প্রবন্ধ
সত্যের পথে অবিচলতা: গুরুত্ব, টিকে থাকার উপায় ও বিচ্যুতির কারণসমূহ
৩ জুলাই, ২০২৬
৭২
০
সত্যের উপর অবিচল থাকার গুরুত্ব
মানবজাতির চিরন্তন সফরের সবচেয়ে কঠিন অথচ অনিবার্য পরীক্ষা হলো সত্যের পথে অবিচল থাকা। দুনিয়ার এই মোহময় যাত্রা, অগণিত ফিতনা আর শয়তানের প্রলোভনের মাঝে নিজের ঈমানকে অক্ষুণ্ণ রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে স্থির থাকা এক মহান সার্থকতা। ইসলামের পরিভাষায় একে বলা হয় 'সাবাত' বা দৃঢ়তা। এটি কেবল একটি চারিত্রিক গুণ নয়, বরং জান্নাত লাভের জন্য এটি এক অপরিহার্য পাথেয়। পরকালীন জীবনে নিরাপত্তা ও ইহকালীন জীবনে অন্তরের প্রশান্তি কেবল তখনই সম্ভব, যখন একজন মুমিন তার ঈমানের উপর পাহাড়ের মতো অবিচল থাকতে পারে।
সত্যের উপর অবিচল থাকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নিম্নোক্ত আয়াতে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন:
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ
অর্থাৎ, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’। (আলে ইমরান: ১০২)
এই আয়াতটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ইসলামের উপর অটল থাকা আমাদের জন্য কতটা জরুরি। একজন মুমিন সারাজীবন ইবাদত করার পর যদি শেষ মুহূর্তে বিচ্যুত হয়ে যায়, তবে তার পুরো জীবনটাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। তাই ঈমান আনার পর তাতে স্থির থাকা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আর এই সত্যের উপর অবিচল থাকার তাওফীক শুধুই আল্লাহ তাআলার দয়ার দান। নবী করীম (ﷺ)-কে লক্ষ্য করে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
وَلَوْلَا أَنْ ثَبَّتْنَاكَ لَقَدْ كِدْتَ تَرْكَنُ إِلَيْهِمْ شَيْئًا قَلِيلًا
অর্থাৎ, ‘আর আমি যদি তোমাকে দৃঢ় না রাখতাম তবে তুমি তাদের প্রতি কিছুটা ঝুঁকেই পড়তে’। (ইসরা: ৭৪)
আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াতি জীবনের কষ্টসাধ্য কাহিনীগুলো কুরআন মাজিদে বর্ণনা করার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মুমিনদের অন্তরের দৃঢ়তা বৃদ্ধি করা। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ
অর্থাৎ, ‘আর রাসূলগণের এসব সংবাদ আমি তোমার কাছে বর্ণনা করছি, যার মাধ্যমে আমি তোমার অন্তরকে দৃঢ় করি’। (হুদ: ১২০)
সত্যের উপর অটল থাকার সুফল কেবল এই দুনিয়াতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পরকালের প্রথম মঞ্জিল কবরেও মানুষের একমাত্র সহায় হবে। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এক অনন্য সুসংবাদ দিয়ে এরশাদ করেছেন:
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
অর্থাৎ, ‘আল্লাহ মুমিনদেরকে দুনিয়ার জীবনে ও পরকালের জীবনে শাশ্বত বা দৃঢ় বাণীর মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত বা অবিচল রাখবেন’। (ইবরাহিম: ২৭)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন যে, একজন মুসলিমকে যখন কবরে প্রশ্ন করা হবে, তখন সে সাক্ষ্য দিবে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল। আর এটাই হলো আল্লাহ তাআলার সেই ঘোষণা যে, তিনি মুমিনদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে অবিচল রাখবেন। (বুখারী: ৪৬৯৯)
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের কেবল অবিচল থাকার আদেশই দেননি, বরং সত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পুনরায় পথভ্রষ্ট হওয়ার পরিণাম সম্পর্কেও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
وَلَا تَتَّخِذُوا أَيْمَانَكُمْ دَخَلًا بَيْنَكُمْ فَتَزِلَّ قَدَمٌ بَعْدَ ثُبُوتِهَا وَتَذُوقُوا السُّوءَ بِمَا صَدَدْتُمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَلَكُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
অর্থাৎ, ‘তোমরা তোমাদের শপথগুলোকে নিজেদের মধ্যে প্রতারণার মাধ্যম বানিও না; অন্যথায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পা পিছলে যাবে এবং আল্লাহর পথে বাধা দেওয়ার কারণে তোমাদের মন্দফল ভোগ করতে হবে; আর তোমাদের জন্য থাকবে মহাশাস্তি’। (নাহল: ৯৪)
মানুষ অনেক সময় হিদায়াত পাওয়ার পর নিজের প্রবৃত্তি বা দুনিয়ার মোহে পড়ে সত্যের পথ থেকে সরে যায়। এই বিচ্যুতি থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আনুগত্যের বিকল্প নেই। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ
অর্থাৎ, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন তোমাদের এমন কিছুর দিকে আহ্বান করেন যা তোমাদের জীবন দান করে, তখন তাতে সাড়া দাও এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝখানে অন্তরায় হন এবং তাঁরই কাছে তোমরা সমবেত হবে’। (আনফাল: ২৪)
মানুষের অন্তর অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। যেকোনো মুহূর্তে অন্তরের মোড় ঘুরে যেতে পারে। তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সর্বদা আল্লাহর কাছে অবিচল থাকার জন্য আকুতি জানাতেন। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অধিকাংশ সময় এই দোয়াটি পড়তেন:
«يَا مُقَلِّبَ القُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ»
অর্থাৎ, ‘হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আপনি আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর অবিচল রাখুন’। (তিরমিযী: ২১৪০)
সাহাবীগণ যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তিনি কি তাঁদের ব্যাপারেও আশঙ্কা বোধ করেন? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উত্তরে বললেন:
«نَعَمْ، إنَّ القُلُوبَ بينَ أُصْبُعَيْنِ مِنْ أَصَابعِ اللهِ يُقَلِّبُهَا كَيْفَ يَشَاءُ»
অর্থাৎ, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই মানুষের অন্তরসমূহ আল্লাহর আঙুলসমূহের মধ্য হতে দুটি আঙুলের মাঝে থাকে, তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন’। (তিরমিযী: ২১৪০)
এই হাদীস দ্বারা এটাও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, সত্যের উপর টিকে থাকা কেবল নিজের শক্তির উপর নির্ভর করে না, বরং এর জন্য আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও সাহায্য প্রয়োজন।
সত্যের উপর অবিচল থাকার উপায়
১. আল্লাহর নিকট অবিচল থাকার জন্য অধিক দোয়া করা (الإكثار من دعاء الله بالتثبيت)
সত্যের পথে অবিচল থাকার প্রথম এবং প্রধান মাধ্যম হলো আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে প্রার্থনা করা। বিশেষ করে কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো বেশি বেশি পাঠ করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের (রাসেখ ফিল ইলম) দোয়া এভাবে উল্লেখ করেছেন:
﴿ رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ ﴾
অর্থাৎ, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে পথভ্রষ্ট করবেন না এবং আপনার নিকট থেকে আমাদের অনুগ্রহ দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা’। (আলে ইমরান: ৮)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই দোয়াটি করতেন:
«اللَّهُمَّ مُصَرِّفَ القُلُوبِ صَرِّفْ قُلُوبَنَا عَلَى طاعَتِكَ»
অর্থাৎ, ‘হে অন্তরের পরিবর্তনকারী আল্লাহ! আপনি আমাদের অন্তরসমূহকে আপনার আনুগত্যের দিকে ঘুরিয়ে দিন’। (মুসলিম: ২৬৫৫)
এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দোয়া বর্ণিত হয়েছে যা অবিচলতা লাভে সাহায্য করে যেমন:
يَا مُثَبِّتَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قُلُوبَنَا عَلَى دِينِكَ
‘হে অন্তরের স্থিরকারী! আপনি আমাদের অন্তরসমূহকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির রাখুন’। (ইবনে মাজা: ১৯৯)
২. আল-কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর তথা চিন্তাভাবনা করা (تدبر كتاب الله)
সত্যের পথে অবিচল থাকার একটি প্রধান মাধ্যম হলো মহান আল্লাহর কিতাব নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করা। যে ব্যক্তি দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকতে চায়, তার জন্য কুরআনের তিলাওয়াত ও এর অর্থ অনুধাবন করা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
﴿ أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ﴾
অর্থাৎ, ‘তবে কি তারা কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না?’ (মুহাম্মদ: ২৪)
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেছেন,
فتدبَّرِ القرآنَ إنْ رُمْتَ الهُدى + فالعِلمُ تحتَ تَدَبُّرِ القُرآنِ
‘যদি তুমি হিদায়াত চাও তবে কুরআন নিয়ে গবেষণা করো, কারণ যাবতীয় জ্ঞান ও হিদায়াত কুরআনের গবেষণার মধ্যেই নিহিত রয়েছে’। সুতরাং, হিদায়াত ও অবিচলতা লাভের জন্য আল্লাহর কালামকে বুঝে পড়া এবং তা নিয়ে চিন্তা করা এক অনন্য পাথেয়।
৩. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসরণ (اتباع سنة رسول الله ﷺ)
দ্বীনের উপর অটল থাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো নবী করীম (ﷺ)-এর সুন্নাহর যথাযথ অনুসরণ করা। সুন্নাহর পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া মানেই হলো ফিতনা ও বিপথগামিতার দিকে ধাবিত হওয়া। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে এরশাদ করেছেন:
﴿ قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ ﴾
অর্থাৎ, ‘বলুন (হে নবী)! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। (আলে ইমরান: ৩১)
বিপরীতভাবে, যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আদর্শ ও আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন পরিণাম। আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে এরশাদ করেছেন:
﴿ فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴾
অর্থাৎ, ‘কাজেই যারা তাঁর (রাসূলের) আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা যেন সতর্ক হয় যে, তাদের উপর কোনো বিপর্যয় (ফিতনা) নেমে আসবে অথবা তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আপতিত হবে’। (নূর: ৬৩)
৪. নেককার ও সৎ ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণ (صحبة الصالحين)
সত্যের পথে টিকে থাকার জন্য নেককার ব্যক্তিদের সঙ্গ লাভ করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকেও (ﷺ) নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি নিজেকে ওই সব লোকের সংসর্গে ধৈর্যশীল রাখেন যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে ডাকে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
﴿ وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ﴾
অর্থাৎ, ‘আর আপনি নিজেকে ওই সব লোকের সংসর্গে ধৈর্যশীল রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে ডাকে এবং তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে; আর আপনি পার্থিব জীবনের শোভাবর্ধন কামনায় তাদের থেকে আপনার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না’। (কাহফ: ২৮)
বিপদ ও ফিতনার সময়ে একজন সৎ বন্ধু অন্যকে দ্বীনের উপর অটল থাকতে সাহায্য করে। যেমনটি আল্লাহ তাআলা হিজরতের সময় আবু বকর (রা.) ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন:
﴿ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا ﴾
অর্থাৎ, ‘যখন তিনি তাঁর সঙ্গীকে বলছিলেন, তুমি বিষণ্ণ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন’। (তওবা: ৪০)
সৎসঙ্গের প্রভাবে অবিচল থাকার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো খলকে কুরআনের ফিতনার সময় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.)-কে তাঁর সঙ্গী মুহাম্মদ বিন নূহ (রহ.)-এর দেওয়া সেই ঐতিহাসিক নসীহত। ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, আমি মুহাম্মদ বিন নূহের চেয়ে কম বয়সী এবং স্বল্প ইলমের অধিকারী এমন আর কাউকে আল্লাহর দ্বীনের উপর এত বেশি অটল ও অবিচল থাকতে দেখিনি। আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, তিনি তাকে খাতেমা বিল খায়েরের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। বন্দী অবস্থায় একদিন যখন আমি ও সে নির্জনে একাকী ছিলাম, তখন সে আমাকে বলেছিল: ‘হে আবু আব্দুল্লাহ! আল্লাহকে ভয় করুন, আল্লাহকে ভয় করুন! আপনি কিন্তু আমার মতো সাধারণ কেউ নন। আপনি সাধারণ মানুষের আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। এই বিশাল জনগোষ্ঠী উৎসুক দৃষ্টিতে আপনার সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে। সুতরাং আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং তাঁর আদেশের উপর অটল থাকুন” (তারিখে বাগদাদ)
৫. তাকওয়া অবলম্বন ও নেক আমল সম্পাদন (تقوى الله وعمل الصالحات)
আল্লাহকে ভয় করা এবং সৎ কাজ করা মুমিনের হৃদয়ে সত্য-মিথ্যা পার্থক্যের শক্তি বা ‘ফুরকান’ তৈরি করে। ফলে যারা তাকওয়ার পথ অবলম্বন করে, তাদের জন্য সঠিক পথে চলা সহজ হয়ে যায় কেননা আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার তাওফীক দিয়ে দেন এবং তাদের পাপসমূহ মোচন করেন। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
﴿ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ﴾
অর্থাৎ, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের সত্য-মিথ্যা পার্থক্যের শক্তি দান করবেন, তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন’। (আনফাল: ২৯)
৬. দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া এবং সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ (الدعوة إلى دين الله والأمر بالمعروف والنهي عن المنكر)
সত্যের উপর অটল থাকার ষষ্ঠ উপায় হলো আল্লাহর দ্বীনের দিকে মানুষকে আহ্বান করা এবং সমাজ থেকে অন্যায় দূর করার প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করা। যখন একজন মুমিন দাওয়াতের কাজে ব্যস্ত থাকে, তখন আল্লাহ তাকে হিদায়াতের পথে আরও দৃঢ় করে দেন।
আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে এরশাদ করেছেন:
﴿ وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ ﴾
অর্থাৎ, ‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎকাজের আদেশ দিবে ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে’। (আলে ইমরান: ১০৪)
দাওয়াতের এই পথই নবী ও তাঁর অনুসারীদের প্রকৃত পথ। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র এরশাদ করেছেন:
﴿ قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي ﴾
অর্থাৎ, ‘বলুন: এটাই আমার পথ; আমি ও আমার অনুসারীগণ জাগ্রত জ্ঞানসহ আল্লাহর দিকে আহ্বান করি’। (ইউসুফ: ১০৮)
এর চমৎকার দৃষ্টান্ত হলো, আসহাবুল উখদুদের সেই যুবক যাকে আল্লাহ এক রাহিবের মাধ্যমে হেদায়াত দান করেছিলেন। অভিজ্ঞ রাহিব আগেই বুঝতে পেরেছিলেন সামনে বালকটির কঠিন দিন আসছে। তাকে ঈমানের অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। কেননা নবী-রাসূলগণের ইতিহাস তো আছেই, তাছাড়াও যুগে-যুগে যারা আল্লাহর পথে মানুষকে দা'ওয়াত দিয়েছেন, যারা শিরক ও বিদ'আত এবং কুসংস্কারের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন, যারা প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বিপরীত কথা বলেছেন, তাদেরকে নিজ জাতির পক্ষ থেকেই কঠিন জুলুম-নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়েছে। রাজা-বাদশা ও সমাজপতিগণ তাদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করেছে। স্বার্থান্বেষী মহল তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিতে চেয়েছে। প্রথমত নানারকম প্রলোভন দিয়ে তাদেরকে ক্ষান্ত করার চেষ্টা করেছে। তাতে ব্যর্থ হলে শক্তি আরোপ করেছে। নানারকম কষ্ট দিয়েছে। এমনকি শহীদ পর্যন্ত করে দিয়েছে। বস্তুত দ্বীনী দাওয়াতের পথ কখনোই মসৃণ হয় না। কঠিন ত্যাগ স্বীকার ছাড়া এ পথে সফলতা লাভ হয় না। তাই রাহিব তাকে আগেই সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু এই বালকের যখন দ্বীনের সত্যতা বুঝে এসে গেল তখন সে এই সত্যের পতাকা নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে লাগলো। বালকটি আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করত। তার চিকিৎসায় জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত লোক ভালো হয়ে যেত। তারা ভালো হত আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাতেই। বালকের নিজস্ব কোনও ক্ষমতা ছিল না। তা কারও থাকেও না। বালকটি আল্লাহ প্রদত্ত এই কারামতকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াতের মাধ্যমে বানিয়ে নিল। বালকটি মানুষকে এভাবে দাওয়াত দিত যে, আমি কাউকে নিরাময় করতে পারি না। নিরাময় তো আল্লাহ তাআলাই করেন। তুমি যদি আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আন, আমি আল্লাহ তাআলার কাছে দু'আ করব, তিনি তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। এ কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতো। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বালকের দোয়ার উসীলায় আরোগ্য দান করতেন। সৃষ্টির সেবা করে করে বালকটি মানুষের ভেতর ভালোবাসা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করতো এবং সেই সম্প্রীতি ও ভালোবাসা দ্বীনী দাওয়াতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতো।
কিন্তু যখন ওই দেশের জালেম বাদশা বিষয়টি জানতে পারলো তখন বাদশা তাকে পাকড়াও করল এবং তাকে শাস্তি দিতে থাকল। তাকে বলা হল, তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এস। সে অস্বীকার করল। ফলে বাদশা তাঁকে বিভিন্নভাবে দ্বীন থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করতে লাগলো। যখন সহজ কথায় কাজ হচ্ছিল না তখন একবার পাহাড়ের চূড়া থেকে ফেলে দিয়ে, আরেকবার নৌকায় তুলে সাগরের মাঝখানে নিয়ে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু যেহেতু বালকটি সবসময় দ্বীনের দাওয়াতে অবিচল ছিল তাই আল্লাহ তাকে ঈমানের পথে অটল থাকার বিশেষ তাওফিক দান করেছিলেন। এর ফলে জীবনের শেষ মুহূর্ত এবং শেষ নিঃশ্বাস অবধি সে দ্বীনের উপর দৃঢ়পদ থাকে; কোনো শক্তির পক্ষেই তাকে সেই সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করা সম্ভব হয়নি। (মুসলিম: ৩০০৫)
৭. নবীগণের কাহিনী ও তাঁদের অনুসারীদের বীরত্বগাথা পাঠ করা (قراءة قصص الأنبياء وأتباعهم)
সত্যের পথে অবিচল থাকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলগণের এবং তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারীদের জীবনের কঠিন পরীক্ষা ও তাতে উত্তীর্ণ হওয়ার কাহিনীগুলো পাঠ করা। এই কাহিনীগুলো মুমিনের হৃদয়ে আত্মবিশ্বাস জোগায় এবং ফিতনার সময় ধৈর্য ধরার প্রেরণা দান করে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ
অর্থাৎ, ‘আর রাসূলগণের এসব সংবাদ আমি তোমার কাছে বর্ণনা করছি, যার মাধ্যমে আমি তোমার অন্তরকে দৃঢ় করি’। (হুদ: ১২০)
এই অবিচলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন হযরত ইবরাহিম (আ.)। যখন তাঁকে নমরুদের বিশাল অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তখনও তিনি সত্য থেকে একচুল নড়েননি। সেই ভয়াবহ মুহূর্তে তাঁর মুখে কেবল একটি শব্দই উচ্চারিত হয়েছিল ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল’। (হুদ: ১২০-এর তাফসির)
অবিচলতার এই ধারা আমরা দেখতে পাই মূসা আলাইহিস সালামের অনুসারী ফেরাউনের জাদুকরদের মাঝেও। সত্য অনুধাবন করার পর যখন তারা ঈমান আনলেন তখন ফেরাউন তাদেরকে দ্বীনের পথ থেকে বিচ্যুত করতে হাত-পা কেটে ফেলা ও শূলে চড়ানোর হুমকি দিল। সে বললো কুরআনের ভাষায়:
فَلَاُقَطِّعَنَّ اَیۡدِیَکُمۡ وَاَرۡجُلَکُمۡ مِّنۡ خِلَافٍ وَّلَاُصَلِّبَنَّکُمۡ فِیۡ جُذُوۡعِ النَّخۡلِ
অর্থাৎ, ‘ফিরাউন বলল, আমি অবশ্যই অবশ্যই তোমাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং তোমাদেরকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলে চড়াব’। (ত্বা-হা: ৭১)
কিন্তু তারা তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। বরং তারা দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন:
قَالُوا لَنْ نُؤْثِرَكَ عَلَى مَا جَاءَنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالَّذِي فَطَرَنَا فَاقْضِ مَا أَنْتَ قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا
অর্থাৎ, ‘তারা বলল: আমাদের কাছে যে সব স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে এবং যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাঁর উপর আমরা তোমাকে কিছুতেই প্রাধান্য দেব না। সুতরাং তুমি যা ফয়সালা করার করো; তুমি তো কেবল এই পার্থিব জীবনেই তোমার হুকুম চালাতে পারবে’। (ত্বা-হা: ৭২)
৮. অধিকহারে আল্লাহর জিকর ও তাসবিহ পাঠ করা (الإكثار من ذكر الله وتسبيحه)
দ্বীনের উপর অটল থাকার অষ্টম মাধ্যম হলো সর্বদা আল্লাহর যিকিরে লিপ্ত থাকা। দুনিয়ার ফেতনা ও অস্থিরতার মাঝে আল্লাহর যিকিরই মুমিনের অন্তরকে শান্ত ও সুদৃঢ় রাখে। এটি হিদায়াতের পথে স্থির থাকার জন্য এক অনন্য আধ্যাত্মিক পাথেয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
﴿ الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ ﴾
অর্থাৎ, ‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর জিকরের মাধ্যমে তাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রেখো, আল্লাহর জিকরের মাধ্যমেই কেবল অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে’। (রাদ: ২৮)
৯. বিভেদ ও অনৈক্য থেকে সতর্ক থাকা (الحذر من التفرق)
সত্যের পথে অবিচল থাকার নবম মাধ্যম হলো অনৈক্য ও বিচ্ছিন্নতা থেকে নিজেকে দূরে রাখা। ঈমানদারদের মাঝে অনৈক্য শয়তানের জন্য সহজ লক্ষ্য তৈরি করে, যা হিদায়াতের পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করে ফেলে। কুরআন ও সুন্নাহর রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধরা দ্বীনের উপর অবিচল থাকার জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন:
﴿ وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ﴾
অর্থাৎ, ‘তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’। (আলে ইমরান: ১০৩)
১০. আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করা (نصرة دين الله)
দ্বীনের উপর অটল থাকার দশম উপায় হলো আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত রাখতে সাহায্য করা। যারা আল্লাহর দ্বীনের ঝাণ্ডা তুলে ধরার জন্য ত্যাগ স্বীকার করে, আল্লাহ তাদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখেন এবং পরকালীন কঠিন পরীক্ষায় তাদের দৃঢ়তা দান করেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এক বিশেষ অঙ্গীকার প্রদান করে এরশাদ করেছেন:
﴿ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ ﴾
অর্থাৎ, ‘হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে (অর্থাৎ তাঁর দ্বীনকে) সাহায্য করো, তবে তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদক্ষেপসমূহ সুদৃঢ় (অবিচল) করবেন’। (মুহাম্মদ: ৭)
১১. সালাত প্রতিষ্ঠা ও তাতে একাগ্রতা বজায় রাখা (إقامة الصلاة والخشوع فيها)
অবিচলতা অর্জনের অন্যতম উপায় হলো যথাযথভাবে সালাত কায়েম করা এবং তাতে খুশু-খুযু অবলম্বন করা ও বিনয়াবনত থাকা। সালাত মুমিনের অন্তরে এক বিশেষ শক্তি ও প্রশান্তি জোগায়, যা তাকে যাবতীয় অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে রক্ষা করে সত্যের উপর অটল রাখে। আল্লাহ তাআলা সূরা মুমিনুনে সফল মুমিনদের পরিচয় তুলে ধরে বলেছেন:
﴿ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ * الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ ﴾
অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই মুমিনগণ সফলকাম হয়েছে; যারা তাদের সালাতে খুশু অবলম্বন করে’। (মুমিনুন: ১-২)
সালাতের এই রক্ষাকবচ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আরও এরশাদ করেছেন:
﴿ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ ﴾
অর্থাৎ, ‘আর আপনি সালাত কায়েম করুন; নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে’। (আনকাবুত: ৪৫)
১২. কুরআনের উদাহরণসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা (التفكر في أمثال القرآن)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝাতে এবং মানুষের অন্তরে হিদায়াতকে দৃঢ় করতে বিভিন্ন উদাহরণ পেশ করেছেন। এই উদাহরণগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে মুমিনের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং শত বাঁধা বিপত্তির মুখেও দ্বীনের উপর অবিচল থাকার প্রেরণা জাগরুক থাকে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
﴿ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ ﴾
অর্থাৎ, ‘এভাবেই আল্লাহ মানুষের সামনে উদাহরণ পেশ করেন যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে’। (ইব্রাহিম: ২৫)
কুরআনের এই উপমাগুলো মুমিনের ঈমানি দৃঢ়তা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এমনই একটি উপমা হচ্ছে, কুরআনে বর্ণিত আসহাবুল উখদুদের দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে বলেন:
وَمَا نَقَمُوۡا مِنۡہُمۡ اِلَّاۤ اَنۡ یُّؤۡمِنُوۡا بِاللّٰہِ الۡعَزِیۡزِ الۡحَمِیۡدِ ۙ
অর্থাৎ, তারা মুমিনদেরকে শাস্তি দিচ্ছিল কেবল এ কারণে যে, তারা সেই আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল, যিনি মহা ক্ষমতার অধিকারী, প্রশংসার্হ। (বুরূজ: ৮)
হাদিসে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। সেখানে আমরা দেখি, এক বালকের দাওয়াত কুরবানী ও ঈমানের দৃঢ়তা দেখে পুরো শহরের হাজার হাজার মানুষ যখন ঈমান আনল, তখন অত্যাচারী বাদশাহ তাদের বিশাল অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মারতে থাকে। ঈমানদারদেরকে হুকুম দেওয়া হয়—হয় ঈমান ছাড়ো, না হয় আগুনে ঝাঁপ দাও। হাজার হাজার মানুষের এই গণহত্যা সত্ত্বেও কেউ ঈমান থেকে বিচ্যুত হয়নি।
অবিচলতার সবচেয়ে করুণ ও শক্তিশালী উদাহরণ ছিল সেই মা ও তাঁর সদ্যজাত শিশুটি। আগুনের সামনে এসে মা যখন এক মুহূর্তের জন্য সন্তানের মমতায় দ্বিধান্বিত হচ্ছিলেন, তখন আল্লাহ সেই শিশুকে কথা বলার ক্ষমতা দেন। শিশুটি বলেছিল, "মা! সবর করুন, আপনি সত্যের উপর আছেন।" এই স্বর্গীয় বাণীতে মা স্থির হয়ে যান এবং সন্তানসহ হাসিমুখে আগুনে ঝাঁপ দেন। কোনো পার্থিব মোহ বা মায়া তাঁদেরকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
১৩. তকদিরের উপর বিশ্বাস এবং আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা (الإيمان بالقدر وحسن الظن بالله)
মুমিনের জীবনে সুখ-দুঃখ যাই আসুক না কেন, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত; এই বিশ্বাস মানুষের মনকে অস্থিরতা থেকে মুক্ত রাখে। তকদিরে বিশ্বাস করা অবিচল থাকার এক মহান মাধ্যম। যখন কোনো বিপদ আসে, তখন মুমিন ধৈর্য ধারণ করে এই বিশ্বাসে যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো কিছুই ঘটে না। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ
অর্থাৎ, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই আপতিত হয় না; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তিনি তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন’। (তাগাবুন: ১১)
১৪. নবীগণের আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসরণ (الاقتداء بالأنبياء)
সত্যের উপর টিকে থাকার জন্য পূর্ববর্তী সকল নবী এবং বিশেষ করে শেষ নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর জীবনকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন নবীগণের হিদায়াতের পথ অনুসরণ করতে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهْ
অর্থাৎ, ‘এঁরাই তাঁরা যাঁদেরকে আল্লাহ হিদায়াত দান করেছেন; সুতরাং আপনি তাঁদের হিদায়াতের অনুসরণ করুন’। (আনআম: ৯০)
আমাদের প্রিয় নবী (ﷺ)-এর জীবন প্রতিটি মুমিনের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ’। (আহযাব: ২১)
১৫. আল্লাহর সাহায্যের উপর অবিচল আস্থা রাখা (الثقة بنصر الله)
বিপদ ও নির্যাতনের চরম মুহূর্তেও আল্লাহর সাহায্যের উপর অগাধ বিশ্বাস রাখা দ্বীনের উপর অবিচল থাকার অন্যতম মাধ্যম। কাফেরদের জুলুম যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখনও মুমিন বিশ্বাস করে যে চূড়ান্ত বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসবে। আল্লাহর সাহায্যের উপর অবিচল আস্থার সার্থক প্রতিফলন ঘটেছিল হযরত মুসা (আ.)-এর জীবনে। তিনি বনি ইসরাইলকে নিয়ে যখন লোহিত সাগরের তীরে উপস্থিত হলেন এবং সামনে অথৈ পানি আর পেছনে ফেরাউনের বিশাল বাহিনী দেখতে পেলেন, তখন তাঁর সাথীরা ভীত হয়ে পড়ে এবং হতাশ হয়ে ভাবে এই বুঝি ফেরাউন তাদেরকে ধরে ফেলবে! আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَلَمَّا تَرَآءَ الۡجَمۡعٰنِ قَالَ اَصۡحٰبُ مُوۡسٰۤی اِنَّا لَمُدۡرَکُوۡنَ ۚ
অর্থাৎ, তারপর যখন উভয় দল একে অন্যকে দেখতে পেল, তখন মুসার সঙ্গীগণ বলল, এখন আমরা নির্ঘাত ধরা পড়ব। (শুয়ারা: ৬১)।
কিন্তু মুসা (আ.) আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রেখে দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করেছিলেন:
﴿ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ ﴾
অর্থাৎ, ‘কক্ষনো নয়! নিশ্চয়ই আমার সাথে আমার প্রতিপালক আছেন, তিনি আমাকে অবশ্যই পথ দেখাবেন’। (শুয়ারা: ৬২)
তাঁর এই অবিচল আস্থার ফলেই আল্লাহ সমুদ্রকে বিদীর্ণ করে তাদের জন্য পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন এবং জালেম ফেরাউনের কবল থেকে তাদেরকে নাজাত দান করেছিলেন।
১৬. বাতিলের প্রকৃত স্বরূপ চিনে নেওয়া (معرفة حقيقة الباطل) সত্যের উপর টিকে থাকার জন্য বাতিল বা কাফেরদের সাময়িক চাকচিক্য ও ক্ষমতা দেখে বিভ্রান্ত না হওয়া জরুরি। বাতিলের এই দাপট খুবই ক্ষণস্থায়ী এবং এর শেষ গন্তব্য অত্যন্ত ভয়াবহ। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এই বিষয়ে সতর্ক করে এরশাদ করেছেন:
لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ * مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ
অর্থাৎ, ‘দেশ-বিদেশে কাফেরদের বিচরণ যেন আপনাকে বিভ্রান্ত না করে। এটা তো স্বল্পকালীন ভোগ মাত্র; এরপর তাদের আবাসস্থল হলো জাহান্নাম, আর তা কতই না নিকৃষ্ট শয্যা’। (আলে ইমরান: ১৯৬-১৯৭)
সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণসমূহ
১. আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপাচার (معصية الله عز وجل)
সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার প্রাথমিক এবং অন্যতম প্রধান কারণ হলো মহান আল্লাহর অবাধ্য হওয়া। মানুষ যখন ক্রমাগত পাপাচারে লিপ্ত হয়, তখন তার অন্তর থেকে হিদায়াতের নূর নিভে যেতে থাকে এবং এক পর্যায়ে সে সত্যের পথ থেকে ছিটকে পড়ে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন:
﴿ وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَاقَوْمِ لِمَ تُؤْذُونَنِي وَقَدْ تَعْلَمُونَ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ ﴾
অর্থাৎ, ‘আর স্মরণ করো, যখন মুসা তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিল: হে আমার সম্প্রদায়! কেন তোমরা আমাকে কষ্ট দিচ্ছ, অথচ তোমরা জানো যে আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল? অতঃপর যখন তারা বাঁকা পথ অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বাঁকা করে দিলেন; আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না’। (আস-সাফ: ৫)
পাপের এই ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সতর্ক করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
«إِنَّ العَبْدَ إِذَا أَخْطَأَ خَطِيئَةً نُكِتَتْ في قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ، فَإِذَا هُوَ نَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ وَتَابَ سُقِلَ قَلْبُهُ، وَإِنْ عَادَ زِيدَ فِيهَا حَتَّى تَعْلُوَ قَلْبَهُ، وَهُوَ الرَّانُ الَّذي ذَكَرَ اللهُ: ﴿ كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ ﴾»
অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই বান্দা যখন কোনো পাপ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। অতঃপর সে যখন তা ত্যাগ করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তওবা করে, তখন তার অন্তর পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি পুনরায় পাপে ফিরে যায়, তবে সেই কালো দাগ বাড়তে থাকে এবং এক সময় তার পুরো অন্তরকে ঢেকে ফেলে; আর এটাই হলো সেই মরিচা (رَانَ), যার কথা আল্লাহ (কুরআনে) উল্লেখ করেছেন: কক্ষনো নয়! বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে’। (তিরমিযী: ৩৩৩৪; সূরা মুতাফফিফীন: ১৪)
২. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ (مخالفة أمر الرسول ﷺ)
হিদায়াত পাওয়ার পর বিচ্যুত হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হলো নবী করীম (ﷺ)-এর সুন্নাহ ও আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করা। সুন্নাহর পথ ত্যাগ করে নিজেদের মনগড়া পদ্ধতি অবলম্বন করা মানুষকে কুফরি, নিফাক বা বিদআতের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে এরশাদ করেছেন:
﴿ فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴾
অর্থাৎ, ‘কাজেই যারা তাঁর (রাসূলের) আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা যেন সতর্ক হয় যে, তাদের উপর কোনো বিপর্যয় (ফিতনা) নেমে আসবে অথবা তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আপতিত হবে’। (নূর: ৬৩)
ইবনে কাসীর (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, এখানে ‘ফিতনা’ বলতে অন্তরের কুফরি, নিফাক বা বিদআতকে বোঝানো হয়েছে এবং ‘যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ বলতে দুনিয়াতে হত্যা, জেল-জুলুম বা পরকালীন আজাবকে বোঝানো হয়েছে।
৩. সত্য থেকে বিমুখতা ও অহংকার প্রদর্শন (الإعراض والاستكبار)
অনেকে সত্য জানার পরও কেবল অহংকারবশত তা গ্রহণ করে না অথবা দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই বিমুখতা মানুষকে পরকালীন অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেয়। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
﴿ وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى ﴾
অর্থাৎ, ‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জীবিকা হবে সংকীর্ণ আর তাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়’। (ত্বা-হা: ১২৪)
যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অবজ্ঞা করে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেছেন:
﴿ وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِّرَ بِآيَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عَنْهَا إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنْتَقِمُونَ ﴾
অর্থাৎ, ‘আর তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে, যাকে তার প্রতিপালকের আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ দেওয়া হয়েছে অতঃপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? নিশ্চয়ই আমি অপরাধীদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী’। (আস-সাজদাহ: ২২)
৪. প্রবৃত্তি ও নফসের দাসত্ব করা (اتباع الهوى)
মানুষ যখন নিজ প্রবৃত্তির কামনা-বাসনাকে আল্লাহর বিধানের উপর প্রাধান্য দেয়, তখন সে দ্রুত সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। শয়তান এমন ব্যক্তিদের সহজেই বিভ্রান্ত করতে পারে। আল্লাহ তাআলা এমনই এক প্রবৃত্তির অনুসারীর করুণ পরিণতির কথা এভাবে ব্যক্ত করেছেন:
﴿ وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكانَ مِنَ الْغَاوِينَ * وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَاهُ بِهَا وَلَكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَاهُ ﴾
অর্থাৎ, ‘আর আপনি তাদের সেই ব্যক্তির বৃত্তান্ত শুনিয়ে দিন, যাকে আমি আমার নিদর্শনসমূহ দিয়েছিলাম, অতঃপর সে তা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেল; তখন শয়তান তার পিছু নিল, ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। আর আমি ইচ্ছা করলে এই নিদর্শনগুলোর মাধ্যমে তাকে উচ্চমর্যাদা দান করতাম, কিন্তু সে পার্থিব জগতের প্রতি ঝুঁকে পড়ল এবং নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করল’। (আল-আ‘রাফ: ১৭৫-১৭৬)
প্রবৃত্তির অনুসরণে সত্যচ্যুত হওয়ার এক বড় দৃষ্টান্ত হলো বনি ইসরাইলের বড় আলেম বালআম ইবনে বাউরা। উক্ত আয়াতে তার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। সে আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান ও বিশেষ অলৌকিক শক্তিপ্রাপ্ত ছিল এবং তার দোয়া কবুল হতো। কিন্তু যখন অত্যাচারী কওম তাকে দুনিয়ার বিপুল ধন-সম্পদের লোভ দেখাল, তখন সে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে আল্লাহর নবী মুসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে রাজি হয়ে গেলো। ফলে আল্লাহ তার থেকে হিদায়াত কেড়ে নিলেন এবং সে চিরস্থায়ীভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে গেল।
৫. পার্থিব জীবনের চাকচিক্যে মোহগ্রস্ত হওয়া (الاغترار بزهرة الحياة الدنيا)
দুনিয়ার ধন-সম্পদ, প্রতিপত্তি এবং জৌলুসের মোহে অন্ধ হওয়া মানুষকে সত্যের পথ ভুলিয়ে দেয়। জীবনকে কেবল ভোগ-বিলাস মনে করা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
﴿ اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ... وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ ﴾
অর্থাৎ, ‘তোমরা জেনে রেখো, দুনিয়ার জীবন তো কেবল খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদ, জাঁকজমক, তোমাদের পারস্পরিক অহংকার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্য লাভের প্রতিযোগিতা মাত্র... আর পার্থিব জীবন তো প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়’। (আল-হাদীদ: ২০)
পার্থিব মোহে বিচ্যুত হওয়ার অন্যতম নিকৃষ্ট উদাহরণ হলো কারূন। সে মুসা (আ.)-এর উম্মত বনি ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আল্লাহ তাকে এত বিপুল ধন-সম্পদ দিয়েছিলেন যে তার ধনভাণ্ডারের চাবিগুলো বহন করতেই একদল শক্তিশালী মানুষের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এই সম্পদ তাকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ করার বদলে অহংকারী করে তুলল। সে বলতে লাগল, এই বিশাল ধনভাণ্ডার আমার নিজস্ব জ্ঞানের বদৌলতে অর্জিত হয়েছে। এতে আল্লাহর কোন দখল নেই। তার এই বিচ্যুতি ও অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তাকে তার বিশাল প্রাসাদ ও সমস্ত ধন-সম্পদসহ জীবন্ত মাটির নিচে ধসিয়ে দিলেন।
৬. অনৈক্য ও দলাদলি (الخلاف والتفرُّق)
সত্যের পথে অবিচল থাকার পথে একটি বড় বাধা হলো পারস্পরিক অনৈক্য ও দলাদলি। যখন মুমিনরা নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়, তখন তাদের শক্তি ও প্রভাব বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তারা সহজেই হিদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে সতর্ক করে এরশাদ করেছেন:
﴿ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ ﴾
অর্থাৎ, ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, অন্যথায় তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি (বা প্রভাব) বিলুপ্ত হবে; আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন’। (আনফাল: ৪৬)
৭. পাপাচারী ও ফাসেকদের সাহচর্য (صحبة الفاسقين)
খারাপ বন্ধুর সঙ্গ মানুষের ঈমান ও চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়। যারা আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকে এবং পাপাচারের মধ্যে ডুবে থাকে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করলে এক পর্যায়ে মুমিনও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। কিয়ামতের দিন এমন লোকরা ভুল বন্ধুর সঙ্গ বেছে নেওয়ার কারণে অত্যন্ত আফসোস করবে। আল্লাহ তাআলা সেই আফসোসের চিত্র বর্ণনা করে এরশাদ করেছেন:
﴿ وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَالَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا * يَاوَيْلَتَا لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا * لَقَدْ أَضَلَّني عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي ﴾
অর্থাৎ, ‘আর সেদিন যালিম ব্যক্তি নিজের হাত দংশন করতে করতে বলবে: হায়! আমি যদি রাসূলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম! হায় দুর্ভোগ! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে-ই তো আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল’। (ফুরকান: ২৭-২৯)
এছাড়াও আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন যেন মুমিনরা এমন কোনো মজলিসে না বসে যেখানে আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার বা উপহাস করা হয়। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
﴿ وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ ﴾
অর্থাৎ, ‘আর আল্লাহ তো কিতাবের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই নির্দেশ অবতীর্ণ করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে এবং তা নিয়ে উপহাস করা হচ্ছে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না যতক্ষণ না তারা অন্য কোনো আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়; অন্যথায় তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে’। (নিসা: ১৪০)
৮. শয়তানের প্ররোচনা ও কুমন্ত্রণা (تسويل الشيطان وتزيينه)
সত্যের পথে চলার পথে মানুষের সবচেয়ে বড় অদৃশ্য শত্রু হলো শয়তান। মানুষ যখন হিদায়াতের পথ চিনে নেওয়ার পর তা অনুসারে চলতে শুরু করে, তখন শয়তান তার সামনে পাপকে সুশোভিত করে এবং তাকে দীর্ঘ জীবনের মিথ্যা আশা দিয়ে বিভ্রান্ত করে। এই প্ররোচনার ফলেই অনেক মুমিন শেষ পর্যন্ত সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন:
﴿ إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِهِمْ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى الشَّيْطَانُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَى لَهُمْ ﴾
অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই যারা তাদের সামনে হেদায়াত পরিস্ফুট হয়ে যাওয়ার পরও পিঠ ফিরিয়ে চলে গেছে, মূলত শয়তান তাদেরকে ফুসলানি দিয়েছে এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দিয়েছে’। (মুহাম্মদ: ২৫)
শয়তানের এই কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে হলে সর্বদা আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা এবং দ্বীনের উপর অবিচল থাকার মাধ্যমগুলো আঁকড়ে ধরা অপরিহার্য।
পরিশেষে বলা যায়, আল-কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সত্যের উপর অবিচল থাকা কেবল একটি মহৎ গুণই নয়, বরং এটি জান্নাত অর্জনের একমাত্র পথ। একজন মানুষের জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা নির্ভর করে সে মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে পারল কি না তার উপর। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রতি সেই উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে এরশাদ করেছেন:
﴿ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ ﴾
অর্থাৎ, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’। (আলে ইমরান: ১০২)
দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবন অসংখ্য ফিতনা ও পরীক্ষার ক্ষেত্র। এখানে পা পিছলে যাওয়ার মতো অনেক কারণ যেমন, পাপাচার, অহংকার, দুনিয়ার মোহ এবং শয়তানের প্ররোচনা বিদ্যমান। কিন্তু যারা আল্লাহর উপর ভরসা করে নেক আমল এবং সৎসঙ্গের মাধ্যমে নিজেদের ঈমানকে রক্ষা করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন এবং কবরের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে তাদেরকে সত্যের উপর সুদৃঢ় রাখবেন। যেমনটি মহান আল্লাহ অঙ্গীকার করেছেন:
﴿ يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ﴾
অর্থাৎ, ‘আল্লাহ মুমিনদেরকে দুনিয়ার জীবনে ও পরকালের জীবনে শাশ্বত বা দৃঢ় বাণীর মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত বা অবিচল রাখেন’। (ইব্রাহিম: ২৭)
আসুন, আমরা সর্বদা সেই মহান রবের কাছে প্রার্থনা করি, যিনি অন্তরের পরিবর্তনকারী। আমাদের প্রতিটি মুনাজাতে যেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শেখানো এই অমীয় বাণীটি উচ্চারিত হয়:
«يَا مُقَلِّبَ القُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ»
অর্থাৎ, ‘হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আপনি আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর অবিচল রাখুন’। (তিরমিযী: ২১৪০)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্যের উপর পাহাড়ের মতো অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যু নসিব করুন। আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
اخلاص اور اس کی برکات
اخلاص یہ ہے کہ انسان کا قول، عمل اور ہر کوشش صرف اللہ تعالیٰ کے لیے ہو، اس کی رضا کے لیے ہو، اس کے ق...
ওলী হওয়ার মাপকাঠি ঈমান ও তাকওয়া
হামদ ও সানার পর... আল্লাহ তাআলা বলেন - وَ مَا تَكُوْنُ فِیْ شَاْنٍ وَّ مَا تَتْلُوْا مِنْهُ مِنْ قُر...
হালাল রিযিক : আল্লাহ প্রদত্ত বড় নিয়ামত
পৃথিবীতে আগমনের পর জীবনধারণের জন্য মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রিযিক। রিযিক বলতে আমরা সাধারণত খাদ্য-পা...
লেনদেনে সততা ও হালাল জীবিকা
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন