নামাজ, রোজা না করলে কোনো শাস্তি নেই! বাউল মতবাদ! পর্ব—১৯
নামাজ, রোজা না করলে কোনো শাস্তি নেই! বাউল মতবাদ! পর্ব—১৯
নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত প্রভৃতি ইসলামের মৌলিক ভিত্তি। এগুলো যথাযথভাবে পালন করলে যেমন মহান প্রতিদানের ওয়াদা রয়েছে, তেমনি অবহেলা বা পরিত্যাগ করলে কঠোর শাস্তির কথাও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাউল ধর্মে কী বলে?
বাউল সম্রাট লালন ফকির লিখেছে—
না করিলে নামাজ রোজা, হাশরে হয় যদি সাজা
চল্লিশ বছর নামাজ কাজা করেছেন রসুল দয়াময়। —অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৬৩
এই বক্তব্য দ্বারা লালন ফকির দু'টো বিষয়ের দাবি করেছে—
এক. নামাজ-রোজা না করলে তার কোনো শাস্তি হবে না!
দুই. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৪০ বছর নামাজ কাজা করেছেন!
ইসলাম কী বলে?
এক. নামাজ-রোজা না করলে তার কোনো শাস্তি হবে না?
যে ব্যক্তি নামাজ আদায় না করবে, তার জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে কঠিন শাস্তি। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করে প্রশ্ন করবেন—
مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوْمِ الدِّين حَتَّى أَتَانَا الْيَقِينُ
“কোন জিনিস তোমাদেরকে জাহান্নামে দাখিল করেছে? তারা বলবে, ‘আমরা নামাজীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আমরা মিসকীনদেরকে খাবার দিতাম না। আর যারা অহেতুক আলাপ-আলোচনায় মগ্ন হতো, আমরাও তাদের সঙ্গে তাতে মগ্ন হতাম। এবং আমরা কর্মফল দিবসকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতাম।” –(সুরা মুদ্দাসসির : ৪২-৪৭)
উক্ত আয়াতে নামাজ না পড়াকে জাহান্নামে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং, আয়াত থেকে স্পষ্ট হলো—নামাজ পরিত্যাগের ফলাফল জাহান্নামের শাস্তি। এছাড়া, সহিহ হাদিসে হযরত আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
أَوَّلُ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِياَمَةِ الصَّلاَةُ يُنْظَرُ فِيْ صَلاَتِهِ فَإنْ صَلَحَتْ فَقَدْ أفْلَحَ وإنْ فَسَدَتْ خاَبَ وَخَسِرَ
“কিয়ামতের দিন বান্দা সর্বপ্রথম যে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে, তা হচ্ছে নামাজ। তার নামাজের দিকে দৃষ্টিপাত করা হবে। যদি তার নামায সংশোধন বা বিশুদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে সে মুক্তি পেয়ে যাবে। আর তার নামায যদি বরবাদ থাকে, তাহলে সে ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যাবে।” –আত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ১ পৃ. ১৯০
এমনিভাবে রোজার ব্যাপারেও হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, হযরত আবু উমামাহ বাহেলী রা. কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন; আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
بَيْنا أنا نائمٌ إذ أتاني رَجُلانِ فأخَذا بضَبْعَيَّ فأتَيا بي جَبَلًا وَعْرًا فقالا لي: اصعَدْ، فقُلتُ: إنِّي لا أُطيقُه، فقالا: إنّا نُسَهِّلُه لكَ، فصَعَدتُ حتّى إذا كُنتُ في سَواءِ الجَبَلِ إذا أنا بأصواتٍ شَديدةٍ، فقُلتُ: ما هذه الأصواتُ؟ قالوا: هذا عُواءُ أهلِ النّارِ، ثمَّ انطَلَق بي، فإذا أنا بقَومٍ مُعَلَّقين بعَراقيبِهِم مُشَقَّقةً أشداقُهم، تَسيلُ أشداقُهم دَمًا، قالَ: قُلتُ: مَن هَؤلاءِ؟ قالَ: هَؤلاءِ الَّذين يُفطِرون قَبْلَ تَحِلَّةِ صَومِهِم
“একদা আমি ঘুমিয়ে ছিলাম; এমন সময় (স্বপ্নে) আমার নিকট দুই ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তাঁরা আমার উভয় বাহুর ঊর্ধ্বাংশে ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ের নিকট উপস্থিত করলেন এবং বললেন, ‘আপনি এই পাহাড়ে চড়ুন।’ আমি বললাম, ‘এ পাহাড়ে চড়তে আমি অক্ষম।’ তাঁরা বললেন, ‘আমরা আপনার জন্য চড়া সহজ করে দেব।’ সুতরাং আমি চড়ে গেলাম। অবশেষে যখন পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন বেশ কিছু চিৎকার-ধ্বনি শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ‘এ চিৎকার-ধ্বনি কাদের?’ তাঁরা বললেন, ‘এ হল জাহান্নামবাসীদের চীৎকার-ধ্বনি।’ পুনরায় তাঁরা আমাকে নিয়ে চলতে লাগলেন। হঠাৎ দেখলাম একদল লোক তাদের পায়ের গোড়ালির উপর মোটা শিরায় (বাঁধা অবস্থায়) লটকানো আছে, তাদের কশগুলো কেটে ও ছিঁড়ে আছে এবং কশ বেয়ে রক্তও ঝরছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, আমি বললাম, ‘ওরা কারা?’ তাঁরা বললেন, ‘ওরা হল তারা; যারা সময় হওয়ার পূর্বে-পূর্বেই ইফতার করে নিতো।” –মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস নং : ১৫৮৮
এই হাদিস থেকে জানা যায়—যারা রোজা রেখেও ইফতারের সময় আগেই ভক্ষণ করে, তাদের জন্য জাহান্নামে কঠোর শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। ভাবুন, রোজা রাখার পরও তাদের অবস্থাই এমন কঠিন, তাহলে যারা সম্পূর্ণ দিন রোজা রাখে না বা পুরো মাস রোজা পালন থেকে বিরত থাকে, তাদের অবস্থা কতটা করুণ ও জটিল হবে তা সহজেই অনুমেয়। তাই, ‘নামাজ বা রোজা না করলে কোনো শাস্তি হবে না’—এ ধরনের দাবি সম্পূর্ণ কুফরী ও ভ্রান্ত।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি ৪০ বছর নামাজ কাজা করেছেন—এ ধরনের দাবি নিতান্তই হাস্যকর এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানের প্রতি চরম অবমাননা। লালন ফকির মূলত এই বক্তব্যের মাধ্যমে নবুওয়াত প্রাপ্তীর পূর্ববর্তী ৪০ বছরের কথা উল্লেখ্য করেছে। অথচ নামাজ ফরজ হয়েছে নবুওয়াত প্রাপ্তীর পর, মেরাজের রাতে। নবুওয়াতের পূর্ববর্তী সেই ৪০ বছরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর নামাজ ফরজই ছিল না। তাহলে কাজা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এটা কী অবান্তর প্রশ্ন না? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অপমানজনক মন্তব্য নয়?
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআনের চেয়ে মুমিন দামী! হেযবুত তওহীদ। পর্ব–১৬
পবিত্র কুরআন সরাসরি আল্লাহপাকের কালাম। পৃথিবীর সব কিছু মাখলুক হলেও আল্লাহ-র কালাম মাখলুক নয়। সুতরাং ...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৩৪৮১
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন