প্রবন্ধ
রবের সান্নিধ্যের সন্ধানে সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৩৪৪
০
ভূমিকা:
মানবজীবনের প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার সম্পদ, সম্মান কিংবা খ্যাতি অর্জনে নয়; বরং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভেই নিহিত। একজন মুমিনের হৃদয়ের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত। কীভাবে সে তার রবের আরও নিকটবর্তী হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاسْجُدْ وَاقْتَرِبْ
“তুমি সিজদা করো এবং নৈকট্য লাভ করো।” সূরা আল-‘আলাক, আয়াত নং: ১৯
সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.) ছিলেন এই আকাঙ্ক্ষার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁদের কাছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য ছিল দুনিয়ার সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাঁরা ফরয ইবাদত পালনের পাশাপাশি নফল নামায, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, দু‘আ, তাওবা, জিহাদ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে নিজেদের রবের আরও নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা করতেন।
রবের সান্নিধ্য অর্জনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মুহাব্বত
আল্লাহ তা‘আলার অসীম সান্নিধ্য ও ভালোবাসা অর্জনের অপরিহার্য সোপান হলো তাঁর প্রিয় হাবীব রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিখাদ মহব্বত ও ভালোবাসা। রবের সন্তুষ্টি এবং রাসূলের ভালোবাসা একে অপরের সাথে এমনভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, নবীজির আনুগত্য ও অনুসরণ ছাড়া আল্লাহর প্রকৃত নৈকট্য লাভ করা অসম্ভব। বান্দা যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে নিজের জান-মাল ও পৃথিবী জীবনের যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি ভালোবেসে তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে, তখন স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা সেই বান্দাকে ভালোবাসেন এবং তাঁর অতি নিকটবর্তী করে নেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা এই সত্যটি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে ইরশাদ করেন:
"قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ"
বলুন, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং: ৩১)
হযরত রাবী‘আ ইবনে কা‘ব আল-আসলামী (রাযি.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একান্ত সেবাযত্নকারী সাহাবীদের একজন।
একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর এই সেবায় খুশি হয়ে তাঁকে বললেন, "হে রাবী‘আ! আমার কাছে কিছু চাও, আমি তোমাকে দেবো।" সাহাবীরা সাধারণত এ ধরনের সুযোগে দুনিয়াবি কোনো সম্পদ, খাবার বা বাহন চাইতেন। কিন্তু পার্থিব কোনো মোহের প্রতি তাঁর কোনো লোভ ছিল না; তাঁর অন্তরে ছিল কেবল আখিরাত ও রবের সান্নিধ্য লাভের তীব্র ব্যাকুলতা। তাই তিনি একটুও না ভেবে সঙ্গে সঙ্গে নিবেদন করলেন,
"أَسْأَلُكَ مُرَافَقَتَكَ فِي الْجَنَّةِ"
ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি জান্নাতে আপনার সঙ্গী হতে চাই।
এমন সুউচ্চ ও মহৎ চাওয়ায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কিছুটা অবাক হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "এ ছাড়া কি অন্য কিছু চাও না?" রাবী‘আ (রাযি.) অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জবাব দিলেন, "না ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কেবল জান্নাতে আপনার সান্নিধ্যই চাই।"
তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর এই হিমালয়সম হিম্মত দেখে তাঁকে জান্নাত ও নিজের সান্নিধ্য অর্জনের মূল চাবিকাঠি শিখিয়ে দিয়ে বললেন:
«فَأَعِنِّي عَلَى نَفْسِكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ»
“তাহলে বেশি বেশি সেজদার মাধ্যমে (নফল সালাত আদায় করে) তোমার নিজের ওপর আমাকে সহযোগিতা করো।”
এই ঘটনার শিক্ষা: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এই অমূল্য নির্দেশ পাওয়ার পর হযরত রাবী‘আ (রাযি.) তাঁর জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নেন অধিক পরিমাণে নফল সালাত আদায় করা এবং সেজদায় পড়ে থাকা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, কাঙ্ক্ষিত মাকাম ও রবের চূড়ান্ত সান্নিধ্য শুধু মুখের কথায় অর্জন করা যায় না, বরং এর জন্য রাতের নীরবতায় কপাল মাটিতে লুটিয়ে দিয়ে বেশি বেশি সেজদা করতে হয়। সেজদাই হলো বান্দার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে তাকে রবের অতি নিকটে পৌঁছে দেওয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
রবের সান্নিধ্য লাভের পরম আকুলতা
আল্লাহ তা‘আলার সান্নিধ্য বা কুরব অর্জনই হলো মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সফলতা ও অন্তরের চূড়ান্ত প্রশান্তি।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا * وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ۚ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ"
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তবে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট। সূরা আত-তালাক, আয়াত নং: ৩
এই পরম সত্যকে যাঁরা নিজেদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এর পবিত্র সাহাবায়ে কেরাম। দুনিয়াবি মোহ, ভোগ-বিলাস ও মোহাচ্ছন্নতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে তাঁরা নিজেদের জীবনকে সঁপে দিয়েছিলেন একমাত্র রবের সন্তুষ্টি অর্জনে। তাঁদের ইবাদত, জিকির, তাহাজ্জুদ, কান্না এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ছিল আল্লাহর নৈকট্য লাভের অনন্য মাধ্যম।
ঈমানের অনির্বাণ শিখা ও দুনিয়াবি মোহমুক্তি
সাহাবায়ে কেরামের জীবনে রবের সান্নিধ্য অর্জনের প্রথম সোপান ছিল নিখাদ ও অবিচল ঈমান। ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথেই তাঁরা পার্থিব সব প্রাপ্তিকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শুরু করেন। মক্কার মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকায় হযরত বিলাল (রাযি.) কিংবা সুমাইয়া (রাযি.)-এর ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হলেও তাঁদের মুখ থেকে কেবল উচ্চারিত হতো, "আহাদ, আহাদ" (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক)।
মুসা'আব ইবনে উমাইর (রাযি.) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বিলাসী ও আদুরে যুবক। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর মা তাঁকে সব সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেন এবং অট্টালিকা থেকে বের করে দেন। অথচ রবের সান্নিধ্যের টানে তিনি সেই রাজকীয় জীবন ত্যাগ করে এমন এক সরল জীবন বেছে নেন যে, মৃত্যুর পর তাঁর কাফন হিসেবে পুরো শরীর ঢাকার মতো পর্যাপ্ত কাপড়ও ছিল না!
এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে ইরশাদ করেন:
"رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِم تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ"
এমন কিছু মানুষ, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, সালাত কায়েম করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিমুখ করে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন উল্টে যাবে বক্ষ ও দৃষ্টিসমূহ। সূরা আন-নূর, আয়াত নং: ৩৭
পার্থিব কোনো কষ্ট বা লোভ তাঁদের অন্তর থেকে আল্লাহর মহব্বত দূর করতে পারেনি। আল্লাহর সান্নিধ্যের মোহে তাঁরা মালের মোহ, গোত্রীয় অহংকার এবং জানমালের মায়া হাসিমুখে ত্যাগ করেছিলেন।
ইখলাস মাধ্যমে রবের নৈকট্য অর্জন:
আমলকে রবের জন্য একনিষ্ঠ করা: আল্লাহ তা‘আলার সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সমস্ত ইবাদত ও আমলকে কেবল এক আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করা, যাকে ইসলামি পরিভাষায় 'ইখলাস' বলা হয়। কোনো আমলের বাহ্যিক সৌন্দর্য বা প্রাচুর্য ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না, যতক্ষণ না তা কেবল তাঁরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়। লোক দেখানো মানসিকতা বা দুনিয়াবি কোনো প্রাপ্তির আশা ইবাদতকে ধ্বংস করে দেয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইখলাসের গুরুত্ব ও নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন:
"وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ"
তাদেরকে কেবল এই আদেশই করা হয়েছিল যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে, আনুগত্যকে একনিষ্ঠভাবে তাঁরই জন্য খালেস রাখে। সূরা আল-বাইয়িনাহ, আয়াত নং: ৫
সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের প্রতিটি আমল, দান-সদকা, জিহাদ ও ইবাদতকে নিখাদ ইখলাসের আলোয় উদ্ভাসিত করেছিলেন। রবের দরবারে কবুল হওয়ার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে তাঁরা ইখলাসকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন। আমলকে রবের জন্য একনিষ্ঠ করার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত নিচে তুলে ধরা হলো:
গোপন দান ও প্রচারবিমুখতার অনন্য দৃষ্টান্ত:
সাহাবী হযরত আবূ বকর সিদ্দিক (রাযি.) কিংবা হযরত আলী (রাযি.) রাতের আঁধারে গরিব-দুঃখীদের ঘরে ঘরে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দিতেন, যাতে কেউ তাঁদের চিনতে না পারে। তাঁরা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে কেবল রবের সন্তুষ্টির জন্যই দান করতেন। বিশেষ করে হযরত জয়নাল আবেদীন (রহ.)-এর যুগে মানুষ জানতে পেরেছিল যে মদীনার অসংখ্য দরিদ্র পরিবারে রাতের আঁধারে খাবার দিয়ে আসতেন স্বয়ং তিনি, যা তিনি আমৃত্যু কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলেন। আমলকে মানুষের প্রশংসা থেকে বাঁচানোর এই তাড়না ছিল ইখলাসের চরম পরাকাষ্ঠা।
ইখলাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন- “ইখলাসে নাজাত, রিয়ায় ধ্বংস”
ফরয ইবাদতের মাধ্যমে রবের নৈকট্য অর্জন
আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রথম ও প্রধান পথ হলো তাঁর ফরয বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করা।
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ
আমার বান্দা যে সকল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো, আমি তার উপর যা ফরয করেছি।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন, বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে তিনি তাকে ভালোবাসেন। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬৫০২
সাহাবায়ে কেরাম এই মূলনীতিটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁরা ফরয নামায, রোযা, জাকাত ও অন্যান্য ফরজ বিধানগুলো পালনে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও যত্নশীল। ফরযের ওপর অবিচল থেকেই তাঁরা নফল ইবাদতের মাধ্যমে রবের সর্বোচ্চ সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন।
রবের সাথে নিভৃত কথোপকথন
রাতের ইবাদত ও চোখের পানি: সাহাবায়ে কেরাম দিনের আলোয় যেমন বীর মুজাহিদ বা সমাজ সংস্কারক ছিলেন, তেমনি রাতের অন্ধকারে তাঁরা হয়ে উঠতেন একান্তে রবের দরবারে কান্নাকাটিকারী পরম বিনম্র বান্দা। দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতের গভীরে তাঁরা সেজদায় লুটিয়ে পড়তেন। এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করতেন।
হযরত সা’দ বিন মুআয (রাযি.) কিংবা হযরত আবূ দারদা (রাযি.) রাতের গভীরে কান্নাকাটি করতে করতে বেহুঁশ হয়ে যেতেন। হযরত আবূ বকর (রাযি.) তাহাজ্জুদের নামাজে কুরআন তেলাওয়াত করার সময় এতটাই বিগলিত হতেন যে, তাঁর চোখের পানিতে চারপাশ ভিজে যেত এবং তাঁর কান্না থামাতে মুসরিকরাও মুগ্ধ ও বিচলিত হয়ে পড়ত।
পবিত্র কুরআনে তাঁদের এই ইবাদতের প্রশংসা করে বলা হয়েছে:
"كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ * وَبِالْأَسْهَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ"
তারা রাতের অল্প অংশই ঘুমিয়ে কাটাতেন এবং শেষ রাতে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত নং: ১৭ - ১৮
হাদীসে এসেছে, নবী কারীম (ﷺ) বলেছেন:
"أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ"
বান্দা তার রবের সবচেয়ে কাছাকাছি চলে যায় যখন সে সেজদারত থাকে। সুতরাং তোমরা তখন বেশি বেশি দু‘আ করো। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৪৮২
রবের সান্নিধ্যের এক পলক অনুভূতির জন্য তাঁরা নিজ নিজ চোখের পানিতে জায়নামাজ ভিজিয়ে ফেলতেন। আল্লাহর ভয় ও তাঁর ভালোবাসার সংমিশ্রণে তাঁদের অন্তর সবসময় সজীব থাকত।
কুরআন তিলাওয়াত ও গভীর অনুধাবন: রবের সাথে আত্মিক সংযোগ
আল্লাহ তা‘আলার সাথে বান্দার সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যম হলো তাঁর পবিত্র কালাম তথা আল-কুরআন। নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এর গভীরে গিয়ে তা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা। এটি হলো রবের সাথে আত্মিক সংযোগকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করে।
কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:
"أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا"
তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালাবদ্ধ রয়েছে? সূরা মুহাম্মদ, আয়াত নং: ২৪
সাহাবায়ে কেরাম যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন, তখন তাঁরা কেবল শব্দ উচ্চারণ করেই ক্ষান্ত হতেন না, বরং এর অর্থের গভীরে প্রবেশ করতেন।
হযরত উসমান (রাযি.) ও হযরত ইবনে মাসউদ (রাযি.) যখন রাতের আঁধারে কুরআন তিলাওয়াত করতেন, তখন কুরআনের আয়াতগুলোর ভয় ও ভালোবাসার তাড়নায় তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়তেন। বিশেষ করে হযরত আবূ বকর (রাযি.) যখন নামাযে দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন, তখন কাফিররাও তাঁর সুমধুর তিলাওয়াত ও কান্নার আওয়াজ শুনে মুগ্ধ ও বিচলিত হয়ে পড়ত। কুরআনের প্রতিটি আয়াতকে তাঁরা নিজেদের জীবনের নির্দেশিকা হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করেছেন।
মানবসেবা ও সৃষ্টির প্রতি দয়া: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অসিলা
কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগিই নয়, বরং দুস্থ, অসহায় ও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সৃষ্টির কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা রবের সান্নিধ্য লাভের অন্যতম বড় একটি মাধ্যম। বান্দার প্রতি দয়া প্রদর্শন করলে আসমানের মালিক বান্দার প্রতি দয়া করেন।
হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
"الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَٰنُ، ارْحَموا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ"
দয়াকারীদের প্রতি পরম দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। সুতরাং তোমরা জমিনবাসীদের প্রতি দয়া করো, তবে আসমানের মালিক তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ১৯২৪
সাহাবায়ে কেরামের জীবনে মানবসেবা ও আত্মত্যাগের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত রয়েছে। হিজরতের পর মদীনার আনসার সাহাবীগণ তাঁদের নিজেদের বাড়িঘর ও সমস্ত সম্পত্তি মুহাজির ভাইদের সাথে সমানভাবে ভাগ করে নিয়েছিলেন, যার অতুলনীয় স্বীকৃতি পাওয়া যায় সূরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে।
খলিফা হযরত ওমর (রাযি.) রাতের বেলা পিঠে আহারের বস্তা বয়ে নিজেই অনাহারী মানুষের দ্বারে দ্বারে খাবার পৌঁছে দিতেন। এছাড়া হযরত আবূ বকর সিদ্দিক (রাযি.) নিয়মিত এক অন্ধ বৃদ্ধার ঘরে গিয়ে তাঁর ঘরের কাজ করে দিয়ে আসতেন, যা খিলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার পরেও তিনি গোপনে চালিয়ে গেছেন। সৃষ্টির প্রতি এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই তাঁদেরকে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় পাত্রে পরিণত করেছিল।
তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধি: সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব
আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের আরেকটি প্রধান হাতিয়ার ছিল সর্বোচ্চ তাকওয়া বা খোদাভীতি। সাহাবীগণ প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করতেন যে, রব তাঁদের দেখছেন।
হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) খিলাফতের দায়িত্ব পালনকালে রাতের আঁধারে মদীনার অলিগলিতে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখতে। একবার এক দরিদ্র নারীর চুলায় খাবার না থাকায় তাঁর ছোট বাচ্চারা কাঁদছিল, তা দেখে তিনি নিজের কাঁধে আহারের বস্তা বয়ে এনে নিজ হাতে রান্না করে খাইয়েছিলেন। রবের সামনে হিসাব দিতে হবে; এই তীব্র খোদাভীতিই তাঁকে এমন দায়িত্বশীল করে তুলেছিল।
কুরআনে তাকওয়ার প্রতিদান সম্পর্কে বলা হয়েছে:
"وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ"
আর যে কেউ তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত। সূরা আর-রহমান, আয়াত নং: ৪৬
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি.) অতিরিক্ত আত্মশুদ্ধি ও খোদাভীতির কারণে প্রায়ই নিজের জিব ধরে বলতেন, "এই অঙ্গটিই আমাকে বিভিন্ন বিপদে ফেলে দেয়।" ছোট থেকে ছোট গুনা বা তিলপরিমাণ অবহেলা থেকেও তাঁরা বেঁচে থাকতেন। রবের অসন্তুষ্টির ভয়ে তাঁদের বুক সবসময় কেঁপে উঠত, যা তাঁদেরকে জান্নাতি চরিত্রের মূর্ত প্রতীক বানিয়েছিল।
আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল ও সন্তুষ্টি
রবের সান্নিধ্য অর্জনের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় বিপদে-আপদে তাঁদের অটল তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর আস্থার মধ্যে। এবং তার সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা।
হিজরতের সময় গুহার মধ্যে কাফিররা যখন মাথার ওপর এসে দাঁড়িয়েছিল, তখন হযরত আবূ বকর (রাযি.) কিছুটা চিন্তিত হলে নবীজি (ﷺ) পরম শান্তিতে তাঁকে বলেছিলেন,
"لاَ تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا"
দুশ্চিন্তা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। এই অগাধ তাওয়াক্কুল ও বিশ্বাসের কারণেই চরম বিপদেও তাঁদের মন শান্ত থাকত। সূরা আত তাওবাহ, আয়াত নং: ৪০
ওহুদ ও খন্দকের মতো চরম সংকটেও তাঁদের ঈমান ছিল অটুট
রবের সান্নিধ্য অর্জনের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় বিপদ-আপদে সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)-এর অটল তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর ওপর অগাধ আস্থার মধ্যে। উহুদের ময়দানে বিপর্যয় নেমে আসার পরও তাঁরা ঈমান হারাননি। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আবারও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে খন্দকের কঠিন সময়ে চারদিক থেকে শত্রুর ভয়াবহ চাপ ও অভাব-অনটন সত্ত্বেও তাঁদের অন্তর আল্লাহর প্রতি আস্থায় অটুট ছিল। পবিত্র কুরআনে তাঁদের সেই ঈমানের প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَمَّا رَأَى الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَٰذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلَّا إِيمَانًا وَتَسْلِيمًا
মুমিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল, তখন তারা বলল, ‘এটাই তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’ আর এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণই বৃদ্ধি পেল। সূরা আল আহ্যাব, আয়াত নং: ২২
আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের মানসিক দৃঢ়তার প্রশংসা করে ইরশাদ করেন:
"الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ"
যাদেরকে লোকেরা বলেছিল, ‘নিশ্চয়ই মানুষেরা আপনাদের বিরুদ্ধে দল গঠন করেছে, সুতরাং তাদেরকে ভয় করুন।’ তখন এটি তাদের ইমান বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, ‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না চমৎকার কর্মবিধাতা!’ সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং: ১৭৩
তাঁরা বিশ্বাস করতেন, যা কিছু হয় রবের ফায়সালা অনুযায়ীই হয়। তাই তাকদীরের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওপর তাঁরা পূর্ণ সন্তুষ্টচিত্তে জীবন অতিবাহিত করতেন। কোনো প্রাপ্তিতে তাঁরা অহংকার করতেন না এবং কোনো ক্ষতিতে ভেঙে পড়তেন না; কারণ তাঁদের কাছে রবের সন্তুষ্টিই ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
বর্তমান সমাজের জন্য শিক্ষা
সাহাবায়ে কেরামের জীবন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, রবের সান্নিধ্য কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, বরং এটি আসে ইবাদতের ইখলাস, অন্তরের পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ ভালোবাসার মাধ্যমে।
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন:
إِذَا تَقَرَّبَ العَبْدُ إِلَيَّ شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا، وَإِذَا تَقَرَّبَ مِنِّي ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ مِنْهُ بَاعًا، وَإِذَا أَتَانِي مَشْيًا أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً
আমার বান্দা যখন আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী হয়, আমি তখন তার দিকে এক হাত পরিমাণ নিকটবর্তী হই। আর সে যখন আমার দিকে এক হাত পরিমাণ নিকটবর্তী হয়, আমি তখন তার দিকে দু’হাত পরিমাণ নিকটবর্তী হই। সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৭৫৩৬
এ হাদীসের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে তাঁর দিকে ফিরে আসার জন্য গভীরভাবে উৎসাহিত করেছেন। বান্দা যত সামান্য পদক্ষেপেই হোক, আন্তরিকতার সঙ্গে রবের দিকে অগ্রসর হলে আল্লাহ তাআলা তাঁর রহমত ও অনুগ্রহ নিয়ে তার প্রতি আরও অধিক অগ্রসর হন। তাই রবের সান্নিধ্য অর্জনের পথ শুরু হয় বান্দার পক্ষ থেকে একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে ফিরে আসার মাধ্যমে।
উপসংহার:
আজকের বস্তুবাদী ও যান্ত্রিক সমাজে আমরা যখন দুনিয়াবি প্রাপ্তির পেছনে অবিরাম ছুটে চলেছি, তখন সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)-এর রূহানি জীবন ও তাঁদের বাস্তব দৃষ্টান্ত আমাদের আত্মোপলব্ধির দুয়ার খুলে দেয়। পার্থিব ব্যস্ততার মাঝেও রবের যিকির, রাতের নির্জনতায় অশ্রুসিক্ত মুনাজাত এবং তাঁর প্রতি অবিচল আস্থা—এসবই পারে আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে এবং রবের সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টির সুশীতল ছায়ায় পৌঁছে দিতে।
পরিশেষে বলা যায়, রবের সান্নিধ্য অর্জনের এই অনুপম পথ আমাদের যান্ত্রিক ও বস্তুবাদী জীবনকেও প্রশান্তি ও বরকতে ভরিয়ে দিতে পারে। প্রয়োজন শুধু অহংকার ও আত্মম্ভরিতা পরিত্যাগ করে বিনম্র হৃদয়ে একান্তভাবে তাঁর দরবারে আত্মসমর্পণ করা। রবের নৈকট্য কোনো দুর্লভ বিষয় নয়; বরং খাঁটি নিয়ত, একনিষ্ঠ ইবাদত, অবিচল তাওয়াক্কুল ও আন্তরিক দু‘আই হলো সেই সেতু, যা বান্দাকে তার রবের সান্নিধ্যের দিকে এগিয়ে নেয়।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাহাবায়ে কেরামের মতো তাঁর অসীম সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করার তৌফিক দান করুন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
টুপি পরিধান করার কোন প্রমাণ কি হাদীস বা আছারে সাহাবায় নেই?
টুপি মুসলিম উম্মাহর ‘ শিআর ’ জাতীয় নিদর্শন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে ...
হযরত উসমান রাঃ সম্পর্কে উত্থিত আপত্তির স্বরূপ সন্ধানে
হযরত উসমান রাঃ এর উপর স্বজনপ্রীতিমূলক আপত্তি সমূহের তাহকিকঃ হযরত উসমান রাঃ সম্পর্কে স্বজনপ্রীতিমূলক ...
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্বামী-স্ত্রীর সুখময় দাম্পত্য
(আম্মাজান আয়েশা রা.এর পবিত্রতম বিবাহ, পারিবারিক জীবন , রাসূলের বয়স পার্থক্য ও বিরুদ্ধবাদীদের আপত্ত...
যুবসমাজকে গড়ে তুলতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতি
ভূমিকা যুবসমাজ একটি জাতির প্রাণশক্তি, ভবিষ্যতের নির্মাতা এবং সভ্যতার অগ্রযাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি।...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন