অমুসলিমদের বানানো মাধ্যম ব্যবহার করে উপার্জন করার বিধান
প্রশ্নঃ ১৭১৬৫৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, অমুসলিমদেরকে কুফরির কাজে সহায়তা করা সেটা কুফরি। এখন আমরা যে ফেসবুক চালাই এবং ওইখান থেকে বিভিন্ন দীনী প্রতিষ্ঠান তাদের প্ল্যাটফর্মের জন্য ফেসবুকে টাকা দেয়। প্রচারণায়, বিভিন্ন প্রোডাক্ট আমরা আমদানি করে নিয়ে আসি, ওইসব দেশ থেকে যেমন আমেরিকা। তাহলে সেইটার বিধান কি হবে? আমাদের মাধ্যমে তাদের ইনকাম হচ্ছে!
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
আপনার প্রশ্নে মূলত দুইটি বিষয় রয়েছে:
এক. অমুসলিমদের কুফরি কাজে সহযোগিতা করার শরয়ি বিধান কী?
দুই. ফেসবুকের মতো অমুসলিমদের পরিচালিত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা, সেখান থেকে বিজ্ঞাপনের টাকা উপার্জন করা কিংবা আমেরিকার মতো দেশ থেকে পণ্য আমদানি করার মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করা কি কুফরি কাজে সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত হবে?
একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য:
অমুসলিমকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করা আর তার কুফরি কাজে সহযোগিতা করা এক বিষয় নয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈধ ব্যবসা করা, তাদের কাছ থেকে পণ্য কেনা কিংবা তাদের সেবা গ্রহণ করার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কুফরি কাজে সহযোগিতার হুকুম প্রযোজ্য হয় না। কেননা কুরআন সুন্নাহে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
অর্থ তোমরা নেককাজ ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো না। —সুরা আল-মায়িদা, ৫:২।
এই আয়াতের বিধান অনুযায়ী, কোনো কাজ কুফরি বা হারাম হলে এবং সেই কাজে সরাসরি সহযোগিতা করা হলে তা নিষিদ্ধ। তবে কোনো অমুসলিমকে আর্থিকভাবে লাভবান করলেই সেটিকে কুফরি কাজে সহযোগিতা বলা যাবে না। কাজের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও সহযোগিতার ধরন বিবেচনা করতে হবে।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত—
اشْتَرَى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ يَهُودِيٍّ طَعَامًا وَرَهَنَهُ دِرْعَهُ
রাসুলুল্লাহ ﷺ একজন ইহুদির কাছ থেকে খাদ্যদ্রব্য কিনেছিলেন এবং তাঁর কাছে নিজের বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন।—সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫১৩।
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, অমুসলিমের সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেন করা সত্ত্বাগত নিষিদ্ধ নয়। এমন কি শুধুমাত্র অমুসলিমের কাছ থেকে কেনার কারণেও কোনো পণ্য বস্তু হারাম হয়ে যায় না। এ লেনদেনের মাধ্যমে ইহুদি ব্যবসায়ীর উপার্জন হওয়া সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ ﷺ তার কাছ থেকে খাদ্যদ্রব্য কিনেছেন। সুতরাং অমুসলিমের আর্থিক লাভ হওয়া মাত্রই তার সঙ্গে লেনদেনকে কুফরি কাজে সহযোগিতা বলা যাবে না।
ফতোয়া শামীতে আছে—
وَجَازَ بَيْعُ عَصِيرِ عِنَبٍ مِمَّنْ يُعْلَمُ أَنَّهُ يَتَّخِذُهُ خَمْرًا؛ لِأَنَّ الْمَعْصِيَةَ لَا تَقُومُ بِعَيْنِهِ بَلْ بَعْدَ تَغَيُّرِهِ، وَقِيلَ يُكْرَهُ لِإِعَانَتِهِ عَلَى الْمَعْصِيَةِ. ج: 6 ص: 391 (المكتبة الشاملة)
যে ব্যক্তি আঙুরের রস মদ বানাবে বলে জানা আছে, তার কাছে আঙুরের রস বিক্রি করা জায়েজ বলা হয়েছে। কেননা, বস্তুটির মূল অবস্থায় গুনাহ সংঘটিত হয় না; বরং তা পরিবর্তিত হওয়ার পর গুনাহ সংঘটিত হয়। তবে কেউ কেউ গুনাহের কাজে সহযোগিতার কারণে এটিকে মাকরুহ বলেছেন।
তাবয়ীনুল হাকায়েক কিতাবে আছে—
قَالَ - رَحِمَهُ اللَّهُ -: (وَجَازَ بَيْعُ الْعَصِيرِ مِنْ خَمَّارٍ)؛ لِأَنَّ الْمَعْصِيَةَ لَا تَقُومُ بِعَيْنِهِ بَلْ بَعْدَ تَغَيُّرِهِ 6/29 (الشاملة)
অর্থ: "তিনি (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন— (মদ প্রস্তুতকারীর কাছে আঙুরের রস বিক্রি করা বৈধ) কারণ, বস্তুটির মূল সত্তার সঙ্গে গুনাহ সংঘটিত হয় না; বরং তা পরিবর্তিত হওয়ার পর গুনাহ সংঘটিত হয়।
কোনো পণ্যের বৈধ ব্যবহারও রয়েছে, আবার কেউ সেটি হারাম কাজে ব্যবহার করতে পারে—এমন হলে কেবল সম্ভাব্য অপব্যবহারের কারণে পণ্যটির ব্যবসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম হয় না। তবে পণ্যটি যদি নিজেই হারাম হয়, অথবা বিক্রয় ও সরবরাহের ধরন সরাসরি হারাম কাজে সহযোগিতা করে, তাহলে বিধান ভিন্ন হতে পারে।
দ্বিতীয় বিষয় হলো, ফেসবুক ব্যবহার ও বিজ্ঞাপনের আয়:
ফেসবুক একটি বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম। সেখানে বৈধ কনটেন্ট প্রকাশ করা এবং তার বিনিময়ে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পাওয়া মৌলিকভাবে জায়েজ। তবে বাস্তবতা হচ্ছে ফেসবুক ইউজারদের যেই অর্থ প্রদান করে তার একটা বড় অংশ আসে তাদের প্রচারিত বিজ্ঞাপন থেকে। আর সেখানে অনেক হালাম পণ্য, বস্তু এবং সার্ভিসের বিজ্ঞাপন, জুয়ার বিজ্ঞাপনও থাকে, ফলে তাদের উপার্জন নিশ্চিত হালাল বলা যায় না। একারণেই উলামায়ে কেরাম এই উপার্জন গ্রহন না করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
সুতরাং প্রয়োজনে ফেসবুক চালানোর অবকাশ থাকলেও তার উপার্জন গ্রহন করা থেকে বিরত থাকাই সতর্কতা।
فقه البیوع: (325/1، ط: مکتبة معارف القرآن) ولكن معظم استعمال التلفزيون في عصرنا في برامج لاتخلو من محظور شرعي، وعامة المشترين يشترونه لهذه الأغراض المحظورة من مشاهدة الأفلام والبرامج الممنوعة، إن كان هناك من لا يقصد به ذلك. فبما أن غالب استعماله في مباح ممكن فلا نحكم الكراهة التحريمية في بيعه مطلقا، إلا إذا تمحض لمحظور، ولكن نظرا إلى أن معظم استعماله لا يخلو من كراهة تنزيهية . وعلى هذا فينبغي أن يتحوط المسلم في اتخاذ تجارته مهنة له في الحالة الراهنة إلا إذا هيأ الله تعالی جوا يتمحض أو يكثر فيه استعمال المباح
অমুসলিম দেশের পণ্য আমদানি:
পণ্যটি হালাল ও বৈধ হলে এবং আমদানি-চুক্তিতে শরিয়তবিরোধী বিষয় না থাকলে তা মূলত জায়েজ। পণ্যটি আমেরিকা বা অন্য কোনো অমুসলিম দেশে উৎপাদিত হওয়া কিংবা বিক্রেতার আর্থিক লাভ হওয়া একে হারাম করে না।
ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয়কারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন:
কোনো প্রতিষ্ঠানের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়, তা জানা থাকলেই তার সঙ্গে প্রতিটি বৈধ লেনদেন হারাম হয়ে যায় না। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট কুফরি বা হারাম কর্মকাণ্ডকে অর্থায়ন করার উদ্দেশ্যে সরাসরি অর্থ প্রদান, কিংবা সে কাজে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত—
اشْتَرَى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ يَهُودِيٍّ طَعَامًا وَرَهَنَهُ دِرْعَهُ
রাসুলুল্লাহ ﷺ একজন ইহুদির কাছ থেকে খাদ্যদ্রব্য কিনেছিলেন এবং তাঁর কাছে নিজের বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন।—সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫১৩।
সার কথা হলো, কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহে হানাফির উপরিউক্ত দলিলগুলোর ভিত্তিতে বলা যায়—অমুসলিমকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করা, ফেসবুক ইউটিউব ব্যবহার করা মাত্রই কুফরি কাজে সহযোগিতা নয়। বরং যদি সরাসির সেই কাজের মাধ্যমে কুফরি কাজে সহযোগিতা করা হয় তাহলে সেটা না জায়েজ হবে। এমনিভাবে অমুসলিম দেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যও নিষিদ্ধ নয়।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন