প্রবন্ধ
লালনের কথাই কুরআন! বাউল মতবাদ! পর্ব—১০
৭ জানুয়ারী, ২০২৬
২০০৩
০
পবিত্র কুরআন হলো মহান আল্লাহর বাণী এবং সুনির্দিষ্ট করে কোট করা বাণীগুলোই কুরআন। যা আমাদের হাতে সংরক্ষিত।
বাউল ধর্মে কী বলে?
তাদের বক্তব্য হলো—লালন ফকিরের কথাই কুরআন। দেখুন, তারা লিখেছে—
যেহি মোর্শেদ সেই তো রসুল ইহাতে নাই কোনও ভুল খোদাও সে হয় ৷
লালন কয় না এমন কথা কোরানে কয়।
এখানে মোর্শেদতত্ত্বের কোরানদর্শনগত গভীরতা বোঝাতে গিয়ে শাঁইজী নিজের দাবিকে জীবন্ত তথা জাগ্রত কোরানের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এবং কোরান যে এক-একথা নিশ্চয় আর নতুন করে বলার দরকার পড়ে না।
কোরান কালুল্লায় কুল্লে সাইউন মোহিত লেখা যায়
আল জবানের খবর জেনে হও হুঁশিয়ারই। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৬৩)
বেদ, গীতা, ত্রিপিটক, বাইবেল কিংবা আল কোরানের মতো তাঁর বাণীও চিরন্তন ও অবিনাশী। —(লালনদর্শন, পৃ. ১০৩)
‘লালন কয় না এমন কথা কোরানে কয়’ এখানে মোর্শেদতত্ত্বের কোরানদর্শনগত গভীরতা বোঝাতে গিয়ে শাঁইজী নিজের দাবিকে জীবন্ত তথা জাগ্রত কোরানের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এবং কোরান যে এক-একথা নিশ্চয় আর নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত : পৃ. ৬৩)
লালনদেহ কেতাব : শাঁইজির বাণী জাগ্রত কোরান
স্রষ্টার বিকাশ বিজ্ঞানকে কেতাব বলে, কাগুজে কোনো গ্ৰন্থকে নয় । কেতাবের তথা জীবন রহস্য বিজ্ঞানের আংশিক প্রকাশ বা কিছু কথা হলো কোরান । —(লালনদর্শন, পৃ. ১২৯)
লালন শাঁইজি হলেন কেতাব অর্থাৎ সৃষ্টি রহস্যের বিকাশ বিজ্ঞান। এ কেতাব বা রহস্যভাণ্ডার থেকে উৎসারিত কিছু বাণী বা কথার সমষ্টি হলো কোরান, যা শাঁইজির সুরের ঝরনাধারা বেয়ে আমাদের পাষাণ মনের কন্দরে প্রবেশ করে তাকে ভিজিয়ে কোমল করে তোলে। —(লালনদর্শন, পৃ. ১২৯)
লালন একাডেমীর সাবেক পরিচালত ডক্টর আনোয়ারুল করীম লিখেছেন—
এরা লালন ফকিরকে নবী হিসাবে দাবী করে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট কুষ্টিয়া কোর্টে মামলা করেছে। জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট অভিযোগ পেশ করা লালনভক্তদের মূখপাত্র হয়ে জনৈক মন্টু শাহ যা বলেন, তাঁর গান আমাদের ধর্মীয় শ্লোক। [দ্রঃ সুধীর চক্রবর্তী, ব্রাত্য লোকায়ত লালন, ২য় সংস্করণ, আগস্ট ১৯৯৮ পৃঃ ৪-৯৫] —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ২২)
ফকির লালন শাঁই মুক্তছন্দ মহাসমুদ্রের মতো চিরপ্রবাহমান সত্য যা অখণ্ড এবং সর্বব্যাপ্ত কোরান। —অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৮১
ইসলাম কী বলে?
যারা নিজেদের আবিস্কৃত কথাকে আল্লাহর কিতাব বলে চালিয়ে দেয়, তারা মিথ্যাবাদী। মহান রব্ব তাদের ব্যাপারে বলেন,
وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقًا يَلْوُونَ أَلْسِنَتَهُم بِالْكِتَابِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ الْكِتَابِ وَمَا هُوَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِندِ اللَّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِندِ اللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ
“তাদেরই মধ্যে একদল লোক এমন আছে, যারা কিতাব (তাওরাত) পড়ার সময় নিজেদের জিহ্বাকে পেঁচায়, যাতে তোমরা (তাদের পেঁচিয়ে তৈরি করা) সে কথাকে কিতাবের অংশ মনে করো, অথচ তা কিতাবের অংশ নয় এবং তারা বলে, এটা আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ, অথচ তা আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ নয় এবং (এভাবে) তারা জেনে শুনে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে।” –(সুরা আলে ইমরান : ৭৮)
فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَٰذَا مِنْ عِندِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا ۖ فَوَيْلٌ لَّهُم مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَّهُم مِّمَّا يَكْسِبُونَ
“সুতরাং ধ্বংস সেই সকল লোকের জন্য, যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে, তারপর (মানুষকে) বলে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে, যাতে তার মাধ্যমে কিঞ্চিত আয়-রোজগার করতে পারে। সুতরাং তাদের হাত যা রচনা করেছে সে কারণেও তাদের জন্য ধ্বংস এবং তারা যা উপার্জন করেছে, সে কারণেও তাদের জন্য ধ্বংস।” –(সুরা বাকারা : ৭৯)
তাছাড়া, রাসুলুল্লাহ সাল্লাহল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্ববর্তী কিতাবের ব্যাপারেও সাবধান করে গেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ، كَيْفَ تَسْأَلُونَ أَهْلَ الْكِتَابِ، وَكِتَابُكُمُ الَّذِي أُنْزِلَ عَلَى نَبِيِّهِ صلى الله عليه وسلم أَحْدَثُ الأَخْبَارِ بِاللَّهِ، تَقْرَءُونَهُ لَمْ يُشَبْ، وَقَدْ حَدَّثَكُمُ اللَّهُ أَنَّ أَهْلَ الْكِتَابِ بَدَّلُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ وَغَيَّرُوا بِأَيْدِيهِمُ الْكِتَابَ فَقَالُوا هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ، لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلاً
“হে মুসলিম সমাজ, কী করে তোমরা আহলে কিতাবদের নিকট জিজ্ঞেস করো? অথচ আল্লাহ তাঁর নবীর ওপর যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, তা আল্লাহ-র সম্পর্কিত নবতর তথ্য সম্বলিত, যা তোমরা তিলাওয়াত করছো এবং যার মধ্যে মিথ্যার কোন সংমিশ্রণ নেই। তদুপরি আল্লাহ তোমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, আহলে কিতাবরা আল্লাহ যা লিখে দিয়েছিলেন, তা পরিবর্তন করে ফেলেছে এবং নিজ হাতে সেই কিতাবের বিকৃতি সাধন করে তা দিয়ে তুচ্ছ মূল্যের উদ্দেশে প্রচার করেছে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকেই অবতীর্ণ।” –(সহিহ বুখারী, হাদিস নং : ২৬৮৫)
মনে রাখতে হবে—আল্লাহর সকল কথা ওহী। আর ওহীর দরজা বন্ধ হয়ে গেছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তেকালের সাথে সাথেই। হযরত উমার ইবনু খাত্তাব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
إِنَّ أُنَاسًا كَانُوْا يُؤْخَذُوْنَ بِالْوَحْيِ فِيْ عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَإِنَّ الْوَحْيَ قَدْ انْقَطَعَ
“আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে কিছু ব্যক্তিকে ওহীর ভিত্তিতে পাকড়াও করা হতো। এখন ওহী বন্ধ হয়ে গেছে।” —(সহিহ বুখারী, হাদিস নং : ২৬৪১)
এরপরও যদি কেউ দাবি করে যে, তার নিজস্ব বক্তব্যগুলোও ওহী, তাহলে নিশ্চিত জেনে নিতে হবে—সেগুলো শয়তানের প্ররোচনা। কারণ, মহান রব্ব বলেন—
وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰ أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ ۖ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ
“শয়তানেরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিতর্ক করার জন্য প্ররোচনা দিতে থাকে। তোমরা যদি তাদের কথা মত চলো, তবে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হয়ে যাবে।” —সুরা আনআম : ১২১
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
শান্তি সম্প্রীতি ও উদারতার ধর্ম ইসলাম
নামে যার শান্তির আশ্বাস তার ব্যাপারে আর যাই হোক, সন্ত্রাসের অপবাদ দেয়ার আগে তার স্বরূপ উদঘাটনে দু'দণ...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (৩য় পর্ব)
...
তাহাফফুযে খতমে নবুওত ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়
الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونؤمن به ونتوكل عليه،ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا،...
মৃত্যুর পর বরযখ, কেয়ামত ও আখেরাত
এ কথা সবাই জানে ও মানে, যে ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ করেছে তাকে মৃত্যু বরণ করতেই হবে। কিন্তু মৃত্যুর পর কী ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন