প্রবন্ধ
সভ্যতার আয়নায় আজকের খেলা
৩ জুন, ২০২৬
১০৬০৩
০
অমুসলিমদের আচার-আচরণ ও কালচার Vs ইসলামী সভ্যতার মূলনীতি। পর্ব ৬
ভূমিকা:
প্রত্যেক সভ্যতারই কিছু প্রতীক থাকে। কোনো সভ্যতার প্রতীক তার জ্ঞানচর্চা, কোনো সভ্যতার প্রতীক তার নৈতিকতা, আবার কোনো সভ্যতার প্রতীক তার ধর্মীয় আদর্শ। প্রতীকের মধ্য দিয়েই একটি জাতির অগ্রাধিকার, চিন্তাধারা ও লক্ষ্য নির্ধারিত হয়।
ইসলামী সভ্যতার দিকে তাকালে আমরা দেখি, এর প্রাণশক্তি ছিল তাওহীদ, এর সৌন্দর্য ছিল আখলাক, আর এর শক্তি ছিল উম্মাহর ঐক্য। মুসলিম সমাজের শ্রেষ্ঠ প্রজন্মগুলো নিজেদের পরিচয় খুঁজে পেয়েছিল মসজিদে, ময়দানে নয়; কুরআনের আলোকে, বিনোদনের উন্মাদনায় নয়; উম্মাহর কল্যাণে, ব্যক্তিগত আবেগের পেছনে নয়।
কিন্তু আধুনিক বিশ্বের একটি বড় বাস্তবতা হলো, বিনোদনকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা। আজ খেলা শুধু খেলা নয়; এটি একটি সংস্কৃতি, একটি অর্থনীতি, একটি আবেগ এবং অনেকের জন্য একটি পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি মানুষ এমনভাবে এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে যে, অনেক সময় তা তাদের ইবাদত, সময়, সম্পদ এবং ঈমানী অগ্রাধিকারের উপর প্রভাব ফেলছে।
প্রশ্ন হলো, একজন মুসলিম কি খেলা দেখতে পারে? অবশ্যই পারে। কিন্তু যখন কোনো খেলা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়, ফরজ ইবাদতের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, সম্পদের অপচয় ঘটায়, উম্মাহর দুঃখ-কষ্ট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং দলীয় উন্মাদনাকে ঈমানী পরিচয়ের উপর স্থান দেয়, তখন তা নিছক বিনোদনের গণ্ডি অতিক্রম করে একটি আত্মিক সংকটে রূপ নেয়।
বিশ্বকাপ এখন আর খেলা নেই। এটা একটা "আধুনিক দাজ্জালী ফিতনা" যার চোখ ধাঁধানো আলোয় পড়ে মুসলিম যুবক তার ফজর, তার সম্পদ, তার উম্মাহ সব ভুলে যায়। এই আয়নায় নিজেকে দেখে প্রশ্ন করুন: আমি "খাইরু উম্মাহ" (শ্রেষ্ঠ উম্মত) নাকি "লাহউ ও লা'ইবের (বিনোদনের) উম্মত"?
১. ফরজ বরবাদ করে খেলা: এটা আর খেলা থাকে না, গুনাহ হয়ে যায়
ক. ফজর চুরি করে বিশ্বকাপ
রাত ৩টায় টিভির সামনে জেগে থাকে, কিন্তু ফজরের মুয়াজ্জিন ডাকলে কানে তুলা দেয়। আল্লাহর ধমক শুনুন:
فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ
"ধ্বংস সেই নামাজিদের জন্য, যারা নিজেদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন"- সূরা মাউন ১০৭: ৪-৫
নবীজি ﷺ কত কঠোর ভাষায় বলেছেন:
«مَنْ تَرَكَ صَلَاةَ الْعَصْرِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ»
"যে ব্যক্তি আসরের নামাজ ছেড়ে দিল, তার সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে গেল" - সহীহ বুখারি ৫৫৩
ফজর ছেড়ে মেসির গোল দেখলে আপনার ২৪ ঘণ্টার ইবাদতের খাতা শূন্য। এই লোকসান কোনো ট্রফি দিয়ে পূরণ হবে?
খ. অপচয়: শয়তানের ভ্রাতৃত্ব
জার্সি ৫ হাজার, পতাকা ২ হাজার, প্রজেক্টর ভাড়া ১০ হাজার। অথচ পাশের গলিতে মা-বোন চালের জন্য হাহাকার করে। আল্লাহর লা'নত শুনুন:
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ
"নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই" - সূরা ইসরা ১৭:২৭
ভাই, শয়তানের ভাই হয়ে জান্নাত চান? এই টাকা দিয়ে একটা এতিমের মুখে হাসি ফোটালে আল্লাহ খুশি হতেন। এখন খুশি হচ্ছে এডিডাস আর নাইকি (মানুষের বানানো নাম ও মূর্তিপূজার দেবির নামের পিছনে)।
২. জুয়া ও ঘৃণা: খেলার ভেতরের বিষ
আজকের খেলা জুয়া ছাড়া চলে না। ফ্যান্টাসি লিগ, বেটিং সাইট - সব হারাম। আল্লাহ চূড়ান্ত ফায়সালা দিয়ে দিয়েছেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ... رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ﴾
"হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া... এগুলো শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো বর্জন করো" - সূরা মায়িদা ৫:৯০
খেলা শেষে দল হারলে গালি, চেয়ার ভাঙা, আত্মহত্যা। নবী ﷺ বলেছেন:
«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ»
"প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে" - সহীহ বুখারি ১০
এটা মুসলিমের আখলাক? নাকি জাহেলিয়াতের উন্মাদনা?
৩. ঈমানী পরিচয় বিক্রি: ওয়ালা-বারার মৃত্যু
যখন ফিলিস্তিনের শিশুর লাশের চেয়ে নেইমারের চোখের পানি আপনার কাছে দামি লাগে, তখন বুঝবেন আপনার অন্তর মরে গেছে। আল্লাহ ফায়সালা শুনিয়ে দিলেন:
﴿لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ﴾
"আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে এমন কোনো সম্প্রদায় তুমি পাবে না, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরোধিতাকারীদের ভালোবাসে" - সূরা মুজাদালা ৫৮:২২
পতাকা কাঁধে নিয়ে "গো ব্রাজিল" বলা সহজ। কিন্তু কিয়ামতের ময়দানে যখন পতাকা খুলে নেওয়া হবে, তখন "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এর পতাকা নিয়ে দাঁড়াতে পারবেন তো?
৪. সময়ের লাশ: ৯০ মিনিট = ৯০ দিন
২৪ ঘণ্টা থেকে রোজ ৬ ঘণ্টা খেলা + আড্ডা + ট্রল। বছরে ৯০ দিন শেষ। ইবনুল কাইয়িম রহ. এর কথাটা কলিজায় গেঁথে নিন:
"সময় তলোয়ারের মতো। তুমি তাকে না কাটলে, সে তোমাকে কেটে ফেলবে"।
এই ৯০ দিনে আপনি কুরআন খতম দিতে পারতেন। ১০টা ইসলামী বই পড়তে পারতেন। উম্মাহর জন্য দোয়া করতে পারতেন। আর আপনি কী করলেন? ২টা লোক ৯০ মিনিট ধরে একটা বল নিয়ে দৌড়ালো, আর আপনি তাকিয়ে রইলেন।
সুতরাং সিদ্ধান্ত আপনার, ফতোয়া দেওয়া আমার কাজ না। আমি শুধু আয়নাটা ধরিয়ে দিলাম।
আজকের খেলার সিস্টেমটা এমন, আপনি ভেতরে ঢুকলে ঈমান নিয়ে বের হতে পারবেন না। নামাজ যাবে, টাকা যাবে, আখলাক যাবে, উম্মাহর দরদ যাবে।
নবী ﷺ বলেছেন:
«احْرِصْ عَلَى مَا يَنفَعُكَ»
"যা তোমার উপকারে আসবে তার প্রতি লোভী হও"- সহীহ মুসলিম, ২৬৬৪
খেলা আপনার উপকারে আসবে? নাকি কবরের ৩টা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার উপকারে আসবে?
ফজরের ২ রাকাত বিশ্বকাপের ৯০ মিনিট। টিভি/মোবাইল/ল্যাপটপ বন্ধ করে জায়নামাজ বিছান। কবরে স্কোরবোর্ড থাকবে না, আমলনামা থাকবে।
সিদ্ধান্ত নিন: আপনি "হিযবুশ শাইতান" শয়তানের দলে থাকবেন, নাকি "হিযবুল্লাহ" আল্লাহর দলে?
আল্লাহর ওয়াদা: "আল্লাহর দলই সফলকাম" - সূরা মুজাদালা ৫৮:২
আল্লাহ আমাদের সময়ের মূল্য বোঝার, ফরজ ইবাদতের হেফাজত করার এবং ইসলামী সভ্যতার প্রকৃত চেতনাকে ধারণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
اسلامی تعزیرات کی معاشرتی اہمیت
...
অধীনস্তদের অধিকার ও বর্তমান সমাজ
আল-কুরআনুল কারীমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুমিনদেরকে সম্বোধন করে বলেছেন, 'তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্...
حضور اکرم صلی اللہ علیہ وسلم کے عظیم اخلاق
۱:- حدیث شریف میں آیا ہے کہ حضرت ام المومنین عائشہ صدیقہ رضی اللہ عنہا سے لوگوں نے پوچھا تھا کہ رسو...
সংঘাতময় পরিস্থিতি: উপেক্ষিত নববী আদর্শ
দিনে দিনে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পৃথিবী। সমতালে এর অধিবাসীরাও 'গরম' হয়ে উঠছে দিনকে দিন। সেই তাপ ও উত্তাপ ব...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন