প্রবন্ধ
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দৈহিক সৌন্দর্য ও মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব
২৭ জুলাই, ২০২৬
১৫৭
০
ভূমিকা
আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের সবার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বশেষ এবং সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন হলেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ। আল্লাহ তাআলা তাঁকে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় দিক থেকেই পূর্ণতা দান করেছেন। তাঁর চরিত্র যেমন ছিল মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ, তেমনি তাঁর দৈহিক গঠন, সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা, ব্যক্তিত্ব ও চলাফেরাও ছিল অনন্য ও অতুলনীয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা ইসলামী ঐতিহ্যে 'শামায়েলে নববী' (الشمائل النبوية/ المحمدية) নামে পরিচিত। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি), বিশেষত হিন্দ ইবন আবী হালা, আলী ইবন আবী তালিব, আনাস ইবন মালিক, জাবির ইবন সামুরা, বারা ইবন আযিবসহ বহু সাহাবি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তাঁর শারীরিক গঠন ও অবয়বের বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। পরবর্তীতে মুহাদ্দিসগণ এসব বর্ণনা আশ-শামাইলুল মুহাম্মাদিয়্যাহ (الشمائل المحمدية - الترمذي), দালায়িলুন নুবুওয়াহ (دلائل النبوة - البيهقي) এবং হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে সংকলিত করেছেন।
নবী করীম ﷺ-এর দৈহিক গঠন সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্য কেবল তাঁর সৌন্দর্যের বর্ণনা করা নয়; বরং তাঁর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করা, তাঁকে সঠিকভাবে জানা এবং সুন্নাহর অনুসরণে উদ্বুদ্ধ হওয়া। কেননা, একজন মুমিনের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিটি দিকই অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়।
কবি বলেন,
آنکھ روشن ہوگئے قلب و جگر تازہ ہوا
جب زبان پر نام سرکارِ دو عالم آگیا
যেই মুহূর্তে আমার জিহ্বায় দুই জাহানের সর্দার হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর পবিত্র নাম উচ্চারিত হলো, অমনি চোখ জুড়িয়ে গেল, হৃদয়-প্রাণ সজীব হয়ে উঠল।
مبتلائے عشق ہو قابل نہیں کچھ کام کا
عشقِ احمد نے مجھے بالکل نکما کر دیا
আহমদ ﷺ-এর প্রেম আমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করেছে যে, দুনিয়ার আর কোনো কাজেই মন বসে না; তাঁর ভালোবাসাই যেন আমাকে সবকিছু থেকে বিমুখ করে দিয়েছে।
নবী ﷺ-এর দৈহিক সৌন্দর্যের গুরুত্ব
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শারীরিক বৈশিষ্ট্য জানার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য রয়েছে:
১. স্বপ্নে সত্যতা যাচাই: সহীহ হাদীসে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখার দাবির সত্যতা যাচাই করা যায়।
২. ভালোবাসা বৃদ্ধি: তাঁর শামায়েল জানা তাঁর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি) এ কারণেই তাঁর প্রতিটি বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করেছেন।
৩. সৌন্দর্যের প্রকৃত ধারণা: ইসলামে প্রকৃত সৌন্দর্যের ধারণা স্পষ্ট হয়। প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক অবয়বে নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া, পবিত্রতা ও উত্তম চরিত্রে প্রকাশ পায়।
নবী কারীম ﷺ–এর সামগ্রিক গঠন : আল্লাহর সৃষ্টির এক অপূর্ব নিদর্শন (সংক্ষেপে)
রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর হুলিয়া মুবারক শুধু সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়; বরং তা ছিল আল্লাহ তাআলার নিখুঁত সৃষ্টিশৈলীর এক অনন্য প্রকাশ। সাহাবায়ে কেরাম (রাযি) অত্যন্ত ভালোবাসা ও গভীর পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তাঁর দেহাবয়ব বর্ণনা করেছেন, যাতে পরবর্তী উম্মত তাঁর প্রিয় নবীর রূপ-সৌন্দর্যের একটি বাস্তব চিত্র হৃদয়ে ধারণ করতে পারে।
ইমাম তিরমিযীর আশ-শামাইলুল মুহাম্মাদিয়্যাহ-র باب ما جاء في خلق رسول الله ﷺ (রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শারীরিক গঠন) অধ্যায়ে বর্ণিত রয়েছে,
নবী ﷺ ছিলেন না অতিরিক্ত লম্বা, না খাটো; বরং মধ্যমাকৃতির সুঠাম ও ভারসাম্যপূর্ণ দেহের অধিকারী। তাঁর শরীর ছিল সুগঠিত, শক্তিশালী ও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তাঁর বুক ছিল প্রশস্ত, দুই কাঁধের মধ্যবর্তী অংশ ছিল বিস্তৃত এবং কাঁধ ও বাহুর সংযোগস্থল ছিল দৃঢ় ও সুস্পষ্ট। হাতের তালু, পায়ের তলা ও আঙুলগুলো ছিল মাংসল ও বলিষ্ঠ। অস্থিগ্রন্থিগুলো ছিল শক্ত ও সুদৃঢ়, যা তাঁর শারীরিক শক্তিমত্তার পরিচয় বহন করত।
তাঁর মুখমণ্ডল ছিল অপরূপ লাবণ্যময়। পূর্ণ গোলাকার না হলেও সামান্য গোলাভ ছিল, আর তা পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় দেখাত। সাহাবাগণ বলেন, তাঁকে দেখলে মনে হতো যেন চাঁদের আলো তাঁর মুখমণ্ডলে বিকশিত হয়েছে। এমনকি পূর্ণিমার রাতে চাঁদ ও নবী ﷺ–এর মুখমণ্ডলের দিকে পর্যায়ক্রমে তাকিয়ে একজন সাহাবী অনুভব করেছিলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অধিক সুন্দর ও আকর্ষণীয়।
তাঁর বর্ণ ছিল উজ্জ্বল শুভ্র, যার মধ্যে হালকা লালিমার আভা ছিল। এ কারণেই বর্ণনায় তাঁকে ‘শুভ্র-রক্তিম’ (أبيض مشرب بحمرة) বলা হয়েছে। তাঁর কেশ মুবারক না ছিল অতিরিক্ত কোঁকড়ানো, না একেবারে সোজা; বরং সামান্য ঢেউ খেলানো। কখনো তা কর্ণমূল পর্যন্ত, কখনো কানের লতি বা কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছাত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কপাল ছিল প্রশস্ত ও উজ্জ্বল (واسع الجبين)। ভ্রুদ্বয় ছিল দীর্ঘ, সরু ও সুন্দর (أزج الحواجب); তবে পরস্পর সংযুক্ত ছিল না (سوابغ في غير قرن)। দূর থেকে সংযুক্ত মনে হলেও কাছে গেলে পৃথক বোঝা যেত। ভ্রুদ্বয়ের মাঝখানে একটি সূক্ষ্ম শিরা ছিল (بينهما عرق), যা রাগান্বিত হলে স্পষ্ট হয়ে উঠত।
তাঁর নাক ছিল উঁচু, সুঠাম ও সুন্দর আকৃতির (أقنى العرنين)। গাল ছিল মসৃণ ও পরিমিত (سهل الخدين)। মুখ ছিল তুলনামূলক প্রশস্ত (ضلع الفم), যা তাঁর স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল বক্তব্যের সঙ্গে মানানসই ছিল।
নবী ﷺ–এর চোখ ছিল বড়, গভীর কালো ও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। চোখের পাপড়ি ছিল দীর্ঘ, যা তাঁর দৃষ্টিকে আরও মোহনীয় করে তুলত। ভ্রূ ছিল ঘন, সুন্দরভাবে বাঁকানো এবং পরস্পর সংযুক্ত ছিল না। নাসিকা ছিল দীর্ঘ, সুঠাম ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। দাঁড়ি ছিল ঘন ও পরিপূর্ণ। সামনের দাঁত দুটির মাঝে সামান্য ফাঁক ছিল; কথা বলার সময় মনে হতো যেন সেই ফাঁক দিয়ে নূরের ঝলক বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
তাঁর গ্রীবা ছিল হাতির দাঁতের মতো মসৃণ ও উজ্জ্বল। বুক থেকে নাভি পর্যন্ত একটি সরু পশমরেখা ছিল, তবে বুক ও উদর লোমে আচ্ছাদিত ছিল না। শরীরের অন্যান্য অনাবৃত অংশ ছিল পরিচ্ছন্ন, উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর পদচারণাও ছিল অনন্য। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতেন, সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে দ্রুত ও স্বাভাবিক গতিতে চলতেন। তাঁকে দেখে মনে হতো যেন উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে অবতরণ করছেন। তিনি যখন কোনো দিকে তাকাতেন, তখন কেবল চোখ নয়; বরং সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ফিরিয়ে তাকাতেন, যা ছিল ভদ্রতা ও মনোযোগের অনুপম শিক্ষা।
তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে মোহরে নবুওয়াত (নবুওয়াতের সীলমোহর) বিদ্যমান ছিল, যা তাঁর নবুওয়াতের অন্যতম আলামত।
সবশেষে সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত সাক্ষ্য ছিল, “আমরা তাঁর পূর্বে কিংবা পরে তাঁর মতো সুন্দর, সুশ্রী ও লাবণ্যময় মানুষ আর কাউকে দেখিনি।” এই সাক্ষ্যই প্রমাণ করে, আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বশেষ রাসূল ﷺ–কে বাহ্যিক সৌন্দর্য, শারীরিক পরিপূর্ণতা এবং ব্যক্তিত্বের মহিমায় এমনভাবে ভূষিত করেছিলেন, যা মানব ইতিহাসে অতুলনীয়।
নবী করীম ﷺ-এর অবয়ব ও অঙ্গসংস্থান (বিস্তারিত)
(ক) মুখমণ্ডল
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মুখমণ্ডল ছিল অপরূপ সৌন্দর্য, জ্যোতি ও প্রশান্তির প্রতীক। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি) তাঁর চেহারা মুবারকের বর্ণনা দিতে গিয়ে সর্বাধিক যে উপমা ব্যবহার করেছেন, তা হলো, পূর্ণিমার চাঁদ (القمر ليلة البدر)।
হিন্দ ইবন আবী হালা (রাযি) বলেন, يَتَلَأْلَأُ وَجْهُهُ تَلَأْلُؤَ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ "তাঁর মুখমণ্ডল পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল ছিল।"
জামি' আত-তিরমিযী (কিতাবুল মানাকিব - باب صفة النبي ﷺ, হাদীস ২৮১১) ও সহীহ মুসলিম-এর باب شيبه ﷺ وصفته অনুচ্ছেদে হযরত জাবির ইবন সামুরা (রাযি) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: فَلَهُوَ عِنْدِي أَحْسَنُ مِنَ الْقَمَرِ "এক রাতে আমি পূর্ণিমার চাঁদ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার কাছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-ই চাঁদের চেয়ে অধিক সুন্দর মনে হয়েছে।"
তাঁর মুখমণ্ডলে সর্বদা প্রশান্তি, মর্যাদা ও নূরের ছাপ ফুটে থাকত। তাঁকে দেখলে মানুষের অন্তরে স্বাভাবিকভাবেই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সৃষ্টি হতো।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা সিদ্দীকা, তাইয়্যিবা, তাহিরা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেন যে, বিশ্বজগতের সর্দার রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন গৃহে আগমন করতেন, তখন তিনি হাস্যোজ্জ্বল ও প্রফুল্ল চেহারায় আসতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রশংসায় তিনি এভাবে কাব্যিক ভাষায় বলতেন,
لنا شمسٌ وللآفاق شمسٌ
وشمسي خيرٌ من شمسِ السماءِ
فإنَّ الشمس تطلعُ بعد فجرٍ
وشمسي طالعٌ بعد العشاءِ
আমাদেরও এক সূর্য আছে, আর দিগন্তেরও একটি সূর্য আছে;
আর আমার সেই সূর্য আকাশের সূর্যের চেয়েও অধিক শ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত।
কারণ, আকাশের সূর্য উদিত হয় ফজরের পর,
আর আমার সেই সূর্য উদিত হন ইশার পর।
এখানে “আমার সূর্য” দ্বারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসা ও কাব্যিক উপমার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, যেমন সূর্য পৃথিবীকে আলো ও উষ্ণতা দান করে, তেমনি রাসূলুল্লাহ ﷺ সমগ্র মানবজাতির জন্য হিদায়াত, নূর ও রহমতের উৎস। আল্লাহ তাআলা বলেন:
قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ
“নিশ্চয় তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নূর ও সুস্পষ্ট কিতাব এসে গেছে।” (সূরা আল-মায়িদা, ৫:১৫)
এই কবিতার মূল উদ্দেশ্য হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও মহব্বতের প্রকাশ। যেমন আকাশের সূর্য জগতকে আলোকিত করে, তেমনি নবী করীম ﷺ-এর আগমনে অজ্ঞতা ও অন্ধকার দূর হয়ে মানবজাতি হিদায়াতের আলো লাভ করেছে। তাঁর আগমন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত ও সৌভাগ্যের কারণ হয়েছে।
(খ) দাঁত ও হাসি
আশ-শামাইলুল মুহাম্মাদিয়্যাহ-র باب ما جاء في ضحك رسول الله ﷺ (রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাসি) এবং সহীহ বুখারী ও মুসলিম-এর বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাঁত ছিল অত্যন্ত শুভ্র, পরিচ্ছন্ন ও মনোমুগ্ধকর। সামনের দাঁতগুলোর মাঝে সামান্য ফাঁক ছিল (مفلج الأسنان), যা তাঁর সৌন্দর্যকে আরও বৃদ্ধি করেছিল। তিনি যখন কথা বলতেন বা মুচকি হাসতেন, তখন দাঁতের শুভ্রতা মুক্তার মতো ঝলমল করত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো অট্টহাসি হাসতেন না; তাঁর অধিকাংশ হাসিই ছিল মৃদু হাসি বা কোমল মুচকি হাসি (جل ضحكه التبسم)।
জামি' আত-তিরমিযী (باب في ضحك النبي ﷺ, হাদীস ৩৬৪১)-তে হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস (রাযি) বলেন: مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ تَبَسُّمًا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ "আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চেয়ে অধিক হাস্যোজ্জ্বল কাউকে দেখিনি।"
হযরত জাবির ইবন সামুরা (রাযি) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন হাসতেন, তখন তাঁর দাঁত শিলাবৃষ্টির সাদা দানার মতো ঝলমল করত (كأنه حب الغمام)। তাঁর হাসি ছিল সংযত, মার্জিত ও আন্তরিক। তাঁর এই হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ছিল তাঁর মহান চরিত্র, বিনয় এবং উত্তম আচার-আচরণের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
(গ) চোখ
আশ-শামাইলুল মুহাম্মাদিয়্যাহ ও দালায়িলুন নুবুওয়াহ-র বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চোখ ছিল বড়, আকর্ষণীয় ও অত্যন্ত সুন্দর (أدعج العينين)।
হিন্দ ইবন আবী হালা (রাযি) বলেন, তাঁর চোখ ছিল প্রশস্ত (أشكل العينين)। চোখের সাদা অংশ ছিল অত্যন্ত শুভ্র এবং কালো অংশ ছিল গভীর কালো (شديد سواد العين)। চোখের পাপড়ি ছিল দীর্ঘ ও ঘন (أشفار العينين طوال)।
তিনি অধিকাংশ সময় দৃষ্টি নিচু রাখতেন। আকাশের তুলনায় জমিনের দিকেই বেশি তাকাতেন (جل نظره إلى الأرض)। তাঁর দৃষ্টি ছিল চিন্তাশীল ও পর্যবেক্ষণমূলক। অকারণে এদিক-সেদিক তাকানো তাঁর অভ্যাস ছিল না। কোনো ব্যক্তির দিকে তাকালে তিনি পূর্ণ মনোযোগসহ তাকাতেন এবং কারও সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতেন।
(ঘ) চুল ও দাড়ি
সহীহ বুখারী (কিতাবুল লিবাস - باب الجُمَّة واتخاذ الشعر), সহীহ মুসলিম এবং শামাইলের باب ما جاء في شعر رسول الله ﷺ অধ্যায়ের বর্ণনা অনুযায়ী:
চুল: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চুল ছিল ঘন, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন। তা একেবারে সোজা ছিল না, আবার অতিরিক্ত কোঁকড়ানোও ছিল না; বরং হালকা ঢেউখেলানো (رجل الشعر) ছিল। চুলের দৈর্ঘ্য সব সময় একরকম ছিল না। কখনো তা কানের লতি পর্যন্ত (إلى لقمة أذنيه), কখনো কাঁধ পর্যন্ত (إلى منكبيه) এবং কখনো এর মধ্যবর্তী অবস্থায় থাকত। যখন চুল বড় হতো, তখন তিনি মাঝখান দিয়ে সিঁথি করতেন (فَرق شعره)। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি) তাঁর চুলের পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাট্যের বিশেষ উল্লেখ করেছেন।
দাড়ি: সহীহ বুখারী (باب إعفاء اللحى) ও শামাইলের বর্ণনামতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাড়ি ছিল ঘন, পূর্ণ ও সুসজ্জিত (كث اللحية / كثيف اللحية)। তা তাঁর মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। তিনি দাড়ির যথাযথ পরিচর্যা করতেন এবং উম্মতকেও দাড়ি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
(ঙ) ঠোঁট ও গর্দান
আশ-শামাইলুল মুহাম্মাদিয়্যাহ ও বাইহাকীর দালায়িলুন নুবুওয়াহ-র বর্ণনা অনুযায়ী:
ঠোঁট: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঠোঁট ছিল পরিমিত, সুন্দর ও স্বাভাবিক আকৃতির। তাঁর মুখমণ্ডলের প্রতিটি অঙ্গের মতো ঠোঁটও ছিল অত্যন্ত সুষম ও মনোহর। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন তাঁর ঠোঁট থেকে স্পষ্ট, প্রাঞ্জল ও মধুর বাক্য বের হতো।
গর্দান: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর গর্দান ছিল দীর্ঘ, উজ্জ্বল ও অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। সাহাবায়ে কেরাম (রাযি) তাঁর গর্দানের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: عُنُقُهُ كَأَنَّهُ جِيدُ دُمْيَةٍ فِي صَفَاءِ الْفِضَّةِ "তাঁর গর্দান যেন রূপার তৈরি সুসংগঠিত পুতুল বা কলসের গলার মতো নির্মল ও দীপ্তিময় ছিল।"
(চ) গাত্রবর্ণদ
সহীহ বুখারী (কিতাবুল মানাকিব - باب صفة النبي ﷺ), সহীহ মুসলিম (কিতাবুল ফাযায়িল) এবং শামাইলের باب ما جاء في خلق رسول الله ﷺ অনুচ্ছেদে হযরত আনাস (রাযি) সহ অন্যান্য সাহাবীদের বর্ণনায় উল্লেখ আছে:
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর গাত্রবর্ণ ছিল উজ্জ্বল শুভ্র, যার সঙ্গে হালকা লাল আভা মিশ্রিত ছিল (أزهر اللون / أبيض مشربًا بحمرة)। তিনি অতিরিক্ত ধবধবে ফর্সাও ছিলেন না (ليس بالأمهَق), আবার গাঢ় বর্ণেরও ছিলেন না (ولا الآدم); বরং তাঁর দেহে ছিল অপূর্ব উজ্জ্বলতা ও সজীবতা। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি) বলেন, তাঁর শরীর থেকে যেন নূরের আভা বিচ্ছুরিত হতো। এই সৌন্দর্য ছিল নবুওয়তের মর্যাদা, পবিত্রতা ও আল্লাহপ্রদত্ত নূরেরই বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশ।
(ছ) কাঁধ, বুক, হাত-পা ও অন্যান্য অঙ্গ
ইমাম সুয়ূতীর আল-খাসায়িসুল কুবরা এবং বাইহাকীর দালায়িলুন নুবুওয়াহ-র রিওয়ায়াত থেকে জানা যায়:
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দেহাবয়ব ছিল অত্যন্ত সুষম, বলিষ্ঠ ও সুগঠিত (معتدل الخلق)। তিনি না অতিরিক্ত স্থূল ছিলেন, না অতিরিক্ত রোগা।
বুক ও কাঁধ: তাঁর বুক ও পেট ছিল সমান (سواء البطن والصدر)। বুক ছিল প্রশস্ত (عريض الصدر) এবং দুই কাঁধের মধ্যবর্তী অংশ ছিল বিস্তৃত (بعيد ما بين المنكبين)।
হাত ও পা: তাঁর হাড়ের সন্ধিস্থলগুলো ছিল দৃঢ় ও সুগঠিত (জালিলুল আযাম)। বাহুদ্বয় ছিল দীর্ঘ এবং হাতের তালু ছিল প্রশস্ত ও কোমল (رحب الراحة / لين الكف)। আঙুলগুলো ছিল পরিমিত ও সুন্দর (শাতনুল আতরাফ)। তাঁর পায়ের তলদেশে স্বাভাবিক খাঁজ ছিল (খামসুন আখমাসায়ন) এবং পদযুগল ছিল মসৃণ ও পরিচ্ছন্ন (মাসীহুল কাদামায়ন)।
দেহের লোমরেখা: গলার নিচ থেকে নাভি পর্যন্ত একটি সরু লোমরেখা ছিল (মশরূবা) এবং কাঁধ, বাহু ও বুকের উপরের অংশে পরিমিত লোম ছিল।
মোহরে নবুওয়াত (خاتم النبوة)
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিশেষ শারীরিক নিদর্শনগুলোর অন্যতম ছিল তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে অবস্থিত মোহরে নবুওয়াত। সহীহ মুসলিম (কিতাবুল ফাযায়িল - باب إثبات خاتم النبوة) ও আশ-শামাইল-এর باب ما جاء في خاتم النبوة অধ্যায়ে এর বর্ণনা রয়েছে।
এটি ছিল তাঁর নবুওয়াতের আলামত, যা পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবসমূহেও উল্লেখিত ছিল। হযরত জাবির ইবন সামুরা (রাযি) বলেন:
رَأَيْتُ الْخَاتَمَ بَيْنَ كَتِفَيْ رَسُولِ اللَّه صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غُدَّةً حَمْرَاءَ مِثْلَ بيضة الحمامة
"আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুই কাঁধের মাঝখানে মোহরে নবুওয়াত দেখেছি। এটি ছিল কবুতরের ডিমের মতো গোলাকার ও সামান্য উঁচু রুগ্ন গোশতের মতো, যা তাঁর শরীরের বর্ণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।"
হযরত সালমান আল-ফারসি (রাযি) এই মোহরে নবুওয়াত দেখেই নিশ্চিত হন যে, মুহাম্মদ ﷺ-ই সেই প্রতিশ্রুত শেষ নবী।
কণ্ঠস্বর, ভাষা ও সুগন্ধি
(ক) কণ্ঠস্বর ও বাকশৈলী
সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও শামাইলের باب ما جاء في كلام رسول الله ﷺ অধ্যায় থেকে সংকলিত:
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কণ্ঠস্বর ছিল স্পষ্ট, সুমধুর ও প্রভাবপূর্ণ (صَادِعٌ / جَهْوَرِيٌّ)। তিনি ধীরে, পরিষ্কার ও সুস্পষ্টভাবে কথা বলতেন (كَلَامًا فَصْلًا)، যাতে শ্রোতারা সহজেই তাঁর প্রতিটি শব্দ বুঝতে পারত। প্রয়োজন হলে একটি কথা তিনবার পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি করতেন (يُعِيدُ الْكَلِمَةَ ثَلَاثًا)।
হযরত আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন: «مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْرُدُ سَرْدَكُمْ هَذَا، وَلَكِنَّهُ كَانَ يَتَكَلَّمُ بِكَلَامٍ بَيِّنٍ فَصْلٍ يَحْفَظُهُ مَنْ جَلَسَ إِلَيْهِ» — "রাসূলুল্লাহ ﷺ তোমাদের মতো দ্রুত কথা বলতেন না; বরং তিনি এমনভাবে স্পষ্ট ও পৃথকভাবে কথা বলতেন যে, উপস্থিত ব্যক্তি তা সহজেই মুখস্থ করতে পারত।"
(খ) সুগন্ধ ও পরিচ্ছন্নতা
সহীহ মুসলিম (কিতাবুল ফাযায়িল - باب طيب رائحة النبي ﷺ) ও শামাইলের باب ما جاء في عرق رسول الله ﷺ অনুসরণে:
রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন সর্বাধিক পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র স্বভাবের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা তাঁর দেহ মুবারককে এমন স্বাভাবিক সুগন্ধ দান করেছিলেন, যা পৃথিবীর কোনো সুগন্ধির সঙ্গে তুলনীয় ছিল না।
হযরত আনাস ইবন মালিক (রাযি) বলেন: مَا شَمَمْتُ عَنْبَرًا قَطُّ وَلَا مِسْكًا وَلَا شَيْئًا أَطْيَبَ مِنْ رِيحِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ — "আমি কখনো কস্তুরী বা আমবরের এমন সুগন্ধ পাইনি, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শরীরের সুগন্ধের চেয়ে উত্তম।"
সহীহ মুসলিম-এর অপর বর্ণনায় এসেছে, হযরত উম্মে সুলাইম (রাযি) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘাম সংগ্রহ করে সুগন্ধির সঙ্গে মিশিয়ে রাখতেন (يَجْمَعْنَ عَرَقَهُ فِي طِيبِهِنَّ)। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিয়মিত মিসওয়াক ব্যবহার করতেন (সহীহ বুখারী: باب السواك) এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে শিক্ষা দিতেন।
চলাফেরা ও শারীরিক ব্যক্তিত্ব
আশ-শামাইলুল মুহাম্মাদিয়্যাহ-র باب ما جاء في مشية رسول الله ﷺ (রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাঁটাচলা) অধ্যায়ে হিন্দ ইবন আবী হালা (রাযি) বলেন:
إِذَا مَشَى تَكَفَّأَ تَكَفُّؤًا كَأَنَّمَا يَنْحَطُّ مِنْ صَبَبٍ
"তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতেন। মনে হতো যেন উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে সহজভাবে নেমে আসছেন।"
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চলাফেরায় ছিল গাম্ভীর্য, আত্মবিশ্বাস ও বিনয়ের অপূর্ব সমন্বয়। তিনি অলস বা উদাসীন ভঙ্গিতে হাঁটতেন না; আবার অহংকারভরে বুক ফুলিয়েও চলতেন না।
কোনো দিকে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন হলে তিনি শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে নয়; বরং পুরো শরীরসহ ফিরে তাকাতেন (إِذَا الْتَفَتَ الْتَفَتَ جَمِيعًا)। এটি ছিল তাঁর পূর্ণ মনোযোগ ও উত্তম আদবের পরিচায়ক। তিনি অধিকাংশ সময় দৃষ্টি নিচু রাখতেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি)-কে তিনি নিজের সামনে চলতে দিতেন এবং নিজে তাঁদের পেছনে হাঁটতেন। কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তিনিই আগে সালাম দিতেন (يَبْدَأُ مَنْ لَقِيَهُ بِالسَّلَامِ)।
সাহাবায়ে কিরামের অনুভূতি ও কবি হাসসানের পঙ্ক্তি
সাহাবায়ে কিরামের অনুভূতি
আশ-শামাইলুল মুহাম্মাদিয়্যাহ-র সংকলনে হযরত আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর চমৎকার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন:
«مَنْ رَآهُ بَدِيهَةً هَابَهُ، وَمَنْ خَالَطَهُ مَعْرِفَةً أَحَبَّهُ، يَقُولُ نَاعِتُهُ: لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ»
"যে ব্যক্তি হঠাৎ তাঁকে দেখত, সে তাঁর ব্যক্তিত্বে অভিভূত হয়ে যেত। আর যে তাঁর সঙ্গে মেলামেশা করত, সে তাঁকে ভালোবেসে ফেলত। তাঁর গুণ বর্ণনাকারী বলতেন: তাঁর মতো কাউকে আমি তাঁর আগে বা পরে আর দেখিনি।"
হাসসান ইবন সাবিত (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কবিতা
ইবন কাসীরের আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ও দীওয়ানু হাসসান ইবন সাবিত-এ বর্ণিত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রশংসায় সাহাবি কবি হাসসান ইবন সাবিত (রাযি)-এর সেই বিখ্যাত কাব্যগাথা:
وَأَحْسَنُ مِنْكَ لَمْ تَرَ قَطُّ عَيْنِي
وَأَجْمَلُ مِنْكَ لَمْ تَلِدِ النِّسَاءُ
خُلِقْتَ مُبَرَّءً مِنْ كُلِّ عَيْبٍ
كَأَنَّكَ قَدْ خُلِقْتَ كَمَا تَشَاءُ
আপনার চেয়ে সুন্দর কাউকে আমার চোখ কখনো দেখেনি।
আপনার চেয়ে অধিক সৌন্দর্যমণ্ডিত কাউকে কোনো নারী জন্ম দেয়নি।
আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র করে।
মনে হয়, আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে ঠিক আপনার ইচ্ছামতো।
সুতরাং, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শামায়েল বা শারীরিক বৈশিষ্ট্যের আলোচনা কেবল ঐতিহাসিক তথ্য জানার জন্য নয়; বরং তাঁর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি, সুন্নাহর অনুসরণ এবং ঈমানকে সুদৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তাঁর দেহাবয়ব ছিল সৌন্দর্য, সুষমতা, পরিচ্ছন্নতা ও মর্যাদার এক অনন্য সমন্বয়। মুখমণ্ডলের জ্যোতি, সুষম দেহগঠন, পরিচ্ছন্ন চুল, ঘন দাড়ি, উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ, দৃঢ় চলাফেরা এবং বিনয়পূর্ণ ব্যক্তিত্ব-সবকিছুই ছিল আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহের নিদর্শন।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল তাঁর বাহ্যিক অবয়বে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর চরিত্র, বিনয়, দয়া, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, ধৈর্য, ন্যায়পরায়ণতা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যই তাঁর সৌন্দর্যকে পূর্ণতা দিয়েছিল। বাহ্যিক সৌন্দর্য ও উত্তম চরিত্র—এই দুইয়ের অপূর্ব সমন্বয়ই তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শে পরিণত করেছে।
একজন মুমিনের কর্তব্য হলো নবী করীম ﷺ-এর প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা লালন করা, তাঁর শামায়েল জানা, সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। কারণ আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন:
﴿لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ﴾
"নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।" — (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১)
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শামায়েল সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন, তাঁর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি এবং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করে জীবন পরিচালনার তাওফীক দান করুন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
নবীদের পবিত্র জীবনীর বিকৃত উপস্থাপনঃ প্রচারকারী টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ এখন ঈমানী দায়িত্ব!
নবীদের পবিত্র জীবনীর বিকৃত উপস্থাপনঃ প্রচারকারী টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ এ...
দু'টি ধারা : কিতাবুল্লাহ ও রিজালুল্লাহ
হিদায়াতের মূল উৎস কুরআন সুন্নাহ'র শিক্ষা। এ শিক্ষা অর্জন করতে হবে শিক্ষকের মাধ্যমে। শিক্ষকের মাধ্যম...
کیا تورات و انجیل کی تلاوت بطور وظیفہ درست ہے؟
مولانا سید مناظر احسن گیلانی ( ۱ ) ( ۱۸۹۲ = ۱۹۵۶) نے ”تدوین قرآن“ کے موضوع کے روایتی ذخیرے پر جو شک...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন