প্রবন্ধ
বিশ্বনবী ﷺ-এর আগমন ও মানবতার নবজাগরণ
১০ আগস্ট, ২০২৬
৭৬৮
০
ভুমিকা
পৃথিবী যখন 'আইয়ামে জাহেলিয়াত' বা অজ্ঞতার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত, চারদিকে যখন অনাচার, জুলুম, কুসংস্কার আর নৈতিক অবক্ষয়ের রাজত্ব—মানবতা যখন দিশেহারা হয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই মহান আল্লাহ মানবজাতিকে আলোর পথ দেখাতে প্রেরণ করেন সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-কে। তাঁর এই পবিত্র আগমন পৃথিবীর ইতিহাসের কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল সমগ্র মানবজাতি ও বিশ্বজগতের জন্য এক যুগান্তকারী মহা-অনুগ্রহ বা 'রহমাতুল্লিল আলামিন' হিসেবে স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ উপহার।
মানুষ যখন তাদের প্রকৃত স্রষ্টাকে ভুলে শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত, সমাজে যখন ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিক মূল্যবোধের চরম আকাল, তখন তিনি নিয়ে এলেন তাওহিদের অমিয় বাণী 'لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ'। তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য কেবল একটি নির্দিষ্ট গোত্র বা সময়কে পথ দেখানো ছিল না; বরং মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি, উত্তম চরিত্রের বিকাশ, ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি শিক্ষা, বৈষম্যহীন ইনসাফভিত্তিক সমাজ কায়েম এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার এক পূর্ণাঙ্গ ও শাশ্বত জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর সুদীর্ঘ নবুয়তি মিশনের মূল লক্ষ্য।
রাসূল (ﷺ)-এর এই মহান আগমন মানব ইতিহাসের গতিপথকে কীভাবে চিরতরে বদলে দিয়েছিল এবং মানবজাতির মুক্তির দূত হিসেবে পৃথিবীতে তাঁর আগমনের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো কী ছিল—কুরআন, হাদীস ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলির আলোকে তা নিয়ে পর্যায়ক্রমে কিছু আলোচনা করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ্।
১. তাওহীদের আলো: জাহিলিয়াত মুক্তির পথ
পৃথিবী যখন 'আইয়ামে জাহেলিয়াত' বা অজ্ঞতার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত, চারদিকে যখন অনাচার, জুলুম, কুসংস্কার আর নৈতিক অবক্ষয়ের রাজত্ব—মানবতা যখন সম্পূর্ণ দিকভ্রান্ত, ঠিক তখনই মহান আল্লাহ মানবজাতিকে আলোর পথ দেখাতে প্রেরণ করেন সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-কে।
মানুষ যখন তাদের প্রকৃত স্রষ্টাকে ভুলে চন্দ্র, সূর্য ও নিজ হাতে গড়া মূর্তির পূজায় লিপ্ত, তখন সকলের শান্তি ও মুক্তির দূত হিসেবে তাঁর এই পবিত্র আগমন ঘটে। এটি কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে যুগান্তকারী ও আশীর্বাদপূর্ণ ঘটনা এবং সমগ্র সৃষ্টির জন্য এক মহা-অনুগ্রহ। তিনি এসে পৃথিবীতে ঘোষণা করলেন তাওহিদের অমিয় বাণী— 'لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ' (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই)।
তাঁর আগমনের সবচেয়ে বড় ও প্রধান কারণ ছিল মানুষকে সব ধরনের শিরক ও মিথ্যা উপাসনার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক ও অদ্বিতীয় রবের পরিচয়ের সাথে যুক্ত করা এবং স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করা। এর পাশাপাশি, সমগ্র মানবজাতি ও বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে আবির্ভূত হয়ে মানুষকে সকল প্রকার জুলুম ও অনাচারের হাত থেকে রক্ষা করে সমাজে ন্যায়, সাম্য এবং মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠাও ছিল তাঁর আগমনের অন্যতম মূল লক্ষ্য।
এবং তিনি তাতে সফলও হয়েছিলেন—ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও অভাবনীয় এক বিপ্লবের মাধ্যমে। তিনি কেবল স্বপ্ন দেখাননি, বরং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে একটি দিকভ্রান্ত ও বর্বর জাতিকে সোনার মানুষে পরিণত করেছিলেন। দীর্ঘ ২৩ বছরের সীমাহীন ত্যাগ ও ধৈর্যের বিনিময়ে তিনি মানুষের হৃদয় থেকে শিরক ও অজ্ঞতার অন্ধকার মুছে ফেলে সেখানে তাওহিদের প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন।
বিশ্বনবী (ﷺ)-এর এই সফলতা ছিল যেন এক ঐশী 'পরশপাথরের' ছোঁয়া। তাঁর পবিত্র নবুয়তি পরশ মক্কার সাধারণ ও নির্যাতিত মানুষগুলোকে ইতিহাসের সবচেয়ে দামি 'সোনার মানুষে' পরিণত করেছিল।
এর এক জীবন্ত ও শিহরণজাগানো ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হলেন হযরত বিলাল (রা.)। মক্কার তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে যখন তাঁর বুকে ভারী পাথর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন চরম নির্যাতনের মুখেও তাঁর মুখ থেকে অবিরত উচ্চারিত হচ্ছিল— "আহাদ, আহাদ" (আল্লাহ এক, আল্লাহ অদ্বিতীয়)। বিলাল (রা.)-এর এই অবিচল ধ্বনিই প্রমাণ করেছিল যে, রাসূল (ﷺ)-এর পরশে তাওহিদের আলো একবার যার অন্তরে প্রবেশ করে, পৃথিবীর কোনো জুলুম বা নির্যাতনই তাকে আর কখনো জাহিলিয়াতের অন্ধকারে ফেরাতে পারে না।
পরবর্তীতে বিদায় হজের ময়দানে লাখো সাহাবির সামনে দাঁড়িয়ে যখন তিনি মানবাধিকার, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শাশ্বত ঘোষণা দিচ্ছিলেন, তখন সেই অভূতপূর্ব দৃশ্যটিই ছিল তাঁর সুদীর্ঘ নবুয়তি মিশনের অতুলনীয় ও চূড়ান্ত সফলতার এক মহাস্বীকৃতি।
২. কুরআনের আলোয় আত্মার পরিশুদ্ধি ও ঈমানের পূর্ণতা
আজকের আধুনিক বিশ্বে মানুষের জাগতিক অভাব হয়তো অনেক কমেছে, কিন্তু মানসিক প্রশান্তি ও আত্মার খোরাকের অভাবে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ শূন্যতা। চারপাশের এত প্রাচুর্যের মাঝেও মানুষ আজ ভেতরে ভেতরে বড় বেশি ক্লান্ত ও দিশেহারা। ঠিক এমন এক বাস্তবতায় রাসূল (ﷺ)-এর শিক্ষা আমাদের জন্য পরম ঔষধ। তিনি কুরআনের ঐশী আলো দিয়ে মানুষের সকল প্রকার আত্মিক ব্যাধি দূর করে তাদের অন্তরকে নিখুঁতভাবে পরিশুদ্ধ করেছিলেন।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাঁর এই মহান দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ
অর্থ: "তিনিই উম্মীদের মধ্যে তাদেরই থেকে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন..." (সূরা আল-জুমুআহ: ২)
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: ইসলামের কট্টর শত্রু ওমর (রা.) যখন ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে রাসূলকে (ﷺ) হত্যা করতে যাচ্ছিলেন, তখন পথিমধ্যে সূরা 'ত্বা-হা'-এর কয়েকটি আয়াত তাঁর কানে পৌঁছায়। কুরআনের সেই ঐশী বাণী তাঁর পাষাণ হৃদয়কে এমনভাবে পরিশুদ্ধ করেছিল যে, সেই তরবারি নিয়েই তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে ছুটে গিয়েছিলেন।
৩. উত্তম চরিত্র ও আদর্শ সমাজ ও মানব গঠন
সমাজে আজ দুর্নীতি, প্রতারণা ও নৈতিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। বৈষয়িক উন্নতির চূড়ায় উঠলেও মানুষ আজ তার মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে, চারদিকে কেবলই স্বার্থপরতা আর অসাধুতার ছড়াছড়ি। অথচ ইসলাম এমন এক সমাজ গঠনের কথা বলে, যার মূল ভিত্তিই হলো উত্তম চরিত্র ও সুমহান নৈতিকতা। রাসূল (ﷺ) তাঁর আগমনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে এই নৈতিকতার বিকাশকেই তুলে ধরেছেন।
হাদীস শরিফে তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন:
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ الْأَخْلَاقِ
অর্থ: "আমাকে কেবল উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের জন্যই প্রেরণ করা হয়েছে।" (মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং: ৪)
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: রাসূল (ﷺ)-এর নিজের জীবনই ছিল এই উত্তম চরিত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য রূপ। হযরত আনাস (রা.) নবীজির (ﷺ) কাছে টানা দশ বছর খাদেম হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি তাঁর চরিত্রের স্মৃতিচারণ করে বলেন, "এই দীর্ঘ দশ বছরে নবীজি কখনো আমার কোনো কাজে বিরক্ত হয়ে একটি 'উহ' শব্দও উচ্চারণ করেননি। আমি কোনো কাজ না করলে তিনি কখনো বলেননি যে, 'তুমি এ কাজ কেন করলে না?' আর নিজের ইচ্ছায় কোনো কাজ করলে কখনো বলেননি, 'কেন করলে?'"
এমন অসীম ধৈর্য, বিনয়, ক্ষমা ও কোমল চরিত্রই হলো একটি আদর্শ, দুর্নীতিমুক্ত ও শান্তিময় সমাজের মূলভিত্তি, যা তিনি নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়েছিলেন।
৪. ইনসাফ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা: জুলুম-নিপীড়ন মুক্ত আদর্শ সমাজ
বর্ণবাদ, বৈষম্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যা। আধুনিক যুগে মানবাধিকারের বড় বড় বুলি আওড়ানো হলেও বাস্তবে দুর্বল ও প্রভাবশালীদের জন্য আইনের প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। কিন্তু রাসূল (ﷺ) আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই এমন এক ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ধনী-গরিব, সাদা-কালো, শাসক-শাসিত—সবার অধিকার ও মর্যাদা ছিল সম্পূর্ণ সমান।
ন্যায়বিচারের এই চূড়ান্ত মানদণ্ড নির্ধারণ করে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ
অর্থ: "হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সংগত সাক্ষ্যদাতা হও।" (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: সমাজে আইনের শাসন ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় রাসূল (ﷺ) কতটা আপসহীন ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় একটি ঐতিহাসিক ঘটনায়। মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের এক নারী চুরির অপরাধে ধরা পড়লে, তার আভিজাত্যের কারণে সমাজের কয়েকজন তার শাস্তি কমানোর সুপারিশ করেন। তখন ন্যায়ের মূর্ত প্রতীক রাসূল (ﷺ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং যুগান্তকারী এক ঘোষণা দিয়ে বলেন—
"তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো এ জন্যই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তাদের মধ্যে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি চুরি করলে তারা তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল কেউ চুরি করলে তাকে শাস্তি দিত। আল্লাহর কসম! আজ যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।"
এমন নিখুঁত ইনসাফ ও পক্ষপাতহীন আইনের শাসনই হলো একটি আদর্শ সমাজের মূলভিত্তি। আর পৃথিবীতে এমন একটি বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল বিশ্বনবী (ﷺ)-এর আগমনের অন্যতম মহান লক্ষ্য।
৫. আল্লাহর ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া
যুগে যুগে মানুষ পুণ্য লাভের আশায় ইবাদতের নামে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো মনগড়া বিভিন্ন প্রথা ও রীতিনীতির উদ্ভাবন করেছে। বিশ্বনবী (ﷺ)-এর আগমনের অন্যতম একটি লক্ষ্য ছিল ইবাদতের ক্ষেত্রে সকল প্রকার কুসংস্কার ও বিদআত (দ্বীনের নামে নব-উদ্ভাবিত প্রথা) সমূলে উৎপাটন করা। তিনি স্রষ্টাকে ডাকার এবং তাঁর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে সঠিক, সুন্দর ও নিখুঁত পদ্ধতি বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে গেছেন।
এ বিষয়ে সুস্পষ্ট মূলনীতি ঘোষণা করে তিনি ইরশাদ করেন:
صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي
অর্থ: "তোমরা সেভাবেই সালাত আদায় করো, যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখেছ।" (সহিহ বুখারি, হাদীস নং: ৬৩১)
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: ইবাদতের ক্ষেত্রে তিনি কতটা যত্নশীল ছিলেন এবং কত সুন্দরভাবে তা শিক্ষা দিতেন, তার চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যায় একটি বিখ্যাত ঘটনায়।
একবার এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে এসে তাড়াহুড়ো করে নামাজ আদায় করল। নবীজি (ﷺ) তাকে অত্যন্ত স্নেহের সাথে কাছে ডেকে বললেন, "ফিরে যাও এবং পুনরায় নামাজ পড়ো, কারণ তোমার নামাজ হয়নি।" এভাবে ওই ব্যক্তি তিনবার তাড়াহুড়ো করে নামাজ পড়ার পর রাসূল (ﷺ) তাকে বিন্দুমাত্র ধমক না দিয়ে অত্যন্ত মমতার সাথে কাছে বসালেন। অতঃপর তাকে রুকু, সিজদাহ এবং ধীরস্থিরতা ও একাগ্রতার (খুশু-খুজু) সাথে নিখুঁত ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি হাতে-কলমে শিখিয়ে দিলেন।
এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, ইবাদত কোনো মনগড়া বা তাড়াহুড়ো করার বিষয় নয়। মূলত, মানুষকে সুন্নাহ ও পরিপূর্ণ একাগ্রতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ এমন বিশুদ্ধ ইবাদতের পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়াই ছিল তাঁর আগমনের অন্যতম মহান লক্ষ্য।
৬. ইহকাল ও পরকালের মুক্তি: মানুষকে চিরস্থায়ী সফলতার পথে পরিচালিত করা
বর্তমান বস্তুবাদী বিশ্বে মানুষ শুধু দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সফলতার পেছনে ছুটছে এবং আখিরাতের অনন্ত জীবনকে সম্পূর্ণ ভুলে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ইসলাম মানুষকে দুনিয়া ত্যাগ করে বৈরাগ্য বা সন্ন্যাসী হতেও বলে না। বরং দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে এক চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখে জীবন পরিচালনার সঠিক পথরেখা দেওয়াই ছিল বিশ্বনবী (ﷺ)-এর আগমনের অন্যতম একটি প্রধান লক্ষ্য।
দুনিয়া ও আখিরাতের এই চমৎকার ভারসাম্যের কথা তুলে ধরে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মুমিনদের দু’আ শিখিয়ে বলেন:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থ: "হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২০১)
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: দুনিয়া ও আখিরাতের এই সফলতার প্রকৃত রূপ কী, তা তিনি সাহাবায়ে কেরামের জীবনে নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছিলেন। সাহাবি হযরত সুহাইব (রা.) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় যাচ্ছিলেন, তখন মক্কার কাফিররা তাঁকে বাধা দেয়। তিনি তখন আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার আশায় নিজের জীবনের সব সঞ্চিত বিপুল সম্পদ কাফিরদের হাতে তুলে দিয়ে সম্পূর্ণ খালি হাতে মদিনায় চলে আসেন। রাসূল (ﷺ) তাঁকে দেখে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ওঠেন, !رَبِحَ البَيعُ أبا يَحيى "হে আবু ইয়াহইয়া! তোমার ব্যবসা লাভজনক হয়েছে!"
মূলত, মানুষকে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সম্পদের মোহের বদলে আখিরাতের এমন চিরস্থায়ী সফলতার পথে পরিচালিত করাই ছিল বিশ্বনবী (ﷺ)-এর নবুয়তি জীবনের অন্যতম একটি মহান লক্ষ্য।
৭. আল্লাহর জমিনে দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়
বিশ্বনবী (ﷺ)-এর আগমনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও মিশন ছিল বাতিল শক্তি এবং মানুষের তৈরি সকল অসার তন্ত্রমন্ত্রকে হটিয়ে আল্লাহর জমিনে কেবল আল্লাহর দেওয়া শাশ্বত জীবনব্যবস্থাকে বিজয়ী করা। তিনি কেবল ব্যক্তিগত শুদ্ধি নয়, বরং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র ও সমাজকেও আল্লাহর বিধানের আলোকে বিন্যস্ত করতে চেয়েছিলেন।
এই চিরন্তন সত্যের ঘোষণা দিয়ে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ
অর্থ: "তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, যাতে একে সব দ্বীনের ওপর বিজয়ী করতে পারেন।" (সূরা আস-সাফ: ৯)
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: মক্কা বিজয়ের দিনটি ছিল ইসলামের এই চূড়ান্ত বিজয়ের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক প্রমাণ। যে মক্কা নগরী থেকে রাসূল (ﷺ)-কে একসময় রক্তমাখা শরীরে অপমানিত করে বিতাড়িত করা হয়েছিল, আট বছর পর তিনি সেখানে দশ হাজার সাহাবির এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করেন। অথচ বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে তিনি ঘোষণা করেছিলেন সাধারণ ক্ষমার। তিনি কাবাঘরকে ৩৬০টি মূর্তির পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
মূলত, এই মক্কা বিজয় ছিল কেবল একটি শহর জয় নয়, বরং বাতিল ও কুফরির অন্ধকারের ওপর আল্লাহর হিদায়াত ও সত্য দ্বীনের চূড়ান্ত বিজয়ের এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক, যা ছিল রাসূল (ﷺ)-এর নবুয়তি মিশনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য লক্ষ্য।
৮. নবুয়তের সমাপ্তি ও ঐশী জীবনব্যবস্থায় দ্বীনের পূর্ণতা
বিশ্বনবী (ﷺ)-এর আগমনের অন্যতম একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল আদম (আ.) থেকে শুরু হওয়া নবুয়তের দীর্ঘ ধারার সমাপ্তি টানা এবং মানবজাতির জন্য আল্লাহ কর্তৃক একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর মাধ্যমেই ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ, শাশ্বত ও যুগোপযোগী জীবনবিধান হিসেবে স্রষ্টার পক্ষ থেকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভ করা।
দ্বীনের এই পূর্ণতার অবিস্মরণীয় ঘোষণা দিয়ে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
অর্থ: "আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।" (সূরা আল-মায়িদা: ৩)
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: বিদায় হজের ঐতিহাসিক ময়দানে লাখো সাহাবায় কেরামের উপস্থিতিতে যখন এই পবিত্র আয়াতটি নাজিল হয়, তখন দ্বীনের চূড়ান্ত পূর্ণতা লাভের খবরে সবাই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সাহাবি হযরত ওমর (রা.) তা শুনে অঝোরে কেঁদে ফেলেছিলেন। কারণ তিনি তাঁর গভীর প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন, দ্বীন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো দুনিয়ায় রাসূল (ﷺ)-এর নবুয়তি দায়িত্ব শেষ হয়ে যাওয়া; অর্থাৎ তিনি অচিরেই তাঁদের ছেড়ে তাঁর মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যাবেন।
মূলত, দ্বীনের এই পূর্ণতা বিধানের মাধ্যমেই বিশ্বনবী (ﷺ)-এর সুদীর্ঘ তেইশ বছরের নবুয়তি মিশনের চূড়ান্ত লক্ষ্যটি শতভাগ সফলতার সাথে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এর পবিত্র জীবনী কেবল ইতিহাসের পাতায় আবদ্ধ কোনো সাধারণ আখ্যান নয়; বরং এটি কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত সকল মানুষের জন্য এক জীবন্ত গাইডলাইন বা দিশারি। তিনি অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত দিকভ্রান্ত মানবজাতিকে এমন এক শাশ্বত আলোকবর্তিকা দিয়ে গেছেন, যা আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে আজও নিখুঁত পথ দেখায়।
বর্তমান যুগে মানুষ হয়তো নিজ হাতে গড়া পাথরের মূর্তির পূজা করে না, কিন্তু অর্থ, ক্ষমতা, পদমর্যাদা ও প্রবৃত্তির অন্ধ দাসত্বে তারা নতুন এক 'আধুনিক জাহিলিয়াতে' নিমজ্জিত। এর পাশাপাশি চারদিকে ছড়িয়ে পড়া সর্বনাশা দাজ্জালি ফিতনা আজ মানুষকে সত্য ও হেদায়েত থেকে বিচ্যুত করে বস্তুবাদ ও ভোগবিলাসের মায়াজালে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ঠিক এমন এক সংকটময় বাস্তবতায় রাসূল (ﷺ)-এর শাশ্বত আদর্শই আমাদের একমাত্র দিশা; যিনি মানবজাতিকে দৃশ্য-অদৃশ্য সকল প্রকার দাসত্ব এবং দাজ্জালি ফিতনার ভয়াবহ ধোঁকা থেকে মুক্ত করে, কেবল এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা আজও আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত মুক্তির একমাত্র পথ।
আধুনিক জাহিলিয়াত, দাজ্জালি ফিতনা আর নৈতিক অবক্ষয়ে জর্জরিত আজকের এই অশান্ত পৃথিবীতে যদি আমরা পুনরায় শান্তি, ইনসাফ ও মানবতার মুক্তি চাই, তবে রাসূল (ﷺ)-এর সেই চিরন্তন আদর্শের কাছে ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তাঁর সুমহান আদর্শকে বুকে ধারণ করে আমরাও যদি সেই পথে অবিচল থাকি, তবে বস্তুবাদ ও বৈষম্যের এই ঘোর অন্ধকার ভেদ করে আবারও মানবতার মুক্তির সুবহে সাদিক উদিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ আমাদের রাসূল (ﷺ)-এর আদর্শে জীবন গড়ার তাওফিক দিন, আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
বিশ্বনবী (সা.)-এর নেতৃত্বগুণ
তাওকির ভুমলা উর্দু থেকে অনুবাদ করেছেন মুফতি জাওয়াদ তাহের অমুসলিমদের লেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই , ‘...
নবীজীর আদর্শ
"আগেকার রাজা-বাদশা কিংবা অন্য কোনো মনীষী এরকম কোনো আদর্শ রেখে যাননি, যা আজও মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়...
মহানবী (সা.)-এর ইনসাফ
ইনসাফ এমন এক মহৎ গুণ , যা মানুষকে প্রিয়ভাজন করে তুলতে সাহায্য করে। প্রিয় নবী ( সা.)-এর মাঝে ইনসাফ ছি...
শানে রেসালাত; এই দুঃসাহস অসহ্য! এই ধৃষ্টতা অমার্জনীয়!!
চলতি বছরের ষোলই অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিস নগরীর শহরতলীতে গলা কেটে হত্যা করা হয় এক স্কুলশিক্ষককে। কুল...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন