প্রবন্ধ
তথ্য সন্ত্রাস ও মিডিয়া সন্ত্রাস: আধুনিক যুগের এক নীরব যুদ্ধ
৪ জুলাই, ২০২৬
৮১৫
০
বর্তমানে এটা আর কারো কাছেই অজানা নয় যে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় গণমাধ্যমের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও বিপজ্জনক। অধিকাংশ গবেষণায় একমত হয়েছে যে গণমাধ্যম আধুনিক যুগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং এটি জনগণ ও সমাজের চিন্তা-চেতনা গঠনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
এক সময় যুদ্ধ মানেই ছিল কামান, গোলা, বারুদ ও সৈন্য-সামন্তের সংঘর্ষ। কিন্তু আধুনিক যুগে যুদ্ধের রূপ বদলেছে। আজ মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, আবেগ, মূল্যবোধ এবং জনমতকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পরিচালিত হচ্ছে আরেক ধরনের যুদ্ধ ‘তথ্যযুদ্ধ’ (Information Warfare)। আর যখন তথ্যকে বিকৃত করে, মিথ্যাকে সত্যের পোশাক পরিয়ে, গুজবকে সংবাদ বানিয়ে এবং জনমতকে বিভ্রান্ত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা রূপ নেয় ‘তথ্য সন্ত্রাস’ বা ‘মিডিয়া সন্ত্রাসে’।
তথ্য সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি মানুষের শরীরকে নয়, বরং তার বিবেক, চিন্তা ও বিচারবোধকে আক্রমণ করে। একটি মিথ্যা সংবাদ কখনো কখনো হাজারো মানুষের মনে এমন ধারণা সৃষ্টি করে, যা বহু বছরেও দূর করা সম্ভব হয় না।
তথ্য সন্ত্রাস কী?
তথ্য সন্ত্রাস হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর, অসম্পূর্ণ, বিকৃত অথবা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান বা জাতির বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা হয়।
আজকের বিশ্বে এই সন্ত্রাস পরিচালিত হয়,
১. টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে,
২. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে,
৩. ইউটিউব, ব্লগ ও অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে,
৪. সংগঠিত প্রচারণা ও ট্রল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশসহ বহু দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা বাস্তব জীবনে উত্তেজনা, সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
মিডিয়ার প্রকারভেদ
মিডিয়াকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়,
১. দৃশ্যমান মিডিয়া (Visual Media):
যা চোখ দিয়ে দেখা হয়। যেমন: টেলিভিশন, ভিডিও, চলচ্চিত্র ইত্যাদি।
২. শ্রবণযোগ্য মিডিয়া (Audio Media):
যা কানের মাধ্যমে শোনা হয়। যেমন: রেডিও, অডিও রেকর্ডিং, পডকাস্ট ইত্যাদি।
৩. লিখিত মিডিয়া (Print Media):
যা পড়ার মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। যেমন: সংবাদপত্র, সাময়িকী, ম্যাগাজিন ও বইপত্র।
প্রথম দুই প্রকারকে আমরা সাধারণত ইলেকট্রনিক মিডিয়া বলি এবং তৃতীয়টিকে প্রিন্ট মিডিয়া বলা হয়।
মিডিয়া ট্রায়াল: আদালতের আগেই রায়
বর্তমান যুগের অন্যতম বিপজ্জনক প্রবণতা হলো ‘মিডিয়া ট্রায়াল’।
কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আদালতের রায়ের অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জনসমক্ষে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে আদালতে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেও তার সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক জীবন ও মানসিক শান্তি অনেকাংশেই ধ্বংস হয়ে যায়।
বাংলাদেশেও বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল পোস্ট, কাটাছেঁড়া করা ভিডিও বা যাচাইবিহীন তথ্যের ভিত্তিতে মানুষের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে। গবেষকেরা একে ‘ডিজিটাল কোর্ট অব পাবলিক ওপিনিয়ন’ বা জনমতের আদালত হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে অভিযোগই অনেক সময় রায়ে পরিণত হয়।
আলেম-উলামাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার: তথ্য সন্ত্রাসের এক নির্মম অধ্যায়
বাংলাদেশে তথ্য সন্ত্রাস ও মিডিয়া সন্ত্রাসের সবচেয়ে আলোচিত এবং বেদনাদায়ক দিকগুলোর একটি হলো আলেম-উলামা ও মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রচারণা। সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের ধারণা, সমাজের অন্য অনেক শ্রেণির তুলনায় আলেমদের ছোটখাটো ভুল, অসতর্ক মন্তব্য বা বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে অনেক বেশি প্রচার করা হয়; কখনো কখনো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুরো আলেম সমাজের পরিচয় হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়।
বর্তমান অনলাইন যুগে এটি আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। একজন আলেম হয়তো এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টার একটি বক্তব্যে কুরআন, হাদীস, নৈতিকতা, পরিবার, সমাজ সংস্কার ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা করলেন। কিন্তু পুরো বক্তব্য থেকে মাত্র দশ বা পনেরো সেকেন্ডের একটি অংশ কেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। এরপর এমন একটি শিরোনাম যুক্ত করা হলো, যা শুনলে মনে হবে তিনি হয়তো চরমপন্থী, অসহিষ্ণু বা অযৌক্তিক কোনো কথা বলেছেন। অথচ পুরো বক্তব্য শুনলে দেখা যায়, প্রকৃত অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এভাবে একটি ক্লিপ, একটি শিরোনাম বা একটি বিকৃত উদ্ধৃতি কখনো কখনো বছরের পর বছর গড়ে তোলা একজন আলেমের সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়।
মাদরাসার বিরুদ্ধে অপপ্রচার: তথ্য সন্ত্রাসের এক নির্মম অধ্যায়
মাদরাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। দেশের হাজার হাজার মাদরাসায় লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, অসংখ্য আলেম সমাজসেবা, দ্বীনি শিক্ষা, মানবিক সহায়তা ও নৈতিক চরিত্র গঠনের কাজে নিয়োজিত আছেন। কিন্তু এসব ইতিবাচক কাজ খুব কমই আলোচনায় আসে। অন্যদিকে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম বা অপরাধের অভিযোগ উঠলে সেটি এমনভাবে প্রচার করা হয় যে সাধারণ মানুষের মনে ধারণা জন্মায়, যেন পুরো মাদরাসা ব্যবস্থা একই সমস্যায় আক্রান্ত।
এখানে প্রশ্ন হলো, কোনো স্কুলে অপরাধ ঘটলে কি পুরো স্কুলব্যবস্থাকে অপরাধী বলা হয়? কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক অন্যায় করলে কি পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়? কোনো সাংবাদিকের ভুলে কি পুরো সাংবাদিক সমাজকে দোষারোপ করা হয়? যদি না হয়, তাহলে আলেম-উলামা ও মাদরাসার ক্ষেত্রে ভিন্ন মানদণ্ড কেন প্রয়োগ করা হবে?
দুঃখজনক হলেও সত্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনেক মানুষ শিরোনাম পড়েই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তারা পুরো বক্তব্য শোনে না, ঘটনার প্রেক্ষাপট জানে না, তথ্য যাচাই করে না। ফলে একটি বিকৃত সংবাদ, একটি কাটাছেঁড়া ভিডিও বা একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং জনমনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
এর ফলে শুধু একজন আলেম বা একটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামী মূল্যবোধ ও দ্বীনি নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষুন্ন হয়। এ কারণেই আলেম-উলামাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারকে অনেকে তথ্য সন্ত্রাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ বলে মনে করেন। কারণ এর উদ্দেশ্য শুধু একজন ব্যক্তিকে সমালোচনা করা নয়; বরং অনেক সময় তার মাধ্যমে একটি বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয়, একটি শিক্ষাব্যবস্থা বা একটি আদর্শিক ধারাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ একবার ছড়িয়ে পড়লে তার সংশোধন আর ততটা মানুষের কাছে পৌঁছায় না। অপপ্রচার মুহূর্তে ভাইরাল হয়, কিন্তু সত্যের ব্যাখ্যা অনেক সময় নীরবে হারিয়ে যায়। ফলে মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায় অভিযোগ, কিন্তু হারিয়ে যায় বাস্তবতা।
এই বাস্তবতায় আলেম-উলামা, মাদরাসা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোনো সংবাদ বা ভিডিও দেখলে একজন সচেতন মানুষের দায়িত্ব হলো, তাৎক্ষণিক আবেগে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পুরো বিষয়টি যাচাই করা, প্রেক্ষাপট জানা এবং সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করা। কারণ ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, যাচাইহীন সংবাদ প্রচার করা যেমন অন্যায়, তেমনি যাচাই ছাড়া কারো বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করাও অন্যায়।
কল্যাণ ও অকল্যাণের বিচারে মিডিয়াকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি।
যদি মিডিয়া সত্য, ন্যায়, মানবকল্যাণ ও দ্বীনের খেদমতের জন্য ব্যবহৃত হয়, তাহলে এর উপকারিতা অপরিসীম। কিন্তু যদি এটি মিথ্যা, অপপ্রচার, অশ্লীলতা, বিভ্রান্তি ও ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তাহলে মানবসমাজের জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ অস্ত্র আর খুব কমই আছে।
আজ মিডিয়ার এই দুই দরজাই মানুষের জন্য খোলা রয়েছে। কেউ একে কল্যাণের পথে ব্যবহার করছে, আবার কেউ ধ্বংসের কাজে লাগাচ্ছে।
বাংলাদেশের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশে একাধিকবার দেখা গেছে, ফেসবুক পোস্ট বা অনলাইন গুজবকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা এবং সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পরে তদন্তে দেখা গেছে, অনেক তথ্যই ছিল বিকৃত, ভুয়া অথবা প্রেক্ষাপটহীন।
কখনো একটি স্ক্রিনশট, কখনো একটি এডিট করা ছবি, কখনো একটি পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার নামে প্রচার করে জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়েছে।
আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর সংবাদের ভাষা এমন হয় যে পাঠক ধরে নেন তিনি অপরাধী। কিন্তু পরে তদন্ত বা আদালতের প্রক্রিয়ায় ভিন্ন চিত্র সামনে আসে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: তথ্য সন্ত্রাসের নতুন অস্ত্র
আগে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করত বড় বড় মিডিয়া হাউস। এখন একটি ফেসবুক পোস্ট, একটি ইউটিউব ভিডিও অথবা একটি টিকটক ক্লিপ লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে তথ্য সন্ত্রাসের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে। আজ অনেকেই শেয়ার করেন, কিন্তু যাচাই করেন না।
অনেকেই আবেগে প্রতিক্রিয়া দেন, কিন্তু উৎস পরীক্ষা করেন না। অনেকেই শিরোনাম পড়েন, কিন্তু পুরো সংবাদ পড়েন না। এই সংস্কৃতি তথ্য সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ইসলামের দৃষ্টিতে তথ্য সন্ত্রাস ও মিডিয়া সন্ত্রাস
ইসলাম যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো সংবাদ প্রচার করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। কারণ একটি মিথ্যা বা যাচাইহীন তথ্য ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
“হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও।”-(সূরা হুজুরাত: ৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
“মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়।”-(সহীহ মুসলিম)
এই নির্দেশনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, গুজব ছড়ানো, যাচাইহীন তথ্য প্রচার করা এবং মানুষের সম্মানহানি করা ইসলামী দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ।
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন,
﴿وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴾
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে। আর তারাই সফলকাম।”-আলে ইমরান, আয়াত নং: ১০৪
﴿وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ﴾
“তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা স্পষ্ট প্রমাণ এসে যাওয়ার পরও বিভক্ত হয়েছে এবং পরস্পর মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”-(সূরা আলে ইমরান: ১০৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও ইরশাদ করেছেন,
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ
“যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের পথ দেখাবে, সে ঐ কাজ সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।”-(সহীহ মুসলিম)
এসব আয়াত ও হাদীস থেকে বোঝা যায়, তথ্য ও সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রেও একজন মুসলিমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্য ও কল্যাণের প্রচার যেমন ইবাদত, তেমনি মিথ্যা, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো বড় গুনাহ।
ইসলামের দৃষ্টিতে মিডিয়ার গুরুত্ব ও প্রভাব এবং মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার ও মুসলিমদের দায়িত্ব
তথ্য এমন একটি শক্তি, যার প্রভাব আজ পৃথিবীর প্রতিটি দেশ, সমাজ ও পরিবারের ওপর পড়ছে। বর্তমান যুগে কোনো ব্যক্তি, জাতি বা রাষ্ট্র উন্নতি, প্রভাব কিংবা নেতৃত্ব অর্জন করতে চাইলে এই শক্তিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আর এই শক্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো, মিডিয়া।
সংবাদপত্র, সাময়িকী, টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সবই মিডিয়ার অন্তর্ভুক্ত।
মিডিয়া সত্য, ন্যায়, মানবকল্যাণ ও দ্বীনের খেদমতে ব্যবহৃত হলে এর উপকারিতা অপরিসীম। পক্ষান্তরে মিথ্যা, অপপ্রচার, অশ্লীলতা ও বিভ্রান্তি ছড়াতে ব্যবহৃত হলে এটি সমাজের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর অস্ত্রে পরিণত হয়।
একটি বই হয়তো শত মানুষ পড়তে পারে; কিন্তু একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান, একটি অনলাইন প্রতিবেদন কিংবা একটি ভাইরাল ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই লক্ষ-কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। মানুষের চিন্তা-চেতনা, পছন্দ-অপছন্দ, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শন গঠনে মিডিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদের অনুসারীরা নিজেদের আদর্শ প্রচারের জন্য মিডিয়াকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছে। অনেকেই বিকৃত মতবাদ, মনগড়া দর্শন ও মানব রচিত চিন্তাধারাকেও মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
অথচ মুসলিম উম্মাহর হাতে রয়েছে আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব “পবিত্র কুরআন”। রয়েছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অমূল্য হাদীসসমূহ এবং মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ফকীহদের বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার। তাই প্রশ্ন হলো, এই মহামূল্যবান সম্পদ মানবতার কাছে পৌঁছে দিতে আমরা মিডিয়াকে কতটুকু কাজে লাগাচ্ছি?
বর্তমান যুগকে অনেকেই তথ্য ও চিন্তার যুদ্ধের যুগ বলে থাকেন। এখানে শুধু অস্ত্রের লড়াই নয়; বরং আদর্শ, বিশ্বাস ও তথ্যেরও লড়াই চলছে। তাই মিডিয়াকে অবহেলা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তা-চেতনা অন্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া।
মিডিয়াকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, বরং এটিকে সত্য, ন্যায়, ঈমান, উত্তম আখলাক ও মানবকল্যাণের বাহনে পরিণত করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
এই মহামূল্যবান সম্পদ মানবতার কাছে পৌঁছে দিতে আমরা মিডিয়াকে কতটুকু ব্যবহার করছি?
যদি কোথাও ঈমানবিধ্বংসী অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়, তাহলে আমাদের উচিত ঈমান জাগানিয়া অনুষ্ঠান তৈরি করা। যদি কোথাও নাস্তিকতা ছড়ানো হয়, তাহলে তাওহীদের দাওয়াত ও আল্লাহর নিদর্শন মানুষের সামনে তুলে ধরা। আর যদি কোথাও অশ্লীলতা ছড়ানো হয়, তাহলে পবিত্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম চরিত্রের শিক্ষা প্রচার করা।
বর্তমান মিডিয়ার ক্ষতিকর দিক, অশ্লীলতা, নৈতিক অবক্ষয় ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি, করণীয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির দায়িত্ব:
নৈতিক অবক্ষয় ১:
বর্তমানে অধিকাংশ মিডিয়ার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে জনপ্রিয়তা, দর্শকসংখ্যা বৃদ্ধি ও আর্থিক লাভ। ফলে সত্য, ন্যায়, ঈমান, ইসলামী মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হয়। সমাজ ধ্বংস হচ্ছে কি না, নতুন প্রজন্ম বিপথগামী হচ্ছে কি না, এসব বিষয় তাদের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, বৃহৎ পরিসরে মিডিয়া পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলে অনেক সময় অর্থনৈতিক স্বার্থই সত্য ও নৈতিকতার ওপর প্রাধান্য পায়।
এছাড়া অনেক অনুষ্ঠান এমন ব্যক্তিদের দ্বারা নির্মিত হয়, যাদের কাছে ইসলামী আকীদা, নৈতিকতা ও ঈমানী মূল্যবোধের কোনো গুরুত্ব নেই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাও থাকে না। ফলে উপকারের পরিবর্তে সমাজে বিভ্রান্তি ও ক্ষতির আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই প্রত্যেক বিষয়ে সেই বিষয়ের যোগ্য ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমেই অনুষ্ঠান প্রস্তুত হওয়া উচিত।
নৈতিক অবক্ষয় ২:
বর্তমান মিডিয়ার অন্যতম বড় সংকট হলো অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও অনৈতিকতাকে স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করা। বিশেষ করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অশোভন পোশাক, অশ্লীল দৃশ্য এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গোপন বিষয় প্রকাশ্যে তুলে ধরার প্রবণতা সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
এসব দৃশ্যের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। শিশু-কিশোররা বারবার এসব বিষয় দেখে এগুলোকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তাদের চিন্তা, রুচি, চরিত্র ও জীবনদর্শনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
إِذَا لَمْ تَسْتَحِ فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ
“যখন তোমার মধ্যে লজ্জা-শরম থাকবে না, তখন তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারো।”-(আল আদাবুল মুফরাদ)
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
الْحَيَاءُ خَيْرٌ كُلُّهُ
“হায়া সম্পূর্ণটাই কল্যাণ।”-(সহীহ মুসলিম)
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
الْحَيَاءُ لَا يَأْتِي إِلَّا بِخَيْرٍ
“হায়া কেবল কল্যাণই নিয়ে আসে।”-(আল আদাবুল মুফরাদ)
আরও ইরশাদ করেছেন,
الْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الْإِيمَانِ
“হায়া ঈমানের একটি শাখা।”-(সুনানে নাসাঈ)
অতএব যে কোনো মাধ্যম মানুষের ভেতর থেকে হায়া, লজ্জাশীলতা ও নৈতিকতা দূর করে দেয়, তা ব্যক্তি ও সমাজ, উভয়ের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর।
ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক বিকল্প মিডিয়ার প্রয়োজন
অনেকে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় মনে করে তা থেকে দূরে থাকে। মিডিয়ার ক্ষতিকর দিকের সমাধান মিডিয়া থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং সত্য, ন্যায়, ঈমান ও মানবকল্যাণভিত্তিক বিকল্প মিডিয়া গড়ে তোলা।
যেখানে অশ্লীলতা প্রচারিত হয়, সেখানে পবিত্রতা ও উত্তম চরিত্রের শিক্ষা প্রচার করতে হবে। যেখানে নাস্তিকতা ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়, সেখানে তাওহীদ, কুরআন-সুন্নাহ এবং ইসলামের সুমহান আদর্শ মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। এভাবেই মিডিয়াকে সমাজ সংস্কার ও দ্বীনের খেদমতের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
﴿كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ﴾
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত; মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ কর এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ।” -(সূরা আলে ইমরান: ১১০)
রাষ্ট্র ও ব্যক্তির দায়িত্ব
যেসব দেশে মুসলিম শাসনব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে সরকারের দায়িত্ব হলো মিডিয়াকে সত্য, ন্যায় ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রচারে ব্যবহার করা এবং ক্ষতিকর ও অনৈতিক বিষয়ের পথ রোধ করা।
আর যেসব দেশে মুসলিম শাসনব্যবস্থা নেই, সেখানেও ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক পর্যায়ে মুসলমানদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সত্য প্রচার করবে, মিথ্যার প্রতিবাদ করবে এবং ইসলামী মূল্যবোধসমৃদ্ধ বিকল্প উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذٰلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
“তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন তা হাত দ্বারা প্রতিরোধ করে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে মুখের মাধ্যমে; আর যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তরে তা ঘৃণা করে। আর এটিই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।” -(সহীহ মুসলিম)
অতএব, মিডিয়ার অপব্যবহার, অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী অবস্থান নেওয়া এবং সত্য, ন্যায় ও ইসলামী মূল্যবোধসমৃদ্ধ মিডিয়া গড়ে তোলা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
“তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”-(সহীহ বুখারী)
সুতরাং, হে প্রিয় পাঠক, লেখক, কলামিস্ট, সাংবাদিক, সম্পাদক, গবেষক, শিক্ষক, দাঈ, বক্তা, কনটেন্ট নির্মাতা, ব্লগার, প্রকাশক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী আল্লাহকে ভয় ও সততা, আমানতদারিতার পরিচয় দিন। সত্য প্রচার করুন। সত্য প্রচারের সহযোগী হোন। যেমনিভাবে মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করলে তার সওয়াব যেমন পাবেন, তেমনি মিথ্যা, বিভ্রান্তি ও গুনাহের পথে আহ্বান করলে তার দায়ও আপনাকেই বহন করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ﴾
আল্লাহ তাআলা বলেন: “যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মিডিয়াকে সত্য, ন্যায়, ঈমান, আখলাক ও মানবকল্যাণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার তাওফীক দান করুন। মিথ্যা, অপপ্রচার, অশ্লীলতা ও সকল প্রকার তথ্য সন্ত্রাস থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
মানবিক ও সুস্থ ধারার সমাজ গঠনে মসজিদের ভূমিকা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুর নাম মসজিদ। মসজিদ ছাড়া মুসলিম সমাজ কল্পনা করা যায় না। মসজিদ শিআরে ইসলাম...
دارالعلوم دیوبند کے مردِ ذکی و دوٗراندیش حضرت مولانا ریاست علی ظفربجنوری رحمة اللہ علیہ
یاد سے تیری، دلِ درد آشنا معمور ہے جیسے کعبے میں دعاؤں سے فَضا معمور ہے شنبہ: ۲۳/شعبان ۱۴۳۸ھ= ۲۰/مئی...
শিক্ষার জন্য শিক্ষকের বিকল্প নেই
আল্লাহ তা'আলা সকল নর-নারীর জন্য ইলম অর্জন ফরজ করেছেন। ইলম আল্লাহ তা'আলার একটি সিফাত। আল্লাহ ত'আলা তা...
অধীনস্তদের অধিকার ও বর্তমান সমাজ
আল-কুরআনুল কারীমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুমিনদেরকে সম্বোধন করে বলেছেন, 'তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন