ইসলামের শুরুদিকে কুরআন শিক্ষার সর্বাপেক্ষা উত্তম জায়গা ছিল মসজিদ। সাহাবায়ে কেরামের অধিকাংশই অসচ্ছল ছিলেন। তাদের পক্ষে নিজ বাড়িতে দলবদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ ছিল না। কালক্রমে মানুষের সচ্ছলতা বেড়েছে। বাসগৃহের বাইরেও মেহমানদের জন্য সাধারণত আলাদা ঘর থাকে। তাই এখন নিজ নিজ বাড়িতেও কুরআন শিক্ষার আয়োজন করা সহজ। মূল উদ্দেশ্য কুরআন শিক্ষা করা। যে-কোনও সুবিধাজনক স্থানই এর জন্য বেছে নেওয়া যেতে পারে। উদ্দেশ্য পূর্ণ হওয়াই আসল কথা। কাজেই মসজিদে, মাদরাসায়, দোকান-ঘরে, হোটেলে, কাছারি ঘরে, গাছতলায়, খোলা মাঠে যেখানেই কুরআনের পঠন-পাঠন সম্ভব, সেখানেই এর আয়োজন করা যেতে পারে এবং তাতে অবশ্যই হাদীছে বর্ণিত ফযীলত হাসিল হবে বলে আশা করা যেতে পারে। হাঁ, মসজিদ আল্লাহর ঘর হিসেবে উত্তম স্থান হওয়ায় এখানে সে ফযীলত হাসিলের সম্ভাবনা খানিকটা বেশি থাকবে বৈ কি।
হাদীছটিতে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য দলবদ্ধ আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝা যায় কুরআন তিলাওয়াতের জন্য একাধিক লোকের একত্র হওয়াটা পছন্দনীয়। কেননা তাতে অলসতা কাটে, অন্যের দেখাদেখি নিজেরও তিলাওয়াতের উৎসাহ জাগে এবং বেশিক্ষণ সে উৎসাহ ধরে রাখাও সম্ভব হয়। তাছাড়া অন্যের তিলাওয়াত শুনে নিজের তিলাওয়াত শুদ্ধ করারও সুযোগ হয়।
হাদীছটি দ্বারা বোঝা যায় কুরআন মাজীদের কেবল তিলাওয়াত করাটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। অর্থ না বুঝে তিলাওয়াত করলেও অবশ্যই ছাওয়াব পাওয়া যায়।
যে ব্যক্তি নিজে তিলাওয়াত করতে জানে না, সে যদি অন্যের তিলাওয়াত শোনে, তাতেও ছাওয়াবের অধিকারী হয়।
وَيَتَدَارَسُوْنَهُ يَبْنَهُمْ (এবং নিজেদের মধ্যে তার পাঠচক্র করে)। بَتَدَارَسُوْنَ ক্রিয়াপদটির উৎপত্তি المُدارة থেকে। শব্দটি ব্যাপক মর্ম ধারণ করে। যেমন অর্থ বোঝা, বিষয়বস্তুর মধ্যে চিন্তাভাবনা করা, ভাষার ভেতর নিহিত তত্ত্ব ও তথ্য উদ্ঘাটন করা, বিধানাবলি আহরণ করা ইত্যাদি। কুরআন মাজীদ মূলত হিদায়াতগ্রন্থ। আখিরাতে মুক্তির লক্ষ্যে একজন বান্দার দুনিয়ায় কীভাবে জীবনযাপন করতে হবে, কুরআন তার পথ দেখায়। অর্থ বোঝা ও বিষয়বস্তুর মধ্যে চিন্তাভাবনা করার দ্বারা বান্দা সে পথের সন্ধান পায়। এ চিন্তাভাবনার যদিও বিভিন্ন স্তর রয়েছে, যার সর্বাপেক্ষা উচ্চস্তর হলো ফকীহগণের গবেষণামূলক কর্মপ্রক্রিয়া, তবে কুরআনের অর্থ বোঝাটাও কম গুরুত্ব বহন করে না। অর্থ বোঝাটা কুরআনী উপদেশ গ্রহণের জন্য বিশেষ সহায়ক। সুতরাং المدارسة এর কাজটি অত্যন্ত মহিমাপূর্ণ। তারপর নিজ হিম্মত জাগ্রত করে যদি অর্থের ভেতর চিন্তাভাবনা করা যায়, তবে তা বড়ই সৌভাগ্যের কথা। কুরআন মাজীদ তার বিভিন্ন আয়াতে মানুষকে এর প্রতি উৎসাহিতও করেছে। যেমন ইরশাদ হয়েছে-
كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ
'(হে রাসূল!) এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতের মধ্যে চিন্তা করে এবং যাতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে। সূরা সোয়াদ, আয়াত ২৯
এ কাজটি একাকীও করা যেতে পারে, তবে সংঘবদ্ধভাবে করার ফায়দা বেশি। একটি আয়াত পাঠ করা হলো। তারপর সবাই মিলে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে থাকল। প্রত্যেকে নিজ নিজ অভিমত প্রকাশ করল। তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করা হলো। এভাবে যদি পাঠচক্র করা হয়, তবে একেক আয়াত থেকে অকল্পনীয় মণিমুক্তা উদ্ঘাটিত হতে পারে। কুরআনের একেক আয়াতে জ্ঞানতত্ত্বের সাগর ঠাসা। যতই চিন্তা করা হবে, ততই নতুন নতুন তত্ত্ব আহরিত হবে। একাকী করলেও তা হবে, তবে বহুজন মিলে করার দ্বারা অর্জন যে অনেক বেশি হবে এবং তা অনেক নিখুঁতও হবে, তা বলাই বাহুল্য। হাদীছটি তারই প্রতি আমাদের উৎসাহদান করছে।
একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত ও কুরআনের পাঠচক্র করার চারটি ফায়দা
আলোচ্য হাদীছের বক্তব্যমতে কোনও স্থানে একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করলে এবং কুরআন বোঝার চেষ্টায় মশগুল হলে চারটি ফায়দা পাওয়া যায়। যথা-
এক. إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ (তবে তাদের উপর অবশ্যই সাকীনা নাযিল হয়।) শব্দটির উৎপত্তি سُكُوّن থেকে। এর অর্থ শান্তি, স্থিরতা, ধীরশান্ত অবস্থা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাচ্ছেন, সম্মিলিতভাবে কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত করলে ও তার অর্থ-মর্মের মধ্যে চিন্তাভাবনা করলে আল্লাহ তা'আলা সাকীনা নাযিল করেন অর্থাৎ যারা এ কাজে রত থাকে, তাদের অন্তরে প্রশান্তি জোগান। ফলে তাদের সব ভয়-ভীতি কেটে যায়, পেরেশানি দূর হয়ে যায়, সংশয়-সন্দেহের অবসান ঘটে, অন্তরে হিম্মত ও সৎ সাহস জন্ম নেয়, প্রতিকূল সব পরিবেশে দৃঢ়তা ও অবিচলতা সৃষ্টি হয়।
সুতরাং দুনিয়ার নানা পেরেশানিতে যারা অস্থির, শান্তির সন্ধানে যারা দিগ্ভ্রান্ত হয়ে কখনও এদিকে কখনও ওদিকে ছুটছে, তাদের উচিত সবকিছু থেকে বিমুখ হয়ে কুরআন মাজীদ আঁকড়ে ধরা। তারা যদি কুরআনের মজলিসে হাজির হয়, কুরআনের পাঠচক্রে অংশগ্রহণ করে ও তাফসীর মাহফিলে শরীক হয়, তবে সর্বপ্রকার পেরেশানি থেকে মুক্তি পেয়ে সত্যিকারের শান্তি তাদের নসীব হবে। বিশেষত ভ্রান্ত মতবাদ ও কুচিন্তা যাদের মনে খটকা সৃষ্টি করে এবং শয়তানি ওয়াসওয়াস যাদের আকীদা-বিশ্বাসে চিড় ধরাতে চায়, তাদের জন্য কুরআন পাঠ ও কুরআনভিত্তিক মজলিসসমূহই শ্রেষ্ঠতম অবলম্বন।
দুই. وَغَشِيتُهُمُ الرَّحْمَةُ (রহমত তাদেরকে ঢেকে ফেলে)। আল্লাহু আকবার! কুরআনী মজলিসের কী বিশাল কল্যাণ। এরূপ মজলিসে হাজির থাকার দ্বারা আল্লাহর রহমতের চাদরে আবৃত হওয়া যায়। আল্লাহ তা'আলার রহমত ও দয়ার দ্বারাই মানুষ দোজাহানের মুক্তি পেতে পারে। যা-কিছু নেক আমল, তা রহমত লাভেরই অসিলাস্বরূপ। অসীম অফুরন্ত রহমতের মালিক আল্লাহ তা'আলার কাছে যে ব্যক্তি রহমত পেতে চায়, আলোচ্য হাদীছ আহ্বান জানায় সে যেন মন দিয়ে কুরআন পড়ে। যেন নিয়মিত কুরআনের মজলিসে হাজির হয়।
তিন. وَحَفَّتْهُمْ الْمَلَائِكَة (ফিরিশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে)। ফিরিশতাদের একটি দল আছে, যারা দিনে-রাতে পালাক্রমে দুনিয়ায় আসা-যাওয়া করে। তারা আল্লাহর বান্দাদের কাজকর্ম পরিদর্শন করে। তারপর ফিরে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার কাছে রিপোর্ট করে যে, কাকে কী অবস্থায় দেখেছে। এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِنَّ لِلَّهِ مَلاَئِكَةً سَيَّاحِينَ فِي الأَرْضِ فَضْلاً عَنْ كُتَّابِ النَّاسِ فَإِذَا وَجَدُوا أَقْوَامًا يَذْكُرُونَ اللَّهَ تَنَادَوْا هَلُمُّوا إِلَى بُغْيَتِكُمْ فَيَجِيئُونَ فَيَحُفُّونَ بِهِمْ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا
'যারা মানুষের আমল লিপিবদ্ধ করে, তারা ছাড়াও আল্লাহ তা'আলার এমন কিছু ফিরিশতা আছে, যারা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে। তারা যখন এমন লোক সমষ্টি দেখতে পায়, যারা আল্লাহ তা'আলার যিকির করে, তখন তারা একে অন্যকে ডেকে বলে, এসো তোমাদের কাঙ্ক্ষিত স্থানে। তারা সেখানে চলে আসে এবং আসমান পর্যন্ত তাদেরকে ঘিরে ফেলে... জামে' তিরমিযী: ৩৬০০; মুসনাদে আহমাদ: ৭৪১৮; মুসনাদুল বাযযার ৯১৪৮: বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ৪৪৪
তো যারা সম্মিলিতভাবে কুরআন পড়ে এবং কুরআনের অর্থ-মর্ম অনুধাবনের চেষ্টা করে, তাদের মজলিস যখন সে ফিরিশতাদের নজরে আসে, তখন তারা সেখানে দাঁড়িয়ে যায়। তারা সে মজলিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আল্লাহ তা'আলার কালামের মর্যাদায় সে মজলিসকেও তারা মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে। সে মজলিসে অংশগ্রহণকারীদেরকে তারা বিশেষ সম্মান জানায়। তারা চারদিক থেকে ডানা বিস্তার করে তাদেরকে ঘিরে ফেলে আর মনোযোগ সহকারে তাদের কুরআন পাঠ ও কুরআন চর্চা শুনতে থাকে। পরিশেষে আল্লাহ তা'আলার দরবারে মুগ্ধতার সঙ্গে তাদের সম্পর্কে রিপোর্ট করে।
চার. وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيْمَنْ عِنْدَهُ (এবং আল্লাহ তাঁর কাছে যারা আছে তাদের সামনে তাদের কথা উল্লেখ করেন)। আল্লাহ তা'আলা আলিমুল গায়ব। তিনি সব জানেন, সব দেখেন। তিনি কারও জানানো ও শোনানোর মুখাপেক্ষী নন। তারপরও ফিরিশতাদের বিশাল কর্মীবাহিনী নিযুক্ত করে রেখেছেন, যা তাঁর মহাবিশ্ব পরিচালনার মহাব্যবস্থাপনার নিদর্শন এবং তাঁর নিখুঁত নিয়ম-শৃঙ্খলার পরিচায়ক। তো ফিরিশতাগণ যখন কুরআন চর্চাকারীদের সম্পর্কে রিপোর্ট করেন, তখন আল্লাহ তা'আলা ফিরিশতাদের সামনে সেই বান্দাদের নিয়ে গর্ব করেন, তাদের প্রশংসা করেন এবং তাদের মাগফিরাতেরও ঘোষণা দেন। হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَا مِنْ قَوْمٍ اجْتَمَعُوا يَذْكُرُونَ اللَّهَ لَا يُرِيدُونَ بِذَلِكَ إِلَّا وَجْهَهُ إِلَّا نَادَاهُمْ مُنَادٍ مِنْ السَّمَاءِ أَنْ قُومُوا مَغْفُورًا لَكُمْ قَدْ بُدِّلَتْ سَيِّئَاتُكُمْ حَسَنَاتٍ.
'যে-কোনও লোকসমষ্টি একত্র হয়ে আল্লাহর যিকির করে আর তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া তাদের অন্য কোনও উদ্দেশ্য না থাকে, আসমান থেকে তাদেরকে লক্ষ্য করে এক ঘোষক ঘোষণা করে, তোমরা ক্ষমাপ্রাপ্তরূপে উঠে যাও। তোমাদের পাপসমূহ পুণ্য দ্বারা বদলে দেওয়া হয়েছে। মুসনাদে আহমাদ: ১২৪৫৩; মুসনাদুল বাযযার ৬৪৬৭; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৪১৪১
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. মসজিদে বা অন্য কোনও স্থানে কুরআন তিলাওয়াতের উদ্দেশ্যে একত্র হওয়া একটি উত্তম আমল।
খ. কুরআনের পাঠচক্র করা অর্থাৎ একত্রে বসে কুরআনের অর্থ ও মর্ম বোঝার চেষ্টা করা এবং এ বিষয়ে মতবিনিময় করা অত্যন্ত কল্যাণকর একটি কাজ।
গ. সম্মিলিতভাবে কুরআন পাঠ ও কুরআনের অর্থ-মর্ম হৃদয়ঙ্গমের প্রচেষ্টা করার দ্বারা মৌলিক চারটি কল্যাণ লাভ হয়- হৃদয়ের প্রশান্তি, আল্লাহর রহমত, ফিরিশতাদের পরিবেষ্টন ও আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক ফিরিশতাদের সামনে প্রশংসা।
ঘ. ফিরিশতাদের একটি কাজ হলো আল্লাহর যিকির ও কুরআন তিলাওয়াতকারীদের সম্মানার্থে তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা।
৫. মসজিদকে কেবল নামায আদায়ের কাজে সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন নয়। কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত ও চর্চাও মসজিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
চ. কুরআনী মক্তব ও দীনী মাদরাসাসমূহে আলোচ্য হাদীছে বর্ণিত আমল সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্টভাবে হয়ে থাকে। সুতরাং এসব প্রতিষ্ঠানের উসতায ও তলাবাবৃন্দেরই এ হাদীছে বর্ণিত ফযীলতসমূহের আওতাভুক্ত থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
আলোচ্য হাদীছটিতে কুরআন মাজীদ কেন্দ্রিক দু'টি কাজের কথা বলা হয়েছে। এক হলো এর তিলাওয়াত, আর দ্বিতীয় হলো এর অর্থ ও মর্ম অনুধাবন। হাদীছটিতে এ উভয় কাজই দলবদ্ধভাবে করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتِ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللهِ (আল্লাহর কোনও ঘরে লোকজন একত্র হয়ে যদি আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে)। সরাসরি আল্লাহর ঘর বলতে মসজিদকে বোঝায়। তবে ব্যাপকার্থে বাসগৃহও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ইসলামের শুরুদিকে কুরআন শিক্ষার সর্বাপেক্ষা উত্তম জায়গা ছিল মসজিদ। সাহাবায়ে কেরামের অধিকাংশই অসচ্ছল ছিলেন। তাদের পক্ষে নিজ বাড়িতে দলবদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ ছিল না। কালক্রমে মানুষের সচ্ছলতা বেড়েছে। বাসগৃহের বাইরেও মেহমানদের জন্য সাধারণত আলাদা ঘর থাকে। তাই এখন নিজ নিজ বাড়িতেও কুরআন শিক্ষার আয়োজন করা সহজ। মূল উদ্দেশ্য কুরআন শিক্ষা করা। যে-কোনও সুবিধাজনক স্থানই এর জন্য বেছে নেওয়া যেতে পারে। উদ্দেশ্য পূর্ণ হওয়াই আসল কথা। কাজেই মসজিদে, মাদরাসায়, দোকান-ঘরে, হোটেলে, কাছারি ঘরে, গাছতলায়, খোলা মাঠে যেখানেই কুরআনের পঠন-পাঠন সম্ভব, সেখানেই এর আয়োজন করা যেতে পারে এবং তাতে অবশ্যই হাদীছে বর্ণিত ফযীলত হাসিল হবে বলে আশা করা যেতে পারে। হাঁ, মসজিদ আল্লাহর ঘর হিসেবে উত্তম স্থান হওয়ায় এখানে সে ফযীলত হাসিলের সম্ভাবনা খানিকটা বেশি থাকবে বৈ কি।
হাদীছটিতে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য দলবদ্ধ আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝা যায় কুরআন তিলাওয়াতের জন্য একাধিক লোকের একত্র হওয়াটা পছন্দনীয়। কেননা তাতে অলসতা কাটে, অন্যের দেখাদেখি নিজেরও তিলাওয়াতের উৎসাহ জাগে এবং বেশিক্ষণ সে উৎসাহ ধরে রাখাও সম্ভব হয়। তাছাড়া অন্যের তিলাওয়াত শুনে নিজের তিলাওয়াত শুদ্ধ করারও সুযোগ হয়।
হাদীছটি দ্বারা বোঝা যায় কুরআন মাজীদের কেবল তিলাওয়াত করাটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। অর্থ না বুঝে তিলাওয়াত করলেও অবশ্যই ছাওয়াব পাওয়া যায়।
যে ব্যক্তি নিজে তিলাওয়াত করতে জানে না, সে যদি অন্যের তিলাওয়াত শোনে, তাতেও ছাওয়াবের অধিকারী হয়।
وَيَتَدَارَسُوْنَهُ يَبْنَهُمْ (এবং নিজেদের মধ্যে তার পাঠচক্র করে)। بَتَدَارَسُوْنَ ক্রিয়াপদটির উৎপত্তি المُدارة থেকে। শব্দটি ব্যাপক মর্ম ধারণ করে। যেমন অর্থ বোঝা, বিষয়বস্তুর মধ্যে চিন্তাভাবনা করা, ভাষার ভেতর নিহিত তত্ত্ব ও তথ্য উদ্ঘাটন করা, বিধানাবলি আহরণ করা ইত্যাদি। কুরআন মাজীদ মূলত হিদায়াতগ্রন্থ। আখিরাতে মুক্তির লক্ষ্যে একজন বান্দার দুনিয়ায় কীভাবে জীবনযাপন করতে হবে, কুরআন তার পথ দেখায়। অর্থ বোঝা ও বিষয়বস্তুর মধ্যে চিন্তাভাবনা করার দ্বারা বান্দা সে পথের সন্ধান পায়। এ চিন্তাভাবনার যদিও বিভিন্ন স্তর রয়েছে, যার সর্বাপেক্ষা উচ্চস্তর হলো ফকীহগণের গবেষণামূলক কর্মপ্রক্রিয়া, তবে কুরআনের অর্থ বোঝাটাও কম গুরুত্ব বহন করে না। অর্থ বোঝাটা কুরআনী উপদেশ গ্রহণের জন্য বিশেষ সহায়ক। সুতরাং المدارسة এর কাজটি অত্যন্ত মহিমাপূর্ণ। তারপর নিজ হিম্মত জাগ্রত করে যদি অর্থের ভেতর চিন্তাভাবনা করা যায়, তবে তা বড়ই সৌভাগ্যের কথা। কুরআন মাজীদ তার বিভিন্ন আয়াতে মানুষকে এর প্রতি উৎসাহিতও করেছে। যেমন ইরশাদ হয়েছে-
كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ
'(হে রাসূল!) এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতের মধ্যে চিন্তা করে এবং যাতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে। সূরা সোয়াদ, আয়াত ২৯
এ কাজটি একাকীও করা যেতে পারে, তবে সংঘবদ্ধভাবে করার ফায়দা বেশি। একটি আয়াত পাঠ করা হলো। তারপর সবাই মিলে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে থাকল। প্রত্যেকে নিজ নিজ অভিমত প্রকাশ করল। তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করা হলো। এভাবে যদি পাঠচক্র করা হয়, তবে একেক আয়াত থেকে অকল্পনীয় মণিমুক্তা উদ্ঘাটিত হতে পারে। কুরআনের একেক আয়াতে জ্ঞানতত্ত্বের সাগর ঠাসা। যতই চিন্তা করা হবে, ততই নতুন নতুন তত্ত্ব আহরিত হবে। একাকী করলেও তা হবে, তবে বহুজন মিলে করার দ্বারা অর্জন যে অনেক বেশি হবে এবং তা অনেক নিখুঁতও হবে, তা বলাই বাহুল্য। হাদীছটি তারই প্রতি আমাদের উৎসাহদান করছে।
একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত ও কুরআনের পাঠচক্র করার চারটি ফায়দা
আলোচ্য হাদীছের বক্তব্যমতে কোনও স্থানে একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করলে এবং কুরআন বোঝার চেষ্টায় মশগুল হলে চারটি ফায়দা পাওয়া যায়। যথা-
এক. إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ (তবে তাদের উপর অবশ্যই সাকীনা নাযিল হয়।) শব্দটির উৎপত্তি سُكُوّن থেকে। এর অর্থ শান্তি, স্থিরতা, ধীরশান্ত অবস্থা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাচ্ছেন, সম্মিলিতভাবে কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত করলে ও তার অর্থ-মর্মের মধ্যে চিন্তাভাবনা করলে আল্লাহ তা'আলা সাকীনা নাযিল করেন অর্থাৎ যারা এ কাজে রত থাকে, তাদের অন্তরে প্রশান্তি জোগান। ফলে তাদের সব ভয়-ভীতি কেটে যায়, পেরেশানি দূর হয়ে যায়, সংশয়-সন্দেহের অবসান ঘটে, অন্তরে হিম্মত ও সৎ সাহস জন্ম নেয়, প্রতিকূল সব পরিবেশে দৃঢ়তা ও অবিচলতা সৃষ্টি হয়।
সুতরাং দুনিয়ার নানা পেরেশানিতে যারা অস্থির, শান্তির সন্ধানে যারা দিগ্ভ্রান্ত হয়ে কখনও এদিকে কখনও ওদিকে ছুটছে, তাদের উচিত সবকিছু থেকে বিমুখ হয়ে কুরআন মাজীদ আঁকড়ে ধরা। তারা যদি কুরআনের মজলিসে হাজির হয়, কুরআনের পাঠচক্রে অংশগ্রহণ করে ও তাফসীর মাহফিলে শরীক হয়, তবে সর্বপ্রকার পেরেশানি থেকে মুক্তি পেয়ে সত্যিকারের শান্তি তাদের নসীব হবে। বিশেষত ভ্রান্ত মতবাদ ও কুচিন্তা যাদের মনে খটকা সৃষ্টি করে এবং শয়তানি ওয়াসওয়াস যাদের আকীদা-বিশ্বাসে চিড় ধরাতে চায়, তাদের জন্য কুরআন পাঠ ও কুরআনভিত্তিক মজলিসসমূহই শ্রেষ্ঠতম অবলম্বন।
দুই. وَغَشِيتُهُمُ الرَّحْمَةُ (রহমত তাদেরকে ঢেকে ফেলে)। আল্লাহু আকবার! কুরআনী মজলিসের কী বিশাল কল্যাণ। এরূপ মজলিসে হাজির থাকার দ্বারা আল্লাহর রহমতের চাদরে আবৃত হওয়া যায়। আল্লাহ তা'আলার রহমত ও দয়ার দ্বারাই মানুষ দোজাহানের মুক্তি পেতে পারে। যা-কিছু নেক আমল, তা রহমত লাভেরই অসিলাস্বরূপ। অসীম অফুরন্ত রহমতের মালিক আল্লাহ তা'আলার কাছে যে ব্যক্তি রহমত পেতে চায়, আলোচ্য হাদীছ আহ্বান জানায় সে যেন মন দিয়ে কুরআন পড়ে। যেন নিয়মিত কুরআনের মজলিসে হাজির হয়।
তিন. وَحَفَّتْهُمْ الْمَلَائِكَة (ফিরিশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে)। ফিরিশতাদের একটি দল আছে, যারা দিনে-রাতে পালাক্রমে দুনিয়ায় আসা-যাওয়া করে। তারা আল্লাহর বান্দাদের কাজকর্ম পরিদর্শন করে। তারপর ফিরে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার কাছে রিপোর্ট করে যে, কাকে কী অবস্থায় দেখেছে। এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِنَّ لِلَّهِ مَلاَئِكَةً سَيَّاحِينَ فِي الأَرْضِ فَضْلاً عَنْ كُتَّابِ النَّاسِ فَإِذَا وَجَدُوا أَقْوَامًا يَذْكُرُونَ اللَّهَ تَنَادَوْا هَلُمُّوا إِلَى بُغْيَتِكُمْ فَيَجِيئُونَ فَيَحُفُّونَ بِهِمْ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا
'যারা মানুষের আমল লিপিবদ্ধ করে, তারা ছাড়াও আল্লাহ তা'আলার এমন কিছু ফিরিশতা আছে, যারা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে। তারা যখন এমন লোক সমষ্টি দেখতে পায়, যারা আল্লাহ তা'আলার যিকির করে, তখন তারা একে অন্যকে ডেকে বলে, এসো তোমাদের কাঙ্ক্ষিত স্থানে। তারা সেখানে চলে আসে এবং আসমান পর্যন্ত তাদেরকে ঘিরে ফেলে... জামে' তিরমিযী: ৩৬০০; মুসনাদে আহমাদ: ৭৪১৮; মুসনাদুল বাযযার ৯১৪৮: বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ৪৪৪
তো যারা সম্মিলিতভাবে কুরআন পড়ে এবং কুরআনের অর্থ-মর্ম অনুধাবনের চেষ্টা করে, তাদের মজলিস যখন সে ফিরিশতাদের নজরে আসে, তখন তারা সেখানে দাঁড়িয়ে যায়। তারা সে মজলিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আল্লাহ তা'আলার কালামের মর্যাদায় সে মজলিসকেও তারা মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে। সে মজলিসে অংশগ্রহণকারীদেরকে তারা বিশেষ সম্মান জানায়। তারা চারদিক থেকে ডানা বিস্তার করে তাদেরকে ঘিরে ফেলে আর মনোযোগ সহকারে তাদের কুরআন পাঠ ও কুরআন চর্চা শুনতে থাকে। পরিশেষে আল্লাহ তা'আলার দরবারে মুগ্ধতার সঙ্গে তাদের সম্পর্কে রিপোর্ট করে।
চার. وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيْمَنْ عِنْدَهُ (এবং আল্লাহ তাঁর কাছে যারা আছে তাদের সামনে তাদের কথা উল্লেখ করেন)। আল্লাহ তা'আলা আলিমুল গায়ব। তিনি সব জানেন, সব দেখেন। তিনি কারও জানানো ও শোনানোর মুখাপেক্ষী নন। তারপরও ফিরিশতাদের বিশাল কর্মীবাহিনী নিযুক্ত করে রেখেছেন, যা তাঁর মহাবিশ্ব পরিচালনার মহাব্যবস্থাপনার নিদর্শন এবং তাঁর নিখুঁত নিয়ম-শৃঙ্খলার পরিচায়ক। তো ফিরিশতাগণ যখন কুরআন চর্চাকারীদের সম্পর্কে রিপোর্ট করেন, তখন আল্লাহ তা'আলা ফিরিশতাদের সামনে সেই বান্দাদের নিয়ে গর্ব করেন, তাদের প্রশংসা করেন এবং তাদের মাগফিরাতেরও ঘোষণা দেন। হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَا مِنْ قَوْمٍ اجْتَمَعُوا يَذْكُرُونَ اللَّهَ لَا يُرِيدُونَ بِذَلِكَ إِلَّا وَجْهَهُ إِلَّا نَادَاهُمْ مُنَادٍ مِنْ السَّمَاءِ أَنْ قُومُوا مَغْفُورًا لَكُمْ قَدْ بُدِّلَتْ سَيِّئَاتُكُمْ حَسَنَاتٍ.
'যে-কোনও লোকসমষ্টি একত্র হয়ে আল্লাহর যিকির করে আর তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া তাদের অন্য কোনও উদ্দেশ্য না থাকে, আসমান থেকে তাদেরকে লক্ষ্য করে এক ঘোষক ঘোষণা করে, তোমরা ক্ষমাপ্রাপ্তরূপে উঠে যাও। তোমাদের পাপসমূহ পুণ্য দ্বারা বদলে দেওয়া হয়েছে। মুসনাদে আহমাদ: ১২৪৫৩; মুসনাদুল বাযযার ৬৪৬৭; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৪১৪১
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. মসজিদে বা অন্য কোনও স্থানে কুরআন তিলাওয়াতের উদ্দেশ্যে একত্র হওয়া একটি উত্তম আমল।
খ. কুরআনের পাঠচক্র করা অর্থাৎ একত্রে বসে কুরআনের অর্থ ও মর্ম বোঝার চেষ্টা করা এবং এ বিষয়ে মতবিনিময় করা অত্যন্ত কল্যাণকর একটি কাজ।
গ. সম্মিলিতভাবে কুরআন পাঠ ও কুরআনের অর্থ-মর্ম হৃদয়ঙ্গমের প্রচেষ্টা করার দ্বারা মৌলিক চারটি কল্যাণ লাভ হয়- হৃদয়ের প্রশান্তি, আল্লাহর রহমত, ফিরিশতাদের পরিবেষ্টন ও আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক ফিরিশতাদের সামনে প্রশংসা।
ঘ. ফিরিশতাদের একটি কাজ হলো আল্লাহর যিকির ও কুরআন তিলাওয়াতকারীদের সম্মানার্থে তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা।
৫. মসজিদকে কেবল নামায আদায়ের কাজে সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন নয়। কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত ও চর্চাও মসজিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
চ. কুরআনী মক্তব ও দীনী মাদরাসাসমূহে আলোচ্য হাদীছে বর্ণিত আমল সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্টভাবে হয়ে থাকে। সুতরাং এসব প্রতিষ্ঠানের উসতায ও তলাবাবৃন্দেরই এ হাদীছে বর্ণিত ফযীলতসমূহের আওতাভুক্ত থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)