মা'আরিফুল হাদীস
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হাদীস নং: ২২২
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.
তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াত লাভের চতুর্থ বর্ষে জন্ম গ্রহণ করেন। এ কথা সবারই জানা যে, তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর কন্যা-যিনি সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মাতা হযরত উম্মে রুমানও সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণকারী মহিলাদের মধ্যে একজন ছিলেন। আযওয়াজে মুতাহহারাতের মধ্যে এ মর্যাদা এককভাবে তাঁরই অর্জিত ছিল যে, তাঁর পিতা মাতা উভয়ই তাঁর জন্মের পূর্বেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঈমানের দাওয়াত কবুল করে নিয়েছিলেন। একটু পরেই সম্মানিত পাঠকবৃন্দ জানতে পারবেন যে, স্বপ্নে একাধিকবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে হযরত আয়েশার আকৃতি দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ইনি দুনিয়া ও আখেরাতে আপনার স্ত্রী হবেন। একটু আগে উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাওদা রাযি. এর অবস্থার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর ওফাত হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে বিশেষ ঈমানী সম্পর্কধারী মহিলা খাওলা বিনতে হাকীম তাঁর সাথে বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা করলেন। সেখানে এ প্রসঙ্গে কেবল ঐ অংশটুকুর উল্লেখ করা হয়েছে- যার সম্পর্ক হযরত সাওদার সাথে ছিল। ঐ ক্ষেত্রেই তিনি হযরত আয়েশার ব্যাপারেও নিবেদন করেছিলেন- যার বয়স তখন কেবলমাত্র ৬/৭ বছরের কাছাকাছি ছিল। আর একথা জানা যে, হুযুর (ﷺ)-এর বয়স তখন ৫০ অতিক্রম করে গিয়েছিল। ঐ অবস্থায় খাওলা বিনতে হাকীমের পক্ষ থেকে হযরত আয়েশার সাথে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করার কোন ব্যাখ্যা এ ছাড়া হতে পারে না যে, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে যে ফায়সালা অদৃশ্য জগতে হয়েছিল, এটা কার্যকর করারও মাধ্যম খাওলা বিনতে হাকীমের এ প্রস্তাবকে করা হবে। রেওয়ায়েতের শব্দমালা দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, হুযুর (ﷺ)-এর স্বপ্নের ব্যাপারে খাওলার কোনকিছুই জানা ছিল না। আর বাস্তবতাও এই যে, এ জাতীয় স্বপ্নের কথা কারো কাছে উল্লেখ করা হয় না। যাহোক, এটাই হল যে, খাওলা হুযূর (ﷺ)-এর সামনে হযরত সাওদা বিনতে যামআর সাথে হযরত আয়েশার বিয়েরও প্রস্তাব রাখলেন।
হুযুর (ﷺ) যেভাবে হযরত সাওদার ব্যাপারে বলেছিলেন যে, তুমিই আমার পক্ষ থেকে পয়গাম দাও, তেমনিভাবে হযরত আয়েশার ব্যাপারেও নির্দেশ দিলেন যে, তুমিই তাঁর ব্যাপারে তাঁর পিতা মাতার নিকট প্রস্তাব নিয়ে যাও। কথা অনুযায়ী হযরত খাওলা হযরত আবু বকর সিদ্দীকের বাড়ীতে গেলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে তিনি তখন বাড়ীতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী হযরত আয়েশা রাযি.-এর মা উম্মে রুমান উপস্থিত ছিলেন। হযরত খাওলা তাকে মুবারকবাদ দিয়ে তার কন্যা হযরত আয়েশার জন্য হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করলেন। একটু পরে হযরত আবু বকরও বাড়ীতে এসে গেলেন। খাওলা তাঁর সামনেও তাঁর কন্যা হযরত আয়েশার জন্য হুযূর (ﷺ)-এর বিয়ের প্রস্তাব রাখলেন। হযরত আবু বকর রাযি. বললেন : أو تصلح له وهي بنت اخيه মর্ম এই যে, আয়েশার সাথে কি হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ে হতে পারে? সে যে তাঁর ভাইয়ের কন্যা। (হযরত আবু বকর রাযি. এ কথা এর ভিত্তিতে বলেছিলেন যে, আরবদের মধ্যে যেভাবে প্রথমে পোষ্য পুত্রদের অবস্থান আপন পুত্রদের ন্যায় ছিল, তেমনিভাবে পোষ্য ভাইদের অবস্থান আপন বংশীয় ভাইদের মত হত এবং তার কন্যাকে বিয়ে করা বৈধ মনে করা হত না- যে ভাবে আপন ভাইয়ের কন্যাকে বিয়ে করা জায়েয নয়।)
খাওলা হযরত আবু বকর রাযি.-এর এ কথা হুযুর (ﷺ)-এর নিকট পৌছালে তিনি বললেন: هو أخي في الإسلام وابنته تحل لى মর্ম এই যে, আবু বকর আমার দ্বীনি ভাই, বংশীয় ভাই নয়। এ জন্য তাঁর কন্যা আয়েশাকে বিয়ে করা আমার জন্য আল্লাহর নাযিলকৃত শরী‘আত অনুযায়ী জায়েয ও বৈধ। হ্যাঁ, সে যদি আমার আপন ও বংশীয় ভাই হত, তাহলে তাঁর কন্যাকে বিয়ে করা আমার জন্য জায়েয হত না। খাওলা হযরত আবু বকরকে হুযুর (ﷺ)-এর উত্তর শুনিয়ে দিলেন। তখন স্বাভাবিক কারণেই তিনি অত্যন্ত খুশী হলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে একটি বাধা এই ছিল যে, হযরত আয়েশার বিয়ের কথাবার্তা বাল্যকালেই জুবাইর ইবনে মুতইমের সাথে হয়ে গিয়েছিল এবং এ জাতীয় কথা বার্তা এ সম্পর্কে এক প্রকার চুক্তি মনে করা হত। এজন্য তিনি নৈতিকতার খাতিরে জরুরী মনে করলেন যে, জুবাইরের পিতা মুতইমের সাথে কথা বলে নেওয়া হোক এবং তাকে এ ব্যাপারে সম্মত করে নেওয়া হোক- যাতে আমার পক্ষ থেকে চুক্তি ভঙ্গ না হয়। তাই এ ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য তিনি মুতইমের বাড়ীতে গেলেন।
এখানে এ বিষয়টি লক্ষণীয় যে, এটা নবুওয়াতের ১১তম বর্ষ ছিল- যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও ইসলামের দাওয়াতের প্রতি এবং ইসলাম গ্রহণকারী লোকদের প্রতি মক্কার কাফেরদের শত্রুতা চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল। হযরত আবু বকর মুতইমের বাড়ীতে গিয়ে নিজের কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, আমার কন্যা আয়েশার ব্যাপারে বর্তমানে তোমার মতামত কি? এ সময় মুতইমের স্ত্রী কাছেই বসা ছিল। মুতইম তার স্ত্রীকে সম্বোধন করে বলল, 'তুমি বল, তোমার মতামত কি? সে বলল, 'আমি চাইনা যে, এখন ঐ মেয়ে (হযরত আয়েশা) আমাদের বাড়ীতে আসুক। যদি সে এসে যায়, তাহলে তাঁর সাথে ইসলামের কদমও আমাদের বাড়ীতে এসে যাবে এবং আমরা এ পর্যন্ত আমাদের পূর্বপুরুষের যে ধর্মের উপর চলে এসেছি, এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে যাবে।' মুতইমের স্ত্রীর এ উত্তর শুনে হযরত আবু বকর রাযি. মুতইমকে বললেন, এবার তুমি বল, তোমার সিদ্ধান্ত কি? সে বলল, তুমি তো আমার স্ত্রীর কথা শুনেছ, আমার অভিমতও তাই। হযরত আবু বকর নিশ্চিন্তমনে সেখান থেকে ফিরে আসলেন এবং খাওলাকে বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে ডেকে নিয়ে আস। খাওলা গেলেন এবং সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তশরীফ আনলেন। আর তখনই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল।
এটা শাওয়াল মাস ছিল- যারপর প্রায় তিন বছর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অবস্থান মক্কায় ছিল। আগেই যেমন বলে আশা হয়েছে যে, এই পূর্ণ সময়কাল হযরত সাওদা বিনতে যামআই হুযুর (ﷺ)-এর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে তাঁর সাথে ছিলেন এবং তিনিই সংসারের কাজ আঞ্জাম দিতেন। নবুওয়াত লাভের প্রায় ১৩ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তিনি আল্লাহর হুকুমে মক্কা থেকে হিজরত করে গেলেন। একথা সুবিদিত যে, এ সফর রাতের বেলায় গোপনে হয়েছিল এবং হুযূর (ﷺ) কেবল আবু বকর রাযি.-কে সাথে নিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী পুত্র পরিজন মক্কাতেই থেকে যান। মদীনা শরীফ পৌঁছার পর বসবাসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করার পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. এক ব্যক্তিকে (আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইক) মক্কায় পাঠিয়ে নিজের স্ত্রী উম্মে রুমান এবং উভয় কন্যা হযরত আয়েশা ও তাঁর বড় বোন হযরত আসমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত যায়েদ ইবনে হারিসাকে মক্কায় পাঠিয়ে নিজের পরিবার হযরত সওদা বিনতে যামআ এবং উভয় কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম ও ফাতেমাকে নিয়ে আসলেন। এটা ঐ সময়ের কথা, যখন হুযুর (ﷺ) মসজিদে নববী নির্মাণের কাজ করছিলেন এবং এর সাথে নিজের জন্য ছোট ছোট হুজরা নির্মাণ করছিলেন। হযরত সাওদা মক্কা থেকে এসে এসব হুজরার একটিতে বসবাস শুরু করলেন। হযরত আয়েশা যার সাথে হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ে তিন বছর পূর্বে মক্কায় হয়ে গিয়েছিল, এখন তিনি ৯/১০ বছর বয়সে উপনীত হয়ে গেলেন। হযরত আবু বকর রাযি. তাঁর অসাধারণ যোগ্যতা ও প্রতিভা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা করে নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন যে, শিক্ষা-দীক্ষা ও চরিত্র গঠনের সর্বোত্তম মাধ্যম হচ্ছে সাহচর্য। এ জন্য তিনি নিজেই হুযুর (ﷺ)-এর কাছে নিবেদন করলেন যে, 'যদি আপনি অসমীচীন মনে না করেন, তাহলে উত্তম এটাই হবে যে, আয়েশা আপনার স্ত্রী ও জীবন সঙ্গিনী হিসাবে আপনার সাথেই থাকবে। হুযুর (ﷺ) এ প্রস্তাব অনুমোদন করলেন এবং তিনিও তাঁর সাথে তাঁর তৈরী করা এক ঘরে অবস্থান গ্রহণ করলেন। প্রবল মত অনুযায়ী এটা ১ম হিজরীর শাওয়াল মাসে হয়েছিল।
এখানে এ বিষয়টি লক্ষণীয় যে, যেহেতু শাওয়াল মাসে কখনো আরবদেশে মহামারী আকার প্লেগ দেখা দিত, এ জন্য এ মাসকে অশুভ মনে করা হত এবং এতে বিয়ে শাদী ইত্যাদি অনুষ্ঠান করা হত না। কিন্তু উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিয়ে মক্কায় শাওয়াল মাসে হয়েছিল। হিজরতের পর যখন মদীনায় এসে হুযুর (ﷺ)-এর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে বসবাস শুরু করলেন, তখন এটাও শাওয়াল মাস ছিল। এভাবে হযরত আয়েশার মুবারক বিয়ে ও স্বামীর ঘরে যাত্রা আরবদের এ অহেতুক ধারণার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দিল।
কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
আযওয়াজে মুতাহহারাতের মধ্যে তারই একমাত্র এ মর্যাদা অর্জিত রয়েছে যে, তিনি বাল্যকালে অর্থাৎ, ৯/১০ বছর বয়স থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাহচর্য, নিকট সান্নিধ্য ও শিক্ষা-দীক্ষা দ্বারা উপকৃত হতে থাকেন। এমনিভাবে আরো কিছু সৌভাগ্য তিনি এককভাবে লাভ করেছিলেন- যেগুলোর আলোচনা তিনি স্বয়ং আল্লাহর শুকরিয়ার সাথে করতেন। তিনি বলতেন আমার একারই এ সৌভাগ্য যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিবাহ বন্ধনে আমার পূর্বেই হুযুর (ﷺ)কে আমার আকৃতি দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ইনি দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে আপনার স্ত্রী হবেন। হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে আমিই একজন যে, তাঁর সাথে বিয়ে হওয়ার আগে অন্য কারো সাথে আমার রেস্তাদারী হয়নি। আমার একার উপরই আল্লাহর এ অনুগ্রহ রয়েছে যে, যখন তিনি আমার সাথে একই লেহাফের নীচে আরাম করতেন, তখন তাঁর নিকট ওহী আসত, অন্য কোন স্ত্রীর এ সৌভাগ্য লাভ হয়নি। এটাও উল্লেখযোগ্য যে, হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বেশী আদরের স্ত্রী ছিলাম। আমি ঐ পিতার কন্যা, যিনি হুযুর (ﷺ)-এর সবচেয়ে প্রিয়পাত্র ছিলেন।
হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে এ মর্যাদাও আমার ভাগ্যে জুটেছে যে, আমার পিতা ও মাতা উভয়ই মুহাজির। তাছাড়া কতিপয় মুনাফিকের ষড়যন্ত্রের ফলে যখন আমার প্রতি একটি নোংরা অপবাধ আরোপ করা হল, তখন আল্লাহ্ তা'আলা আমার নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য কুরআন পাকের আয়াত নাযিল করলেন- যেগুলো কিয়ামত পর্যন্ত ঈমানদারগণ পাঠ করবেন এবং ঐ আয়াতসমূহে নবীয়ে পাকের طيب (এর পাক বিবি طيبة (বলা হয়েছে। তাছাড়া এ প্রসঙ্গের শেষ আয়াতে اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ হয়েছে। অর্থাৎ, আমার জন্য মাগফেরাত ও সম্মানজনক রিযিকের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি কখনো কখনো নিজের এ সৌভাগ্যের কথাও উল্লেখ করতেন যে, হুযূর (ﷺ) জীবনের শেষ পূর্ণ সপ্তাহটি আমার ঘরে অবস্থান করেছেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন যে, জীবনের শেষ দিনটি আমার এখানে থাকার দিন ছিল এবং আল্লাহ্ তা'আলার সবিশেষ অনুগ্রহ আমার উপর এই ছিল যে, এই শেষ দিন আমার মুখের লালা হুযুর (ﷺ)-এর মুখের লালার সাথে তাঁর পেটে গিয়েছিল এবং জীবনের শেষ মুহূর্তে আমিই তাঁকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বসা ছিলাম। আর যে সময় আল্লাহর হুকুমে দেহ থেকে রূহ বিচ্ছিন্ন হয়, ঐ সময় তাঁর কাছে আমিই ছিলাম অথবা মৃত্যুর ফিরিশতা। শেষ কথা এই যে, আমার হুজরাটিই কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর বিশ্রামস্থল হয়েছে। অর্থাৎ, এখানেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াত লাভের চতুর্থ বর্ষে জন্ম গ্রহণ করেন। এ কথা সবারই জানা যে, তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর কন্যা-যিনি সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মাতা হযরত উম্মে রুমানও সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণকারী মহিলাদের মধ্যে একজন ছিলেন। আযওয়াজে মুতাহহারাতের মধ্যে এ মর্যাদা এককভাবে তাঁরই অর্জিত ছিল যে, তাঁর পিতা মাতা উভয়ই তাঁর জন্মের পূর্বেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঈমানের দাওয়াত কবুল করে নিয়েছিলেন। একটু পরেই সম্মানিত পাঠকবৃন্দ জানতে পারবেন যে, স্বপ্নে একাধিকবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে হযরত আয়েশার আকৃতি দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ইনি দুনিয়া ও আখেরাতে আপনার স্ত্রী হবেন। একটু আগে উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাওদা রাযি. এর অবস্থার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর ওফাত হয়, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে বিশেষ ঈমানী সম্পর্কধারী মহিলা খাওলা বিনতে হাকীম তাঁর সাথে বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা করলেন। সেখানে এ প্রসঙ্গে কেবল ঐ অংশটুকুর উল্লেখ করা হয়েছে- যার সম্পর্ক হযরত সাওদার সাথে ছিল। ঐ ক্ষেত্রেই তিনি হযরত আয়েশার ব্যাপারেও নিবেদন করেছিলেন- যার বয়স তখন কেবলমাত্র ৬/৭ বছরের কাছাকাছি ছিল। আর একথা জানা যে, হুযুর (ﷺ)-এর বয়স তখন ৫০ অতিক্রম করে গিয়েছিল। ঐ অবস্থায় খাওলা বিনতে হাকীমের পক্ষ থেকে হযরত আয়েশার সাথে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করার কোন ব্যাখ্যা এ ছাড়া হতে পারে না যে, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে যে ফায়সালা অদৃশ্য জগতে হয়েছিল, এটা কার্যকর করারও মাধ্যম খাওলা বিনতে হাকীমের এ প্রস্তাবকে করা হবে। রেওয়ায়েতের শব্দমালা দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, হুযুর (ﷺ)-এর স্বপ্নের ব্যাপারে খাওলার কোনকিছুই জানা ছিল না। আর বাস্তবতাও এই যে, এ জাতীয় স্বপ্নের কথা কারো কাছে উল্লেখ করা হয় না। যাহোক, এটাই হল যে, খাওলা হুযূর (ﷺ)-এর সামনে হযরত সাওদা বিনতে যামআর সাথে হযরত আয়েশার বিয়েরও প্রস্তাব রাখলেন।
হুযুর (ﷺ) যেভাবে হযরত সাওদার ব্যাপারে বলেছিলেন যে, তুমিই আমার পক্ষ থেকে পয়গাম দাও, তেমনিভাবে হযরত আয়েশার ব্যাপারেও নির্দেশ দিলেন যে, তুমিই তাঁর ব্যাপারে তাঁর পিতা মাতার নিকট প্রস্তাব নিয়ে যাও। কথা অনুযায়ী হযরত খাওলা হযরত আবু বকর সিদ্দীকের বাড়ীতে গেলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে তিনি তখন বাড়ীতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী হযরত আয়েশা রাযি.-এর মা উম্মে রুমান উপস্থিত ছিলেন। হযরত খাওলা তাকে মুবারকবাদ দিয়ে তার কন্যা হযরত আয়েশার জন্য হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করলেন। একটু পরে হযরত আবু বকরও বাড়ীতে এসে গেলেন। খাওলা তাঁর সামনেও তাঁর কন্যা হযরত আয়েশার জন্য হুযূর (ﷺ)-এর বিয়ের প্রস্তাব রাখলেন। হযরত আবু বকর রাযি. বললেন : أو تصلح له وهي بنت اخيه মর্ম এই যে, আয়েশার সাথে কি হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ে হতে পারে? সে যে তাঁর ভাইয়ের কন্যা। (হযরত আবু বকর রাযি. এ কথা এর ভিত্তিতে বলেছিলেন যে, আরবদের মধ্যে যেভাবে প্রথমে পোষ্য পুত্রদের অবস্থান আপন পুত্রদের ন্যায় ছিল, তেমনিভাবে পোষ্য ভাইদের অবস্থান আপন বংশীয় ভাইদের মত হত এবং তার কন্যাকে বিয়ে করা বৈধ মনে করা হত না- যে ভাবে আপন ভাইয়ের কন্যাকে বিয়ে করা জায়েয নয়।)
খাওলা হযরত আবু বকর রাযি.-এর এ কথা হুযুর (ﷺ)-এর নিকট পৌছালে তিনি বললেন: هو أخي في الإسلام وابنته تحل لى মর্ম এই যে, আবু বকর আমার দ্বীনি ভাই, বংশীয় ভাই নয়। এ জন্য তাঁর কন্যা আয়েশাকে বিয়ে করা আমার জন্য আল্লাহর নাযিলকৃত শরী‘আত অনুযায়ী জায়েয ও বৈধ। হ্যাঁ, সে যদি আমার আপন ও বংশীয় ভাই হত, তাহলে তাঁর কন্যাকে বিয়ে করা আমার জন্য জায়েয হত না। খাওলা হযরত আবু বকরকে হুযুর (ﷺ)-এর উত্তর শুনিয়ে দিলেন। তখন স্বাভাবিক কারণেই তিনি অত্যন্ত খুশী হলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে একটি বাধা এই ছিল যে, হযরত আয়েশার বিয়ের কথাবার্তা বাল্যকালেই জুবাইর ইবনে মুতইমের সাথে হয়ে গিয়েছিল এবং এ জাতীয় কথা বার্তা এ সম্পর্কে এক প্রকার চুক্তি মনে করা হত। এজন্য তিনি নৈতিকতার খাতিরে জরুরী মনে করলেন যে, জুবাইরের পিতা মুতইমের সাথে কথা বলে নেওয়া হোক এবং তাকে এ ব্যাপারে সম্মত করে নেওয়া হোক- যাতে আমার পক্ষ থেকে চুক্তি ভঙ্গ না হয়। তাই এ ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য তিনি মুতইমের বাড়ীতে গেলেন।
এখানে এ বিষয়টি লক্ষণীয় যে, এটা নবুওয়াতের ১১তম বর্ষ ছিল- যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও ইসলামের দাওয়াতের প্রতি এবং ইসলাম গ্রহণকারী লোকদের প্রতি মক্কার কাফেরদের শত্রুতা চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল। হযরত আবু বকর মুতইমের বাড়ীতে গিয়ে নিজের কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, আমার কন্যা আয়েশার ব্যাপারে বর্তমানে তোমার মতামত কি? এ সময় মুতইমের স্ত্রী কাছেই বসা ছিল। মুতইম তার স্ত্রীকে সম্বোধন করে বলল, 'তুমি বল, তোমার মতামত কি? সে বলল, 'আমি চাইনা যে, এখন ঐ মেয়ে (হযরত আয়েশা) আমাদের বাড়ীতে আসুক। যদি সে এসে যায়, তাহলে তাঁর সাথে ইসলামের কদমও আমাদের বাড়ীতে এসে যাবে এবং আমরা এ পর্যন্ত আমাদের পূর্বপুরুষের যে ধর্মের উপর চলে এসেছি, এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে যাবে।' মুতইমের স্ত্রীর এ উত্তর শুনে হযরত আবু বকর রাযি. মুতইমকে বললেন, এবার তুমি বল, তোমার সিদ্ধান্ত কি? সে বলল, তুমি তো আমার স্ত্রীর কথা শুনেছ, আমার অভিমতও তাই। হযরত আবু বকর নিশ্চিন্তমনে সেখান থেকে ফিরে আসলেন এবং খাওলাকে বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে ডেকে নিয়ে আস। খাওলা গেলেন এবং সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তশরীফ আনলেন। আর তখনই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল।
এটা শাওয়াল মাস ছিল- যারপর প্রায় তিন বছর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অবস্থান মক্কায় ছিল। আগেই যেমন বলে আশা হয়েছে যে, এই পূর্ণ সময়কাল হযরত সাওদা বিনতে যামআই হুযুর (ﷺ)-এর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে তাঁর সাথে ছিলেন এবং তিনিই সংসারের কাজ আঞ্জাম দিতেন। নবুওয়াত লাভের প্রায় ১৩ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তিনি আল্লাহর হুকুমে মক্কা থেকে হিজরত করে গেলেন। একথা সুবিদিত যে, এ সফর রাতের বেলায় গোপনে হয়েছিল এবং হুযূর (ﷺ) কেবল আবু বকর রাযি.-কে সাথে নিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী পুত্র পরিজন মক্কাতেই থেকে যান। মদীনা শরীফ পৌঁছার পর বসবাসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করার পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. এক ব্যক্তিকে (আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইক) মক্কায় পাঠিয়ে নিজের স্ত্রী উম্মে রুমান এবং উভয় কন্যা হযরত আয়েশা ও তাঁর বড় বোন হযরত আসমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত যায়েদ ইবনে হারিসাকে মক্কায় পাঠিয়ে নিজের পরিবার হযরত সওদা বিনতে যামআ এবং উভয় কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম ও ফাতেমাকে নিয়ে আসলেন। এটা ঐ সময়ের কথা, যখন হুযুর (ﷺ) মসজিদে নববী নির্মাণের কাজ করছিলেন এবং এর সাথে নিজের জন্য ছোট ছোট হুজরা নির্মাণ করছিলেন। হযরত সাওদা মক্কা থেকে এসে এসব হুজরার একটিতে বসবাস শুরু করলেন। হযরত আয়েশা যার সাথে হুযুর (ﷺ)-এর বিয়ে তিন বছর পূর্বে মক্কায় হয়ে গিয়েছিল, এখন তিনি ৯/১০ বছর বয়সে উপনীত হয়ে গেলেন। হযরত আবু বকর রাযি. তাঁর অসাধারণ যোগ্যতা ও প্রতিভা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা করে নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন যে, শিক্ষা-দীক্ষা ও চরিত্র গঠনের সর্বোত্তম মাধ্যম হচ্ছে সাহচর্য। এ জন্য তিনি নিজেই হুযুর (ﷺ)-এর কাছে নিবেদন করলেন যে, 'যদি আপনি অসমীচীন মনে না করেন, তাহলে উত্তম এটাই হবে যে, আয়েশা আপনার স্ত্রী ও জীবন সঙ্গিনী হিসাবে আপনার সাথেই থাকবে। হুযুর (ﷺ) এ প্রস্তাব অনুমোদন করলেন এবং তিনিও তাঁর সাথে তাঁর তৈরী করা এক ঘরে অবস্থান গ্রহণ করলেন। প্রবল মত অনুযায়ী এটা ১ম হিজরীর শাওয়াল মাসে হয়েছিল।
এখানে এ বিষয়টি লক্ষণীয় যে, যেহেতু শাওয়াল মাসে কখনো আরবদেশে মহামারী আকার প্লেগ দেখা দিত, এ জন্য এ মাসকে অশুভ মনে করা হত এবং এতে বিয়ে শাদী ইত্যাদি অনুষ্ঠান করা হত না। কিন্তু উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিয়ে মক্কায় শাওয়াল মাসে হয়েছিল। হিজরতের পর যখন মদীনায় এসে হুযুর (ﷺ)-এর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে বসবাস শুরু করলেন, তখন এটাও শাওয়াল মাস ছিল। এভাবে হযরত আয়েশার মুবারক বিয়ে ও স্বামীর ঘরে যাত্রা আরবদের এ অহেতুক ধারণার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দিল।
কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
আযওয়াজে মুতাহহারাতের মধ্যে তারই একমাত্র এ মর্যাদা অর্জিত রয়েছে যে, তিনি বাল্যকালে অর্থাৎ, ৯/১০ বছর বয়স থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাহচর্য, নিকট সান্নিধ্য ও শিক্ষা-দীক্ষা দ্বারা উপকৃত হতে থাকেন। এমনিভাবে আরো কিছু সৌভাগ্য তিনি এককভাবে লাভ করেছিলেন- যেগুলোর আলোচনা তিনি স্বয়ং আল্লাহর শুকরিয়ার সাথে করতেন। তিনি বলতেন আমার একারই এ সৌভাগ্য যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিবাহ বন্ধনে আমার পূর্বেই হুযুর (ﷺ)কে আমার আকৃতি দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ইনি দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে আপনার স্ত্রী হবেন। হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে আমিই একজন যে, তাঁর সাথে বিয়ে হওয়ার আগে অন্য কারো সাথে আমার রেস্তাদারী হয়নি। আমার একার উপরই আল্লাহর এ অনুগ্রহ রয়েছে যে, যখন তিনি আমার সাথে একই লেহাফের নীচে আরাম করতেন, তখন তাঁর নিকট ওহী আসত, অন্য কোন স্ত্রীর এ সৌভাগ্য লাভ হয়নি। এটাও উল্লেখযোগ্য যে, হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বেশী আদরের স্ত্রী ছিলাম। আমি ঐ পিতার কন্যা, যিনি হুযুর (ﷺ)-এর সবচেয়ে প্রিয়পাত্র ছিলেন।
হুযুর (ﷺ)-এর স্ত্রীদের মধ্যে এ মর্যাদাও আমার ভাগ্যে জুটেছে যে, আমার পিতা ও মাতা উভয়ই মুহাজির। তাছাড়া কতিপয় মুনাফিকের ষড়যন্ত্রের ফলে যখন আমার প্রতি একটি নোংরা অপবাধ আরোপ করা হল, তখন আল্লাহ্ তা'আলা আমার নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য কুরআন পাকের আয়াত নাযিল করলেন- যেগুলো কিয়ামত পর্যন্ত ঈমানদারগণ পাঠ করবেন এবং ঐ আয়াতসমূহে নবীয়ে পাকের طيب (এর পাক বিবি طيبة (বলা হয়েছে। তাছাড়া এ প্রসঙ্গের শেষ আয়াতে اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ হয়েছে। অর্থাৎ, আমার জন্য মাগফেরাত ও সম্মানজনক রিযিকের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি কখনো কখনো নিজের এ সৌভাগ্যের কথাও উল্লেখ করতেন যে, হুযূর (ﷺ) জীবনের শেষ পূর্ণ সপ্তাহটি আমার ঘরে অবস্থান করেছেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন যে, জীবনের শেষ দিনটি আমার এখানে থাকার দিন ছিল এবং আল্লাহ্ তা'আলার সবিশেষ অনুগ্রহ আমার উপর এই ছিল যে, এই শেষ দিন আমার মুখের লালা হুযুর (ﷺ)-এর মুখের লালার সাথে তাঁর পেটে গিয়েছিল এবং জীবনের শেষ মুহূর্তে আমিই তাঁকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বসা ছিলাম। আর যে সময় আল্লাহর হুকুমে দেহ থেকে রূহ বিচ্ছিন্ন হয়, ঐ সময় তাঁর কাছে আমিই ছিলাম অথবা মৃত্যুর ফিরিশতা। শেষ কথা এই যে, আমার হুজরাটিই কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর বিশ্রামস্থল হয়েছে। অর্থাৎ, এখানেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
২২২. হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি. সূত্রে নবী করীম (ﷺ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন: পুরুষদের মধ্যে তো অনেকেই পরাকাষ্ঠা গুণের অধিকারী হয়েছেন। কিন্তু মহিলাদের মধ্যে এ গুণের অধিকারী হয়েছেন কেবল মরিয়াম বিনতে ইমরান ও ফেরাআউনের স্ত্রী আসিয়া। আর নারীজাতির উপর আয়েশার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব ঠিক তেমন, যেমন সকল খাদ্য সামগ্রীর মধ্যে সারীদের শ্রেষ্ঠত্ব। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ أَبِي مُوسَى عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرَةٌ وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَرْيَمَ بِنْتِ عِمْرَانَ وَآسِيَةَ امْرَأَةِ فِرْعَوْنَ وَفَضْلَ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ. (رواه البخارى ومسلم)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ কথা সুস্পষ্ট যে, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম- যাদের সংখ্যা কোন কোন রেওয়ায়াত অনুযায়ী ১ লাখেরও বেশী, তাঁদের সবাই পরাকাষ্ঠা গুণের শীর্ষে পৌছেছিলেন। তেমনিভাবে তাঁদের সহচর ও খলীফাগণ- যাদের সংখ্যা আল্লাহই জানেন, তাঁরাও সবাই কামেল ও মানবীয় গুণাবলীতে শীর্ষে উন্নীত ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্টি নারীজাতির মধ্য থেকে এ হাদীসে কেবল হযরত ঈসা (আ.)-এর মা মারয়াম বিনতে ইমরান ও ফেরআউনের স্ত্রী আসিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, কেবল তাঁরাই জ্ঞান গরিমার শীর্ষে পৌছতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ দু'জনের এ অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে কুরআনে কারীমের সূরা তাহরীমের শেষ দিকে তাঁদের ঈমানী কর্মকাণ্ডকে সমস্ত মু'মিনদের জন্য অনুসরণ যোগ্য ও দৃষ্টান্ত হিসাবে পেশ করা হয়েছে।
কোন কোন হাদীস ব্যাখ্যাতা লিখেছেন যে, হুযুর (ﷺ)-এর এ বক্তব্যের সম্পর্ক কেবল পূর্ববর্তী উম্মতের সাথে। তাই এ হাদীস থেকে ফলাফল বের করা যাবে না যে, তাঁর উম্মতের কোন নারী পরাকাষ্ঠা গুণে উত্তীর্ণ হয়নি।
একটু আগেই হযরত খাদীজা রাযি.-এর মর্যাদা ও ফযীলত বর্ণনায় এ হাদীসে অতিক্রান্ত হয়েছে:
خَيْرُ نِسَائِهَا مَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَخَيْرُ نِسَائِهَا خَدِيجَةُ بِنْتُ خُوَيْلِدٍ
(অর্থাৎ, পৃথিবীর সমস্ত নারীর মধ্যে উত্তম ছিলেন মরিয়াম বিনতে ইমরান ও খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ।) স্বয়ং ব্যাখ্যাধীন এ হাদীসের শেষ দিকে বলা হয়েছে:
وَفَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ
যার অর্থ এই যে, আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আয়েশা রাযি.-কে নারীকূলের উপর এমন শ্রেষ্ঠত্ব ও ফযীলত দান করেছেন- যেমন সকল খাদ্য সামগ্রীর উপর সারীদের ফযীলত। বাস্তব কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর যুগে স্বাদ ও উপকারিতায় সকল খাবার সামগ্রীর উপর সারীদের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল। সারীদের ব্যাপারে অভিধান ও হাদীস গ্রন্থসমূহে যা লিখা হয়েছে, এর দ্বারা এর প্রকৃত স্বরূপ বুঝে আসে না। এ অধম সংকলকের হযরত মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানীর দস্তরখানে সারীদ খাওয়ার বার বার সুযোগ হয়েছে। এ অধমের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিও এটাই যে, এটা স্বাদে, হজমে ও উপকারিতায় আমাদের যুগের ঐসব খাবারের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম, যেগুলোকে সাধারণত উত্তম মনে করা হয়।
কেউ কেউ এ হাদীসের ভিত্তিতে এ মত প্রকাশ করেছেন যে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর পৃথিবীর সমস্ত নারীজাতির উপর অর্থাৎ, পূর্ববর্তী উম্মত ও উম্মতে মুহাম্মাদীর নারীদের উপরও মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। কিন্তু এসব হাদীস নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে- যেগুলোর মধ্যে এ জাতীয় কোন মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে- যুক্তিযুক্ত ও বিশুদ্ধ মত এটাই বুঝা যায় যে, এ মর্যাদা সামগ্রিক ক্ষেত্রে নয়; বরং কোন বিশেষ দিক বিবেচনায় হয়ে থাকে। যেমন, হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.-এর শরী‘আতের আহকামে শরী‘আতের ইলম, ফেকাহ জ্ঞান ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের কারণে সমস্ত নারীকূলের উপর মর্যাদা ও প্রাধান্য অর্জিত রয়েছে। এ দিকে হযরত খাদীজা রাযি.-এর ঐসব বৈশিষ্ট্যের কারণে- যা তাঁর গুণাবলীর আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সকল নারীর উপর মর্যাদা রাখেন। তেমনিভাবে হযরত ফাতেমা রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর আদরের দুলালী হওয়ার সাথে তাঁর ঐসবগুণ গরিমার কারণে যেগুলো একটু সামনে গিয়ে পাঠকগণ পড়বেন, এর কারণে তাঁর যে অনন্য মর্যাদা অর্জিত রয়েছে, নিঃসন্দেহে এটা কেবল তারই অংশ।
এ হাদীসটি হযরত আবু মুসা আশআরীর বর্ণনা। বুখারী শরীফেই হযরত আনাস রাযি.-এর বর্ণনা হাদীসটির কেবল শেষ অংশ
فَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ
উল্লেখ করা হয়েছে।
কোন কোন হাদীস ব্যাখ্যাতা লিখেছেন যে, হুযুর (ﷺ)-এর এ বক্তব্যের সম্পর্ক কেবল পূর্ববর্তী উম্মতের সাথে। তাই এ হাদীস থেকে ফলাফল বের করা যাবে না যে, তাঁর উম্মতের কোন নারী পরাকাষ্ঠা গুণে উত্তীর্ণ হয়নি।
একটু আগেই হযরত খাদীজা রাযি.-এর মর্যাদা ও ফযীলত বর্ণনায় এ হাদীসে অতিক্রান্ত হয়েছে:
خَيْرُ نِسَائِهَا مَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَخَيْرُ نِسَائِهَا خَدِيجَةُ بِنْتُ خُوَيْلِدٍ
(অর্থাৎ, পৃথিবীর সমস্ত নারীর মধ্যে উত্তম ছিলেন মরিয়াম বিনতে ইমরান ও খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ।) স্বয়ং ব্যাখ্যাধীন এ হাদীসের শেষ দিকে বলা হয়েছে:
وَفَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ
যার অর্থ এই যে, আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আয়েশা রাযি.-কে নারীকূলের উপর এমন শ্রেষ্ঠত্ব ও ফযীলত দান করেছেন- যেমন সকল খাদ্য সামগ্রীর উপর সারীদের ফযীলত। বাস্তব কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর যুগে স্বাদ ও উপকারিতায় সকল খাবার সামগ্রীর উপর সারীদের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল। সারীদের ব্যাপারে অভিধান ও হাদীস গ্রন্থসমূহে যা লিখা হয়েছে, এর দ্বারা এর প্রকৃত স্বরূপ বুঝে আসে না। এ অধম সংকলকের হযরত মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানীর দস্তরখানে সারীদ খাওয়ার বার বার সুযোগ হয়েছে। এ অধমের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিও এটাই যে, এটা স্বাদে, হজমে ও উপকারিতায় আমাদের যুগের ঐসব খাবারের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম, যেগুলোকে সাধারণত উত্তম মনে করা হয়।
কেউ কেউ এ হাদীসের ভিত্তিতে এ মত প্রকাশ করেছেন যে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর পৃথিবীর সমস্ত নারীজাতির উপর অর্থাৎ, পূর্ববর্তী উম্মত ও উম্মতে মুহাম্মাদীর নারীদের উপরও মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। কিন্তু এসব হাদীস নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে- যেগুলোর মধ্যে এ জাতীয় কোন মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে- যুক্তিযুক্ত ও বিশুদ্ধ মত এটাই বুঝা যায় যে, এ মর্যাদা সামগ্রিক ক্ষেত্রে নয়; বরং কোন বিশেষ দিক বিবেচনায় হয়ে থাকে। যেমন, হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.-এর শরী‘আতের আহকামে শরী‘আতের ইলম, ফেকাহ জ্ঞান ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের কারণে সমস্ত নারীকূলের উপর মর্যাদা ও প্রাধান্য অর্জিত রয়েছে। এ দিকে হযরত খাদীজা রাযি.-এর ঐসব বৈশিষ্ট্যের কারণে- যা তাঁর গুণাবলীর আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সকল নারীর উপর মর্যাদা রাখেন। তেমনিভাবে হযরত ফাতেমা রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর আদরের দুলালী হওয়ার সাথে তাঁর ঐসবগুণ গরিমার কারণে যেগুলো একটু সামনে গিয়ে পাঠকগণ পড়বেন, এর কারণে তাঁর যে অনন্য মর্যাদা অর্জিত রয়েছে, নিঃসন্দেহে এটা কেবল তারই অংশ।
এ হাদীসটি হযরত আবু মুসা আশআরীর বর্ণনা। বুখারী শরীফেই হযরত আনাস রাযি.-এর বর্ণনা হাদীসটির কেবল শেষ অংশ
فَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ
উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)