মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ২২৬
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
জ্ঞান-গবেষণায় হযরত আয়েশার স্থান
২২৬. হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আমাদের অর্থাৎ, সাহাবায়ে কেরামের কারো নিকট কোন মাসআলা জটিল মনে হয়েছে, তখন হযরত আয়েশার নিকট এর সমাধান চাইলে সুন্দর সমাধান পেয়েছি। (তিরমিযী)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ مَا أَشْكَلَ عَلَيْنَا أَصْحَابَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدِيثٌ قَطُّ فَسَأَلْنَا عَائِشَةَ إِلاَّ وَجَدْنَا عِنْدَهَا مِنْهُ عِلْمًا. (رواه والترمذى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

জানা আবশ্যক যে, হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি. প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। তিনি ঐ কয়জন সাহাবীর অন্তর্ভুক্ত, যারা ইলম ও ধর্মীয় জ্ঞানে অনন্য ছিলেন। তিনি প্রকৃতপক্ষে ইয়ামানের অধিবাসী ছিলেন। ঈমান ও ইসলামের দাওয়াতের প্রাথমিক যুগেই তাঁর নিকট এ সংবাদ পৌছল, তিনি স্বয়ং মক্কায় হুযুর (ﷺ)-এর খেদমতে হাজির হন। হুযুর (ﷺ)-এর অভ্যাস অনুযায়ী তাঁর সামনেও ইসলামের দাওয়াত পেশ করলে তাঁর সুস্থ বিবেক নির্দ্বিধায় ইসলাম গ্রহণ করে নেন এবং তিনি মক্কায়ই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারপর যখন মক্কার কাফের ও মুশরিকগণ ইসলাম গ্রহণকারীদেরকে নিজেদের অত্যাচার নিপীড়নের লক্ষ্যস্থল বানিয়ে নিল এবং অত্যাচার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন হুযুর (ﷺ)-এরই পরামর্শক্রমে ঐ নিপীড়িত মুসলমান হাবশার দিকে হিজরত করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। হযরত জাফর ইবনে আবু তালেবের নেতৃত্বে সাহাবায়ে কিরামের যে দলটি হাবশার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন, তাঁদের মধ্যে হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি.ও ছিলেন, কয়েক বছর পর্যন্ত তাঁরা হাবশায়ই অবস্থান করেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মদীনায় হিজরতের পর তাঁরা মদীনায় এসে গেলেন।

হযরত আবু মূসা আশআরীকে আল্লাহ তা'আলা বিশেষ পর্যায়ের ইলম ও জ্ঞান দান করেছিলেন। তিনি হুযুর (ﷺ)-এর জীবদ্দশাতেই ঐ কয়জন সাহাবীর মধ্যে গণ্য হতেন, সাধারণ মুসলমানগণ ধর্মীয় জ্ঞান লাভ করার জন্য যাদের শরণাপন্ন হতেন। পারিভাষিক শব্দে বলা যায় যে, তিনি 'ফুকাহায়ে সাহাবার' একজন ছিলেন। তাঁর এ বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পর আমাদের যখন কোন মাসআলায় জটিলতা দেখা দিত, তখন আমরা হযরত আয়েশার শরণাপন্ন হতাম এবং দেখতাম যে, এ ব্যাপারে তাঁর কাছে সুন্দর সমাধান রয়েছে। হয়তো তাঁর নিকট এ ব্যাপারে হুযুর (ﷺ)-এর কোন হাদীস থাকত অথবা তিনি আপন এজতেহাদী যোগ্যতা দ্বারা এর সমাধান দিয়ে দিতেন।
এ প্রসঙ্গে কয়েকজন মহান তাবেয়ীর এ স্বাক্ষ্যসমূহ নিম্নে পেশ করা হচ্ছে।

হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের- যিনি হযরত আয়েশার আপন ভাগিনা ও হযরত আয়েশার রেওয়ায়েতসমূহের বিপুল সংখ্যকের রাবী ইমাম হাকেম ও তাবরানী তাঁর এ বর্ণনা হযরত আয়েশা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন:

ما رأيت أحدًا أعلم بالقرآن ولا بفريضة ولا بحرام ولا بحلال ولا بفقه ولا بشعر ولا بطب ولا بحديث العرب ولا نسب من عائشة .

(আমি এমন কাউকে দেখিনাই, যিনি কুরআন পাক, আল্লাহর নির্ধারিত ফরয, হালাল, হারাম, ফেকাহ, কবিতা, চিকিৎসা বিদ্যা, আরবদের ইতিহাস ও বংশবিদ্যা সম্পর্কে (আমার খালা) হযরত আয়েশার চাইতে অধিক জ্ঞান রাখেন।)

হাকেম ও তাবরানীই অন্য একজন তাবেয়ী মাসরূক থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন?

والله لَقَدْ رَأَيْتُ الْأكابر من الصحابة وفي لفظ مثيخة اصحابِ رَسُول اللَّهِ الأكابر يَسْأَلُونَ عَائِشَة عن الفرائض .

(অর্থাৎ, আমি বড় বড় সাহাবীদেরকে দেখেছি যে, তাঁরা ফারায়েয সম্পর্কে হযরত আয়েশার নিকট জিজ্ঞাসা করতেন। ইমাম হাকেমই তৃতীয় এক বুযুর্গ তাবেয়ী আতা ইবনে আবী রাবাহ এর বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন।

كانتْ عَائِشَةُ افْقَهُ النَّاسِ وَاعْلَمُ النَّاسِ وَاحْسَنَ النَّاسِ رَأْيَا فِي الْعَامَةِ

(অর্থাৎ, হযরত আয়েশা বড় ফকীহ ও আলেম ছিলেন। সাধারণ মানুষের মতামত তাঁর ব্যাপারে অত্যন্ত ভাল ছিল।

বাগ্মিতায় হযরত আয়েশা রাযি.
উপরে উল্লেখিত জ্ঞানগত পরাকাষ্ঠা ছাড়াও আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে বক্তৃতা ভাষণেও বিশেষ যোগ্যতা দান করেছিলেন। তাবরানী হযরত মু'আবিয়া রাযি.-এর উক্তি উদ্ধৃত করেছেন:

قَالَ مُعاوية والله ما رأيت خطيبا قط أبلغ ولا أفصح ولا أَفْطَنَ مِنْ عَائِشَة

অর্থাৎ, হযরত মু'আবিয়া রাযি. বলেন, আমি এমন কোন বক্তা দেখি নাই, যিনি বক্তৃতা ভাষণের বেলায় শব্দ চয়নে, বাক্যের অলংকরণে ও সুন্দর উপস্থাপনায় হযরত আয়েশার চেয়ে অগ্রগামী।

এগুলো হচ্ছে হযরত আয়েশার আল্লাহ প্রদত্ত গুণাবলী, যেগুলোর কারণে তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সকল স্ত্রীদের মধ্যে হুযুর (ﷺ)-এর সবচেয়ে বেশী প্রিয় ছিলেন। رَضَى اللَّهُ عَنْهَا وَارْضَاها
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান