মা'আরিফুল হাদীস
معارف الحديث
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায় - এর পরিচ্ছেদসমূহ
মোট হাদীস ১৩২ টি
হাদীস নং: ২১৬
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.
২১৬. হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে একজন 'আমিন' (অতিবিশ্বস্ত ব্যক্তি) থাকে। আর আমার উম্মতের আমিন হচ্ছে আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لِكُلِّ أُمَّةٍ أَمِينٌ، وَأَمِينُ هَذِهِ الأُمَّةِ أَبُو عُبَيْدَةَ بْنُ الجَرَّاحِ» (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ২১৭
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.
২১৭. হযরত হুযায়ফা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাজরান এলাকার লোকেরা এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি আমাদের জন্য নির্বাচন করে প্রেরণ করুন। তিনি উত্তরে বললেন, আমি তোমাদের প্রতি একজন যথার্থ বিশ্বস্ত লোক প্রেরণ করব। লোকেরা তখন এ প্রত্যাশায় রইল। (হযরত হুযায়ফা বলেন,) রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তখন আবু উবায়দাকে সেখানে প্রেরণ করলেন। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ حُذَيْفَةَ، قَالَ: جَاءَ أَهْلُ نَجْرَانَ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ ابْعَثْ إِلَيْنَا رَجُلًا أَمِينًا فَقَالَ: «لَأَبْعَثَنَّ إِلَيْكُمْ رَجُلًا أَمِينًا حَقَّ أَمِينٍ حَقَّ أَمِينٍ»، قَالَ فَاسْتَشْرَفَ لَهَا النَّاسُ قَالَ فَبَعَثَ أَبَا عُبَيْدَةَ بْنَ الْجَرَّاحِ. (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ২১৮
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.
২১৮. ইবনে আবী মুলায়কা তাবেয়ী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হযরত আয়েশা রাযি.-কে বলতে শুনেছি- যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যদি কাউকে খলীফা নির্বাচন করে যেতেন, তাহলে কাকে নির্বাচন করতেন? আয়েশা রাযি. বললেন, আবু বকর সিদ্দীককে। আবার প্রশ্ন করা হল, আবু বকরের পরবর্তী সময়ের জন্য কাকে খলীফা বানিয়ে যেতেন? তিনি উত্তর দিলেন, উমরকে। পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হল, উমরের পর কাকে খলীফা নির্বাচন করতেন? আয়েশা উত্তর দিলেন, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে। (মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنِ ابْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ، سَمِعْتُ عَائِشَةَ، وَسُئِلَتْ: " مَنْ كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُسْتَخْلِفًا لَوِ اسْتَخْلَفَهُ؟ قَالَتْ: أَبُو بَكْرٍ، فَقِيلَ: ثُمَّ مِنْ بَعْدِ أَبِي بَكْرٍ؟ قَالَتْ: عُمَرُ، قِيلَ مَنْ بَعْدَ عُمَرَ؟ قَالَتْ: أَبُو عُبَيْدَةَ بْنُ الْجَرَّاحِ ". (رواه مسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ২১৯
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ নবী করীম (ﷺ)-এর আহলে বাইত তথা পুণ্যবতী স্ত্রী ও সন্তানদের ফযীলত ও মর্যাদা
এটা এক বাস্তব সত্য- যাতে কোন সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই যে, আহলে বাইত শব্দটি কুরআন মজীদে নবী পত্রীদের জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে। সূরা আহযাবের চতুর্থ রুকুতে নবী পত্রীদেরকে বিশেষ কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়ার পর বলা হয়েছে:
إنما يريد الله ليذهب عنكم الرجس أهل البيت ويطهركم تطهيرا
যার অর্থ এই যে, হে আমার নবী পত্নীগণ। তোমাদেরকে যে এই বিশেষ কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, এগুলোর দ্বারা আল্লাহ্ তা'আলার উদ্দেশ্য ঝামেলা ও কষ্টে ফেলা নয়; বরং আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা এসব দিকনির্দেশনা দ্বারা এই যে, তোমাদেরকে সর্বপ্রকার জাহেরী ও বাতেনী পংকিলতা থেকে তিনি মুক্ত রাখবেন। আরবী ভাষা সম্পর্কে যে ব্যক্তি সামান্য জ্ঞানও রাখে, সে সূরা আহযাবের এ পূর্ণ রুকূটি পাঠ করার পর সামান্য সন্দেহও পোষণ করবে না যে, এখানে 'আহলে বাইত' শব্দটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পুণ্যবতী স্ত্রীদের জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এটা কেমন আশ্চর্য কথা যে, কুরআনের প্রতি ঈমান পোষণকারী আমাদের মুসলমানদের অবস্থা আজ এই যে, 'আহলে বাইত' শব্দটি শুনে আমাদের মন-মস্তিষ্ক নবী-পত্নীদের দিকে মোটেও যায় না; বরং হুযুর (ﷺ)-এর কন্যা হযরত ফাতেমা রাযি. ও তাঁর স্বামী হযরত আলী রাযি. এবং এ দু'জনের সন্তানাদির দিকেই ধাবিত হয়।
'আহলে বাইত' শব্দটি কুরআন মজীদে সূরা আহযাব ছাড়া কেবল এক স্থানে সূরা হুদের ষষ্ঠ রুকুতেও এসেছে। যেখানে এ ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন বার্ধক্যের এ বয়সে উপনীত হয়ে গিয়েছিলেন, যখন প্রাকৃতিক সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সন্তানের আশা করা যায় না এবং তখনও তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, তখন আল্লাহ তা'আলার প্রেরিত ফিরিশতাদের একটি দল এসে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী হযরত সারাকে একটি পুত্র সন্তান জন্মের সুসংবাদ দিলেন। হযরত সারা আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন:
أَأَلِدُ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهٰذَا بَعْلِي شَيْخًا
(আমি নিজেও বৃদ্ধা, আর আমার স্বামীও বুড়ো হয়ে গিয়েছেন। তাই এখন আমি সন্তান জন্ম দিব?) এর উত্তরে ফিরিশতারা বললেন:
اَتَعۡجَبِیۡنَ مِنۡ اَمۡرِ اللّٰہِ رَحۡمَتُ اللّٰہِ وَبَرَکٰتُہٗ عَلَیۡکُمۡ اَہۡلَ الۡبَیۡتِ ؕ اِنَّہٗ حَمِیۡدٌ مَّجِیۡدٌ
(আপনি আল্লাহ্ তা'আলার কুদরতী ফায়সালার উপর আশ্চর্যবোধ করছেন। আপনাদের আহলে বাইত-এর উপর তো আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকত রয়েছে।) স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে, এ আয়াতেও 'আহলে বাইত' দ্বারা হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর স্ত্রী হযরত সারাকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে।
আরবী ভাষা ও বাকপদ্ধতি সম্পর্কে যাদের ধারণা রয়েছে এমন প্রতিটি ব্যক্তিই জানে যে, কোন ব্যক্তির আহলে বাইতের প্রয়োগস্থল তার স্ত্রীই হয়ে থাকে। তদ্রূপভাবে ফারসী ভাষায় 'আহলে খানাহ্' এবং উর্দু ভাষায় 'ঘরওয়ালা' অথবা 'ঘরওয়ালী' স্ত্রীকেই বলা হয়। মা, বোন, কন্যা, জামাতা ও তাদের সন্তানদের জন্য আহলে বাইত, আহলে খানাহ এবং ঘরওয়ালে শব্দ ব্যবহার করা হয় না। সারকথা, এতে কোন সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই যে, কুরআন মজীদে আহলে বাইত শব্দটি নবী-পত্রীদের জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাঁরাই এর প্রথম প্রয়োগস্থল। তবে এ কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, যখন সূরা আহযাবের উপরোল্লিখিত আয়াত:
اِنَّمَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیُذۡہِبَ عَنۡکُمُ الرِّجۡسَ اَہۡلَ الۡبَیۡتِ وَیُطَہِّرَکُمۡ تَطۡہِیۡرًا ۚ
নাযিল হল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপন কন্যা হযরত ফাতেমা যাহরা, তাঁর দু'পুত্র হযরত হাসান ও হুসাইন এবং তাদের সাথে তাঁর চাচাতো ভাই ও স্বামী হযরত আলী রাযি.-কে একটি কম্বলে নিজের সাথে নিয়ে এ দু‘আ করলেন:
اللَّهُمَّ هَؤُلاَءِ أَهْلُ بَيْتِي فَأَذْهِبْ عَنْهُمُ الرِّجْسَ وَطَهِّرْهُمْ تَطْهِيرًا
(হে আল্লাহ্। এরাও আমার আহলে বাইত, সুতরাং তাদের থেকেও অপবিত্রতা দূর করে দিয়ে তাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র করে দাও।) নিঃসন্দেহে হুযুর (ﷺ)-এর এ দু‘আ কবুল হয়েছে এবং সূরা আহযাবে নবী পত্রীগণকে আহলে বাইত শব্দ দ্বারা উল্লেখ করে তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলার যে বিশেষ অনুগ্রহের কথা বলা হয়েছে, এর মধ্যে তারাও শামিল হয়ে গেলেন। এর ভিত্তিতে তারাও 'আহলে বাইত'-এর সঠিক প্রয়োগস্থল। কিন্তু আগেও যেমন বিস্তারিত বলে আসা হয়েছে যে, কুরআন মজীদে এ শব্দটি নবী পত্রীদের জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাঁরাই এর প্রথম প্রয়োগক্ষেত্র।
সারকথা: এ বিষয়টি যে, নবী পত্নীগণ হুযুর (ﷺ)-এর আহলে বাইত নন; বরং এ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল তাঁর এক কন্যা, এক জামাতা ও দুই নাতী একথাটি না ভাষাগত দিক দিয়ে সঠিক, না কুরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত; বরং একটি বিশেষ ফেরকার চালাকির ফলে এ ভুলটি উম্মতের মধ্যে ব্যাপক রূপ ধারণ করে নিয়েছে এবং আমাদের সাদা মনের কারণে অন্যান্য অনেক ভুলের ন্যায় এটাও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে ফেলেছে। তাই আহলে বাইত শব্দ শুনে আমাদের লেখাপড়া জানা অনেক মন মস্তিষ্কও নবী-পত্রীদের প্রতি যায় না- যা কুরআন মাজীদের দৃষ্টিতে এ শব্দের প্রথম প্রয়োগ স্থল।
এবার এ অধম 'আহলে বাইত' শব্দের সঠিক অর্থটি উম্মতের মধ্যে প্রচলন দেওয়ার নিয়্যতে 'আহলে বাইত নববী' শিরোনামের অধীনেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পত্রীগণ ও সন্তানদের উভয়ের মর্যাদা ও ফযীলত লিখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। وَاللَّهُ الْمُوَفِّقُ وَهُوَ الْمُسْتَعَانُ
আযওয়াজে মুতাহহারাত তথা নবী পত্রীদের আলোচনা
হাদীস ও শরী‘আতের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আযওয়াজে মুতাহহারাত যারা বিবাহিতা স্ত্রী হিসাবে হুযূর (ﷺ)-এর সাথে অল্প বিস্তর সময় রয়েছেন, তাঁরা মোট এগারজন। তাদের নাম এই: (১) হযরত খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ, (২) হযরত সাওদা বিনতে যামআ, (৩) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা, (৪) হযরত হাফসা বিনতে উমর ইবনুল খাত্তাব, (৫) হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা, (৬) হযরত উম্মে সালামা, (৭) হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ, (৮) হযরত উম্মে হাবীবা, (৯) হযরত জুওয়াইরিয়া বিনতুল হারেস, (১০) হযরত সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই ইবনে আখতাব, (১১) হযরত মায়মুনা রাযি.। তাঁদের মধ্যে হযরত খাদীজা ও হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা হুযুর (ﷺ)-এর জীবদ্দশাতেই ইন্তিকাল করে গিয়েছেন। এ এগারজন ছাড়া বনু কুরায়যার রায়হানা বিনতে শামাউন সম্পর্কেও কোন কোন রেওয়ায়াত দ্বারা জানা যায় যে, যখন হুযুর (ﷺ) বনু কুরায়যার ইয়াহুদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন এবং তাদের অবশিষ্টদেরকে গ্রেফতার করলেন, তখন তাদের মধ্যে এ রায়হানাও ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করে নিলে হুযুর (ﷺ) তাকে মুক্ত করে দিয়ে নিজের বিবাহে নিয়ে নিলেন। কিন্তু অপর কোন কোন রেওয়ায়াত দ্বারা জানা যায় যে, তিনি হুযুর (ﷺ)-এর বিবাহিতা স্ত্রীর মর্যাদা লাভের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি; বরং দাসী হিসাবে হুযুর (ﷺ)-এর সাথে ছিলেন। পরিশেষে হুযূর (ﷺ)-এর ওফাতের কয়েকদিন পূর্বে এবং এক বর্ণনা অনুযায়ী বিদায় হজ্ব থেকে প্রত্যাবর্তনের পর হুযুর (ﷺ)-এর জীবদ্দশায়ই তিনি ওফাত পান।
স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য ও মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য নিঃসন্দেহে একটি উঁচু স্তরের মর্যাদা এবং আল্লাহ্ তা'আলার এক বিরাট নেয়ামত। স্তরের পার্থক্য সত্ত্বেও এ মর্যাদা সকল আযওয়াজে মুতাহহারাতের সমানভাবে অর্জিত রয়েছে। তেমনিভাবে তাদেরকে যে বিশেষ বিধানাবলী আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, এসব বিধানও তাদের সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কুরআন মজীদে وازواجه امهاتهم বলে তাদেরকে সকল ঈমানদারের মা বলা হয়েছে। এর ভিত্তিতেই হুযুর (ﷺ)-এর ওফাতের পর তাঁর কোন উম্মত ও ঈমানদারের জন্য তাদের মধ্য থেকে কাউকে বিয়ে করা তেমনিভাবে হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে, যেমনভাবে নিজের মাকে বিয়ে করা হারাম।
এ পর্যন্ত কেবল আযওয়াজে মুতাহহারাতের নাম লিখা হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রী হওয়ার মর্যাদা সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সামনে ইনশাআল্লাহ এসব 'উম্মাহাতুল মু'মিনীনের' প্রয়োজনীয় পরিচিতি, উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিবাহে আসার বিবরণ ও এর বিশেষ কারণসমূহ পাঠকগণ দেখতে পাবেন। তাছাড়া তাদের মৃত্যুর আলোচনাও সেখানে থাকবে। এর দ্বারা ইনশাআল্লাহ্ ঐসব প্রশ্ন ও সন্দেহের উত্তরও হয়ে যাবে, যা আযওয়াজে মুতাহহারাতের সংখ্যার ব্যাপারে মানুষরূপী শয়তানদের ওয়াসওয়াসার কারণে অন্তরে সৃষ্টি হয়।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.
ইনি হচ্ছেন সর্বপ্রথম ভাগ্যবতী নারী, যিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রী হওয়ার মর্যাদায় ভূষিত হন। তার পিতা খুওয়াইলিদ মক্কার আসাদ গোত্রের একজন ধনী ও সম্মানিত ব্যবসায়ী ছিলেন। হযরত খাদীজার প্রথম বিয়ে আবু হালা তামীমীর সাথে হয়েছিল এবং তাদের দু'জন সন্তান (হালা ও হিন্দ) জন্ম গ্রহণ করেছিল। কিছুদিন পর আবু হালার ইন্তিকাল হয়ে গেল এবং দ্বিতীয় বিয়ে আতীক ইবনে আবেদ মাখযুমীর সাথে অনুষ্ঠিত হল। এ দিক থেকেও তাদের এক কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করল। কিন্তু আতীকও বেশী দিন বেঁচে থাকলেন না। তারপর যখন খাদীজার বয়স ৩৫/৩৬ বছর হয়ে গেল, তখন তার পিতা খুওয়াইলিদেরও ইন্তিকাল হয়ে গেল। এখন ব্যবসায়িক কাজ কারবারের দায়িত্ব নিজের উপরই এসে পড়ল। মক্কায় প্রচলন ছিল যে, লাভের নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করে দিয়ে অন্যের দ্বারাও ব্যবসা পরিচালনা করা হত। (যাকে ফেকাহর পরিভাষায় মুযারাবা বলা হয়।) নিজের পিতা ও স্বামীর মৃত্যুর পর হযরত খাদীজা এ পদ্ধতিই অবলম্বন করলেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্মল চরিত্র, বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা ও সততার কথা মক্কাবাসীর নিকট সুবিদিত ছিল। এমনকি তিনি 'আল আমীন' উপাধিতে পরিচিত ছিলেন। এ কারণেই হযরত খাদীজা একবার চাইলেন যে, হুযুর (ﷺ) তার ব্যবসায়িক পণ্য সামগ্রী নিয়ে সিরিয়ায় যান এবং এ প্রস্তাবও দিলেন যে, লাভের যতটুকু অংশ অন্যদেরকে এ পর্যন্ত দিয়ে এসেছি, আপনাকে এর দ্বিগুণ দিব। হুযূর (ﷺ) নিজের চাচা আবু তালেবের সাথে পরামর্শ করার পর এ প্রস্তাব গ্রহণ করে নিলেন। হযরত খাদীজা স্বীয় গোলাম মায়সারাকেও তাঁর সাথে দিয়ে দিলেন। এ বাণিজ্যিক সফরে আল্লাহ্ তা'আলা প্রচুর বরকত দান করলেন এবং আগে যে লাভ হত, এ সফরে দ্বিগুণ মুনাফা হল। তাছাড়া হযরত খাদীজার গোলাম মায়সারা হুযূর (ﷺ)-এর উত্তম চরিত্র, নির্মল জীবনধারা এবং কিছু অসাধারণ ও কারামত জাতীয় বিষয়ও প্রত্যক্ষ করলেন। সফর থেকে ফিরে আসার পর মায়সারা খাদীজার সাথেও সেগুলোর আলোচনা করেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে বিবাহ
হযরত খাদীজা একজন প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক ও অভিজাত মহিলা হওয়া ছাড়া বাহ্যিক রূপ, সৌন্দর্য, আভ্যন্তরীণ গুণাবলী, মহান কীর্তি, দানশীলতা ও সাধুতা ইত্যাদি প্রশংসনীয় গুণাবলীতেও অনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন। এ জন্যই তিনি 'তাহেরা' উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। এ কারণে মক্কার কুরাইশদের অনেক সম্ভ্রান্ত লোকদের পক্ষ থেকে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি দু'জন স্বামীর বিয়োগের কারণে বাকী জীবন এভাবেই কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করেছিলেন। এ জন্য কারো প্রস্তাব গ্রহণ করলেন না। কিন্তু মায়সারা ব্যবসায়িক সফর থেকে ফিরে আসার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতা ও চাক্ষুষ ঘটনাবলী যখন বর্ণনা করলেন, তখন স্বয়ং তাঁর অন্তরে হুযুর (ﷺ)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আকাঙ্খা জাগ্রত হল। এ উদ্দেশ্যে তিনি নফীসা নামী এক মহিলাকে তথ্য সংগ্রহের জন্য গোপনে পাঠালেন। নফীসা বলেন যে, আমি হুযুর (ﷺ)-এর নিকট গেলাম এবং বললাম, আপনি বিয়ে করেন না কেন? তিনি উত্তর দিলেন, আমি নিঃস্ব ও খালিহাত। আমি কিভাবে বিয়ে করতে পারি? আমি বললাম, যদি এমন কোন মহিলা আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আকাঙ্খী হয়, যিনি বাহ্যিক রূপ-সৌন্দর্য ও আভিজাত্য ছাড়া প্রচুর সম্পদেরও মালিক এবং আপনার প্রয়োজন পূরণে আন্তরিকভাবে আগ্রহী হয়, তাহলে আপনি কি তাকে বিয়ে করে নেওয়া পছন্দ করবেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কোন্ বান্দী পছন্দ করবেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কোন্ বান্দী এমন হতে পারে? আমি বললাম, খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ। হুযুর (ﷺ) এ প্রস্তাবের কথা চাচা আবু তালেবের নিকট পেশ করলে তিনি অত্যন্ত খুশী প্রকাশ করলেন। এরপর হুযুর (ﷺ) নফীসাকে উত্তর দিয়ে দিলেন যে, খাদীজা যদি এর জন্য আগ্রহী হয়, তাহলে আমিও রাজী আছি।
নফীসা এসে হযরত খাদীজাকে এ ব্যাপারে অবগতি দান করলেন। তারপর খাদীজা নফীসার মাধ্যমেই হুযুর (ﷺ)কে ডেকে এনে সরাসরি তাঁর সাথে কথা বললেন। এ কথাবার্তার মধ্যেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেল অমুক দিন আমার এখানে এসে যাবেন। কথামত হুযুর (ﷺ) আপন চাচা আবু তালেব ও পরিবারের অন্যান্য মুরুব্বীদেরকে নিয়ে যাদের মধ্যে হযরত হামযা রাযি.ও ছিলেন-হযরত খাদীজার বাড়ীতে পৌছে গেলেন। খাদীজাও আপন চাচা আমর ইবনে আসাদকে ডেকে নিয়ে আসলেন এবং তখনকার কুরাইশদের প্রথা অনুযায়ী তাকেই ওলী ও অভিভাবক নির্ধারণ করে বিয়ে হয়ে গেল। এ সময় হুযুর (ﷺ) এর বয়স পঁচিশ বছর ছিল এবং খাদীজার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। এটা ছিল হুযুর (ﷺ)-এর প্রথম বিয়ে, যা নবুওয়াত লাভের প্রায় পনের বছর পূর্বে হয়েছিল।
সন্তানাদি
এ দাম্পত্য সম্পর্কের কিছুদিন পর (এক ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী ৫ বছর পর) হুযুর (ﷺ)-এর প্রথম পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন- যার নাম 'কাসেম' রাখা হয়। তারই নাম হুযুর (ﷺ) নিজের 'কুনিয়াত' উপনাম আবুল কাসেম রাখেন। শিশুকালেই তার ইন্তিকাল হয়ে যায়। তারপর হুযুর (ﷺ)-এর সর্বজ্যৈষ্ঠ কন্যা হযরত যয়নব জন্মগ্রহণ করেন। এ দু'জনের জন্ম নবুওয়াতের সূচনার পূর্বেই হয়। তারপর এক পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন-যার নাম আব্দুল্লাহ রাখা হয়। তার জন্ম নবুওয়াত যুগে হয়। এ জন্যই তাকে তৈয়্যেব ও তাহের উপনামেও স্মরণ করা হয়। তারও ইন্তিকাল শিশুকালেই হয়ে যায়। তাদের পরে ধারাবাহিকভাবে তিন কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন। যাদের নাম রুকাইয়্যা, উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা রাখা হয়। চার কন্যারই আলোচনা সামনে 'সন্তানাদি' শিরোনামে পাঠকদের সামনে পেশ করা হবে ইনশাআল্লাহ।
হযরত খাদীজার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
এ কথা সুবিদিত যে, কুরাইশ গোত্র; বরং সাধারণভাবে মক্কার অধিবাসীরা মূর্তিপূজার শিরকে লিপ্ত ছিল এবং এ শিরক তাদের নিকট এত প্রিয় ছিল যে, এর বিরুদ্ধে একটি কথা শোনাও তাদের নিকট অসহনীয় বিষয় ছিল। কিন্তু জাহিলিয়্যাতের এ যুগেও হাতে গোনা দু'চারজন এমন লোকও ছিলেন, যাদের নিকট প্রকৃতিগত ভাবেই মূর্তিপূজা অত্যন্ত ঘৃণিত ছিল। তাদের মধ্যে হযরত খাদীজাও একজন ছিলেন। ঐ যুগের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, তিনিই একমাত্র মহিলা ছিলেন, যিনি শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে বেজার ছিলেন।
আল্লাহ্ তা'আলা হযরত খাদীজাকে অন্যান্য নেয়ামতসমূহ ছাড়া আর্থিক প্রাচুর্যও দান করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অবস্থা এর বিপরীত ছিল। তাই হযরত খাদীজা নিজের সম্পূর্ণ সম্পদ যেন হুযুর (ﷺ)-এর পদতলে লুটিয়ে দিলেন এবং হুযুর (ﷺ)কে এ জাতীয় চিন্তা থেকে মুক্ত করে দিলেন। কুরআন মাজীদের সূরা 'যোহা'তে এ অবস্থা সম্পর্কেই বলা হয়েছে। وَوَجَدَکَ عَآئِلًا فَاَغۡنٰی হে নবী। আপনাকে আপনার পরওয়ারদেগার দরিদ্র ও নিঃস্ব পেয়েছন, তারপর অমুখাপেক্ষী বানিয়ে দিলেন। এখানে এ ঘটনাটিও উল্লেখ করার মত যে, হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা খাদীজা রাযি.-এর কেনা গোলাম ছিলেন। তিনি দেখলেন যে, যায়েদের মাঝে হুযুর (ﷺ)-এর প্রতি বিশেষ ভালবাসা ও আন্তরিক টান রয়েছে এবং হুযুর (ﷺ)ও তাঁর প্রতি ভালবাসার আচরণ করেন। তাই খাদীজা রাযি. যায়েদকে হুযুর (ﷺ)-এর মালিকানায় দিয়ে দিলেন। এরপর তিনি তাকে মুক্ত করে দিলেন এবং আরবদের তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী তাকে নিজের 'পালকপুত্র' বানিয়ে নিলেন। এমনকি তাকে যায়েদ ইবনে হারেসার স্থলে যায়েদ ইবনে মুহাম্মদই বলা হতে লাগল।
তারপর বিয়ের পনের বছর পর আল্লাহ্ তা'আলা হুযুর (ﷺ)কে নবুওয়াতের মর্যাদায় ভূষিত করলেন এবং তাঁর উপর ঐ কঠিন অবস্থা আসল, যেগুলোর আলোচনা নবুওয়াতের সূচনা সংক্রান্ত হাদীসে কিতাবুল মানাকেবের শুরুতেই করে আসা হয়েছে- ঐসময় তাঁর যে ধরনের প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সহানুভূতিমাখা সান্ত্বনার প্রয়োজন ছিল, সেটা আল্লাহ্ তা'আলার বিশেষ তাওফীকে হযরত খাদীজার দ্বারাই সম্ভব হয়েছিল। হযরত খাদীজা যখন হুযুর (ﷺ)কে আপন চাচাতো ভাই ওরাকা ইবনে নওফেলের নিকট নিয়ে গেলেন- যিনি মক্কার পূর্ণ জনবসতিতে তাওহীদবাদী, সঠিক আকীদার অধিকারী খ্রিস্টান এবং তাওরাত ও ইনজিলের অভিজ্ঞ আলেম ছিলেন এবং তিনি হুযুর (ﷺ)-এর মুখে হেরাগুহার ঘটনা ও ইতিবৃত্ত শুনে পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে হুযুর (ﷺ)-এর আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী হওয়ার কথা বললেন, তখন খাদীজাও তার এ কথা অন্তর থেকে কবুল করে নিলেন; বরং এ কথা বলা সঠিক হবে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পনের বছরের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পূর্ব থেকেই তাঁর অন্তর হুযুর (ﷺ)-এর প্রতিটি কথা বিশ্বাস করতে ও তা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল। এ হিসাবে বলা যায় যে, সারা উম্মতের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াতে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন।
তারপর যখন হুযুর (ﷺ) আল্লাহর হুকুমে তাওহীদ ও দ্বীনে হকের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন, তখন গোটা সম্প্রদায় তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সম্ভাব্য সকল পন্থায় তাঁকে উৎপীড়ন করা বছরের পর বছর এ হতভাগাদের প্রিয় নেশা হয়ে রইল। উৎপীড়নের এ পুরা সময়ে হযরত খাদীজা কেবল হুযুর (ﷺ)-এর দুঃখে সহানুভূতিশীল ছিলেন না; বরং সম্পূর্ণরূপে তাঁর সুখে দুঃখে শরীক ছিলেন। এমনকি যখন এ যালেমরা মক্কার প্রায় সব লোকদেরকে সাথে নিয়ে হুযুর (ﷺ) এবং তাঁর পরিবার বনী হাশেমের ঐসব লোকদের বিরুদ্ধেও অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি, কিন্তু আত্মীয়তার সম্পর্ক অথবা বংশ সম্পর্কের কারণে তাঁর সাহায্য করত। ফলে তাঁর নিকটাত্মীয়রাও শিআবে আবু তালেবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল। তারা এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল যে, পানাহার সামগ্রী পর্যন্ত তাদের নিকট পৌছানো যেত না, ফলে গাছের পাতা খেয়ে কখনো কখনো তাদের জীবন চালাতে হত। এ অবস্থায়ও হযরত খাদীজা শিআবে আবু তালেবে হুযুর (ﷺ)-এর সাথেই থাকেন। অথচ তিনি ইচ্ছা করলে এ দিনগুলোতে নিজের বাড়িতেই থাকতে পারতেন।
হযরত খাদীজার ব্যাপারে এ কথাটিও উল্লেখ করার মত যে, তিনি পুরা পঁচিশটি বছর হুযুর (ﷺ)-এর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে হুযুর (ﷺ)-এর সাথে ছিলেন। এ পুরা সময়কালে হুযুর (ﷺ) দ্বিতীয় কোন বিয়ে করেননি। নবুওয়াতের দশম সালে হিজরতের প্রায় তিন বছর পূর্বে ১লা রমযান ১১ হিজরীতে ৬৫ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।
এ সময় পর্যন্ত পাঞ্জেগানা নামাযও ফরয হয়নি এবং জানাযা নামাযের বিধানও আসেনি। এ জন্য তাঁর জানাযার নামায পড়া হয়নি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বয়ং নিজের মুবারক হাতে তাঁকে কবরে নামান এবং আল্লাহর রহমতের হাতে সোপর্দ করে দেন।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
এটা এক বাস্তব সত্য- যাতে কোন সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই যে, আহলে বাইত শব্দটি কুরআন মজীদে নবী পত্রীদের জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে। সূরা আহযাবের চতুর্থ রুকুতে নবী পত্রীদেরকে বিশেষ কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়ার পর বলা হয়েছে:
إنما يريد الله ليذهب عنكم الرجس أهل البيت ويطهركم تطهيرا
যার অর্থ এই যে, হে আমার নবী পত্নীগণ। তোমাদেরকে যে এই বিশেষ কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, এগুলোর দ্বারা আল্লাহ্ তা'আলার উদ্দেশ্য ঝামেলা ও কষ্টে ফেলা নয়; বরং আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা এসব দিকনির্দেশনা দ্বারা এই যে, তোমাদেরকে সর্বপ্রকার জাহেরী ও বাতেনী পংকিলতা থেকে তিনি মুক্ত রাখবেন। আরবী ভাষা সম্পর্কে যে ব্যক্তি সামান্য জ্ঞানও রাখে, সে সূরা আহযাবের এ পূর্ণ রুকূটি পাঠ করার পর সামান্য সন্দেহও পোষণ করবে না যে, এখানে 'আহলে বাইত' শব্দটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পুণ্যবতী স্ত্রীদের জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এটা কেমন আশ্চর্য কথা যে, কুরআনের প্রতি ঈমান পোষণকারী আমাদের মুসলমানদের অবস্থা আজ এই যে, 'আহলে বাইত' শব্দটি শুনে আমাদের মন-মস্তিষ্ক নবী-পত্নীদের দিকে মোটেও যায় না; বরং হুযুর (ﷺ)-এর কন্যা হযরত ফাতেমা রাযি. ও তাঁর স্বামী হযরত আলী রাযি. এবং এ দু'জনের সন্তানাদির দিকেই ধাবিত হয়।
'আহলে বাইত' শব্দটি কুরআন মজীদে সূরা আহযাব ছাড়া কেবল এক স্থানে সূরা হুদের ষষ্ঠ রুকুতেও এসেছে। যেখানে এ ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে যে, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন বার্ধক্যের এ বয়সে উপনীত হয়ে গিয়েছিলেন, যখন প্রাকৃতিক সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সন্তানের আশা করা যায় না এবং তখনও তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, তখন আল্লাহ তা'আলার প্রেরিত ফিরিশতাদের একটি দল এসে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী হযরত সারাকে একটি পুত্র সন্তান জন্মের সুসংবাদ দিলেন। হযরত সারা আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন:
أَأَلِدُ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهٰذَا بَعْلِي شَيْخًا
(আমি নিজেও বৃদ্ধা, আর আমার স্বামীও বুড়ো হয়ে গিয়েছেন। তাই এখন আমি সন্তান জন্ম দিব?) এর উত্তরে ফিরিশতারা বললেন:
اَتَعۡجَبِیۡنَ مِنۡ اَمۡرِ اللّٰہِ رَحۡمَتُ اللّٰہِ وَبَرَکٰتُہٗ عَلَیۡکُمۡ اَہۡلَ الۡبَیۡتِ ؕ اِنَّہٗ حَمِیۡدٌ مَّجِیۡدٌ
(আপনি আল্লাহ্ তা'আলার কুদরতী ফায়সালার উপর আশ্চর্যবোধ করছেন। আপনাদের আহলে বাইত-এর উপর তো আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকত রয়েছে।) স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে, এ আয়াতেও 'আহলে বাইত' দ্বারা হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর স্ত্রী হযরত সারাকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে।
আরবী ভাষা ও বাকপদ্ধতি সম্পর্কে যাদের ধারণা রয়েছে এমন প্রতিটি ব্যক্তিই জানে যে, কোন ব্যক্তির আহলে বাইতের প্রয়োগস্থল তার স্ত্রীই হয়ে থাকে। তদ্রূপভাবে ফারসী ভাষায় 'আহলে খানাহ্' এবং উর্দু ভাষায় 'ঘরওয়ালা' অথবা 'ঘরওয়ালী' স্ত্রীকেই বলা হয়। মা, বোন, কন্যা, জামাতা ও তাদের সন্তানদের জন্য আহলে বাইত, আহলে খানাহ এবং ঘরওয়ালে শব্দ ব্যবহার করা হয় না। সারকথা, এতে কোন সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই যে, কুরআন মজীদে আহলে বাইত শব্দটি নবী-পত্রীদের জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাঁরাই এর প্রথম প্রয়োগস্থল। তবে এ কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, যখন সূরা আহযাবের উপরোল্লিখিত আয়াত:
اِنَّمَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیُذۡہِبَ عَنۡکُمُ الرِّجۡسَ اَہۡلَ الۡبَیۡتِ وَیُطَہِّرَکُمۡ تَطۡہِیۡرًا ۚ
নাযিল হল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপন কন্যা হযরত ফাতেমা যাহরা, তাঁর দু'পুত্র হযরত হাসান ও হুসাইন এবং তাদের সাথে তাঁর চাচাতো ভাই ও স্বামী হযরত আলী রাযি.-কে একটি কম্বলে নিজের সাথে নিয়ে এ দু‘আ করলেন:
اللَّهُمَّ هَؤُلاَءِ أَهْلُ بَيْتِي فَأَذْهِبْ عَنْهُمُ الرِّجْسَ وَطَهِّرْهُمْ تَطْهِيرًا
(হে আল্লাহ্। এরাও আমার আহলে বাইত, সুতরাং তাদের থেকেও অপবিত্রতা দূর করে দিয়ে তাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র করে দাও।) নিঃসন্দেহে হুযুর (ﷺ)-এর এ দু‘আ কবুল হয়েছে এবং সূরা আহযাবে নবী পত্রীগণকে আহলে বাইত শব্দ দ্বারা উল্লেখ করে তাদের উপর আল্লাহ্ তা'আলার যে বিশেষ অনুগ্রহের কথা বলা হয়েছে, এর মধ্যে তারাও শামিল হয়ে গেলেন। এর ভিত্তিতে তারাও 'আহলে বাইত'-এর সঠিক প্রয়োগস্থল। কিন্তু আগেও যেমন বিস্তারিত বলে আসা হয়েছে যে, কুরআন মজীদে এ শব্দটি নবী পত্রীদের জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাঁরাই এর প্রথম প্রয়োগক্ষেত্র।
সারকথা: এ বিষয়টি যে, নবী পত্নীগণ হুযুর (ﷺ)-এর আহলে বাইত নন; বরং এ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল তাঁর এক কন্যা, এক জামাতা ও দুই নাতী একথাটি না ভাষাগত দিক দিয়ে সঠিক, না কুরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত; বরং একটি বিশেষ ফেরকার চালাকির ফলে এ ভুলটি উম্মতের মধ্যে ব্যাপক রূপ ধারণ করে নিয়েছে এবং আমাদের সাদা মনের কারণে অন্যান্য অনেক ভুলের ন্যায় এটাও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে ফেলেছে। তাই আহলে বাইত শব্দ শুনে আমাদের লেখাপড়া জানা অনেক মন মস্তিষ্কও নবী-পত্রীদের প্রতি যায় না- যা কুরআন মাজীদের দৃষ্টিতে এ শব্দের প্রথম প্রয়োগ স্থল।
এবার এ অধম 'আহলে বাইত' শব্দের সঠিক অর্থটি উম্মতের মধ্যে প্রচলন দেওয়ার নিয়্যতে 'আহলে বাইত নববী' শিরোনামের অধীনেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পত্রীগণ ও সন্তানদের উভয়ের মর্যাদা ও ফযীলত লিখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। وَاللَّهُ الْمُوَفِّقُ وَهُوَ الْمُسْتَعَانُ
আযওয়াজে মুতাহহারাত তথা নবী পত্রীদের আলোচনা
হাদীস ও শরী‘আতের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আযওয়াজে মুতাহহারাত যারা বিবাহিতা স্ত্রী হিসাবে হুযূর (ﷺ)-এর সাথে অল্প বিস্তর সময় রয়েছেন, তাঁরা মোট এগারজন। তাদের নাম এই: (১) হযরত খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ, (২) হযরত সাওদা বিনতে যামআ, (৩) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা, (৪) হযরত হাফসা বিনতে উমর ইবনুল খাত্তাব, (৫) হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা, (৬) হযরত উম্মে সালামা, (৭) হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ, (৮) হযরত উম্মে হাবীবা, (৯) হযরত জুওয়াইরিয়া বিনতুল হারেস, (১০) হযরত সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই ইবনে আখতাব, (১১) হযরত মায়মুনা রাযি.। তাঁদের মধ্যে হযরত খাদীজা ও হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা হুযুর (ﷺ)-এর জীবদ্দশাতেই ইন্তিকাল করে গিয়েছেন। এ এগারজন ছাড়া বনু কুরায়যার রায়হানা বিনতে শামাউন সম্পর্কেও কোন কোন রেওয়ায়াত দ্বারা জানা যায় যে, যখন হুযুর (ﷺ) বনু কুরায়যার ইয়াহুদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন এবং তাদের অবশিষ্টদেরকে গ্রেফতার করলেন, তখন তাদের মধ্যে এ রায়হানাও ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করে নিলে হুযুর (ﷺ) তাকে মুক্ত করে দিয়ে নিজের বিবাহে নিয়ে নিলেন। কিন্তু অপর কোন কোন রেওয়ায়াত দ্বারা জানা যায় যে, তিনি হুযুর (ﷺ)-এর বিবাহিতা স্ত্রীর মর্যাদা লাভের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি; বরং দাসী হিসাবে হুযুর (ﷺ)-এর সাথে ছিলেন। পরিশেষে হুযূর (ﷺ)-এর ওফাতের কয়েকদিন পূর্বে এবং এক বর্ণনা অনুযায়ী বিদায় হজ্ব থেকে প্রত্যাবর্তনের পর হুযুর (ﷺ)-এর জীবদ্দশায়ই তিনি ওফাত পান।
স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য ও মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য নিঃসন্দেহে একটি উঁচু স্তরের মর্যাদা এবং আল্লাহ্ তা'আলার এক বিরাট নেয়ামত। স্তরের পার্থক্য সত্ত্বেও এ মর্যাদা সকল আযওয়াজে মুতাহহারাতের সমানভাবে অর্জিত রয়েছে। তেমনিভাবে তাদেরকে যে বিশেষ বিধানাবলী আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, এসব বিধানও তাদের সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কুরআন মজীদে وازواجه امهاتهم বলে তাদেরকে সকল ঈমানদারের মা বলা হয়েছে। এর ভিত্তিতেই হুযুর (ﷺ)-এর ওফাতের পর তাঁর কোন উম্মত ও ঈমানদারের জন্য তাদের মধ্য থেকে কাউকে বিয়ে করা তেমনিভাবে হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে, যেমনভাবে নিজের মাকে বিয়ে করা হারাম।
এ পর্যন্ত কেবল আযওয়াজে মুতাহহারাতের নাম লিখা হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রী হওয়ার মর্যাদা সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সামনে ইনশাআল্লাহ এসব 'উম্মাহাতুল মু'মিনীনের' প্রয়োজনীয় পরিচিতি, উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিবাহে আসার বিবরণ ও এর বিশেষ কারণসমূহ পাঠকগণ দেখতে পাবেন। তাছাড়া তাদের মৃত্যুর আলোচনাও সেখানে থাকবে। এর দ্বারা ইনশাআল্লাহ্ ঐসব প্রশ্ন ও সন্দেহের উত্তরও হয়ে যাবে, যা আযওয়াজে মুতাহহারাতের সংখ্যার ব্যাপারে মানুষরূপী শয়তানদের ওয়াসওয়াসার কারণে অন্তরে সৃষ্টি হয়।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.
ইনি হচ্ছেন সর্বপ্রথম ভাগ্যবতী নারী, যিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রী হওয়ার মর্যাদায় ভূষিত হন। তার পিতা খুওয়াইলিদ মক্কার আসাদ গোত্রের একজন ধনী ও সম্মানিত ব্যবসায়ী ছিলেন। হযরত খাদীজার প্রথম বিয়ে আবু হালা তামীমীর সাথে হয়েছিল এবং তাদের দু'জন সন্তান (হালা ও হিন্দ) জন্ম গ্রহণ করেছিল। কিছুদিন পর আবু হালার ইন্তিকাল হয়ে গেল এবং দ্বিতীয় বিয়ে আতীক ইবনে আবেদ মাখযুমীর সাথে অনুষ্ঠিত হল। এ দিক থেকেও তাদের এক কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করল। কিন্তু আতীকও বেশী দিন বেঁচে থাকলেন না। তারপর যখন খাদীজার বয়স ৩৫/৩৬ বছর হয়ে গেল, তখন তার পিতা খুওয়াইলিদেরও ইন্তিকাল হয়ে গেল। এখন ব্যবসায়িক কাজ কারবারের দায়িত্ব নিজের উপরই এসে পড়ল। মক্কায় প্রচলন ছিল যে, লাভের নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করে দিয়ে অন্যের দ্বারাও ব্যবসা পরিচালনা করা হত। (যাকে ফেকাহর পরিভাষায় মুযারাবা বলা হয়।) নিজের পিতা ও স্বামীর মৃত্যুর পর হযরত খাদীজা এ পদ্ধতিই অবলম্বন করলেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্মল চরিত্র, বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা ও সততার কথা মক্কাবাসীর নিকট সুবিদিত ছিল। এমনকি তিনি 'আল আমীন' উপাধিতে পরিচিত ছিলেন। এ কারণেই হযরত খাদীজা একবার চাইলেন যে, হুযুর (ﷺ) তার ব্যবসায়িক পণ্য সামগ্রী নিয়ে সিরিয়ায় যান এবং এ প্রস্তাবও দিলেন যে, লাভের যতটুকু অংশ অন্যদেরকে এ পর্যন্ত দিয়ে এসেছি, আপনাকে এর দ্বিগুণ দিব। হুযূর (ﷺ) নিজের চাচা আবু তালেবের সাথে পরামর্শ করার পর এ প্রস্তাব গ্রহণ করে নিলেন। হযরত খাদীজা স্বীয় গোলাম মায়সারাকেও তাঁর সাথে দিয়ে দিলেন। এ বাণিজ্যিক সফরে আল্লাহ্ তা'আলা প্রচুর বরকত দান করলেন এবং আগে যে লাভ হত, এ সফরে দ্বিগুণ মুনাফা হল। তাছাড়া হযরত খাদীজার গোলাম মায়সারা হুযূর (ﷺ)-এর উত্তম চরিত্র, নির্মল জীবনধারা এবং কিছু অসাধারণ ও কারামত জাতীয় বিষয়ও প্রত্যক্ষ করলেন। সফর থেকে ফিরে আসার পর মায়সারা খাদীজার সাথেও সেগুলোর আলোচনা করেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে বিবাহ
হযরত খাদীজা একজন প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক ও অভিজাত মহিলা হওয়া ছাড়া বাহ্যিক রূপ, সৌন্দর্য, আভ্যন্তরীণ গুণাবলী, মহান কীর্তি, দানশীলতা ও সাধুতা ইত্যাদি প্রশংসনীয় গুণাবলীতেও অনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন। এ জন্যই তিনি 'তাহেরা' উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। এ কারণে মক্কার কুরাইশদের অনেক সম্ভ্রান্ত লোকদের পক্ষ থেকে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি দু'জন স্বামীর বিয়োগের কারণে বাকী জীবন এভাবেই কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করেছিলেন। এ জন্য কারো প্রস্তাব গ্রহণ করলেন না। কিন্তু মায়সারা ব্যবসায়িক সফর থেকে ফিরে আসার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতা ও চাক্ষুষ ঘটনাবলী যখন বর্ণনা করলেন, তখন স্বয়ং তাঁর অন্তরে হুযুর (ﷺ)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আকাঙ্খা জাগ্রত হল। এ উদ্দেশ্যে তিনি নফীসা নামী এক মহিলাকে তথ্য সংগ্রহের জন্য গোপনে পাঠালেন। নফীসা বলেন যে, আমি হুযুর (ﷺ)-এর নিকট গেলাম এবং বললাম, আপনি বিয়ে করেন না কেন? তিনি উত্তর দিলেন, আমি নিঃস্ব ও খালিহাত। আমি কিভাবে বিয়ে করতে পারি? আমি বললাম, যদি এমন কোন মহিলা আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আকাঙ্খী হয়, যিনি বাহ্যিক রূপ-সৌন্দর্য ও আভিজাত্য ছাড়া প্রচুর সম্পদেরও মালিক এবং আপনার প্রয়োজন পূরণে আন্তরিকভাবে আগ্রহী হয়, তাহলে আপনি কি তাকে বিয়ে করে নেওয়া পছন্দ করবেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কোন্ বান্দী পছন্দ করবেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কোন্ বান্দী এমন হতে পারে? আমি বললাম, খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ। হুযুর (ﷺ) এ প্রস্তাবের কথা চাচা আবু তালেবের নিকট পেশ করলে তিনি অত্যন্ত খুশী প্রকাশ করলেন। এরপর হুযুর (ﷺ) নফীসাকে উত্তর দিয়ে দিলেন যে, খাদীজা যদি এর জন্য আগ্রহী হয়, তাহলে আমিও রাজী আছি।
নফীসা এসে হযরত খাদীজাকে এ ব্যাপারে অবগতি দান করলেন। তারপর খাদীজা নফীসার মাধ্যমেই হুযুর (ﷺ)কে ডেকে এনে সরাসরি তাঁর সাথে কথা বললেন। এ কথাবার্তার মধ্যেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেল অমুক দিন আমার এখানে এসে যাবেন। কথামত হুযুর (ﷺ) আপন চাচা আবু তালেব ও পরিবারের অন্যান্য মুরুব্বীদেরকে নিয়ে যাদের মধ্যে হযরত হামযা রাযি.ও ছিলেন-হযরত খাদীজার বাড়ীতে পৌছে গেলেন। খাদীজাও আপন চাচা আমর ইবনে আসাদকে ডেকে নিয়ে আসলেন এবং তখনকার কুরাইশদের প্রথা অনুযায়ী তাকেই ওলী ও অভিভাবক নির্ধারণ করে বিয়ে হয়ে গেল। এ সময় হুযুর (ﷺ) এর বয়স পঁচিশ বছর ছিল এবং খাদীজার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। এটা ছিল হুযুর (ﷺ)-এর প্রথম বিয়ে, যা নবুওয়াত লাভের প্রায় পনের বছর পূর্বে হয়েছিল।
সন্তানাদি
এ দাম্পত্য সম্পর্কের কিছুদিন পর (এক ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী ৫ বছর পর) হুযুর (ﷺ)-এর প্রথম পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন- যার নাম 'কাসেম' রাখা হয়। তারই নাম হুযুর (ﷺ) নিজের 'কুনিয়াত' উপনাম আবুল কাসেম রাখেন। শিশুকালেই তার ইন্তিকাল হয়ে যায়। তারপর হুযুর (ﷺ)-এর সর্বজ্যৈষ্ঠ কন্যা হযরত যয়নব জন্মগ্রহণ করেন। এ দু'জনের জন্ম নবুওয়াতের সূচনার পূর্বেই হয়। তারপর এক পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন-যার নাম আব্দুল্লাহ রাখা হয়। তার জন্ম নবুওয়াত যুগে হয়। এ জন্যই তাকে তৈয়্যেব ও তাহের উপনামেও স্মরণ করা হয়। তারও ইন্তিকাল শিশুকালেই হয়ে যায়। তাদের পরে ধারাবাহিকভাবে তিন কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন। যাদের নাম রুকাইয়্যা, উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা রাখা হয়। চার কন্যারই আলোচনা সামনে 'সন্তানাদি' শিরোনামে পাঠকদের সামনে পেশ করা হবে ইনশাআল্লাহ।
হযরত খাদীজার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
এ কথা সুবিদিত যে, কুরাইশ গোত্র; বরং সাধারণভাবে মক্কার অধিবাসীরা মূর্তিপূজার শিরকে লিপ্ত ছিল এবং এ শিরক তাদের নিকট এত প্রিয় ছিল যে, এর বিরুদ্ধে একটি কথা শোনাও তাদের নিকট অসহনীয় বিষয় ছিল। কিন্তু জাহিলিয়্যাতের এ যুগেও হাতে গোনা দু'চারজন এমন লোকও ছিলেন, যাদের নিকট প্রকৃতিগত ভাবেই মূর্তিপূজা অত্যন্ত ঘৃণিত ছিল। তাদের মধ্যে হযরত খাদীজাও একজন ছিলেন। ঐ যুগের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, তিনিই একমাত্র মহিলা ছিলেন, যিনি শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে বেজার ছিলেন।
আল্লাহ্ তা'আলা হযরত খাদীজাকে অন্যান্য নেয়ামতসমূহ ছাড়া আর্থিক প্রাচুর্যও দান করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অবস্থা এর বিপরীত ছিল। তাই হযরত খাদীজা নিজের সম্পূর্ণ সম্পদ যেন হুযুর (ﷺ)-এর পদতলে লুটিয়ে দিলেন এবং হুযুর (ﷺ)কে এ জাতীয় চিন্তা থেকে মুক্ত করে দিলেন। কুরআন মাজীদের সূরা 'যোহা'তে এ অবস্থা সম্পর্কেই বলা হয়েছে। وَوَجَدَکَ عَآئِلًا فَاَغۡنٰی হে নবী। আপনাকে আপনার পরওয়ারদেগার দরিদ্র ও নিঃস্ব পেয়েছন, তারপর অমুখাপেক্ষী বানিয়ে দিলেন। এখানে এ ঘটনাটিও উল্লেখ করার মত যে, হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা খাদীজা রাযি.-এর কেনা গোলাম ছিলেন। তিনি দেখলেন যে, যায়েদের মাঝে হুযুর (ﷺ)-এর প্রতি বিশেষ ভালবাসা ও আন্তরিক টান রয়েছে এবং হুযুর (ﷺ)ও তাঁর প্রতি ভালবাসার আচরণ করেন। তাই খাদীজা রাযি. যায়েদকে হুযুর (ﷺ)-এর মালিকানায় দিয়ে দিলেন। এরপর তিনি তাকে মুক্ত করে দিলেন এবং আরবদের তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী তাকে নিজের 'পালকপুত্র' বানিয়ে নিলেন। এমনকি তাকে যায়েদ ইবনে হারেসার স্থলে যায়েদ ইবনে মুহাম্মদই বলা হতে লাগল।
তারপর বিয়ের পনের বছর পর আল্লাহ্ তা'আলা হুযুর (ﷺ)কে নবুওয়াতের মর্যাদায় ভূষিত করলেন এবং তাঁর উপর ঐ কঠিন অবস্থা আসল, যেগুলোর আলোচনা নবুওয়াতের সূচনা সংক্রান্ত হাদীসে কিতাবুল মানাকেবের শুরুতেই করে আসা হয়েছে- ঐসময় তাঁর যে ধরনের প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সহানুভূতিমাখা সান্ত্বনার প্রয়োজন ছিল, সেটা আল্লাহ্ তা'আলার বিশেষ তাওফীকে হযরত খাদীজার দ্বারাই সম্ভব হয়েছিল। হযরত খাদীজা যখন হুযুর (ﷺ)কে আপন চাচাতো ভাই ওরাকা ইবনে নওফেলের নিকট নিয়ে গেলেন- যিনি মক্কার পূর্ণ জনবসতিতে তাওহীদবাদী, সঠিক আকীদার অধিকারী খ্রিস্টান এবং তাওরাত ও ইনজিলের অভিজ্ঞ আলেম ছিলেন এবং তিনি হুযুর (ﷺ)-এর মুখে হেরাগুহার ঘটনা ও ইতিবৃত্ত শুনে পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে হুযুর (ﷺ)-এর আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী হওয়ার কথা বললেন, তখন খাদীজাও তার এ কথা অন্তর থেকে কবুল করে নিলেন; বরং এ কথা বলা সঠিক হবে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পনের বছরের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পূর্ব থেকেই তাঁর অন্তর হুযুর (ﷺ)-এর প্রতিটি কথা বিশ্বাস করতে ও তা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল। এ হিসাবে বলা যায় যে, সারা উম্মতের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াতে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন।
তারপর যখন হুযুর (ﷺ) আল্লাহর হুকুমে তাওহীদ ও দ্বীনে হকের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন, তখন গোটা সম্প্রদায় তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সম্ভাব্য সকল পন্থায় তাঁকে উৎপীড়ন করা বছরের পর বছর এ হতভাগাদের প্রিয় নেশা হয়ে রইল। উৎপীড়নের এ পুরা সময়ে হযরত খাদীজা কেবল হুযুর (ﷺ)-এর দুঃখে সহানুভূতিশীল ছিলেন না; বরং সম্পূর্ণরূপে তাঁর সুখে দুঃখে শরীক ছিলেন। এমনকি যখন এ যালেমরা মক্কার প্রায় সব লোকদেরকে সাথে নিয়ে হুযুর (ﷺ) এবং তাঁর পরিবার বনী হাশেমের ঐসব লোকদের বিরুদ্ধেও অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি, কিন্তু আত্মীয়তার সম্পর্ক অথবা বংশ সম্পর্কের কারণে তাঁর সাহায্য করত। ফলে তাঁর নিকটাত্মীয়রাও শিআবে আবু তালেবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল। তারা এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল যে, পানাহার সামগ্রী পর্যন্ত তাদের নিকট পৌছানো যেত না, ফলে গাছের পাতা খেয়ে কখনো কখনো তাদের জীবন চালাতে হত। এ অবস্থায়ও হযরত খাদীজা শিআবে আবু তালেবে হুযুর (ﷺ)-এর সাথেই থাকেন। অথচ তিনি ইচ্ছা করলে এ দিনগুলোতে নিজের বাড়িতেই থাকতে পারতেন।
হযরত খাদীজার ব্যাপারে এ কথাটিও উল্লেখ করার মত যে, তিনি পুরা পঁচিশটি বছর হুযুর (ﷺ)-এর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে হুযুর (ﷺ)-এর সাথে ছিলেন। এ পুরা সময়কালে হুযুর (ﷺ) দ্বিতীয় কোন বিয়ে করেননি। নবুওয়াতের দশম সালে হিজরতের প্রায় তিন বছর পূর্বে ১লা রমযান ১১ হিজরীতে ৬৫ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।
এ সময় পর্যন্ত পাঞ্জেগানা নামাযও ফরয হয়নি এবং জানাযা নামাযের বিধানও আসেনি। এ জন্য তাঁর জানাযার নামায পড়া হয়নি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বয়ং নিজের মুবারক হাতে তাঁকে কবরে নামান এবং আল্লাহর রহমতের হাতে সোপর্দ করে দেন।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
২১৯. হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন জিবরাঈল (আ.) নবী করীম (ﷺ)-এর নিকট আসলেন এবং বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! খাদীজা আসছেন, আর তাঁর সাথে রয়েছে একটি পাত্র এবং পাত্রে রয়েছে তরকারী ও অন্য কিছু খাদ্য সামগ্রী। তিনি যখন আপনার নিকট আসবেন, তখন তাঁকে তাঁর রবের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম বলবেন। আর তাঁকে জান্নাতে এমন একটি মুক্তাখচিত ঘরের সুসংবাদ দিবেন, যাতে কোন শোরগোল ও ক্লান্তি-কষ্ট নেই। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: " أَتَى جِبْرِيلُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ: هَذِهِ خَدِيجَةُ قَدْ أَتَتْ مَعَهَا إِنَاءٌ فِيهِ إِدَامٌ، وَطَعَامٌ، فَإِذَا أَتَتْكَ فَاقْرَأْ عَلَيْهَا السَّلاَمَ مِنْ رَبِّهَا وَمِنِّي وَبَشِّرْهَا بِبَيْتٍ فِي الجَنَّةِ مِنْ قَصَبٍ لاَ صَخَبَ فِيهِ، وَلاَ نَصَبَ " (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ২২০
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ নবী করীম (ﷺ)-এর আহলে বাইত তথা পুণ্যবতী স্ত্রী ও সন্তানদের ফযীলত ও মর্যাদা
উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
২২০. হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে বলতে শুনেছি (তৎকালীন দুনিয়ার) সমস্ত নারীদের সর্বোত্তম ছিলেন মরিয়ম বিনতে ইমরান, আর (বর্তমান দুনিয়ার নারীদের মধ্যে) সবার চেয়ে উত্তম হলেন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عَلِيِّ (رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ) قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: «خَيْرُ نِسَائِهَا مَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَخَيْرُ نِسَائِهَا خَدِيجَةُ بِنْتُ خُوَيْلِدٍ» (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ২২১
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ নবী করীম (ﷺ)-এর আহলে বাইত তথা পুণ্যবতী স্ত্রী ও সন্তানদের ফযীলত ও মর্যাদা
উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
২২১. হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে হযরত খাদীজার প্রতি আমার যতটুকু ঈর্ষা হত, ততটুকু অন্য কোন স্ত্রীর প্রতি হত না। অথচ আমি তাকে দেখিওনি। তিনি তাঁর কথা খুব আলোচনা করতেন। এমনও হত যে, তিনি একটি বকরী যবেহ করে এর বিভিন্ন অংশ টুকরা টুকরা করতেন। তারপর এগুলো খাদীজার বান্ধবীদের বাড়ীতে পাঠাতেন। তাই আমি কোন সময় বলে ফেলতাম, দুনিয়ায় মনে হয় খাদীজা ছাড়া আর কোন স্ত্রী লোকই নাই। তিনি উত্তরে বলতেন, সে এরূপই ছিল, সে এরূপই ছিল। আর তার পক্ষ থেকে আমার সন্তানাদি হয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: مَا غِرْتُ عَلَى أَحَدٍ مِنْ نِسَاءِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مَا غِرْتُ عَلَى خَدِيجَةَ، وَمَا رَأَيْتُهَا، وَلَكِنْ كَانَ يُكْثِرُ ذِكْرَهَا، وَرُبَّمَا ذَبَحَ الشَّاةَ ثُمَّ يُقَطِّعُهَا أَعْضَاءً، ثُمَّ يَبْعَثُهَا فِي صَدَائِقِ خَدِيجَةَ، فَرُبَّمَا قُلْتُ لَهُ: كَأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ فِي الدُّنْيَا امْرَأَةٌ إِلَّا خَدِيجَةُ، فَيَقُولُ «إِنَّهَا كَانَتْ، وَكَانَتْ، وَكَانَ لِي مِنْهَا وَلَدٌ» (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ২২২
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.
তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াত লাভের চতুর্থ বর্ষে জন্ম গ্রহণ করেন। এ কথা সবারই জানা যে, তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর কন্যা-যিনি সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মাতা হযরত উম্মে রুমানও সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণকারী মহিলাদের মধ্যে একজন ছিলেন। আযওয়াজে মুতাহহারাতের মধ্যে এ মর্যাদা এককভাবে তাঁরই অর্জিত ছিল যে, তাঁর পিতা মাতা উভয়ই তাঁর জন্মের পূর্বেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঈমানের দাওয়াত কবুল করে নিয়েছিলেন। একটু পরেই সম্মানিত পাঠকবৃন্দ জানতে পারবেন যে, স্বপ্নে একাধিকবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে হযরত আয়েশার আকৃতি দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ইনি দুনিয়া ও আখেরাতে আপনার স্ত্রী হবেন। একটু আগে উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাওদা রাযি. এর অবস্থার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর ওফাত হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে বিশেষ ঈমানী সম্পর্কধারী মহিলা খাওলা বিনতে হাকীম তাঁর সাথে বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা করলেন। সেখানে এ প্রসঙ্গে কেবল ঐ অংশটুকুর উল্লেখ করা হয়েছে- যার সম্পর্ক হযরত সাওদার সাথে ছিল। ঐ ক্ষেত্রেই তিনি হযরত আয়েশার ব্যাপারেও নিবেদন করেছিলেন- যার বয়স তখন কেবলমাত্র ৬/৭ বছরের কাছাকাছি ছিল। আর একথা জানা যে, হুযুর (ﷺ)-এর বয়স তখন ৫০ অতিক্রম করে গিয়েছিল। ঐ অবস্থায় খাওলা বিনতে হাকীমের পক্ষ থেকে হযরত আয়েশার সাথে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করার কোন ব্যাখ্যা এ ছাড়া হতে পারে না যে, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে যে ফায়সালা অদৃশ্য জগতে হয়েছিল, এটা কার্যকর করারও মাধ্যম খাওলা বিনতে হাকীমের এ প্রস্তাবকে করা হবে। রেওয়ায়েতের শব্দমালা দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, হুযুর (ﷺ)-এর স্বপ্নের ব্যাপারে খাওলার কোনকিছুই জানা ছিল না। আর বাস্তবতাও এই যে, এ জাতীয় স্বপ্নের কথা কারো কাছে উল্লেখ করা হয় না। যাহোক, এটাই হল যে, খাওলা হুযূর (ﷺ)-এর সামনে হযরত সাওদা বিনতে যামআর সাথে হযরত আয়েশার বিয়েরও প্রস্তাব রাখলেন।
হুযুর (ﷺ) যেভাবে হযরত সাওদার ব্যাপারে বলেছিলেন যে, তুমিই আমার পক্ষ থেকে পয়গাম দাও, তেমনিভাবে হযরত আয়েশার ব্যাপারেও নির্দেশ দিলেন যে, তুমিই তাঁর ব্যাপারে তাঁর পিতা মাতার নিকট প্রস্তাব নিয়ে যাও। কথা অনুযায়ী হযরত খাওলা হযরত আবু বকর সিদ্দীকের বাড়ীতে গেলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে তিনি তখন বাড়ীতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী হযরত আয়েশা রাযি.-এর মা উম্মে রুমান উপস্থিত ছিলেন। হযরত খাওলা তাকে মুবারকবাদ দিয়ে তার কন্যা হযরত আয়েশার জন্য হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করলেন। একটু পরে হযরত আবু বকরও বাড়ীতে এসে গেলেন। খাওলা তাঁর সামনেও তাঁর কন্যা হযরত আয়েশার জন্য হুযূর (ﷺ)-এর বিয়ের প্রস্তাব রাখলেন। হযরত আবু বকর রাযি. বললেন : أو تصلح له وهي بنت اخيه মর্ম এই যে, আয়েশার সাথে কি হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ে হতে পারে? সে যে তাঁর ভাইয়ের কন্যা। (হযরত আবু বকর রাযি. এ কথা এর ভিত্তিতে বলেছিলেন যে, আরবদের মধ্যে যেভাবে প্রথমে পোষ্য পুত্রদের অবস্থান আপন পুত্রদের ন্যায় ছিল, তেমনিভাবে পোষ্য ভাইদের অবস্থান আপন বংশীয় ভাইদের মত হত এবং তার কন্যাকে বিয়ে করা বৈধ মনে করা হত না- যে ভাবে আপন ভাইয়ের কন্যাকে বিয়ে করা জায়েয নয়।)
খাওলা হযরত আবু বকর রাযি.-এর এ কথা হুযুর (ﷺ)-এর নিকট পৌছালে তিনি বললেন: هو أخي في الإسلام وابنته تحل لى মর্ম এই যে, আবু বকর আমার দ্বীনি ভাই, বংশীয় ভাই নয়। এ জন্য তাঁর কন্যা আয়েশাকে বিয়ে করা আমার জন্য আল্লাহর নাযিলকৃত শরী‘আত অনুযায়ী জায়েয ও বৈধ। হ্যাঁ, সে যদি আমার আপন ও বংশীয় ভাই হত, তাহলে তাঁর কন্যাকে বিয়ে করা আমার জন্য জায়েয হত না। খাওলা হযরত আবু বকরকে হুযুর (ﷺ)-এর উত্তর শুনিয়ে দিলেন। তখন স্বাভাবিক কারণেই তিনি অত্যন্ত খুশী হলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে একটি বাধা এই ছিল যে, হযরত আয়েশার বিয়ের কথাবার্তা বাল্যকালেই জুবাইর ইবনে মুতইমের সাথে হয়ে গিয়েছিল এবং এ জাতীয় কথা বার্তা এ সম্পর্কে এক প্রকার চুক্তি মনে করা হত। এজন্য তিনি নৈতিকতার খাতিরে জরুরী মনে করলেন যে, জুবাইরের পিতা মুতইমের সাথে কথা বলে নেওয়া হোক এবং তাকে এ ব্যাপারে সম্মত করে নেওয়া হোক- যাতে আমার পক্ষ থেকে চুক্তি ভঙ্গ না হয়। তাই এ ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য তিনি মুতইমের বাড়ীতে গেলেন।
এখানে এ বিষয়টি লক্ষণীয় যে, এটা নবুওয়াতের ১১তম বর্ষ ছিল- যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও ইসলামের দাওয়াতের প্রতি এবং ইসলাম গ্রহণকারী লোকদের প্রতি মক্কার কাফেরদের শত্রুতা চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল। হযরত আবু বকর মুতইমের বাড়ীতে গিয়ে নিজের কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, আমার কন্যা আয়েশার ব্যাপারে বর্তমানে তোমার মতামত কি? এ সময় মুতইমের স্ত্রী কাছেই বসা ছিল। মুতইম তার স্ত্রীকে সম্বোধন করে বলল, 'তুমি বল, তোমার মতামত কি? সে বলল, 'আমি চাইনা যে, এখন ঐ মেয়ে (হযরত আয়েশা) আমাদের বাড়ীতে আসুক। যদি সে এসে যায়, তাহলে তাঁর সাথে ইসলামের কদমও আমাদের বাড়ীতে এসে যাবে এবং আমরা এ পর্যন্ত আমাদের পূর্বপুরুষের যে ধর্মের উপর চলে এসেছি, এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে যাবে।' মুতইমের স্ত্রীর এ উত্তর শুনে হযরত আবু বকর রাযি. মুতইমকে বললেন, এবার তুমি বল, তোমার সিদ্ধান্ত কি? সে বলল, তুমি তো আমার স্ত্রীর কথা শুনেছ, আমার অভিমতও তাই। হযরত আবু বকর নিশ্চিন্তমনে সেখান থেকে ফিরে আসলেন এবং খাওলাকে বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে ডেকে নিয়ে আস। খাওলা গেলেন এবং সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তশরীফ আনলেন। আর তখনই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল।
এটা শাওয়াল মাস ছিল- যারপর প্রায় তিন বছর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অবস্থান মক্কায় ছিল। আগেই যেমন বলে আশা হয়েছে যে, এই পূর্ণ সময়কাল হযরত সাওদা বিনতে যামআই হুযুর (ﷺ)-এর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে তাঁর সাথে ছিলেন এবং তিনিই সংসারের কাজ আঞ্জাম দিতেন। নবুওয়াত লাভের প্রায় ১৩ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তিনি আল্লাহর হুকুমে মক্কা থেকে হিজরত করে গেলেন। একথা সুবিদিত যে, এ সফর রাতের বেলায় গোপনে হয়েছিল এবং হুযূর (ﷺ) কেবল আবু বকর রাযি.-কে সাথে নিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী পুত্র পরিজন মক্কাতেই থেকে যান। মদীনা শরীফ পৌঁছার পর বসবাসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করার পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. এক ব্যক্তিকে (আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইক) মক্কায় পাঠিয়ে নিজের স্ত্রী উম্মে রুমান এবং উভয় কন্যা হযরত আয়েশা ও তাঁর বড় বোন হযরত আসমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত যায়েদ ইবনে হারিসাকে মক্কায় পাঠিয়ে নিজের পরিবার হযরত সওদা বিনতে যামআ এবং উভয় কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম ও ফাতেমাকে নিয়ে আসলেন। এটা ঐ সময়ের কথা, যখন হুযুর (ﷺ) মসজিদে নববী নির্মাণের কাজ করছিলেন এবং এর সাথে নিজের জন্য ছোট ছোট হুজরা নির্মাণ করছিলেন। হযরত সাওদা মক্কা থেকে এসে এসব হুজরার একটিতে বসবাস শুরু করলেন। হযরত আয়েশা যার সাথে হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ে তিন বছর পূর্বে মক্কায় হয়ে গিয়েছিল, এখন তিনি ৯/১০ বছর বয়সে উপনীত হয়ে গেলেন। হযরত আবু বকর রাযি. তাঁর অসাধারণ যোগ্যতা ও প্রতিভা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা করে নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন যে, শিক্ষা-দীক্ষা ও চরিত্র গঠনের সর্বোত্তম মাধ্যম হচ্ছে সাহচর্য। এ জন্য তিনি নিজেই হুযুর (ﷺ)-এর কাছে নিবেদন করলেন যে, 'যদি আপনি অসমীচীন মনে না করেন, তাহলে উত্তম এটাই হবে যে, আয়েশা আপনার স্ত্রী ও জীবন সঙ্গিনী হিসাবে আপনার সাথেই থাকবে। হুযুর (ﷺ) এ প্রস্তাব অনুমোদন করলেন এবং তিনিও তাঁর সাথে তাঁর তৈরী করা এক ঘরে অবস্থান গ্রহণ করলেন। প্রবল মত অনুযায়ী এটা ১ম হিজরীর শাওয়াল মাসে হয়েছিল।
এখানে এ বিষয়টি লক্ষণীয় যে, যেহেতু শাওয়াল মাসে কখনো আরবদেশে মহামারী আকার প্লেগ দেখা দিত, এ জন্য এ মাসকে অশুভ মনে করা হত এবং এতে বিয়ে শাদী ইত্যাদি অনুষ্ঠান করা হত না। কিন্তু উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিয়ে মক্কায় শাওয়াল মাসে হয়েছিল। হিজরতের পর যখন মদীনায় এসে হুযুর (ﷺ)-এর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে বসবাস শুরু করলেন, তখন এটাও শাওয়াল মাস ছিল। এভাবে হযরত আয়েশার মুবারক বিয়ে ও স্বামীর ঘরে যাত্রা আরবদের এ অহেতুক ধারণার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দিল।
কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
আযওয়াজে মুতাহহারাতের মধ্যে তারই একমাত্র এ মর্যাদা অর্জিত রয়েছে যে, তিনি বাল্যকালে অর্থাৎ, ৯/১০ বছর বয়স থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাহচর্য, নিকট সান্নিধ্য ও শিক্ষা-দীক্ষা দ্বারা উপকৃত হতে থাকেন। এমনিভাবে আরো কিছু সৌভাগ্য তিনি এককভাবে লাভ করেছিলেন- যেগুলোর আলোচনা তিনি স্বয়ং আল্লাহর শুকরিয়ার সাথে করতেন। তিনি বলতেন আমার একারই এ সৌভাগ্য যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিবাহ বন্ধনে আমার পূর্বেই হুযুর (ﷺ)কে আমার আকৃতি দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ইনি দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে আপনার স্ত্রী হবেন। হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে আমিই একজন যে, তাঁর সাথে বিয়ে হওয়ার আগে অন্য কারো সাথে আমার রেস্তাদারী হয়নি। আমার একার উপরই আল্লাহর এ অনুগ্রহ রয়েছে যে, যখন তিনি আমার সাথে একই লেহাফের নীচে আরাম করতেন, তখন তাঁর নিকট ওহী আসত, অন্য কোন স্ত্রীর এ সৌভাগ্য লাভ হয়নি। এটাও উল্লেখযোগ্য যে, হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বেশী আদরের স্ত্রী ছিলাম। আমি ঐ পিতার কন্যা, যিনি হুযুর (ﷺ)-এর সবচেয়ে প্রিয়পাত্র ছিলেন।
হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে এ মর্যাদাও আমার ভাগ্যে জুটেছে যে, আমার পিতা ও মাতা উভয়ই মুহাজির। তাছাড়া কতিপয় মুনাফিকের ষড়যন্ত্রের ফলে যখন আমার প্রতি একটি নোংরা অপবাধ আরোপ করা হল, তখন আল্লাহ্ তা'আলা আমার নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য কুরআন পাকের আয়াত নাযিল করলেন- যেগুলো কিয়ামত পর্যন্ত ঈমানদারগণ পাঠ করবেন এবং ঐ আয়াতসমূহে নবীয়ে পাকের طيب (এর পাক বিবি طيبة (বলা হয়েছে। তাছাড়া এ প্রসঙ্গের শেষ আয়াতে اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ হয়েছে। অর্থাৎ, আমার জন্য মাগফেরাত ও সম্মানজনক রিযিকের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি কখনো কখনো নিজের এ সৌভাগ্যের কথাও উল্লেখ করতেন যে, হুযূর (ﷺ) জীবনের শেষ পূর্ণ সপ্তাহটি আমার ঘরে অবস্থান করেছেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন যে, জীবনের শেষ দিনটি আমার এখানে থাকার দিন ছিল এবং আল্লাহ্ তা'আলার সবিশেষ অনুগ্রহ আমার উপর এই ছিল যে, এই শেষ দিন আমার মুখের লালা হুযুর (ﷺ)-এর মুখের লালার সাথে তাঁর পেটে গিয়েছিল এবং জীবনের শেষ মুহূর্তে আমিই তাঁকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বসা ছিলাম। আর যে সময় আল্লাহর হুকুমে দেহ থেকে রূহ বিচ্ছিন্ন হয়, ঐ সময় তাঁর কাছে আমিই ছিলাম অথবা মৃত্যুর ফিরিশতা। শেষ কথা এই যে, আমার হুজরাটিই কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর বিশ্রামস্থল হয়েছে। অর্থাৎ, এখানেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াত লাভের চতুর্থ বর্ষে জন্ম গ্রহণ করেন। এ কথা সবারই জানা যে, তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর কন্যা-যিনি সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মাতা হযরত উম্মে রুমানও সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণকারী মহিলাদের মধ্যে একজন ছিলেন। আযওয়াজে মুতাহহারাতের মধ্যে এ মর্যাদা এককভাবে তাঁরই অর্জিত ছিল যে, তাঁর পিতা মাতা উভয়ই তাঁর জন্মের পূর্বেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঈমানের দাওয়াত কবুল করে নিয়েছিলেন। একটু পরেই সম্মানিত পাঠকবৃন্দ জানতে পারবেন যে, স্বপ্নে একাধিকবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে হযরত আয়েশার আকৃতি দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ইনি দুনিয়া ও আখেরাতে আপনার স্ত্রী হবেন। একটু আগে উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাওদা রাযি. এর অবস্থার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর ওফাত হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে বিশেষ ঈমানী সম্পর্কধারী মহিলা খাওলা বিনতে হাকীম তাঁর সাথে বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা করলেন। সেখানে এ প্রসঙ্গে কেবল ঐ অংশটুকুর উল্লেখ করা হয়েছে- যার সম্পর্ক হযরত সাওদার সাথে ছিল। ঐ ক্ষেত্রেই তিনি হযরত আয়েশার ব্যাপারেও নিবেদন করেছিলেন- যার বয়স তখন কেবলমাত্র ৬/৭ বছরের কাছাকাছি ছিল। আর একথা জানা যে, হুযুর (ﷺ)-এর বয়স তখন ৫০ অতিক্রম করে গিয়েছিল। ঐ অবস্থায় খাওলা বিনতে হাকীমের পক্ষ থেকে হযরত আয়েশার সাথে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করার কোন ব্যাখ্যা এ ছাড়া হতে পারে না যে, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে যে ফায়সালা অদৃশ্য জগতে হয়েছিল, এটা কার্যকর করারও মাধ্যম খাওলা বিনতে হাকীমের এ প্রস্তাবকে করা হবে। রেওয়ায়েতের শব্দমালা দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, হুযুর (ﷺ)-এর স্বপ্নের ব্যাপারে খাওলার কোনকিছুই জানা ছিল না। আর বাস্তবতাও এই যে, এ জাতীয় স্বপ্নের কথা কারো কাছে উল্লেখ করা হয় না। যাহোক, এটাই হল যে, খাওলা হুযূর (ﷺ)-এর সামনে হযরত সাওদা বিনতে যামআর সাথে হযরত আয়েশার বিয়েরও প্রস্তাব রাখলেন।
হুযুর (ﷺ) যেভাবে হযরত সাওদার ব্যাপারে বলেছিলেন যে, তুমিই আমার পক্ষ থেকে পয়গাম দাও, তেমনিভাবে হযরত আয়েশার ব্যাপারেও নির্দেশ দিলেন যে, তুমিই তাঁর ব্যাপারে তাঁর পিতা মাতার নিকট প্রস্তাব নিয়ে যাও। কথা অনুযায়ী হযরত খাওলা হযরত আবু বকর সিদ্দীকের বাড়ীতে গেলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে তিনি তখন বাড়ীতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী হযরত আয়েশা রাযি.-এর মা উম্মে রুমান উপস্থিত ছিলেন। হযরত খাওলা তাকে মুবারকবাদ দিয়ে তার কন্যা হযরত আয়েশার জন্য হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করলেন। একটু পরে হযরত আবু বকরও বাড়ীতে এসে গেলেন। খাওলা তাঁর সামনেও তাঁর কন্যা হযরত আয়েশার জন্য হুযূর (ﷺ)-এর বিয়ের প্রস্তাব রাখলেন। হযরত আবু বকর রাযি. বললেন : أو تصلح له وهي بنت اخيه মর্ম এই যে, আয়েশার সাথে কি হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ে হতে পারে? সে যে তাঁর ভাইয়ের কন্যা। (হযরত আবু বকর রাযি. এ কথা এর ভিত্তিতে বলেছিলেন যে, আরবদের মধ্যে যেভাবে প্রথমে পোষ্য পুত্রদের অবস্থান আপন পুত্রদের ন্যায় ছিল, তেমনিভাবে পোষ্য ভাইদের অবস্থান আপন বংশীয় ভাইদের মত হত এবং তার কন্যাকে বিয়ে করা বৈধ মনে করা হত না- যে ভাবে আপন ভাইয়ের কন্যাকে বিয়ে করা জায়েয নয়।)
খাওলা হযরত আবু বকর রাযি.-এর এ কথা হুযুর (ﷺ)-এর নিকট পৌছালে তিনি বললেন: هو أخي في الإسلام وابنته تحل لى মর্ম এই যে, আবু বকর আমার দ্বীনি ভাই, বংশীয় ভাই নয়। এ জন্য তাঁর কন্যা আয়েশাকে বিয়ে করা আমার জন্য আল্লাহর নাযিলকৃত শরী‘আত অনুযায়ী জায়েয ও বৈধ। হ্যাঁ, সে যদি আমার আপন ও বংশীয় ভাই হত, তাহলে তাঁর কন্যাকে বিয়ে করা আমার জন্য জায়েয হত না। খাওলা হযরত আবু বকরকে হুযুর (ﷺ)-এর উত্তর শুনিয়ে দিলেন। তখন স্বাভাবিক কারণেই তিনি অত্যন্ত খুশী হলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে একটি বাধা এই ছিল যে, হযরত আয়েশার বিয়ের কথাবার্তা বাল্যকালেই জুবাইর ইবনে মুতইমের সাথে হয়ে গিয়েছিল এবং এ জাতীয় কথা বার্তা এ সম্পর্কে এক প্রকার চুক্তি মনে করা হত। এজন্য তিনি নৈতিকতার খাতিরে জরুরী মনে করলেন যে, জুবাইরের পিতা মুতইমের সাথে কথা বলে নেওয়া হোক এবং তাকে এ ব্যাপারে সম্মত করে নেওয়া হোক- যাতে আমার পক্ষ থেকে চুক্তি ভঙ্গ না হয়। তাই এ ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য তিনি মুতইমের বাড়ীতে গেলেন।
এখানে এ বিষয়টি লক্ষণীয় যে, এটা নবুওয়াতের ১১তম বর্ষ ছিল- যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও ইসলামের দাওয়াতের প্রতি এবং ইসলাম গ্রহণকারী লোকদের প্রতি মক্কার কাফেরদের শত্রুতা চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল। হযরত আবু বকর মুতইমের বাড়ীতে গিয়ে নিজের কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, আমার কন্যা আয়েশার ব্যাপারে বর্তমানে তোমার মতামত কি? এ সময় মুতইমের স্ত্রী কাছেই বসা ছিল। মুতইম তার স্ত্রীকে সম্বোধন করে বলল, 'তুমি বল, তোমার মতামত কি? সে বলল, 'আমি চাইনা যে, এখন ঐ মেয়ে (হযরত আয়েশা) আমাদের বাড়ীতে আসুক। যদি সে এসে যায়, তাহলে তাঁর সাথে ইসলামের কদমও আমাদের বাড়ীতে এসে যাবে এবং আমরা এ পর্যন্ত আমাদের পূর্বপুরুষের যে ধর্মের উপর চলে এসেছি, এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে যাবে।' মুতইমের স্ত্রীর এ উত্তর শুনে হযরত আবু বকর রাযি. মুতইমকে বললেন, এবার তুমি বল, তোমার সিদ্ধান্ত কি? সে বলল, তুমি তো আমার স্ত্রীর কথা শুনেছ, আমার অভিমতও তাই। হযরত আবু বকর নিশ্চিন্তমনে সেখান থেকে ফিরে আসলেন এবং খাওলাকে বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে ডেকে নিয়ে আস। খাওলা গেলেন এবং সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তশরীফ আনলেন। আর তখনই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল।
এটা শাওয়াল মাস ছিল- যারপর প্রায় তিন বছর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অবস্থান মক্কায় ছিল। আগেই যেমন বলে আশা হয়েছে যে, এই পূর্ণ সময়কাল হযরত সাওদা বিনতে যামআই হুযুর (ﷺ)-এর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে তাঁর সাথে ছিলেন এবং তিনিই সংসারের কাজ আঞ্জাম দিতেন। নবুওয়াত লাভের প্রায় ১৩ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তিনি আল্লাহর হুকুমে মক্কা থেকে হিজরত করে গেলেন। একথা সুবিদিত যে, এ সফর রাতের বেলায় গোপনে হয়েছিল এবং হুযূর (ﷺ) কেবল আবু বকর রাযি.-কে সাথে নিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী পুত্র পরিজন মক্কাতেই থেকে যান। মদীনা শরীফ পৌঁছার পর বসবাসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করার পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. এক ব্যক্তিকে (আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইক) মক্কায় পাঠিয়ে নিজের স্ত্রী উম্মে রুমান এবং উভয় কন্যা হযরত আয়েশা ও তাঁর বড় বোন হযরত আসমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত যায়েদ ইবনে হারিসাকে মক্কায় পাঠিয়ে নিজের পরিবার হযরত সওদা বিনতে যামআ এবং উভয় কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম ও ফাতেমাকে নিয়ে আসলেন। এটা ঐ সময়ের কথা, যখন হুযুর (ﷺ) মসজিদে নববী নির্মাণের কাজ করছিলেন এবং এর সাথে নিজের জন্য ছোট ছোট হুজরা নির্মাণ করছিলেন। হযরত সাওদা মক্কা থেকে এসে এসব হুজরার একটিতে বসবাস শুরু করলেন। হযরত আয়েশা যার সাথে হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ে তিন বছর পূর্বে মক্কায় হয়ে গিয়েছিল, এখন তিনি ৯/১০ বছর বয়সে উপনীত হয়ে গেলেন। হযরত আবু বকর রাযি. তাঁর অসাধারণ যোগ্যতা ও প্রতিভা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা করে নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন যে, শিক্ষা-দীক্ষা ও চরিত্র গঠনের সর্বোত্তম মাধ্যম হচ্ছে সাহচর্য। এ জন্য তিনি নিজেই হুযুর (ﷺ)-এর কাছে নিবেদন করলেন যে, 'যদি আপনি অসমীচীন মনে না করেন, তাহলে উত্তম এটাই হবে যে, আয়েশা আপনার স্ত্রী ও জীবন সঙ্গিনী হিসাবে আপনার সাথেই থাকবে। হুযুর (ﷺ) এ প্রস্তাব অনুমোদন করলেন এবং তিনিও তাঁর সাথে তাঁর তৈরী করা এক ঘরে অবস্থান গ্রহণ করলেন। প্রবল মত অনুযায়ী এটা ১ম হিজরীর শাওয়াল মাসে হয়েছিল।
এখানে এ বিষয়টি লক্ষণীয় যে, যেহেতু শাওয়াল মাসে কখনো আরবদেশে মহামারী আকার প্লেগ দেখা দিত, এ জন্য এ মাসকে অশুভ মনে করা হত এবং এতে বিয়ে শাদী ইত্যাদি অনুষ্ঠান করা হত না। কিন্তু উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিয়ে মক্কায় শাওয়াল মাসে হয়েছিল। হিজরতের পর যখন মদীনায় এসে হুযুর (ﷺ)-এর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে বসবাস শুরু করলেন, তখন এটাও শাওয়াল মাস ছিল। এভাবে হযরত আয়েশার মুবারক বিয়ে ও স্বামীর ঘরে যাত্রা আরবদের এ অহেতুক ধারণার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দিল।
কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
আযওয়াজে মুতাহহারাতের মধ্যে তারই একমাত্র এ মর্যাদা অর্জিত রয়েছে যে, তিনি বাল্যকালে অর্থাৎ, ৯/১০ বছর বয়স থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাহচর্য, নিকট সান্নিধ্য ও শিক্ষা-দীক্ষা দ্বারা উপকৃত হতে থাকেন। এমনিভাবে আরো কিছু সৌভাগ্য তিনি এককভাবে লাভ করেছিলেন- যেগুলোর আলোচনা তিনি স্বয়ং আল্লাহর শুকরিয়ার সাথে করতেন। তিনি বলতেন আমার একারই এ সৌভাগ্য যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিবাহ বন্ধনে আমার পূর্বেই হুযুর (ﷺ)কে আমার আকৃতি দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ইনি দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে আপনার স্ত্রী হবেন। হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে আমিই একজন যে, তাঁর সাথে বিয়ে হওয়ার আগে অন্য কারো সাথে আমার রেস্তাদারী হয়নি। আমার একার উপরই আল্লাহর এ অনুগ্রহ রয়েছে যে, যখন তিনি আমার সাথে একই লেহাফের নীচে আরাম করতেন, তখন তাঁর নিকট ওহী আসত, অন্য কোন স্ত্রীর এ সৌভাগ্য লাভ হয়নি। এটাও উল্লেখযোগ্য যে, হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বেশী আদরের স্ত্রী ছিলাম। আমি ঐ পিতার কন্যা, যিনি হুযুর (ﷺ)-এর সবচেয়ে প্রিয়পাত্র ছিলেন।
হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে এ মর্যাদাও আমার ভাগ্যে জুটেছে যে, আমার পিতা ও মাতা উভয়ই মুহাজির। তাছাড়া কতিপয় মুনাফিকের ষড়যন্ত্রের ফলে যখন আমার প্রতি একটি নোংরা অপবাধ আরোপ করা হল, তখন আল্লাহ্ তা'আলা আমার নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য কুরআন পাকের আয়াত নাযিল করলেন- যেগুলো কিয়ামত পর্যন্ত ঈমানদারগণ পাঠ করবেন এবং ঐ আয়াতসমূহে নবীয়ে পাকের طيب (এর পাক বিবি طيبة (বলা হয়েছে। তাছাড়া এ প্রসঙ্গের শেষ আয়াতে اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ হয়েছে। অর্থাৎ, আমার জন্য মাগফেরাত ও সম্মানজনক রিযিকের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি কখনো কখনো নিজের এ সৌভাগ্যের কথাও উল্লেখ করতেন যে, হুযূর (ﷺ) জীবনের শেষ পূর্ণ সপ্তাহটি আমার ঘরে অবস্থান করেছেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন যে, জীবনের শেষ দিনটি আমার এখানে থাকার দিন ছিল এবং আল্লাহ্ তা'আলার সবিশেষ অনুগ্রহ আমার উপর এই ছিল যে, এই শেষ দিন আমার মুখের লালা হুযুর (ﷺ)-এর মুখের লালার সাথে তাঁর পেটে গিয়েছিল এবং জীবনের শেষ মুহূর্তে আমিই তাঁকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বসা ছিলাম। আর যে সময় আল্লাহর হুকুমে দেহ থেকে রূহ বিচ্ছিন্ন হয়, ঐ সময় তাঁর কাছে আমিই ছিলাম অথবা মৃত্যুর ফিরিশতা। শেষ কথা এই যে, আমার হুজরাটিই কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর বিশ্রামস্থল হয়েছে। অর্থাৎ, এখানেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
২২২. হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি. সূত্রে নবী করীম (ﷺ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন: পুরুষদের মধ্যে তো অনেকেই পরাকাষ্ঠা গুণের অধিকারী হয়েছেন। কিন্তু মহিলাদের মধ্যে এ গুণের অধিকারী হয়েছেন কেবল মরিয়াম বিনতে ইমরান ও ফেরাআউনের স্ত্রী আসিয়া। আর নারীজাতির উপর আয়েশার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব ঠিক তেমন, যেমন সকল খাদ্য সামগ্রীর মধ্যে সারীদের শ্রেষ্ঠত্ব। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ أَبِي مُوسَى عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرَةٌ وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَرْيَمَ بِنْتِ عِمْرَانَ وَآسِيَةَ امْرَأَةِ فِرْعَوْنَ وَفَضْلَ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ. (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ২২৩
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত আয়েশা রাযি.-এর মর্যাদা ও পরাকাষ্ঠা গুণ
২২৩. হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেনঃ তোমাকে তিন রাত স্বপ্নে আমাকে দেখানো হয়েছে যে, একজন ফিরিশতা রেশমী কাপড়ে জড়িয়ে তোমাকে আমার সামনে নিয়ে আসছে এবং আমাকে বলছে যে, ইনি হচ্ছেন আপনার স্ত্রী। আমি তোমার মুখের কাপড় সরিয়ে দেখলাম যে, সে তুমিই। আমি তখন মনে মনে বললাম, এটা যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, তাহলে তিনি এ স্বপ্ন বাস্তবায়িত করবেন। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ لِيْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أُرِيتُكِ فِي الْمَنَامِ ثَلاَثَ لَيَالٍ جَاءَنِي بِكِ الْمَلَكُ فِي سَرَقَةٍ مِنْ حَرِيرٍ فَيَقُولُ هَذِهِ امْرَأَتُكَ. فَأَكْشِفُ عَنْ وَجْهِكِ فَإِذَا أَنْتِ هِيَ فَقُلْتُ إِنْ يَكُنْ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ يُمْضِهِ. (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ২২৪
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত আয়েশা রাযি.-এর মর্যাদা ও পরাকাষ্ঠা গুণ
২২৪. হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (একদিন) বললেন, হে আয়েশা। ইনি হচ্ছেন জিবরাঈল (আ.) তিনি তোমাকে সালাম বলছেন। আমি তখন বললাম, وَعَلَيْهِ السَّلاَمُ وَرَحْمَةُ اللَّه (অর্থ, তাঁর উপরও শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।) আয়েশা বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তা দেখতেন, যা আমি দেখতাম না। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا عَائِشَةُ هَذَا جِبْرِيلُ يَقْرَأُ عَلَيْكِ السَّلاَمَ قَالَتْ وَعَلَيْهِ السَّلاَمُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ، قَالَتْ وَهُوَ يَرَى مَا لاَ أَرَى. (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ২২৫
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত আয়েশা রাযি.-এর মর্যাদা ও পরাকাষ্ঠা গুণ
২২৫. হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের হাদিয়া নিয়ে আমার পালার দিনটির অপেক্ষা করতেন, আর এর দ্বারা তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে খুশী করতে চাইতেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে দু'টি দল ছিল। একদলে আয়েশা, হাফসা, ছফিয়্যা ও সাওদা ছিলেন। অপর দলে উম্মে সালামা ও অবশিষ্ট স্ত্রীগণ। হযরত উম্মে সালামার দলের আযওয়াজে মুতাহহারাত উম্মে সালামাকে বললেন, আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে বলুন যে, আপনার সাহাবীদেরকে বলে দিন যে, তাদের কেউ যদি কিছু হাদিয়া দিতে চায়, তাহলে আপনি পালাক্রমে যার ঘরেই থাকুন, সেখানেই যেন হাদিয়া দিয়ে যায়। উম্মে সালামা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে একথা বললেন। তিনি উত্তরে বললেন, তোমরা আমাকে আয়েশার ব্যাপারে কষ্ট দিয়ো না। এটা আয়েশারই বৈশিষ্ট্য যে, তাঁর সাথে অবস্থানকালেই তাঁর লেহাফের নীচে আমার উপর ওহী নাযিল হয়েছে। (অন্য কোন স্ত্রীর সাথে এভাবে অবস্থানকালে ওহী আসেনি।) উম্মে সালামা তখন বললেন, আমি আপনাকে কষ্ট দেওয়া থেকে মহান আল্লাহর দরবারে তওবা করছি। তারপর উম্মে সালামার দলের স্ত্রীগণ হযরত ফাতেমাকে এ উদ্দেশ্যে তাঁর নিকট পাঠালেন এবং তিনি ঐ কথাই নিবেদন করলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন বললেন, হে আদরের কন্যা। তুমি কি তাকে ভালবাসবে না, যাঁকে আমি ভালবাসি। তিনি উত্তর দিলেন, অবশ্যই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন বললেন, তাহলে তুমি তাঁর (আয়েশার) প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন কর। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ النَّاسَ كَانُوا يَتَحَرَّوْنَ بِهَدَايَاهُمْ يَوْمَ عَائِشَةَ يَبْتَغُونَ بِذَلِكَ مَرْضَاةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالَتْ إِنَّ نِسَاءَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُنَّ حِزْبَيْنِ فَحِزْبٌ فِيهِ عَائِشَةُ وَحَفْصَةُ وَصَفِيَّةُ وَسَوْدَةُ، وَالْحِزْبُ الآخَرُ أُمُّ سَلَمَةَ وَسَائِرُ نِسَاءِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَكَلَّمَ حِزْبُ أُمِّ سَلَمَةَ، فَقُلْنَ لَهَا كَلِّمِي رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكَلِّمُ النَّاسَ، فَيَقُولُ مَنْ أَرَادَ أَنْ يُهْدِيَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَدِيَّةً فَلْيُهْدِهِ إِلَيْهِ حَيْثُ كَانَ، فَكَلَّمَتْهُ فَقَالَ لَهَا: لاَ تُؤْذِينِي فِي عَائِشَةَ، فَإِنَّ الْوَحْيَ لَمْ يَأْتِنِي، وَأَنَا فِي ثَوْبِ امْرَأَةٍ إِلاَّ عَائِشَةَ. قَالَتْ أَتُوبُ إِلَى اللَّهِ مِنْ أَذَاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ. ثُمَّ إِنَّهُنَّ دَعَوْنَ فَاطِمَةَ بِنْتَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَرْسَلْنَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَلَّمَتْهُ. فَقَالَ: يَا بُنَيَّةُ، أَلاَ تُحِبِّينَ مَا أُحِبُّ. قَالَتْ بَلَى قَالَ فَأَحُبِّيْ هَذِهِ. (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ২২৬
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ জ্ঞান-গবেষণায় হযরত আয়েশার স্থান
২২৬. হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আমাদের অর্থাৎ, সাহাবায়ে কেরামের কারো নিকট কোন মাসআলা জটিল মনে হয়েছে, তখন হযরত আয়েশার নিকট এর সমাধান চাইলে সুন্দর সমাধান পেয়েছি। (তিরমিযী)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ مَا أَشْكَلَ عَلَيْنَا أَصْحَابَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدِيثٌ قَطُّ فَسَأَلْنَا عَائِشَةَ إِلاَّ وَجَدْنَا عِنْدَهَا مِنْهُ عِلْمًا. (رواه والترمذى)
তাহকীক:
হাদীস নং: ২২৭
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসা রাযি.
হাফসা রাযি. হচ্ছেন, হযরত উমর রাযি.-এর কন্যা। উমর রাযি.-এর সন্তানদের মাঝে তিনিই আব্দুল্লাহ বিন উমর রাযি.-এর আপন বোন। তাঁর মা যায়নাব বিনতে মাউন রাযি.। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী উসমান বিন মাযউন রাযি.-এর বোন। নবুওয়াতের পাঁচ বছর পূর্বে হাফসা রাযি. জন্ম গ্রহণ করেন। এ হিসেবে তিনি রাসূল (ﷺ) এর চেয়ে ৩৫ বছরের ছোট ছিলেন।
হিজরতের পূর্বে সাহাবী খুনায়স বিন হুযাফা সাহমী রাযি.-এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর সাথেই তিনি মদীনায় হিজরত করেন। খুনায়স রাযি. বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। প্রসিদ্ধ বর্ণনানুযায়ী এ যুদ্ধেই তিনি মারাত্মক আহত হন। তা থেকে পুরোপুরি সেরে উঠেননি। কিছুদিন পর প্রচণ্ড এ আঘাতই তাঁকে শাহাদাতের পথে পৌঁছে দেয়।
খুনায়স রাযি.-এর ইন্তিকালের পর কন্যা নিয়ে উমর রাযি. এর কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠে। সময়টা ছিল বদর যুদ্ধের অব্যবহিত পরেরই। সে সময় উসমান রাযি.-এর স্ত্রী ও রাসূল (ﷺ)-এর কন্যা রুকাইয়্যা রাযি. ও পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। তাই উমর রাযি. এসে উসমান রাযি.-এর কাছে হাফসা রাযি.-কে বিয়ে করার প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কিছু সময় চাইলেন। কয়েক দিন পর এ ব্যাপারে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর উমর রাযি. আবু বকর রাযি. কেও উক্ত প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তর না দিয়ে নীরবতা অবলম্বন করেন। উমর রাযি. বলেন, উসমানের অপারগতার চেয়ে তাঁর নীরবতা আমার কাছে অনেক বেশী অসহনীয় মনে হয়। এর কিছুদিন পরই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাফসা রাযি.-কে বিয়ে করার পয়গাম পাঠান। এ বিবাহের পরে একদিন আবু বকর রাযি. উমর রাযি. কে পেয়ে বলেন- আমার ধারণা, তুমি আমার কাছে হাফসাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পেশ করলে আমি নীরবতা অবলম্বন করে ছিলাম, নিশ্চয় এতে তুমি চরম অসন্তুষ্ট হয়েছিলে। আসল কথা হলো, কোনো একভাবে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাফসাকে বিয়ে করতে একটা প্রচ্ছন্ন আগ্রহ বোধ করছেন। এ কারণেই আমি তোমার প্রস্তাবের কোন জবাব দেইনি। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে বিষয়ে তখনো গোপন রেখেছেন, তা প্রকাশ করাও আমি সমীচীন মনে করিনি। যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঐ আগ্রহের কথা আমার জানা না থাকত, তাহলে অবশ্যই আমি তোমার প্রস্তাবে সাড়া দিতাম। উপরোক্ত সবটুকু আলোচনাই বুখারী, মুসলিমসহ অন্যান্য কিতাবে হাফসা রাযি.-এর সহোদর আব্দুল্লাহ বিন উমর রাযি. সূত্রে পাওয়া যায়। হাদীসের নির্ভরযোগ্য আরেকটি কিতাব মুসনাদে আবু ইয়ালা'য় অতিরিক্ত এ অংশটুকুও পাওয়া যায় যে, উমর রাযি. উসমান রাযি.-কে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করার পর তিনি অপারগতার অজুহাত দেখালে উমর রাযি. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এজন্য অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আল্লাহ্ পাক হাফসাকে উসমানের চেয়েও শ্রেষ্ঠ একজন স্বামী দান করবেন, আর উসমানকেও হাফসার চেয়ে একজন শ্রেয়সী স্ত্রী দিবেন। এর কিছুদিন পরই রাসূল তনয়া উম্মে কুলসুম রাযি.-এর সাথে উসমান রাযি.-এর শুভশাদী হয়, আর হাফসা রাযি.ও নবীগৃহের বধু হওয়ার অনির্বচনীয় সম্মান লাভ করেন। হাফসা রাযি. এর কীর্তিমতা আলোচনায় এ বিষয়টিও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, উমর রাযি. এর পরামর্শে আবু বকর রাযি.-এর খেলাফতকালে কুরআন মাজীদের যে কপিটি পরিপূর্ণরূপে লিপিবদ্ধ ও সংকলন করা হয়েছিল, উমর রাযি. এর শাহাদাতের পর সেটি হাফসা রাযি.-এর তত্ত্বাবধানেই থাকত। উসমান রাযি.-এর খেলাফতকালে যখন খেলাফতের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কুরআনে কারীমের অভিন্ন একটি কপি সংকলিত ও সুনির্ধারিত করে ইসলামী সমাজের দিকে দিকে পাঠিয়ে দেয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন হাফসা রাযি.-এর কাছে সংরক্ষিত এই কপিটিকেই এ কাজের ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়। এ সম্পর্কিত বিশদ আলোচনা এই মা'আরিফুল হাদীসেই উসমান রাযি.-এর গুণাবলী অধ্যায়ে বিগত হয়েছে। এখানে শুধু এতটুকু বলা উদ্দেশ্য যে, ফারুকী যামানার পরে সেই কপিটি হাফসা রাযি.-এর তত্ত্বাবধানে আসাটা নিঃসন্দেহে তাঁর অসামান্য মর্যাদার পরিচয় বহন করে। হাফসা রাযি. মু'আবিয়া রাযি.-এর খেলাফতকালে ৪৫ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
এই পরিচয়মূলক ও ভূমিকাসুলভ কথাগুলির পর একটি হাদীসে উল্লেখ করা হচ্ছে। যাতে আল্লাহ্ পাকের অতি নিকটতম ফিরিশতা জিবরায়ীল (আ.) এর ভাষায় হাফসা রাযি.-এর ব্যাপারে এক দেদীপ্যমান সাক্ষ্য অমলিন হয়ে রয়েছে। বাস্তব কথা হল, হাফসা রাযি.-এর অনন্য মর্যাদার জন্য শুধু এ হাদীসটিই যথেষ্টে।
হাফসা রাযি. হচ্ছেন, হযরত উমর রাযি.-এর কন্যা। উমর রাযি.-এর সন্তানদের মাঝে তিনিই আব্দুল্লাহ বিন উমর রাযি.-এর আপন বোন। তাঁর মা যায়নাব বিনতে মাউন রাযি.। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী উসমান বিন মাযউন রাযি.-এর বোন। নবুওয়াতের পাঁচ বছর পূর্বে হাফসা রাযি. জন্ম গ্রহণ করেন। এ হিসেবে তিনি রাসূল (ﷺ) এর চেয়ে ৩৫ বছরের ছোট ছিলেন।
হিজরতের পূর্বে সাহাবী খুনায়স বিন হুযাফা সাহমী রাযি.-এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর সাথেই তিনি মদীনায় হিজরত করেন। খুনায়স রাযি. বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। প্রসিদ্ধ বর্ণনানুযায়ী এ যুদ্ধেই তিনি মারাত্মক আহত হন। তা থেকে পুরোপুরি সেরে উঠেননি। কিছুদিন পর প্রচণ্ড এ আঘাতই তাঁকে শাহাদাতের পথে পৌঁছে দেয়।
খুনায়স রাযি.-এর ইন্তিকালের পর কন্যা নিয়ে উমর রাযি. এর কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠে। সময়টা ছিল বদর যুদ্ধের অব্যবহিত পরেরই। সে সময় উসমান রাযি.-এর স্ত্রী ও রাসূল (ﷺ)-এর কন্যা রুকাইয়্যা রাযি. ও পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। তাই উমর রাযি. এসে উসমান রাযি.-এর কাছে হাফসা রাযি.-কে বিয়ে করার প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কিছু সময় চাইলেন। কয়েক দিন পর এ ব্যাপারে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর উমর রাযি. আবু বকর রাযি. কেও উক্ত প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তর না দিয়ে নীরবতা অবলম্বন করেন। উমর রাযি. বলেন, উসমানের অপারগতার চেয়ে তাঁর নীরবতা আমার কাছে অনেক বেশী অসহনীয় মনে হয়। এর কিছুদিন পরই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাফসা রাযি.-কে বিয়ে করার পয়গাম পাঠান। এ বিবাহের পরে একদিন আবু বকর রাযি. উমর রাযি. কে পেয়ে বলেন- আমার ধারণা, তুমি আমার কাছে হাফসাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পেশ করলে আমি নীরবতা অবলম্বন করে ছিলাম, নিশ্চয় এতে তুমি চরম অসন্তুষ্ট হয়েছিলে। আসল কথা হলো, কোনো একভাবে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাফসাকে বিয়ে করতে একটা প্রচ্ছন্ন আগ্রহ বোধ করছেন। এ কারণেই আমি তোমার প্রস্তাবের কোন জবাব দেইনি। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে বিষয়ে তখনো গোপন রেখেছেন, তা প্রকাশ করাও আমি সমীচীন মনে করিনি। যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঐ আগ্রহের কথা আমার জানা না থাকত, তাহলে অবশ্যই আমি তোমার প্রস্তাবে সাড়া দিতাম। উপরোক্ত সবটুকু আলোচনাই বুখারী, মুসলিমসহ অন্যান্য কিতাবে হাফসা রাযি.-এর সহোদর আব্দুল্লাহ বিন উমর রাযি. সূত্রে পাওয়া যায়। হাদীসের নির্ভরযোগ্য আরেকটি কিতাব মুসনাদে আবু ইয়ালা'য় অতিরিক্ত এ অংশটুকুও পাওয়া যায় যে, উমর রাযি. উসমান রাযি.-কে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করার পর তিনি অপারগতার অজুহাত দেখালে উমর রাযি. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এজন্য অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আল্লাহ্ পাক হাফসাকে উসমানের চেয়েও শ্রেষ্ঠ একজন স্বামী দান করবেন, আর উসমানকেও হাফসার চেয়ে একজন শ্রেয়সী স্ত্রী দিবেন। এর কিছুদিন পরই রাসূল তনয়া উম্মে কুলসুম রাযি.-এর সাথে উসমান রাযি.-এর শুভশাদী হয়, আর হাফসা রাযি.ও নবীগৃহের বধু হওয়ার অনির্বচনীয় সম্মান লাভ করেন। হাফসা রাযি. এর কীর্তিমতা আলোচনায় এ বিষয়টিও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, উমর রাযি. এর পরামর্শে আবু বকর রাযি.-এর খেলাফতকালে কুরআন মাজীদের যে কপিটি পরিপূর্ণরূপে লিপিবদ্ধ ও সংকলন করা হয়েছিল, উমর রাযি. এর শাহাদাতের পর সেটি হাফসা রাযি.-এর তত্ত্বাবধানেই থাকত। উসমান রাযি.-এর খেলাফতকালে যখন খেলাফতের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কুরআনে কারীমের অভিন্ন একটি কপি সংকলিত ও সুনির্ধারিত করে ইসলামী সমাজের দিকে দিকে পাঠিয়ে দেয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন হাফসা রাযি.-এর কাছে সংরক্ষিত এই কপিটিকেই এ কাজের ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়। এ সম্পর্কিত বিশদ আলোচনা এই মা'আরিফুল হাদীসেই উসমান রাযি.-এর গুণাবলী অধ্যায়ে বিগত হয়েছে। এখানে শুধু এতটুকু বলা উদ্দেশ্য যে, ফারুকী যামানার পরে সেই কপিটি হাফসা রাযি.-এর তত্ত্বাবধানে আসাটা নিঃসন্দেহে তাঁর অসামান্য মর্যাদার পরিচয় বহন করে। হাফসা রাযি. মু'আবিয়া রাযি.-এর খেলাফতকালে ৪৫ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
এই পরিচয়মূলক ও ভূমিকাসুলভ কথাগুলির পর একটি হাদীসে উল্লেখ করা হচ্ছে। যাতে আল্লাহ্ পাকের অতি নিকটতম ফিরিশতা জিবরায়ীল (আ.) এর ভাষায় হাফসা রাযি.-এর ব্যাপারে এক দেদীপ্যমান সাক্ষ্য অমলিন হয়ে রয়েছে। বাস্তব কথা হল, হাফসা রাযি.-এর অনন্য মর্যাদার জন্য শুধু এ হাদীসটিই যথেষ্টে।
২২৭. কায়স বিন যায়েদ রাযি. থেকে বর্ণিত, একবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাফসা রাযি. কে প্রত্যাহারযোগ্য তালাক দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন। এর কারণ হল, জিবরাঈল (আ.) এসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে বললেন, আপনি হাফসার তালাক প্রত্যাহার করে তাঁকে ফিরিয়ে আনুন। কারণ, সে খুব বেশী রোযা পালনকারী এবং অনেক বেশী নামায আদায়কারী। এছাড়া জান্নাতেও সে আপনার স্ত্রী হবে।
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ قَيْسِ بْنِ زَيْدٍ أَنَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَلَّقَهَا تَطْلِيقَةً، ثُمَّ اِرْتَجَعَهَا وَذَالِكَ أَنَّ جِبْرَائِيْلَ، قَالَ لَهُ إِرْجِعْ حَفْصَةَ فَإِنَّهَا صَوَّامَةٌ قَوَّامَةٌ، وَإِنَّهَا زَوْجَتُكَ وَفِي الْجَنَّةِ.
তাহকীক: