প্রবন্ধ
অশ্রুসিক্ত তাওবার সোনালি দৃষ্টান্তে সাহাবায়ে কেরাম রাযি.
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৪৩৫
০
ভুমিকা
মানুষ মাত্রই ভুল হয়। সাহাবায়ে কেরামও রক্তমাংসে গড়া মানুষ ছিলেন, তাঁরাও কখনো কখনো হোঁচট খেয়েছেন। কিন্তু গুনাহ তাঁদের থামাতে পারেনি: তাওবার মাধ্যমে ফিরে এসেছিলেন সাহাবায়ে কেরাম রাযি.। তাঁদের জীবনে একটি ভুল হলে তা নিয়ে তাঁরা যে পরিমাণ চোখের জল ফেলতেন, তা আমাদের কল্পনারও অতীত। তাঁদের এই অনুশোচনার আগুন আর ক্ষমার বারিধারা ইসলামের ইতিহাসে এক জীবন্ত বিস্ময়।
হাদিস শরিফে নবীজি (ﷺ) বলেছেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
"প্রত্যেক আদম সন্তানই গুনাহগার (ভুলকারী), আর গুনাহগারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো তারা, যারা তাওবা করে।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫১)
বস্তুত, সাহাবায়ে কেরামের জীবনে ঘটে যাওয়া এসব ভুলের মাঝেও আল্লাহর গভীর প্রজ্ঞা ও হেকমত লুকিয়ে ছিল; মূলত তাঁদের এই ভুলের মাধ্যমেই আমাদের জন্য তাওবার শিক্ষা ও বিভিন্ন শরয়ি বিধান এসেছে। তাঁদের জীবনে সংঘটিত ভুল-ত্রুটির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা উম্মতের জন্য অনেক সহজলভ্য বিধান শিক্ষা দিয়েছেন এবং শরীয়তের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কাঠিন্য দূর করে সহজতার পথ দেখিয়েছেন। তাঁরা ভুল না করলে আমরা জানতামই না যে, অপরাধের পর কীভাবে রবের দরবারে ফিরে আসতে হয়। তাঁদের এই খাঁটি তাওবার কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁদের সব ভুল ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং মারা যাওয়ার আগেই তাঁদেরকে পরিপূর্ণ নিষ্পাপ করে নিয়েছিলেন। আর তাইতো আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে "رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ" (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বা 'আল্লাহ তাঁদের ওপর সন্তুষ্ট' উপাধিতে ভূষিত করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁদের এই মর্যাদার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, رَضِیَ اللّٰہُ عَنۡہُمۡ وَرَضُوۡا عَنۡهُ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ "আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর এটাই হলো মহাসাফল্য।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ১১৯)।
অপরাধের পর আত্মসমর্পণ
ভুল হয়ে গেলে সাহাবায়ে কেরাম রাযি. কখনো অজুহাত খুঁজতেন না, নিজেদের অপরাধকে হালকা করে দেখতেন না; বরং অনুতপ্ত হৃদয়ে রবের দরবারে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতেন। তাঁদের তাওবা ছিল আন্তরিকতা, অশ্রু ও সংশোধনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নিচে রবের দরবারে তাঁদের ফিরে আসার এমন কিছু অবিস্মরণীয় ঘটনা এবং সেসব ঘটনা থেকে আমাদের জন্য নিহিত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো তুলে ধরা হলো,
যে অনুশোচনার জবাবে আসমান থেকে নাজিল হলো ক্ষমার আয়াত!
তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কারণে হযরত কাব ইবনে মালেক (রাযি.) সহ তিনজন সাহাবীর সাথে নবীজি (ﷺ) এবং পুরো মদিনাবাসীর কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যায়। ৫০ দিনের সেই নিদারুণ বয়কটে মদিনার মাটি তাঁদের জন্য যেন জাহান্নাম হয়ে উঠেছিল। অথচ তাবুক যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেনি, তাদের মধ্যে কিছু মুনাফিক নবী কারীম ﷺ-এর কাছে মিথ্যা অজুহাত পেশ করে নিজেদের বাঁচিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু হযরত কা‘ব ইবনে মালিক রাযি. চাইলেই কোনো অজুহাত দাঁড় করিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারতেন। তিনি নবী কারীম ﷺ-এর সামনে সত্য কথাই বললেন। তিনি বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যদি আপনার কাছে কোনো মিথ্যা অজুহাত পেশ করি, তাহলে হয়তো আজ আপনার কাছে রেহাই পেয়ে যাব; কিন্তু আল্লাহ তাআলা অবশ্যই আপনাকে আমার প্রকৃত অবস্থা জানিয়ে দেবেন।” তাই তিনি মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে নিজের অপরাধ অকপটে স্বীকার করলেন। এরপর শুরু হলো ৫০ দিনের সেই নিদারুণ পরীক্ষা। নবী কারীম ﷺ-এর নির্দেশে সাহাবায়ে কেরাম রাযি. তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ করে দিলেন। এমনকি তাঁদের স্ত্রীদেরও তাঁদের থেকে পৃথক থাকার নির্দেশ দেওয়া হলো। মদিনার প্রশস্ত জমিন তাঁদের জন্য যেন সংকীর্ণ হয়ে গেল; নিজের জীবনও তাঁদের কাছে দুর্বিষহ মনে হতে লাগল। তাঁদের এই বুকফাটা আর্তনাদের জবাবে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং কোরআনের আয়াত নাজিল করে তাঁদের ক্ষমার ঘোষণা দেন:
وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّىٰ إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ...
"এবং সেই তিনজনের প্রতিও (তিনি ক্ষমা প্রদর্শন করলেন), যাদের বিষয় স্থগিত রাখা হয়েছিল; এমনকি পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তা তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল... অতঃপর তিনি তাদের তাওবা কবুল করলেন, যাতে তারা ফিরে আসে।" (সূরা আত-তাওবা: ১১৮)
তাঁদের মানসিকতা ও অনুভূতি: এই ৫০ দিনের যন্ত্রণার কথা স্মরণ করে কাব (রাযি.) বলতেন, "মদিনার প্রশস্ত জমিন আমার কাছে সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল। আমার নিজের জীবনটাই আমার কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলাম, আল্লাহ ছাড়া তাঁর পাকড়াও থেকে বাঁচার কোনো আশ্রয়স্থল নেই।" (সহীহ বুখারী: ৪৪১৮)
আমাদের জন্য শিক্ষা: গুনাহ হয়ে গেলে মিথ্যা অজুহাত না খুঁজে অকপটে নিজের ভুল স্বীকার করে নেওয়া খাঁটি মুমিনের বৈশিষ্ট্য। পাপের কারণে যখন চারপাশ অন্ধকার মনে হয়, তখন হতাশ না হয়ে একনিষ্ঠভাবে রবের কাছেই ফিরে যেতে হয়।
মসজিদের খুঁটিতে নিজেকে বন্দি করার অদ্ভুত সেই তাওবা!
বনু কুরাইজা গোত্রের ইহুদিদের সাথে কথা বলার সময় সাহাবী আবু লুবাবা (রাযি.) নিজের গলার দিকে ইশারা করে বুঝিয়েছিলেন যে, নবীজি (ﷺ) তাদের হত্যা করবেন। পরক্ষণেই তাঁর উপলব্ধি হলো, তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের একটি গোপন তথ্য ফাঁস করে আমানতের খিয়ানত করেছেন। অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে তিনি সোজা মসজিদে নববীতে গিয়ে নিজেকে একটি খুঁটির সাথে শক্ত করে বেঁধে ফেলেন। টানা সাতদিন পর আল্লাহ তাঁর তাওবা কবুল করেন (সূরা আল-আনফাল: ২৭) এবং নবীজি (ﷺ) নিজ হাতে তাঁর বাঁধন খুলে দেন।
তাঁদের মানসিকতা ও অনুভূতি: খুঁটির সাথে নিজেকে বাঁধার সময় তিনি প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন, "আল্লাহর কসম! যতক্ষণ না আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন, আমি কিছুই পানাহার করব না এবং এই বাঁধন খুলব না। আর আমি কখনোই সেই ভূমিতে যাব না, যেখানে আমি খিয়ানত করেছি।" (উয়ূনুল আছার, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৭)
আমাদের জন্য শিক্ষা: ভুল বুঝতে পারার সাথে সাথে নিজেকে আত্মশুদ্ধির কঠোর প্রক্রিয়ায় ফেলে দেওয়া উচিত। গুনাহ থেকে বাঁচতে পাপের পরিবেশ ও সঙ্গ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
যে তাওবার বদৌলতে ঘাতকের নামও উঠল জান্নাতিদের খাতায়!
ওহুদ যুদ্ধে নবীজি (ﷺ)-এর প্রিয় চাচা হযরত হামজা (রাযি.)-কে নির্মমভাবে শহীদ করেছিলেন ওয়াহশি (রাযি.)। মক্কা বিজয়ের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে চাইলেন, কিন্তু নিজের অতীত অপরাধের কারণে তিনি ছিলেন ভীষণ ভীত ও অনুতপ্ত।
তাঁর মতো একজন গুনাহগারের জন্যও আল্লাহ তা‘আলা তাওবার দরজা উন্মুক্ত রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনের মহান আশার বাণী,
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ...
"তবে যারা তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গুনাহগুলোকে নেকি দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন..." (সূরা আল-ফুরকান: ৭০)
তাঁদের মানসিকতা ও অনুভূতি: ওয়াহশি (রাযি.) চরম আতঙ্কে ভাবতেন, "আমি নবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে হত্যা করেছি। আমার মতো মহাপাপীকে কি আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন?" কিন্তু এই ক্ষমা তাঁর জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল।
আমাদের জন্য শিক্ষা: শয়তানের সবচেয়ে বড় ধোঁকা হলো মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করা। গুনাহ যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর ক্ষমার বিশালতার কাছে তা কিছুই নয়। খাঁটি তাওবা শুধু পাপই মোচন করে না, বরং পাপকে সওয়াবে পরিণত করে দেয়।
‘হায়! আমি যদি ঘাস হতাম!’ জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের পাহাড়সম ভয়
যাঁরা দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন, তাঁদের বুকেও ছিল আল্লাহর প্রচণ্ড ভয়। উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানুষ, ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রাযি.) একটি পাখি বা ঘাস দেখে কাঁদতেন। তিনি আক্ষেপ করে বলতেন:
يَا لَيْتَنِي كُنْتُ هَذِهِ الْبَقْلَةَ يَأْكُلُنِي سَبُعٌ ، وَلَمْ أَكُ بَشَرًا
"হায়! আমি যদি এই ঘাস হতাম, যাকে কোনো প্রাণী খেয়ে ফেলত, আর আমি মানুষ না হতাম (তবে আমাকে আল্লাহর কাছে হিসাব দিতে হতো না)!" এমনকি তিনি নিজের জিহ্বা টেনে ধরে কাঁদতেন আর বলতেন, "এই জিহ্বাই আমাকে বিপদে ফেলবে।" (কিতাবুজ যুহদ, ১\১৫৯)
আমাদের জন্য শিক্ষা: ঈমান যত মজবুত হয়, আল্লাহর প্রতি ভয় তত বাড়ে। আমরা সামান্য আমল করেই নিজেদের জান্নাতি মনে করে অহংকার করি, অথচ জান্নাতের গ্যারান্টি পেয়েও শ্রেষ্ঠ মানুষেরা প্রতিটি কথার হিসাব দেওয়ার ভয়ে কাঁপতেন। নিজের কথা ও কাজের ব্যাপারে আমাদের চরম সতর্ক হওয়া উচিত।
কুরআনের এক আয়াতে বেহুঁশ খলিফা: রবের ভয়ে একমাস শয্যাশায়ী!
অর্ধেক পৃথিবীর শাসক হযরত উমর (রাযি.) একদিন রাতের বেলা এক ব্যক্তির ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটি তখন তাহাজ্জুদে সূরা তুরের আয়াত তিলাওয়াত করছিল:
رَبِّكَ لَوَاقِعٌ (৭) مَّا لَهُ مِن دَافِعٍ (৮)
"নিশ্চয়ই আপনার রবের আজাব সংঘটিত হবেই। তা প্রতিহত করার কেউ নেই।" (সূরা আত-তুর: ৭ - ৮)
এই আয়াতটি শোনার সাথে সাথে রবের ভয়ে তিনি এতটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন যে, তিনি সেখানেই বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। এরপর প্রায় একমাস যাবৎ তিনি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন! (আত-তাযকারু ফী আফযালিল আযকার, ১৬০)
উমর (রাযি.)-এর অন্তর রবের ভয়ে এতটাই সজাগ ছিল যে, আজাবের কথা শোনামাত্রই তাঁর মনে হতো যেন সেই আজাব তাঁর চোখের সামনেই উপস্থিত হয়েছে। দুনিয়ার রাজত্বের চেয়ে আখেরাতের জবাবদিহিতাই তাঁর কাছে প্রধান ছিল।
আমাদের জন্য শিক্ষা: আমরা প্রতিদিন কোরআনের কত আয়াত পড়ি বা শুনি, কিন্তু তা আমাদের অন্তরে রেখাপাত করে? কোরআন তেলাওয়াতের সময় এর অর্থ ও ভয়াবহতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে আমাদের অন্তরও আল্লাহর ভয়ে নরম হবে।
গুনাহ তাঁদের জান্নাতের পথ রুদ্ধ করতে পারেনি
হযরত মা‘ইয ইবনু মালিক (রাযি.)-এর ঘটনা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একটি বড় গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর তিনি গভীরভাবে অনুতপ্ত হন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে নিজের পবিত্রতার আকুতি জানান। শরীয়তের নির্ধারিত হদ্দ কার্যকর হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর তাওবার প্রশংসা করে বলেন,
لَقَدْ تَابَ تَوْبَةً لَوْ قُسِّمَتْ بَيْنَ أُمَّةٍ لَوَسِعَتْهُمْ
“সে এমন তাওবা করেছে, যা কোনো জাতির মধ্যে বণ্টন করে দিলে তাদের সবার জন্য যথেষ্ট হতো।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৬৯৫)
এ ঘটনা আমাদের শেখায়: গুনাহ হয়ে যাওয়া একজন মুমিনের জীবনের শেষ পরিণতি নয়; বরং গুনাহের পর তাওবা না করাই প্রকৃত বিপদ। তাই ভুল হয়ে গেলে হতাশ হয়ে পড়া যাবে না। বরং অনুতপ্ত হৃদয়ে, অশ্রুসিক্ত নয়নে আল্লাহ তায়ালার দরবারে ফিরে আসতে হবে এবং আন্তরিকভাবে তাওবা করে জান্নাতের পথকে সহজ করে নিতে হবে।
সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.) আমাদের শিখিয়েছেন গুনাহ যেন আমাদের থামিয়ে না দেয়; বরং তাওবাই হোক আল্লাহর পথে ফিরে আসার নতুন সূচনা।
অনুশোচনার আগুন আর ক্ষমার বারিধারা: যেমন ছিল সাহাবিদের তাওবা
তরুণ সাহাবী সালাবা (রাযি.) একবার একজন আনসারি সাহাবীর বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বাতাসে দরজার পর্দা সরে গেলে ঘরের ভেতরের একজন নারীর ওপর তাঁর অসতর্ক দৃষ্টি পড়ে যায়।
দৃষ্টিটি ছিল অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু মুহূর্তেই তাঁর অন্তরে আল্লাহর ভয় প্রবল হয়ে উঠল। তিনি ভাবতে লাগলেন “যদি আমার এই ভুলের কারণে আমার ব্যাপারে কোনো ওহী নাযিল হয় এবং আমাকে মুনাফিক ঘোষণা করা হয়, তাহলে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে কীভাবে দাঁড়াব?”
লজ্জা ও অনুশোচনায় তিনি মদিনা ছেড়ে পাহাড়ের একটি গুহায় গিয়ে আত্মগোপন করলেন। সেখানে তিনি ৪০ দিন কান্নাকাটি করতে থাকলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর অনুপস্থিতির বিষয় জানতে পেরে সাহাবীদের মাধ্যমে তাঁকে খুঁজতে থাকেন। অবশেষে তাঁকে পাওয়া গেল সেই গুহায় এবং তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে উপস্থিত হলেন। ভয়ে ও অনুশোচনায় তিনি তখনও কাঁপছিল। (হিলইয়াতুল আওলিয়া, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৩২৯)
আমাদের জন্য শিক্ষা: একজন মুমিনের অন্তর এমন হওয়া উচিত, গুনাহকে সে কখনো তুচ্ছ মনে করবে না। আজ আমাদের চোখ প্রতিনিয়ত স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাস্তাঘাটের নানা দৃশ্যের মুখোমুখি হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো নিষিদ্ধ দৃশ্য চোখে পড়লে আমাদের অন্তর কি সত্যিই কেঁপে ওঠে?
সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা হলো, ভুল হয়ে গেলে গুনাহকে স্বাভাবিক মনে না করে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে হবে, অনুতপ্ত হতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে তাওবা করতে হবে।
যে অন্তর গুনাহের কারণে কাঁদে, সে অন্তরই তাওবার মাধ্যমে রবের দিকে ফিরে আসতে পারে।
রবের দরবারে ফিরে আসার গল্প:
হযরত ইকরিমা (রাযি.) ছিলেন ইসলামের ঘোর বিরোধী আবূ জাহলের পুত্র। মক্কা বিজয়ের পর নিজের অতীতের কারণে তিনি মক্কা ছেড়ে পালিয়ে যান। সমুদ্রপথে একটি জাহাজে আরোহণ করার পর মাঝসমুদ্রে প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়েন।
বিপদের সেই মুহূর্তে নাবিকরা তাঁকে বলল: তোমরা যেসব উপাস্যের ইবাদত কর, তারা আজ তোমাদের কোনো উপকার করতে পারবে না। এখন একমাত্র আল্লাহকেই ডাকো।
কথাগুলো ইকরিমা (রাযি.)-এর অন্তরে গভীর রেখাপাত করল। তিনি উপলব্ধি করলেন, বিপদের সময় যখন একমাত্র আল্লাহই আশ্রয়, তখন শান্তির সময়ও ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই।
এই উপলব্ধিই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। পরবর্তীতে তিনি মক্কায় ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অতীতের বিরোধিতা ছেড়ে ইসলামের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। তিনি হয়ে ওঠেন ইসলামের একজন সাহসী মুজাহিদ ও সম্মানিত সাহাবী। (সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ৪০৬৭)
আমাদের জন্য শিক্ষা: জীবনের বড় বড় ঝড় ও বিপদ সবসময় অভিশাপ হয়ে আসে না; কখনো কখনো এগুলো হয় রবের পক্ষ থেকে আমাদের ফিরে আসার আহ্বান। যে বিপদ আমাদের ভেঙে দেয়, সেটিই হয়তো আমাদের রবের দিকে ফিরে আসার পথ খুলে দেয়।
অতীতের পাপ যত ভয়ংকরই হোক, আল্লাহর রহমতের দরজা কখনো বন্ধ নয়। এক মুহূর্তের আন্তরিক অনুশোচনা ও খাঁটি তাওবাই পারে একজন মানুষকে পাপের অন্ধকার থেকে হিদায়াতের আলোর শিখরে পৌঁছে দিতে।
তাই বিপদে ভেঙে পড়া নয় রবের দিকে ফিরে আসাই হোক আমাদের প্রথম পদক্ষেপ।
যে চোখের জলে নিভে যায় জাহান্নামের আগুন!
সাহাবায়ে কেরামের এই তাওবার জীবন আমাদের জন্য এক বিশাল আয়না। আমরা প্রতিদিন কত গুনাহ করি, অথচ আমাদের চোখে এক ফোঁটা পানিও আসে না। নবীজি (ﷺ) বলেছেন:
عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ: عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ...
"দুটি চোখকে কখনো জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না— এক. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কাঁদে..." (সুনানে তিরমিজি: ১৬৩৯)
আসুন, সাহাবায়ে কেরামের এই অশ্রুসিক্ত তাওবার সোনালি দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে আমরাও রবের দরবারে ফিরে আসি। এক ফোঁটা খাঁটি অনুশোচনার অশ্রু দিয়ে নিভিয়ে দিই আমাদের গুনাহের সমস্ত আগুন।
সারকথা:
মানুষ মাত্রই ভুলকারী; সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)-এর জীবনেও কখনো ভুল-ত্রুটি ঘটেছে। তবে তাঁদের বিশেষত্ব ছিল—ভুলের পর তাঁরা গাফেল হয়ে থাকতেন না; বরং গভীর অনুশোচনা, অশ্রু ও আত্মসংশোধনের মাধ্যমে দ্রুত আল্লাহ তাআলার দরবারে ফিরে আসতেন। হযরত কা‘ব ইবনে মালিক (রাযি.), আবূ লুবাবা (রাযি.), ওয়াহশি (রাযি.), মা‘ইয ইবনু মালিক (রাযি.) ও অন্যান্য সাহাবীর ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, গুনাহ যত বড়ই হোক, আন্তরিক তাওবা ও আল্লাহর রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.) আমাদের শিখিয়েছেন—গুনাহের পর অজুহাত নয়, তাওবা; হতাশা নয়, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন; আর ভুলকে আঁকড়ে থাকা নয়, আত্মসংশোধনই মুমিনের পথ। তাই আমাদেরও গুনাহ হয়ে গেলে দেরি না করে অনুতপ্ত হৃদয়ে রবের দরবারে ফিরে এসে তাওবায়ে নাসূহা করা উচিত।
* তাওবা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন- "তাওবার শেষ সুযোগ"
আল্লাহ আমাদের তাওবায়ে নাসুহা (খাঁটি তাওবা) করার তাওফিক দিন।
আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
টুপি পরিধান করার কোন প্রমাণ কি হাদীস বা আছারে সাহাবায় নেই?
টুপি মুসলিম উম্মাহর ‘ শিআর ’ জাতীয় নিদর্শন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে ...
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্বামী-স্ত্রীর সুখময় দাম্পত্য
(আম্মাজান আয়েশা রা.এর পবিত্রতম বিবাহ, পারিবারিক জীবন , রাসূলের বয়স পার্থক্য ও বিরুদ্ধবাদীদের আপত্ত...
সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও সাহাবা সমালোচকদের পরিণতি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাগণের মর্যাদা ও ফযীলত কুরআন ও হাদীসের মাঝে বিস্তারিতভাব...
হযরত উসমান রাঃ সম্পর্কে উত্থিত আপত্তির স্বরূপ সন্ধানে
হযরত উসমান রাঃ এর উপর স্বজনপ্রীতিমূলক আপত্তি সমূহের তাহকিকঃ হযরত উসমান রাঃ সম্পর্কে স্বজনপ্রীতিমূলক ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন