প্রবন্ধ
যেভাবে নবুওয়াত লাভ করেন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)
১০ আগস্ট, ২০২৬
৬৯২
০
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারতম সময়ে আলোর মশাল নিয়ে আগমন ঘটেছিল ইসলামের। জাহিলিয়াত তথা চরম মূর্খতা, অন্যায় আর পাপাচারের সাগরে নিমজ্জিত মানব সমাজকে উদ্ধার করতে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ ﷺ-কে নবুওয়াত দান করেন। বিশ্ব নবীর এই নবুওয়াত প্রাপ্তি কেবল তাঁর জীবনের কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল সমগ্র মানবজাতির ভাগ্য পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বেই আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে বিশেষ চারিত্রিক কাঠামোতে গড়ে তুলেছিলেন, যা তাঁকে তৎকালীন কলুষিত সমাজের মাঝে এক অনন্য সাধারণ মানুষে পরিণত করেছিল।
নবুওয়াতপূর্ব জীবনে জাহিলিয়াতের কলুষতা থেকে আল্লাহর সুরক্ষা
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তির আগের জীবন ছিল মানব ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়। এটি কেবল একটি সাধারণ মানুষের বেড়ে ওঠা ছিল না, বরং ছিল মহান আল্লাহর সরাসরি তত্ত্বাবধানে এক মহান বিপ্লবের প্রস্তুতি। তাঁর শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল নিষ্কলুষ, যা পরবর্তীকালে তাঁর নবুওয়াতের সবচেয়ে বড় দলিলে পরিণত হয়েছে। আরবের ঘোর অন্ধকারের মাঝে তাঁর এই আলোকোজ্জ্বল জীবন ছিল মূলত এক ঐশী মুজিজা।
মূর্তিপূজার প্রতি বিরাগভাজন
রাসূলুল্লাহ ﷺ শৈশব থেকেই সত্য ঈমান এবং গভীর চিন্তাশীলতার ওপর বেড়ে উঠেছিলেন। জাহিলিয়াতের ভ্রান্ত আকিদা বা মূর্তিপূজার সামনে তিনি কখনোই মাথা নত করেননি। মক্কার কুরাইশরা মূর্তির সামনে সিজদা করত বা বরকত লাভের আশায় সেগুলোকে স্পর্শ করত, কিন্তু নবীজি ﷺ এ থেকে চিরকাল পবিত্র ছিলেন। হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের রা. থেকে বর্ণিত, হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রা.-এর একজন প্রতিবেশী বর্ণনা করেছেন, তিনি নবীজিকে খাদিজা রা.-এর কাছে এভাবে বলতে শুনেছেন
أَيْ خَدِيجَةُ، وَاللَّهِ لَا أَعْبُدُ اللَّاتَ، وَاللَّهِ لَا أَعْبُدُ العُزَّى أَبَدًا
অর্থ: "হে খাদিজা! আল্লাহর কসম, আমি কখনোই লাত-এর ইবাদত করব না। আল্লাহর কসম, আমি কখনোই উযযার ইবাদত করব না।" তখন হযরত খাদিজা রা. তাকে সমর্থন করে বলতেন, "আপনি লাত ও উযযাকে পরিহার করুন।" (মুসনাদে আহমদ: ১৭৯৪৭)
একইভাবে হযরত যায়েদ বিন হারিসা রা. বলেছেন, কাবার পাশে ইসাফ ও নায়েলা নামক দুটি পিতলের মূর্তি ছিল, মুশরিকরা তওয়াফ করার সময় সেগুলো স্পর্শ করত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে আমিও তওয়াফ করছিলাম। আমি যখন ঐ মূর্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন তা স্পর্শ করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: لَا تَمَسَّهُ অর্থাৎ, "তুমি এটা স্পর্শ করো না।" যায়েদ রা. বলেন, আমরা পুনরায় তওয়াফ করলাম এবং আমি মনে মনে বললাম যে, এটি স্পর্শ করলে কী হয় তা দেখার জন্য হলেও আমি আবার স্পর্শ করব। আমি পুনরায় স্পর্শ করলে রাসূলুল্লাহ ﷺ ধমক দিয়ে বললেন: لَا تَمَسَّهُ، أَلمْ تُنْهَ؟ অর্থাৎ, "তুমি তা স্পর্শ করো না, তোমাকে কি নিষেধ করা হয়নি?"
হযরত যায়েদ বিন হারিসা রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! নবুওয়াত লাভ ও ওহী নাজিলের আগেও কোনদিন নবী ﷺ (সম্মান প্রদর্শন বা অভিবাদনের উদ্দেশ্যে) কোনো মূর্তিকে স্পর্শ করেননি। (সুনানে কুবরা নাসাঈ: ৮১৩২)
পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে অলৌকিক নিরাপত্তা
যৌবনকালে আরবের যুবকরা যখন মদ্যপান, জুয়া এবং বিভিন্ন অশ্লীল আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত থাকত, নবীজি ﷺ তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে অলৌকিকভাবে সুরক্ষিত ছিলেন। তিনি কখনও মদ পান করেননি কিংবা কোনো চারিত্রিক স্খলনে লিপ্ত হননি। তৎকালীন সমাজে প্রচলিত নর্তকী বা গায়িকাদের মজলিশ থেকে আল্লাহ তাঁকে বিশেষ পন্থায় হেফাজত করেছিলেন। হযরত আলী ইবনে আবু তালিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছেন, "জাহিলিয়াতের লোকেরা যেসব মন্দ কাজে লিপ্ত হতো, আমি কেবল দুইবার সেগুলোর প্রতি আগ্রহবোধ করেছিলাম। কিন্তু উভয়বারই আল্লাহ তাআলা আমাকে রক্ষা করেছেন। মক্কার উচ্চভূমিতে পরিবারের ছাগল চরানোর সময় সঙ্গী কুরাইশী যুবককে আমি বললাম, 'তুমি কি আমার ছাগলগুলো দেখবে? আমি আজ রাতে মক্কায় যাব সাধারণ যুবকদের মতো গল্পগুজব করতে।' সে রাজি হলো।"
নবীজি ﷺ বলেন, "আমি যখন মক্কার লোকালয়ের কাছাকাছি পৌঁছালাম, তখন গান-বাজনা ও দফ বা বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটি কী? তারা বলল, অমুক কুরাইশ ব্যক্তির সাথে অমুক নারীর বিয়ে হচ্ছে। আমি তখন সেই গান ও শব্দ শুনে বসে পড়লাম। তখন আল্লাহ তাআলা আমার ওপর ঘুমের চাদর টেনে দিলেন। অবশেষে রাত পেরিয়ে যখন দিন হয়ে গেল এবং সূর্য যখন প্রখর উত্তাপ ছড়াতে লাগলো তখন আমার ঘুম ভাঙল। পরদিনও আমি একইভাবে যাওয়ার চেষ্টা করলে আল্লাহ তায়ালা আমাকে ঘুমের মাধ্যমে হেফাজত করেন।" এর পরবর্তী সময় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
فَوَاللَّهِ ما هَمَمْتُ بَعْدَهُمَا بِسُوءِ مِمَّا يَعْمَلُهُ أَهْلُ الجَاهِلِيَّةِ حتى أكْرَمَنِي اللَّهُ بِنُبُوَّتهِ
অর্থ: "আল্লাহর কসম! এরপর থেকে নবুওয়াত প্রাপ্তি পর্যন্ত আমি আর কখনো জাহিলিয়াতের কোনো মন্দ কাজের সংকল্প করিনি।" (সহীহ ইবনে হিব্বান: ৬২৭২)
আরাফাতের ময়দানে অবস্থান
নবুওয়াতের পূর্বেই আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে হকের পথে পরিচালিত করেছিলেন। কুরাইশরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের জন্য হজ পালনের সময় আরাফাতের ময়দানে না গিয়ে মুযদালিফায় অবস্থান করত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের এই বৈষম্যমূলক প্রথা মানতেন না এবং সাধারণ মানুষের সাথে আরাফাতের ময়দানেই অবস্থান করতেন। হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম রা. বলেন
أَضْلَلْتُ بَعِيرًا لِي، فَدَخَلْتُ أَطْلُبُهُ يَوْمَ عَرَفَةَ، فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَاقِفًا مَعَ النَّاسِ بِعَرَفَةَ
অর্থ: "আমি আরাফাতের দিনে আমার একটি উট খুঁজতে বের হলাম। তখন আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মানুষের সাথে আরাফাতের ময়দানে উকূফ করতে দেখলাম।" (সহীহ বুখারী: ১৬৬৪)
এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর জন্য বিশেষ তওফিক। কুরাইশরা অহংকারের বশবর্তী হয়ে যা বর্জন করত, নবীজি ﷺ ইবরাহিমী সুন্নাহ অনুসরণের তাগিদ থেকে সেটাই করতেন এবং অন্যান্য গোত্রের সাথে আরাফাতের ময়দানে উকূফ করতেন।
আমানতদারিতা ও অনন্য সত্যবাদিতা
নবীজি ﷺ-এর চরিত্র ছিল আমানত ও সত্যবাদিতার এক মূর্ত প্রতীক। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাই তাঁর সত্যবাদিতার সাক্ষ্য দিত। নবুওয়াতের দায়িত্ব পাওয়ার পর যখন তিনি সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কুরাইশে লোকদেরকে ডাক দিলেন, তখন তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করেছিলেন "যদি আমি তোমাদের বলি, এই পাহাড়ের পেছনে একটি বাহিনী তোমাদের আক্রমণ করার জন্য ওঁত পেতে আছে, তবে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে?"
তখন কুরাইশ বংশের নেতৃবৃন্দ একবাক্যে উত্তর দিয়েছিল
نَعَمْ، مَا جَرَّبْنَا عَلَيْكَ كَذِبًا قَطُّ
অর্থ: "হ্যাঁ, আমরা আপনার কাছ থেকে কখনো মিথ্যা কথা বলার অভিজ্ঞতা পাইনি।" (সহীহ বুখারী: ৪৭৭০)
এমনকি রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন মক্কার তখনকার কাফের নেতা আবু সুফিয়ানের কাছে নবীজির সত্যবাদিতা সম্পর্কে জানতে চাইলেন, তখন আবু সুফিয়ান (যিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি) স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, নবীজি ﷺ কখনো মিথ্যা বলেননি।" (সহীহ বুখারী: ৭)
এই আমানতদারিতা ও চারিত্রিক বিশুদ্ধতাই তাঁকে আরবের শ্রেষ্ঠ সত্যবাদী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল এবং মানুষের হৃদয়ে তাঁর প্রতি এক অবিচল আস্থা তৈরি করেছিল।
আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা ও মানবসেবা
রাসূলুল্লাহ ﷺ কেবল সত্যবাদী ও বিশ্বস্তই ছিলেন না, সেই সাথে তিনি ছিলেন আর্তমানবতার সেবক এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি দরিদ্রদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, মেহমানদের আপ্যায়নে ছিলেন খুবই আন্তরিক এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। তাঁর এই মানবিক গুণাবলি সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.) ওহী নাযিলের প্রারম্ভিক মুহূর্তে এক অবিস্মরণীয় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। তিনি নবীজি ﷺ-কে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন:
"كَلَّا وَاللَّهِ لَا يُخْزِيكَ اللَّهُ أَبَدًا، إنَّكَ لَتَصِلُ الرَّمَ، وتَحْمِلُ الكَلَّ، وتُكْسِبُ المَعْدُومَ، وتَقْرِي الضَّيْفَ، وتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الحَقِّ"
অর্থ: "কখনোই নয়, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, অসহায়দের বোঝা বহন করেন, রিক্তহস্তদের সাহায্য করেন, মেহমানদারি করেন এবং বিপদে মানুষকে সাহায্য করেন।" (সহীহ বুখারী: ৩)
মোটকথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত পূর্ব জীবন ছিল শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা এবং মানবীয় মহত্ত্বে ভরপুর। মহান আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব দেওয়ার আগেই এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন যে, তাঁর চরিত্রে কোনো খুঁত বা দুর্বলতা ছিল না।
কাজী ইয়ায (রহ.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল প্রশংসনীয় গুণাবলী ছিল আল্লাহর বিশেষ দান। (আশ-শিফা বি-তারীফি হুকুকিল মুস্তফা: ১/৮৯)
ইমাম যাহাবী (রহ.) বলেন:
والذِي لا رَيْبَ فيهِ: أَنَّ المُصْطَفَى -صلى اللَّه عليه وسلم- كان مَعْصُومًا قَبْلَ الوَحْي، وبَعْدَهُ، وقَبْلَ التَّشْرِيعِ مِنَ الزِّنَى قَطْعًا، ومِنَ الخِيَانَةِ والكَذِبِ، والسُّكْرِ، والسُّجُودِ لِوَثَنٍ، والاسْتِقْسَامِ بالأزْلَامِ، ومِنَ الرَّذَائِلِ، والسَّفَهِ وبَذَاءِ اللِّسَانِ، وكَشْفِ العَوْرَةِ، فَلَمْ يَكُنْ يطُوفُ عُرْيَانًا، ولا كَانَ يَقِفُ يَوْمَ عَرَفَةَ مَعَ قَوْمِهِ بِمُزْدَلِفَةٍ، بلْ كَانَ يَقِفُ بِعَرَفَةَ.
এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী প্রাপ্তির আগে এবং পরে, এমনকি ইসলামি বিধিবিধান বা শরীয়ত প্রবর্তনের পূর্বকালেও যাবতীয় পাপাচার থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র বা ‘মাসুম’ ছিলেন। তিনি ব্যভিচার, খেয়ানত, মিথ্যাচার, মদ্যপান, মূর্তিপূজা, তীরের মাধ্যমে ভাগ্য নির্ণয় করা, যাবতীয় চারিত্রিক হীনতা, মূর্খতা, অশ্লীল ভাষা এবং সতর বা লজ্জাস্থান উন্মুক্ত করার মতো অশোভন আচরণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন কাজ থেকে মুক্ত ছিলেন। তৎকালীন জাহিলি প্রথা অনুযায়ী তিনি কখনো উলঙ্গ অবস্থায় কাবা ঘর তওয়াফ করেননি এবং হজের সময় কুরাইশদের আভিজাত্য রক্ষার প্রথা মেনে চলেননি। বরং সাধারণ মানুষের সাথে আরাফাতের ময়দানেই তিনি উকূফ করতেন। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা: ১/১৩০, ১৩১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মাঝে কখনো নবুওয়াতের কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না
কিন্তু এক অজানা আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা ছিল
নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মনে এক প্রকার অজানা ব্যাকুলতা কাজ করত, কিন্তু তিনি কখনো কল্পনাও করেননি যে, মহান আল্লাহ তাঁকে ওহী ও রিসালাতের মহান দায়িত্বে অভিষিক্ত করবেন। তিনি নবুওয়াতের কোনো প্রত্যাশা বা পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করেননি, বরং এটি ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক বিশেষ রহমত ও ঐশী নির্বাচন। এই বিষয়ে মহান আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
{وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِي بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ}
অর্থ: "এমনিভাবে আমি আপনার প্রতি আমার নির্দেশে ‘রূহ’ (ওহী) প্রেরণ করেছি। আপনি জানতেন না কিতাব কী এবং ঈমান কী। কিন্তু আমি একে আলো বানিয়েছি, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা পথপ্রদর্শন করি। আর নিশ্চয়ই আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন।" (সূরা শূরা: ৫২)
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
{وَمَا كُنْتَ تَرْجُو أَنْ يُلْقَى إِلَيْكَ الْكِتَابُ إِلَّا رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ فَلَا تَكُونَنَّ ظَهِيرًا لِلْكَافِرِينَ}
অর্থ: "পূর্ব থেকে আপনার এ আশা ছিল না যে, আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করা হবে। কিন্তু এটা আপনার প্রতিপালকের রহমত। " (সূরা কাসাস: ৮৬)
নিরক্ষরতা: আল্লাহর বিশেষ হিকমত
আল্লাহ তাআলা নবী ﷺ-কে উম্মি বা নিরক্ষর হিসেবে বড় করেছেন। তিনি পড়তে বা লিখতে জানতেন না, যা পরবর্তীকালে আল-কুরআনের অলৌকিকত্বের এক বড় দলিলে পরিণত হয়। এর ফলে বাতিলপন্থীরা এই অপবাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ পায়নি যে নবীজি (ﷺ) আগের কোনো কিতাব পড়ে বা নিজে লিখে এই কালাম তৈরি করেছেন। কুরআন মাজীদে এই হিকমতটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
{وَمَا كُنْتَ تَتْلُو مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ}
অর্থ: "এর পূর্বে আপনি কোনো কিতাব পাঠ করতেন না এবং স্বহস্তে তা লিখতেন না; এমন হলে বাতিলপন্থীরা অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করত।" (সূরা আনকাবুত: ৪৮)
এমনকি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহেও তাঁর এই 'উম্মি' বা নিরক্ষর হওয়ার গুণটি বর্ণিত ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
{الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ}
অর্থ: "যারা অনুসরণ করবে এই রাসূলের, যিনি উম্মি নবী, যাঁর উল্লেখ তারা তাদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায় …(তারাই হবে সফলকাম)।" (সূরা আরাফ: ১৫৭)
নবুওয়াতের পূর্বাভাস: শয়তানের গতিবিধি রোধ ও নক্ষত্রপাত
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় যখন ঘনিয়ে এল, তখন আসমানি জগতে এক বিশেষ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলো। শয়তান ও জিনেরা আগে আসমানে গিয়ে ফেরেশতাদের কথোপকথন চুরি করে শুনত, কিন্তু নবীজি (ﷺ)-এর আগমনের আগমুহূর্তে তাদের এসব অপতৎপরতা বন্ধ করে দেওয়া হলো। যখনই তারা আসমানের দিকে যেত, নক্ষত্র বা উল্কাপিণ্ড নিক্ষেপ করে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হতো। জিনেরা বুঝতে পারল পৃথিবীতে মহান কোনো ঘটনার অবতারণা হতে যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা জিনদের জবানিতে বলেন:
{وَأَنَّا كُنَّا نَقْعُدُ مِنْهَا مَقَاعِدَ لِلسَّمْعِ فَمَنْ يَسْتَمِعِ الْآنَ يَجِدْ لَهُ شِهَابًا رَصَدًا وَأَنَّا لَا نَدْرِي أَشَرٌّ أُرِيدَ بِمَنْ فِي الْأَرْضِ أَمْ أَرَادَ بِهِمْ رَبُّهُمْ رَشَدًا}
অর্থ: "আগে আমরা সংবাদের জন্য আসমানের বিভিন্ন ঘাঁটিতে বসতাম, কিন্তু এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে তার ওপর প্রদীপ্ত উল্কাপিণ্ডকে ওঁত পেতে থাকতে দেখে। আমরা জানি না যে দুনিয়াবাসীদের জন্য কোনো অমঙ্গল চাওয়া হয়েছে, নাকি তাদের পালনকর্তা তাদের সুপথ প্রদর্শনের ইচ্ছা করেছেন।" (সূরা জিন: ৯-১০)
নবুওয়াতপূর্ব আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি
সত্য স্বপ্ন ও ঐশী আলোর ঝিলিক
নবুওয়াত ও ওহী সরাসরি প্রাপ্তির আগে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার জন্য ছয় মাস পর্যন্ত সত্য স্বপ্নের ধারা জারি রাখা হয়েছিল। হযরত আয়েশা (রা.) নবীজি ﷺ-এর নবুওয়াতের সূচনা সম্পর্কে বলেছেন:
"أَوَّلُ مَاُ بُدِئَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ -صلى اللَّه عليه وسلم- مِنَ الْوَحْي الرُّؤْيَا الصَّادِقَةُ فِي النَّوْمِ، فَكَانَ لَا يَرَى رُؤْيَا إِلَّا جَاءَتْ مِثْلَ فَلَقِ الصُّبْحِ"
অর্থ: "রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ওহীর সূচনা হয়েছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা সুবহে সাদেকের আলোর মতো প্রকাশিত হতো।" (সহীহ বুখারী: ৩; সহীহ মুসলিম: ১৬০)
নিভৃত সাধনা: হেরা গুহায় নির্জনতা ও ইবাদত
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বয়স যখন চল্লিশের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন মহান আল্লাহ তাঁর অন্তরে নির্জনতা ও নিভৃত সাধনার প্রতি গভীর অনুরাগ সৃষ্টি করে দিলেন। তিনি মক্কার কোলাহল ছেড়ে জাবালে নূরের চূড়ায় অবস্থিত হেরা গুহায় দীর্ঘ সময় কাটাতে শুরু করেন। তিনি সেখানে অবস্থান করতেন এবং আল্লাহ তাআলার ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। এই নির্জনবাস ছিল মূলত নবুওয়াতের মহান দায়িত্ব গ্রহণের এক বিশেষ আত্মিক ও মানসিক প্রস্তুতি। এই সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
"ثُمَّ حُبِّبَ إِلَيْهِ الْخَلَاءُ، وَكَانَ يَخْلُو بِغَارِ حِرَاءٍ، فَيَتَحَنَّثُ فِيهِ -وَهُوة التَّعَبُّدُ- اللَّيَالِيَ ذَوَاتِ الْعَدَدِ"
অর্থ: "অতঃপর নির্জনতা তাঁর কাছে প্রিয় করে দেওয়া হলো। তিনি হেরা গুহায় নির্জনবাস করতেন এবং সেখানে টানা কয়েক রাত ইবাদতে (তাহান্নুছ) মগ্ন থাকতেন।" (সহীহ বুখারী: ৩; সহীহ মুসলিম: ১৬০, ফিকহুস সীরাহ, মুহাম্মদ আল-গাজালী: ৮৫)
জড়বস্তুর সালাম ও নবুওয়াতপূর্ব অলৌকিক ঘটনা
নবুওয়াত ও ওহী নাযিলের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে অনেক অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেতে শুরু করে। এটি ছিল তাঁকে আসমানি বার্তার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করারই অংশবিশেষ। যেমন মক্কার রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় বিভিন্ন পাথর ও গাছ তাঁকে সম্বোধন করে সালাম প্রদান করত। হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন:
"إِنِّي لَأَعْرِفُ حَجَرًا بِمَكَّةَ كَانَ يُسَلِّمُ عَلَيَّ قَبْلَ أَنْ أُبْعَثَ، إِنِّي لَأَعْرِفُهُ الْآنَ"
অর্থ: "আমি মক্কার একটি পাথরকে চিনি যা আমি নবুওয়াত পাওয়ার আগে থেকেই আমাকে সালাম দিত, আমি তাকে এখনও চিনবো।" (সহীহ মুসলিম: ২২৭৭)
হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, আমি নবী ﷺ-এর সঙ্গে মক্কা মুকাররামায় ছিলাম। একবার কোন এক পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আমরা বের হলাম। এ সময় যেসব পাহাড় ও বৃক্ষ তাঁর সামনে পড়ছিল, সেগুলো তাঁকে লক্ষ্য করে বলছিল: আসসালামু আলায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ! (জামে তিরমিজী: ৩৯৫৪; মুস্তাদরাক হাকেম: ৪২৯৬)
নবুয়ত লাভ
হেরা গুহায় জিবরাঈল (আ.) ও প্রথম ওহী
অবশেষে মানব ইতিহাসের সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত উপস্থিত হলো, যা মানবজাতির মুক্তির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও বরকতময় অধ্যায়। একদিন নবী ﷺ যখন হেরা গুহার নিভৃত কোণে মহান রব্বুল আলামীনের ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন, তখন ওহীর বার্তা নিয়ে হযরত জিবরাঈল (আ.) উপস্থিত হলেন। আর এভাবেই শুরু হলো পুরো পৃথিবীর মানুষের হেদায়েতের এক নতুন আলোকোজ্জ্বল যুগ। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) সেই বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, হেরা গুহায় ফেরেশতা এসে তাঁকে বললেন 'পড়ুন'। নবীজি ﷺ বললেন 'আমি তো পড়তে জানি না'। তখন ফেরেশতা তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে সজোরে চাপ দিলেন এবং পুনরায় পড়তে বললেন। এভাবে তিনবার চাপ দেওয়ার পর জিবরাঈল (আ.) সূরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াত পাঠ করলেন:
"{اقرأ باسم ربك الذي خلق (١) خلق الإنسان من علق (٢) اقرأ وربك الأكرم (٣) الذي علم بالقلم (٤) علم الإنسان ما لم يعلم (٥)}"
অর্থ: "পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।" (সূরা আলাক: ১-৫; সহীহ বুখারী: ৩; সহীহ মুসলিম: ১৬০)
এই বাণীর মাধ্যমেই বিশ্বনবী ﷺ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়াতের চূড়ান্ত দায়িত্বে অভিষিক্ত হলেন।
নবুওয়াতের গুরুভার ও খাদিজা (রা.)-এর প্রবোধ দান
ওহী নাযিলের এই অভাবনীয় ও গাম্ভীর্যপূর্ণ ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত ভীত ও কম্পিত অবস্থায় ঘরে ফিরলেন। নবুওয়াতের এই গুরুভার বহনের প্রাথমিক মুহূর্তে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিচলিত ছিলেন। তিনি ঘরে ঢুকে হযরত খাদিজা (রা.)-কে বললেন 'আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দাও'।
হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন:
"فرجع بها رسول الله ﷺ يرجف فؤاده، فدخل على خديجة بنت خويلد رضي الله عنها، فقال: "زملوني زملوني"، فزملوه حتى ذهب عنه الروع"
অর্থ: "রাসূলুল্লাহ ﷺ কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরে এলেন এবং খাদিজা (রা.)-কে বললেন, 'আমাকে বস্ত্রাবৃত করো, আমাকে বস্ত্রাবৃত করো'। তখন তারা তাঁকে বস্ত্রাবৃত করে রাখলো। অবশেষে তাঁর আতঙ্ক দূর হলো।" (সহীহ বুখারী: ৩; সহীহ মুসলিম: ১৬০)
সে সময় হযরত খাদিজা (রা.) তাঁর অনুপম চরিত্রের সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না, আপনি তো আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন এবং মানুষের সেবা করেন। মহীয়সী খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রবোধ ও আস্থা নবীজিকে সেই কঠিন সময়ে সাহস ও স্বস্তি জুগিয়েছিল।
ওহী স্থগিত হওয়া ও আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা
প্রথমবার ওহী নাযিলের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওহী আসা বন্ধ থাকে, যাকে ইসলামী পরিভাষায় 'ফাতরাতুল ওহী' বা ওহী স্থগিতের কাল বলা হয়। এটি ছিল মূলত নবীজি ﷺ-এর প্রাথমিক আতঙ্ক দূর করা এবং তাঁর মনে ওহীর প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও ব্যাকুলতা সৃষ্টির একটি মাধ্যম। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, এই বিরতির হিকমত ছিল নবীজির মন থেকে ওহীর প্রাথমিক ভীতিকর ভাব দূর করা এবং পুনরায় ওহী লাভের জন্য তাঁকে মানসিকভাবে উদগ্রীব করে তোলা। (ফাতহুল বারী: ১/৪০)
সূরা মুদ্দাসসির ও দাওয়াতের চূড়ান্ত ঘোষণা
ওহী স্থগিত থাকার সময় একদিন নবীজি ﷺ পথ চলছিলেন, এমন সময় তিনি আকাশ থেকে একটি শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সেই ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে একটি আসনে বসে আছেন। তাঁকে সেই বিশাল রূপে দেখে নবীজি পুনরায় ভীত হয়ে ঘরে ফিরে এলেন এবং বললেন 'আমাকে বস্ত্রাবৃত করো'। ঠিক সেই মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাআলা দাওয়াতের চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়ে সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতসমূহ নাযিল করেন। হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ওহীর বিরতি বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন, একদিন আমি পথ চলছিলাম, হঠাৎ আকাশ হতে একটি শব্দ শুনে মাথা তুলে তাকালাম, দেখি, হেরা গুহায় যে ফিরিশতা আমার কাছে এসেছিলেন সে ফিরিশতা যমীন ও আসমানের মধ্যস্থলে কুরসীর উপর বসে আছেন। এ দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। জলদি বাড়ি ফিরে এসে বলতে লাগলামঃ আমাকে বস্ত্রাচ্ছাদিত কর, আমাকে বস্ত্রাচ্ছাদিত কর। তারা আমায় বস্ত্রাচ্ছাদিত করল। সে সময় আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন:
"{يَاأَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ (١) قُمْ فَأَنْذِرْ (٢) وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ (٣) وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ (٤) وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ (٥)}"
অর্থ: "হে বস্ত্রাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন। আপনার পালনকর্তার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন। আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন এবং অপবিত্রতা বর্জন করুন।" (সূরা মুদ্দাসসির: ১-৫; সহীহ মুসলিম: ১৬১)
এই আয়াতের মাধ্যমেই মূলত মানুষের দ্বারে দ্বারে ইসলামের সুমহান বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এক দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার সূচনা হয়। (ফি জিলালিল কুরআন: ৬/৩৭৫৪)
সূরা মুযাম্মিল ও কঠোর ইবাদতের প্রস্তুতি
দাওয়াতের এই কঠিন ও মহান দায়িত্ব পালনের জন্য নবীজি ﷺ-কে আধ্যাত্মিকভাবে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন ছিল। তাই সূরা মুদ্দাসসিরের পরেই আল্লাহ তাআলা সূরা মুয্যাম্মিল নাযিল করে তাঁকে রাত জেগে দীর্ঘ সময় সালাত ও কুরআন তিলাওয়াতের নির্দেশ দেন। এটি ছিল নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য এক প্রকার রুহানি প্রশিক্ষণ। মহান আল্লাহ তাআলা এরশাদ ফরমান:
"{يَاأَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ (١) قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا (٢) نِصْفَهُ أَوِ انْقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا (٣) أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا (٤)}"
অর্থ: "হে চাদরাবৃত! রাতের কিছু অংশ ছাড়া বাকি রাত (ইবাদতের জন্য) দাঁড়িয়ে যান; অর্ধেক রাত অথবা তার চেয়ে কিছু কম। অথবা তার চেয়ে কিছু বেশি এবং কুরআন পাঠ করুন সুনিপুণভাবে।" (সূরা মুয্যাম্মিল: ১-৪)
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এই আয়াতের নির্দেশে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবীগণ দীর্ঘ এক বছর ধরে রাতে এত বেশি ইবাদত করতেন যে তাঁদের পা ফুলে যেত। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা এই সূরার শেষ আয়াতগুলোতে ইবাদতের এই কঠোরতা শিথিল করে দেন। (সহীহ মুসলিম: ৭৪৬)
ওহীর প্রকারভেদ ও অবতরণের তীব্রতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর ওহী আসার পদ্ধতি ছিল বৈচিত্র্যময়। কখনো জিবরাঈল (আ.) মানুষের বেশে আসতেন, আবার কখনো ওহী আসার সময় ঘণ্টার ধ্বনির মতো শব্দ হতো। এই দ্বিতীয় পদ্ধতিটি ছিল তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। ওহী নাযিলের সময় প্রচণ্ড শীতের দিনেও তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরত এবং তিনি অত্যন্ত ভার বোধ করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কাছে ওহী কীভাবে আসে? তিনি উত্তরে বললেন:
"أحْيَانًا يَأْتِينِي مِثْلَ صَلْصَلَةِ الجَرَسِ، وهُو أشَدُّهُ عَلَيَّ، فيُفْصَمُ عَنِّي، وَقَدْ وَعَيْتُ عَنْهُ مَا قَالَ، وأحْيَانًا يتَمَثَّلُ لِيَ المَلَكُ رَجُلًا فيكَلِّمُنِي فَأَعِي ما يَقُولُ"
অর্থ: "কখনো আমার কাছে তা ঘণ্টার আওয়াজের মতো আসে এবং এটিই আমার ওপর সবচেয়ে কঠিন হয়। ওহী শেষ হয় এমতাবস্থায় যে আমি ফেরেশতার বলা সব কথা মুখস্থ করে ফেলেছি। আবার কখনো ফেরেশতা মানুষের আকৃতিতে এসে আমার সাথে কথা বলেন। তখন তিনি যা বলেন আমি তা আয়ত্ত করে নেই।" (সহীহ মুসলিম: ২৩৩৩)
হযরত আয়েশা (রা.) আরও বলেন, আমি তীব্র শীতের দিনেও তাঁর ওপর ওহী নাযিল হতে দেখেছি, ওহী শেষ হলে দেখা যেত তাঁর ললাট থেকে ঘাম ঝরছে। (সহীহ বুখারী: ২)
ওহী সংরক্ষণে মহান আল্লাহর অভয় প্রদান
ওহী নাযিলের সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ খুব দ্রুত তা মুখস্থ করার চেষ্টা করতেন, পাছে তিনি কোনো অংশ ভুলে যান। ওহীর প্রতি তাঁর এই গভীর ভালোবাসা ও ব্যাকুলতা দেখে মহান আল্লাহ স্বয়ং এর সংরক্ষণ ও তিলাওয়াতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নবীজিকে অভয় দেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ওহী নাযিলের সময় তা আয়ত্ত করতে বেশ কষ্ট স্বীকার করতেন এবং প্রায়ই তিনি তাঁর উভয় ঠোঁট নাড়তেন। তখন আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন:
"{لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ، إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ، فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ}"
অর্থ: "তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করার জন্য আপনি আপনার জিহ্বা নাড়াবেন না। নিশ্চয়ই একে (আপনার অন্তরে) জমানো ও (মুখ দিয়ে) পাঠ করানোর দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি (জিবরাঈলের মাধ্যমে) তা পাঠ করি আপনি সে পাঠের অনুসরণ করুন" (সূরা কিয়ামাহ: ১৬-১৮)
ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, অর্থাৎ মনোযোগ সহকারে শুনুন এবং চুপ থাকুন। তারপর থেকে যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আসতেন, তখন তিনি মনোযোগ সহকারে কেবল শুনতেন। জিবরাঈল চলে গেলে তিনি যেমন পড়েছিলেন, রাসূলুল্লাহও (ﷺ) ঠিক তেমনি পড়তেন। (সহীহ বুখারী: ৫)
মোটকথা আল্লাহ তাআলা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, ওহী নাযিলের সময় তিনি যেন কেবল মনোযোগ দিয়ে তা শোনেন; পরে তা পাঠ করিয়ে দেওয়া এবং তাঁর হৃদয়ে গেঁথে দেওয়ার দায়িত্ব মহান আল্লাহ তাআলার। এরপর থেকে জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে এলে নবীজি চুপচাপ তা শুনতেন এবং জিবরাঈল (আ.) চলে যাওয়ার পর তিনি অবিকল সেভাবে তা পাঠ করতেন।
শেষ কথা
নবী ﷺ-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির মাধ্যমেই পৃথিবী থেকে অন্ধকার ও মূর্খতার অবসান ঘটার পথ সুগম হয়। নবুওয়াত প্রাপ্তির সেই পবিত্র মুহূর্তগুলো কেবল ইসলামের ইতিহাসের সূচনা নয়, বরং তা ছিল সমগ্র মানবজাতির ভাগ্য পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ এবং মানব সভ্যতার মুক্তি ও সফলতার এক শাশ্বত এবং চিরন্তন আলোকবর্তিকা। হেরা গুহার সেই ঐতিহাসিক মহিমান্বিত ক্ষণটি কেবল নবীজি ﷺ-এর ব্যক্তিগত জীবনকেই বদলে দেয়নি, বরং তা ছিল গোটা বিশ্বমানবতার ভাগ্য পরিবর্তনের এক অনন্য সূচনা। ওহীর আলো আসার আগে পৃথিবী যখন জাহেলিয়াত, অন্যায় আর পাপাচারের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক তখনই নবুওয়াতের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে হেদায়েতের নতুন সূর্য উদিত হয়। মহান আল্লাহর কালাম পবিত্র কুরআনের প্রথম বাণী 'ইকরা' বা 'পড়ো'-র মাধ্যমে মানবজাতিকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আলোর এক নতুন পথের দিশা দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর হাবীবের নবুওয়াত লাভ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল সৃষ্টির শুরু থেকে মহান রব্বুল আলামীনের এক মহাপরিকল্পনার বাস্তব রূপ। নবুওয়াত পাওয়ার পর থেকে আমৃত্যু প্রিয় নবী ﷺ যে অক্লান্ত সংগ্রাম করে গেছেন, তার ফলেই আজ আমরা ইসলামের মতো পরম নিয়ামত লাভ করেছি। হেরা গুহার সেই নিভৃত কোণ থেকে শুরু হওয়া তাওহীদের বাণী আজ কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। একজন সাচ্চা মুসলিম হিসেবে আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দেখানো সেই আলোতে নিজেদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ইমাম আবু হানীফা রহ. সম্পর্কে ইমাম ইবনে আবী শাইবা রহ.-এর মনোভাব : একটি পর্যালোচনা
ইমাম আবু হানীফা রহ. সম্পর্কে ইমাম ইবনে আবী শাইবা রহ.-এর মনোভাব : একটি পর্যালোচনা মাওলানা মুহসিনুদ্দী...
ইসলামের ইতিহাসে সিরিয়া ও শাম অঞ্চল
সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত একটি আরব দেশ। এটি পশ্চিম এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। দেশটির ভৌগোলি...
“তালেবানের বিজয়: আল্লাহর সাহায্যের এক নিদর্শন”
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্য। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের...
ফিরাঊনের লাশ; আমাদের শিক্ষা
একজন শাইখ মিসরের যাদুঘর পর্যটন করতে গেলেন। ফিরাঊনের মমিকৃত লাশকে অবলোকন করার সময় তিনি দেখতে পেলেন যে...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন