মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ২২৭
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসা রাযি.

হাফসা রাযি. হচ্ছেন, হযরত উমর রাযি.-এর কন্যা। উমর রাযি.-এর সন্তানদের মাঝে তিনিই আব্দুল্লাহ বিন উমর রাযি.-এর আপন বোন। তাঁর মা যায়নাব বিনতে মাউন রাযি.। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী উসমান বিন মাযউন রাযি.-এর বোন। নবুওয়াতের পাঁচ বছর পূর্বে হাফসা রাযি. জন্ম গ্রহণ করেন। এ হিসেবে তিনি রাসূল (ﷺ) এর চেয়ে ৩৫ বছরের ছোট ছিলেন।

হিজরতের পূর্বে সাহাবী খুনায়স বিন হুযাফা সাহমী রাযি.-এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর সাথেই তিনি মদীনায় হিজরত করেন। খুনায়স রাযি. বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। প্রসিদ্ধ বর্ণনানুযায়ী এ যুদ্ধেই তিনি মারাত্মক আহত হন। তা থেকে পুরোপুরি সেরে উঠেননি। কিছুদিন পর প্রচণ্ড এ আঘাতই তাঁকে শাহাদাতের পথে পৌঁছে দেয়।

খুনায়স রাযি.-এর ইন্তিকালের পর কন্যা নিয়ে উমর রাযি. এর কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠে। সময়টা ছিল বদর যুদ্ধের অব্যবহিত পরেরই। সে সময় উসমান রাযি.-এর স্ত্রী ও রাসূল (ﷺ)-এর কন্যা রুকাইয়্যা রাযি. ও পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। তাই উমর রাযি. এসে উসমান রাযি.-এর কাছে হাফসা রাযি.-কে বিয়ে করার প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কিছু সময় চাইলেন। কয়েক দিন পর এ ব্যাপারে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর উমর রাযি. আবু বকর রাযি. কেও উক্ত প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তর না দিয়ে নীরবতা অবলম্বন করেন। উমর রাযি. বলেন, উসমানের অপারগতার চেয়ে তাঁর নীরবতা আমার কাছে অনেক বেশী অসহনীয় মনে হয়। এর কিছুদিন পরই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাফসা রাযি.-কে বিয়ে করার পয়গাম পাঠান। এ বিবাহের পরে একদিন আবু বকর রাযি. উমর রাযি. কে পেয়ে বলেন- আমার ধারণা, তুমি আমার কাছে হাফসাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পেশ করলে আমি নীরবতা অবলম্বন করে ছিলাম, নিশ্চয় এতে তুমি চরম অসন্তুষ্ট হয়েছিলে। আসল কথা হলো, কোনো একভাবে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাফসাকে বিয়ে করতে একটা প্রচ্ছন্ন আগ্রহ বোধ করছেন। এ কারণেই আমি তোমার প্রস্তাবের কোন জবাব দেইনি। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে বিষয়ে তখনো গোপন রেখেছেন, তা প্রকাশ করাও আমি সমীচীন মনে করিনি। যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঐ আগ্রহের কথা আমার জানা না থাকত, তাহলে অবশ্যই আমি তোমার প্রস্তাবে সাড়া দিতাম। উপরোক্ত সবটুকু আলোচনাই বুখারী, মুসলিমসহ অন্যান্য কিতাবে হাফসা রাযি.-এর সহোদর আব্দুল্লাহ বিন উমর রাযি. সূত্রে পাওয়া যায়। হাদীসের নির্ভরযোগ্য আরেকটি কিতাব মুসনাদে আবু ইয়ালা'য় অতিরিক্ত এ অংশটুকুও পাওয়া যায় যে, উমর রাযি. উসমান রাযি.-কে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করার পর তিনি অপারগতার অজুহাত দেখালে উমর রাযি. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এজন্য অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আল্লাহ্ পাক হাফসাকে উসমানের চেয়েও শ্রেষ্ঠ একজন স্বামী দান করবেন, আর উসমানকেও হাফসার চেয়ে একজন শ্রেয়সী স্ত্রী দিবেন। এর কিছুদিন পরই রাসূল তনয়া উম্মে কুলসুম রাযি.-এর সাথে উসমান রাযি.-এর শুভশাদী হয়, আর হাফসা রাযি.ও নবীগৃহের বধু হওয়ার অনির্বচনীয় সম্মান লাভ করেন। হাফসা রাযি. এর কীর্তিমতা আলোচনায় এ বিষয়টিও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, উমর রাযি. এর পরামর্শে আবু বকর রাযি.-এর খেলাফতকালে কুরআন মাজীদের যে কপিটি পরিপূর্ণরূপে লিপিবদ্ধ ও সংকলন করা হয়েছিল, উমর রাযি. এর শাহাদাতের পর সেটি হাফসা রাযি.-এর তত্ত্বাবধানেই থাকত। উসমান রাযি.-এর খেলাফতকালে যখন খেলাফতের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কুরআনে কারীমের অভিন্ন একটি কপি সংকলিত ও সুনির্ধারিত করে ইসলামী সমাজের দিকে দিকে পাঠিয়ে দেয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন হাফসা রাযি.-এর কাছে সংরক্ষিত এই কপিটিকেই এ কাজের ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়। এ সম্পর্কিত বিশদ আলোচনা এই মা'আরিফুল হাদীসেই উসমান রাযি.-এর গুণাবলী অধ্যায়ে বিগত হয়েছে। এখানে শুধু এতটুকু বলা উদ্দেশ্য যে, ফারুকী যামানার পরে সেই কপিটি হাফসা রাযি.-এর তত্ত্বাবধানে আসাটা নিঃসন্দেহে তাঁর অসামান্য মর্যাদার পরিচয় বহন করে। হাফসা রাযি. মু'আবিয়া রাযি.-এর খেলাফতকালে ৪৫ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

এই পরিচয়মূলক ও ভূমিকাসুলভ কথাগুলির পর একটি হাদীসে উল্লেখ করা হচ্ছে। যাতে আল্লাহ্ পাকের অতি নিকটতম ফিরিশতা জিবরায়ীল (আ.) এর ভাষায় হাফসা রাযি.-এর ব্যাপারে এক দেদীপ্যমান সাক্ষ্য অমলিন হয়ে রয়েছে। বাস্তব কথা হল, হাফসা রাযি.-এর অনন্য মর্যাদার জন্য শুধু এ হাদীসটিই যথেষ্টে।
২২৭. কায়স বিন যায়েদ রাযি. থেকে বর্ণিত, একবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাফসা রাযি. কে প্রত্যাহারযোগ্য তালাক দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন। এর কারণ হল, জিবরাঈল (আ.) এসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে বললেন, আপনি হাফসার তালাক প্রত্যাহার করে তাঁকে ফিরিয়ে আনুন। কারণ, সে খুব বেশী রোযা পালনকারী এবং অনেক বেশী নামায আদায়কারী। এছাড়া জান্নাতেও সে আপনার স্ত্রী হবে।
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ قَيْسِ بْنِ زَيْدٍ أَنَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَلَّقَهَا تَطْلِيقَةً، ثُمَّ اِرْتَجَعَهَا وَذَالِكَ أَنَّ جِبْرَائِيْلَ، قَالَ لَهُ إِرْجِعْ حَفْصَةَ فَإِنَّهَا صَوَّامَةٌ قَوَّامَةٌ، وَإِنَّهَا زَوْجَتُكَ وَفِي الْجَنَّةِ.

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আল্লাহ্ পাকের কাছে হাফসা রাযি. এর অনন্য মর্যাদা, তাঁর বরণীয় ও প্রিয়ভাজন হওয়ার ধারণা পাওয়ার জন্য এ হাদীসটিই যথেষ্ট। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন কোন কারণে হাফসা রাযি.-কে তালাক দিয়েছিলেন, তখন আল্লাহ্ পাক জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে শুধু হাফসা রাযি.-এর তালাক প্রত্যাহার করার ঘোষণাই দেননি; বরং পাশাপাশি তাঁর নির্মল সাধনা ও ঐকান্তিক একনিষ্ঠতার স্বীকৃতি ও সাক্ষ্য প্রদান করে বলেছেন- সে দিনের বেলা খুব বেশী রোযা রাখে, আর রাত হলে খোদার সকাশে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে থাকে। শুধু এতটুকুই নয়, আরেকটু অগ্রসর হয়ে বলা হয়েছে যে, জান্নাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর স্ত্রী হওয়ার মহামর্যাদাটি তাঁর জন্য বরাদ্দ হয়ে আছে। এ বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানা নেই যে, তালাক প্রদানের মূল হেতুটি কি ছিল। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, তালাক ও তা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ ঘরে সংঘটিত এ ঘটনাটি গোটা উম্মতের জন্য এক্ষেত্রে একটি সঠিক ও সুন্নাহ সম্মত অনুসরণীয় পদ্ধতি বলে পরিচিত হয়ে থাকবে। হতে পারে এ ঘটনার অন্তর্নিহিত একটি কারণ ছিল এ পদ্ধটিরই শিক্ষা প্রদান করা। এছাড়াও ঐ ঘটনার আরেকটি বরকত হল, এর মাধ্যমেই আল্লাহ্ পাকের কাছে তাঁর অত্যুচ্চ মর্যাদার বিষয়টি প্রকাশ লাভ করেছে এবং মর্যাদা অর্জনে সহায়ক তাঁর একান্ত বৈশিষ্ট্যগুলিও জানা গেছে। সর্বোপরি এ ঘটনার বদৌলতেই নিশ্চিতভাবে তাঁর জান্নাতী হওয়ার ঐশী স্বীকৃতি পাওয়া গেছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ২২৭ | মুসলিম বাংলা