রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০১৬
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
শরীয়তের দৃষ্টিতে রুক্‌য়া (ঝাড়ফুঁক, তাবীজ)

আমরা যাকে ঝাড়ফুঁক ও তাবীজ বলি, আরবীতে তাকে رقية (রুক্‌য়া) বলা হয়। কয়া শব্দটির উৎপত্তি উট থেকে। এর অর্থ উপরে ওঠা, আরোহণ করা। কুরআন মাজীদে ইরশাদ-

اَوۡ تَرۡقٰی فِی السَّمَآءِ ؕ وَلَنۡ نُّؤۡمِنَ لِرُقِیِّکَ حَتّٰی تُنَزِّلَ عَلَیۡنَا کِتٰبًا نَّقۡرَؤُہٗ

'অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে, কিন্তু আমরা তোমার আকাশে তারোহণকেও ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের প্রতি এমন এক কিতাব অবতীর্ণ করবে, যা আমরা পড়তে পারব। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৯৩)

শত্রুর হামলা ও বিপদ-আপদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য মানুষ উঁচু স্থানে আরোহণ করে থাকে। এ হিসেবে রক্ষা করা অর্থেও শব্দটির ব্যবহার আছে। ঝাড়ফুঁক দ্বারা মানুষকে রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করা হয়। তাই ঝাড়ফুঁক অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এখন তো রুক্‌য়া বলতে সাধারণত ঝাড়ফুঁককেই বোঝায়। এ অর্থে তাবীজ শব্দেরও ব্যবহার আছে।

তাবীজ শব্দটির আরবী উচ্চারণ تَعْوِيدٌ। এর উৎপত্তি عَوْذُ থেকে। অর্থ আশ্রয় গ্রহণ করা। তাবীজ অর্থ আশ্রয় দান করা। এর থেকেই সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে ممؤذتَان বলা হয়। কেননা এর দ্বারা রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-আপদ থেকে আল্লাহর আশ্রয় লাভ হয়। সুতরাং যে-কোনও সূরা বা আয়াত কিংবা দুআ পড়ে ঝাড়ফুঁক করাকে যেমন রুক্‌য়া বলা হয়, তেমনি এর জন্য তাবীজ শব্দেরও ব্যবহার আছে। তবে প্রচলিত অর্থে তাবীজ বলা হয় সূরা বা আয়াত কিংবা দুআ লিখিতরূপে ব্যবহার করাকে, তা কোনও মাদুলির ভেতরে হোক বা এমনিই সুতায় বেঁধে হোক।

ঝাড়ফুঁক ও তাবীজ সম্পর্কে চিন্তা ও কর্মগত প্রান্তিকতা

রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-আপদে ঝাড়ফুঁক করা ও তাবীজ ব্যবহার করা শরীয়তসম্মত। তবে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি আছে। কেউ একে সম্পূর্ণ নাজায়েয বলে, এমনকি শিরক সব্যস্ত করে। তাদের দৃষ্টিতে ঝাড়ফুঁক ও তাবীজের ব্যবহার কোনওভাবেই বৈধ নয়। এটা করা কঠিন গুনাহের কাজ। অপরদিকে একশ্রেণির লোক ঝাড়ফুঁক ও তাবীজকেই সবকিছু মনে করে। সকল উদ্দেশ্য পূরণে এটাই তাদের একমাত্র অবলম্বন। রোগ-ব্যাধি

হলে আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করবে না। ঝাড়ফুঁককেই তারা যথেষ্ট মনে করে। নিঃসন্তান বাবা-মা'ও এরূপ করে থাকে। যে-কোনও বিপদ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় তাদের দৃষ্টিতে তাবীজ ও ঝাড়ফুঁক। এমনকি নফল নামায পড়ে দুআ করা, দান-সদাকা করা, কুরআন মাজীদের কোনও সূরা বা আয়াত পড়া এবং হাদীছে বর্ণিত দুআসমূহ পড়ার চেয়েও তাদের কাছে তাবীজ ও ঝাড়ফুঁকের গুরুত্ব বেশি। এ বাড়াবাড়ি কোনওক্রমেই সংগত নয়।

যারা ঝাড়ফুঁককে নাজায়েয বলে, তাদের দলীল হলো- দীর্ঘ এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছিলেন যে, তাঁর উম্মতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে। সাহাবায়ে কেরাম জানতে চেয়েছিলেন তারা কারা। তিনি ইরশাদ করেন-

هُمُ الَّذِينَ لَا يَسْتَرْقُوْنَ، وَلَا يَتَطَيَّرُونَ، وَلَا يَكْتَوُوْنَ، وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

'তারা ওইসকল লোক, যারা রুক্‌য়া করে না, কোনওকিছুকে কুলক্ষণ মনে করে না, (চিকিৎসার উদ্দেশ্যে) শরীর দাগায় না; বরং তারা তাদের প্রতিপালকের উপরই ভরসা রাখে। (সহীহ বুখারী: ৫৭০৫; সহীহ মুসলিম: ২১৮; জামে তিরমিযী: ২৪৪৬; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৬২১; মুসনাদে আহমাদ: ২৪৪৯; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৭৫৬০; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ৫৩৪০; জামে' মা'মার ইবন রাশিদ: ১৯৫১৯; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৭১৪১)

অপর এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-

مَنْ اكْتَوَى أَوِ اسْتَرْقَى فَقَدْ بَرِئَ مِنَ التَّوَكُّلِ

'যে ব্যক্তি শরীর দাগায় বা রুক্‌য়া করায়, তাওয়াক্কুলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। (জামে' তিরমিযী: ২০৫৫: সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৪৮৯; মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী। ৭৩২; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৬২৩; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৮৯০। হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৮২৭৯: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ১৯৫৪৬; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৩২৪১)

এ হাদীছদু'টিতে রুক্‌য়া করাকে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থি সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাওয়াক্কুল করা অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা রাখা ফরয। তাই তাওয়াক্কুল পরিপন্থি কোনও কাজই জায়েয নয়। সুতরাং রুক্‌য়াও জায়েয নয়।

প্রকৃতপক্ষে এ হাদীছ সাধারণভাবে বর্তমানে প্রচলিত রুক্‌য়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এটা প্রযোজ্য জাহিলী যুগের রুক্‌য়ার ক্ষেত্রে। বর্তমানেও কারও রুক্‌য়া সেরকম হলে

হাদীছের দৃষ্টিতেও তাও নাজায়েয হবে। অর্থাৎ কারও মন-মানসিকতা যদি এমন হয় যে সে রুক্‌য়ার কাজটিকেই সবকিছু মনে করে, এরই উপর তার ভরসা, এর দ্বারা যে আল্লাহ তা'আলাই উপকার দেবেন সেদিকে লক্ষ রাখে না, তার জন্য রুক্‌য়া অবশ্যই নাজায়েয। ইসলামপূর্ব যুগে রুক্‌য়া এরকমই ছিল। সেকালে এক তো নানা রকম দুর্বোধ্য মন্ত্র পড়ে ঝাড়ফুঁক করা হতো। দ্বিতীয়ত তখন বিশ্বাস ছিল ঝাড়ফুঁক ও তাবীজ স্বয়ং শক্তিমান। তা আপন শক্তিতেই কাজ করে। তাছাড়া তাদের ঝাড়ফুঁকে দেব-দেবীর নাম থাকত। জিন-শয়তানদের আশ্রয় নেওয়া হতো। এ সবই সুস্পষ্ট শিরক। তাই সেকালের প্রচলিত রুক্‌য়াকে নাজায়েয ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ইসলামে যে রুক্‌য়া, তা মোটেই এরকম নয়। তা তাওয়াক্কুলবিরোধী নয়। শিরকের সঙ্গেও এর কোনও সম্পর্ক নেই।

তাওয়াক্কুলের অর্থ এ নয় যে, কোনও বিষয়ের সংশ্লিষ্ট আসবাব-উপকরণ গ্রহণ না করে এবং উপযুক্ত চেষ্টা-পরিশ্রম না করে হাত-পা ছেড়ে বসে থাকা হবে আর এভাবে আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করা হবে যে, তিনি তা সরাসরি সম্পন্ন করে দেবেন। এটা তাওয়াক্কুল তো নয়ই; বরং আল্লাহ তা'আলার হুকুমেরও বিপরীত। তাওয়াক্কুল অর্থ হলো প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র গ্রহণ করে এবং যথাযথ চেষ্টা অব্যাহত রেখে আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা রাখা যে, তিনি নিজ ইচ্ছা হিকমত অনুযায়ী এর ফলাফল দান করবেন।

বস্তুসামগ্রী যেমন আসবাব-উপকরণের অন্তর্ভুক্ত, তেমনি দুআ, ঝাড়ফুঁক, তাবীজ-তুমার ইত্যাদিও আসবাবের অন্তর্ভুক্ত বৈ কি। এর নিজস্ব কোনও শক্তি নেই। আল্লাহ তা'আলাই এর আছর ও ফলাফল প্রকাশ করেন। মুসলিম ব্যক্তি যখন কোনও সূরা বা আয়াত কিংবা দুআ পড়ার দ্বারা ঝাড়ফুঁক করে, তখন তার ভরসা তো আল্লাহ তা'আলার উপরই থাকে। এসবের মাধ্যমে তো সে আল্লাহ তা'আলারই আশ্রয় গ্রহণ করে। কাজেই শিরকের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক, বিশেষত যখন হাদীছে এর বৈধতার প্রমাণও আছে?

তাদের আরেকটি দলীল হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ-

إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ

'রুক্‌য়া, তাবীজ ও তিওয়ালা শিরক। (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৮৩; সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৫৩০; মুসনাদে আহমাদ: ৩৬১৫: মুসনাদে আবু ইয়া'লা ৫২০৮; সহীহ ইবন হিব্বান ৬০৯০: তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ১০৫০৩; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯৬০৩: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৩২৪০)

তিওয়ালা একপ্রকার জাদু। জাদু ইসলামে নিষিদ্ধ। এটা শিরকী কাজ। এ হাদীছে তিওয়ালার সঙ্গে রুক্‌য়া ও তাবীজকেও শিরক বলা হয়েছে। সুতরাং রুক্‌য়া ও তাবীজও জাদুর মতো হারাম বৈ কি।

প্রকৃতপক্ষে এর দ্বারাও প্রচলিত রুক্‌য়া ও তাবীজকে হারাম বলা যায় না। কেননা এ হাদীছে যে রুক্‌য়া ও তাবীজকে শিরক বলা হয়েছে, তার সঙ্গে প্রচলিত রুক্‌য়া ও তাবীজের সম্পর্ক নেই। কেননা এখন রুক্‌য়া ও তাবীজ করা হয় কুরআনের আয়াত বা হাদীছের দুআ দ্বারা। সেকালে করা হতো শিরকী মন্ত্র-তন্ত্র দ্বারা। সে কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নিষেধ করেছেন।

বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করেন, তখন এখানে রুক্‌য়া ও ঝাড়ফুঁকের প্রচলন ছিল। শিরকী কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি তা নিষেধ করে দেন। এ অবস্থায় একবার এক সাহাবীকে একটি বিষধর সাপ দংশন করে। বিষয়টা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হয়। তাঁকে আরও বলা হয়, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হাজম পরিবার বিষ নামানোর জন্য রুক্‌য়া করত। বিশেষত উমারার এ কাজে বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। কিন্তু আপনি নিষেধ করলে তারা তা ছেড়ে দেয়। তিনি বললেন, ঠিক আছে, উমারাকে ডেকে আনো। তাকে ডেকে আনা হলো। তিনি তাকে বললেন, তুমি কীভাবে রুক্‌য়া কর আমাকে বলো। উমারা তা বললেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে দূষণীয় কিছু দেখতে পেলেন না। ফলে তাদেরকে রুক্‌য়া করার অনুমতি দিলেন। তিনি বললেন-

مَا أَرَى بَأْسًا مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يَنْفَعَ أَخَاهُ فَلْيَنْفَعُهُ

'আমি কোনও দোষ দেখছি না। তোমাদের মধ্যে নিজ ভাইয়ের কোনও উপকার করার ক্ষমতা যার আছে, সে যেন তার উপকার করে। (সহীহ মুসলিম: ২১৯৯: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ১৯৫৯৫; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৫৩০: মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ১৯১৪: তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার ৭১৯৫)

এর দ্বারা বোঝা যায় রুক্‌য়া প্রথমে সাধারণভাবে নিষিদ্ধ ছিল। পরে নির্দোষ রুক্‌য়া বৈধও করে দেওয়া হয়। অতঃপর হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রুক্‌য়া করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে নিজের রুক্‌য়া করেছেন, তিনি অন্যকে রুক্‌য়া করেছেন এবং অন্যদেরকে রুক্‌য়া করার অনুমতি দিয়েছেন। একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হলে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তাঁর কাছে উপস্থিত হন এবং তাঁকে এই বলে রুক্‌য়া করেন-

بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَىْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيك

'আমি আল্লাহর নামে আপনার রুক্‌য়া করছি এমন সবকিছু থেকে, যা আপনাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক প্রাণীর অনিষ্ট থেকে এবং ঈর্ষাকারীর চোখ থেকে। আল্লাহ আপনাকে শিফা দান করুন। আল্লাহর নামে আপনার রুক্‌য়া করছি। (সহীহ মুসলিম: ২১৮৬; জামে তিরমিযী: ৯৭২। সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৫২৩; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ১০৭৭৬: সহীহ ইবন হিব্বান: ৬০৯৫; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ১০৬৬)

এ দুআটি পড়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও অন্যদের রুক্‌য়া করতেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন দুআ পড়ে রুক্‌য়া করেছেন। যেমন কারও শরীরে কোনও বেদনা হলে বা ফোঁড়া হলে কিংবা কেউ জখম হলে তিনি তাঁর শাহাদাত আঙুল মাটিতে রাখতেন, তারপর সে আঙুল তুলে দুআ পড়তেন-

بِاسْمِ اللَّهِ تُرْبَةُ أَرْضِنَا بِرِيقَةِ بَعْضِنَا لِيُشْفَى بِهِ سَقِيمُنَا بِإِذْنِ رَبِّنَا

'আল্লাহর নামে। আমাদের ভূমির মাটি আমাদের কারও থুথুর সঙ্গে। এর দ্বারা আমাদের রুগ্ন ব্যক্তি নিরাময় লাভ করবে আমাদের প্রতিপালকের ইচ্ছায়। (সহীহ মুসলিম: ২১৯৪: সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৯৫; মুসনাদুল হুমায়দী: ২৫৪: হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৮২৬৬; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৪১৫)


এ সবকিছু দ্বারা প্রমাণিত হয় রুক্‌য়া শরীয়তসম্মত। এটা করা জায়েয। হাদীছে যে রুক্‌য়াকে শিরক বলা হয়েছে, তা দ্বারা এমন রুক্‌য়া বোঝানো উদ্দেশ্য, যাতে কুফরী বাক্য ব্যবহৃত হয়।

রুক্‌য়ার প্রকারভেদ ও শরীয়তসম্মত রুক্‌য়া

ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, রুক্‌য়া তিন প্রকার। (ক) ইসলামপূর্ব যুগে প্রচলিত রুক্‌য়া, যাতে দুর্বোধ্য মন্ত্র পাঠ করা হতো। (খ) এমন রুক্‌য়া, যা আল্লাহ তা'আলার নাম ও তাঁর কারাম দ্বারা করা হয়। (গ) এমনসব রুক্‌য়া, যাতে ফিরিশতা, ওলী-বুযুর্গ, আরশ প্রভৃতি গায়রুল্লাহর নাম ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে প্রথম প্রকার রুক্‌য়া এ কারণে হারাম যে, তাতে শিরকে লিপ্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার রুক্‌য়া বৈধ; বরং হাদীছে বর্ণিত নিয়মে করা হলে তা পছন্দনীয়। আর তৃতীয় প্রকার রুক্‌য়ায় যদি গায়রুল্লাহকে সম্মান করা উদ্দেশ্য হয়, তবে তা পরিহার করা জরুরি। আর সেরকম উদ্দেশ্য না থাকলে তা জায়েয হবে বটে, তবে তা থেকেও বেঁচে থাকা উত্তম।

এর দ্বারা বোঝা যায়, রুক্‌য়ায় যা পাঠ করা হয় তা নির্দোষ কথা হলে শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হবে। ইমাম মালিক রহ.-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, উত্তম কথা দ্বারা যে রুক্‌য়া করা হয় তাতে কোনও দোষ নেই। ইমাম শাফিয় রহ. বলেন, আল্লাহর কিতাব ও বোধগম্য যিকির দ্বারা রুক্‌য়া করা হলে তাতে কোনও অসুবিধা নেই।

বস্তুত রুক্‌য়া সঠিক পন্থায় হলে তা সকল মাযহাবেই জায়েয। ইমাম রাযী বহ, বলেন, আল্লাহর নাম ও তাঁর কিতাব দ্বারা যে রুক্‌য়া করা হয়, তা বৈধ হওয়ার বিষয়ে কোনও মতভেদ নেই। ইমাম ইবন হাজার রহ. বলেন, তিনটি শর্ত সাপেক্ষে উলামায়ে কেরাম রুক্‌য়া বৈধ হওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। শর্তগুলো হলো- (ক) রুক্‌য়া হতে হবে আল্লাহর কালাম, তাঁর নামসমূহ কিংবা তাঁর গুণাবলি দ্বারা। (খ) তা আরবী ভাষা বা এমন কোনও ভাষার দ্বারা হতে হবে, যার অর্থ বোঝা যায়। (গ) বিশ্বাস রাখতে হবে যে, রুক্‌য়ার নিজস্ব কোনও শক্তি নেই। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায়ই তা ক্রিয়াশীল হয়।

লক্ষণীয়, তিনটি শর্তেরই সারমর্ম হলো তাওহীদের সংরক্ষণ। অর্থাৎ রুক্‌য়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে বিশ্বাস ও কর্ম কোনওদিক থেকেই শিরকের মলিনতা দ্বারা তাওহীদের পবিত্রতা নষ্ট হতে না পারে।

যেসব ক্ষেত্রে রুক্‌য়া করা যায়

প্রশ্ন হচ্ছে, রুক্‌য়া কোন কোন ক্ষেত্রে করা যাবে? এ প্রশ্ন এসেছে এ কারণে যে, এক হাদীছে আছে-

لَا رُقْيَةَ إِلَّا مِنْ عَيْنٍ أَوْ حُمَةٍ.
'নজর ও বিষ ছাড়া অন্য কিছুতে রুক্‌য়া নেই। (সহীহ বুখারী: ৫৭০৫; সহীহ মুসলিম: ২২০; সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৮৪; জামে' তিরমিযী। ২০৫৭: সুনানে ইবন মাজাহ ৩৫১৩; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৫৩১; মুসনাদুল হুমায়দী: ৮৫৮; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৫৮৭: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯৫৪৫)

এ হাদীছের ভিত্তিতে কেউ কেউ মনে করেন রুক্‌য়া কেবল এ দুই ক্ষেত্রেই জায়েয। কারও উপর বদনজর লাগলে কিংবা বিষাক্ত কোনও প্রাণী কাউকে দংশন করলে কেবল তার নিরাময়ের জন্য রুক্‌য়া করা যাবে, অন্য কোনও ক্ষেত্রে করা যাবে না। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। কেননা এর বাইরেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে রুক্‌য়ার ব্যবহার প্রমাণিত। উলামায়ে কেরাম এ হাদীছটির ব্যাখ্যা করেছেন এই যে, এ দুই ক্ষেত্রে রুক্‌য়া খুব বেশি কার্যকর এবং এ দুই ক্ষেত্রে রুক্‌য়া শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা। যেমন বলা হয়-لَا سَيْفَ إِلَّا ذُو الْفِقارِ (যুলফিকার ছাড়া তরবারি নেই)। অর্থাৎ যুলফিকার শ্রেষ্ঠ তরবারি।

রুক্‌য়া যে অন্যান্য ক্ষেত্রেও জায়েয, বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা তা প্রমাণিত। যেমন হযরত আনাস ইবন মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত-

رُخِّصَ فِي الْحُمَةِ وَالنَّمْلَةِ وَالْعَيْنِ.

'বিষ, ফোঁড়া ও বদনজর থেকে নিরাময়ের জন্য রুক্‌য়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। (সহীহ মুসলিম : ২১৯৬; জামে তিরমিযী: ২০৫৬; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৭৪৯৯; সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৫১৬; মুসনাদে আহমাদ: ১২১৭৩; সহীহ ইবন হিব্বান : ৬১০৪)

অনেক সময় শিশুরা কান্নাকাটি করে। সে কান্নার কোনও কারণ না বাবা-মা খুঁজে পায়, না চিকিৎসক। ফলে বাবা-মা পেরেশান হয়ে পড়ে। রুক্‌য়াও পেরেশানি দূর করার একটা উপায় হতে পারে। একবার এক শিশু কান্নাকাটি করছিল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন-

مَا لِصَيِّكُمْ هَذَا يَبْكِي، فَهَلَا اسْتَرْقَيْتُمْ لَهُ مِنَ الْعَيْنِ.

'তোমাদের এই শিশুটি কাঁদছে কেন? তোমরা কেন তাকে বদনজরের রুক্‌য়া করছ না? (মুসনাদে আহমাদ: ২৪৪৮৬; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৪২৯৫)

বোঝা গেল এ শিশুর কান্নার কারণ ছিল বদনজর। আর এরূপ ক্ষেত্রে রুক্‌য়া দ্বারা সুফল লাভ হয়। মোটকথা শারীরিক-মানসিক সর্বপ্রকার রোগ-ব্যাধি, মানুষের বদনজর, হিংসুকের হিংসা, জিনের স্পর্শ, সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদি বিষধর প্রাণীর দংশন, জখম-ফোঁড়া প্রভৃতি ক্ষেত্রে রুক্‌য়া বা ঝাড়ফুঁক উপকারী হয়ে থাকে। নেককারদের জবানিতে এটা করা হলে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় উপকারলাভের সম্ভাবনা বেশি। এ কয়া নিজে নিজের বেলায়ও করা যেতে পারে, অন্যের দ্বারাও করানো যেতে পারে। সর্বাবস্থায় ব্যক্তির সৎ ও নেককার হওয়াটা উপকারলাভের পক্ষে সহায়ক। কিন্তু এরূপ লোক বিরল হওয়ায় মানুষ রুক্‌য়া ছেড়ে আধুনিক চিকিৎসাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

পূর্বে যে দু'আ উল্লেখ করা হয়েছে, " بِاسْمِ اللَّهِ تُرْبَةُ أَرْضِنَا بِرِيقَةِ بَعْضِنَا لِيُشْفَى بِهِ سَقِيمُنَا بِإِذْنِ رَبِّنَا "- এটির বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরীরের যে-কোনও রোগ-ব্যাধি, ফোঁড়া ও জখম সবকিছুতেই এর দ্বারা রুক্‌য়া করতেন। এমনিভাবে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে দম করার দ্বারা যে-কোনও রোগ-ব্যাধি ও বালা-মসিবত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বলে বিভিন্ন হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, যেমনটা পেছনে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং রুক্‌য়া জাদুটোনা, বদনজর, রোগ-ব্যাধি, ফোঁড়া-জখম, বালা-মসিবত ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

সতর্কতা: মনে রাখতে হবে, রুক্‌য়ার উদ্দেশ্য কেবলই নিজের বা অন্যের উপকার সাধন। কাজেই কারও ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে রুক্‌য়ার ব্যবহার কিছুতেই জায়েয হবে না। অন্যের ক্ষতি করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও কঠিন গুনাহের কাজ।

যা-কিছু দ্বারা রুক্‌য়া করা যাবে

রুক্‌য়ার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবস্থা হলো কুরআন মাজীদ। কুরআন মাজীদের কোনও সূরা বা আয়াত পড়া, পড়ে শরীরে দম করা, পানিতে দম করে সেই পানি পান করা বা তা দ্বারা গোসল করা, হাতে ফুঁ দিয়ে সেই হাত দ্বারা শরীর মোছা হলো সর্বোত্তম রুক্‌য়া। এর দ্বারা উদ্দিষ্ট বিষয়ে উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা সবচে' বেশি। এটা কুরআনুল কারীমের যে-কোনও আয়াত দ্বারাই করা যেতে পারে। সারা কুরআনই শিফা। তা অন্তরের বা রূহানী শিফা তো বটেই, শারীরিক নিরাময়ও এর দ্বারা লাভ হয়ে থাকে। অবশ্য সুনির্দিষ্টভাবে কোনও কোনও সূরা ও আয়াতের কথাও বিভিন্ন হাদীছে বিশেষভাবে বর্ণিত আছে। যেমন সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইয়াসীন, সূরা ফালাক ও সূরা নাস।

জাদুটোনা ও বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি থেকে নিরাময়ের জন্য হাদীছে যেসব দু'আ বর্ণিত হয়েছে বা যেসব উপায় অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, নিঃসন্দেহে তার মধ্যেও অনেক খায়র ও বরকত রয়েছে। কাজেই দৃঢ় বিশ্বাস ও ভক্তির সঙ্গে তার উপরও আমল করা চাই। উদাহরণত জিন শয়তানের ক্ষতি ও বদনজরের কুফল থেকে মুক্তির জন্য পাঠ করা-

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

'আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের, প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত প্রাণী থেকে এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর চোখ থেকে। (সহীহ বুখারী: ৩৩৭১)

এ দু'আ টি অন্যের উপরও পড়া যেতে পারে, বিশেষত শিশুদের উপর। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল ও ইসহাক আলাইহিমাস সালামের উপর এ দু'আ পড়তেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান ও হুসায়ন রাযি.-এর উপরও এ দু'আর দ্বারা রুক্‌য়া করতেন। (সহীহ বুখারী: ৩৩৭১: সুনানে আবূ দাউদ: ৪৭৩৭; জামে তিরমিযী: ২০৬০; সুনানে ইবন মাজাহ ৩৫২৬; মুসনাদে আহমাদ ২১১১; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৭৬৭৯; তহাবী, শারহু মশকিলিল আছার: ২৮৮৫; খারাইতী, মাকারিমল আখলাক: ১০৫৬: হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৪৭৮১)
সে ক্ষেত্রে দু'জনের বেলায় বলতে হবে-

أُعِيْذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لامَّةٍ

আর একজনের বেলায় বলতে হবে-

أُعِيْذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لامَّةٍ

শরীরের কোনও অঙ্গে যে-কোনও রকম ব্যথা-বেদনার জন্য ব্যথার স্থানে ডান হাত বুলিয়ে সাতবার বিশেষ একটি দু'আ পড়ার কথা হাদীছে বর্ণিত আছে। হযরত উছমান ইবন আবূল 'আস রাযি.-এর শরীরের এক অঙ্গে বেদনা ছিল। খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

امْسَحْهُ بِيَمِينِكَ سَبْعَ مَرَّاتٍ وَقُلْ أَعُوذُ بِعِزَّةِ اللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِد

'তুমি ব্যথার জায়গাটিতে সাতবার তোমার ডান হাত বুলাও আর বলো-

أَعُوذُ بِعِزَّةِ اللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِد (আল্লাহর ক্ষমতা ও শক্তির আশ্রয় গ্রহণ করছি)। জামে' তিরমিযী: ২০৮০; সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৯১; সুনানে ইবন মাজাহ ৩৫২২: নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৭৫০৪; সহীহ ইবন হিব্বান ২৯৬৫; ইবনুস সুন্নী, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লায়লা ৫৪৫; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ১২৭১: বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ২৫৭

তাবীজ প্রসঙ্গ

তাবীজ শব্দটির আরবী উচ্চারণ تَعْوِيدٌ, যেমন পূর্বে বলা হয়েছে। যে-কোনও সূরা আয়াত কিংবা দু'আ পড়ে ঝাড়ফুঁক করাকে যেমন রুক্‌য়া বলা হয়, তেমনি এর জন্য তাবীজ শব্দেরও ব্যবহার আছে। তবে প্রচলিত অর্থে তাবীজ বলা হয় সূরা বা আয়াত কিংবা দু'আ লিখিতরূপে ব্যবহার করাকে, তা কোনও মাদুলির ভেতরে হোক বা এমনিই সুতায় বেঁধে হোক। এটা সাধারণত গলায় ঝুলিয়ে বা বাহুতে বেঁধে ব্যবহার করা হয়। আরবীতে একে تَمِيمَةٌ বলে।

রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-আপদে ঝাড়ফুঁক করার মতো তাবীজ ব্যবহার করাও শরীয়তসম্মত। তবে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি আছে। কেউ একে সম্পূর্ণ নাজায়েয বলে, এমনকি শিরক সাব্যস্ত করে। অপরদিকে একশ্রেণির লোক ঝাড়ফুঁক ও তাবীজকেই সবকিছু মনে করে। সকল উদ্দেশ্য পূরণে এটাই তাদের একমাত্র অবলম্বন। রোগ-ব্যাধি হলে কোনওমতেই আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করবে না। এ বাড়াবাড়ি কোনওক্রমেই সংগত নয়।

ইসলামপূর্ব যুগেও তাবীজের ব্যবহার ছিল। বিশেষত কুদৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য তারা এর ব্যবহার করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, তাবীজের এমন নিজস্ব শক্তি আছে, যা বদনজরসহ সমস্ত বালা-মসিবত দূর করতে পারে। বলাবাহুল্য, এরূপ বিশ্বাস সম্পূর্ণ শিরক। কোনও মাখলুকেরই নিজস্ব কোনও ক্ষমতা নেই। কোনও বস্তুর দ্বারা যে উপকার লাভ হয়, তা সম্পূর্ণই আল্লাহ তা'আলার দান ও তাঁর ইচ্ছার প্রকাশ। তিনি ইচ্ছা না করলে কারও দ্বারাই কোনও উপকার লাভ বা কারও দ্বারা কোনও ক্ষতি হওয়া সম্ভব নয়। জাহিলী যুগে মানুষ যেহেতু তাবীজের নিজস্ব ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিল, তাছাড়া তারা তাবীজের ভেতর দুর্বোধ্য মন্ত্র যোগ করত, তাই শুরুতে ইসলাম এটাকে হারাম করেছিল। হযরত আলী রাযি. ও হযরত ইবন মাস'উদ রাযি. থেকে বর্ণিত আছে-

«إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ»

'রুক্‌য়া, তাবীজ ও তিওয়ালা শিরক। সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৮৩; সুনানে ইবন মাজাহ ৩৫৩০; মুসনাদে আহমাদ: ৩৬১৫; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৫২০৮; সহীহ ইবন হিব্বান ৬০৯০; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ১০৫০৩; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯৬০৩; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৩২৪০

এ হাদীছে ইসলামপূর্ব কালের রেওয়াজ হিসেবেই তাবীজকে শিরক সাব্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং যে তাবীজে শিরকের কোনও বিষয় থাকবে না, তা জায়েয হবে বৈ কি। কোনও মুসলিম তাবীজের নিজস্ব ক্ষমতায় বিশ্বাস রাখে না। তাদের বিশ্বাস আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতার উপর।

দ্বিতীয়ত তারা তাবীজে কোনও দুর্বোধ্য মন্ত্র বা শিরকী কথাবার্তা যোগ করে না। মুসলিমগণ যে তাবীজ ব্যবহার করে, তাতে কুরআন মাজীদের কোনও সূরা বা আয়াত থাকে কিংবা থাকে হাদীছে বর্ণিত কোনও দু'আ । তাই এরূপ তাবীজে শিরকের কোনও বিষয় নেই। বরং এর দ্বারা নির্ভর করা হয় আল্লাহ তা'আলার উপরই। তাবীজে যে দু'আ লেখা হয়, তা দ্বারা মূলত আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করা হয়, যাতে তিনি বান্দার উদ্দেশ্য পুরণ করেন। আর যদি কুরআন মাজীদের সূরা বা আয়াত লেখা হয়, তবে তার উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহ তা'আলার কালামের বরকত লাভ করা। প্রকারান্তরে এটা আল্লাহ তা'আলারই আশ্রয় গ্রহণ। আল্লাহর কালামে মানুষের অন্তরের রোগ-ব্যাধির যেমন শিফা আছে, তেমনি শিফা আছে শারীরিক রোগ-ব্যাধিরও। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-

وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ

'আমি নাযিল করছি এমন কুরআন, যা মুমিনদের পক্ষে শেফা ও রহমত। সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৮২

সুতরাং তাবীজ ব্যবহার সম্পূর্ণ বৈধ। এর বৈধতা সম্পর্কে হানাফী, মালিকী ও শাফি'ঈ মাযহাবের ইমামগণ একমত। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রহ. থেকেও এর বৈধতা প্রমাণিত আছে। বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাযি. নিজেও তাবীজ লিখেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর থেকে হাদীছ বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ ঘুমের ভেতর ভয় পেলে সে যেন পড়ে-

بِسْمِ اللهِ ،أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ ، مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ ، وَشَرِّ عِبَادِهِ ، وَمِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ ، وَأَنْ يَحْضُرُونِ.

(আল্লাহর নামে। আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের, তাঁর ক্রোধ থেকে, তাঁর শাস্তি থেকে, তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট থেকে, শয়তানদের প্ররোচনা এবং আমার কাছে তাদের উপস্থিতি থেকে)।

এ দু'আ পড়লে শয়তানেরা তার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাযি. তাঁর বালেগ সন্তানদেরকে এ দু'আ শিখিয়ে দিতেন। আর যারা নাবালেগ ছিল, তাদের গলায় এ দু'আ টি কোনও কাগজে লিখে ঝুলিয়ে দিতেন। জামে' তিরমিযী: ৩৫২৮; সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৯৩: মুসনাদে আহমাদ: ৬৬৯৬; বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ৪০৭

বিখ্যাত তাবি'ঈ সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহ.-কে তাবীজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, চামড়ায় লেখা হলে কোনও দোষ নেই।

প্রসিদ্ধ তাবি'ঈ আতা ইবন আবী রাবাহ রহ. বলেন, কুরআন গলায় ঝোলানো হলে কোনও সমস্যা নেই।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি.-এর বিখ্যাত ছাত্র মুজাহিদ রহ, মানুষকে তাবীজ লিখে দিতেন। এমনিভাবে ইমাম বাকির ও ইমাম ইবন সীরীন রহ. থেকেও এর বৈধতা প্রমাণিত। সুতরাং তাবীজকে গড়পড়তায় শিরক ও নাজায়েয বলে দেওয়া নিতান্তই বাড়াবাড়ি। তবে এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনও জরুরি। তাবীজ অবশ্যই আল্লাহর কালাম, হাদীছে বর্ণিত দু'আ বা উৎকৃষ্ট কথার দ্বারা হতে হবে। যে তাবীজে শিরকী মন্ত্র বা দুর্বোধ্য কথাবার্তা থাকে, তা ব্যবহার করা কিছুতেই জায়েয হবে না। জায়েয তাবীজের ক্ষেত্রেও মনে রাখতে হবে যে, এটা কেবলই জায়েয, কোনও ছাওয়াবের কাজ নয়।

ছাওয়াবের কাজ হলো সরাসরি কুরআন তিলাওয়াত করা বা আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'আ করা। কুরআন তিলাওয়াত ও দু'আ পাঠ করা ইবাদত। তাই যে-কোনও নেক মাকসাদ পূরণের জন্য তাবীজ অপেক্ষা এ ব্যবস্থা অবলম্বন করাই উত্তম। উদ্দেশ্য পূরণ না হলেও এ ব্যবস্থা বৃথা যায় না। কেননা তিলাওয়াত ও দু'আর ছাওয়াব তো অবশ্যই পাওয়া যাবে। বান্দার সবচে' বড় লক্ষ্যবস্তু তো ছাওয়াব হাসিল করাই।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে রুক্‌য়া ও তাবীজ

বিপদ আসার পূর্বে বা বদনজর থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থ হিসেবেও রুক্‌য়া ও তাবীজ জায়েয। বহু হাদীছ দ্বারা এর বৈধতা প্রমাণিত। যেমন একবার এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ রাতে আমি দংশিত হয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, কীসে তোমাকে দংশন করেছে? সে বলল, বিচ্ছুতে। তিনি বললেন, তুমি যদি সন্ধ্যাকালে পাঠ করতে أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ (আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের আশ্রয় গ্রহণ করছি তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে), তবে আল্লাহর ইচ্ছায় তা তোমার কোনও ক্ষতি করতে পারত না। সুনানে আবূ দাউদ: ৩৮৯৮; মুসনাদুল বাযযার ৯০৬৬; মুসনাদে ইবনুল জা'দ ১৫৮৫। নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ১০৩৫০; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার ১৬: খারাইডী মাকারিমুল আখলাক ৮৬৯; সহীহ ইবন হিব্বান: ১০২১; বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ৩৬৫

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান ও হুসায়ন রাযি.-কে বদনজর থেকে রক্ষার জন্য বিশেষ একটি দু'আর দ্বারা রুক্‌য়া করতেন। তিনি বলতেন, তোমাদের পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্র ইসমাঈল ও ইসহাক আলাইহিমাস সালামকে এর দ্বারা রুক্‌য়া করতেন। দু'আ টি হলো-

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ.

'আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের, প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত প্রাণি থেকে এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর চোখ থেকে। সহীহ বুখারী: ৩৩৭১

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও ঘুমের আগে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে দু'হাতে ফুঁ দিতেন এবং তা দ্বারা চেহারা ও দেহের যতটুকু সম্ভব মুছে নিতেন। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এছাড়াও বিভিন্ন দু'আ ও আমলের কথা বহু হাদীছে বর্ণিত আছে।

তাবীজ ও ঝাড়ফুঁকের আর্থিক বিনিময় গ্রহণ

ঝাড়ফুঁক ও তাবীজ করে বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয। এ বিষয়ে একটি সুন্দর ঘটনা বর্ণিত আছে। একবার সাহাবায়ে কেরামের একটি দল কোথাও জিহাদের সফর করছিলেন। তারা ছিলেন ৩০ জন। পথে তারা কোনও এক লোকালয়ে যাত্রাবিরতি দেন। তারা ক্ষুধার্ত ছিলেন। তাই সেখানকার লোকজনের কাছে আতিথেয়তার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু সেখানকার লোকজন স্পষ্ট জানিয়ে দিল- আমরা তোমাদের খাবার দিতে পারব না। ওদিকে তাদের গোত্রপতিকে বিচ্ছু দংশন করেছিল। অনেক চেষ্টা করেও তারা তার বিষ নামাতে পারেনি। অগত্যা তারা সাহাবায়ে কেরামের সেই দলটির শরণাপন্ন হলো। আশা ছিল তাদের কাছে রুক্‌য়া জানা কোনও লোক থাকতে পারে। তারা এসে বিনয়ের সঙ্গে জানাল, আমাদের গোত্রপতিকে বিচ্ছু দংশন করেছে। আমরা অনেক চেষ্টা-তদবির করেও তার বিষ নামাতে পারিনি। আপনাদের কাছে কি রুক্‌য়া জানে এমন কেউ আছে?

বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. এ দলে ছিলেন। তিনি বললেন, তা তো আছেই। কিন্তু আমরা তোমাদের কাছে আতিথেয়তা চেয়েছিলাম। তোমরা আমাদের আতিথেয়তা করনি। কাজেই আমি কিছুতেই তোমাদের রুক্‌য়া করব না। অবশ্য তোমরা যদি মজুরি দাও, তবে ভিন্ন কথা। শেষে স্থির হলো তারা একপাল বকরি দেবে। কোনও কোনও বর্ণনায় আছে ৩০টি বকরি দেবে। এতে তিনি রাজি হলেন।

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাযি. তাদের সঙ্গে তাদের গোত্রপতির কাছে গেলেন। সাতবার সূরা ফাতিহা পড়ে তাকে ঝাড়লেন। ফলে সে তখনই ভালো হয়ে গেল। উঠে এমনভাবে হাঁটা শুরু করল, যেন তার কোনও ব্যথাই নেই।

তারা কথা রাখল এবং একপাল বকরি তাঁকে দিয়ে দিল। তিনি বকরির পাল নিয়ে সঙ্গীদের কাছে ফিরে আসলেন। তাদের কেউ কেউ বললেন, এগুলো আমাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হোক। কিন্তু হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. তাতে সম্মত হলেন না। তিনি বললেন, আমি তো রুক্‌য়া ভালো জানি না। তাও এ বকরিগুলো নিয়েছি। কাজেই আমরা এখন এগুলো খাব না; বরং আগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে যাই এবং সবটা বৃত্তান্ত তাঁকে জানাই। তারপর তিনি যা বলেন সেইমতো কাজ করব। সকলে এ কথা মেনে নিলেন। তারপর তারা মদীনায় ফিরে আসলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবটা বৃত্তান্ত শুনে বললেন-

وَمَا يُدْرِيكَ أَنَّهَا رُقْيَةٌ، ثُمَّ قَالَ: قَدْ أَصَبْتُمُ اقْسِمُوا وَاضْرِبُوا لِي مَعَكُمْ سَهْمًا، فَضَحِكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم

'তুমি কী করে জানলে এটা রুক্‌য়া (অর্থাৎ সূরা ফাতিহা দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা যায়)? তা তোমরা সঠিক করেছ। এখন এগুলো বণ্টন করে ফেলো। তোমাদের সঙ্গে আমাকেও একটা ভাগ দিয়ো। এই বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। সহীহ বুখারী: ২২৭৬; জামে' তিরমিযী: ২০৬৪ সুনানে ইবন মাজাহ: ২১৫৬; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৭৪৯০; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৬০১৮: সহীহ ইবন হিব্বান: ৬১১২; হাকিম, আল মুসতাদরাক ২০৫৪; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান ২২৩৭: বাগাৰী, শারহুস সুন্নাহ: ১১৮৯

এ ঘটনা দ্বারা কেবল ঝাড়ফুঁকের বৈধতাই প্রমাণ হয় না; সেইসঙ্গে এটাও প্রমাণ হয় যে, ঝাড়ফুঁক করে আর্থিক বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয আছে। অপর এক হাদীছে উপরে বর্ণিত ঘটনার বিবরণে আছে, সাহাবীগণ বলেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো কুরআনের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন-

«إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ»

'তোমরা যার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ কর, তার মধ্যে কুরআনই শ্রেষ্ঠ। সহীহ বুখারী: ৫৭৩৭; সহীহ ইবন হিব্বান ৫১৪৬; সুনানে দারা কতনী: ৩০৩৮: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ২০১৯; শু'আবূল ঈমান: ২৩৯৩; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২১৮৭

অপর এক সাহাবী একাধারে তিন দিন সকাল-সন্ধ্যা সূরা ফাতিহা দ্বারা এক পাগলকে রুক্‌য়া করেছিলেন। তাতে সে লোকটি সুস্থ হয়ে যায়। তারা সেই সাহাবীকে আর্থিক বিনিময় দিয়েছিল। সাহাবী এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন-

كُلْ فَلَعَمْرِي لَمَنْ أَكَلَ بِرُقْيَةٍ بَاطِلٍ لَقَدْ أَكَلْتَ بِرُقْيَةٍ حَقٍّ

'খাও। আল্লাহর কসম! ওরা তো ভ্রান্ত রুক্‌য়ার বিনিময়ে খেয়ে থাকে। তুমি খাবে সত্য-সঠিক রুক্‌য়ার বিনিময়ে। সুনানে আবূ দাউদ: ৩৪২০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২২৫৮৬; মুসনাদে আবূ দাউদ ওয়ালিসী: ১৪৫৯; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৬০১৭; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৫০৯; ইবনুস সুন্নী, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লায়লা ৬৩০; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২১৫০
এসব হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, ঝাড়ফুঁক ও তাবীজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয। তবে অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের মতো এ ক্ষেত্রেও সততা জরুরি। মানুষকে ঠকিয়ে বা কোনওরকম প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কারও কাছ থেকে অর্থকড়ি হাতিয়ে নেওয়া জায়েয নয় কোনও ক্ষেত্রেই। ঝাড়ফুঁক ও তাবীজ-কবজও তার ব্যতিক্রম নয়। আজকাল যারা এ কাজকে পেশা বানিয়ে নিয়েছে, যারা এর মাধ্যমেই অর্থ উপার্জন করে, তাদের অধিকাংশই এ বিষয়ে সচেতন নয়। এতে করে তাদের উপার্জন যেমন অবৈধ হয়ে যায়, তেমনি কুরআন-হাদীছকেও একরকম অবমাননা করা হয়। কুরআন-হাদীছ ও মাসনূন দু'আসমূহকে অসৎ অর্থোপার্জনের মাধ্যম বানানো এক কঠিনতম পাপকর্ম। এর থেকে বিরত থাকা সকলের জন্য একান্ত অপরিহার্য।

সূরা মুলকের ফযীলত
১০১৬. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কুরআনের ত্রিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা আছে। সূরাটি এক ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করল। ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো। সে সূরাটি হলো تبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ। -আবূ দাউদ ও তিরমিযী। (সুনানে আবূ দাউদ: ১৪০০: জামে' তিরমিযী: ২৮৯১: নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা। ১১৫৪৮: সুনানে ইবন মাজাহ ৩৭৮৬; মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৬২: মুসনাদে ইসহাক ই রাহুয়াহ : ১২২: মুসনাদুল বাযযার ৯৫০৪; সহীহ ইবন হিব্বান ৭৮৭: হাকিম, আল মুসতাদরাক: ২০৭৫)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1016 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «مِنَ القُرْآنِ سُورَةٌ ثَلاثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُلٍ حَتَّى غُفِرَ لَهُ، وَهِيَ: {تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ المُلْكُ}». رواه أَبُو داود والترمذي، (1) وقال: «حديث حسن».
وفي رواية أَبي داود: «تَشْفَعُ».

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: أبو داود (1400)، وابن ماجه (3786)، والترمذي (2891) والنسائي في «الكبرى» (11612).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

সূরা মুলক অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ একটি সূরা। এ সূরায় আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ ও আখিরাত সম্পর্কিত বিশ্বাস বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে আছে মানুষের পার্থিব জীবনযাপনের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। ইহজগতে মানুষের অস্তিত্ব কী উদ্দেশ্যে রয়েছে তার বলিষ্ঠ বয়ান। সে উদ্দেশ্য পূরণে যাতে মানুষ কর্মব্যস্ত থাকে, যাতে সে তার প্রতিটি কাজ সুন্দর ও সুচারুরূপে আঞ্জাম দেয়, সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এক কথায় পরকালীন ও ইহকালীন জীবন সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য মানুষের যা করণীয়, তার হিদায়াত এ সূরায় দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজেই সূরাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

জীবন গঠনমূলক এ সূরাটি বার বার পড়া দরকার। নিয়মিত পড়া দরকার। সেইসঙ্গে তরজমা ও তাফসীর গ্রন্থ থেকে সূরাটির অর্থ ও ব্যাখ্যাও জেনে নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। মানুষ যাতে এ সূরাটি নিয়মিত পড়ে, সেজন্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরাটিকে মুসলিম ব্যক্তির দৈনন্দিন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছেন। এর প্রতি অনুপ্রাণিত করার জন্য তুলে ধরেছেন সূরাটির বিশেষ ফযীলত। এর ফযীলত সম্পর্কে আছে একাধিক হাদীছ।

সূরা মুলকের শাফা'আত কবুল হওয়া
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আলোচ্য হাদীছটিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مِنَ الْقُرْآنِ سُوْرَةٌ ثَلاَثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُلٍ حَتَّى غُفِرَ لَه

(কুরআনের ত্রিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা আছে। সূরাটি এক ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করল। ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো)। কুরআন মাজীদ যে মুমিন ব্যক্তির জন্য এক সুপারিশকারী, পূর্বে ৯৯১ নং হাদীছে তা বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীছ দ্বারা জানা গেল, কুরআন মাজীদের বিশেষ বিশেষ সূরাও সুপারিশ করবে। এতে জানানো হয়েছে, সূরা মুলক এক ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেছে, ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। এ কথাটি বলা হয়েছে অতীতবাচক ক্রিয়াপদ দ্বারা। অর্থাৎ এক ব্যক্তির জন্য এটি ঘটেছে।

সম্ভবত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় এমন এক সাহাবীর ইন্তিকাল হয়েছিল, যিনি সূরা মুলক নিয়মিত পড়তেন এবং এর উপর আমল করতেন, ফলে সূরাটি তার জন্য সুপারিশ করেছে। হাদীছটি জানাচ্ছে, সূরাটির সুপারিশের বদৌলতে সে ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। ক্ষমার চূড়ান্ত রূপ তো হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাত লাভ করা। তা কিয়ামতে মহা বিচারদিবসের পর সম্পন্ন হবে। তবে ক্ষমাপ্রাপ্তির সুফল কেবল সেই দিনের জন্যই নির্ধারিত নয়; তার আগেও মুমিন ব্যক্তি সে সুফল লাভ করে থাকে, যেমন কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাওয়া। এ সাহাবীর বেলায় হয়তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওহী মারফত জানানো হয়েছিল যে, সূরাটির সুপারিশের বদৌলতে আল্লাহ তা'আলা তার কবরের আযাব মাফ করে দিয়েছেন, তাকে কবরে শান্তি দান করেছেন।

এমনও হতে পারে যে, কথাটিকে অতীতবাচক ক্রিয়ায় ব্যক্ত করা হয়েছে বিষয়বস্তুটি জোরদার করার জন্য। কুরআন মাজীদ ও হাদীছে ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য বিষয়ের জন্য অতীতবাচক ক্রিয়ার বহুল ব্যবহার রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও হয়তো তা-ই হয়েছে। এর দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য সূরা মুলক তার পাঠক ও অনুসারীর জন্য অবশ্যই সুপারিশ করবে। তার সুপারিশ করার বিষয়টা এমনই নিশ্চিত, যেন তা ঘটেই গেছে। কাজেই ক্রিয়াপদটি অতীতবাচক হলেও বোঝানো উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ কাল।

সুনানে আবূ দাউদের এক বর্ণনা দ্বারা এ ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়। তাতে আছে- تَشْفَعُ لِصَاحِيهَا (সূরাটি সুপারিশ করবে তার সঙ্গীর জন্য)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি সূরাটি নিয়মিত পাঠ করে এবং এর অনুসরণও করে, তার মৃত্যুর পর সূরাটি তার জন্য সুপারিশ করবে। ফলে কবরে সে আযাব থেকে রক্ষা পাবে এবং কিয়ামতের দিন সে জাহান্নাম থেকে নাজাত পাবে।

লক্ষণীয়, সুপারিশ কার জন্য করবে তা বোঝানোর জন্য لِصَاحِهًا শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দটির উৎপত্তি صُحْبَةٌ (সুহবাত) থেকে। এর অর্থ সঙ্গ ও সাহচর্য। অর্থাৎ সুপারিশ করবে এমন ব্যক্তির জন্য, যে সূরাটির সঙ্গী ও সহচর হয়ে গেছে। তার মানে সূরাটি সে নিয়মিত পড়ে। সে সূরাটির নির্দেশনা অনুসরণ করে চলে। কাজেই সূরাটির সুপারিশ লাভ করতে হলে অবশ্যই নিয়মিত তিলাওয়াত করতে হবে এবং এর হিদায়াত অনুযায়ী চলতে হবে।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আচমকা বলে দেননি যে, সূরা মুলক সুপারিশ করবে। বরং এর প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য খানিকটা সময় নিয়েছেন। শ্রোতার অন্তরে কৌতূহল সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, সেটি কুরআনের এমন এক সূরা, যাতে ৩০টি আয়াত আছে। স্বাভাবিকভাবেই এ কথা শুনলে শ্রোতার অন্তরে কৌতূহল জাগবে। সে মনে মনে খুঁজবে সেটি কোন সূরা। তারা জানার প্রতীক্ষায় থাকবে। প্রতীক্ষার পর যখন কোনও কথা বলা হয়, তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয় এবং তার মর্মবাণী অন্তরে বসে যায়। হাদীছটি অন্তরে বসিয়ে দেওয়ার দরকারও ছিল, যাতে শ্রোতা কখনও না ভোলে এবং সে নিয়মিত এটি পাঠ করতে থাকে। কাজেই কৌতূহল সৃষ্টির পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দেন, সেটি হলো সূরা- تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ (মহিমময় সেই সত্তা, যাঁর হাতে রাজত্ব)। এটি সূরার প্রথম আয়াতের শুরুর অংশ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াতের এ অংশ দ্বারা সূরাটির নামকরণ করেছেন। তিনি আরও অনেক সূরার ক্ষেত্রেই এমন করেছেন। এক শব্দের নাম না বলে আয়াত বা আয়াতের অংশবিশেষকে নাম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে সেসব সূরার সংক্ষিপ্ত নামও আছে। আলোচ্য সূরাটিকে সংক্ষেপে সূরা মুলক বলা হয়। এ নামটি নেওয়া হয়েছে আয়াতের এ অংশেরই الْمُلْكُ। (মুলক = রাজত্ব) শব্দটি থেকে।

আল্লাহর পরিচয় তাঁর কয়েকটি গুণের দ্বারা
আয়াতটির প্রথম অংশে আল্লাহ তা'আলার একটি বিশেষ গুণ তুলে ধরা হয়েছে। তা হলো- তিনি রাজত্ব ও সার্বভৌমত্বের মালিক। তাঁর একটি গুণবাচক নাম اَلْمَلِكُ (মহাবিশ্বের অধিকর্তা ও সার্বভৌম মালিক)। নামটির উৎপত্তি এই 'মুলক' শব্দ থেকেই। 'তাঁর হাতে রাজত্ব' এর অর্থ রাজত্ব ও আধিপত্য তাঁর ক্ষমতায়। হাত দ্বারা রূপকার্থে ক্ষমতা বোঝানো হয়। এটা সব ভাষায়ই আছে।

আয়াতটির শেষাংশে তাঁর আরেকটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে যে- وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُ (তিনি সবকিছুর উপর পরিপূর্ণ শক্তিমান)। তিনি দুনিয়ার রাজা-বাদশাহের মতো নন, যাদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ নয়। তাদের ক্ষমতা নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলে, নির্দিষ্ট পরিমাণে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এমনই জগৎপতি, যাঁর ক্ষমতা মহাবিশ্বের সর্বত্র, সবকিছুতে পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান। তাঁর সে ক্ষমতার এক প্রকাশ হলো জীবন ও মৃত্যুর সৃষ্টি, মহাবিশ্বের সৃষ্টি এবং মানুষের সৃষ্টি। তিনি বলেন-

الَّذِیۡ خَلَقَ الۡمَوۡتَ وَالۡحَیٰوۃَ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا وَہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡغَفُوۡرُ ۙ

'যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে, কর্মে তোমাদের মধ্যে কে উত্তম। তিনিই পরিপূর্ণ ক্ষমতার মালিক, অতি ক্ষমাশীল।'

অর্থাৎ তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। তিনি নাস্তি থেকে তোমাদের অস্তিত্ব দান করেছেন। তারপর আবার তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন। দুনিয়ায় তোমাদেরকে একটা সীমিত আয়ু দান করেছেন। এ সীমিত আয়ু দানের উদ্দেশ্য তোমাদেরকে পরীক্ষা করা। তিনি দেখতে চান তোমাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম। তা দেখতে চাওয়ার অধিকার তো তাঁর আছেই। তিনি তাঁর বান্দাকে পরীক্ষা করতেই পারেন। পরীক্ষা করার উদ্দেশ্য ভালো-মন্দ কাজের জন্য পুরস্কার ও শাস্তি দেওয়া। তিনি অসীম ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী। বান্দাকে যা ইচ্ছা আদেশ করার এখতিয়ার তিনি রাখেন। তাঁর সে ইচ্ছা ও আদেশ প্রতিহত করার ক্ষমতা কারও নেই। আদেশ পালন করলে পুরস্কার দেওয়া এবং অমান্য করলে শাস্তি দেওয়ারও পরিপূর্ণ ক্ষমতা তাঁর আছে। তাতেও কেউ বাধা দেওয়ার শক্তি রাখে না।

যা হোক, ইহজীবনে মানুষ পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে। আল্লাহ পরীক্ষা করছেন কে কাজেকর্মে উত্তম। কর্ম উত্তম হয় সঠিক পন্থায় সঠিক উদ্দেশ্যে সুচারুরূপে করার দ্বারা। আল্লাহ তা'আলা শরীয়ত দিয়েছেন। মানুষ ইহজীবনে কী কী কাজ করবে, কোন কাজ কীভাবে করবে, তার রূপরেখার নাম শরীয়ত। যে কাজ শরীয়ত অনুযায়ী করা হবে, করা হবে পূর্ণ মনোযোগ সহকারে সুন্দর ও নিখুঁতভাবে এবং তা করা হবে আল্লাহ তা'আলাকে রাজি-খুশি করার জন্য, তাই উত্তম কাজ। তবে মানুষের ক্ষমতা সীমিত। নানা প্রতিবন্ধকতা সামনে আছে। তাই ভুলত্রুটি হয়ে যেতে পারে। সে ভলত্রুটির অনুভূতি থাকলে এবং সেজন্য অনুশোচনা প্রকাশ করলে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দেন। কেননা তিনি মহা ক্ষমাশীল।

মানুষ যাতে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনে যত্নবান থাকে, সেজন্য সূরাটির শুরুর দিকে আল্লাহ তা'আলার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। আল্লাহকে চেনা যায় তাঁর গুণাবলি দ্বারা। তাই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃজন এবং এর মধ্যে বিরাজমান আল্লাহর শক্তি-ক্ষমতার বহু বিচিত্র নিদর্শনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। সেসবের প্রতি গভীরভাবে লক্ষ করতে বলা হয়েছে। যাতে সে বুঝতে পারে আল্লাহর সৃষ্টি কত নিখুঁত এবং তিনি কী পরিপূর্ণ হিকমত ও ক্ষমতার মালিক। এর দ্বারা এ শিক্ষাও লাভ হয় যে, মানুষ যেন আপন সাধ্য অনুযায়ী সকল কাজ নিখুঁতভাবে করতে সচেষ্ট থাকে।

এ পৃথিবীতে তার ভোগ-উপভোগের বস্তুরাজি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেসব আহরণ করার জন্য জলে-স্থলে চলাচল করার জন্য রাস্তাঘাটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিটি মানুষের কর্তব্য অলস বসে না থেকে প্রয়োজনীয় বস্তুসামগ্রী সংগ্রহের চেষ্টা করা। আল্লাহর দেওয়া পথে সে বিচরণ করবে আর আল্লাহর দেওয়া রিযিক আহরণ করবে। কারও উপর নির্ভরশীল হবে না। তবে সর্বাবস্থায় তাকে মনে রাখতে হবে, ইহজগৎ অনন্তকালের নয়। একদিন সকলকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তিনি সকলকে তাদের কাজের পরিপূর্ণ প্রতিদান দেবেন। ফলে ভাগ্যবানেরা জান্নাতে যাবে আর হতভাগাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম।

মুমিন ব্যক্তি যদি সূরাটি মন দিয়ে পড়ে আর এসব বিষয়ে চিন্তা করে, তবে আল্লাহর প্রতি তার আকীদা-বিশ্বাস দৃঢ় হবে, তাঁর প্রতি তাওয়াক্কুল ও নির্ভরতায় গভীরতা আসবে, অন্তরে সন্তুষ্টি ও প্রশান্তি ছেয়ে যাবে আর এভাবে সে তাঁর আদেশ-নিষেধ পালনে অনুপ্রাণিত হবে। তারপরও যদি কোনও ভুলত্রুটি হয়ে যায় এবং নফস ও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ত্রুটিবিচ্যুতি করে ফেলে, তবে তাওবার দুয়ার খোলা রয়েছে। তাওবা করলে তিনি ক্ষমা করে দেবেন। মৃত্যুর পর সে সূরাটির সুপারিশ ও আল্লাহ তা'আলার কাছে মাগফিরাত পেয়ে যাবে, যেহেতু তিনি অতি ক্ষমাশীল।

রাতে ঘুমানোর আগে সূরা মুলক পড়া
এতটা বরকত ও কল্যাণ এবং এত গভীর শিক্ষা ও হিদায়াত যে সূরার মধ্যে নিহিত রয়েছে, সে সূরাটি তো বারবারই পড়া উচিত। এটিকে দৈনন্দিন আমলের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া উচিত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তাই করতেন। হযরত জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত-

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ لَا يَنَامُ حَتَّى يَقْرَأَ الْم تَنْزِيلُ، وَتَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ.

'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা আলিফ-লাম-মীম সাজদা ও সূরা তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক না পড়ে ঘুমাতেন না। (জামে' তিরমিযী: ৩৪০৪; মুসনাদে আহমাদ: ১৪৬৫৯; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা : ২৯৮১৬; সুনানে দারিমী: ৩৪৫৪; খারাইতী, মাকারিমুল আখলাক ৯৫১: নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ১০৪৭৭; হাকিম, আল মুসতাদরাক ৩৫৪৫; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ১৪৮৩)

এ হাদীছ দ্বারা বোঝা যায়, ঘুমের আগে যেসব আমল মাসনূন, সূরা মুলক পড়াও তার একটি। কোনও কোনও হাদীছে এটিকে সাধারণভাবে রাতের আমলসমূহের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাযি. থেকে বর্ণিত-

مَنْ قَرَأَ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ كُلَّ لَيْلَةٍ، مَنَعَهُ اللَّهُ بِهَا مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ۔

'যে ব্যক্তি প্রতিরাতে সূরা মুলক পড়বে, আল্লাহ তা'আলা এর প্রতিদানে তাকে কবরের আযাব থেকে মুক্ত রাখবেন। (নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ১০৪৭৯; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ১০২৫৪; আল মু'জামুল আওসাত: ৬২১৬)

হযরত ইবন মাস'উদ রাযি. বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এ সূরাটিকে 'আল-মানিআ' নামে অভিহিত করতাম। আল-মানিআ অর্থ রক্ষাকারী অর্থাৎ এটি কবরের আযাব থেকে রক্ষা করবে অথবা এটি গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে, যা কিনা কবর আযাবের কারণ।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাযি.-এর হাদীছে ঘুমের আগে পড়ার কথা নেই। হযরত জাবির রাযি. বর্ণিত হাদীছের সঙ্গে এ হাদীছটিকে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায় এ সূরাটি ইশার নামাযের পরে ঘুমের আগপর্যন্ত যে-কোনও সময়ই পড়া যেতে পারে।

পরিবারের প্রত্যেককে সূরা মুলক শেখানো
মোটকথা সূরা মুলক অত্যন্ত মুবারক ও কল্যাণময় একটি সূরা। মানুষের জীবনগঠনে এর বিশাল ভূমিকা রয়েছে। আখিরাতের জীবনেও সূরাটি তার পাঠকের পক্ষে অতীব উপকারী সাব্যস্ত হবে। সুতরাং মানুষের জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সূরাটি এক মহামূল্যবান উপহার।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. একদিন তাঁর এক শিষ্যকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, আমি কি তোমাকে একটি উপহার দেব, যা পেয়ে তুমি খুব খুশি হবে? শিষ্য বলল, অবশ্যই হে আবূল আব্বাস। আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। তিনি বললেন, তুমি সূরা তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক পড়বে। এটি মুখস্থ করবে। এটি তোমার স্ত্রীকে শেখাবে। তোমার ছেলেমেয়ে ও ঘরের শিশুদেরকে শেখাবে, শেখাবে প্রতিবেশীদেরকেও। কেননা এটি নাজাতদাতা। কিয়ামতের দিন এটি তার পাঠকের পক্ষে তার প্রতিপালকের কাছে ফরিয়াদ করবে, যেন তিনি তাকে জাহান্নাম থেকে নাজাত দেন। যে ব্যক্তি এ সূরাটি নিয়মিত পড়বে, আল্লাহ তা'আলা তাকে এর অসিলায় কবরের আযাব থেকে রক্ষা করবেন।

হযরত ইবন মাস'উদ রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

لَوَدِدْتُ أَنَّهَا فِيْ قَلْبِ كُلِّ إِنْسَانٍ مِنْ أُمَّتِيْ.

'আমার কামনা, এ সূরাটি আমার উম্মতের প্রতিটি লোকের অন্তরে থাকুক। তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ১১৬১৬; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২২৭৭

হযরত ইবন মাস'উদ রাযি. বলেন, মৃতব্যক্তির কবরে (শাস্তিদাতা ফিরিশতাদের) উপস্থিতি ঘটবে। প্রথমে তারা আসবে তার দু'পায়ের দিক থেকে। তখন তার পা'দুটি বলবে, আমার দিক থেকে তোমাদের জন্য কোনও পথ নেই। কারণ সে আমার উপর ভর করে সূরা মুলক পড়ত। তারপর আসবে তার বুকের দিক থেকে। বুক বলবে, আমার দিক থেকে তোমাদের জন্য কোনও পথ নেই। কারণ সে আমার ভেতর সূরা মুলক সংরক্ষণ করত। তারপর আসবে তার মাথার দিক থেকে। মাথা বলবে, আমার দিক থেকে তোমাদের জন্য কোনও পথ নেই। কারণ সে আমার দ্বারা সূরা মূলক পড়ত। এভাবে এ সূরা তাকে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করবে। মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৬০২৫; হাকিম, আল মুসতাদরাক দরাক: ৩৮৩৯; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২২৭৯

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, জনৈক সাহাবী একটি কবরের উপর ঘর তৈরি করেছিলেন। তার জানা ছিল না সেটি কবর। হঠাৎ তিনি শুনতে পান এক ব্যক্তি সূরা তাবারাকা (সূরা মুলক) পাঠ করছে। সে পূর্ণ সূরাটি পাঠ করে ফেলে।

সেই সাহাবী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ! আমি একটি কবরের উপর ঘর তৈরি করেছি। আমার জানা ছিল না সেটি কবর। হঠাৎ শুনতে পাই তাতে এক ব্যক্তি সূরা তাবারাকা পাঠ করছে। সে শেষ পর্যন্ত সূরাটি পাঠ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ সূরাটি রক্ষাকারী- কবরের আযাব থেকে রক্ষা করে। জামে তিরমিযী: ২৮৯০; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২২৮০

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. রাতের বেলা, বিশেষত ঘুমের আগে সূরা মুলক তিলাওয়াত করার দ্বারা কবরের আযাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কাজেই আমরা রাতের বেলা এ সূরাটি নিয়মিত পড়ব।

খ. সূরাটির সুপারিশ পাওয়ার জন্য এর শিক্ষা ও হিদায়াত অনুসারে আমল করাও জরুরি।

গ. বান্দার পক্ষে যারা সুপারিশ করবে, সূরা মুলক তার অন্যতম।

ঘ. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে মুমিন ব্যক্তির জন্য সুপারিশের অনুমতি থাকার বিষয়টা সত্য। এটা ইসলামের একটি আকীদা। এর উপর বিশ্বাস রাখা চাই।

ঙ. সবকিছুর নিরঙ্কুশ মালিকানা কেবল আল্লাহ তা'আলারই আছে। নিরঙ্কুশ আধিপত্য কেবল তাঁরই, অন্য কারও নেই। যার যা মালিকানা বা আধিপত্য, তা অতি সীমিত পরিসরে ও সীমিত পরিমাণে এবং সীমিত সময়ের জন্য।

চ. পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে সূরা মুলক শেখানো উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান