প্রবন্ধ
নারী সাহাবীদের পারিবারিক জীবন
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৩৬১
০
দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবন হলো মানব সভ্যতার মূল ভিত্তি ও সুখের এক স্বর্গীয় নীড়। ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্পত্য জীবন কেবল একটি জৈবিক বা সামাজিক চুক্তি নয়, বরং তা আত্মিক প্রশান্তি, পারস্পরিক ভালোবাসা ও মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহা সোপান। একটি আদর্শ পরিবার কীভাবে গঠিত হয় এবং সেখানে পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্যের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখতে হয়, তার সর্বোত্তম বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে সোনালী যুগের পুণ্যবতী নারী সাহাবীগণের জীবনের পরতে পরতে।
যাঁরা সরাসরি নবীজি (ﷺ)-এর তত্ত্বাবধানে তারবিয়াত বা দীক্ষা লাভ করেছিলেন, তাঁদের পারিবারিক জীবন ছিল স্বর্গীয় আলোয় উদ্ভাসিত। আধুনিক পৃথিবীর নানামুখী সংকটে জর্জরিত পারিবারিক কাঠামোকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে সেই মহীয়সী নারীদের পারিবারিক জীবনকে আমাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে, স্বামীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশে, সন্তানদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এবং সর্বোপরি ঘরের কোণকে প্রশান্তির উৎস বানাতে তাঁরা যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে।
অনুপম মোহর ও দ্বীনী আদর্শের মেলবন্ধন
পারিবারিক জীবনের সূচনা ঘটে বিবাহের মাধ্যমে, আর বিবাহের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো মোহরানা। ইসলামের এই বিধানটিকে নারী সাহাবীগণ আড়ম্বর বা বৈষয়িক অহংকারের হাতিয়ার বানাননি, বরং তাঁরা একে দ্বীনী আদর্শ ও আত্মিক কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল ও অনুপম উদাহরণ হলেন হযরত উম্মে সুলাইম (রা.)।
হযরত আবু তালহা (রা.) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে যখন হযরত উম্মে সুলাইম (রা.)-এর নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠান, তখন তিনি কোনো পার্থিব ধন-সম্পদ দাবি করেননি। তিনি পার্থিব ধন-সম্পদকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে এক ঐতিহাসিক প্রস্তাব পেশ করেন।
হযরত আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন,
خطب أبو طلحة أم سليم قبل أن يسلم فقالت: أما إني فيك لراغبة، وما مثلك يرد، ولكنك رجل كافر، وأنا امرأة مسلمة، فإن تسلم فذاك مهري، لا أسأل غيره، فأسلم وتزوجها أبو طلحة.
"আবু তালহা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উম্মে সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। তখন উম্মে সুলাইম বললেন: হে আবু তালহা, আপনার মতো মানুষের বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু আপনি একজন কাফির আর আমি একজন মুসলিম নারী (আমার জন্য আপনাকে বিয়ে করা সাজে না)। যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে সেটাই হবে আমার মোহরানা, এ ছাড়া আমি আপনার কাছে আর কোনো মোহর দাবি করব না। অতঃপর আবু তালহা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং উম্মে সুলাইমকে বিয়ে করলেন।" (নাসায়ী: ৩৩৪১)
পার্থিব স্বর্ণ-রৌপ্য বা ধন-দৌলতের চেয়ে ঈমান ও হিদায়াতকে মোহর হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই মহান মানসিকতা তাঁদের দাম্পত্য জীবনকে বরকতময় করে তুলেছিল।
হযরত উম্মে সুলাইম (রা.)-এর পবিত্র আত্মত্যাগের কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে সুসংবাদ দান করেন। হযরত আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
دَخَلْتُ الْجَنَّةَ فَسَمِعْتُ خَشْفَةً فَقُلْتُ مَنْ هَذَا قَالُوا هَذِهِ الْغُمَيْصَاءُ بِنْتُ مِلْحَانَ أُمُّ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ.
"আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম এবং একটি পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এটি কে? তাঁরা বললেন, এটি হলেন উম্মে আনাস বিন মালিক গুমাইসা বিনতে মিলহান।" (মুসলিম: ২৪৫৬)
দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সহযোগিতা
নারী সাহাবীগণের দাম্পত্য জীবন কেবল সুখের আলস্যে ঘেরা ছিল না, বরং তা ছিল পরিশ্রম, সহযোগিতা ও আন্তরিকতায় পূর্ণ। তাঁরা স্বামীর আর্থিক অভাব-অনটনে নিজেদের ঘরের সমস্ত কাজ নিজের হাতে করতেন। কোনো অলসতা বা অহংকার তাঁদের স্পর্শ করতে পারেনি।
নবীজি (ﷺ)-এর অতি আদরের কন্যা এবং জান্নাতের নারীদের সর্দার হযরত ফাতিমা (রা.)-এর জীবন ছিল এর অনন্য প্রমাণ। সংসারের প্রয়োজনে যাতা ঘুরিয়ে আটা পেষার কারণে তাঁর পবিত্র হাতে ফোসকা পড়ে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কন্যা হওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনো রাজকীয় বিলাসিতা পাননি এবং নিজের কাজ নিজে করতে কখনো সংকোচ বোধ করেননি।
হযরত আলী (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর হাতে কঠোর পরিশ্রমের কারণে যাতা ঘোরানোর দাগ পড়ে গিয়েছিল। (বুখারী: ৩১১৩)
অনুরূপ দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যায় হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.)-এর দাম্পত্য জীবনে। অত্যন্ত অভিজাত ঘরের কন্যা এবং হযরত আবু বকর (রা.)-এর সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তিনি যখন হযরত যুবাইর (রা.)-এর ঘরণী হলেন, তখন স্বামীর দারিদ্র্যকে আনন্দের সাথে বরণ করে নেন।
হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নিজের ঘরের কাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন:
تَزَوَّجَنِى الزُّبَيْرُ ، وَمَا لَهُ فِى الأَرْضِ مِنْ مَالٍ ، وَلاَ مَمْلُوكٍ ، وَلاَ شَىْءٍ غَيْرَ نَاضِحٍ ، وَغَيْرَ فَرَسِهِ ، فَكُنْتُ أَعْلِفُ فَرَسَهُ ، وَأَسْتَقِى الْمَاءَ ، وَأَخْرِزُ غَرْبَهُ وَأَعْجِنُ
"যুবাইর যখন আমাকে বিয়ে করেন, তখন তাঁর কোনো ধন-সম্পদ ছিল না, কোনো দাস-দাসীও ছিল না; কেবল পানি বহনের একটি উট এবং একটি ঘোড়া ছাড়া। তখন আমি নিজেই তাঁর ঘোড়াকে ঘাস-পানি দিতাম, পানি টেনে আনতাম, চামড়ার বালতি ছিঁড়ে গেলে সেলাই করতাম এবং আটা খামির করতাম।" (বুখারী: ৫২২৪)
এই আন্তরিকতা ও কষ্টসহিষ্ণুতা প্রমাণ করে যে, নারী সাহাবীগণ ঘরের কাজকে অবমাননাকর মনে করতেন না, বরং স্বামীর সুখের জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখাকে গৌরবের বিষয় মনে করতেন।
দাম্পত্য জীবনে পরিমিত আনন্দবোধ ও উচ্ছলতা
নারী সাহাবীগণের পারিবারিক জীবন কেবল নিরস কর্তব্য পালনের শুষ্কতায় ঘেরা ছিল না, বরং সেখানে ছিল পরিমিত পরিমাণে আনন্দ, কৌতুক ও খুনসুটির মধুর ছোঁয়া। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর স্ত্রীদের সাথে খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত হতেন, যা ঘরোয়া পরিবেশকে আনন্দময় করে তুলত।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজি (ﷺ)-এর সাথে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি মধুর স্মৃতিচারণ করে বলেছেন:
تَعَالَى أُسَابِقُكِ، فَسَابَقْتُهُ، فَسَبَقْتُهُ عَلَى رِجْلَيَّ... وَسَابَقَنِي بَعْدَ أَنْ حَمَلْتُ اللَّحْمَ وَبَدُنْتُ فَسَبَقَنِي وَجَعَلَ يَضْحَكُ وَقَالَ هَذِهِ بِتِلْكَ!
"একবার নবীজি (ﷺ) আমাকে বললেন, 'এসো, তোমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করি।' আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম এবং পায়ে হেঁটে আমি তাঁর আগে চলে গেলাম। পরবর্তীতে যখন আমার শরীর কিছুটা ভারী হয়ে গেল, তখন তিনি আবার আমার সাথে প্রতিযোগিতা করলেন এবং এবার তিনি আমাকে পেছনে ফেলে বিজয়ী হলেন। তখন তিনি হাসতে হাসতে বললেন, 'এই বিজয়টি পূর্বের পরাজয়ের প্রতিশোধ!'" (মুসনাদে আহমাদ ২৬২৭৭ )
পারিবারিক জীবনে এই আনন্দময় খুনসুটি কেবল স্বামী-স্ত্রীর মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সতীনদের মাঝেও ছিল সুন্দর ও কৌতুকপূর্ণ সম্পর্ক, যা ঘরের গাম্ভীর্য ও একঘেয়েমি দূর করতে সাহায্য করত।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে আরেকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যা নারী সাহাবীগণের গৃহকোণের সজীবতার প্রমাণ বহন করে। তিনি বলেন:
أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِخَزِيرَةٍ طَبَخْتُهَا لَهُ، فَقُلْتُ لِسَوْدَةَ وَالنَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بَيْنِي وَبَيْنَهَا فَقُلْتُ لَهَا: كُلِي. فَأَبَتْ، فَقُلْتُ: لَتَأْكُلِنَّ أَوْ لأَلْطَخَنَّ وَجْهَكِ. فَأَبَتْ، فَوَضَعْتُ يَدِي فِي الْخَزِيرَةِ فَطَلَيْتُ بِهَا وَجْهَهَا، فَضَحِكَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم، فَوَضَعَ فَخِذَهُ لَهَا وَقَالَ لِسَوْدَةَ: الْطِخِي وَجْهَهَا، فَلَطَّخَتْ وَجْهِي، فَضَحِكَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَيْضًا
"আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য পায়েস (খাযীরাহ) রান্না করে নিয়ে আসলাম। সেখানে নবীজি (ﷺ) আমার এবং সাওদার মাঝখানে বসেছিলেন। আমি সাওদাকে বললাম, 'খাও।' কিন্তু সে অস্বীকৃতি জানাল। তখন আমি বললাম, 'তোমাকে অবশ্যই খেতে হবে, অন্যথায় আমি তোমার মুখে এটি মাখিয়ে দেব।' তবুও সে অস্বীকৃতি জানালে আমি খাযীরাহতে হাত দিয়ে তার মুখে মাখিয়ে দিলাম। এতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হেসে উঠলেন এবং তিনি নিজের উরুটি সাওদার দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়ে বললেন, 'তুমিও ওর মুখে এটি মাখিয়ে দাও।' অতঃপর সাওদাও আমার মুখে তা মাখিয়ে দিল এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবারও হাসলেন।" (মুসনাদে আবু ইয়া’লা: ৪৪৭৬)
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে এই পারস্পরিক হৃদ্যতা ও ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে দাম্পত্য জীবনের ক্লান্তি ও একঘেয়েমি সহজেই দূর হয়ে যেত।
পরনিন্দা ও অসার কথাবার্তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখা
একটি সুন্দর ও সুখী পরিবার গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ঘরের নারীদের পরনিন্দা, গীবত এবং অসার কথাবার্তা থেকে দূরে থাকা। নারী সাহাবীগণের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষের পরিবর্তে ছিল অসাধারণ তাকওয়া ও আত্মনিয়ন্ত্রণ, যা তাঁদের কুৎসা রটানো থেকে রক্ষা করত।
ইসলামের ইতিহাসে যখন মুনাফিকরা হযরত আয়েশা (রা.)-এর নামে অপবাদ রটনা করেছিল এবং মদীনার সমাজে এক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল, তখন নবীপত্নী হযরত যাইনাব বিনতে জাহশ (রা.) সতীন হওয়া সত্ত্বেও আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।
হযরত আয়েশা (রা.) নিজেই যাইনাব (রা.)-এর এই মহৎ গুণের প্রশংসা করে বলেন:
وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سَأَلَ زَيْنَبَ بِنْتَ جَحْشٍ زَوْجَ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم عَنْ أَمْرِى مَا عَلِمْتِ أَوْ مَا رَأَيْتِ . فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَحْمِى سَمْعِى وَبَصَرِى وَاللَّهِ مَا عَلِمْتُ إِلاَّ خَيْرًا . وَهِىَ الَّتِى كَانَتْ تُسَامِينِى مِنْ أَزْوَاجِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فَعَصَمَهَا اللَّهُ بِالْوَرَعِ.
"রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার চরিত্র সম্পর্কে নবীপত্নী হযরত যাইনাব বিনতে জাহশ (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'তুমি আয়েশা সম্পর্কে কী জানো বা কী দেখেছ?' তখন যাইনাব বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি আমার কান ও চোখের হেফাজত করছি। আল্লাহর কসম, আমি তাঁর সম্পর্কে ভালো ছাড়া আর কিছুই জানি না।' আয়েশা (রা.) বলেন, যাইনাবই ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে আমার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু তাঁর খোদাভীতি ও পরহেজগারির কারণে মহান আল্লাহ তাঁকে পাপ থেকে রক্ষা করেছেন।" (মুসলিম: ২৭৭০)
এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, নারী সাহাবীগণ সতীনের হিংসাকে ঈমানী তাকওয়া দিয়ে জয় করেছিলেন। অন্যের কুৎসা রটনা বা অসার আলোচনা থেকে জিহ্বাকে হেফাজত করা মুমিনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
অর্থনৈতিক সংকটে ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে স্বামীর পাশে থাকা
পারিবারিক জীবনে সচ্ছলতা ও প্রাচুর্য সবসময় একরকম থাকে না। জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক সংকটে স্বামীর পাশে থাকা স্ত্রীর অন্যতম বড় দায়িত্ব। এই গুণের সর্বোত্তম নমুনা ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.)।
তিনি ছিলেন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী নারী। কিন্তু বিয়ের পর তিনি নিজের সমস্ত সম্পদ আল্লাহর দ্বীনের জন্য এবং তাঁর প্রিয় স্বামীর সেবায় উৎসর্গ করে দেন। কুরাইশরা যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং মুসলমানদের শিআবে আবি তালিবে অবরুদ্ধ করে তিন বছর অর্থনৈতিক বয়কট আরোপ করেছিল, তখন এই মহীয়সী নারী তাঁর বিপুল ঐশ্বর্য ও আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে স্বামীর সাথে গাছের পাতা খেয়ে দিনাতিপাত করেছিলেন, কিন্তু ক্ষণিকের জন্যও অনুযোগ করেননি।
তাঁর এই চরম ত্যাগ ও অবিচল সমর্থনের কারণে মহান আল্লাহ ও জিবরাইল (আ.) আকাশ থেকে তাঁকে সালাম পাঠিয়েছিলেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أَتَى جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَذِهِ خَدِيجَةُ قَدْ أَتَتْ وَمَعَهَا إِنَاءٌ فِيهِ إِدَامٌ، أَوْ طَعَامٌ أَوْ شَرَابٌ، فَإِذَا هِيَ أَتَتْكَ فَاقْرَأْ عَلَيْهَا السَّلَامَ مِنْ رَبِّهَا وَمِنِّي، وَبَشِّرْهَا بِبَيْتٍ فِي الْجَنَّةِ مِنْ قَصَبٍ، لَا صَخَبَ فِيهِ وَلَا نَصَبَ.
"একদা জিবরাইল (আ.) নবীজি (ﷺ)-এর নিকট এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, এই যে খাদিজা আপনার নিকট আসছেন। তাঁর সাথে একটি পাত্র রয়েছে, যাতে তরকারি, খাদ্য অথবা পানীয় আছে। তিনি যখন আপনার কাছে পৌঁছাবেন, তখন আপনি তাঁকে তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম জানাবেন। আর তাঁকে জান্নাতের এমন একটি মুক্তানির্মিত প্রাসাদের সুসংবাদ দিন, যেখানে কোনো শোরগোল থাকবে না এবং কোনো ক্লান্তি বা কষ্ট থাকবে না।'" (বুখারী: ৩৮২০)
সুদিনের ভালোবাসার চেয়ে দুর্দিনের অবিচল ছায়া যে কত বেশি দামি ও গৌরবময়, তা উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.)-এর এই জীবনাদর্শ থেকে আজ প্রতিটি মুসলিম নারীর শিক্ষা নেওয়া উচিত।
স্বামীর অনুপস্থিতিতে পবিত্রতা ও বিশ্বস্ততা রক্ষা
দাম্পত্য জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য ও অলঙ্কার হলো পারস্পরিক বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততা রক্ষা করা। বিশেষ করে স্বামীর অনুপস্থিতিতে স্ত্রীর নিজের সতীত্ব, সম্মান এবং স্বামীর আমানতের নিখুঁত হেফাজত করা ঈমানের দাবি। পুণ্যবতী নারী সাহাবীগণ স্বামীর অনুপস্থিতিতে তাঁর আত্মমর্যাদার প্রতি সর্বোচ্চ খেয়াল রাখতেন এবং এমন কোনো কাজ করতেন না যা স্বামীর মনে বিন্দুমাত্র সংশয় বা আঘাত হানতে পারে।
হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি স্বামীর চরম দারিদ্র্যের কারণে অনেক কষ্ট করে মাঠ থেকে খেজুরের আঁটি সংগ্রহ করে মাথায় বয়ে আনতেন। একদিন তিনি খেজুরের আঁটি মাথায় নিয়ে আসার সময় পথিমধ্যে নবীজি (ﷺ) ও তাঁর সাথে কিছু আনসার সাহাবীর দেখা হয়। নবীজি (ﷺ) তাঁকে পেছনে বসিয়ে নেওয়ার জন্য পরম স্নেহে উট থামালেন। কিন্তু আসমা (রা.) তাঁর স্বামী হযরত যুবাইর (রা.)-এর তীব্র আত্মমর্যাদাবোধ ও ঈর্ষার (গায়রাত) কথা স্মরণ করে লজ্জিত হলেন এবং উটে আরোহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন।
আসমা (রা.) নিজেই এই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন:
فجِئْتُ يَوْماً وَالنَّوَى عَلَى رَأْسِى فَلَقِيتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَمَعَهُ نَفَرٌ مِنَ الأَنْصَارِ فَدَعَانِى ثُمَّ قَالَ :« إِخْ إِخ » . لِيَحْمِلَنِى خَلْفَهُ ، فَاسْتَحْيَيْتُ أَنْ أَسِيرَ مَعَ الرِّجَالِ ، وَذَكَرْتُ الزُّبَيْرَ وَغَيْرَتَهُ ، وَكَانَ أَغْيَرَ النَّاسِ ، فَعَرَفَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنِّى قَدِ اسْتَحْيَيْتُ فَمَضَى ، فَجِئْتُ الزُّبَيْرَ فَقُلْتُ : لَقِيَنِى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَعَلَى رَأْسِى النَّوَى ، وَمَعَهُ نَفَرٌ مِنْ أَصْحَابِهِ ، فَأَنَاخَ لأَرْكَبَ ، فَاسْتَحْيَيْتُ مِنْهُ وَعَرَفْتُ غَيْرَتَكَ.
"একদিন আমি মাথায় করে খেজুরের আঁটি নিয়ে আসছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে আমার দেখা হলো। তাঁর সাথে কয়েকজন আনসার সাহাবীও ছিলেন। তিনি আমাকে তাঁর পেছনে বসিয়ে নেওয়ার জন্য উটকে থামানোর উদ্দেশ্যে 'ইখ ইখ' শব্দ করলেন। কিন্তু পুরুষদের সাথে পথ চলতে আমার অত্যন্ত লজ্জা হলো। আমার মনে পড়ে গেল যুবাইরের কথা এবং তাঁর আত্মমর্যাদাবোধের কথা। সে ছিল অত্যন্ত আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বুঝতে পারলেন যে আমি লজ্জা পাচ্ছি, তাই তিনি চলে গেলেন। অতঃপর আমি যুবাইরের নিকট এসে বললাম, আজ মাথায় খেজুরের আঁটি নিয়ে আসার সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তাঁর সাথে কয়েকজন সাহাবীও ছিলেন। তিনি আমাকে আরোহণ করানোর জন্য উট বসিয়েছিলেন, কিন্তু পুরুষদের উপস্থিতিতে আমি লজ্জিত হয়েছি এবং তোমার আত্মমর্যাদা ও ঈর্ষার কথা আমার মনে পড়ে গিয়েছিল।" (বুখারী: ৫২২৪)
স্বামীর অনুপস্থিতিতেও তাঁর ভালোলাগা, মন্দলাগা এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি এমন সজাগ দৃষ্টি রাখা দাম্পত্য সম্পর্কের অনন্য গভীরতার পরিচয় দেয়। আজকের যুগের অনেক নারীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বামী চোখের আড়াল হলেই পোশাক-আশাক ও চালচলনে এক ধরণের অনভিপ্রেত শিথিলতা চলে আসে, যা স্বামীর পছন্দ নয়। নারী সাহাবীগণের এই অনুপম চরিত্র আমাদের শেখায় যে, আদর্শ স্ত্রী তিনিই যিনি স্বামীর উপস্থিতিতে এবং অনুপস্থিতিতে সমানভাবে নিজের ও পরিবারের মর্যাদা রক্ষা করেন।
সৌন্দর্যচর্চা ও দাম্পত্য সুখের আবহ তৈরি
দাম্পত্য জীবনকে চিরসবুজ, প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় রাখতে নারীর সৌন্দর্যচর্চা ও পরিপাটি থাকা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে। নারী সাহাবীগণ তাঁদের স্বামীদের সামনে নিজেদেরকে আকর্ষণীয় ও সুসজ্জিত রূপে উপস্থাপন করতেন। তাঁরা ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্যই পরিপাটি হতেন না, বরং ঘরে স্বামীর জন্য সেজেগুজে পরম আগ্রহে অপেক্ষা করতেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ ইবনুল হাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রী আয়িশা (রাযিঃ) এর খেদমতে উপস্থিত হই। তখন তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার নিকট উপস্থিত হয়ে আমার হাতে রূপার বড় বড় আংটি দেখতে পান। তিনি বলেন, হে আয়িশা! এ কি? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার উদ্দেশ্যে রূপচর্চা করার জন্য তা তৈরি করিয়েছি।
নারী সাহাবীগণ যেমন নিজেদেরকে স্বামীদের সামনে সুসজ্জিত রূপে উপস্থাপন করতেন, তেমনি স্বামীদেরকে পরিপাটি ও সুশ্রী রাখার ব্যাপারেও ছিলেন সমান যত্নশীল। গভীর ভালোবাসা ও পরম যত্নে স্বামীর চুল আঁচড়ে দেওয়া বা সুগন্ধি মাখিয়ে দেওয়ার মতো রূপচর্চাতেও তারা শামিল হতেন। এটি তাঁদের দাম্পত্য জীবনে এক মধুর ও প্রাণবন্ত আবহ তৈরি করত।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি নবীজি (ﷺ)-এর ইতিকাফের সময়ও অত্যন্ত যত্নসহকারে তাঁর চুল আঁচড়ে দিতেন। তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন:
كَانَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- إِذَا اعْتَكَفَ يُدْنِى إِلَىَّ رَأْسَهُ فَأُرَجِّلُهُ
"নবীজি (ﷺ) যখন ইতিকাফে থাকতেন, তখন তিনি তাঁর পবিত্র মাথাটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিতেন। আর আমি তাঁর চুল আঁচড়ে দিতাম।" (মুসলিম: ২৯৭)
হযরত আয়েশা (রা.) আরও বলেছেন যে, তিনি নবীজি (ﷺ)-কে সর্বোত্তম সুগন্ধি দ্বারা সুবাসিত করতেন:
كُنْتُ أُطَيِّبُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- بِالْغَالِيَةِ الْجَيِّدَةِ
"আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সর্বোত্তম ও উৎকৃষ্ট মানের সুগন্ধি লাগিয়ে দিতাম।" (ত্বহাবী: ৩৫৮৭)
এছাড়াও দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সন্তুষ্টি ও সুখানুভূতি অর্জনের জন্য স্ত্রীদের মাঝে যে সুন্দর ও অহিংস প্রতিযোগিতা চলত, তা ছিল সত্যিই মুগ্ধকর। একবার হযরত সাফিয়্যাহ (রা.) নবীজি (ﷺ)-এর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি ফিরে পাওয়ার জন্য তাঁর নিজের নির্ধারিত দিনটি হযরত আয়েশা (রা.)-কে উপহার দিয়েছিলেন। তিনি জাফরান রঙে রাঙানো একটি ওড়না নিয়ে তাতে সুগন্ধ ছড়ানোর জন্য পানি ছিটিয়েছিলেন, যাতে চারদিক সুবাসিত হয়ে ওঠে।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন:
وَجَدَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَلَى صَفِيَّةَ بِنْتِ حُيَيٍّ فَقَالَتْ لِي: هَلْ لَكِ إِلَى أَنْ تُرْضِينَ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَنِّي وَأَجْعَلُ لَكِ يَوْمِي؟ قُلْتُ: نَعَمْ، فَأَخَذَتْ خِمَارًا لَهَا مَصْبُوغًا بِزَعْفَرَانٍ، فَرَشَّتْهُ بِالْمَاءِ، ثُمَّ اخْتَمَرَتْ بِهِ، لِيَفُوحَ رِيحُهُ، ثُمَّ دَخَلَتْ عَلَيْهِ فِي يَوْمِهَا، فَجَلَسَتْ إِلَى جَنْبِهِ، فَقَالَ: "إِلَيْكِ يَا عَائِشَةُ! فَلَيْسَ هَذَا يَوْمَكِ!" فَقُلْتُ: فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ، ثُمَّ أَخْبَرْتُهُ خَبَرِي، فَرَضِيَ عَنْهَا.
"রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াইয়ের ওপর কোনো কারণে অসন্তুষ্ট হলেন। তখন সাফিয়্যাহ আমাকে বললেন, 'তুমি কি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আমার ওপর সন্তুষ্ট করে দিতে পারবে? যদি পারো, তবে আমার নির্ধারিত দিনটি আমি তোমাকে দিয়ে দেব।' আমি বললাম, 'হ্যাঁ, পারব।' অতঃপর তিনি তাঁর জাফরান রঙে রাঙানো একটি ওড়না নিলেন এবং সুগন্ধ ছড়ানোর জন্য তাতে পানি ছিটালেন। তারপর সেটি মাথায় জড়িয়ে নির্ধারিত দিনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট গেলেন এবং তাঁর পাশে গিয়ে বসলেন। তারপর আমি নবীজি (ﷺ)-এর কাছে উপস্থিত হলাম। তখন নবীজি (ﷺ) বললেন, 'হে আয়েশা, তুমি এখান থেকে যাও, আজ তো তোমার নির্ধারিত দিন নয়।' আমি বললাম, 'এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন।' এরপর আমি বিস্তারিত সব খুলে বললে নবীজি (ﷺ) সাফিয়্যাহর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন।" (মুসনাদে আহমাদ: ২৫১২২)
লাজুকতা ও নারীত্বের চিরন্তন সৌন্দর্য
লজ্জাশীলতা বা লাজুকতা হলো নারীর প্রধানতম ভূষণ এবং ঈমানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। নারী সাহাবীগণের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে এই লজ্জাশীলতা এক অপূর্ব মহিমায় প্রকাশ পেত। কেবল জীবদ্দশায় কোনো পরপুরুষের সামনেই নয়, বরং মৃত্যুর পরেও তাঁদের অবচেতন মনেও এই লজ্জাশীলতার পবিত্র চেতনা জাগ্রত থাকত।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর জীবন থেকে এর একটি অসামান্য ও বিস্ময়কর উদাহরণ পাওয়া যায়। নবীজি (ﷺ) ও তাঁর পিতা হযরত আবু বকর (রা.) যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁদেরকে আয়েশা (রা.)-এর কামরাতেই দাফন করা হয়েছিল। তখনও আয়েশা (রা.) নিজের ঘরে স্বাভাবিক পোশাকে ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতেন। কিন্তু যখন সেখানে পরপুরুষ হযরত উমর (রা.)-কে দাফন করা হলো, তখন থেকে তিনি নিজের ঘরেও পর্দার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন শুরু করেন।
হযরত আয়েশা (রা.) নিজেই তাঁর এই অভূতপূর্ব লজ্জাশীলতার কথা বর্ণনা করে বলেছেন:
كنت أدخل بيتي الذي دفن فيه رسول الله صلى الله عليه وسلم وأبي فأضع ثوبي فأقول :إنما هو زوجي وأبي فلما دفن عمر معهم فو الله ما دخلت إلا وأنا مشدودة عليٌ ثيابي حياء من عمر.
"আমি যখন আমার ঘরে প্রবেশ করতাম যেখানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং আমার পিতা সমাহিত ছিলেন, তখন আমি আমার চাদর বা অতিরিক্ত পোশাক খুলে রাখতাম। আমি মনে মনে বলতাম, এখানে তো কেবল আমার স্বামী এবং আমার পিতাই আছেন। কিন্তু যখন সেখানে উমরকেও দাফন করা হলো, আল্লাহর কসম, এরপর থেকে আমি উমরের প্রতি লজ্জাবশত আমার শরীরের পোশাকগুলো শক্ত করে জড়িয়ে না নিয়ে কখনোই ঘরে প্রবেশ করিনি।" (মুসনাদে আহমাদ: ২৫৬৬০)
লজ্জাশীলতার এই পবিত্র অনুভূতি আজ আমাদের সমাজের প্রতিটি মুসলিম নারীর জন্য অত্যন্ত অনুকরণীয় শিক্ষা। আধুনিক যুগে যেখানে পর্দা ও লজ্জাশীলতাকে একটি প্রাচীন প্রথা হিসেবে তুচ্ছ করার চেষ্টা করা হয়, সেখানে উম্মুল মুমিনীনের এই আদর্শ আমাদের সুপ্ত ঈমানকে নাড়া দেয়। লাজুকতা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি নারীর চিরন্তন সৌন্দর্য ও মর্যাদার এক অনন্য প্রতীক।
পারিবারিক পরিমণ্ডলে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন ও তার বিস্তার
নারী সাহাবীগণ কেবল ঘরের কাজের মাঝেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতেন না, বরং দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেও তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী ও অগ্রগামী। বিশেষ করে পারিবারিক কাজকর্মের পরে অতিরিক্ত সময়কে তাঁরা অর্থহীন অলসতায় না কাটিয়ে জ্ঞান চর্চায় ব্যয় করতেন।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফকীহ, মুহাদ্দিস এবং নারী শিক্ষিকা। বহু বড় বড় প্রবীণ সাহাবী জটিল ফারায়েয ও দ্বীনি সমস্যার সমাধানের জন্য তাঁর শরণাপন্ন হতেন। ইমাম যুহরী (রহ.) আয়েশা (রা.)-এর জ্ঞান সম্পর্কে বলেছেন যে,
لو جمع علم عائشة إلى علم جميع النساء لكان علم عائشة أفضل.
পৃথিবীর সমস্ত নারীর জ্ঞান যদি একদিকে রাখা হয়, তবে আয়েশা (রা.)-এর একার জ্ঞানই হবে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও ভারী। (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ২/১৮০)
নারী সাহাবীগণের এই জ্ঞানপিপাসা এতটাই তীব্র ছিল যে, পুরুষদের উপস্থিতির কারণে তাঁরা নবীজি (ﷺ)-এর মজলিসে বসার সুযোগ না পাওয়ায় সরাসরি নবীজি (ﷺ)-এর নিকট আবেদন করেন, যাতে নারীদের জন্য আলাদা একটি দিন নির্দিষ্ট করা হয়।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা এক নারী নবীজি (ﷺ)-এর নিকট এসে বললেন:
يَا رَسُولَ اللَّهِ ذَهَبَ الرِّجَالُ بِحَدِيثِكَ فَاجْعَلْ لَنَا مِنْ نَفْسِكَ يَوْمًا نَأْتِيكَ فِيهِ تُعَلِّمُنَا مِمَّا عَلَّمَكَ اللَّهُ
"হে আল্লাহর রাসূল! পুরুষেরা আপনার হাদীস ও সান্নিধ্য নিয়ে আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। অতএব আপনি আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একটি দিন নির্দিষ্ট করে দিন, যেদিন আমরা আপনার কাছে আসব এবং আল্লাহ আপনাকে যা শিখিয়েছেন তা থেকে আমাদের শিক্ষা দেবেন।"
নবীজি (ﷺ) তাঁর এই আগ্রহ দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং নারীদের বললেন:
اجْتَمِعْنَ يَوْمَ كَذَا وَكَذَا
"তোমরা অমুক অমুক দিন একত্রিত হও।" (বুখারী: ৭৩১০)
দ্বীনী জ্ঞান অর্জনের এই ব্যাকুলতা প্রতিটি মুসলিম পরিবারের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। আজ অনেক মুসলিম নারী পার্থিব শিক্ষা বা অর্থ উপার্জনের চিন্তায় দ্বীন শেখার মৌলিক বিষয়গুলো ভুলে যান। অথচ নিজের সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এবং পরিবারে সুখ শান্তি বজায় রাখতে দ্বীনী ইলমের কোনো বিকল্প নেই।
ক্রোধ ও মান-অভিমানের ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ
পারিবারিক জীবনে নানা কারণে রাগ, অভিমান ও মতবিরোধ হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু আদর্শ পরিবারে এই রাগ ও অভিমানকে কীভাবে ভালোবাসার আবহে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তা নারী সাহাবীগণের দাম্পত্য জীবন থেকে শেখার মতো। তাঁরা কখনো রাগের মাথায় দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙার বা সংসার উজাড় করার কথা ভাবতেন না, বরং রাগের মাঝেও ভালোবাসার একটি সূক্ষ্ম আবহ বজায় রাখতেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং হযরত আয়েশা (রা.)-এর মাঝে মাঝে যে মিষ্টি মান-অভিমান হতো, তা নবীজি (ﷺ) নিজেই বুঝতে পারতেন। তিনি আয়েশা (রা.)-এর কথা বলার ধরণ দেখেই বুঝতে পারতেন তিনি সন্তুষ্ট নাকি অভিমান করে আছেন।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেন:
إِنِّى لأَعْلَمُ إِذَا كُنْتِ عَنِّى رَاضِيَةً ، وَإِذَا كُنْتِ عَلَىَّ غَضْبَى
"আমি বুঝতে পারি কখন তুমি আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকো এবং কখন তুমি আমার ওপর অসন্তুষ্ট বা অভিমানী থাকো।"
আয়েশা (রা.) কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি কীভাবে তা বুঝতে পারেন?" নবীজি (ﷺ) উত্তরে বললেন:
أَمَّا إِذَا كُنْتِ عَنِّى رَاضِيَةً فَإِنَّكِ تَقُولِينَ لاَ وَرَبِّ مُحَمَّدٍ ، وَإِذَا كُنْتِ غَضْبَى قُلْتِ لاَ وَرَبِّ إِبْرَاهِيمَ
"যখন তুমি আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকো, তখন কথার মাঝে শপথ করে বলো, 'না, মুহাম্মাদের রবের কসম!' আর যখন তুমি রাগ বা অভিমান করে থাকো, তখন বলো, 'না, ইব্রাহীমের রবের কসম!'"
তখন হযরত আয়েশা (রা.) অত্যন্ত মধুর ও চমৎকার এক উত্তর দিয়েছিলেন, যা দাম্পত্যের অনন্য ভালোবাসার প্রমাণ বহন করে। তিনি বলেছিলেন:
أَجَلْ وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ ، مَا أَهْجُرُ إِلاَّ اسْمَكَ
"হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল, আমি রাগ করে কেবল আপনার নামটিকেই মুখে নেওয়া থেকে বিরত রাখি (কিন্তু আপনার প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা হৃদয়ে অপরিবর্তিতই থাকে)।" (বুখারী: ৫২২৮)
মান-অভিমানের এই পরিশীলিত রূপ আজকের দম্পতিদের জন্য এক মহান শিক্ষা। অনেকে সামান্য ঝগড়া হলেই স্বামীদের গালিগালাজ করে বসেন বা বাবার বাড়ি চলে যাওয়ার হুমকি দেন, যা সম্পর্ককে আরও বিষাক্ত করে তোলে। নারী সাহাবীগণের জীবনী আমাদের শেখায় কীভাবে রাগের মাথায়ও শালীনতা বজায় রেখে এবং অপর পক্ষকে আঘাত না করে মান-অভিমান প্রকাশ করা যায়।
পারিবারিক মতবিরোধ ও খুনসুটি নিরসনে সহনশীলতা
দাম্পত্য জীবনে নানা কারণে মাঝে মাঝে অনভিপ্রেত দ্বিমত বা মান-অভিমান হওয়া এক স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু সেই ক্ষণস্থায়ী অমিলকে দীর্ঘস্থায়ী বিবাদে রূপ না দিয়ে সহনশীলতা, পারস্পরিক ছাড় ও ক্ষমার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ। নবীজি (ﷺ) এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর দাম্পত্য জীবন আমাদেরকে এই শিক্ষাই দেয়।
হযরত নুমান বিন বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার হযরত আবু বকর (রা.) নবীজি (ﷺ)-এর নিকট আসার অনুমতি চাইলেন। তখন তিনি শুনতে পেলেন যে, হযরত আয়েশা (রা.) উঁচু আওয়াজে নবীজির সাথে কথা বলছেন। আবু বকর (রা.) ঘরে প্রবেশ করে আয়েশাকে লক্ষ্য করে রাগান্বিত হয়ে বললেন:
ترفعين صوتك على رسول الله صلى الله عليه وسلم ! فحال النبي صلى الله عليه وسلم بينه وبينها
"তুমি আল্লাহর রাসূলের সাথে উঁচু আওয়াজে কথা বলছো! তখন নবীজি (ﷺ) তাঁর এবং আবু বকরের মাঝখানে আড়াল হয়ে দাঁড়ালেন।"
হযরত আবু বকর (রা.) রাগ করে চলে যাওয়ার পর নবীজি (ﷺ) হযরত আয়েশা (রা.)-এর মান ভাঙানোর চেষ্টা করছিলেন এবং ভালোবাসাপূর্ণ কন্ঠে বলছিলেন:
ألم تريني حلت بين الرجل وبينك
"তুমি কি দেখলে না, আমি কীভাবে লোকটির ও তোমার মাঝে দাঁড়িয়ে তোমাকে রক্ষা করলাম?" (মুসনাদে আহমদ: ২৬৮)
এরপর আবু বকর (রা.) পুনরায় নবীজির ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন এবং এবার তিনি তাঁদের দুজনকে হাসিমুখে কথা বলতে শুনলেন। তখন আবু বকর (রা.) প্রফুল্ল চিত্তে বললেন:
أشركاني في سلمكما كما أشركتماني في حربكما
"তোমাদের এই শান্তিময় আনন্দেও আমাকে শরীক করে নাও, যেমনটি তোমাদের মান-অভিমানের যুদ্ধের মাঝে আমাকে শরীক করেছিলে।" (আবু দাউদ: ৪৯৯৯)
দাম্পত্য জীবনের এই চমৎকার সহনশীলতা কেবল নবীগৃহেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং হযরত আলী (রা.) এবং নবী-কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.)-এর পরিবারেও একই রূপ ধারণ করেছিল। মতবিরোধ বা রাগ হলে হযরত আলী (রা.) ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদে গিয়ে শুয়ে থাকতেন, যাতে ক্ষণিকের রাগ আর না বাড়ে।
হযরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত ফাতিমা (রা.)-এর ঘরে এসে হযরত আলী (রা.)-কে দেখতে পেলেন না। তিনি ফাতিমা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমার চাচাতো ভাই কোথায়?" ফাতিমা (রা.) উত্তর দিলেন:
كان بيني وبينه شيء فغاضبني، فخرج فلم يقِلْ عندي.
"আমার ও তাঁর মাঝে সামান্য কথা-কাটাকাটি হয়েছে, তাই তিনি আমার ওপর রাগ করে চলে গেছেন এবং আজ দুপুরে আমার ঘরে বিশ্রাম নেননি।" (বুখারী: ৪৪১)
আজকের সমাজে সামান্য অমিল বা অমত হলেই দম্পতিরা একে অপরের ওপর চড়াও হন এবং শেষ পর্যন্ত তা আদালত কিংবা বিবাহবিচ্ছেদ অবধি গড়ায়। অথচ সাহাবী দম্পতিদের জীবন আমাদের শেখায় যে, রাগের মাথায় এক পক্ষ শান্ত হওয়া বা ঘর থেকে সাময়িকভাবে সরে যাওয়া এবং অন্য পক্ষের সেই ভুলগুলো সহনশীলতার সাথে মিটিয়ে ফেলাই বুদ্ধিমত্তার দাবি।
গভীর শোকে ও বিপদে ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয়
জীবনচলার পথে প্রিয়জনের বিয়োগব্যথা ও আকস্মিক বিপর্যয় মানুষের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে কোনো সন্তানের অকাল ইন্তেকাল মায়ের হৃদয়ে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ মুহূর্তে কীভাবে নিজের শোককে হজম করে এক অনন্য বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্যের সাথে স্বামীর পাশে দাঁড়াতে হয়, তা দেখিয়েছেন হযরত উম্মে সুলাইম (রা.)।
হযরত আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উম্মে সুলাইম (রা.)-এর গর্ভজাত হযরত আবু তালহা (রা.)-এর একটি সন্তান অসুস্থ অবস্থায় মারা যায়। আবু তালহা তখন ঘরে ছিলেন না। উম্মে সুলাইম তাঁর সন্তানের মৃতদেহ চাদর দিয়ে ঢেকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বললেন, "তোমরা কেউ আবু তালহাকে তাঁর ছেলের মৃত্যুর খবর দেবে না, যতক্ষণ না আমি নিজে তাঁকে এই সংবাদ দিই।"
অতঃপর আবু তালহা (রা.) ঘরে ফিরলে উম্মে সুলাইম (রা.) শান্ত মুখে তাঁর সামনে রাতের খাবার পরিবেশন করলেন। তিনি আহার শেষ করলে উম্মে সুলাইম নিজের শোক আড়াল করে অত্যন্ত চমৎকারভাবে নিজেকে সুসজ্জিত করলেন এবং সুগন্ধি মাখলেন, যা তিনি ইতিপূর্বে কখনো করেননি। ফলে আবু তালহা (রা.) তাঁর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করলেন।
হযরত আনাস বিন মালিক (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, যখন উম্মে সুলাইম (রা.) দেখলেন যে তাঁর স্বামী তৃপ্ত হয়েছেন এবং দাম্পত্য সুখ লাভ করেছেন, তখন তিনি পরম প্রজ্ঞা ও শান্ত কণ্ঠে বললেন:
يَا أَبَا طَلْحَةَ أَرَأَيْتَ لَوْ أَنَّ قَوْمًا أَعَارُوا عَارِيَتَهُمْ أَهْلَ بَيْتٍ فَطَلَبُوا عَارِيَتَهُمْ أَلَهُمْ أَنْ يَمْنَعُوهُمْ؟ قَالَ: لَا . قَالَتْ: فَاحْتَسِبِ ابْنَكَ.
"হে আবু তালহা! আপনি বলুন, যদি কোনো সম্প্রদায় অন্য কোনো পরিবারের কাছে কোনো জিনিস ধার দেয়, অতঃপর তারা যদি তাদের সেই ধার দেওয়া জিনিস ফেরত চায়, তবে কি সেই পরিবারের পক্ষে তা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কোনো অধিকার আছে? আবু তালহা বললেন, না, কখনোই নয়। তখন উম্মে সুলাইম শান্ত কণ্ঠে বললেন, তবে আপনি আপনার পুত্রকে আল্লাহর আমানত মনে করে সবর করুন এবং নেকের আশা রাখুন।" (মুসলিম: ২১৪৪)
ছেলের মৃত্যুর মতো একটি চরম হৃদয়বিদারক সংবাদকে এমন অসামান্য প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের চাদরে জড়িয়ে স্বামীর কাছে উপস্থাপন করার এই উদাহরণ মানব ইতিহাসে দ্বিতীয়টি মেলা ভার। উম্মে সুলাইমের এই অনন্য ত্যাগের কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদের জন্য বরকতের দুআ করেছিলেন, যার ফলে পরবর্তী সময়ে তাঁদের পরিবারে বহু আলেম ও দ্বীনদার সন্তানের জন্ম হয়েছিল।
আজকের নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারে কোনো আর্থিক ক্ষতি বা ছোটখাটো বিপর্যয় ঘটলেই তাঁরা কান্নাকাটি ও মাতম শুরু করে স্বামীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলেন। নারী সাহাবীগণের এই অনুপম চরিত্র আমাদের শেখায় যে, বিপদে ধৈর্য ধারণ করা এবং স্বামীর মানসিক অবস্থাকে বিবেচনা করে কোমল আচরণ করা একটি আদর্শ দাম্পত্যের পরম সৌন্দর্য।
পিতা-মাতার প্রতি ভক্তি ও সদাচরণ
পারিবারিক বন্ধনের একটি সুদৃঢ় খুঁটি হলো পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের বিনম্র ভালোবাসা ও অকৃত্রিম ভক্তি। ইসলামে মাতা-পিতার অধিকারকে আল্লাহর ইবাদতের পরেই স্থান দেওয়া হয়েছে। নারী সাহাবীগণ বিবাহিত জীবনে স্বামীর সংসারে থাকার পরেও নিজের পিতা-মাতার প্রতি সেবাপরায়ণতা ও ভক্তি প্রকাশের ক্ষেত্রে এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, এমনকি মাতা-পিতা যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীও হতেন।
হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়কালে আমার মা (যিনি তখনও মুশরিক ছিলেন) আরবের কাফেরদের সাথে মদীনায় আমার সাথে দেখা করতে আসলেন। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট দ্বীনী ফতোয়া চেয়ে আরজ করলাম, "হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা আমার কাছে এসেছেন, তিনি ইসলামের প্রতি বিমুখ, তবুও তিনি আমার কাছে সদ্ব্যবহার প্রত্যাশা করেন। এমতাবস্থায় আমি কি আমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করব এবং তাঁর আত্মীয়তা রক্ষা করব?" রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উত্তরে বললেন:
نعم صلي أمك
"হ্যাঁ, তুমি তোমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে।" (বুখারী: ২৬২০)
মাতা-পিতা অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ও সৌজন্য বজায় রাখার এই অনন্য শিক্ষা প্রমাণ করে যে, পারিবারিক সম্পর্ক ও রক্তের টানের প্রতি ইসলাম কতখানি গুরুত্বারোপ করেছে।
পিতার প্রতি কন্যার নিখাদ ভালোবাসা ও অপরিসীম ভক্তির অনন্য প্রতিচ্ছবি ছিলেন হযরত ফাতিমা (রা.)। তিনি যখনই নবীজি (ﷺ)-এর পবিত্র দরবারে আসতেন, তখন নবীজি পরম স্নেহে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর হাত জড়িয়ে কপালে চুম্বন করতেন। অনুরূপভাবে নবীজি (ﷺ) যখন ফাতিমা (রা.)-এর ঘরে যেতেন, তখন ফাতিমাও পরম শ্রদ্ধায় দাঁড়িয়ে তাঁর পিতার হাত ধরে কপালে চুমু খেয়ে নিজের আসনে বসাতেন।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
مَا رَأَيْتُ أَحَدًا كَانَ أَشْبَهَ سَمْتًا وَهَدْيًا وَدَلاًّ بِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ فَاطِمَةَ... كَانَتْ إِذَا دَخَلَتْ عَلَيْهِ قَامَ إِلَيْهَا فَأَخَذَ بِيَدِهَا وَقَبَّلَهَا وَأَجْلَسَهَا فِى مَجْلِسِهِ
"কথাবার্তা, চালচলন, উঠাবসা এবং আচার-ব্যবহারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে ফাতিমা অপেক্ষা অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ আমি আর কাউকেও দেখিনি। ফাতিমা যখনই নবীজি (ﷺ)-এর নিকট আসতেন, তিনি তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে তাঁর হাত ধরতেন, তাঁকে চুম্বন করতেন এবং নিজের আসনে তাঁকে বসাতেন।" (আবু দাউদ: ৫২১৭)
পিতা-মাতার প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসার এই স্বর্গীয় ধারা প্রতিটি মুসলিম পরিবারের জন্য পরম অনুকরণীয়। বর্তমান যুগে অনেক নারী স্বামীর ঘরে যাওয়ার পর নিজের পিতা-মাতাকে ভুলে যান যা অকল্যাণ ডেকে আনে। নারী সাহাবীগণের এই জীবনাদর্শ আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে এবং মাতা-পিতার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ দেখায়।
স্বামীর অতিথিদের আপ্যায়ন ও মেহমানদারি
মেহমানদারি বা অতিথিসেবা ইসলামের অন্যতম মহৎ ইবাদত এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধির এক প্রধান চাবিকাঠি। স্বামীর মেহমানদের মনে প্রফুল্লতা আনা এবং ঘরের চরম অভাব-অনটনের মাঝেও তাঁদের সর্বোত্তম উপায়ে আপ্যায়ন করার ক্ষেত্রে পুণ্যবতী সাহাবিয়াতগণ যে অতুলনীয় ও ত্যাগী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা মুসলিম পারিবারিক জীবনের এক অনন্য রূপরেখা তৈরি করে। তাঁরা মেহমানদের ঘরে আসাকে বোঝা মনে করতেন না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক বিশেষ রহমত ও বরকত মনে করে অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে এবং পরম যত্নে তাঁদের খিদমতে নিয়োজিত হতেন।
আসহাবে সুফফার দরিদ্র সাহাবী হযরত কায়েস আল-গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজি (সা.)-এর সাথে উম্মুল মুমিনীনের ঘরে মেহমান হওয়ার মধুর স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে বললেন, "চলো আমাদের সাথে আয়েশার ঘরে চলো।" অতঃপর আমরা নবীজির সাথে গেলাম। ঘরে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন:
يَا عَائِشَةُ أَطْعِمِينَا
"হে আয়েশা, আমাদের খাবার দাও।" তখন তিনি 'হাশীশাহ' নামক আটা ও তরল দিয়ে তৈরি এক ধরণের খাবার নিয়ে আসলেন এবং আমরা তা খেলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) পুনরায় বললেন:
يَا عَائِشَةُ أَطْعِمِينَا
"হে আয়েশা, আমাদের খাবার দাও।" এবার তিনি 'হাইসাহ' নামক খেজুর, ঘি ও পনির মিশ্রিত অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার নিয়ে আসলেন এবং আমরা তা খেলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) আবার বললেন:
يَا عَائِشَةُ اسْقِينَا
"হে আয়েশা, আমাদের পান করাও।" তখন তিনি দুধের একটি বড় পাত্র নিয়ে আসলেন এবং আমরা তা তৃপ্তিসহকারে পান করলাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) আবারও বললেন:
يَا عَائِشَةُ اسْقِينَا
"হে আয়েশা, আমাদের পান করাও।" তখন তিনি পানির একটি ছোট পাত্র নিয়ে আসলেন এবং আমরা পান করলাম। (আবু দাউদ: ৫০৪০)
ঘরে অতি সামান্য উপকরণ থাকা সত্ত্বেও স্বামীর নির্দেশে বারবার মেহমানদের সামনে তা হাসিমুখে পরিবেশন করা এবং তাঁদের সেবা করার এই দৃশ্য প্রমাণ করে যে, সাহাবিয়াতদের নিকট অতিথিসেবা কতটা আনন্দদায়ক ও ঈমানী দায়িত্বের একটি অংশ ছিল।
এমনকি স্বামী ঘরে না থাকলেও মেহমানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাঁদের আপ্যায়নের দায়িত্বে সাহাবিয়াতগণ বিন্দুমাত্র অবহেলা করতেন না। হযরত লাকীত বিন সাবিরী (রা.) নবীজি (সা.)-এর সান্নিধ্যে আসার একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দরবারে উপস্থিত হলাম, কিন্তু ঘরে তখন নবীজিকে পেলাম না। তবে ঘরে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমাদের আগমনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিলেন এবং মেহমানদারির জন্য সচেষ্ট হলেন।
হযরত লাকীত বিন সাবিরী (রা.) নিজেই এই সুন্দর ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন:
فَأَمَرَتْ لَنَا بِخَزِيرَةٍ فَصُنِعَتْ لَنَا، قَالَ: وَأُتِينَا بِقِنَاعٍ مِنْ تَمْرٍ
"অতঃপর আয়েশা (রা.) আমাদের জন্য খাযীরাহ নামক মাংস ও আটার স্যুপ জাতীয় সুস্বাদু খাবার তৈরি করার নির্দেশ দিলেন এবং তা আমাদের জন্য প্রস্তুত করা হলো। তিনি আরও বলেন, আমাদের জন্য একটি পাত্রে করে খেজুরও পরিবেশন করা হলো।" (আবু দাউদ: ১৪২)
স্বামীর অনুপস্থিতিতেও মেহমানদের এভাবে আপ্যায়ন করা এবং ঘরের আড়ালে থেকে তাঁদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা ছিল সাহাবিয়াতদের বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠার অসামান্য প্রতিচ্ছবি।
বর্তমান পুঁজিবাদী ও অতি-ব্যস্ত সমাজে অতিথিসেবা বা স্বামীর মেহমানদের আপ্যায়ন করাকে অনেক সময় নারীরা নিজেদের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বা একটি বাড়তি ঝামেলা হিসেবে বিবেচনা করেন। অনেকে স্বামীর মেহমানদের সাথে দুর্ব্যবহার বা মুখ ভার করে থাকেন। অথচ সাহাবিয়াতদের এই সুমহান অতিথিসেবার উজ্জ্বল চিত্র আমাদের হৃদয়ে মেহমানদারির প্রকৃত মূল্যবোধ জাগ্রত করে। ঘরের কাজ এবং অতিথিসেবা কেবল কোনো জাগতিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও স্বামীর হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নেওয়ার এক সর্বোত্তম ঈমানী মাধ্যম। স্বামীর মেহমানদের সম্মান করার অর্থ হলো প্রকারান্তরে স্বামীকে সম্মান করা এবং পরিবারের মাঝে এক বরকতময় আধ্যাত্মিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বাতি নিভিয়ে অতিথিসেবা ও আনসারী দম্পতির ত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত
স্বামীর মেহমানদারির ক্ষেত্রে সাহাবিয়াতদের সহযোগিতা ও আত্মত্যাগের সবচেয়ে বিস্ময়কর, হৃদয়স্পর্শী এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল মদীনার এক আনসারী সাহাবীর ঘরে। নিজেদের চরম অর্থনৈতিক সংকট ও অনাহারের মাঝেও তাঁরা যেভাবে মেহমানকে পরম তৃপ্তিতে খাইয়েছিলেন এবং নিজেদের বাচ্চাদের অভুক্ত রেখেছিলেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানব সভ্যতার জন্য এক অনন্য মাইলফলক।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট এসে অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি ক্ষুধার তীব্রতায় অত্যন্ত পরিশ্রান্ত।' নবীজি (সা.) তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের নিকট লোক পাঠালেন যে ঘরে মেহমান আপ্যায়নের মতো কোনো খাবার আছে কি না। কিন্তু উম্মাহাতুল মুমিনীনের প্রত্যেকেই উত্তর দিলেন, 'সেই মহান সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, আমাদের ঘরে পানি ছাড়া আর কিছুই নেই।'
তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের ডেকে বললেন:
مَنْ يُضِيفُ هَذَا اللَّيْلَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ؟
"আজ রাতে কে এই মেহমানের আপ্যায়ন করবে? আল্লাহ তার ওপর রহম করুন।"
তখন আনসারদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি (কোনো কোনো বর্ণনায় তিনি হযরত আবু তালহা রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি এই মেহমানদারির দায়িত্ব নিচ্ছি।'
অতঃপর তিনি সেই ক্ষুধার্ত মেহমানকে নিয়ে পরম শ্রদ্ধায় তাঁর ঘরে গেলেন এবং তাঁর স্ত্রীকে বললেন, 'রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মেহমানকে সম্মান করো।' তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'মেহমানকে দেওয়ার মতো কোনো খাবার কি ঘরে আছে?' স্ত্রী অত্যন্ত সংকোচের সাথে উত্তর দিলেন, 'না, আল্লাহর কসম! ঘরে আমাদের বাচ্চাদের সামান্য খাবার ছাড়া আর কিছুই নেই।'
তখন সেই আনসারী সাহাবী অত্যন্ত চমৎকার এক পরিকল্পনা করলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন:
عَلِّلِيهِمْ بِشَيْءٍ، فَإِذَا دَخَلَ ضَيْفُنَا فَأَطْفِئِي السَّرَاجَ، وَأَرِيهِ أَنَّا نَأْكُلُ، فَإِذَا أَهْوَى لِيَأْكُلَ فَقُومِي إِلَى السَّرَاجِ حَتَّى تُطْفِئِيهِ
"বাচ্চাদের অন্য কিছু দিয়ে ভুলিয়ে রাখো। তারা যখন রাতের খাবারের জন্য কাঁদবে, তখন তাদের ঘুম পাড়িয়ে দিও। আর যখন আমাদের মেহমান ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তুমি বাতিটি নিভিয়ে দিও এবং তাকে বুঝিয়ো যে আমরাও তার সাথে খাচ্ছি। মেহমান যখন খাওয়ার জন্য হাত বাড়াবে, তখন তুমি বাতি ঠিক করার বাহানায় উঠে গিয়ে বাতিটি নিভিয়ে দিও।" (মুসলিম: ২০৫৪)
স্বামীর নির্দেশ পাওয়ামাত্র সেই পুণ্যবতী আনসারী সাহাবিয়া মাতৃত্বের কোমল আবেগকে জয় করে সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। অতঃপর রাতের খাবার পরিবেশন করা হলো। মেহমান যখন খেতে বসলেন, তখন স্ত্রী বাতি ঠিক করার ছলে সেটি নিভিয়ে দিলেন।
অন্ধকারের মাঝে স্বামী-স্ত্রী দুজনে খালি মুখে চিবানোর আওয়াজ করে মেহমানকে এটিই বোঝাতে চাইলেন যে তাঁরাও সাথে খাচ্ছেন। মেহমান পেট পুরে তৃপ্তিসহকারে খেলেন, আর সেই আনসারী দম্পতি সারা রাত অভুক্ত অবস্থায় কাটালেন।
পরদিন সকালে যখন সেই আনসারী সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দরবারে উপস্থিত হলেন, তখন নবীজি (সা.) অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে হেসে উঠলেন এবং বললেন:
قَدْ عَجِبَ اللَّهُ -عَزَّ وَجَلَّ- مِنْ صَنِيعِكُمَا بِضَيْفِكُمَا اللَّيْلَةَ
"গত রাতে তোমরা তোমাদের মেহমানের সাথে যে আচরণ করেছ, তা দেখে মহান আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন (অন্য বর্ণনায়: আল্লাহ হেসেছেন)।" (বুখারী: ৩৭৯৮)
এই অসাধারণ আত্মত্যাগ ও ইখলাসের উপহারস্বরূপ মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন:
وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
"আর তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, নিজেরা ক্ষুধার্ত বা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও। আর যাদের অন্তরের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।" (সূরা আল-হাশর: ৯)
দাম্পত্য জীবনে স্বামীর মেহমানদের প্রতি স্ত্রীর এই যে অপূর্ব সহযোগিতা, ইখলাস এবং বাচ্চাদের খাবার পর্যন্ত বিলিয়ে দিয়ে বাতি নিভিয়ে অন্ধকার ঘরে বসে অতিথিসেবা করার এই নজিরবিহীন ত্যাগ তা পৃথিবীর ইতিহাসে দাম্পত্যের ও মেহমানদারির এক সর্বোচ্চ স্বর্গীয় রূপ।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে ও সন্তানের লালন-পালনে আদর্শ অভিভাবকত্ব
একটি আদর্শ সমাজ ও উম্মাহ গঠনের মূল কারিগর হলেন মা। সন্তানের শৈশবকাল থেকেই তাকে দ্বীনী মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাসের আলোয় গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব মায়েদের ওপর অর্পিত। পুণ্যবতী নারী সাহাবীগণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে ও সন্তানের অভিভাবকত্বে যে অতুলনীয় প্রজ্ঞা ও ত্যাগের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যায়।
এর অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন হযরত উম্মে সুলাইম (রা.)। তিনি তাঁর আদরের ছোট সন্তান হযরত আনাস বিন মালিক (রা.)-কে শৈশবেই বিশ্বমানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পবিত্র খিদমতে উৎসর্গ করেছিলেন, যাতে সন্তান সরাসরি নববী মাদরাসায় বড় হতে পারে।
হযরত আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার মা উম্মে সুলাইম (রা.) আমাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট নিয়ে আসলেন এবং আমার পরনের কাপড় কেটে আমাকে চাদর ও লুঙ্গি বানিয়ে পরিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি আরজ করলেন:
يا رسول الله ! هذا أنيس ابني أتيتك به يخدمك ، فادع الله له
"হে আল্লাহর রাসূল! এই যে আমার সন্তান উনীস (আনাস)। আমি তাকে আপনার নিকট নিয়ে এসেছি যাতে সে আপনার খিদমত করতে পারে। অতএব আপনি আল্লাহর কাছে তার জন্য দুআ করুন।" (মুসলিম: ২৪৮১)
নারী সাহাবীগণ কেবল সন্তানদের বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধাই দিতেন না, বরং খুব ছোটবেলা থেকেই কীভাবে তাদের ইবাদতে অভ্যস্ত করতে হয় এবং ধৈর্যের প্রশিক্ষণ দিতে হয়, তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে পরিচালনা করতেন।
হযরত রুবাইয়ি বিনতে মুআউয়িয (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আশুরার দিন সকালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আনসারদের মহল্লায় এই নির্দেশ পাঠালেন যে, 'যে ব্যক্তি আজ সকাল থেকে রোযা রাখেনি সে যেন দিনের বাকি অংশ রোযা রাখে, আর যে রোযা রেখেছে সে যেন রোযা পূর্ণ করে।' রুবাইয়ি (রা.) বলেন,
فَكُنَّا نَصُومُهُ بَعْدُ ، وَنُصَوِّمُ صِبْيَانَنَا ، وَنَجْعَلُ لَهُمُ اللُّعْبَةَ مِنَ الْعِهْنِ ، فَإِذَا بَكَى أَحَدُهُمْ عَلَى الطَّعَامِ أَعْطَيْنَاهُ ذَاكَ ، حَتَّى يَكُونَ عِنْدَ الإِفْطَارِ
"আমরা নিজেরাও পরবর্তীতে এই রোযা রাখতাম এবং আমাদের সন্তানদের রোযা রাখাতাম। আমরা তাদের জন্য রঙিন সুতোর বা পশমের পুতুল খেলনা বানিয়ে রাখতাম। তাদের কেউ যখন খাবারের জন্য কাঁদত, তখন ইফতারের সময় হওয়া পর্যন্ত আমরা তাকে সেই খেলনাটি দিয়ে শান্ত রাখতাম।" (বুখারী: ১৯৬০)
মাতৃত্বের কোমল আবেগকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের ইবাদত ও ধৈর্যের প্রতি অভ্যস্ত করার এই যে সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতা, তা কেবল নারী সাহাবীগণের পক্ষেই সম্ভব ছিল। বর্তমান যুগে অনেক মুসলিম মা সন্তানদের সামান্য ক্ষুধার কষ্টে কাতর হয়ে রোযা রাখতে বাধা দেন বা নামাযের জন্য ভোরে ঘুম থেকে ডাকতে অলসতা করেন, যা সন্তানের ভবিষ্যৎ আধ্যাত্মিক জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। নারী সাহাবীগণের এই জীবনাদর্শ আমাদের শেখায় কীভাবে স্নেহের পাশাপাশি শাসন ও দ্বীনী অনুশীলনের মাধ্যমে সন্তানদের প্রকৃত মুমিন হিসেবে গড়ে তুলতে হয়।
সতীনদের মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও উদারতা
বহুবিবাহের সমাজব্যবস্থায় সতীনদের পারস্পরিক সম্পর্ক সাধারণত এক ধরণের মানসিক টানাপোড়েন ও হিংসা-বিদ্বেষের ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু নারী সাহাবীগণ নিজেদের সুউচ্চ ঈমানী চরিত্র এবং আখলাকে হাসানাহ বা উত্তম আচরণের মাধ্যমে এই চিরন্তন মানবিক সংকটের ওপর জয়লাভ করেছিলেন। তাঁরা দেখিয়ে গেছেন যে, সতীন হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে সৌহার্দ্য ও উদারতার স্বর্গীয় আবহ তৈরি করা যায়।
এর অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত সাওদা বিনতে জামআ (রা.)। তিনি যখন বার্ধক্যে উপনীত হলেন এবং বুঝতে পারলেন যে তাঁর শারীরিক শক্তি হ্রাস পাচ্ছে, তখন তিনি নবীজি (ﷺ)-এর সাথে অতিবাহিত করার জন্য নির্ধারিত তাঁর নিজের বিশেষ দিনটি হযরত আয়েশা (রা.)-কে স্বেচ্ছায় ও সানন্দে উপহার দিয়েছিলেন, যাতে তাঁর প্রিয় স্বামী রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আনন্দিত হন।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সাওদা (রা.) যখন বয়োবৃদ্ধা হলেন, তখন তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর পবিত্র সান্নিধ্যে অতিবাহিত করার জন্য নির্ধারিত তাঁর দিনটি আয়েশাকে দান করে দিলেন। তিনি বলেছিলেন:
يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ جَعَلْتُ يَوْمِى مِنْكَ لِعَائِشَةَ
"হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সান্নিধ্যে থাকার জন্য আমার নির্ধারিত দিনটি আয়েশাকে দান করলাম।" ফলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আয়েশার জন্য দুটি দিন বণ্টন করতেন একটি আয়েশার নিজস্ব দিন এবং অপরটি সাওদার দিন। (মুসলিম: ১৪৬৩)
এই উদারতা ও ভালোবাসার আরেকটি অসাধারণ চিত্র ফুটে ওঠে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে হাবীবাহ (রা.)-এর মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তের একটি ঘটনায়। তিনি জীবদ্দশায় সতীনদের মাঝে মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতার কারণে ঘটে যাওয়া যেকোনো মনমালিন্য বা ছোটখাটো ভুলত্রুটি মৃত্যুর আগে সম্পূর্ণ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে যেতে চেয়েছিলেন।
হযরত আউফ বিন আল-হারিস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আয়েশা (রা.)-কে বলতে শুনেছি যে, হযরত উম্মে হাবীবাহ (রা.) তাঁর মৃত্যুর সময় আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন:
قَدْ كَانَ يَكُوْنُ بَيْنَنَا مَا يَكُوْنُ بَيْنَ الضَّرَائِرِ، فَغَفَرَ اللهُ لِي وَلَكِ مَا كَانَ مِنْ ذَلِكَ
"সতীনদের মাঝে পারস্পরিক যে ধরণের দ্বন্দ্ব বা মনমালিন্য হয়ে থাকে, আমাদের মাঝেও কখনো কখনো তা হয়ে থাকত। অতএব মহান আল্লাহ আমাদের উভয়ের সেই সমস্ত ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিন।" আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম, 'আল্লাহ আপনার সব অপরাধ ক্ষমা করে দিন এবং আপনাকে দায়মুক্ত করুন।' তখন তিনি অত্যন্ত খুশি হয়ে বললেন, 'আপনি আমাকে আনন্দিত করেছেন, আল্লাহ আপনাকে আনন্দিত রাখুন।' অতঃপর তিনি উম্মে সালামা (রা.)-এর কাছেও এই একই বার্তা পাঠিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন। (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ২/২১৯)
ক্ষমা ও সহমর্মিতার এই পরম উদার মানসিকতা প্রমাণ করে যে, নারী সাহাবীগণের অন্তর হিংসা ও কুটিলতা থেকে কতখানি পবিত্র ছিল।
উপসংহার
সোনালী যুগের মহীয়সী নারী সাহাবীগণের পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন পর্যালোচনা করলে এ সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইসলাম পারিবারিক জীবনের ক্ষেত্রে যেই আদর্শের দীক্ষা দিয়েছে, তা কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল এক জীবন্ত এবং কর্মময় বাস্তবতা। তাঁদের প্রতিটি গৃহকোণ ছিল ঈমান, ভালোবাসা, ধৈর্য, পরিশ্রম ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক নিখুঁত স্বর্গীয় নীড়।
আজকের আধুনিক পৃথিবীতে তথাকথিত প্রগতি ও স্বাধীনতার মোড়কে পারিবারিক কাঠামো যেভাবে ভেঙে পড়ছে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অবিশ্বাসের যে দেয়াল তৈরি হচ্ছে এবং সম্পর্কের মাধুর্য হারিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো নারী সাহাবীগণের জীবনাদর্শের দিকে ফিরে যাওয়া। স্বামীর আর্থিক সংকটে পাশে থাকা, ঘরের কাজকে অহংকারহীনভাবে নিজের পুণ্যময় দায়িত্ব মনে করা, দ্বীনী জ্ঞান চর্চায় অগ্রগামী হওয়া এবং সন্তানদের আদর্শ চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তোলার যে অনুপম দৃষ্টান্ত তাঁরা স্থাপন করেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্ব মুসলিম নারীদের জন্য পরম আলোকবর্তিকা।
আসুন, আমরা আমাদের পতনোন্মুখ পারিবারিক জীবনগুলোকে পুনরায় সুখের জান্নাতে পরিণত করতে নারী সাহাবীগণের সেই ঐতিহ্যকে নিজেদের বাস্তব জীবনে ধারণ করি। মহান আল্লাহ আমাদের পরিবারগুলোকে সাহাবীদের পবিত্র ঘরগুলোর মতো ঈমানী আলোয় উদ্ভাসিত করে দিন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
সাহাবায়ে কেরামকে ভালোবাসা ঈমানের দাবি
প্রত্যেক মুসলিমের ওপর আবশ্যকীয় ঈমানের অংশ হলো—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবায়...
প্রসঙ্গ মুয়াবিয়া রাজিআল্লাহু আনহুঃ সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কিত ইতিহাস পাঠের মূলনীতি
...
কুরআনে কারীম ও সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম কিছু দিক কিছু দৃষ্টান্ত
সাহাবায়ে কেরামের তিলাওয়াত কুরআনেরঅন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হক হল অধিক পরিমাণে তিলাওয়াত করা। কোনো কোনো দিক ...
টুপি পরিধান করার কোন প্রমাণ কি হাদীস বা আছারে সাহাবায় নেই?
টুপি মুসলিম উম্মাহর ‘ শিআর ’ জাতীয় নিদর্শন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন