প্রবন্ধ
সাহাবায়ে কেরামের যুহদ
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৬১৫
০
ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরাম রাযি. এমন এক অনন্য প্রজন্ম, যাদের জীবন ছিল ঈমান, তাকওয়া, ইবাদত, ত্যাগ, আত্মসংযম এবং আখিরাতমুখী চিন্তার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁদের মধ্যে কেউ ছিলেন বিপুল সম্পদের অধিকারী, কেউ ছিলেন দরিদ্র; কেউ ছিলেন শাসক, কেউ ছিলেন ব্যবসায়ী; কেউ যুদ্ধের ময়দানে, কেউ মসজিদের নির্জনতায়। কিন্তু তাঁদের জীবনধারার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য ছিল এক—দুনিয়া তাঁদের হাতে ছিল, অন্তরে নয়।
সাহাবিদের যুহদ বুঝতে হলে প্রথমেই একটি ভুল ধারণা দূর করা প্রয়োজন। যুহদ অর্থ সম্পদকে হারাম মনে করা নয়, সুন্দর পোশাক পরাকে হারাম মনে করা নয়, পরিবার-পরিজন ত্যাগ করা নয় এবং বৈধ উপার্জন ছেড়ে দেওয়া তো নয়ই। বরং যুহদ হলো—আল্লাহর সন্তুষ্টির তুলনায় দুনিয়াকে তুচ্ছ মনে করা; প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসে হৃদয়কে বন্দী না করা; আল্লাহ যা দিয়েছেন তা ব্যবহার করা, কিন্তু তার প্রতি হৃদয়ের আসক্তি তৈরি না করা।
সাহাবায়ে কেরামের জীবন এ সত্যের উজ্জ্বল প্রমাণ। তাঁরা বৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন, ব্যবসা করেছেন, কৃষিকাজ করেছেন, সম্পদ ব্যয় করেছেন; কিন্তু সম্পদ তাঁদের লক্ষ্য হয়ে ওঠেনি।
যুহদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নববী মানদণ্ড
হযরত সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি.-এর বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ اللهَ يُحِبُّ العَبْدَ التَّقِيَّ، الغَنِيَّ، الخَفِيَّ»
“নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন বান্দাকে ভালোবাসেন, যে তাকওয়াবান, অন্তরে পরিতৃপ্ত/অন্যের মুখাপেক্ষী নয় এবং প্রচারবিমুখ।” -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯৬৫।
এখানে “الغني” দ্বারা মূলত অন্তরের ঐশ্বর্য ও মানুষের কাছে অমুখাপেক্ষিতা বোঝানো হয়েছে।
এই হাদীসের বাস্তব প্রয়োগ আমরা সাহাবায়ে কেরামের জীবনেই দেখতে পাই।
আবু বকর সিদ্দীক রাযি.—সম্পদ ছিল, কিন্তু সম্পদের প্রতি আসক্তি ছিল না
সাহাবায়ে কেরামের যুহদের আলোচনা করলে সর্বাগ্রে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর জীবন সামনে আসে। তিনি শুধু দরিদ্রতার কারণে যাহিদ ছিলেন না; বরং সম্পদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সম্পদের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
ইবনু হাযম রহ. সাহাবিদের যুহদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আবু বকর রাযি.-এর সম্পদ ব্যয়, খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সরল জীবন এবং মৃত্যুর সময় মুসলিমদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
খেলাফতের পরও জীবিকার চিন্তা
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. যখন খলীফা নিযুক্ত হলেন, তখন পরদিন সকালে তিনি কাপড়ের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে বাজারের দিকে রওনা হলেন। তিনি কাপড়ের ব্যবসা করতেন।
পথে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. ও হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাযি.-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, “হে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর খলীফা! আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
তিনি বললেন, “বাজারে।”
তাঁরা বললেন, “আপনি এখন বাজারে গিয়ে কী করবেন? অথচ আপনি তো মুসলমানদের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন!”
তিনি বললেন, “তাহলে আমার পরিবারের ভরণ-পোষণ হবে কীভাবে?”
তাঁরা বললেন, “আমাদের সঙ্গে চলুন। আমরা আপনার জন্য একটি নির্দিষ্ট ভাতা নির্ধারণ করে দিচ্ছি।”
অতঃপর তাঁরা তাঁর জন্য ভাতা নির্ধারণ করলেন। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, সাহাবায়ে কেরাম তাঁর জন্য এমন পরিমাণ ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন, যাতে তাঁর প্রয়োজন পূরণ হয়—তাঁর পোশাক, সফরের বাহন এবং পরিবারের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা থাকবে; আর তা হবে তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে পরিবারে যে পরিমাণ ব্যয় করতেন, তার অনুরূপ।
অর্থাৎ, খেলাফতের মতো মহান দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হওয়ার পরও তিনি নিজের জীবিকা ও পরিবারের ভরণ-পোষণের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন না; বরং প্রথম দিনেই জীবিকার ব্যবস্থা করার চিন্তা করেছিলেন।—সূত্র: ইবনু সা‘দ, الطبقات الكبرى, ৩/১৮৪
ক্ষমতা তাঁকে সম্পদের মালিক করেনি; বরং আমানতের পাহারাদার বানিয়েছিল।
খিলাফত তাঁর কাছে সম্মানের আসন ছিল না; ছিল আল্লাহর সামনে জবাবদিহির দায়িত্ব।
রাসূল ﷺ-এর জীবনে আবু বকর রাযি.-এর কান্না
হযরত আয়েশা রাযি. থেকে সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ অবস্থায় আবু বকর রাযি.-কে মানুষের ইমামতি করতে নির্দেশ দিলেন, তখন আয়েশা রাযি. বলেছিলেন:
«إِنَّ أَبَا بَكْرٍ رَجُلٌ أَسِيفٌ، إِذَا قَامَ مَقَامَكَ لَمْ يُسْمِعِ النَّاسَ مِنَ الْبُكَاءِ»
অর্থাৎ, “আবু বকর অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ; তিনি আপনার স্থানে দাঁড়ালে কান্নার কারণে মানুষ তাঁর কণ্ঠ শুনতে পাবে না।” —সহীহ বুখারী
এটি তাঁর রাক্কত ও আল্লাহভীতির ব্যাপারে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণ।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.—ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও আখিরাতের ভয়ে কাঁদতেন
তিনি ছিলেন বিশাল ইসলামী রাষ্ট্রের শাসক। তাঁর শাসনামলে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা অভূতপূর্বভাবে বিস্তৃত হয়েছিল। কিন্তু এই বিপুল ক্ষমতা তাঁর হৃদদয়ে অহংকার সৃষ্টি করেনি; বরং দায়িত্বের ভয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কান্নার চিহ্ন তাঁর মুখে
উমর রাযি.-এর ব্যাপারে প্রসিদ্ধ বর্ণনা রয়েছে:
«كَانَ فِي وَجْهِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ خَطَّانِ أَسْوَدَانِ مِنَ الْبُكَاءِ»
“উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.-এর মুখে কান্নার কারণে দুটি কালো দাগ দেখা যেত।”—মহজুস সাওয়াব ফী ফাদায়িলি আমীরিল মুইমিনিনা উমরাবনিল খাত্তাব : ২/৬৯৯
কুরআনের আয়াত শুনে অশ্রু
উমর রাযি.-এর আল্লাহভীতির বহু ঘটনা জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, কুরআনের কোনো কোনো আয়াত শুনে বা পড়তে গিয়ে তিনি এত কাঁদতেন যে অসুস্থ হয়ে পড়তেন।
তাঁর জীবনের এই দিকটি যুহদের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কারণ প্রকৃত যুহদ শুধু পোশাক-পরিচ্ছদের সরলতা নয়; বরং দুনিয়ার ক্ষমতার মাঝেও আখিরাতকে সামনে রেখে জীবনযাপন করা।
“হায়, আমি যদি কিছুই না হতাম!”
তিনি মাটিতে পড়ে থাকা একটি খড়/তৃণ তুলে নিয়ে বলেছিলেন:
«يَا لَيْتَنِي كُنْتُ هَذِهِ التِّبْنَةَ، لَيْتَنِي لَمْ أَكُنْ شَيْئًا، لَيْتَ أُمِّي لَمْ تَلِدْنِي»
“হায়, আমি যদি এই খড়কুটোটিই হতাম! হায়, যদি আমি কিছুই না হতাম! হায়, আমার মা যদি আমাকে জন্মই না দিতেন!” —কানযুল উম্মাল
এখানে একজন শাসকের অন্তর আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। যে ব্যক্তি দুনিয়ার কোটি মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করতেন, নিজের হিসাবের ব্যাপারে তিনি ছিলেন ভীত ও বিনীত।
“সাহাবায়ে কেরামের সামগ্রিক জীবন ছিল ঈমান, তাকওয়া, ইবাদত, যুহদ, ওয়ারা‘, আল্লাহভীতি, আখিরাতের চিন্তা, দানশীলতা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসায় সমৃদ্ধ। তাঁদের প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বে এসব গুণের প্রকাশের ধরন ও মাত্রা একরকম ছিল না; কিন্তু দুনিয়ার তুলনায় আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছিল তাঁদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি. ছিলেন ধনী ব্যবসায়ী, আবার আবু যর রাযি.-এর জীবন ছিল সম্পদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর; উভয়েই সাহাবি এবং উভয়ের জীবনেই যুহদের স্বতন্ত্র রূপ বিদ্যমান।
যুহদ মানে কাজ ছেড়ে দেওয়া নয়
এখানে আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি.-এর ঘটনা বিশেষ শিক্ষণীয়। মদিনায় হিজরত করার পর সা‘দ ইবনে রাবী‘ রাযি. তাঁকে সম্পদ ও পরিবারের অংশ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। আবদুর রহমান রাযি. বললেন:
«بَارَكَ اللهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ، دُلَّنِي عَلَى السُّوقِ»
“আল্লাহ আপনার পরিবার ও সম্পদে বরকত দিন। আমাকে বাজারের পথ দেখিয়ে দিন।” —সহীহ বুখারী
তিনি বাজারে গিয়ে ব্যবসা শুরু করলেন। কয়েকদিনের মধ্যে তিনি উপার্জন করলেন এবং পরবর্তীতে বিবাহও করলেন।
তাঁরা সম্পদকে প্রত্যাখ্যান করেননি; সম্পদের দাসত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাঁরা উপার্জন করেছেন, কিন্তু উপার্জন তাঁদের ঈমানের বিকল্প হয়নি। তাঁরা সম্পদের মালিক হয়েছেন, কিন্তু সম্পদ তাঁদের হৃদয়ের মালিক হয়নি।
এই কারণেই সাহাবিদের যুহদকে কেবল “কম খাওয়া, কম পরা ও কম সম্পদ রাখা” দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যথেষ্ট নয়।
সম্পদের প্রাচুর্যে অনাসক্তি, ক্ষমতার মাঝে সরলতা
সাহাবায়ে কেরামের যুহদ নিছক দারিদ্র্যের নাম ছিল না। কেউ সম্পদশালী হয়েও যাহিদ ছিলেন, কেউ রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও সাধারণ জীবন কাটিয়েছেন। তাঁদের কাছে দুনিয়া ছিল প্রয়োজন পূরণের উপকরণ; জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়।
এই সত্যটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে হযরত উসমান ইবনে আফফান, আলী ইবনে আবি তালিব, আবদুর রহমান ইবনে আওফ এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাযি.-এর জীবনে।
উসমান ইবনে আফফান রাযি.—সম্পদের পাহাড়, অথচ হৃদয় পড়ে আছে আখিরাতে
হযরত উসমান রাযি. সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে অত্যন্ত সম্পদশালী ছিলেন। তাঁর ব্যবসা ছিল, সম্পদ ছিল এবং আল্লাহ তাঁকে প্রাচুর্য দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর যুহদ বোঝার জন্য তাঁর সম্পদের পরিমাণের দিকে তাকালে চলবে না; দেখতে হবে সেই সম্পদের সঙ্গে তাঁর হৃদয়ের সম্পর্ক।
তাবুক অভিযানের সময় মুসলিম বাহিনী যখন কঠিন আর্থিক সংকটে পড়ে, তখন উসমান রাযি.-এর বিপুল দান ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। অর্থাৎ তিনি সম্পদ অর্জন করতেন; কিন্তু আল্লাহর দ্বীনের প্রয়োজন দেখা দিলে সেই সম্পদের ওপর নিজের অধিকারকে প্রধান মনে করতেন না।
তাঁর জীবনের আরও বিস্ময়কর দিক ছিল—প্রাচুর্যের মাঝেও আখিরাতের ভয়।
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দাড়ি ভিজে যেত
হানী, যিনি উসমান রাযি.-এর মুক্তদাস ছিলেন, বর্ণনা করেন:
«كَانَ عُثْمَانُ إِذَا وَقَفَ عَلَى قَبْرٍ بَكَى حَتَّى يَبُلَّ لِحْيَتَهُ»
“উসমান রাযি. যখন কোনো কবরের পাশে দাঁড়াতেন, তখন এত কাঁদতেন যে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত।”
তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, জান্নাত ও জাহান্নামের কথা স্মরণ করেও আপনি এভাবে কাঁদেন না, অথচ কবরের কথা মনে করে এত কাঁদেন কেন?
তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ الْقَبْرَ أَوَّلُ مَنْزِلٍ مِنْ مَنَازِلِ الْآخِرَةِ، فَإِنْ نَجَا مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَيْسَرُ مِنْهُ، وَإِنْ لَمْ يَنْجُ مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَشَدُّ مِنْهُ»
“কবর আখিরাতের মনযিলসমূহের প্রথম মনযিল। কেউ যদি সেখানে মুক্তি পায়, তাহলে পরবর্তী পর্যায়গুলো তার জন্য তুলনামূলক সহজ হবে; আর সেখানে মুক্তি না পেলে পরবর্তী পর্যায় আরও কঠিন হবে।”
—সুনানুত তিরমিযী, হাদীস ২৩০৮; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস ৪২৬৭ এবং মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৪৫৪।
“হযরত উসমান গনী রাযি. দিনে রোযা রাখতেন, রাতে কিয়াম করতেন, নির্জনে কাঁদতেন, প্রায়ই এক রাকাতে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করতেন এবং কোনো কবরের পাশ দিয়ে গেলে এত কাঁদতেন যে তাঁর মুবারক দাড়ি ভিজে যেত।”
এক রাকাতে কুরআন খতম
উসমান রাযি.-এর স্ত্রী নায়িলা বিনতে ফারাফিসা রাযি. থেকে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ আছার রয়েছে। বিদ্রোহীরা যখন উসমান রাযি.-কে হত্যা করার জন্য তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলেছিল, তখন তিনি বলেছিলেন:
«إِنْ تَقْتُلُوهُ فَإِنَّهُ كَانَ يُحْيِي اللَّيْلَ كُلَّهُ فِي رَكْعَةٍ يَجْمَعُ فِيهَا الْقُرْآنَ»
“তোমরা যদি তাঁকে হত্যা করো, জেনে রেখো—তিনি এমন মানুষ ছিলেন যিনি এক রাকাতে পুরো কুরআন পড়ে রাত জাগতেন।” তাবরানী: ১৩০ নং হাদীস
এই মানুষটিই ছিলেন ধনী উসমান।
সম্পদ তাঁর হাতে বেড়েছে, অথচ সম্পদের সঙ্গে তাঁর রাত বাড়েনি; বেড়েছে কুরআনের সঙ্গে তাঁর রাত।
এটাই সাহাবায়ে কেরামের যুহদ।
আলী ইবনে আবি তালিব রাযি.—শাসকের পোশাকেও অহংকারের স্থান নেই
হযরত আলী রাযি.-এর যুহদ সম্পর্কে বহু ঘটনা প্রচলিত।
যায়দ ইবনে ওয়াহব রহ. বলেন, বসরার একটি প্রতিনিধি দল আলী রাযি.-এর কাছে এসেছিল। তাদের মধ্যে একজন তাঁর সাধারণ পোশাক নিয়ে আপত্তি করল। সে বলল, আপনি আরও ভালো পোশাক পরেন না কেন?
আলী রাযি. বললেন:
«إِنَّ لِبَاسِي هَذَا أَبْعَدُ لِي مِنَ الْكِبْرِ، وَأَجْدَرُ أَنْ يَقْتَدِيَ بِيَ الْمُسْلِمُونَ»
“আমার এই পোশাক আমাকে অহংকার থেকে অধিক দূরে রাখে এবং মুসলমানেরা আমার অনুসরণ করবে—এর অধিক উপযোগী।”—মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৭০৩; কানযুল উম্মাল
খেয়াল করুন—আলী রাযি. সাধারণ পোশাক পরার কারণ হিসেবে দারিদ্র্যের কথা বলেননি।
বলেছেন:“এটি আমাকে অহংকার থেকে দূরে রাখে।”
অর্থাৎ তাঁর যুহদ ছিল একটি সচেতন নৈতিক সিদ্ধান্ত।
একজন সাধারণ দরিদ্র মানুষের খসখসে পোশাক পরা এবং সামর্থ্যবান রাষ্ট্রপ্রধানের ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ পোশাক বেছে নেওয়া এক বিষয় নয়।
আলী রাযি.-এর ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টিই ঘটেছিল।
“হে দুনিয়া! অন্য কাউকে প্রতারিত করো”
আলী রাযি.-এর একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ঘটনা রয়েছে:
“তিনি নিজের দাড়ি ধরে সাপের দংশনে কাতর মানুষের মতো ছটফট করতেন এবং শোকার্ত মানুষের মতো কাঁদতেন। এরপর দুনিয়াকে সম্বোধন করে বলতেন—হে দুনিয়া! অন্য কাউকে ধোঁকা দাও। আমি তোমাকে তিন তালাক দিয়ে দিয়েছি...।”
এর মূল বর্ণনাটি প্রাচীন জীবনী ও রাকায়েকের গ্রন্থে পাওয়া যায়।
দিরার ইবনে দামরাহ একবার মু‘আবিয়া রাযি.-এর সামনে আলী রাযি.-এর জীবন বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তিনি আলী রাযি.-কে গভীর রাতে দেখেছেন—দাড়ি ধরে কাঁদছেন এবং দুনিয়াকে সম্বোধন করে বলছেন:
«يَا دُنْيَا يَا دُنْيَا، غُرِّي غَيْرِي... قَدْ بَتَتُّكِ ثَلَاثًا لَا رَجْعَةَ لِي فِيكِ، فَعُمْرُكِ قَصِيرٌ، وَعَيْشُكِ حَقِيرٌ... آهٍ مِنْ قِلَّةِ الزَّادِ، وَبُعْدِ السَّفَرِ، وَوَحْشَةِ الطَّرِيقِ»
“হে দুনিয়া! হে দুনিয়া! অন্য কাউকে প্রতারিত করো... আমি তোমার সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটিয়েছি; তোমার দিকে আমার আর প্রত্যাবর্তন নেই। তোমার আয়ু অল্প, তোমার জীবন তুচ্ছ... আহ! পাথেয় কত অল্প, সফর কত দীর্ঘ, আর পথ কত নিঃসঙ্গ!”
বর্ণনাটি ইবনুল জাওযীর আত-তাবসিরাহসহ বিভিন্ন সিয়ার ও রাকায়েক গ্রন্থে এসেছে। এমনকি ইবনু তাইমিয়্যাহ আলী রাযি.-এর প্রসিদ্ধ উক্তি হিসেবে “يا صفراء، يا بيضاء... غري غيري” কথাটি উল্লেখ করেছেন।
আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি.—সম্পদই যখন পরীক্ষায় পরিণত হলো
যাহিদ মানেই যার টাকা নেই?
অথচ আবদুর রহমান রাযি. ছিলেন মদিনার অন্যতম সফল ব্যবসায়ী এবং বিপুল সম্পদের অধিকারী।
কিন্তু দুনিয়ার প্রাচুর্য সম্পর্কে তাঁর নিজের উপলব্ধি ছিল বিস্ময়কর।
তিনি বলেন:
«ابْتُلِينَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ بِالضَّرَّاءِ فَصَبَرْنَا، ثُمَّ ابْتُلِينَا بِالسَّرَّاءِ بَعْدَهُ فَلَمْ نَصْبِرْ»
“রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে আমরা দুঃখ-কষ্ট দিয়ে পরীক্ষিত হয়েছিলাম, তখন আমরা ধৈর্য ধরেছিলাম। পরে তাঁর পর আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে পরীক্ষা করা হলো, তখন আমরা সে রকম ধৈর্য রাখতে পারলাম না।”—সুনান তিরমিযী, হাদীস ২৪৬৪।
কথাটি গভীরভাবে লক্ষ্য করার মতো।
তিনি বলেননি—দারিদ্র্যই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বরং দীর্ঘ দারিদ্র্য ও কষ্ট পার হয়ে এসে যখন সম্পদ তাদের হাতে আসতে শুরু করল, তখন আবদুর রহমান রাযি.-এর ভয় হলো:
এবার পরীক্ষা আরও কঠিন হয়ে গেছে।
ধনী মানুষ, কিন্তু নিজ হাতে কোদাল
সম্পদ আছে—কিন্তু শ্রমের প্রতি লজ্জা নেই।
ধন আছে—কিন্তু নিজের ব্যাপারে আত্মতুষ্টি নেই।
সাফল্য আছে—কিন্তু মনে হচ্ছে তিনি পরীক্ষার মধ্যে আছেন। এই উপলব্ধিটিই যুহদের প্রাণ।
فقدمتُ المدينةَ في خلافةِ عثمانَ بنِ عفانَ، فلقيتُهم إلا عبدَ الرحمنِ بنَ عوفٍ، أُخبرتُ أنه بأرضٍ له بالجُرُفِ، فركبتُ إليه حتى جئتُه، فإذا هو واضعٌ رداءَه، يُحوِّلُ الماءَ بمِسحاةٍ في يدِه، فلما رآني استحيا مني، فألقى المسحاةَ وأخذ رداءَه... فقال عبدُ الرحمنِ: لم يأتِنا إلا ما جاءكم، ولم نعلمْ إلا ما قد علمتم، ولكنَّا بُلينا بالضراءِ فصبرنا، وبُلينا بالسراءِ فلم نصبرْ.
“আমি উসমান ইবনে আফফান রাযি.-এর খেলাফতের সময়ে মদিনায় এলাম। সাহাবিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম, শুধু আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি. ছাড়া। জানতে পারলাম, তিনি আল-জুরুফে তাঁর জমিতে আছেন। সেখানে গিয়ে দেখলাম, তিনি চাদর খুলে রেখে হাতে মিসহাত (কোদালজাতীয় কৃষি-সরঞ্জাম) দিয়ে জমিতে পানি সরাচ্ছেন। আমাকে দেখে তিনি লজ্জা পেলেন এবং মিসহাতটি রেখে চাদর তুলে নিলেন... এরপর বললেন: ‘আমাদের কাছে তো তাই এসেছে, যা তোমাদের কাছে এসেছে... কিন্তু আমরা দুঃখ-কষ্ট দ্বারা পরীক্ষিত হয়ে ধৈর্য ধরেছিলাম; আর স্বাচ্ছন্দ্য দ্বারা পরীক্ষিত হয়ে ধৈর্য ধরতে পারিনি।’”----যুহদ, ইবনুল মুবারক, হাদীস ৫১৯; যুহদ, আবু দাউদ, পৃ. ১২৩; মুসনাদুশ শামিয়্যীন, তাবারানী, ৪/২৪১, হাদীস ৩১৮৯; মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, ১১/৪৫৭, হাদীস ২০৯৯৭।
আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাযি.—সিরিয়ার আমীরের ঘরে কিছুই নেই!
রাসূলুল্লাহ ﷺ যাঁকে এই উম্মতের “আমীন” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, সেই আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাযি. পরবর্তী সময়ে বিশাল অঞ্চলের দায়িত্বশীল আমীর হয়েছিলেন।
ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটেছে। সম্পদ আসছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ জমা হচ্ছে।
একদিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. আবু উবাইদাহ রাযি.-এর ঘরে প্রবেশ করলেন।
চারদিকে তাকিয়ে তিনি প্রায় কিছুই পেলেন না।
ঘরে ছিল সামান্য কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস—একটি বিছানাসদৃশ চামড়া/মাদুর, একটি পাত্র, পানির পাত্র; খাবার চাইলে আবু উবাইদাহ রাযি. একটি পাত্র থেকে সামান্য শুকনো খাবার বের করলেন।
এই দৃশ্য দেখে উমর রাযি. কেঁদে ফেললেন।
আবু উবাইদাহ রাযি. বললেন—আমি তো আগেই বলেছিলাম, আপনি আমার কাছে এলে আপনার চোখে পানি আসবে।
তখন উমর রাযি. বললেন:
«غَيَّرَتْنَا الدُّنْيَا كُلَّنَا غَيْرَكَ يَا أَبَا عُبَيْدَةَ»
“হে আবু উবাইদাহ! দুনিয়া আমাদের সবাইকে বদলে দিয়েছে—তোমাকে ছাড়া।”—ইমাম যাহাবী সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা-তে ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।
তাঁর যুহদের প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে এটিই প্রকৃত যুহদ—নিছক অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির বাধ্যতামূলক দারিদ্র্য নয়।
কথাটির তাৎপর্য অসাধারণ।
যদি তাঁর হাতে কিছু পাওয়ার সুযোগই না থাকত, তবে তাঁর অল্প জিনিস নিয়ে জীবনযাপনকে শুধু যুহদ বলা কঠিন হতো।
কিন্তু তিনি ছিলেন আমীর।
সুযোগ ছিল।
রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল।
সচ্ছলতার সমস্ত দরজা তাঁর সামনে খোলা ছিল।
তারপরও ঘরে প্রবেশ করে মুসলিম জাহানের খলিফাকে প্রায় কিছুই খুঁজে পেতে হলো না।
এটাই স্বেচ্ছায় দুনিয়ার প্রাচুর্য থেকে দূরে থাকা।
সাহাবিদের যুহদের দুই রূপ
সাহাবায়ে কেরামের যুহদের দুটি আপাত বিপরীত, অথচ পরস্পর পরিপূরক রূপ দেখা গেল।
একদিকে আবু উবাইদাহ রাযি.—আমীর হয়েও ঘরে প্রায় কিছু নেই।
অন্যদিকে আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি.—বিপুল সম্পদের মালিক।
একদিকে উসমান রাযি.—ধনী ব্যবসায়ী।
অন্যদিকে আলী রাযি.—রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও অত্যন্ত সাধারণ পোশাক।
তাহলে কার যুহদ বেশি?
এখানেই ইসলামের যুহদ অন্য অনেক দুনিয়াবিমুখ দর্শন থেকে পৃথক।
যুহদের মাপকাঠি শুধু:
“তোমার কাছে কত সম্পদ আছে?”
এটি নয়।
বরং প্রশ্ন হলো:
“সম্পদের কাছে তুমি কতটুকু বন্দী?”
উসমান রাযি.-এর কাছে সম্পদ ছিল; প্রয়োজনে তা আল্লাহর পথে ঢেলে দিয়েছেন।
আবদুর রহমান রাযি.-এর কাছে সম্পদ ছিল; কিন্তু সম্পদ আসাকে নিজের সফলতা মনে না করে নতুন পরীক্ষা মনে করেছেন।
আলী রাযি.-এর হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল; কিন্তু পোশাকের মাধ্যমে নিজেকে মানুষের ওপরে তুলে ধরতে চাননি।
আবু উবাইদাহ রাযি.-এর সামনে রাষ্ট্রীয় প্রাচুর্য ছিল; কিন্তু তাঁর ব্যক্তিজীবন রয়ে গেছে প্রায় অপরিবর্তিত।
এই কারণেই সাহাবায়ে কেরামের যুহদকে দারিদ্র্যের ইতিহাস হিসেবে পড়া ভুল।
এটি মূলত হৃদয়ের স্বাধীনতার ইতিহাস।
তাঁদের হৃদয় আল্লাহর জন্য ছিল; তাই দুনিয়া কখনো সেই হৃদয়ের স্থায়ী বাসিন্দা হতে পারেনি।
সালমান ফারসি, আবু যর ও সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি.-এর জীবনে দুনিয়াবিমুখতা
সাহাবায়ে কেরামের যুহদ বুঝতে হলে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—যুহদ মানে এই নয় যে, মানুষ দায়িত্ব ছেড়ে দেবে, উপার্জন করবে না কিংবা সম্পদ থাকা অপরাধ মনে করবে। বরং প্রকৃত যুহদ হলো—মানুষের হাতে দুনিয়া থাকবে, কিন্তু দুনিয়া যেন তার অন্তরের মালিক হয়ে না যায়। কেউ শাসক হয়েও যাহিদ হতে পারেন, কেউ ব্যবসায়ী হয়েও যাহিদ হতে পারেন, আবার কেউ সাধারণ জীবন বেছে নিয়েও যাহিদ হতে পারেন। সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এই বৈচিত্র্য অত্যন্ত স্পষ্ট।
হযরত সালমান ফারসি রাযি.—শাসকের পদ, অথচ নিজের হাতে উপার্জন
হযরত সালমান ফারসি রাযি. ছিলেন ইসলামের অন্যতম মহান সাহাবি। তিনি মাদায়েনের গভর্নর ছিলেন। তাঁর অধীনে বিপুল সংখ্যক মুসলমানের প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু এই পদমর্যাদা তাঁর জীবনযাত্রায় কোনো বিলাসিতা সৃষ্টি করতে পারেনি।
আবু নু‘আইম ইসফাহানি রহ. ‘হিলইয়াতুল আওলিয়া’-তে হাসান বসরি রহ.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন:
«كَانَ عَطَاءُ سَلْمَانَ خَمْسَةَ آلَافٍ، وَكَانَ أَمِيرًا عَلَى زُهَاءِ ثَلَاثِينَ أَلْفًا مِنَ الْمُسْلِمِينَ، وَكَانَ يَخْطُبُ النَّاسَ فِي عَبَاءَةٍ يَفْتَرِشُ بَعْضَهَا وَيَلْبَسُ بَعْضَهَا، وَإِذَا خَرَجَ عَطَاؤُهُ أَمْضَاهُ، يَأْكُلُ مِنْ سَفِيفِ يَدِهِ.»
অর্থাৎ, সালমান রাযি.-এর নির্ধারিত ভাতা ছিল পাঁচ হাজার দিরহাম। তিনি প্রায় ত্রিশ হাজার মুসলমানের আমির ছিলেন। অথচ তিনি এমন একটি চাদর পরতেন, যার এক অংশ বিছিয়ে নিতেন এবং অপর অংশ পরিধান করতেন। তাঁর ভাতা যখন তাঁর কাছে আসত, তিনি তা ব্যয় করে দিতেন এবং নিজের হাতের তৈরি জিনিস বিক্রি করে তা থেকে আহার করতেন। ‘হিলইয়াতুল আওলিয়া’-তে সালমান রাযি.-এর হাতে খেজুরপাতা দিয়ে কাজ করার বর্ণনাও রয়েছে।
আরেক বর্ণনায় সালমান রাযি.-কে মাদায়েনে অবস্থানরত অবস্থায় খেজুরপাতা দিয়ে জিনিস তৈরি করতে দেখা যায়। তাঁকে বলা হলো, আপনি আমির হওয়া সত্ত্বেও এসব কাজ করছেন? তিনি নিজের হাতে উপার্জন করে খেতে পছন্দ করার কথা উল্লেখ করেন।- আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবনু সা‘দ, ৪/৬৬; হিলয়াতুল আউলিয়া
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সালমান রাযি. প্রশাসনিক দায়িত্বকে দুনিয়াবি ভোগ-বিলাসের মাধ্যম বানাননি। তাঁর কাছে পদ ছিল আমানত, আর সম্পদ ছিল আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব। তিনি চাইলে নিজের পদমর্যাদার সুযোগ নিয়ে আরাম-আয়েশ করতে পারতেন; কিন্তু তাঁর অন্তর সেই দিকে আকৃষ্ট হয়নি।
এটাই যুহদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—দুনিয়া ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং দুনিয়া হাতে এসেও দুনিয়ার গোলাম না হওয়া।
হযরত আবু যর গিফারি রাযি.—সম্পদের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা
হযরত আবু যর গিফারি রাযি.-এর জীবন ছিল যুহদ, সরলতা ও দুনিয়াবিমুখতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। তবে তাঁর অবস্থান বুঝতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। সম্পদ সঞ্চয়ের ব্যাপারে তাঁর ব্যক্তিগত কঠোর অবস্থানকে এমন কোনো সাধারণ ফিকহি বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না যে, প্রত্যেক মুসলমানের জন্য সম্পদ রাখা হারাম। বরং তাঁর জীবনের মূল শিক্ষা হলো—সম্পদ যেন মানুষের অন্তরকে আল্লাহ থেকে দূরে না সরিয়ে দেয় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের প্রতি অন্ধ আসক্তি সৃষ্টি না করে।
সহীহ মুসলিমে আবু যর রাযি.-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা এসেছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বলেছিলেন:
«مَا يَسُرُّنِي أَنَّ لِي مِثْلَهُ ذَهَبًا أُنْفِقُهُ كُلَّهُ إِلَّا ثَلَاثَةَ دَنَانِيرَ»
“আমার কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও থাকে, তাহলে তা থেকে তিন দিনার ছাড়া অবশিষ্ট সবকিছু আল্লাহর পথে ব্যয় করে দিতে পারলে আমি আনন্দিত হব।”
এরপর আবু যর রাযি. বলেছিলেন:
«لَا وَرَبِّكَ، لَا أَسْأَلُهُمْ دُنْيَا، وَلَا أَسْتَفْتِيهِمْ عَنْ دِينٍ، حَتَّى أَلْحَقَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ»
“আপনার রবের কসম! আমি তাদের কাছে দুনিয়ার কোনো কিছু চাইব না এবং আমার দ্বীনের ব্যাপারে তাদের কাছে ফতোয়া নেব না—যতক্ষণ না আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে মিলিত হই।” —সহীহ মুসলীম, হাদীস নং: ৯৯২
এই হাদীসের মধ্যে আবু যর রাযি.-এর অন্তরের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে—তিনি দুনিয়ার সম্পদকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করতেন না। তাঁর কাছে আসল সম্পদ ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি।
তাঁর জীবনের আরেকটি ঘটনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যখন মানুষের সঙ্গে বসে সম্পদ সঞ্চয়ের ব্যাপারে সতর্ক করতেন, তখন কেউ তাঁকে প্রশ্ন করেছিল, আপনি কুরাইশদের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করেন না কেন? তিনি জবাব দেন:
«لَا وَرَبِّكَ، لَا أَسْأَلُهُمْ دُنْيَا، وَلَا أَسْتَفْتِيهِمْ عَنْ دِينٍ»
“না, আপনার রবের কসম! আমি তাদের কাছে দুনিয়া চাইব না এবং দ্বীনের ব্যাপারে তাদের কাছে ফতোয়া নেব না।”-সহীহ মুসলিম
আবু যর রাযি.-এর এই অবস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ যখন দুনিয়ার প্রয়োজনকে অতিক্রম করে দুনিয়ার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে যায়, তখন তার অন্তরের স্বাধীনতা নষ্ট হয়ে যায়।
হযরত সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি.—ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছেড়ে নির্জন জীবন
হযরত সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি. ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবিদের অন্যতম। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রাথমিক যুগের একজন বিশিষ্ট সাহাবি এবং বড় বড় ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িত। কিন্তু জীবনের এক পর্যায়ে যখন মানুষ ক্ষমতা ও রাজত্বের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছিল, তখন তিনি নিজেকে সেই সংঘাত থেকে দূরে রাখেন।
সহীহ মুসলিমে আমির ইবনে সা‘দ থেকে বর্ণিত হয়েছে:
«كَانَ سَعْدُ بْنُ أَبِي وَقَّاصٍ فِي إِبِلِهِ، فَجَاءَهُ ابْنُهُ عُمَرُ، فَلَمَّا رَآهُ سَعْدٌ قَالَ: أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّ هَذَا الرَّاكِبِ»
সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি. তাঁর উটের মধ্যে ছিলেন। তাঁর ছেলে উমর তাঁর কাছে এলো। তাকে দেখে সা‘দ রাযি. বললেন, “আমি এই আরোহীর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।”
তাঁর ছেলে বলল, আপনি কি আপনার উট-ছাগলের মধ্যে বসে থাকবেন, অথচ মানুষ রাজত্ব নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে বিবাদ করছে?
তখন সা‘দ রাযি. নিজের বুকে আঘাত করে বললেন:
«اسْكُتْ، سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْعَبْدَ التَّقِيَّ، الْغَنِيَّ، الْخَفِيَّ»
“চুপ করো! আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন বান্দাকে ভালোবাসেন, যে তাকওয়াবান, মানুষের কাছে অমুখাপেক্ষী এবং লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে।’”—সহীহ মুসলিম, ২৯৬৫।
এখানে “الغني” অর্থ কেবল ধনী হওয়া নয়; বরং আল্লাহর ওপর নির্ভর করে মানুষের কাছে অমুখাপেক্ষী থাকা।
আর “الخفي” এমন বান্দাকে বোঝায়, যে নিজের পরিচিতি, খ্যাতি ও মানুষের প্রশংসার পেছনে ছুটে বেড়ায় না।
সা‘দ রাযি.-এর জীবনে আমরা এর বাস্তব নমুনা দেখতে পাই। যে ব্যক্তি চাইলে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারতেন, তিনি উট-ছাগল নিয়ে নির্জনে থাকার পথ বেছে নিলেন। কারণ তাঁর কাছে মানুষের দেওয়া ক্ষমতা অপেক্ষা আল্লাহর সন্তুষ্টি অধিক মূল্যবান ছিল।
মুস‘আব ইবনে উমাইর রাযি.—মক্কার বিলাসী যুবক থেকে উহুদের শহীদ
হযরত মুস‘আব ইবনে উমাইর রাযি. ছিলেন মক্কার অত্যন্ত স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি উন্নত পোশাক ও সুগন্ধি ব্যবহারের জন্য পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ঈমান গ্রহণের পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতন শুরু হয় এবং তাঁকে দুনিয়ার আরাম-আয়েশ থেকে বঞ্চিত করা হয়।
পরবর্তীতে তিনি ইসলামের জন্য এমন ত্যাগ স্বীকার করেন যে, উহুদের ময়দানে শাহাদাতের সময় তাঁর কাফনের জন্যও পর্যাপ্ত কাপড় পাওয়া যায়নি।
খাব্বাব ইবনে আরাত রাযি. বলেন:
«هَاجَرْنَا مَعَ النَّبِيِّ ﷺ نُرِيدُ وَجْهَ اللَّهِ، فَوَقَعَ أَجْرُنَا عَلَى اللَّهِ، فَمِنَّا مَنْ مَضَى لَمْ يَأْخُذْ مِنْ أَجْرِهِ شَيْئًا، مِنْهُمْ مُصْعَبُ بْنُ عُمَيْرٍ، قُتِلَ يَوْمَ أُحُدٍ، وَتَرَكَ نَمِرَةً، فَكُنَّا إِذَا غَطَّيْنَا بِهَا رَأْسَهُ بَدَتْ رِجْلَاهُ، وَإِذَا غَطَّيْنَا رِجْلَيْهِ بَدَا رَأْسُهُ، فَأَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنْ نُغَطِّيَ رَأْسَهُ، وَنَجْعَلَ عَلَى رِجْلَيْهِ شَيْئًا مِنْ إِذْخِرٍ.»
“আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হিজরত করেছিলাম। আমাদের প্রতিদান আল্লাহর কাছে নির্ধারিত হয়ে গেল। আমাদের কেউ এমন ছিলেন, যাঁরা তাঁদের প্রতিদানের কিছুই দুনিয়াতে ভোগ করতে পারেননি। তাঁদের মধ্যে মুস‘আব ইবনে উমাইর অন্যতম। তিনি উহুদের দিন শহীদ হন। তিনি একটি মাত্র চাদর রেখে গিয়েছিলেন। সেটি দিয়ে তাঁর মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যেত। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিলেন, তাঁর মাথা চাদর দিয়ে ঢেকে দিতে এবং পায়ের ওপর ইযখির ঘাস রাখতে।”—সহীহ বুখারী: ৩৮৯৭।
কী আশ্চর্য পরিবর্তন!
যে যুবক একসময় মক্কার মানুষের কাছে বিলাসী পোশাক ও সুগন্ধির জন্য পরিচিত ছিলেন, সেই মুস‘আব রাযি. শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থায় শহীদ হলেন যে, তাঁর পুরো শরীর ঢাকার মতো কাফনের কাপড়ও ছিল না।
কিন্তু তিনি হারেননি। কারণ তিনি দুনিয়া হারিয়ে আখিরাত জয় করেছিলেন।
হযরত হামযা রাযি.—আল্লাহর পথে জীবন বিসর্জন
মুস‘আব রাযি.-এর সঙ্গে একই প্রসঙ্গে হযরত হামযা রাযি.-এর কথাও স্মরণীয়। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চাচা, ইসলামের অন্যতম সাহসী যোদ্ধা এবং উহুদের মহান শহীদ।
আনাস ইবনে মালিক রাযি.-এর বর্ণনায় এসেছে, হামযা রাযি.-কে একটি মাত্র কাপড়ে কাফন দেওয়া হয়েছিল। মাথার দিকে কাপড় টানলে পা বের হয়ে যেত এবং পায়ের দিকে টানলে মাথা বের হয়ে যেত। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর মাথা ঢেকে দিতে এবং পায়ের ওপর ইযখির ঘাস রাখার নির্দেশ দেন। তিরমিজি, ১০১৬
এ ঘটনা শুধু সাহাবিদের দারিদ্র্যের চিত্র নয়; বরং এটি তাঁদের অগ্রাধিকারের চিত্র।
তাঁদের কাছে প্রশ্ন ছিল না—“আমার কাফন কত সুন্দর হবে?”
প্রশ্ন ছিল—“আল্লাহর কাছে আমার আমল কীভাবে কবুল হবে?”
আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি.-এর অশ্রু—“আমাদের জন্য কি দুনিয়ার নেয়ামত তাড়াতাড়ি এসে গেল?”
মুস‘আব ও হামযা রাযি.-এর ঘটনা পরবর্তী প্রজন্মের সাহাবিদের ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছিল, তার এক অসাধারণ উদাহরণ হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি.-এর ঘটনা।
তিনি একদিন রোজা অবস্থায় ইফতারের খাবার সামনে পেলেন। তখন মুস‘আব ইবনে উমাইর রাযি.-এর কথা তাঁর মনে পড়ে গেল। তিনি বললেন:
«قُتِلَ مُصْعَبُ بْنُ عُمَيْرٍ وَهُوَ خَيْرٌ مِنِّي، كُفِّنَ فِي بُرْدَةٍ، إِنْ غُطِّيَ رَأْسُهُ بَدَتْ رِجْلَاهُ، وَإِنْ غُطِّيَ رِجْلَاهُ بَدَا رَأْسُهُ، وَقُتِلَ حَمْزَةُ وَهُوَ خَيْرٌ مِنِّي... ثُمَّ بُسِطَ لَنَا مِنَ الدُّنْيَا مَا بُسِطَ، وَقَدْ خَشِينَا أَنْ تَكُونَ حَسَنَاتُنَا عُجِّلَتْ لَنَا»
“মুস‘আব ইবনে উমাইর নিহত হয়েছেন—তিনি আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। তাঁকে এমন একটি চাদরে কাফন দেওয়া হয়েছিল যে, মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যেত। হামযাও নিহত হয়েছেন—তিনিও আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। এরপর আমাদের জন্য দুনিয়ার যতটুকু প্রসারিত করা হয়েছে, তা করা হয়েছে। আর আমরা আশঙ্কা করছি, আমাদের নেক আমলগুলোর প্রতিদান হয়তো দুনিয়াতেই তাড়াতাড়ি দিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
এরপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে খাবার ছেড়ে দেন।-সহীহ বুখারী, হাদীস: ১২৭৪
খেয়াল করুন, আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি. নিজে দরিদ্র ছিলেন না। তিনি ব্যবসা করে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন। তবুও তাঁর অন্তরে ভয় ছিল—যাঁরা তাঁর চেয়ে উত্তম ছিলেন, তাঁরা দুনিয়া থেকে প্রায় শূন্য হাতে চলে গেলেন; আর তাঁর সামনে দুনিয়ার দরজা খুলে গেল!
এটাই সাহাবায়ে কেরামের যুহদ।
সম্পদ থাকা তাঁদের ভয় পাইয়ে দেয়নি; বরং সম্পদের হিসাব ও আখিরাতের জবাবদিহির চিন্তা তাঁদের কাঁদিয়েছে।
খাব্বাব ইবনে আরাত রাযি.—দুনিয়া যখন বাড়তে শুরু করল
হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত রাযি. ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের নির্যাতিত সাহাবিদের একজন। তাঁর ওপর মক্কায় ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছিল। কিন্তু ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর যখন মুসলমানদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলো, তখন তাঁর ভয় অন্য জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল—দুনিয়ার প্রাচুর্য যেন আখিরাতের ক্ষতির কারণ না হয়ে যায়।
ইবনে আব্বাস বা অন্য বর্ণনাকারীদের সূত্রে খাব্বাব রাযি.-এর কাছে গেলে তাঁকে নিজের দেয়াল নির্মাণ করতে দেখা যায়। তিনি বলেন:
«إِنَّ أَصْحَابَنَا الَّذِينَ مَضَوْا لَمْ تَنْقُصْهُمُ الدُّنْيَا شَيْئًا، وَإِنَّا أَصَبْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ شَيْئًا لَا نَجِدُ لَهُ مَوْضِعًا إِلَّا التُّرَابَ»
“আমাদের যেসব সঙ্গী আমাদের আগে চলে গেছেন, দুনিয়া তাঁদের কোনো কিছুই কমিয়ে দেয়নি। আর আমরা তাঁদের পরে এমন কিছু দুনিয়া পেয়েছি, যার জন্য মাটিতে রাখার জায়গা ছাড়া আর কোনো জায়গা খুঁজে পাচ্ছি না।”- সহীহ বুখারী ৬৪৩১
কী গভীর উপলব্ধি!
যে মানুষ একসময় কিছুই পেতেন না, তিনি যখন সম্পদের অধিকারী হলেন, তখন সম্পদ পাওয়াকে সফলতা হিসেবে উদযাপন করলেন না; বরং চিন্তা করলেন—এই সম্পদ আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
এখানেই সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য।
আমরা অনেক সময় দুনিয়া না পেলে কাঁদি—তাঁরা দুনিয়া পেয়ে আখিরাতের কথা ভেবে কাঁদতেন।
যুহদ কি তবে সম্পদকে প্রত্যাখ্যান করা?
না।
আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি. ছিলেন সম্পদশালী। উসমান রাযি. ছিলেন সম্পদশালী। তালহা রাযি. ছিলেন সম্পদশালী। কিন্তু তাঁদের অন্তর সম্পদের বন্দি ছিল না।
অন্যদিকে মুস‘আব, হামযা ও খাব্বাব রাযি.-এর জীবনে দুনিয়ার অভাব ছিল; কিন্তু তাঁদের অন্তর ছিল আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ।
সুতরাং সাহাবায়ে কেরামের জীবন আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা দেয়:
সম্পদ থাকলে অহংকার করো না।
সম্পদ না থাকলে হতাশ হয়ো না।
সম্পদ এলে আল্লাহকে ভুলে যেয়ো না।
সম্পদ চলে গেলে ঈমান হারিয়ে ফেলো না।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দুনিয়ার প্রাচুর্যকে সফলতা এবং দুনিয়ার সংকটকে ব্যর্থতা মনে করো না।
মুস‘আব রাযি.-এর কাফনের কাপড় ছিল অপ্রতুল, কিন্তু তাঁর আখিরাত ছিল অসীম।
হামযা রাযি.-এর কাফন ছিল সামান্য, কিন্তু তাঁর মর্যাদা ছিল অসামান্য।
খাব্বাব রাযি. সম্পদ দেখে ভয় পেয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেন—দুনিয়া যত বাড়ে, হিসাবও তত বাড়ে।
আর আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি. খাবার সামনে রেখেও কেঁদেছিলেন, কারণ তাঁর চোখে তখন দুনিয়ার খাবার নয়—মুস‘আব ও হামযা রাযি.-এর আখিরাতের দৃশ্য ভাসছিল।
এটাই ছিল সাহাবায়ে কেরামের যুহদ—দুনিয়াকে ঘৃণা করা নয়; বরং আখিরাতকে দুনিয়ার চেয়ে অধিক মূল্যবান মনে করা।
হযরত আবু দারদা রাযি.—ব্যবসা ছেড়ে ইবাদতের দিকে ঝুঁকে পড়া
হযরত আবু দারদা রাযি. প্রথম জীবনে ব্যবসা করতেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তিনি উপলব্ধি করলেন যে, তাঁর মনকে ব্যবসা ও ইবাদত—দুটোর মধ্যে একটির দিকে অধিক ঝুঁকতে হচ্ছে।
তাঁর নিজের বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত হয়েছে:
«كُنْتُ تَاجِرًا قَبْلَ الْمَبْعَثِ، فَلَمَّا جَاءَ الْإِسْلَامُ جَمَعْتُ التِّجَارَةَ وَالْعِبَادَةَ، فَلَمْ يَجْتَمِعَا، فَتَرَكْتُ التِّجَارَةَ وَلَزِمْتُ الْعِبَادَةَ»
“নবুওয়াতের পূর্বে আমি ব্যবসায়ী ছিলাম। ইসলাম আসার পর আমি ব্যবসা ও ইবাদত—দুটিকে একত্র করার চেষ্টা করলাম; কিন্তু দুটো একত্রে আমার জন্য সম্ভব হলো না। তাই আমি ব্যবসা ছেড়ে ইবাদতে মনোনিবেশ করলাম।”
এটি আবু দারদা রাযি.-এর জীবনীমূলক একটি আছার, যা যাহাবি ‘সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’-তে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে যাহাবি মন্তব্য করেছেন যে, মানুষের সামর্থ্য একরকম নয়—কেউ ব্যবসা ও ইবাদত দুটোই সুন্দরভাবে করতে পারেন, যেমন আবু বকর ও আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযি.; আবার কেউ একটি দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। তবে পরিবার-পরিজনের অধিকার অবশ্যই আদায় করতে হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আবু দারদা রাযি.-এর এই ব্যক্তিগত পছন্দকে শরিয়তের সাধারণ বিধান হিসেবে নেওয়া যাবে না। বরং এটি তাঁর ব্যক্তিগত যুহদ ও আত্মিক অবস্থার প্রকাশ। কারণ ইসলাম বৈধ উপার্জনকে নিষিদ্ধ করেনি।
বরং তাঁর যুহদের প্রকৃত সৌন্দর্য ছিল—তিনি দুনিয়ার লাভকে নিজের জীবনের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য বানাননি।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি.—দুনিয়া তাঁকে আকর্ষণ করতে পারেনি
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক, পরহেজগার ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিত্ব।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. তাঁর সম্পর্কে বলেন:
«مَا مِنَّا أَحَدٌ أَدْرَكَ الدُّنْيَا إِلَّا قَدْ مَالَتْ بِهِ، إِلَّا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ»
“আমাদের মধ্যে এমন কেউ ছিল না যে দুনিয়ার সুযোগ পেয়েও তার দ্বারা প্রভাবিত হয়নি—শুধু আবদুল্লাহ ইবনে উমর ব্যতিক্রম।”
এই কথাটি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি.-এর যুহদের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অসাধারণ মূল্যায়ন।
দুনিয়া তাঁর সামনে এসেছিল, কিন্তু তিনি দুনিয়ার প্রতি নিজের অন্তরকে সমর্পণ করেননি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে একটি মৌলিক নসিহতও করেছিলেন:
«كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ، أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ»
“দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো, যেন তুমি একজন অপরিচিত ব্যক্তি অথবা পথ অতিক্রমকারী মুসাফির।”
এরপর ইবনে উমর রাযি. বলতেন:
«إِذَا أَمْسَيْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ الصَّبَاحَ، وَإِذَا أَصْبَحْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ الْمَسَاءَ، وَخُذْ مِنْ صِحَّتِكَ لِمَرَضِكَ، وَمِنْ حَيَاتِكَ لِمَوْتِكَ»
“সন্ধ্যায় উপনীত হলে সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার অপেক্ষা করো না; আর সকালে উপনীত হলে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকার অপেক্ষা করো না। তোমার সুস্থতা থেকে তোমার অসুস্থতার জন্য এবং জীবন থেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো।”-সহীহ বুখারী
হযরত উসমান ইবনে মাজ‘উন রাযি.—ইবাদতে অতিরঞ্জন নয়, নববী ভারসাম্য
হযরত উসমান ইবনে মাজ‘উন রাযি. ছিলেন প্রথম যুগের অন্যতম মহান সাহাবি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ইবাদতগুজার ও দুনিয়াবিমুখ। কিন্তু তাঁর জীবনের একটি ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—কারণ এতে বোঝা যায়, সাহাবায়ে কেরামের যুহদ কখনো শরিয়তের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করত না।
উসমান ইবনে মাজ‘উন রাযি. এত বেশি ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন যে, তিনি দুনিয়ার স্বাভাবিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে ভারসাম্যের শিক্ষা দেন।
আয়িশা রাযি.-এর বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ উসমান ইবনে মাজ‘উন রাযি.-কে এমন অবস্থায় দেখতে পান যে, তিনি অতিরিক্ত কষ্টকর ইবাদতের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। তখন নবী ﷺ তাঁকে নির্দেশ দেন:
«وَإِنَّ لِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا»
“নিশ্চয়ই তোমার চোখেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে এবং তোমার স্ত্রীরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।”-সহীহ বুখারী
অর্থাৎ যুহদ মানে শরীরের অধিকার নষ্ট করা নয়, পরিবারের অধিকার নষ্ট করা নয় এবং আল্লাহ যে বৈধ বিষয়গুলো অনুমোদন করেছেন সেগুলোকে নিজের ওপর হারাম করে নেওয়াও নয়।
উসমান ইবনে মাজ‘উন রাযি.-এর ঘটনা থেকে তাই যুহদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা পাওয়া যায়—আল্লাহর জন্য দুনিয়াকে ত্যাগ করা মানে শরিয়তসম্মত দুনিয়াকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা নয়।
যুহদ হলো দুনিয়ার প্রতি আসক্তি ত্যাগ করা; শরিয়তের অনুমোদিত জীবনকে অস্বীকার করা নয়।
হযরত আবু দারদা রাযি.-এর একটি গভীর শিক্ষা
আবু দারদা রাযি.-এর সূত্রে একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা এসেছে:
«مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ مُعَافًى فِي جَسَدِهِ، آمِنًا فِي سِرْبِهِ، عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ، فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيَا»
“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সকালে এমন অবস্থায় উপনীত হলো যে, তার শরীর সুস্থ, সে নিরাপদ এবং তার কাছে এক দিনের খাদ্য রয়েছে—তাহলে যেন তার জন্য সমগ্র দুনিয়াই একত্র করে দেওয়া হয়েছে।”-সুনান তিরমিজি
সাহাবায়ে কেরামের যুহদ—চারটি ভিন্ন রূপ
আবু দারদা রাযি.-এর জীবনে আমরা দেখি—দুনিয়ার ব্যবসার চেয়ে ইবাদতের প্রতি অধিক ঝোঁক।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি.-এর জীবনে দেখি—দুনিয়া সামনে এসেও অন্তরকে আকৃষ্ট করতে পারেনি।
উসমান ইবনে মাজ‘উন রাযি.-এর ঘটনায় দেখি—যুহদ থাকলেও শরিয়তের ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
আর আবু দারদা রাযি.-এর বর্ণিত শিক্ষায় দেখি—স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় রিজিকও বিরাট নেয়ামত; এগুলোর জন্য কৃতজ্ঞ হওয়াই মুমিনের সৌভাগ্য।
সুতরাং সাহাবায়ে কেরামের যুহদ ছিল না কেবল পুরোনো কাপড় পরা কিংবা কম খাবার খাওয়ার নাম।
যুহদ ছিল অন্তরের একটি অবস্থা।
দুনিয়া তাদের কাছে এসেছিল—কিন্তু তারা দুনিয়ার হয়ে যাননি।
সম্পদ তাদের হাতে এসেছে—কিন্তু অন্তরকে কিনতে পারেনি।
সময় তাদের দেওয়া হয়েছিল—তারা তা আখিরাতের পাথেয় বানিয়েছেন।
আর প্রয়োজনীয় দুনিয়াবি নেয়ামত পেয়েও তাঁরা ভুলে যাননি—একদিন এই দুনিয়া ছেড়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।
এই হলো সাহাবায়ে কেরামের যুহদের প্রকৃত সৌন্দর্য।
যুহদ মানে হালালকে হারাম করা নয়
ইসলাম দুনিয়ার বৈধ নেয়ামতকে নিষিদ্ধ করেনি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ»
“বলুন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্যের সামগ্রী ও পবিত্র রিজিক বের করেছেন, তা কে হারাম করেছে?”—সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:৩২
তাই যুহদ মানে সুন্দর পোশাক পরা হারাম মনে করা নয়, ভালো খাবার খাওয়া হারাম মনে করা নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য করা থেকে বিরত থাকা নয় কিংবা পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবিদের মধ্যে ব্যবসায়ী ছিলেন, কৃষক ছিলেন, শাসক ছিলেন, সম্পদশালী ছিলেন। কিন্তু তাঁদের কেউ দুনিয়াকে জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য বানাননি।
যুহদ হলো—হালাল জিনিস ব্যবহার করবে, কিন্তু তার প্রতি এমন আসক্ত হবে না যে, তার জন্য হারাম পথে যেতে হয়।
যুহদের মূল জায়গা হলো অন্তর
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ»
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।”—সহীহ মুসলিম, ২৫৬৪
এই হাদীস যুহদের প্রকৃত স্থানটি বুঝিয়ে দেয়।
বাহ্যিক পোশাক, ঘরের অবস্থা কিংবা সম্পদের পরিমাণ দিয়ে একজন মানুষকে যাহিদ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। যুহদের আসল জায়গা হলো অন্তর।
একজন মানুষ সাধারণ পোশাক পরেও দুনিয়ার প্রতি প্রবল লোভী হতে পারেন।
আবার একজন মানুষ সুন্দর পোশাক পরেও আল্লাহর কাছে যাহিদ হতে পারেন।
কারণ আল্লাহ দেখেন অন্তর এবং আমল।
যুহদের আরেকটি দিক—কমে সন্তুষ্ট থাকা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ، وَرُزِقَ كَفَافًا، وَقَنَّعَهُ اللَّهُ بِمَا آتَاهُ»
“সফল হয়েছে সে ব্যক্তি, যে ইসলাম গ্রহণ করেছে, প্রয়োজন পরিমাণ রিজিক পেয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট করেছেন।”—সহীহ মুসলিম, ১০৫৪
এখানে “কাফাফ” অর্থ এমন রিজিক, যা মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে। আর “কানা‘আত” হলো আল্লাহর দেওয়া রিজিকে অন্তরের সন্তুষ্টি।
এটাই যুহদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
যার এক লাখ আছে সে যদি দুই লাখের জন্য অস্থির থাকে, সে যাহিদ নয়।
আর যার সামান্য আছে কিন্তু সে আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট, হারাম থেকে বেঁচে থাকে এবং নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে শুকরিয়া আদায় করে—তার অন্তরে যুহদের গুণ থাকতে পারে।
যুহদ মানুষকে আখিরাতমুখী করে
সাহাবায়ে কেরামের জীবনে মৃত্যুর স্মরণ ও আখিরাতের চিন্তা ছিল অত্যন্ত গভীর।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ»
“তোমরা স্বাদ-আনন্দ বিনষ্টকারী বিষয়—অর্থাৎ মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো।”—সুনান তিরমিযি, ২৩০৭।
মৃত্যুর স্মরণ মানুষের দুনিয়ার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে।
যে ব্যক্তি জানে তাকে একদিন সবকিছু ছেড়ে যেতে হবে, সে দুনিয়ার সম্পদকে চূড়ান্ত অর্জন মনে করতে পারে না।
এই কারণেই সাহাবায়ে কেরামের কাছে দুনিয়ার প্রাসাদ অপেক্ষা কবরের পরের জীবন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আজকের জীবনে সাহাবায়ে কেরামের যুহদ কীভাবে অর্জন করা যায়?
সাহাবায়ে কেরামের মতো যুহদ অর্জনের অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে দেবে, ব্যবসা বন্ধ করবে কিংবা সব সম্পদ বিলিয়ে দেবে।
বরং তাঁদের জীবন থেকে কয়েকটি বাস্তব শিক্ষা গ্রহণ করা যায়।
প্রথমত, হালাল উপার্জন করব; কিন্তু হারাম উপায়ে সম্পদ অর্জন করব না।
দ্বিতীয়ত, সম্পদকে নিজের পরিচয় বানাব না।
তৃতীয়ত, আল্লাহ সম্পদ দিলে শুকরিয়া আদায় করব এবং তার হক—যাকাত, সদকা ও মানুষের প্রয়োজন—আদায় করব।
চতুর্থত, সম্পদ কম থাকলে হতাশ হব না এবং অন্যের সম্পদের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকাব না।
পঞ্চমত, বিলাসিতা ও অপচয়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝব।
ষষ্ঠত, নিজের প্রয়োজনের বাইরে সবকিছুকে জীবনের অপরিহার্য বিষয় মনে করব না।
সপ্তমত, খ্যাতি, প্রশংসা ও মানুষের স্বীকৃতির পেছনে জীবন নষ্ট করব না।
অষ্টমত, প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করব—আমি দুনিয়ার জন্য কতটুকু করছি এবং আখিরাতের জন্য কতটুকু প্রস্তুতি নিচ্ছি?
শেষ কথা,
সাহাবায়ে কেরামের যুহদের ইতিহাস আমাদের দুনিয়া থেকে পালিয়ে যেতে শেখায় না; বরং দুনিয়ার দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে শেখায়।
তাঁরা দুনিয়াকে হাতে রেখেছিলেন, অন্তরে নয়।
সম্পদ তাঁদের কাছে এসেছিল, কিন্তু সম্পদ তাঁদের কিনতে পারেনি।
ক্ষমতা তাঁদের কাছে এসেছিল, কিন্তু ক্ষমতা তাঁদের অহংকারী করতে পারেনি।
অভাব তাঁদের কাছে এসেছিল, কিন্তু অভাব তাঁদের আল্লাহর প্রতি অসন্তুষ্ট করতে পারেনি।
আর মৃত্যু তাঁদের সামনে ছিল, তাই তাঁরা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী আনন্দের চেয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতাকে বড় করে দেখেছেন।
সাহাবায়ে কেরামের যুহদের সারকথা যেন এই,
দুনিয়া তোমার প্রয়োজন মেটাবে, কিন্তু তোমার হৃদয় দখল করবে না।
তুমি সম্পদের মালিক হবে, সম্পদ যেন তোমার মালিক না হয়।
তুমি দুনিয়ায় থাকবে, কিন্তু দুনিয়াকে তোমার জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য মনে করবে না।
কারণ মুমিনের আসল ঠিকানা দুনিয়া নয়।
দুনিয়া হলো সফর।
আখিরাতই হলো স্থায়ী ঠিকানা।
আর সেই সফরের শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক হলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম রাযি., যাঁদের জীবন আমাদের শিখিয়েছে—দুনিয়া যতই হাতে আসুক, হৃদয়ের সিংহাসনে একমাত্র আল্লাহর স্থানই অটুট থাকতে হবে।
এখানেই সাহাবায়ে কেরামের যুহদ।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআন-হাদীসে ইসরা ও মিরাজ : বর্ণনা ও শিক্ষা
ইসরা ও মিরাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।...
خبرِ واحد کی شرعی حیثیت
ترتیب و تحریر: حافظ رشید الحق خان عابد خبرِ واحد اگرچہ عقائد کے باب میں موجبِ علم نہیں لیکن عمل کے ب...
সকল ফকীহরই নির্ভরতা ছিল সহীহ হাদীসের উপর
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন