নবীজি সা. আউয়াল-আখের, বাতেন-জাহের! বাউল মতবাদ! পর্ব—১৪
নবীজি সা. আউয়াল-আখের, বাতেন-জাহের! বাউল মতবাদ! পর্ব—১৪
নিঃসন্দেহে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা হলো ঈমানের প্রকৃত প্রতীক। কোনো ব্যক্তির অন্তরে যদি তাঁর প্রতি এই ভালবাসা না থাকে, তবে সে কখনো প্রকৃত অর্থে ইমানদার হতে পারবে না। তদুপরি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য জীবন উৎসর্গ করার মানসিকতা আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত থাকা উচিত। কিন্তু এই মহিমান্বিত ভালোবাসাকে পুঁজি করে পথভ্রষ্ট বক্তব্য প্রচার করা বা তাঁকে আল্লাহ তাআলার সমকক্ষ প্রতিষ্ঠার কোনো সুযোগ নেই।
বাউল ধর্মে কী বলা হয়?
বাউলরা ইসলাম ধর্মের অন্তর্ভুক্ত নয়; তাই তারা মুসলিমদের মুশরিক বানাতে নানা উপায় অবলম্বন করে। শিরক প্রচার ও শিরকপূর্ণ কর্মকাণ্ড তাদের মূল লক্ষ্য। উদাহরণস্বরূপ, তারা লিখেছে—
নবি আউয়াল আখের বাতেন জাহের
কখন কোন রূপাধারণ করেন কোনখানে।
আসমান জমিন জলধি পবন,
যে নবির নূরে হয় সৃজন
বলো কোথায় ছিলো সে নবির আসন,
নবি পুরুষ কি প্রকৃতি আকার তখনে। —মহাত্মা লালন, পৃ. ৯৭)
অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আউয়াল, আখের, বাতেন, জাহের।
ইসলাম কী বলে?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এ ধরনের বক্তব্য দেননি, এবং সাহাবারাও তাদের কোথাও এমন কিছু বলেননি। বরং উক্ত গানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্পষ্টভাবে আল্লাহ তাআলার সমকক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আওয়াল-আখের, জাহের-বাতেন—এগুলি একমাত্র আল্লাহ তাআলার সিফাত। কুরআন কারীমে মহান আল্লাহ বলেন—
هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ ۖ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
“তিনিই (আল্লাহ) আওয়াল (আদি), তিনিই আখের (অন্ত) এবং তিনিই জাহের (ব্যক্ত) ও তিনিই (বাতেন) গুপ্ত। তিনি সবকিছু পরিপূর্ণভাবে জানেন।” —(সুরা হাদিদ : ৩)
সুতরাং, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁকে আল্লাহ তাআলার সমকক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা নিঃসন্দেহে মুশরিক হওয়ার শামিল।
নবীজি সা. আল্লাহর নূর, তওবার ফুল, ময়নার গলার হার, তারকা ময়ূররূপে ছিলেন!
বাউল সম্প্রদায়ের মূল ভিত্তি মূর্খতা, মিথ্যাচার এবং অপব্যাখ্যার ওপর। আমজনতাকে খুশি করে পকেট ভারি করতে তারা কুরআন, সুন্নাহ'র নামে মিথ্যা প্রচার করতেও তাদের বুক কাঁপে না। আল্লাহ এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামেও তারা ভূরি ভূরি মিথ্যাচার করে থাকে। তার একটি জ্বলন্ত নমুনা পেশ করছি। লালন ফকির লিখেছে—
নবি আওয়ালে আল্লাহর নূর,
দুওমেতে তওবার ফুল,
ছিওমেতে ময়নার গলার হার,
চৌঠমেতে নূর সিতারা,
পঞ্চমে ময়ূর। —মহাত্মা লালন, পৃ. ৯৯
অর্থাৎ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে আল্লাহর নূর ছিলেন, দ্বিতীয়ত তওবার ফুল, তৃতীয়ত ময়নার গলার হার, চতুর্থত তারকা এবং পঞ্চমে ময়ূর ছিলেন।
ময়ূররূপে : এমন কোনো হাদিস সহিহ সনদে বর্ণিত হয়নি। এ সম্পর্কে ‘দাকায়িকুল আখবার-এ একটি বর্ণনা রয়েছে—
إن الله تعالى خلق شجرة ولها أربعة أغصان، فسماها شجرة اليقين، ثم خلق نور محمد صلى الله عليه وسلم في حجاب من درة بيضاء مثله كمثل الطاووس، ووضعه على تلك الشجرة، فسبح عليها مقدار سبعين ألف سنة
“আল্লাহ তাআলা চার শাখা বিশিষ্ঠ একটি গাছ সৃষ্টি করে নাম দিলেন ‘সাজারাতুল ইয়াক্বিন’। অতঃপর নূরে মুহাম্মদীকে আল্লাহ ময়ূরের আকৃতিতে সৃষ্টি করতঃ শ্বেত শুভ্রপাত্রে রেখে এ অবস্থায় তিনি একাধারে সত্তর হাজার বছর আল্লাহর তাসবীহ-তাহলীলে মাশগুল থাকেন।” —দাকায়িকুল আখবার, পৃ. ৩
কিন্তু এই বর্ণনার ক্ষেত্রে কেউ কোনো সনদ দেখাতে পারেননি। অর্থাৎ এটা হাদিসের নামে জালিয়াতি।
তারকারূপে : আমাদের দেশের সুপ্রসিদ্ধ একটি ইসলামী কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত একটি খুতবার বইয়ে লেখা হয়েছে:
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ: إِنَّهُ سَأَلَ جِبْرَائِيْلَ فَقَالَ: يَا جِبْرَائِيْلُ، كَمْ عُمِّرْتَ مِنَ السِّنِيْنَ؟ فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ، لَسْتُ أَعْلَمُ غَيْرَ أَنَّ فِيْ الْحِجَابِ الرَّابِعِ نَجْماً يَطَّلِعُ فِيْ كُلِّ سَبْعِيْنَ أَلْفَ سَنَةٍ مَرَّةً، رَأَيْتُهُ اثْنَيْنِ وَسَبْعِيْنَ أَلْفَ مَرَّةً. فَقَالَ: يَا جِبْرَائِيْلُ، وَعِزَّةِ رَبِّيْ جَلَّ جَلاَلُهُ، أَنَا ذَلِكَ الْكَوْكَبُ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ.
“হযরত আবূ হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, হযরত রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরাঈল আ.-কে জিজ্ঞেস করেন—হে জিবরাঈল, আপনার বয়স কত? তিনি উত্তর দিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি এ সম্পর্কে কিছু জানি না। তবে এতটুকু বলতে পারি যে, চতুর্থ পর্দায় (আসমানে) একটি সিতারা আছে, যা প্রতি ৭০ হাজার বছর পর সেখানে উদিত হয়। আমি উহা এ যাবত ৭০ হাজার বার উদিত হতে দেখেছি। এতদশ্রবণে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে জিবরাঈল, শপথ মহান আল্লাহর ইজ্জতের, আমি সেই সিতারা। (বুখারীতে বর্ণিত)।” —সীরাতে হালবিয়াহ, খ. ১ পৃ. ৪৭
সিরাতে হালবিয়্যাতে এ ভিত্তিহীন কথাটিকে বুখারী শরীফের বরাত দিয়ে চালানো হয়েছে। অথচ বুখারীতে এমন কোনো বর্ণনা নেই। সুতরাং এটা হাদিসের নামে যেমন বানোয়াট তেমনি ইমাম বুখারী রহি.-এর নামেও অপপ্রচার। সুতরাং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে এ সমস্ত বর্ণনা করা মারাত্মক অন্যায়।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআনের তাফসীর পড়া যাবে না! হেযবুত তওহীদ পর্ব–১৭
যদি কেউ বড় শিক্ষিত হয়, তবে তার বক্তব্য বুঝতে হলে নিশ্চয় জ্ঞানী হতে হয়, অথবা জ্ঞানীদের থেকে বুঝে নিতে...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৪৪৬৯