মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ২২১
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
নবী করীম (ﷺ)-এর আহলে বাইত তথা পুণ্যবতী স্ত্রী ও সন্তানদের ফযীলত ও মর্যাদা

উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
২২১. হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে হযরত খাদীজার প্রতি আমার যতটুকু ঈর্ষা হত, ততটুকু অন্য কোন স্ত্রীর প্রতি হত না। অথচ আমি তাকে দেখিওনি। তিনি তাঁর কথা খুব আলোচনা করতেন। এমনও হত যে, তিনি একটি বকরী যবেহ করে এর বিভিন্ন অংশ টুকরা টুকরা করতেন। তারপর এগুলো খাদীজার বান্ধবীদের বাড়ীতে পাঠাতেন। তাই আমি কোন সময় বলে ফেলতাম, দুনিয়ায় মনে হয় খাদীজা ছাড়া আর কোন স্ত্রী লোকই নাই। তিনি উত্তরে বলতেন, সে এরূপই ছিল, সে এরূপই ছিল। আর তার পক্ষ থেকে আমার সন্তানাদি হয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: مَا غِرْتُ عَلَى أَحَدٍ مِنْ نِسَاءِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مَا غِرْتُ عَلَى خَدِيجَةَ، وَمَا رَأَيْتُهَا، وَلَكِنْ كَانَ يُكْثِرُ ذِكْرَهَا، وَرُبَّمَا ذَبَحَ الشَّاةَ ثُمَّ يُقَطِّعُهَا أَعْضَاءً، ثُمَّ يَبْعَثُهَا فِي صَدَائِقِ خَدِيجَةَ، فَرُبَّمَا قُلْتُ لَهُ: كَأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ فِي الدُّنْيَا امْرَأَةٌ إِلَّا خَدِيجَةُ، فَيَقُولُ «إِنَّهَا كَانَتْ، وَكَانَتْ، وَكَانَ لِي مِنْهَا وَلَدٌ» (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে যেসব সদগুণ দ্বারা ভূষিত করেছিলেন, এগুলোর মধ্যে একটি ছিল কারো উপকার ও অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা। হযরত খাদীজা রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর বিবাহে আসার পর তাঁর যেসব খেদমত করেছেন, তার পর সত্য দ্বীনের দাওয়াতের সময় যেভাবে তিনি দুঃখ-কষ্টে হুযুর (ﷺ)-এর সাথী হয়ে থেকেছেন এবং এছাড়াও আল্লাহ তা'আলা যেসব বৈশিষ্ট্য তাঁকে দান করেছিলেন, এগুলোর দাবী এই ছিল যে, হুযুর (ﷺ) কখনো তা ভুলবেন না; বরং কৃতজ্ঞতার চাহিদা ছিল যে, তিনি তাঁর ও তাঁর খেদমতসমূহের কথা অন্যদের কাছে- বিশেষ করে নিজের পুণ্যবতী স্ত্রীদের সামনে আলোচনা করবেন। বস্তুত এটাই তাঁর আমল ও কর্মধারা ছিল। এমনকি এ পর্যায়ে হুযুর (ﷺ)-এর অভ্যাস ও রীতি এটাও ছিল যে, কখনো কখনো তিনি ছাগল যবেহ করে এর গোশতের বিভিন্ন অংশ হযরত খাদীজার বান্ধবীদের বাড়ীতে হাদিয়া হিসাবে পাঠিয়ে দিতেন। হুযুর (ﷺ)-এর এ কর্মপদ্ধতির কারণেই হযরত আয়েশা বললেন যে, হুযুর (ﷺ)-এর কোন স্ত্রীর প্রতিই আমার এতটুকু ঈর্ষা হয়নি, যেমন খাদীজার প্রতি ঈর্ষা জাগ্রত হত। অথচ তাঁকে আমি দেখিও নাই। (কেননা, আয়েশার বাল্যকালেই হযরত খাদীজা ইন্তিকাল করে যান।) এ প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. নিজের ঐ দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন যে, হুযুর (ﷺ) যখন আপন মরহুমা স্ত্রী হযরত খাদীজার গুণাবলীর কথা আলোচনা করতেন, তখন আমি কখনো কখনো বলে ফেলতাম 'মনে হয় হযরত খাদীজাই এ দুনিয়াতে এক নারী ছিলেন।' হুযুর (ﷺ) তখন উত্তরে বলতেন, সে এমনটিই ছিল, সে এমনই গুণবতী ছিল। মর্ম এই যে, তিনি হযরত খাদীজার এহসান ও খেদমতের কথা স্বীকার করতেন। এ প্রসঙ্গে হুযুর (ﷺ) তাঁর ঐ বৈশিষ্ট্যের কথাও উল্লেখ করতেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর মাধ্যমেই আমাকে সন্তান দান করেছেন। তিনি ছাড়া অন্য কোন স্ত্রীর গর্ভে আমার কোন সন্তান হয়নি।

হুযুর (ﷺ)-এর এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত মারিয়া কিবতিয়্যার গর্ভে এক পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, যার নাম তিনি ইবরাহীম রেখেছিলেন। তিনি দুগ্ধপোষ্য অবস্থায়ই মাত্র দেড় বছর বয়সে ইন্তিকাল করে গিয়েছিলেন। কিন্তু হযরত মারিয়া হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রী ছিলেন না; বরং দাসী ছিলেন- যাকে আলেকজান্দ্রিয়ার সম্রাট মুকাউকিস অন্যান্য কিছু উপঢৌকনের সাথে তাকেও হাদিয়া হিসাবে হুযুর (ﷺ)-এর খেদমতে প্রেরণ করেছিলেন। পরে তিনি হযরত ইবরাহীমের জন্মের পর শরী‘আতের বিধান অনুযায়ী 'উম্মে ওয়ালাদ' হয়ে গেলেন। এভাবে তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতের ৫ বছর পর হযরত উমর রাযি.-এর খেলাফতকালে মৃত্যু বরণ করেন। رضى الله عَنْهَا وَارْضَاهَا


উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাওদা বিনতে যামআ রাযি.
ইতিপূর্বে যেমন বলে আসা হয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশে মানবজাতিকে মূর্তিপূজা ও জাহিলিয়্যাতের জীবনাচার পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর আনুগত্যের জীবনধারার প্রতি দাওয়াত দেওয়ার কাজ শুরু করলেন, তখন গোটা সম্প্রদায় তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু এমন কিছু সুস্থ বিবেকের মানুষও ছিল, যাদের অন্তর হুযুর (ﷺ)-এর সত্যের আহ্বানকে গ্রহণ করে নিয়েছিল। তাদের মধ্যে হযরত সাওদা বিনতে যামআ আমেরিয়‍্যাও একজন ছিলেন। তার বিবাহ নিজের চাচাতো ভাই সাকরানের সাথে হয়েছিল। সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর দাওয়াতে ইসলামের বিরুদ্ধাচরণে সাধারণ মুশরিকদের সাথেই ছিল। হযরত সাওদা এটাই উপযোগী ও কল্যাণকর মনে করলেন যে, নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা তার কাছে প্রকাশ করবেন না। তবে তিনি যখন সুযোগ বুঝতেন, তখন স্বামী সাকরানের সামনে এমন কথাবার্তা বলতেন, যার দ্বারা তার অন্তর ও হুযুর (ﷺ)-এর সত্যবাদিতা ও ইসলামের হাক্কানিয়্যাতের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। এর ফল এই হল যে, আল্লাহর তাওফীকে তার স্বামী সাকরানও কিছুদিন পর ইসলাম গ্রহণ করে নিলেন। তারপর স্বামী স্ত্রী উভয়ে নিজেদের ঈমান ও ইসলামের প্রকাশ্য ঘোষণাও দিয়ে দিলেন। এর ফলে তাদের উভয়ের উপর কুরাইশ কাফেরদের পক্ষ থেকে যুলুম ও নির্যাতন শুরু হয়ে যায় এবং দিন দিন তা বাড়তেই থাকে। পরিশেষে এ অত্যাচার ও উৎপড়ীনে অতিষ্ট হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরামর্শক্রমে তারা দু'জনও অন্যান্য মযলুম মুসলমানদের ন্যায় হাবশার দিকে হিজরত করে গেলেন। কয়েক বছর পর তার স্বামী সাকরান হাবশাতেই মারা যান। ফলে সাওদা বিধবা হয়ে মক্কায় ফিরে আসেন এবং নিজের পিতার সাথে থাকতে লাগলেন।

নবুওয়াতের দশম বর্ষে যখন উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি. ইন্তিকাল করলেন, তখন হুযুর (ﷺ) স্বাভাবিকভাবেই তার বিচ্ছেদে অত্যন্ত মর্মাহত ছিলেন। তাছাড়া দুশ্চিন্তার আরেকটি কারণ এই ছিল যে, তখন বাড়ীতে কেবল অল্প বয়সী ৪ জন কন্যা সন্তান ছিলেন- যাদের দেখাশোনা ও সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন পূরণে সাহায্যকারী কেউ ছিল না।

হযরত উসমান ইবনে মাযউনের স্ত্রী এ পরিস্থিতি অনুভব করে হুযুর (ﷺ)-এর নিকট নিবেদন করলেন, আপনার দ্রুত বিয়ে করে নেওয়া চাই। হুযূর (ﷺ) বললেন, তোমার দৃষ্টিতে এমন কোন্ মহিলা আছে, যাকে তুমি এ পরিস্থিতিতে উপযোগী মনে কর। খাওলা তখন সাওদা বিনতে যামআর নাম নিলেন- যিনি বিধবা ও বয়স্কা মহিলা ছিলেন। হুযুর (ﷺ) তখন তার ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামিতা, হাবশার হিজরত এবং সাকরানের মৃত্যুর পর তার ধৈব্য জীবনের মনোকষ্টের দিকে লক্ষ্য করে তার সাথে বিবাহের ইচ্ছা করলেন এবং খাওলাকে বললেন, তুমি নিজেই আমার পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব পাঠাও। খাওলা বলেন, আমি সাওদার কাছে গেলাম এবং তাকে মুবারকবাদ দিয়ে বিবাহের প্রস্তাব দিলাম। তিনি প্রস্তাব শুনে বললেন, আমি মনে প্রাণে এ প্রস্তাবে সম্মত আছি। তবে উত্তম হবে যদি তুমি আমার পিতা যামআর সাথেও এ বিষয়ে কথা বলে নাও। আমি সাথে সাথে তার নিকটও গেলাম এবং প্রস্তাব পেশ করলাম। তিনিও নিজের সম্মতির কথা জানিয়ে দিলেন এবং সাথে সাথে একথাও বললেন যে, তুমি নিজে সাওদাকে জিজ্ঞাসা করে নাও। আমি বললাম যে, আমার তার সাথে কথা হয়েছে এবং সে সানন্দে সম্মতি দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত যামআ হযরত খাওলা বিনতে হাকীমের মাধ্যমেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে ডেকে আনলেন এবং হুযুর (ﷺ)-এর সাথে আপন কন্যা সাওদার বিয়ের কাজ সম্পন্ন করে দিলেন। ঐ সময় হযরত সাওদার বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছর ছিল। বিয়ের পর হুযুর (ﷺ) এর মদীনায় হিজরত করা পর্যন্ত তিন বছর হুযূর (ﷺ)-এর বিবাহিত স্ত্রী হিসাবে একা তিনিই হুযুর (ﷺ)-এর সাথে ছিলেন। তার বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর মধ্যে অল্পেতুষ্টি, অমুখাপেক্ষীতা, দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও দানশীলতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতের পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক ও হযরত উমর রাযি. তার উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যসমূহের কারণে তাঁর সাথে অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার আচরণ করতেন। একবার হযরত উমর রাযি. দেরহাম ভর্তি একটি থলে তাঁর খেদমতে প্রেরণ করলেন। থলে নিয়ে আগমনকারী লোকটিকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, থলের মধ্যে কি খেজুর রাখা? সে উত্তর দিল, না; বরং এতে দেরহাম রয়েছে। তিনি বললেন, খেজুর যদি হত, তাহলে খাবারের কাজে আসত। এই বলে তিনি থলেটি হাতে নিলেন এবং এর মধ্যে রাখা সবগুলো দেরহাম অভাবীদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন

হযরত উমর রাযি. এর খেলাফতকালের শেষ দিকে ২২ হিজরীতে প্রায় ৭৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল কলেন। رضى اللهُ عَنْهَا وَأَرْضَاهَا
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান