রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০২২
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
সূরা ফাতিহা ও সূরা বাকারার শেষ আয়াতসমূহের ফযীলত
১০২২. হযরত ইবন আব্বাস রাযি. বলেন, একদা হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসা ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি উপরের দিক থেকে একটি আওয়াজ শুনলেন। তিনি উপরের দিকে মাথা তুলে বললেন, এটি আসমানের একটি দরজা। আজ এটি খোলা হয়েছে। আজ ছাড়া আর কখনও এটি খোলা হয়নি। তারপর সেখান থেকে একজন ফিরিশতা নেমে আসলেন। হযরত জিবরীল বললেন, ইনি এমন এক ফিরিশতা, যিনি আজই পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন। এর আগে তিনি কখনও অবতরণ করেননি। সে ফিরিশতা এসে সালাম দিলেন এবং বললেন, আপনি এমন দু'টি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন, যা আপনাকে দেওয়া হয়েছে, আপনার আগে অন্য কোনও নবীকে দেওয়া হয়নি। তা হলো সূরা ফাতিহা এবং সূরা বাকারার শেষ আয়াতসমূহ। আপনি এর যে-কোনও একটি বাক্য পড়বেন, আপনাকে তা অবশ্যই দেওয়া হবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম : ৮০৬; সুনানে নাসাঈ: ৮১২; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩১৭০১৯ মুসনাদে আবূ ইয়া'লা ২৪৮৮; সহীহ ইবন হিব্বান ৭৭৮; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ১২২৫৫: বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান ২১৪৫: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১২০১)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1022 - وعن ابنِ عَبَّاسٍ رضي الله عنهما: بَيْنَمَا جِبْريلُ - عليه السلام - قَاعِدٌ عِنْدَ النبي - صلى الله عليه وسلم - سَمِعَ نَقيضًا مِنْ فَوقِهِ، فَرَفَعَ رَأسَهُ، فَقَالَ: هَذَا بَابٌ مِنَ السَّمَاءِ فُتِحَ اليَوْمَ وَلَمْ يُفْتَحْ قَطٌّ إِلاَّ اليَوْمَ، فنَزلَ منهُ مَلكٌ، فقالَ: هذا مَلكٌ نَزلَ إلى الأرضِ لم ينْزلْ قطّ إلاّ اليومَ فَسَلَّمَ وقال: أبْشِرْ بِنُورَيْنِ أُوتِيتَهُمَا لَمْ يُؤتَهُمَا نَبيٌّ قَبْلَكَ: فَاتِحَةُ الكِتَابِ، وَخَواتِيمُ سُورَةِ البَقَرَةِ، لَنْ تَقْرَأَ بِحَرْفٍ مِنْهَا إِلاَّ أُعْطِيتَه. رواه مسلم. (1)
«النَّقِيضُ»: الصَّوْتُ.

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: مسلم 2/ 198 (806) (254).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটি সূরা ফাতিহা ও সূরা বাকারার শেষের আয়াতসমূহের ফযীলত সম্পর্কে। হাদীছটি দ্বারা আমরা সে ফযীলত জানার পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় জানতে পারি। এতে বলা হয়েছে, একদিন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসা ছিলেন। এ সময় উপর দিকে একটি আওয়াজ শুনতে পান। তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম উপরদিকে মাথা তুলে বলেন-

هُذَا بَابٌ مِنَ السَّمَاءِ فُتَحَ الْيَوْمَ (এটি আসমানের একটি দরজা। আজ এটি খোলা হয়েছে)। এর দ্বারা জানা যায় যে, আসমান বায়বীয় কিছু নয়; বরং তার বাস্তব অস্তিত্ব আছে। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে আসমানকে ছাদ বলা হয়েছে। যেমন ইরশাদ হয়েছে-

وَجَعَلْنَا السَّمَاءَ سَقْفًا مَّحْفُوظًا

'এবং আমি আকাশকে করেছি এক সুরক্ষিত ছাদ। সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৩২

এ হাদীছ বলছে, আসমানের দরজা আছে। আরও বহু হাদীছে আসমানের দরজা থাকার উল্লেখ আছে। মি'রাজ সম্পর্কিত বিখ্যাত হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য সাত আসমানের সাত দরজা খোলার কথা স্পষ্টই বর্ণিত হয়েছে। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতেও এ কথা আছে। যেমন এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَاسۡتَکۡبَرُوۡا عَنۡہَا لَا تُفَتَّحُ لَہُمۡ اَبۡوَابُ السَّمَآءِ

'নিশ্চয়ই যারা আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং অহংকারের সাথে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাদের জন্য আকাশের দরজাসমূহ খোলা হবে না। সূরা আ'রাফ, আয়াত ৪০

তবে আসমান বহু দূরে। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব অসংখ্য আলোকবর্ষ পরিমাণ। এমন কোনও যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়নি, যা দ্বারা আসমানের নিকটবর্তী কোনওকিছুও দেখা সম্ভব। যেসব যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, তা দ্বারা এখনও পর্যন্ত আসমানের বহু নক্ষত্র দেখা সম্ভব হয়নি। অথচ কুরআন মাজীদের বর্ণনা অনুযায়ী সব নক্ষত্রই আসমানের নিচে। যখন দূরবর্তী সে নক্ষত্রসমূহই দেখা সম্ভব হয়নি, তখন আসমান দেখতে না পাওয়ায় আশ্চর্যের কিছু নেই। কাজেই তা দেখতে না পাওয়ায় আসমানের অস্তিত্ব অস্বীকার করাটা জ্ঞানবত্তার পরিচয় বহন করে না। কুরআন আল্লাহ তা'আলার অকাট্য সত্যগ্রন্থ। বিশুদ্ধ হাদীছসমূহও সত্য। কাজেই তাতে যা বলা হয়েছে তা সত্য বলে স্বীকার করাই ন্যায়নিষ্ঠার পরিচায়ক।

হাদীছটিতে আসমানের যে দরজা থাকার কথা বলা হয়েছে, তাও বাস্তব দরজাই। দরজা খোলার দ্বারা যে আওয়াজ হয়, আসমানের সে দরজা খোলারও তেমনি আওয়াজ রয়েছে। সে আওয়াজের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেই হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম জানিয়েছেন যে, এটি আসমানের সেই দরজা খোলার আওয়াজ।

হাদীছটি দ্বারা ফিরিশতাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানার পাশাপাশি আরও জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করে রেখেছেন। তার মধ্যে একটা কাজ হলো নবী-রাসূলগণের কাছে ওহী নিয়ে আসা। আরও জানা যাচ্ছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মৌলিকভাবে ওহী নিয়ে আসার দায়িত্ব হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম পালন করলেও কখনও কখনও অন্য কোনও ফিরিশতাও করতেন। যেমন এ হাদীছে বলা হয়েছে, আসমানের দরজা খোলার পর দুই নূর সম্পর্কে সুসংবাদ নিয়ে আসেন নতুন এক ফিরিশতা। আবার এ ফিরিশতাও এমন, যিনি পৃথিবীতে এই প্রথম অবতরণ করেন, এর আগে আর কখনও আসেননি।

আরও জানা যাচ্ছে, আসমানের দরজা আছে বহু। কুরআন মাজীদেও আসমানের বহু দরজার উল্লেখ আছে। সেসব দরজা বন্ধ থাকে। যখন প্রয়োজন হয় তখন খোলা হয়। এ ফিরিশতা যে দরজা দিয়ে এসেছিলেন, সে দরজাটি এর আগে আর কখনও খোলা হয়নি।

ফিরিশতা এসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রথমে সালাম দেন। অভিবাদন হিসেবে সালাম দেওয়া-নেওয়ার আমল কেবল মানুষের জন্যই খাস নয়। সালামের প্রচলন শুরু হয়েছিল ঊর্ধ্বজগতে। আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে হযরত আদম আলাইহিস সালাম ফিরিশতাদের সালাম দিয়েছিলেন। তারা উত্তর দিয়েছিলেন। এখান থেকেই সালামের সূচনা। সালাম দেওয়ার পর ফিরিশতা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে বললেন-

أَبْشِرْ بِنُورَيْنِ أُوتِيتَهُمَا لَمْ يُؤْتَهُمَا نَبِيٌّ قَبْلَكَ فَاتِحَةُ الْكِتَابِ وَخَوَاتِيمُ سُورَةِ الْبَقَرَةِ (আপনি এমন দু'টি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন, যা আপনাকে দেওয়া হয়েছে, আপনার আগে অন্য কোনও নবীকে দেওয়া হয়নি। তা হলো সুরা ফাতিহা এবং সূরা বাকারার শেষ আয়াতসমূহ)। নূর মানে আলো। সমগ্র কুরআন মাজীদই নূর। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে তা স্পষ্টই বলা হয়েছে। তা সত্ত্বেও এখানে সূরা ফাতিহা এবং সূরা বাকারার শেষ আয়াতসমূহকে আলাদাভাবে নূর বলা হয়েছে এর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে। কিয়ামতের দিন এ দু'টি এর ধারকের সামনে সামনে আলো হয়ে চলবে। দুনিয়ায়ও এ দু'টি হিদায়াতের বিশেষ আলো। বান্দাকে সরল-সঠিক পথ দেখায়। সূরা ফাতিহা তো সারা কুরআনেরই সারমর্ম। আর সূরা বাকারার শেষ আয়াতদু'টিতে আছে আল্লাহর প্রতি বান্দার চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ ও তাঁর আদেশ-নিষেধ পালনে তাঁর সাহায্য লাভের আকুতি।

প্রশ্ন হতে পারে, সমগ্র কুরআনই তো আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে অবতীর্ণ এক নতুন কিতাব, এ কিতাব অন্য কোনও নবীকে নয়; বরং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেওয়া হয়েছে, এ অবস্থায় কেবল এ দু'টি সম্পর্কে এ কথা বলার কী অর্থ যে, অন্য কোনও নবীকে তা দেওয়া হয়নি?

এর উত্তর হলো, ভাষার অসাধারণত্ব ও বিষয়বস্তুর গভীরতার দিক থেকে এ দু'টি স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। বিশেষত দু'আ ও মুনাজাত হিসেবে সূরা ফাতিহা এবং সূরা বাকারার শেষ আয়াতের কোনও তুলনা হয় না। এরূপ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কোনও সূরা বা আয়াত পূর্ববর্তী কোনও আসমানী কিতাবে ছিল না। কেবল সে হিসেবেই এ কথাটি বলা হয়েছে। অন্যথায় এটা তো স্পষ্ট যে, সমগ্র কুরআন মাজীদ এক অলৌকিক গ্রন্থ এবং সর্বশেষ আসমানী কিতাব হিসেবে পরিপূর্ণ হিদায়াতের ধারক। এ কিতাবের মতো কোনও কিতাব এর আগে কোনও নবীকে দেওয়া হয়নি।

কুরআন মাজীদের এ দু'টি অংশ গভীর মর্মধারী প্রার্থনা। হাদীছটিতে বলা হয়েছে- لَنْ تَقْرَأَ بِحَرْفٍ مِنْهُمَا إِلَّا أَعْطيته (আপনি এর যে-কোনও একটি বাক্য পড়বেন, আপনাকে তা অবশ্যই দেওয়া হবে)। অর্থাৎ সূরা ফাতিহায় আছে সরল-সঠিক পথের হিদায়াত প্রার্থনা, ইবাদত-বন্দেগীতে আল্লাহর সাহায্য কামনা, সূরা বাকারার শেষ আয়াতে আছে আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ পালনে সহজতা কামনা, অসহনীয় বিপদ-আপদ ও কষ্ট-ক্লেশ থেকে মুক্তিলাভের আকুতি এবং সবশেষে নিজ গুনাহের জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা ও অবিশ্বাসী সম্প্রদায়সমূহের বিরুদ্ধে তাঁর সাহায্য কামনা- এ সবই বান্দার পরম কাম্যবস্তু। কুরআন মাজীদের এ দুই অংশ পাঠ করার দ্বারা বান্দা আল্লাহ তা'আলার কাছে এসব চেয়ে থাকে। সুতরাং যে বান্দা আল্লাহ তা'আলার অভিমুখী হয়ে এ দু'টি পাঠ করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে এসব বিষয় অবশ্যই দান করবেন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. আসমান বাস্তব অস্তিত্বমান মাখলুক।

খ. আসমানের বহু দরজা আছে।

গ. আসমানের দরজা খোলার দ্বারা আওয়াজ হতে পারে এবং সে আওয়াজ অন্যদের পক্ষে শোনাও সম্ভব।

ঘ. কখনও কখনও হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম ছাড়া অন্য ফিরিশতাও ওহী নিয়ে আসতেন।

ঙ. ফিরিশতাগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দিতেন। বিভিন্ন সময় তারা মুমিনদেরকেও সালাম দিয়ে থাকেন।

চ. সাক্ষাৎকালে অন্যসব কথার আগে প্রথমে সালাম দিতে হয়।

ছ. কুরআন মাজীদ আল্লাহপ্রদত্ত নূর বা আলো। তার মধ্যে সূরা ফাতিহা বিশেষ নূর এবং সূরা বাকারার শেষ দু'টি আয়াতও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নূর।

জ. কুরআন মাজীদের এ দুই অংশ স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। এরূপ মর্যাদাপূর্ণ কোনও সূরা বা আয়াত অন্য কোনও নবীকে দেওয়া হয়নি।

ঝ. কুরআন মাজীদের এ দুই অংশে বিশেষ প্রার্থনার যেসব বিষয়ের উল্লেখ আছে, মনোযোগ সহকারে তিলাওয়াত করা হলে আল্লাহ তা'আলা সেসব বিষয় বান্দাকে অবশ্যই প্রদান করেন। তাই আমরা সূরা ফাতিহা পাঠকালে এর মর্মবস্তুর দিকে লক্ষ রাখব এবং সূরা বাকারার শেষ আয়াত পাঠকালেও আল্লাহর অভিমুখী থাকব।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান