প্রবন্ধ
কুরআন আপনার পক্ষে অথবা বিপক্ষে এক অকাট্য দলিল
৩০ জুন, ২০২৬
১৫৩
০
মানবজাতির ইহকালীন জীবনের দিশারি এবং পরকালীন মুক্তির রাজপথ হিসেবে মহান আল্লাহ তাআলা আল-কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। এই মহাগ্রন্থ কেবল তিলাওয়াতের জন্য নয়, বরং এটি মানুষের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণী এক অকাট্য প্রমাণ। কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিবসে, যখন মানুষ তার কর্মের ভারে জর্জরিত থাকবে, তখন এই কুরআনই হবে মানুষের শেষ আশ্রয় অথবা তার ধ্বংসের কারণ।
হযরত আবু মালেক আল-আশ‘আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
الْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ
অর্থাৎ, ‘কুরআন হল তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলীল’। (মুসলিম: ২২৩)
এই হাদিস আমাদেরকে সতর্ক করে যে, আল-কুরআন পরকালে নিরপেক্ষ থাকবে না। এটি হয় আমাদের জান্নাতে নেওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে অকাট্য যুক্তি পেশ করবে, নতুবা আমাদের অবাধ্যতা ও বিমুখতার কারণে আমাদের বিরুদ্ধে নালিশ জানাবে। আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষণ এবং এই কালামের সাথে আমাদের গভীর সম্পর্কের ওপরই নির্ভর করছে সেদিন কুরআনের অবস্থান কী হবে।
কুরআনকে নিছক একটি পাঠ্যবই বা বরকতের বস্তু মনে করা এক বিশাল ভ্রান্তি। এটি মানুষের জীবনের প্রতিটি কাজের স্বচ্ছ দর্পণ। যেকোনো মুমিন তার সামনে দাঁড়ালে বুঝতে পারবে কুরআন কি তার পক্ষে নাকি বিপক্ষে? যদি কোনো ব্যক্তি কুরআনের নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং এর শিক্ষাকে অবজ্ঞা করে, তবে কিয়ামতের ময়দানে কুরআন তার বিপক্ষে দাঁড়াবে। এই ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,
وَقَدْ آتَيْنَاكَ مِنْ لَدُنَّا ذِكْرًا مَنْ أَعْرَضَ عَنْهُ فَإِنَّهُ يَحْمِلُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وِزْرًا
অর্থাৎ, ‘আর আমি আমার নিকট থেকে তোমাকে দান করেছি উপদেশ (অর্থাৎ কুরআন)। যে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, ক্বিয়ামতের দিন সে (পাপের) বোঝা বহন করবে’। (ত্ব-হা: ৯৯-১০০)
এই পাপের বোঝা এতই ভারী হবে যে, মানুষ সেদিন তা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পাবে না। আল-কুরআন এখানে কেবল একটি কিতাব নয়, বরং অবাধ্য মানুষের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে উপস্থাপিত এক অকাট্য অভিযোগনামা হিসেবে গণ্য হবে। যারা দুনিয়াতে একে গুরুত্ব দেয়নি, পরকালে কুরআন তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনবে।
বিপরীতে আল-কুরআন সেই মুমিনদের জন্য মুক্তির সোপান ও পরম বন্ধু হবে, যারা দুনিয়াতে একে পাঠ করেছে এবং এর প্রতিটি শব্দ নিজের মাঝে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এর সাথে ঐকান্তিক সংযোগ স্থাপন করা আল্লাহর সাথে এক লাভজনক ব্যবসা করার সমতুল্য। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً يَرْجُونَ تِجَارَةً لَنْ تَبُورَ لِيُوَفِّيَهُمْ أُجُورَهُمْ وَيَزِيدَهُمْ مِنْ فَضْلِهِ إِنَّهُ غَفُورٌ شَكُورٌ
অর্থাৎ, ‘যারা আল্লাহর কিতাব (কুরআন) তিলাওয়াত করে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে আর আল্লাহ তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছেন তাত্থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন এক ব্যবসায়ের আশা করে যাতে কক্ষনো লোকসান হবে না। কারণ, তিনি তাদেরকে তাদের প্রতিফল পূর্ণমাত্রায় দান করবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরো বেশী দিবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল (ভাল কাজের) বড়ই মর্যাদাদানকারী’। (ফাত্বির: ২৯-৩০)
হযরত আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) নবী করীম (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন,
اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِى يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لأَصْحَابِهِ
অর্থাৎ, ‘তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করবে। কেননা ক্বিয়ামতের দিন তা তিলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশকারী রূপে উপস্থিত হবে’। (মুসলিম: ৮০৪)
অর্থাৎ, কুরআন কিয়ামতের সেই কঠিন মুহূর্তে তিলাওয়াতকারীকে একাকী ছেড়ে দেবে না। এটি আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে যাবে এবং তার সাথীর ক্ষমা ও জান্নাতের জন্য জোরালো সুপারিশ করতে থাকবে।
অন্যদিকে, যারা এই তিলাওয়াত থেকে দূরে থাকে এবং অবজ্ঞাভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের ইহকালীন জীবন যেমন সংকীর্ণ হবে, পরকালেও তাদের জন্য থাকবে ভয়াবহ বিপর্যয়। আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন,
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى
অর্থাৎ, ‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জীবন হবে সংকীর্ণ আর তাকে ক্বিয়ামতের দিন উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়’। (ত্ব-হা: ১২৪)
কেবল নিজে পড়া নয়, কুরআন যখন পঠিত হয় তখন তা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করার মধ্যেও রয়েছে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও করুণা। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
অর্থাৎ, ‘যখন কুরআন পাঠ করা হয় তখন তোমরা তা মনোযোগের সঙ্গে শ্রবণ কর আর নীরবতা বজায় রাখ যাতে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়’। (আ‘রাফ: ২০৪)
প্রকৃত জ্ঞানীরা যখন কুরআন শ্রবণ করেন, তখন তাদের হৃদয় কম্পিত হয়। তারা এর মহিমা অনুভব করে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না। তাদের এই বিনয় ও কান্না তাদের ঈমানকে আরও শক্তিশালী করে। আল্লাহর তাআলা এরশাদ করেছেন,
قُلْ آمِنُوا بِهِ أَوْ لَا تُؤْمِنُوا إِنَّ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلِهِ إِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ يَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ سُجَّدًا وَيَقُولُونَ سُبْحَانَ رَبِّنَا إِنْ كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولًا وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا
অর্থাৎ, ‘বল, তোমরা কুরআনে বিশ্বাস কর কিংবা বিশ্বাস না কর, ইতোপূর্বে যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তাদেরকে যখন কুরআন পাঠ করে শুনানো হয়, তখন তারা অধোমুখে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। আর তারা বলে, আমাদের রব মহাপবিত্র; আমাদের রবের ওয়াদা অবশ্যই পূর্ণ হবে। তারা কাঁদতে কাঁদতে অধোমুখে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আর তা তাদের বিনয়ানম্রতা বাড়িয়ে দেয়’। (ইসরা: ১০৭-১০৮-১০৯)
আল-কুরআন কেবল তিলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একে শিক্ষা করা এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া মুমিনের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের সোপান। যারা এই কিতাব চর্চায় আত্মনিয়োগ করে, কুরআন পরকালে তাদের পক্ষে এক বিশেষ মর্যাদা ও সুপারিশ নিয়ে দাঁড়াবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন,
وَلَكِنْ كُونُوا رَبَّانِيِّينَ بِمَا كُنْتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَابَ وَبِمَا كُنْتُمْ تَدْرُسُونَ
অর্থাৎ, ‘তোমরা আল্লাহ্ওয়ালা হও; যেহেতু তোমরা কুরআন শিক্ষা দান কর এবং নিজেরাও পাঠ কর’। (আলে ইমরান: ৭৯)
হযরত উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন,
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
অর্থাৎ, ‘তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়’। (বুখারী: ৫০২৭)
বিপরীতে যারা আল্লাহর দেওয়া এই জ্ঞান ও হেদায়াত মানুষের কাছে পৌঁছে না দিয়ে গোপন করে, কুরআন কিয়ামতের ময়দানে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগকারী হবে। পার্থিব হীন স্বার্থে সত্যকে আড়াল করাই হবে তাদের অপরাধ। আল্লাহ তাআলা সূরা বাক্বারাহ-এর ১৫৯ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ
অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই যারা আমার অবতীর্ণ নিদর্শনাবলী এবং হেদায়াতকে গোপন করে, যদিও আমি কিতাবে তা মানুষের জন্য সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছি, আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ করেন আর অভিশাপকারীও তাদের প্রতি অভিশাপ করে থাকে’। (বাক্বারাহ: ১৫৯)
কুরআন আপনার পক্ষে দলিল তখনই হবে, যখন আপনি এর প্রতিটি বিধানকে বিনাবাক্যে মেনে নেবেন। ঈমানের দাবি হলো পুরো কিতাবকে সত্য বলে গ্রহণ করা, কোনো অংশ বাদ না দেওয়া। পবিত্র কুরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে,
وَتُؤْمِنُونَ بِالْكِتَابِ كُلِّهِ
অর্থাৎ, ‘আর তোমরা পূর্ণ কিতাবের প্রতিও বিশ্বাস রাখ’। (ইমরান: ১১৯)
যারা নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী কুরআনের কিছু অংশ মানে এবং কিছু অংশ বর্জন করে, তাদের জন্য এই কুরআনই পরকালে কঠিন আজাবের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এমন সুবিধাবাদী আচরণকে আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ
অর্থাৎ, ‘তাহলে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশকে বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান কর? অতএব তোমাদের যারা এমন করে তাদের পার্থিব জগতে লাঞ্ছনা ও অবমাননা ছাড়া আর কী প্রতিদান হতে পারে? এবং ক্বিয়ামতের দিন তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে’। (বাক্বারাহ: ৮৫)
মুত্তাকীদের জন্য কুরআন হলো চিরন্তন উপদেশ। যারা কুরআন শুনে নিজেদের সংশোধন করে, কুরআন তাদের জান্নাতে যাওয়ার পথ সহজ করে দেয়। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,
وَإِنَّهُ لَتَذْكِرَةٌ لِلْمُتَّقِينَ … وَإِنَّهُ لَحَسْرَةٌ عَلَى الْكَافِرِينَ
অর্থাৎ, ‘মুত্তাক্বীদের জন্য এ কুরআন অবশ্যই এক উপদেশ। আর এ কুরআন কাফেরদের জন্য অবশ্যই দুঃখ ও হতাশার কারণ হবে’। (হাক্কাহ: ৪৮-৪৯-৫০)
তাই যারা কুরআন থেকে বিমুখ থাকে এবং এর উপদেশ শোনার পর আরও কঠোর হয়ে যায়, তাদের পরিণাম অত্যন্ত করুণ। আল্লাহ তাআলা তাদের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন বন্য গাধার সাথে, যারা সিংহ দেখে ভয়ে পালিয়ে বেড়ায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَمَا لَهُمْ عَنِ التَّذْكِرَةِ مُعْرِضِينَ كَأَنَّهُمْ حُمُرٌ مُسْتَنْفِرَةٌ فَرَّتْ مِنْ قَسْوَرَةٍ
অর্থাৎ, ‘তাদের হয়েছে কী যে তারা উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে? যেন তারা চমকে ওঠা বন্য গাধা, যা সিংহের সম্মুখ থেকে পলায়ন করেছে’। (মুদ্দাছছির: ৪৯-৫১)
ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক জীবন পর্যন্ত কুরআনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা ঈমানের দাবি। যারা আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করে, কুরআন কিয়ামতের দিন তাদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,
وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ
অর্থাৎ, ‘আর তুমি তাদের মধ্যে বিচার ফায়ছালা কর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী, তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবে না’। (মায়েদাহ: ৪৯)
অপর দিকে যারা আল্লাহর বিধান ত্যাগ করে মানবরচিত আইন বা ‘তাগুতের’ ওপর ভরসা করে, তারা সরাসরি কুফরিতে লিপ্ত। এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কুরআন পরকালে আল্লাহর আদালতে কঠোর অভিযোগ পেশ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
অর্থাৎ, ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়ছালা করে না তারাই কাফির’। (মায়েদাহ: ৪৪)
মানুষ অনেক সময় কুরআনের স্পষ্ট বিধান থাকার পরও সমাজের অধিকাংশ মানুষ বা প্রভাবশালী নেতাদের ভুল পথের অনুসরণ করে। কিয়ামতের দিন এই নেতারা তাদের অনুসারীদের কোনো উপকার করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা জাহান্নামীদের আর্তি বর্ণনা করে বলেন,
يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَالَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلَا
অর্থাৎ, ‘আগুনে যেদিন তাদের মুখ উপুড় করে দেয়া হবে সেদিন তারা বলবে- হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম ও রাসূলকে মানতাম। আর তারা বলবে- হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা আমাদের নেতাদেরকে ও আমাদের প্রধানদেরকে মান্য করতাম। তারাই আমাদের গোমরাহ করেছিল’। (আহযাব: ৬৬-৬৭)
একইভাবে যারা পূর্বপুরুষদের দোহাই দিয়ে কুরআনের হুকুম অমান্য করে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, তাদের পিতৃপুরুষরা যদি কিছুই না জেনে থাকে এবং সঠিক পথপ্রাপ্ত না হয়, তবুও কি তারা তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করবে (মায়েদাহ: ১০৪)?
কুরআনকে নিজের পক্ষে পাওয়ার অন্যতম শর্ত হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর যথাযথ অনুসরণ করা। হিদায়াতের মাপকাঠি হলো রাসূল (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণের প্রদর্শিত পথ। হযরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছিলেন,
وَقَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ كِتَابَ اللهِ
অর্থাৎ, ‘আমি তোমাদের মাঝে এমন এক জিনিস রেখে যাচ্ছি- যা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব’। (মুসলিম: ১২১৮)
মালিক ইবনু আনাস (রহঃ) হতে মুরসালরূপে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
অর্থাৎ, ‘আমি তোমাদের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দু’টি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে তাঁর নবীর সুন্নাত’। (মুয়াত্ত্বা মালেক: ১৬৬১)
তবে ইবাদতের নামে সুন্নাহর সীমা অতিক্রম করে বাড়াবাড়ি করা বা চরমপন্থা অবলম্বন করাও কুরআনকে বিপক্ষের দলিলে পরিণত করতে পারে। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করীম (ﷺ) তাঁর সুন্নাহর বাইরে গিয়ে কঠোর ইবাদতকারীদের সতর্ক করে বলেছেন,
فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
অর্থাৎ, ‘সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত (জীবন-যাপন পদ্ধতি) হতে বিমুখ হবে সে আমার দলভুক্ত নয়’। (বুখারী: ৫০৬৩)
পরিশেষে, আল-কুরআন কেবল একটি গ্রন্থ নয়, বরং এটি পরকালের আমলনামার এক জীবন্ত সাক্ষী। কিয়ামতের সেই মহান বিচারালয়ে, যেখানে প্রতিটি মানুষের আমল পরিমাপ করা হবে, সেখানে কুরআন হয় আপনার জন্য মুক্তির সনদ হবে, না হয় আপনার ধ্বংসের অকাট্য দলিলে পরিণত হবে। আমরা যদি আজ কুরআনকে তিলাওয়াত করি, এর মর্মার্থ অনুধাবন করি, একে জীবনের একমাত্র সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করি এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণের আদর্শ অনুযায়ী জীবন যাপন করি, তবেই এই মহান কিতাব কিয়ামতের দিন আমাদের জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করবে। আসুন, আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআনকে আমাদের পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করি, যাতে অন্ধ ও লাঞ্ছিত অবস্থায় সেদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে না হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআনের নূর দ্বারা সিক্ত করুন এবং কিয়ামতের দিন একে সুপারিশকারী হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
قرآن مجیدکیا ہے؟ (پہلی قسط)
کیا قرآن مجید اللہ جل وعلیٰ کا ازلی وابدی کلام ہے اور آسمانی کتاب جو جبرئیل علیہ السلام کے ذریعہ رسو...
সন্তান ভাবনা; কুরআন মাজীদের একটি আয়াতের বার্তা
দায়িত্বশীল বাবা-মা মাত্রই সন্তানকে নিয়ে চিন্তা করেন। সন্তানের জন্যে দায়িত্বশীল পিতা-মাতার এই চিন্তা ...
কুরআন তিলাওয়াত ও তারাবীর তিলাওয়াত : আমাদের অসতর্কতা
কুরআনুল কারীম আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কালাম। মহান প্রভুর মহান বার্তা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- لَّا ...
কুরআনের প্রতি জুলুম
মহিউস সুন্নাহ হযরত মাওলানা আবরারুল হক সাহেব হারদুঈ রহ. বলেন, ১. নিজের ঘর বাড়ি, দোকান-পাট, খাওয়া-দাওয়...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন